📄 বিচারকার্য পরিচালনার স্থান
মোকদ্দমা নিষ্পত্তির জন্য বিচারকরা মসজিদে বা বিশেষ কোনো জায়গাতে কিংবা অন্য কোনো স্থানে বসতেন। মিশরের গ্রামীণ বিচারকরা বিচারের জন্য নিজেদের বাসভবনেই বসতেন। এরপর বিচারের জায়গা নির্ধারিত হয়ে গেলে আদালতের নিজস্ব জায়গা অথবা ভাড়া করা জায়গায় বিচারের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
তিউনিসিয়ায় মুফতি এবং অভিজাত শ্রেণির তত্ত্বাবধায়কদের উপস্থিতিতে পাশা অথবা খিলাফতের কার্যালয়ে বিচারের কার্যক্রম চলত। এরপর বিচারের জন্য স্থান নির্ধারিত হলে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্থানেই বিচারের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১০৭৫] তারীখুল কাদ্দা, পৃ. ১২৬
📄 বিচারকার্য হানাফি মাযহাবের মাঝে সীমাবদ্ধকরণ
উসমানিরা সবাই ছিলেন ইমাম আবু হানিফার অনুসারী। তারা হানাফি মাযহাবের অনুসারীদের থেকেই শাইখুল ইসলাম নিয়োগ দিতেন। যিনি হানাফি মাযহাব অনুসারেই ফতোয়া দিতেন। সুলতান সুলাইমান ক্ষমতায় এসে একটি রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন। যা-তে এ কথা বলা হয়, বিচারব্যবস্থা এবং ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবই হচ্ছে রাষ্ট্রের আবশ্যকীয় মাযহাব। সুতরাং শাইখুল ইসলাম, সমস্ত মুফতি এবং যাবতীয় বিচারক হানাফি মাযহাব অনুসারে ফতোয়া প্রদান এবং বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
এরপর উসমানি সালতানাত লেনদেন-সংক্রান্ত হানাফি মাযহাবের বিধানাবলি সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে উসমানি খিলাফতের আদালতে হানাফি মাযহাব আবশ্যকীয় কার্যকর আইনে পরিণত হয়। এই সংকলনটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ’ তথা আদালতের বিধিবিধানের সংকলন।
১৮৫৫ সালে হানাফি মাযহাবের আইন নিয়ে গবেষণার জন্য একটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক পর্যায়ে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো।
৯২৭ হিজরির রজব মাসের ১০ তারিখে তুর্কি সামরিক বিচারক সাইদি শালাবি মিশরে আগমন করেন। তার হাতে উসমানি সুলতানের পক্ষ থেকে একটি ফরমান ছিল। যা-তে শালাবিকে সুলতানের প্রধান বিচারক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তা-তে এ কথাও বলা হয়েছিল, সুলতান মিশরের চার মাযহাবের বিচারক নীতি বাতিল করে কেবল একজন তুর্কি বিচারককে নিয়োগ দিয়েছেন। তুর্কি বিচারকের অধীনে চার মাযহাব অনুসারে চারজন নায়েব থাকবেন। মিশরকে সুলতান ৩৬টি বিচার-সম্বন্ধীয় প্রদেশে ভাগ করেছেন। সুলতান কয়েকজন বিচারক নিয়োগ দেবেন। অবশিষ্ট বিচারকদের নিয়োগ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত সামরিক বিচারক।
এ ফরমান শুনে মিশরের চার মাযহাবের বিচারকগণ মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। আদালতে উপস্থিত হওয়া বর্জন করে তারা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান শুরু করলেন। কেননা তারা ধরেই নিয়েছিলেন, এ ফরমান অনুযায়ী কাজ করা মানে বিচারব্যবস্থাকে শুধু হানাফি মাযহাবের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলা।
বিভিন্ন মাযহাবের বিচারকরা তখনো দায়িত্ব পালন করছিলেন। একপর্যায়ে মিশরে মুহাম্মাদ আলি পাশার শাসনামলের প্রাথমিক দিকে কেবল হানাফি মাযহাব অনুসারেই বিচারকদের বিচার করার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যায়। খলিফা ফরমান জারি করে বিচারকার্য পরিচালনা এবং ফতোয়া প্রদান কেবল হানাফি মাযহাব অনুসারেই সীমাবদ্ধ করে দেন। এই ফরমান মিশরের আলিম-উলামা, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সরকারি ব্যক্তিদের সামনে পড়ে শোনানো হয়। মুহাম্মাদ আলি পাশার শাসনামলের শেষ দিকে এই ফরমান অনুসারে কাজ করার ব্যাপারে জোর তাগিদ দিয়ে স্পষ্ট সরকারি ফরমান জারি হয়। এরপর থেকেই মিশরের বিচারব্যবস্থা হানাফি মাযহাব অনুসারে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অথচ এর আগে মিশরে শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারীরাই মিশরে ধর্মীয় নেতৃত্ব দিত। আফ্রিকাতেও বিচারব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবের ওপর নির্ভর করা শুরু হয়ে যায়। এমনকি উত্তর আফ্রিকাতেও হানাফি মাযহাব পৌঁছে যায়। অথচ সেখানে কেবল মালিকি মাযহাবেরই প্রচলন ছিল।
আলি হায়দার বলেন, ‘উসমানি সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই বিচারকদের প্রতি এ আদেশ দেওয়া ছিল, তারা যতক্ষণ উসমানি আদালতে থাকবেন ততক্ষণ অবধি হানাফি মাযহাব অনুসারে বিচারকার্য পরিচালনা করতে তারা বাধ্য। অন্য মাযহাবের অনুসারী হলেও এ আদেশ তাদের মানতেই হবে।’
আলি হায়দার আরও বলেন, ‘এখানে চিন্তাভাবনা করার মতো একটি বিষয় রয়েছে। তা হচ্ছে প্রশাসনিকভাবে হানাফি মাযহাবকে অন্য মাযহাবের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার জন্য এই মাযহাবকে অনুধাবন করা। যা ভবিষ্যতে লেনদেনের ক্ষেত্রে সমকালীন যুগের চাহিদার সাথে সবচেয়ে অধিক সংগতিপূর্ণ হবে।’
মিশরের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে শাইখ মাহমুদ আরনুস বলেন, ‘বিচারব্যবস্থাকে হানাফি মাযহাবের মাঝে সীমাবদ্ধ করার পর তার উৎসগুলো কমে যায়। কারণ হানাফি মাযহাবের অধিকাংশ অনুসারী ছিলেন শামের অধিবাসী। শামেই আবু হানিফার মাযহাব সবচেয়ে বেশি প্রসারিত হয়েছিল। ওই সময় বিচারকদের এমনভাবে অধঃপতন হয়েছিল, যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষের অন্তরে বিচারকদের প্রতি ধর্মীয় মূল্যবোধ না থাকলে তাদের সমস্ত প্রভাব নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।’
টিকাঃ
[১০৭৬] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৭; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭২
[১০৭৭] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৭-১০৮; শাজারাতুন নূরিয যাকিয়্যাহ, পৃ. ১২৯
[১০৭৮] দুরারুল হুক্কাম শারহু মাজাল্লাতিল আহকাম, পৃ. ৪১৬-৪১৭
[১০৭৯] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ২২৩