📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উসমানি যুগে শারঈ বিচারকের পরিধি

📄 উসমানি যুগে শারঈ বিচারকের পরিধি


মিশর উসমানি সালতানাতের অধীনে আসার পর বিজয়ী সুলতান সালিম ১৫১৬ খ্রিষ্টাব্দে শারঈ বিচারকের মৌলিক পরিধি আবার ফিরিয়ে আনেন। অন্যান্য দেশেও এমনটা হয়েছিল। এ সময় শারঈ বিচারকই দেওয়ানি, ফৌজদারি, ব্যক্তিগত যাবতীয় বিষয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টন করা-সহ চুক্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন লেনদেন, স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর এবং ওয়াকফ মন্ত্রণালয় পরিচালনা ছিল তারই দায়িত্ব।

সুলতান আবদুল মাজিদ কর্তৃক জারিকৃত সংশোধনীর ফলে বেসামরিক এবং মিশ্র আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। শারঈ বিচারব্যবস্থা তখন কেবল শারঈ আদালত এবং নাগরিক (আইনি) আদালতের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এ আদালত দুটিই ‘মাজাল্লাহ আইন’ অনুসারে পরিচালিত হতো।

প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, আইন এবং সংশোধনীগুলো ইস্তাম্বুল এবং মিশরে একই নীতি অনুসরণ করে চলত। যাবতীয় শারঈ বিষয় পরিচালনা এবং বিচার করার জন্য ৫৩ নং ধারায় মিশরে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের প্রস্তাবনাটি শারঈ আদালতের পরিধি নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। ব্যক্তিগত এবং শাখাগত বিভিন্ন বিষয়ের আইন সম্পর্কিত বিষয়গুলো ছিল এর সাথে জড়িত। এগুলোর সাথে মার্ডার কেসের ধারাও যুক্ত করা হয়। জেলা ও থানার আদালতগুলো দেওয়ানি আদালত থেকে পরিবর্তনের পরে একচেটিয়াভাবে মিশর এবং আলেকজান্দ্রিয়ার তত্ত্বাবধান করত।

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় প্রস্তাবনাটি পূর্ববর্তী প্রস্তাবনার মতো ১৬ এবং ১৮ নং ধারা অনুসারে শারঈ আদালতের পরিধি নিশ্চিত করে দেয়। স্থানীয় আদালত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের প্রস্তাবনার ১৬ নং ধারায় উল্লেখ করা হয় যে, শারঈ আদালত কিছু কিছু বিষয়ের বিচার করতে পারবে না। সেগুলোর একটি হচ্ছে ‘ব্যক্তিগত বিষয়’।

তারপর ১৯০৯ সালে ২৫ নং আইনে শারঈ আদালত একটি প্রস্তাবনা প্রকাশ করা হয়। যা আগের মতোই ৫, ৬ এবং ৭ নং ধারায় শারঈ আদালতের পরিধি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেয়। এর আগেও ১৮৮৯ সালে সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। ১৮৮৪ সালে হাক্কানিয়্যাহ মন্ত্রণালয়ও একটি ফরমান জারি করে। এই প্রজ্ঞাপন দুটিতে শারঈ বিচারকের সামনে বিদেশি জমির মালিকানা সংক্রান্ত মামলার শুনানি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। শারঈ আদালতও এর ওপর আর নির্ভর করে থাকেনি।... এর পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে এবং ধীরগতিতে শারঈ আদালতের পরিধিগুলো কেড়ে নেওয়া হতে থাকে। একপর্যায়ে শারঈ আদালতের পরিধিগুলো শুধু ব্যক্তিগত বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। যেমনটা হয়ে থাকে খ্রিষ্টান এবং ইহুদিদের ধর্মীয় আর আধ্যাত্মিক ব্যক্তিগত আদালতের মধ্যে। সর্বশেষ ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে তুরস্কে শারঈ আদালতকে বাতিল ঘোষণা দিয়ে শারঈ আদালতের পরিধিগুলো বেসামরিক আদালতের সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়।

মিশরীয় সরকার মুসলিমদের অনুভূতির জন্য শারঈ আদালতের পরিধি সুনির্দিষ্টভাবে সীমাবদ্ধ করার সাহস করেনি। আবার শারঈ আইন প্রয়োগ বাতিল করার জন্য ভিনদেশি আইন ও বিচারব্যবস্থা গ্রহণের প্রকৃত ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত শারঈ আদালতগুলো বুঝতে পারে, অন্যান্য আদালতের পরিধিভুক্ত নয় কেবল এমন বিষয়েই তাদের পরিধি সীমাবদ্ধ। কারণ স্বরাষ্ট্র এবং অর্থ মন্ত্রণালয় শারঈ আদালতের সেসব রায় বাস্তবায়ন করে না, যেগুলো স্থানীয় এবং মিশ্র আদালতের পরিধির মধ্যে পড়ে। এই আদালতগুলো কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কখনোই শারঈ আদালতের রায়কে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেনি।

একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার, ‘ব্যক্তিগত বিষয়’ এই শব্দটি ইউরোপের ব্যবহৃত শব্দ। যার নির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই। ইউরোপের মধ্যে এর অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক যাবতীয় বিষয়ে এ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা আছে। ওয়াকফ শব্দটিও এমন। এটা নিয়েও শারঈ আদালত, বেসামরিক আদালত এবং মিশ্র আদালতের মাঝে অনেক মতবিরোধ রয়েছে। শারঈ বিচারকের পরিধিগুলো যেসব বিষয়ে বিভক্ত ছিল, সেগুলো হচ্ছে: ১. শারঈ আদালত, ২. স্থানীয় আদালত, ৩. মিশ্র আদালত, ৪. দূতাবাস-সম্বন্ধীয় আদালত, ৫. হিসবাহ পরিষদ এবং ৬. ধর্মীয় আদালত।

অভিজাত শ্রেণি এবং শাসক পরিবারের মোকদ্দমা পরিচালনা করার ব্যাপারেও শারঈ বিচারককে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। রায় কার্যকর করার বিষয়টি বিচারক এবং আদালত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এটি হাক্কানিয়্যাহ (আইন) মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত। এই কাজটি বিভিন্ন ধাপে এবং একাধিক পদক্ষেপে সম্পন্ন হতো।

তারপর ৮/১/১৩৩৬ হিজরিতে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে শারঈ বিচারকের পরিধি আনুষ্ঠানিকভাবে উসমানি শারঈ আদালতের কার্যপ্রণালি নির্ধারণ করে আইন জারি করা হয়। যা ছিল ৭ এবং ৮ নং ধারায় সীমাবদ্ধ। সেগুলো হচ্ছে:
১. ব্যক্তিগত অবস্থা। বংশ, বিবাহ, তালাক, অভিভাবকত্ব, নিষেধাজ্ঞা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করা, নাবালকের জন্য অভিভাবক নিয়োগ, তাকে অপসারণ এবং নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পদ দেখাশোনা করা ছিল এর অন্তর্ভুক্ত।
২. মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে বিরোধ। অর্থাৎ উত্তরাধিকার সম্পত্তির বণ্টন।
৩. প্রশাসনিক কাজ। যেমন অভিভাবকত্ব, উইল এবং ওয়াকফ সম্পত্তির পরিচালককে এমন কাজ করার জন্য অনুমোদন করা—যা বিচারকের অনুমতি এবং উইলের নিবন্ধন, ওয়াকফকৃত সম্পদ এবং প্রতিনিধির সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। (ধারা: ৮)
৪. ওয়াকফকৃত সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলা।
৫. শারঈ দলিল অনুসারে ওয়াকফের সম্পত্তি এবং ইয়াতিমদের সম্পত্তি থেকে ঋণ গ্রহণ।
৬. মুক্তিপণ মামলা।

শারঈ বিচারব্যবস্থার জন্য নির্ধারিত এই পরিধিগুলো বর্তমানেও অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রে শারঈ আদালতের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বহাল আছে।

টিকাঃ
[১০৮৭] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭২
[১০৮৮] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৯৭
[১০৮৯] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১৯৮
[১০৯০] ব্যক্তিগত অবস্থা বলে কী বোঝানো হয় সেটা জানতে আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়‍্যাহ, পৃ. ১৯৬-১৯৭ এবং আল-মুরাফাতুল মাদানিয়্যাহ ওয়াত তিজারিয়্যাহ, পৃ. ৩২৩ দেখুন।
[১০৯১] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ২০২
[১০৯২] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ২০৩

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উসমানি যুগে বিচারের উৎস

📄 উসমানি যুগে বিচারের উৎস


উসমানি সালতানাতে আইন প্রণয়নের প্রথম যুগে বিচারের একমাত্র উৎস ছিল শারঈ আইন। কেবল শরীয়ত থেকে এবং বিশেষভাবে হানাফি মাযহাব থেকে তারা সহায়তা গ্রহণ করতেন।

আইন প্রণয়নের দ্বিতীয় যুগে ভিনদেশি আইন আমদানি করা এবং বেসামরিক আদালত প্রতিষ্ঠার পর একাধিক উৎস থেকে বিচারব্যবস্থা এবং বিধিবিধান গ্রহণ করা হতে থাকে। সেই উৎসগুলোর বিবরণ এখানে দেওয়া হলো।

১. ফিকহি মাযহাব। লেনদেন এবং ব্যক্তিগত বিষয়ের ক্ষেত্রে শারঈ বিচারব্যবস্থার বিবেচনায় বিভিন্ন মাযহাবের প্রতিনিধিরা থাকলেও বিচারকার্য পরিচালনা এবং ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবই ছিল উসমানি সালতানাত কর্তৃক রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃত। হানাফি মতাবলম্বী বিচারকরা তো সাধারণভাবে বিচারের ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাব মেনে চলত। আর জেলা পর্যায়ের এবং প্রাদেশিক বিচারকরা বিশেষভাবে হানাফি মাযহাব মেনে চলত। এটা হতো ব্যক্তিগত বিষয় এবং শারঈ আদালতের পরিধির সীমায় থেকে মাযহাবের গ্রহণযোগ্য মতামত অনুসারে।
২. মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ তথা আদালতের বিধিবিধানের সংকলন। উসমানি খিলাফতের অধীনে থাকা প্রায় সবগুলো রাষ্ট্রেই এ আইন কার্যকর ছিল। এর অধীনেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক এবং দেওয়ানি (আইনি) লেনদেন।
৩. আমদানিকৃত ভিনদেশি আইন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। উসমানি খিলাফত এবং মিশরের সুলতান আর প্রশাসকরা যার প্রচলন করেছিলেন। ইতিপূর্বে এগুলোর আলোচনা করা হয়েছে।
৪. ভিনদেশি আদালত বা দূতাবাস ইত্যাদিতে থাকা বিদেশি আইন।
৫. ধর্মীয় আদালতের জন্য প্রযোজ্য অনৈসলামি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিধান।

বিচারের একাধিক উৎসের ফল এই হয় যে, জীবনের অনেক অঙ্গন থেকেই শরীয়তের অনুশাসন খতম হয়ে যায়। শারঈ বিধানের প্রয়োগ কেবল সংকীর্ণ কিছু ক্ষেত্রে এবং নির্দিষ্ট কিছু পরিধির মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

টিকাঃ
[১০৯৩] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৬৭, ১০৭-১১০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00