📄 পশ্চিমাদের থেকে গৃহীত উসমানি আইন
উসমানি সালতানাত পশ্চিমা প্রভাবের শৃঙ্খলে আটকা পড়েছিল। তারা চেয়েছিল পশ্চিমা সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে। আধুনিক উন্নয়ন এবং অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য পশ্চিমা আইন গ্রহণ না করে উপায় নেই—এমনটাই ছিল ভিনদেশি ক্ষমতা এবং বিদেশি সুবিধার বার্তা। উসমানি খিলাফতের কর্মকর্তাদের মাঝেও এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তারা অন্ধ এবং বধিরের মতো ইউরোপের পেছনে ছুটে চলে। পর্যায়ক্রমে এবং ধাপে ধাপে পশ্চিমা নীতি এবং আইন গ্রহণ করে। এমন কয়েকটি আইন এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।
১. ১২৫৬ হিজরিতে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে উসমানি ফৌজদারি আইনটি ছিল ১৮১০ খ্রিষ্টাব্দে জারিকৃত এমনই একটি ফরাসি আইন থেকে গৃহীত। স্থানীয় এবং ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার জন্য একটি বিশেষ বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
২. ১২৬৭ হিজরিতে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের বাণিজ্যিক আইনটি ছিল ফরাসি আইনের একটি আক্ষরিক রূপ।
৩. ১২৬৭ হিজরিতে ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দের আরেকটি ফৌজদারি আইন ইউরোপীয় আইন থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল।
৪. দাতব্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আইন। এটি ১২৭৩ হিজরিতে ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান আবদুল মাজিদের ‘কুলখানা ফরমান’ নিশ্চিতকরণার্থে জারি করা হয়েছিল।
৫. ১২৭৫ হিজরিতে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ভূমি আইন। যা খাস, পরিত্যক্ত এবং অনাবাদি জমিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের জন্য চালু করা হয়েছিল।
৬. ১২৭৮ হিজরিতে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের বাণিজ্য আইনের পরিশিষ্ট।
৭. ১২৭৮ হিজরিতে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের বাণিজ্যিক মামলা পদ্ধতি আইন।
৮. ১২৮০ হিজরিতে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের সামুদ্রিক বাণিজ্য আইনটি তার অনুরূপ একটি ফরাসি আইন থেকে গৃহীত।
৯. ১২৯৬ হিজরিতে ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত আদালত গঠন আইন।
১০. ১২৯৬ হিজরিতে ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দের বেসামরিক আদালতের মূলনীতি-সংক্রান্ত আইন।
১১. ১৩২৯ হিজরিতে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের আপোস বিচারক সংক্রান্ত আইন।
১২. ১৩৩০ হিজরিতে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের মামলা পদ্ধতি আইন।
১৩. স্থাবর সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত আইন। ১৩৩১ হিজরির ৫ই জুমাদাল উলায় এটা জারি করা হয়েছিল।
১৪. ১২৮০ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের ৬ তারিখ জারিকৃত সামুদ্রিক বাণিজ্য আইন।
এসব আইনের অধিকাংশই ছিল ফরাসি আইন থেকে আমদানিকৃত। যা অক্ষরে অক্ষরে তুর্কি ভাষায় ভাষান্তরিত করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে কখনো-বা আরবিতেও অনুবাদ করা হয়। জীবনের যাবতীয় অঙ্গনে প্রয়োজন পূরণের জন্য উসমানি সালতানাতে আইন প্রণয়নের জোয়ার এসেছিল। এসব আইন আমদানির ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় একাধিক বেসামরিক আদালত।
টিকাঃ
[১০৮০] আল-মাদখালুল ফিকহিল আম: ১/১৭৭; জুহুদু তারুনীনিল ফিকহিল ইসলামি, পৃ. ৫৩; উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ ওয়াল মাদানিয়্যাহ, ৯৫; আল-ওয়াজিয ফিল হুকুকিল মাদানিয়্যাহ: ১/৬১; মুহাদ্বারাত ফিত তানযীমিল কাদ্বাঈ, পৃ. ৩১; বুহূসুন ওয়া দিরাসাতুন ফী কানুনিল মুরাফাআতিল মাদানিয়্যাহ আল-ইরাকি, পৃ. ১২
📄 উসমানি যুগে ইসলামি আইন
উসমানি ভূখণ্ডে চলমান শরীয়তের বিধানগুলো স্বতন্ত্র আইন এবং ব্যবস্থাপনা হওয়ায় উসমানি সালতানাত তা আইনিকরণে সচেষ্ট ছিল। তা ছাড়া এসব বিধান ছিল ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত আইন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সমসাময়িক। উসমানি সালতানাতে যেসব ইসলামি আইন জারি করা হয়েছিল, সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।
১. ১২৮৬-১২৯৩ হিজরিতে ১৮৬৯-১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ বা লেনদেন ও নাগরিক আইন। প্রণীত আইনসমূহের মাঝে এগুলো ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। শারঈ বিধানাবলি এভাবেই সর্বপ্রথম আইনিকরণ হয় এবং প্রশাসনিক রূপ পায়। এজন্য এগুলো নিয়ে বিশেষভাবে এবং সবিস্তারে আলোচনা করা হবে।
২. ১৩৩৬ হিজরিতে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে পারিবারিক অধিকার আইন।
৩. ১৩৩৬ হিজরিতে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শারঈ মামলা পদ্ধতি আইন।
📄 মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ
এগুলো হচ্ছে হানাফি মাযহাবের লেনদেন এবং নাগরিক আইনের সমষ্টি। উসমানি সালতানাতে বেসামরিক আদালত প্রতিষ্ঠার পর তাতে শারঈ বিচারকদের পরিবর্তে কেবল আইনি বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। শারঈ আদালত এবং শারঈ বিচারক সমাধান করতে পারে এমন কিছু লেনদেন-সংক্রান্ত মামলা তখন আইনি বিচারকদের পরিধিভুক্ত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় ফিকহি বিধানাবলি সহজে পুনঃনিরীক্ষণ করা এবং হানাফি মাযহাবের গ্রহণযোগ্য এবং আমলযোগ্য মতামতের দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য বেসামরিক আদালতের বিচারকদের সহযোগিতার প্রয়োজন হতে থাকে। এ কারণে আদালতে যেসব শারঈ বিধিবিধান বেশি বেশি উত্থাপিত হয়, সেগুলো সংকলনের জন্য একটি কমিটি গঠন করার নির্দেশনা দিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি হলো।
১২৮৬ হিজরিতে ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে এই কমিটি লেনদেন-সংক্রান্ত বিধানগুলোর একটা সংকলন তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাছে হানাফি মাযহাবের গ্রহণযোগ্য মতামতগুলো উল্লেখ করার পাশাপাশি জনস্বার্থ এবং সময়ের পরিবর্তনের দিকে লক্ষ্য রেখে অগ্রহণযোগ্য মতামতগুলোও উল্লেখ করা হয়।
কমিটি এই বিধানগুলোকে আমদানিকৃত ভিনদেশি আইনের পদ্ধতিতে ক্রমিক নম্বরের ভিত্তিতে সাজিয়েছে। এতে পুনঃনিরীক্ষণ করা সহজ হয়ে গেছে। এ-তে সর্বসাকুল্যে ১৮৫১টি ধারা আছে। এই সংকলনটির নাম রাখা হয়েছে ‘মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ’ তথা আদালতের বিধিবিধানের সংকলন (Journal of Judicial Rulings)। অর্থাৎ লেনদেন ও নাগরিক আইন। ‘লা-ইহাতুল আসবাবিল মুজিবাহ’ তথা আবশ্যকীয় কিছু কারণের প্রস্তাবনা নামে ব্যাখ্যামূলক স্মারকলিপির একটি প্রতিবেদনও এর সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই সংকলনে দুটি ভূমিকা রয়েছে। যার একটি ইসলামি আইনের সংজ্ঞা আর প্রকার সম্পর্কে এবং অন্যটি ৯৯টি ধারার ইসলামি ফিকহ বা আইনের মূলনীতি সম্পর্কে।
১৬৯৩ হিজরির শাবান মাসে মোতাবেক ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে এই সংকলন অনুসারে রায় প্রদান আবশ্যক এবং আইনগুলো যেন রাষ্ট্রের যাবতীয় আদালতে বাস্তবায়ন করা হয়—এ মর্মে নির্দেশনা দিয়ে সুলতান আবদুল আজিজ খান ইবনু দ্বিতীয় মাহমুদের পক্ষ থেকে একটি ফরমান জারি করা হয়। এভাবে এই সংকলনটি হানাফি মাযহাবের আইন থেকে গৃহীত নাগরিক আইন হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত এবং সমাদৃত হয়ে ওঠে।
এই সংকলনের প্রতিবেদনে এসেছে, ‘মুসলিম ইমাম তথা শাসক যদি ইজতিহাদি তথা গবেষণামূলক মাসআলাগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটির ওপর নির্দিষ্টভাবে আমল করার নির্দেশ দেন, তাহলে সে মাসআলা নির্ধারিত হয়ে যাবে। মুসলিম শাসকের বক্তব্য অনুযায়ী আমল করা তখন আবশ্যক হবে।’
এই সংকলনের ১৮০১ নং ধারায় আছে, ‘সুনির্দিষ্ট কোনো মাসআলার ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো মুজতাহিদের রায় অনুযায়ী আমল করার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় কোনো নির্দেশ জারি হলে তদনুযায়ী আমল করা আবশ্যক। কেননা মুজতাহিদের রায়টিই মানুষের জন্য সবচেয়ে সহজ এবং যুগের প্রেক্ষিতে সর্বাধিক উপযুক্ত। উপর্যুক্ত মুজতাহিদের রায় বাদ দিয়ে অন্য মুজতাহিদ প্রদত্ত বিপরীত কোনো রায় অনুযায়ী ফয়সালা দেওয়ার অধিকার বিচারকের নেই। বিপরীত ফয়সালা দিলেও সেটা কার্যকর করা হবে না।’
ব্যাখ্যা হিসেবে ফিকহ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হিসেবে আইনের মধ্যে সমন্বয় হচ্ছে এই সংকলনের অনন্য সুবিধা। কিছু শাখাগত এবং মৌলিক আলোচনা আপন আপন জায়গাতে বর্ণনা করার পর তা একটি বেসামরিক আইন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ফলে ভিনদেশি আইনের সমর্থকদের সামনে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রত্যেক অধ্যায়ের মৌলিক এবং শাখাগত মাসআলাগুলো বিষয়ভিত্তিক আকারে বিভক্ত। প্রয়োজনের খাতিরে মাযহাবের অগ্রহণযোগ্য মতামতকেও গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ফিকহের অতিরঞ্জিত ইখতিলাফ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা হয়েছে।
তবে এই সংকলনটি ত্রুটিমুক্ত নয়। কেননা এ-তে ব্যাখ্যামূলক অনেক উদাহরণ যেমন আছে, তেমনি অনেক সংজ্ঞা আছে। আবার কিছু দুর্বল মামলা বিষয়ক নীতিও এ-তে পাওয়া যায়। চুক্তি এবং বাধ্যবাধকতা (দায়বদ্ধতা) সম্পর্কে কোনো সাধারণ তত্ত্ব এতে নেই। সর্বোপরি অন্যান্য মাযহাবের আইনশাস্ত্রের থেকে উপকৃত না হয়ে কেবল হানাফি মাযহাবের চিন্তাধারা মেনে চলেছে।
টিকাঃ
[১০৮১] সংকলনটির পরিচিতি জানতে মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪৯৭; আল-মাদখালুল ফিকহিল আম: ১/১৭৪ এবং তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৬৭ ও ১০৭ দেখুন।
[১০৮২] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৬৭ এবং ১০৭; আল-মাদখালুল ফিকহিল আম: ১/১৬৯, ১/১৭৪ এবং ১/১৭৭
📄 আদালত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় দ্বৈত পরিস্থিতি
আমদানিকৃত ভিনদেশি আইনকানুন প্রচলনের ফলে আদালত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় দ্বৈত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এর প্রধান কারণ ছিল ১৮ শতকে উসমানি সালতানাতের ওপর সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া এবং পশ্চিমা দেশগুলোর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়া। ১৯ শতকে এই আক্রমণ আরও দ্বিগুণ হয়। ইসলাম এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে তারা চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করে। তাদের অবস্থা ছিল একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে খতম করার নেশায় মেতে ওঠার মতো। বিভিন্ন বহিযুদ্ধ, উসমানি সালতানাতের ভেতরকার নানান বিদেশি চুক্তি, বিদেশি সুযোগ-সুবিধা, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাপ এবং হুমকি-ধমকিকে তারা এর মাধ্যম হিসেবে নিয়েছিল।
চতুর্দিক থেকে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের আওয়াজ উঠতে থাকে। রোগ নির্ণয় না করেই ঐশী প্রতিষেধক গ্রহণের মাধ্যমে চিকিৎসা করার মতো ইসলামি আইন এবং শরীয়তের সুস্পষ্ট এবং সঠিক বাস্তবায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করার পরিবর্তে পশ্চিমা সভ্যতা এবং জীবনযাত্রার সাথে তাল মিলিয়ে চলার প্রতি তাদের সংস্কার পদ্ধতি ঝুঁকে পড়ে। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো চাপ সৃষ্টি-সহ সাম্রাজ্যবাদী নানাধরনের নীতি প্রয়োগ করতে থাকে।
উসমানি সালতানাতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে তারা হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে ২৬শে শাবান ১২৫৫ হিজরিতে ৩০/১১/১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান আবদুল মাজিদ ‘কুলখানার ফরমান’ নামে পরিচিত প্রথম সংস্কারমূলক ফরমান জারি করতে বাধ্য হন। এরপর ১২৭৩ হিজরিতে ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে আসে ‘হুমায়ুনলিপি’। তারপর আপোস আদালত, প্রাথমিক আদালত, আপিল আদালত, ফৌজদারি আদালত, মামলা রেফার আদালত, প্রশাসনিক মামলার বিচারের জন্য শূরা তথা উপদেষ্টা পরিষদ এবং সাম্প্রদায়িক আদালতের মতো একাধিক বেসামরিক আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। ভিনদেশি আদালত বা দূতাবাস-সম্বন্ধীয় আদালতগুলো উসমানি সালতানাত তার নাগরিকদের প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা অনুসারে বিচারকার্য পরিচালনা করত। যা সাধারণত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে আরোপিত হয়ে থাকে।
ওপরোক্ত আদালতগুলো ধীরে ধীরে শারঈ আদালত থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং শারঈ আদালতের পরিধিগুলো ছিনিয়ে নিতে থাকে। সামনে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। এসব আদালত ছিল আমদানিকৃত ভিনদেশি আইন এবং ভিনদেশি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করতে বাধ্য।
উসতায আয-যারকা বলেন, ‘উসমানি সালতানাত এবং পরবর্তীকালে তা থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া দেশগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভিনদেশি আইনগুলো ঢুকে গিয়েছিল। যেমন সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং ইরাক। উভয় ধারার আইনের মাঝে হওয়া সংঘর্ষ এতটাই ব্যাপক ছিল যে, ইসলামি আইনের সব অঙ্গনেই কম-বেশি পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটে। এমনকি অনেক আইন তো বাদ দেওয়াও হয়।
ইংরেজ আর ফরাসিদের সাথে থাকা সম্পর্কের কারণে মুহাম্মাদ আলি পাশা মিশরে শারঈ আদালত ছাড়াও বেশ কয়েকটি বিচারিক পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেগুলো শারঈ আদালতের সকল পরিধি কেড়ে নিয়েছিল। আমদানিকৃত এবং অনূদিত কিছু আইনও তিনি জারি করেছিলেন। কৃষিখাত নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল রোধ, সীমানা সরানো এবং মালিকের সম্মতি ছাড়া অন্য লোকের গবাদিপশু ব্যবহার এবং সবজি, ফল-ফসল আর ঘরবাড়ি চুরি রোধে ‘হালুল ফাল্লাহ’ তথা কৃষকের অবস্থা নামে একটি আইন প্রণয়ন করেছিলেন তিনি। মুহাম্মাদ আলির পর সাঈদও এমনটা করেছিলেন। এরপর আসে ইসমাঈল পাশার যুগ। মিশর তখন উসমানি সালতানাত থেকে বিচারিক এবং প্রশাসনিক স্বাধীনতা লাভ করে ইউরোপীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনের কাছে নতি স্বীকার করে নেয়। ১২/৫/১২৯১ হিজরিতে একটি ফরমান জারি করে তারা বেশ কয়েকটি পরিষদ এবং বিচার-সংক্রান্ত আদালত প্রতিষ্ঠা করে। এর বিবরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসমাঈলের যুগে মিশর কেবল নামে উসমানি সালতানাতের অধীনস্থ ছিল। তথাপি রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে ‘মাজাল্লাহ আইন’ প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। ফরাসি বেসামরিক আইন আরবিতে অনূদিত হওয়ার পর মিশর সেটা গ্রহণ করে নেয়। যা ‘পুরোনো মিশরীয় নাগরিক আইন’ নামে পরিচিত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ তৃতীয়াংশে মিশরে প্রয়োগকৃত আইনটি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ‘নতুন মিশরীয় নাগরিক আইন’ নামে প্রণীত সেখানকার আইনটি আজও বিদ্যমান আছে।
টিকাঃ
[১০৮৩] উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ ওয়াল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৯৫
[১০৮৪] আল-মাদখালুল ফিকহিল আম: ১/১৭৮
[১০৮৫] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৯৭
[১০৮৬] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৯৭