📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারক নিয়োগ

📄 বিচারক নিয়োগ


উসমানি যুগের শুরুতে বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হতো সরাসরি সুলতানের মাধ্যমে। তারপর বিচারক নিয়োগের বিষয়টি রাজধানীর মুফতি শাইখুল ইসলামের এখতিয়ারে পরিণত হয়ে যায়। তবে তা-ও সুলতানের পরিপূর্ণ সম্মতি এবং সুস্পষ্ট ইচ্ছা অনুসারেই হতো। ৯৫১ হিজরিতে মুফতি আবুস সুউদ মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি মুস্তফা যখন ফতোয়া প্রদানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন সুলতানের কাছে বিচারক নির্বাচনের ব্যাপারে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের যুগের বিচারকদের এবং ইনসাফের মধ্যে সমতা সুস্পষ্টভাবে দেখা দিলে জনসাধারণ, ধর্ম ও ইনসাফের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ব্যক্তিকে নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া হবে।’ এ থেকে বুঝে আসে যে, তিনি বিচারক নিয়োগ দেওয়ার জন্য কমিটি গঠন করার কথা বলছেন।

বিচারক নিয়োগের বিষয়টি বাস্তবায়িত হওয়ার পদ্ধতি ছিল এমন: রুমানিয়া বা আনাতোলিয়ায় সামরিক বিচারক যিনি হতেন, তিনি বিচারক মনোনীত করে বিষয়টি শাইখুল ইসলামের কাছে পেশ করতেন। শাইখুল ইসলাম অনুমোদন দিলে সেটা সুলতানের কাছে পেশ করা হতো। তখন সুলতান বিচারক নিয়োগ দিয়ে একটি ফরমান জারি করতেন। পক্ষান্তরে বিচারকের প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি সামরিক বিচারকের তরফ থেকে হতো।

বিভিন্ন প্রদেশ এবং থানা পর্যায়ের বিচারকদেরও ইস্তাম্বুলের প্রাসাদ থেকে নিয়োগ দেওয়া হতো। এরপর বিচারক নিয়োগের বিষয়টি আরও উন্নত হয়। প্রশাসক নিজেই বিচারক নিয়োগ দিতেন। তখন মিশরের প্রশাসক সাঈদ পাশা (১২৩২ হি.) ইস্তাম্বুল সরকারের সাথে একমত হন যে, তিনি মিশরে প্রাদেশিক বিচারক নিয়োগ করবেন। আর মিশরের বিচারক নিয়োগ দেওয়া হবে ইস্তাম্বুল থেকে। নিয়োগের ক্ষেত্রে বিচারক তুর্কি হওয়ার শর্ত ছিল। এরপর মিশরের অন্যান্য অঞ্চলে বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব পালন করতেন।

পরবর্তীকালে উসমানি খিলাফতের সময় মিশরে আদালতের প্রস্তাবনাতে থাকা নির্ধারিত শর্তাবলি অনুসারে বিচারক বাছাই করা এবং সে অনুযায়ী তাদের নিয়োগের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়।

যাচাই-বাছাইয়ের পর ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে আদালতের যে প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছিল, তদনুযায়ী শারঈ বিচারক নির্বাচনের পর খেদিভ (মিশরের শাসক)-এর আদেশ দ্বারা নিয়োগ চূড়ান্ত হতো। চূড়ান্তকরণ বৈঠকে মিশরের গ্র্যান্ড শারঈ আদালতের বিচারক, শাইখুল আজহার, হানাফি নেতৃবৃন্দের মুফতি, নাজির আল-হাক্কানিয়্যাহ তথা আইনমন্ত্রী বা তার প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতেন। সাধ্যানুসারে আলিমগণও সেখানে একত্র হতেন।

১৮৯৭ সালের আদালতের প্রস্তাবনায় হাক্কানিয়্যাহ তথা আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠনের শর্ত দেওয়া হয়েছিল। যা-তে আদালতের তত্ত্বাবধায়ক বা তার প্রতিনিধি, শাইখুল আজহার, মিশরের মুফতি, আল-হাক্কানিয়্যাহর মুফতি এবং শারঈ আদালতের দুজন পরিদর্শকের কথা বলা হয়।

১৮৫৫ সালে শারঈ বিচারকদের স্নাতক করার জন্য রাজধানী ইস্তাম্বুলে একটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই থেকে এ ইনস্টিটিউটের স্নাতকদের মধ্য থেকেই বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হতো।

তারপর মিশরে ১৯০৯ সালের ২৫ নং আইন জারি করা হয়। যাতে বিচারক, সদস্য এবং মুফতিদের নির্বাচন এবং নিয়োগ পদ্ধতির ব্যাপারে ১০-১৪ অনুচ্ছেদটি সুস্পষ্ট করার পাশাপাশি এটি কার্যকরও করা হয়েছিল।

মিশর ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কি নির্ভরতা থেকে মুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়। ফলে সংবিধান অনুসারে মিশরে সমস্ত বিচারক নিয়োগের অধিকার কেবল মিশরের রাজার জন্য সংরক্ষিত হয়ে যায়।

টিকাঃ
[১০৫৮] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ২১২
[১০৫৯] উসমানি যুগে মামলুকরা মিশরের ক্ষমতায় এলে তারা তুর্কি সুলতানের পক্ষ থেকে বিচারক নিয়োগ দানের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করত না। তারা নিজেদের বিচার-সংক্রান্ত মোকদ্দমা শাইখুল আজহারের কাছে তুলে ধরত। শাইখুল আজহার সাধারণত শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারী হতেন। আবার হাম্বলি বা মালিকি মাযহাবের অনুসারী হতেও দেখা গেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তারা চারজন বিচারকের রীতি পুনরায় চালু করেছিল। (আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭৩)
[১০৬০] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১০৯ এবং ২১৩
[১০৬১] তারীখুল কাযযা, পৃ. ২১৩
[১০৬২] তারীখুল কাযযা, পৃ. ২১২

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারক হওয়ার শর্তাবলি

📄 বিচারক হওয়ার শর্তাবলি


উসমানি প্রশাসন বিচারক নিয়োগে যেসব শর্তের ব্যাপারে খুব গুরুত্ব দিত সেগুলো হচ্ছে:

১. বিচারকের বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
২. ব্যক্তিকে অবশ্যই যে-কোনো ধরনের আইনি অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। অর্থাৎ তাকে বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনি বাধা থাকা চলবে না।
৩. সাধারণ অপরাধ করার কারণে প্রার্থী যেন এক সপ্তাহের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত না হয়।
৪. ব্যক্তিটিকে অবশ্যই বুঝমান, ন্যায়পরায়ণ, সৎ, দক্ষ এবং জ্ঞান আর কাজের ক্ষেত্রে শক্তিশালী হতে হবে।
৫. মামলা, জটিল বিষয় এবং সমস্যার সমাধান পূর্ণরূপে পার্থক্য করতে সক্ষম হতে হবে।
৬. প্রার্থীকে অবশ্যই বিচারকদের প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদিত হতে হবে। কিংবা একটি পরীক্ষা দিয়ে বিচারকদের প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে হবে।
৭. বিচারককে অবশ্যই হানাফি মাযহাবের অনুসারী হতে হবে। তবে বিচারকের নায়েবের জন্য এটা শর্ত নয়।

১৮৯৭ প্রস্তাবনার ১৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচারক বা শারঈ আদালতের সদস্য নিযুক্ত হতে চাইলে শরীয়তের বিধানাবলি সম্পর্কে তার পূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে। সচ্চরিত্র হতে হবে; অসম্মানজনক রায়ে দোষী সাব্যস্ত হতে পারবে না। তার বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।

কেন্দ্রীয় আদালতের বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হতে হলে প্রার্থীকে আল-আজহার থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের সনদ লাভ করতে হবে। নয়তো শাইখুল আজহার কর্তৃক অনুমোদিত অন্য কোনো জায়গা থেকে সনদ পেতে হবে। দারুল উলূম থেকে বিচারকার্য পরিচালনা এবং ফতোয়া প্রদান করার উপযুক্ত হওয়ার সনদ থাকতে হবে।

প্রাদেশিক কেন্দ্রীয় বিচারক পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য তুর্কি বংশোদ্ভূত হওয়া শর্ত। তবে অন্যান্য বিচারক এবং বিচারকের নায়েব হওয়ার জন্য এটা শর্ত নয়। তারা মিশরীয় বা অন্য যে-কোনো বংশোদ্ভূত হতে পারবে।

হানাফি মাযহাব অনুসারে বিচার করা এবং ফতোয়া প্রদান করার ব্যাপারে উসমানি খলিফা কর্তৃক জারিকৃত ফরমানটি আমরা সামনে উল্লেখ করব। এতে শর্ত ছিল যে, বিচারককে হানাফি মাযহাবের অনুসারী হতে হবে। আর এই বিচারক চার মাযহাবের পক্ষ থেকে চারজন নায়েব নিয়োগ প্রদান করবেন।

টিকাঃ
[১০৬৩] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ২১২
[১০৬৪] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭২; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১০৯
[১০৬৫] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৮

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উসমানি যুগে বিচার পদ্ধতি

📄 উসমানি যুগে বিচার পদ্ধতি


উসমানি যুগে বিচার পদ্ধতির বিকাশ ঘটেছিল। যা ছিল নিম্নলিখিত শ্রেণিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত।

১. শাইখুল ইসলাম বা রাজধানীর মুফতি। তিনি একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের অধিকারী ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার ক্ষেত্রে মন্ত্রীরা তার মতামতের অপেক্ষা করত। তার দায়িত্ব ছিল ফতোয়ার উত্তর প্রদান এবং বিচারক নিয়োগ দেওয়া। বিচার বিভাগের সাধারণ তত্ত্বাবধানও ছিল তার পরিধিভুক্ত।

২. সামরিক বিচারক। তিনি প্রধান বিচারকের সমপর্যায়ের পদের অধিকারী ছিলেন। রাষ্ট্রে তার অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিচারকদের নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে প্রথমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের যাচাই করে তারপর শাইখুল ইসলামের কাছে তাদের নাম পেশ করতেন। উসমানি সালতানাতে সামরিক বিচারক ছিলেন দুজন। উসমানি রাষ্ট্রের সামরিক বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাকে ‘সামরিক বিচারক’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছিল। সামরিক বিচারক মূলত নিজে সামরিক ছিলেন না। সামরিক বিচারকের দুজনের একজন ছিলেন ইউরোপের রুমেলিয়ার সামরিক বিচারক এবং অপরজন ছিলেন এশিয়ার আনাতোলিয়ার সামরিক বিচারক। সুলতান প্রথম মুরাদ (৭২৬ হি. মোতাবেক ১৩২৬ ঈ.) সর্বপ্রথম সামরিক বিচারকের পদ চালু করেন। সমাজে সামরিক বিচারকের অনেক প্রভাব এবং সামাজিক নৈতিক মর্যাদা থাকত। ইতিপূর্বে কোনো প্রধান বিচারপতি তেমনটা অর্জন করতে পারেনি। নিজের প্রাদেশিক আদালতের তত্ত্বাবধান করা, নিয়োগ দানের জন্য বিচারকের নাম প্রস্তাব করা এবং বিচারকের নায়েব মনোনীত করা ছিল তার দায়িত্ব।

৩. তখত বা সিংহাসনের বিচারক। এরা ছিলেন ইস্তাম্বুলের বিচারক। সংখ্যায় চারজন এই বিচারকদের একজন ছিলেন রাজধানীতে এবং বাকি তিনজন ছিলেন ইস্তাম্বুলের শহরতলিতে। অন্যান্য প্রাদেশিক রাজধানীর বিচারকরা ছিলেন তাদের সমপর্যায়ের।

৪. প্রধান শ্রেণির বিচারক। তাদের ‘শহরের বিচারক’ বলা হতো। রাজধানী ছাড়া অন্যান্য প্রাদেশিক শহরগুলোতে তারাই বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। সংখ্যায় তারা ছিলেন ১৭জন।

৫. পরিদর্শক বা তদন্ত বিচারক।

৬. ছোট বিভাগের বিচারক। তারা ছোট এবং দ্বিতীয় স্তরের প্রাদেশিক শহরের বিচারক ছিলেন।

৭. সাধারণ বিচারক। উসমানি ব্যবস্থাপনায় তাদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব এবং উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিল। তাদের থাকত বিরাট ক্ষমতা। প্রাদেশিক কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসকের পরই ছিল তাদের স্থান।

৯. উচ্চ আদালতে মোকদ্দমা আপিল এবং মামলা রেফার করা। সুলতান আবদুল আজিজ খানের শাসনামলে মামলা রেফারের একটি বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যার কাজ ছিল মামলা এবং রায় রেফার করা। তবে সুলতান আবদুল হামিদের শাসনামলে এ আদালত বিলুপ্ত করে ফতোয়া বিভাগের অধীনে ‘মাজলিসুত তাওফিকাতিশ শারইয়্যাহ’ তথা শারঈ সমঝোতা পরিষদ চালু করা হয়। যা মামলা রেফার সংক্রান্ত আদালতের মতোই ছিল।

এই বিচারকরা ছিলেন কয়েক স্তরের। প্রথম স্তরে ছিলেন সামরিক বিচারক। বিচার বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ে তিনিই ছিলেন। তার পরবর্তী স্তরে ছিলেন ‘মাওলা’ তথা প্রধান শ্রেণির বিচারকগণ। সংখ্যায় তারা ছিলেন ১৭জন। পদমর্যাদার ক্ষেত্রে তারা ছিলেন সামরিক বিচারকের পরবর্তী স্তরের। রুমেলিয়া, আনাতোলিয়া, মক্কা, মদীনা, বুরুসা, এডিরন, দামিস্ক, কায়রো, আল-কুদস, ইজমির, আলেপ্পো, লারিসা এবং সালুনিয়কে তারা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। ‘পাশা’দের মতো বিশেষ সুবিধা তাদের দেওয়া হতো। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব প্রশাসন এবং বিশেষ অঞ্চল ছিল। সুলতান সিংহাসনে আরোহণের সময় তারা সরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতেন। তাদের পর আসতেন ছোট ছোট শহরের বিচারকগণ এবং সর্বোচ্চ শ্রেণির তদন্ত বিচারকগণ। যাদের বিচার বিভাগীয় কিছু পরিধি ছিল। সুলতান কর্তৃক ওয়াকফকৃত সম্পদ এবং ওয়াকফ প্রশাসন দেখাশোনার দায়িত্ব তারা পালন করতেন।

টিকাঃ
[১০৬৬] সুরিয়্যাহ ওয়াল আহদুল উসমানি, পৃ. ৩০
[১০৫৭] বিলাদুশ শামি ওয়া মিশর মিনাল ফাতহিল উসমানি ইলা হামলাতি নাবিলিয়ন, পৃ. ৮১

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বেসামরিক আদালত প্রতিষ্ঠা

📄 বেসামরিক আদালত প্রতিষ্ঠা


উসমানি যুগ ছিল পূর্ণাঙ্গ শারঈ বিচার বিভাগ থেকে আদালত এবং বিচারব্যবস্থার দ্বৈত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তিত হওয়ার সন্ধিক্ষণ। এ সময় শারঈ বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি বেসামরিক বিচারব্যবস্থা চালু হয়। এটা হয়েছিল সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রদান এবং ফাঁসির বিধান রহিত করার নির্দেশনা সংক্রান্ত হুমায়ুনলিপি জারি করার পর। উক্ত ফরমান জারি করার পরে ভিনদেশি আইন এবং ব্যবস্থাপনা চালু হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় শারঈ আদালত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বতন্ত্র বেসামরিক আদালত।

ইসলামি শরীয়তের পাশাপাশি মানব-রচিত আইন প্রণয়ন করে ফরমান জারির উদ্যোক্তা ছিলেন সুলতান আবদুল মাজিদ। এসব আইন বাস্তবায়নের জন্য আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দিলে এর পরপরই বেসামরিক আদালতগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়। সামনে ধারাবাহিকভাবে এর আলোচনা পেশ করা হলো।

১. আপোস আদালত। যা ১৩২৯ হিজরিতে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের পর প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। গ্রাম এবং জেলা পর্যায়ের কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগে এবং উপজেলায় এ আদালত পরিচালিত হতো। এ আদালত পরিচালনা করতেন একজন বিচারক। তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব থাকত।

২. প্রাথমিক আদালত। প্রতিটি বিচারের কেন্দ্রে, জেলায় এবং প্রাদেশিক কেন্দ্রগুলোতে এই আদালত পরিচালিত হতো। যা গঠিত হতো একজন প্রধান বিচারক এবং চারজন সদস্য নিয়ে। এটি ছিল আপোস আদালতের সর্বোচ্চ স্তর।

৩. ব্যবসার আদালত। ১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে একজন প্রধান বিচারপতি, দুজন স্থায়ী সদস্য এবং চারজন অস্থায়ী সদস্য থাকতেন।

৪. আপিল আদালত। প্রতিটি প্রদেশের কেন্দ্রে একটি করে আপিল আদালত থাকত। যা-তে দুটি বিভাগ থাকত। একটি হতো আইনি (তথা দেওয়ানি এবং অর্থ-সংক্রান্ত), আর অপরটি হতো দণ্ড-সংক্রান্ত। প্রতিটি বিভাগে পাঁচজন করে বিচারক থাকতেন। একজন হতেন প্রধান বিচারক এবং চারজন হতেন সদস্য। এই চার সদস্যের দুজন হতেন মুসলিম এবং দুজন হতেন অমুসলিম। এই সদস্যপদ দুই বছর মেয়াদি হতো। আপিল আদালত ছিল প্রাথমিক আদালতের চেয়ে উচ্চ পর্যায়ের।

৫. মামলা রেফার আদালত। যার সদর দফতর ছিল রাজধানী ইস্তাম্বুলে। এতে চারটি বিভাগ ছিল। আইনি, দণ্ড-সংক্রান্ত, বাণিজ্যিক এবং শারঈ। ১২৯৬ হিজরিতে সুলতান আবদুল হামিদ কর্তৃক জারিকৃত ‘আদালত গঠনবিধি’-এর অধীনে ‘মামলা রেফার আদালত’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ আদালত ছিল একজন প্রধান বিচারক এবং ছয়জন সদস্য নিয়ে গঠিত। যা ছিল সর্বোচ্চ আদালত।

৬. বাণিজ্যিক আদালত। এটি ছিল বাণিজ্যিক মামলার শুনানি এবং বাণিজ্য আইন বিষয়ক বিশেষত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত প্রাথমিক আদালত।

৭. বিশেষ আদালত। এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী আদালত। ভিনদেশিদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দুই ধরনের হতো।
প্রথমত: দূতাবাস-সম্বন্ধীয় আদালত। এই আদালতগুলো বিদেশি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে নাগরিকদের স্বার্থ আছে এমন বিষয়গুলো বিচার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একজন বিদেশি সেখানে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। অর্থাৎ যে দেশ এ আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে, তার কোনো একজন নাগরিক এই আদালতের বিচারক হিসেবে থাকত।
দ্বিতীয়ত: আধ্যাত্মিক আদালত। অমুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মাধ্যমে এই আদালতগুলো পরিচালিত হতো। যার কাজ ছিল অমুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান করা। তবে অমুসলিম সম্প্রদায়গুলো শারঈ আদালতেও মামলা দায়ের করত। কেননা মুসলিম আইনবিদগণের ঐকমত্য অনুসারে, মুসলিমদের মাঝে অমুসলিম বিচারককে বিচারের দায়িত্ব প্রদান বৈধ নয়। অধিকাংশ মুসলিম আইনবিদ মুসলিমদের মাঝে তো বটেই, এমনকি অমুসলিমদের মাঝেও অমুসলিমকে বিচারের দায়িত্ব প্রদান বৈধ মনে করেন না। তবে হানাফি মতাবলম্বী আইনবিদগণ অমুসলিমকে অমুসলিমদের মাঝে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দানের অনুমতি দিয়েছেন।

৮. শারঈ আদালত। মৌলিকভাবেই পূর্ববর্তী আদালতের সাথে শারঈ আদালতের সম্পর্ক থাকলেও তার পরিধি সীমিত হয়ে পড়েছিল। এমনকি মুসলিমদের মধ্যকার ব্যক্তিগত, আর্থিক, বিবেচনামূলক শাস্তি এবং অপরাধ-সম্বন্ধীয় ইত্যাদি বিষয়ের বিচারেই তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অনন্তর এসব পরিধি কমিয়ে কেবল মুসলিমদের ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়।

৯. মামলার আদালত। নেপোলিয়ন মিশরে আসার পর আদালতে নানাধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসেন। ‘কোর্ট অব কেস’ তথা মামলার আদালত নামে একটি স্বতন্ত্র দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। যা-তে ১২জন বণিক ছিল। এদের অর্ধেক আবার ছিল কিবতি বা কপ্টিক। আর অবশিষ্ট অর্ধেক ছিল মুসলিম। প্রধান বিচারক কিবতি বা কপ্টিক ছিল। বণিক এবং জনসাধারণের বিষয় দেখাশোনা করা ছিল এই দপ্তরের কাজ। উসমানি বিচারকদের পরিবর্তে মিশরের কোনো শাইখকে বিচারক হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য নেপোলিয়ন আদেশ করেন। তিনি শতকরা আড়াই শতাংশ বিচারিক ফি নির্ধারণ করেন, যা বিচারক এবং মুনশিদের মাঝে বিতরণ করা হতো।

টিকাঃ
[১০৬৭] আপোসের বিচার আইন ১১/৪/১৩২৯ হিজরিতে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের প্রণয়ন করা হয়েছিল।
[১০৬৮] আল-আওদ্বাউত তাশরীইয়্যাহ, পৃ. ১৮৭; উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ ওয়াল মাদানিয়্যাহ, পৃ. ৯৫
[১০৬৯] আন-নুযুমূল কাদ্ধাইয়্যাহ, পৃ. ৭০; মুহাদ্বারাত ফী মাবাদিইত তানযীমিল কাদ্বাঈ ফিল ইরাক, পৃ. ৩২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00