📄 বেসামরিক আদালত প্রতিষ্ঠা
উসমানি যুগ ছিল পূর্ণাঙ্গ শারঈ বিচার বিভাগ থেকে আদালত এবং বিচারব্যবস্থার দ্বৈত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তিত হওয়ার সন্ধিক্ষণ। এ সময় শারঈ বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি বেসামরিক বিচারব্যবস্থা চালু হয়। এটা হয়েছিল সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রদান এবং ফাঁসির বিধান রহিত করার নির্দেশনা সংক্রান্ত হুমায়ুনলিপি জারি করার পর। উক্ত ফরমান জারি করার পরে ভিনদেশি আইন এবং ব্যবস্থাপনা চালু হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় শারঈ আদালত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বতন্ত্র বেসামরিক আদালত।
ইসলামি শরীয়তের পাশাপাশি মানব-রচিত আইন প্রণয়ন করে ফরমান জারির উদ্যোক্তা ছিলেন সুলতান আবদুল মাজিদ। এসব আইন বাস্তবায়নের জন্য আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দিলে এর পরপরই বেসামরিক আদালতগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়। সামনে ধারাবাহিকভাবে এর আলোচনা পেশ করা হলো।
১. আপোস আদালত। যা ১৩২৯ হিজরিতে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের পর প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। গ্রাম এবং জেলা পর্যায়ের কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগে এবং উপজেলায় এ আদালত পরিচালিত হতো। এ আদালত পরিচালনা করতেন একজন বিচারক। তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব থাকত।
২. প্রাথমিক আদালত। প্রতিটি বিচারের কেন্দ্রে, জেলায় এবং প্রাদেশিক কেন্দ্রগুলোতে এই আদালত পরিচালিত হতো। যা গঠিত হতো একজন প্রধান বিচারক এবং চারজন সদস্য নিয়ে। এটি ছিল আপোস আদালতের সর্বোচ্চ স্তর।
৩. ব্যবসার আদালত। ১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে একজন প্রধান বিচারপতি, দুজন স্থায়ী সদস্য এবং চারজন অস্থায়ী সদস্য থাকতেন।
৪. আপিল আদালত। প্রতিটি প্রদেশের কেন্দ্রে একটি করে আপিল আদালত থাকত। যা-তে দুটি বিভাগ থাকত। একটি হতো আইনি (তথা দেওয়ানি এবং অর্থ-সংক্রান্ত), আর অপরটি হতো দণ্ড-সংক্রান্ত। প্রতিটি বিভাগে পাঁচজন করে বিচারক থাকতেন। একজন হতেন প্রধান বিচারক এবং চারজন হতেন সদস্য। এই চার সদস্যের দুজন হতেন মুসলিম এবং দুজন হতেন অমুসলিম। এই সদস্যপদ দুই বছর মেয়াদি হতো। আপিল আদালত ছিল প্রাথমিক আদালতের চেয়ে উচ্চ পর্যায়ের।
৫. মামলা রেফার আদালত। যার সদর দফতর ছিল রাজধানী ইস্তাম্বুলে। এতে চারটি বিভাগ ছিল। আইনি, দণ্ড-সংক্রান্ত, বাণিজ্যিক এবং শারঈ। ১২৯৬ হিজরিতে সুলতান আবদুল হামিদ কর্তৃক জারিকৃত ‘আদালত গঠনবিধি’-এর অধীনে ‘মামলা রেফার আদালত’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ আদালত ছিল একজন প্রধান বিচারক এবং ছয়জন সদস্য নিয়ে গঠিত। যা ছিল সর্বোচ্চ আদালত।
৬. বাণিজ্যিক আদালত। এটি ছিল বাণিজ্যিক মামলার শুনানি এবং বাণিজ্য আইন বিষয়ক বিশেষত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত প্রাথমিক আদালত।
৭. বিশেষ আদালত। এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী আদালত। ভিনদেশিদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দুই ধরনের হতো।
প্রথমত: দূতাবাস-সম্বন্ধীয় আদালত। এই আদালতগুলো বিদেশি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে নাগরিকদের স্বার্থ আছে এমন বিষয়গুলো বিচার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একজন বিদেশি সেখানে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। অর্থাৎ যে দেশ এ আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে, তার কোনো একজন নাগরিক এই আদালতের বিচারক হিসেবে থাকত।
দ্বিতীয়ত: আধ্যাত্মিক আদালত। অমুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মাধ্যমে এই আদালতগুলো পরিচালিত হতো। যার কাজ ছিল অমুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান করা। তবে অমুসলিম সম্প্রদায়গুলো শারঈ আদালতেও মামলা দায়ের করত। কেননা মুসলিম আইনবিদগণের ঐকমত্য অনুসারে, মুসলিমদের মাঝে অমুসলিম বিচারককে বিচারের দায়িত্ব প্রদান বৈধ নয়। অধিকাংশ মুসলিম আইনবিদ মুসলিমদের মাঝে তো বটেই, এমনকি অমুসলিমদের মাঝেও অমুসলিমকে বিচারের দায়িত্ব প্রদান বৈধ মনে করেন না। তবে হানাফি মতাবলম্বী আইনবিদগণ অমুসলিমকে অমুসলিমদের মাঝে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দানের অনুমতি দিয়েছেন।
৮. শারঈ আদালত। মৌলিকভাবেই পূর্ববর্তী আদালতের সাথে শারঈ আদালতের সম্পর্ক থাকলেও তার পরিধি সীমিত হয়ে পড়েছিল। এমনকি মুসলিমদের মধ্যকার ব্যক্তিগত, আর্থিক, বিবেচনামূলক শাস্তি এবং অপরাধ-সম্বন্ধীয় ইত্যাদি বিষয়ের বিচারেই তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অনন্তর এসব পরিধি কমিয়ে কেবল মুসলিমদের ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়।
৯. মামলার আদালত। নেপোলিয়ন মিশরে আসার পর আদালতে নানাধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসেন। ‘কোর্ট অব কেস’ তথা মামলার আদালত নামে একটি স্বতন্ত্র দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। যা-তে ১২জন বণিক ছিল। এদের অর্ধেক আবার ছিল কিবতি বা কপ্টিক। আর অবশিষ্ট অর্ধেক ছিল মুসলিম। প্রধান বিচারক কিবতি বা কপ্টিক ছিল। বণিক এবং জনসাধারণের বিষয় দেখাশোনা করা ছিল এই দপ্তরের কাজ। উসমানি বিচারকদের পরিবর্তে মিশরের কোনো শাইখকে বিচারক হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য নেপোলিয়ন আদেশ করেন। তিনি শতকরা আড়াই শতাংশ বিচারিক ফি নির্ধারণ করেন, যা বিচারক এবং মুনশিদের মাঝে বিতরণ করা হতো।
টিকাঃ
[১০৬৭] আপোসের বিচার আইন ১১/৪/১৩২৯ হিজরিতে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের প্রণয়ন করা হয়েছিল।
[১০৬৮] আল-আওদ্বাউত তাশরীইয়্যাহ, পৃ. ১৮৭; উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ ওয়াল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৯৫
[১০৬৯] আন-নুযুমূল কাদ্ধাইয়্যাহ, পৃ. ৭০; মুহাদ্বারাত ফী মাবাদিইত তানযীমিল কাদ্বাঈ ফিল ইরাক, পৃ. ৩২
📄 মিশরে আদালত এবং দ্বৈত বিচার বিভাগ
১২৯১ হিজরিতে উসমানি সাম্রাজ্য থেকে বিচারিক এবং প্রশাসনিকভাবে পৃথক হয়ে যাওয়ার পর খেদিভ ইসমাঈল মিশরে বেশ কয়েকটি বিচার বিভাগীয় পরিষদ গঠন করেন, যেগুলো অনেকটা উসমানি আদালতের মতোই ছিল। সেগুলো হচ্ছে,
১. মামলা রেজিস্ট্রি কাউন্সিল: এর পরিধি ছিল ১৫০০ পিয়াস্টার অপেক্ষা কম মূল্যের সাধারণ দেওয়ানি মামলা পরিচালনা করা।
২. ছোট ছোট শহরের মামলা পরিষদ: এর পরিধি ছিল ৫০০ পিয়াস্টার থেকে কম মূল্যের নাগরিক অধিকার। আবার কিছু কিছু কৃষি বিষয়ের তত্ত্বাবধানও করা হতো।
৩. কেন্দ্রীয় পরিষদ: শহরের আপিলকৃত মামলাসমূহের রায় পরিচালনা করা ছিল এ পরিষদের কাজ। যা প্রাথমিকভাবে ৫০০ পিয়াস্টার মূল্যমানের মামলাগুলোর বিচার করত। তবে ২৫০০ পিয়াস্টারের বেশি মূল্যমানের কখনোই হতো না।
৪. জেলা এবং উপজেলা শহরগুলোতে থাকা প্রাথমিক পরিষদ। যা ২৫০০ পিয়াস্টার মূল্যমানেরও বেশি এমন ফৌজদারি মামলা এবং দেওয়ানি মামলার বিচার করত।
৫. প্রাথমিক আদালত থেকে জারি করা রায়গুলোর আপিল পরিষদ।
৬. কায়রোর বিচার পরিষদ। এর কাজ ছিল আপিল পরিষদের রায়গুলো দেখাশোনা করা। কার্যত এটি রেফার আদালতের মতো ছিল।
৭. বাণিজ্যিক পরিষদ।
৮. দেশের শাইখ তথা প্রবীণদের পরিষদ।
এই পরিষদগুলো শারঈ বিচারকের অধিকাংশ পরিধি দখল করে নিয়েছিল। পূর্বোল্লেখিত পরিষদগুলোর অব্যবহিত পরই মিশরীয় এবং ভিনদেশিদের মিশ্রণে ১৮৭৫ সালে ‘মিশ্র আদালত’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮৮৩ সালে পূর্বোক্ত পরিষদগুলো বাতিল করে কেবল মিশরীয়দের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘স্থানীয় আদালত’।
টিকাঃ
[১০৭০] তারীখুল কাম্বা, পৃ. ১৯৮
📄 একাধিক বিচারক
উসমানি শাসনামলে পূর্বোল্লেখিত নতুন নতুন আদালত, দেওয়ানি, স্থানীয় এবং মিশ্র আদালত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুবাদে দলবদ্ধ বিচারক পদ্ধতি চালু হয়। প্রতিটি আদালতেই তখন মামলা শুনানির জন্য একাধিক বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের প্রস্তাবনার ২ নং ধারায় আছে, প্রতিটি কেন্দ্রীয় আদালতে একজন বিচারক থাকবেন। ৬ নং ধারায় আছে, মিশরীয় আদালত একজন বিচারক এবং পাঁচজন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে। তাদের মধ্যে রায় জারি করা হবে তিনজনের পক্ষ থেকে। তাদের একজন হবেন প্রধান বিচারক বা তার প্রতিনিধি। আলেকজান্দ্রিয়ার আদালত গঠিত হবে একজন বিচারক এবং তিনজন সদস্য নিয়ে। যাদের একজন হবেন এই অঞ্চলের প্রধান মুফতি বা তার প্রতিনিধি। জেলার প্রতিটি আদালতে থাকবেন একজন বিচারক এবং দুজন সদস্য। যাদের একজন হবেন আদালত অঞ্চলের মুফতি। আর তিনজনের পক্ষ থেকে রায় জারি করা হবে। আর ৮ নং অনুচ্ছেদে আছে, মিশরের আদালতে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চ আদালত গঠন করা হবে। যার একজন হবেন মিশরের প্রধান বিচারক, একজন হবেন মিশরের মুফতি, একজন হবেন আল-হাক্কানিয়্যাহ তথা আইন মন্ত্রণালয়ের মুফতি এবং অবশিষ্ট দুজন সদস্যকে আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাঁচজনের পক্ষ থেকেই রায় জারি করা হবে।
টিকাঃ
[১০৭১] তারীখুল কাম্বা, পৃ. ২১০
📄 বিচারের একাধিক ধাপ
বিচারের নিত্যনতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, নতুন নতুন সংশোধনী, নতুন সব আইন এবং ব্যবস্থাপনার ফলশ্রুতিতে আপিল বিভাগ চালু হয়। যা আপোস আদালত এবং প্রাথমিক আদালত থেকে রায় জারি করার পর পরিপূর্ণভাবে মামলা শুনানির দ্বিতীয় পর্যায়ের আদালত হিসেবে কাজ করত। ১৮৮০ সালের মিশরের প্রস্তাবনায় ছিল, তিন ধাপে তিন পরিষদের সামনে মামলার শুনানি হবে। প্রথম শুনানি হবে শরীয়াহ পরিষদের সামনে। এরপর বাদী-বিবাদী পক্ষ যদি ফয়সালায় সন্তুষ্ট না হয়, অথবা যদি তাদের একজন সন্তুষ্ট না হয়, তাদের মধ্য থেকে কারও অভিযোগ থাকলে মিশরের আদালতে শরীয়াহ পরিষদের সামনে দ্বিতীয়বারের মতো মামলার শুনানি হবে। উল্লিখিত পরিষদ থেকে জারিকৃত ফয়সালায় কারও সন্দেহ থাকলে এই মোকদ্দমা শাইখুল আজহার এবং হানাফিদের মুফতির কাছে পেশ করা হবে।
মিশরের স্থানীয় আদালত প্রতিষ্ঠা করার পর দ্বিতীয় ধাপের নীতি তথা আপিল আদালত প্রয়োগ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ১৮৯৭ সালের প্রস্তাবনা অনুসারে শারঈ আদালতের ওপর এই নীতি প্রয়োগ করা হয়। ১৮৯৭ সালের ৮ নং অনুচ্ছেদে মিশরে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চ আদালত গঠন করার কথা বলা হয়েছে। যা-তে একজন হবেন মিশরের প্রধান বিচারক, আরেকজন হবেন মিশরের মুফতি, আরেকজন হবেন হাক্কানিয়্যাহ তথা আইন মন্ত্রণালয়ের মুফতি। অবশিষ্ট দুজন সদস্যকে আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবানুসারে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাঁচজনের পক্ষ থেকেই রায় জারি করা হবে।
পরবর্তীকালে ৫/২/১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কমিটি গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়। যা-তে বলা হয়, পাঁচ সদস্যের কমিটির একজন হবেন মিশরের বিচারক, একজন হবেন হাক্কানিয়্যাহ মন্ত্রণালয়ের মুফতি এবং অবশিষ্ট তিনজন হবেন সদস্য। এরপর কমিটি থেকে মুফতিকে দেওয়া হয়। তারপর ১০/৪/১৮৯৯ সালে শারঈ উচ্চ আদালতের সদস্যপদে স্থানীয় আপিল আদালতের পক্ষ থেকে দুজন উপদেষ্টা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু মিশরের শারঈ বিচারক এবং মুফতির বিরোধিতার কারণে দ্বিতীয় নির্দেশ বাস্তবায়ন বন্ধ করে পূর্বোল্লেখিত প্রথম নির্দেশনাটি জারি করা হয়। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বারবার চেষ্টা করা হলে পুনরায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৮৯৭ সালের প্রস্তাবনার ১৭ নং ধারায় ফৌজদারি আদালতে মামলার আপিলের পদ্ধতি উল্লেখ আছে।
টিকাঃ
[১০৭২] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ২১৫
[১০৭৩] প্রাগুক্ত
[১০৭৪] তারীখুল কাছা, পৃ. ২১৬