📄 মিশরে আদালত এবং দ্বৈত বিচার বিভাগ
১২৯১ হিজরিতে উসমানি সাম্রাজ্য থেকে বিচারিক এবং প্রশাসনিকভাবে পৃথক হয়ে যাওয়ার পর খেদিভ ইসমাঈল মিশরে বেশ কয়েকটি বিচার বিভাগীয় পরিষদ গঠন করেন, যেগুলো অনেকটা উসমানি আদালতের মতোই ছিল। সেগুলো হচ্ছে,
১. মামলা রেজিস্ট্রি কাউন্সিল: এর পরিধি ছিল ১৫০০ পিয়াস্টার অপেক্ষা কম মূল্যের সাধারণ দেওয়ানি মামলা পরিচালনা করা।
২. ছোট ছোট শহরের মামলা পরিষদ: এর পরিধি ছিল ৫০০ পিয়াস্টার থেকে কম মূল্যের নাগরিক অধিকার। আবার কিছু কিছু কৃষি বিষয়ের তত্ত্বাবধানও করা হতো।
৩. কেন্দ্রীয় পরিষদ: শহরের আপিলকৃত মামলাসমূহের রায় পরিচালনা করা ছিল এ পরিষদের কাজ। যা প্রাথমিকভাবে ৫০০ পিয়াস্টার মূল্যমানের মামলাগুলোর বিচার করত। তবে ২৫০০ পিয়াস্টারের বেশি মূল্যমানের কখনোই হতো না।
৪. জেলা এবং উপজেলা শহরগুলোতে থাকা প্রাথমিক পরিষদ। যা ২৫০০ পিয়াস্টার মূল্যমানেরও বেশি এমন ফৌজদারি মামলা এবং দেওয়ানি মামলার বিচার করত।
৫. প্রাথমিক আদালত থেকে জারি করা রায়গুলোর আপিল পরিষদ।
৬. কায়রোর বিচার পরিষদ। এর কাজ ছিল আপিল পরিষদের রায়গুলো দেখাশোনা করা। কার্যত এটি রেফার আদালতের মতো ছিল।
৭. বাণিজ্যিক পরিষদ।
৮. দেশের শাইখ তথা প্রবীণদের পরিষদ।
এই পরিষদগুলো শারঈ বিচারকের অধিকাংশ পরিধি দখল করে নিয়েছিল। পূর্বোল্লেখিত পরিষদগুলোর অব্যবহিত পরই মিশরীয় এবং ভিনদেশিদের মিশ্রণে ১৮৭৫ সালে ‘মিশ্র আদালত’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮৮৩ সালে পূর্বোক্ত পরিষদগুলো বাতিল করে কেবল মিশরীয়দের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘স্থানীয় আদালত’।
টিকাঃ
[১০৭০] তারীখুল কাম্বা, পৃ. ১৯৮
📄 একাধিক বিচারক
উসমানি শাসনামলে পূর্বোল্লেখিত নতুন নতুন আদালত, দেওয়ানি, স্থানীয় এবং মিশ্র আদালত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুবাদে দলবদ্ধ বিচারক পদ্ধতি চালু হয়। প্রতিটি আদালতেই তখন মামলা শুনানির জন্য একাধিক বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের প্রস্তাবনার ২ নং ধারায় আছে, প্রতিটি কেন্দ্রীয় আদালতে একজন বিচারক থাকবেন। ৬ নং ধারায় আছে, মিশরীয় আদালত একজন বিচারক এবং পাঁচজন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে। তাদের মধ্যে রায় জারি করা হবে তিনজনের পক্ষ থেকে। তাদের একজন হবেন প্রধান বিচারক বা তার প্রতিনিধি। আলেকজান্দ্রিয়ার আদালত গঠিত হবে একজন বিচারক এবং তিনজন সদস্য নিয়ে। যাদের একজন হবেন এই অঞ্চলের প্রধান মুফতি বা তার প্রতিনিধি। জেলার প্রতিটি আদালতে থাকবেন একজন বিচারক এবং দুজন সদস্য। যাদের একজন হবেন আদালত অঞ্চলের মুফতি। আর তিনজনের পক্ষ থেকে রায় জারি করা হবে। আর ৮ নং অনুচ্ছেদে আছে, মিশরের আদালতে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চ আদালত গঠন করা হবে। যার একজন হবেন মিশরের প্রধান বিচারক, একজন হবেন মিশরের মুফতি, একজন হবেন আল-হাক্কানিয়্যাহ তথা আইন মন্ত্রণালয়ের মুফতি এবং অবশিষ্ট দুজন সদস্যকে আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাঁচজনের পক্ষ থেকেই রায় জারি করা হবে।
টিকাঃ
[১০৭১] তারীখুল কাম্বা, পৃ. ২১০
📄 বিচারের একাধিক ধাপ
বিচারের নিত্যনতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, নতুন নতুন সংশোধনী, নতুন সব আইন এবং ব্যবস্থাপনার ফলশ্রুতিতে আপিল বিভাগ চালু হয়। যা আপোস আদালত এবং প্রাথমিক আদালত থেকে রায় জারি করার পর পরিপূর্ণভাবে মামলা শুনানির দ্বিতীয় পর্যায়ের আদালত হিসেবে কাজ করত। ১৮৮০ সালের মিশরের প্রস্তাবনায় ছিল, তিন ধাপে তিন পরিষদের সামনে মামলার শুনানি হবে। প্রথম শুনানি হবে শরীয়াহ পরিষদের সামনে। এরপর বাদী-বিবাদী পক্ষ যদি ফয়সালায় সন্তুষ্ট না হয়, অথবা যদি তাদের একজন সন্তুষ্ট না হয়, তাদের মধ্য থেকে কারও অভিযোগ থাকলে মিশরের আদালতে শরীয়াহ পরিষদের সামনে দ্বিতীয়বারের মতো মামলার শুনানি হবে। উল্লিখিত পরিষদ থেকে জারিকৃত ফয়সালায় কারও সন্দেহ থাকলে এই মোকদ্দমা শাইখুল আজহার এবং হানাফিদের মুফতির কাছে পেশ করা হবে।
মিশরের স্থানীয় আদালত প্রতিষ্ঠা করার পর দ্বিতীয় ধাপের নীতি তথা আপিল আদালত প্রয়োগ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ১৮৯৭ সালের প্রস্তাবনা অনুসারে শারঈ আদালতের ওপর এই নীতি প্রয়োগ করা হয়। ১৮৯৭ সালের ৮ নং অনুচ্ছেদে মিশরে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চ আদালত গঠন করার কথা বলা হয়েছে। যা-তে একজন হবেন মিশরের প্রধান বিচারক, আরেকজন হবেন মিশরের মুফতি, আরেকজন হবেন হাক্কানিয়্যাহ তথা আইন মন্ত্রণালয়ের মুফতি। অবশিষ্ট দুজন সদস্যকে আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবানুসারে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাঁচজনের পক্ষ থেকেই রায় জারি করা হবে।
পরবর্তীকালে ৫/২/১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কমিটি গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়। যা-তে বলা হয়, পাঁচ সদস্যের কমিটির একজন হবেন মিশরের বিচারক, একজন হবেন হাক্কানিয়্যাহ মন্ত্রণালয়ের মুফতি এবং অবশিষ্ট তিনজন হবেন সদস্য। এরপর কমিটি থেকে মুফতিকে দেওয়া হয়। তারপর ১০/৪/১৮৯৯ সালে শারঈ উচ্চ আদালতের সদস্যপদে স্থানীয় আপিল আদালতের পক্ষ থেকে দুজন উপদেষ্টা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু মিশরের শারঈ বিচারক এবং মুফতির বিরোধিতার কারণে দ্বিতীয় নির্দেশ বাস্তবায়ন বন্ধ করে পূর্বোল্লেখিত প্রথম নির্দেশনাটি জারি করা হয়। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বারবার চেষ্টা করা হলে পুনরায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৮৯৭ সালের প্রস্তাবনার ১৭ নং ধারায় ফৌজদারি আদালতে মামলার আপিলের পদ্ধতি উল্লেখ আছে।
টিকাঃ
[১০৭২] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ২১৫
[১০৭৩] প্রাগুক্ত
[১০৭৪] তারীখুল কাছা, পৃ. ২১৬
📄 বিচারকার্য পরিচালনার স্থান
মোকদ্দমা নিষ্পত্তির জন্য বিচারকরা মসজিদে বা বিশেষ কোনো জায়গাতে কিংবা অন্য কোনো স্থানে বসতেন। মিশরের গ্রামীণ বিচারকরা বিচারের জন্য নিজেদের বাসভবনেই বসতেন। এরপর বিচারের জায়গা নির্ধারিত হয়ে গেলে আদালতের নিজস্ব জায়গা অথবা ভাড়া করা জায়গায় বিচারের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
তিউনিসিয়ায় মুফতি এবং অভিজাত শ্রেণির তত্ত্বাবধায়কদের উপস্থিতিতে পাশা অথবা খিলাফতের কার্যালয়ে বিচারের কার্যক্রম চলত। এরপর বিচারের জন্য স্থান নির্ধারিত হলে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্থানেই বিচারের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১০৭৫] তারীখুল কাদ্দা, পৃ. ১২৬