📄 উসমানি সুলতানদের পরিচয়
ইসলামি খিলাফত ঘোষণার আগেকার উসমানি সুলতানদের কথা আমরা ইতিপূর্বে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। এখানে আমরা উসমানি সুলতান এবং খলিফাদের সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করব। সংখ্যায় এরা ছিলেন মোট ৩৭ জন।
১. প্রথম উসমান (১২৮১-১৩২৪ খ্রি.) বুরসা এবং ইজনিক-এ বাইজেন্টাইনদের পরাজিত করে উসমানি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনকাল ছিল ৬৯৯-৭২৬ হি./১২৯৯-১৩২৪ খ্রি. পর্যন্ত।
২. ওরখান (১৩২৪-১৩৬০ খ্রি.)।
৩. প্রথম মুরাদ (১৩৫৯-১৩৮৯ খ্রি.)। ৭৯১ হিজরিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
৪. বায়েজিদ (১৩৮৯-১৪০২ খ্রি.)। ৮১৬ হিজরিতে তার মৃত্যু হয়।
৫. প্রথম মুহাম্মাদ (১৪০৩-১৪২১ খ্রি.)। ৮২৫ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
৬. দ্বিতীয় মুরাদ (১৪২১-১৪৫১ খ্রি.) এর মৃত্যু ৮৫৫ হিজরিতে।
৭. দ্বিতীয় মুহাম্মাদ (১৪৪৬-১৪৮১ খ্রি.)। তার উপাধি ছিল আল-ফাতিহ তথা বিজেতা। সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছেন। মসজিদ এবং দুর্গ তৈরি করেছেন। ৮৮৬ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
৮. দ্বিতীয় বায়েজিদ (১৪৮১-১৫১২ খ্রি.)। ৯১৮ হিজরিতে তার মৃত্যু হয়।
৯. প্রথম সালিম (১৫১২-১৫২০ খ্রি.)। ৯২৬ হিজরিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
১০. প্রথম সুলাইমান আল-কানুনি (১৫২০-১৫৬৬ খ্রি.)। ৯৭৪ হিজরিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পশ্চিমারা যাকে ‘দ্যা ম্যাগনিফিসেন্ট’ বলে। তিনি নিজে ১৩টি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। যার দশটি ছিল ইউরোপে, আর তিনটি ছিল এশিয়াতে। রাষ্ট্র সম্প্রসারিত করেছিলেন। আট বার স্বহস্তে কুরআনের অনুলিপি করেছিলেন। অনেক কাব্যসংকলনও করেন। একাধিক বার ফ্রান্সের সাথে বিশেষাধিকারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন তিনি।
১১. দ্বিতীয় সালিম (১৫৬৬-১৫৭৪ খ্রি.)। ৯৮২ হিজরিতে তার মৃত্যু হয়।
১২. তৃতীয় মুরাদ (১৫৭৪-১৫৯৫ খ্রি.)।
১৩. তৃতীয় মুহাম্মাদ (১৫৯৫-১৬০৩ খ্রি.)।
১৪. প্রথম আহমাদ (১৬০৩-১৬১৭ খ্রি.)।
১৫. প্রথম মুস্তফা (১৬১৭-১৬২৩ খ্রি.)।
১৬. দ্বিতীয় উসমান (১৬১৭-১৬২২ খ্রি.)।
১৭. চতুর্থ মুরাদ (১৬২৩-১৬৪০ খ্রি.)।
১৮. ইবরাহীম (১৬৪০-১৬৪৮ খ্রি.)।
১৯. চতুর্থ মুহাম্মাদ (১৬৪৮-১৬৮৭ খ্রি.)।
২০. দ্বিতীয় সুলাইমান (১৬৮৭-১৬৯১ খ্রি.)।
২১. দ্বিতীয় আহমাদ (১৬৯১-১৬৯৫ খ্রি.)।
২২. দ্বিতীয় মুস্তফা (১৬৯৫-১৭০৩ খ্রি.)।
২৩. তৃতীয় আহমাদ (১৭০৩-১৭৩০ খ্রি.)।
২৪. প্রথম মাহমুদ (১৭৩০-১৭৫৪ খ্রি.)।
২৫. তৃতীয় উসমান (১৭৫৪-১৭৫৭ খ্রি.)।
২৬. তৃতীয় মুস্তফা (১৭৫৭-১৭৭৪ খ্রি.)।
২৭. প্রথম আবদুল হামিদ (১৭৭৪-১৭৮৯ খ্রি.)।
২৮. তৃতীয় সালিম (১৭৮৯-১৮০৭ খ্রি.)।
২৯. চতুর্থ মুস্তফা (১৮০৭-১৮০৮ খ্রি.)।
৩০. দ্বিতীয় মাহমুদ (১৮০৮-১৮৩৯ খ্রি.)।
৩১. প্রথম আবদুল মাজিদ (১৮৩৯-১৮৬১ খ্রি.)।
৩২. আবদুল আজিজ (১৮৬১-১৮৭৬ খ্রি.)।
৩৩. পঞ্চম মুরাদ (১৮৭৬ খ্রি.)।
৩৪. দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (১৮৭৬-১৯০৯ খ্রি.)।
৩৫. পঞ্চম মুহাম্মাদ (১৯০৯-১৯১৮ খ্রি.)।
৩৬. ষষ্ঠ মুহাম্মাদ (১৯১৮-১৯২২ খ্রি.)।
৩৭. দ্বিতীয় আবদুল মাজিদ (১৯২২-১৯২৪ খ্রি.)।
উসমানি শাসনের নিয়ম অনুসারে বড় ছেলেই সাধারণত পিতার স্থলাভিষিক্ত হতো। কিন্তু একবার দেখা গেল, বড় ছেলের বয়স অনেক কম। তখন উসমানি-পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষ পরবর্তী সুলতান হওয়ার ব্যাপারে ফরমান জারি করা হলো।
উসমানি শাসককে ‘আল-খানকার’ তথা মহান সুলতান বা মহত্তম শাসক বলা হতো। তবে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ পর্যন্ত উসমানি সুলতানদের কেউই কার্যত খলিফার উপাধি ব্যবহার করেননি।
টিকাঃ
[১০৪৭] আল-মাশরিকুল আরাবি, পৃ. ৩০-৩১
[১০৪৮] আল-মাশরিকুল আরাবি, পৃ. ৩০
📄 খিলাফতের রাজনৈতিক এবং আইনি পরিস্থিতি
১৬শ শতাব্দীতে ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠার সময় উসমানিদের অবস্থান ছিল শক্তির শীর্ষে। পৃথিবীর সর্বাধিক বিস্তৃত ভূখণ্ডগুলোতে তাদের শাসন বিস্তার লাভ করেছিল। অধিকাংশ আরব দেশেই তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৭শ শতাব্দীতে সামরিক এবং অর্থনৈতিক বিভিন্ন কারণবশত উসমানি সালতানাতে দুর্বলতার চিহ্ন দেখা দিতে শুরু করে। তাদের বিপক্ষে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং আধুনিক চ্যালেঞ্জের বিভিন্ন দৃশ্যের অবতারণা হয়। ক্রমে উসমানিদের দুর্বলতা বিরাট আকার ধারণ করতে থাকে। অবশেষে ১৮শ শতাব্দীতে এই দুর্বলতা পতনের রূপ নেয়। নানাধরনের স্থানীয় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় স্বাধীনতাকামী বিভিন্ন আন্দোলন। যার সর্বশেষ পর্যায়ে ছিল মিশর এবং শামে নেপোলিয়নের হামলা। এরপর মুহাম্মাদ আলি পাশার শাসনামলে মিশরে অনেকটা জাতিগত স্বাধীনতা।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে উসমানি সালতানাতে বিভিন্ন সংগঠনের সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু হয়। সেইসাথে ইউরোপীয়দের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ দেখা দিতে থাকে। প্রচলন ঘটে নানাবিধ ভিনদেশি সুবিধার। আইন এবং ব্যবস্থাপনা ভিন্ন হতে থাকলে বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং শিক্ষা-সহ অন্যান্য বিভাগে বিঘ্ন ঘটতে থাকে। এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়।
প্রথমত: বিচার এবং আইনগত দিক থেকে উসমানি সালতানাতের ব্যবস্থাপনার উভয় স্তরের মাঝে পার্থক্য করা দরকার।
(১) উসমানি খিলাফত প্রতিষ্ঠা থেকে ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময় তথা সুলতান আবদুল হামিদের যুগ অর্থাৎ ১২৫৫ হিজরিতে ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দের আগ অবধি। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী কাল অবধি আইন ছিল ইসলামি, বিচারব্যবস্থা চলত দ্বীন-ইসলাম এবং শরীয়ত অনুসারে। অবশেষে পশ্চিমাদের সামনে উসমানিদের শক্তি খর্ব হয়ে যায়।
(২) ১৯ শতকের মধ্যবর্তী সময় থেকে এর সূচনা। এ সময় ‘কুলখানার ফরমান’ জারি করা হয়। ১২৫৫ হিজরিতে ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দের সংস্কার আন্দোলন প্রকাশ পায়। তারপর ১২৭৪ হিজরিতে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে জারি করা হয় ‘হুমায়ুনলিপি’। অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানি রাষ্ট্রের বলয় থেকে আরব রাষ্ট্রগুলো বের হয়ে যায়।
এরপর ১৯২৪ সালে কামাল আতাতুর্ক ইসলামি খিলাফত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেয়। উসমানি খিলাফতের এ স্তরে একই রাষ্ট্রে তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন আইন। বিচারব্যবস্থায় দেখা দেয় দ্বৈত নীতি। বিদেশি আইনকানুন এবং ব্যবস্থাপনা অনুপ্রবেশ করে। পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদেশি আদালত এবং সাধারণ বিচারালয়। অবশেষে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে কামাল আতাতুর্ক শারঈ আদালত বাতিল ঘোষণা করে সেটার যাবতীয় কার্যক্রম বিচারিক আদালতের সাথে সংযুক্ত করে দেয়।
দ্বিতীয়ত: রাজনৈতিক দিক থেকে উভয় যুগের ব্যবস্থাপনার মাঝে পার্থক্য করা উচিত।
(১) উসমানি যুগ হলো খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর থেকে সুলতান আবদুল হামিদের পতনের আগ পর্যন্ত। এ সময় রাজনৈতিক দিক থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ইসলাম-সম্মত ছিল।
(২) আধুনিক তুর্কির দুই দল—জোটদল এবং প্রগতিবাদী দল—ক্ষমতা গ্রহণের পর তুর্কি শাসনব্যবস্থা জাতীয়তাবাদী তথা তুরানি হয়ে গিয়েছিল। ইসলামি শাসন আর বাকি থাকেনি।
টিকাঃ
[১০৪৯] খ্রিষ্টাব্দ ১৬শ শতকের শেষ দিকে উসমানি যুগের মানচিত্র এবং উসমানি সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির পরিধির সীমা জানতে আতলাসুত তারীখিল আরাবি, পৃ. ৬৭-৬৯ দেখুন।
[১০৫০] মুহাম্মাদ আলি পাশা (১৭৬৯-১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন মিশরে খেদিভ এবং মামলুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। কায়রোর দুর্গে মামলুক নেতাদের হত্যা করে মিশর এবং সুদানে তার ক্ষমতা বিস্তার করেছিলেন। সেনাবাহিনীকে সুবিন্যস্ত করে তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হলে তার এবং তার বংশধরের জন্য মসনদের অধিকার মেনে নেওয়া হয়। (আল-মুনজিদ, পৃ. ৪৮৩)
[১০৫১] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৭; তারীখুদ দাওলাতিল আলিয়্যাহ, পৃ. ২৯৮; আল-মাদখালুল ফিকহিল আম : ১/১৬৯
📄 বিদেশিদের সুযোগ-সুবিধা
উসমানি খিলাফতের সময়কার বিদেশি সুযোগ-সুবিধাগুলো ছিল উসমানি কর্তৃপক্ষ, সাধারণ শারঈ শাসন এবং বিশেষত বিচার বিভাগের জন্য পিঠে ছুরিকাঘাতের মতো। এসব সুযোগ-সুবিধা ছিল নিকৃষ্ট দরজা। যার মাধ্যমে পশ্চিমা উপনিবেশ আর ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো উসমানি সালতানাতের তৃণমূলে প্রবেশ করেছিল। এভাবেই উসমানি সালতানাতের নাগরিক এবং প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে উপনিবেশ আর পশ্চিমা প্রভাব ঢুকে পড়ে। যার শুরুটা ছিল রাষ্ট্রে থাকা বিদেশি জনগণ, অমুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য বিচারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের প্রদত্ত অধিকারের মাধ্যমে। যার ভিত্তি ছিল কিছু রাষ্ট্র এবং সংগঠনকে উসমানি সুলতানদের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক আর রাজনৈতিক স্বার্থে সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা।
এসব সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। এর ফলে রাষ্ট্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। রাষ্ট্রকে তার ভূমির ব্যাপারে কর্তৃত্ব হ্রাস করে দিয়েছে। এই সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে ভিনদেশিরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে। রাষ্ট্রের মর্যাদা, অধিকার, ব্যবস্থাপনা এবং আইনকানুন নিয়ে তারা তামাশায় মেতে উঠেছে। যা ছিল নাগরিকের মর্যাদার পরিপন্থি এবং ইসলামি রাষ্ট্রের কাঁধে কলঙ্কের দাগ। আল্লাহর আইন এবং ইসলামি রাষ্ট্রগুলোয় শারঈ বিচারব্যবস্থা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য চূড়ান্ত আঘাত।
এসব সুযোগ-সুবিধার পরিণতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ৯৪১ হিজরিতে ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের সাথে সুলতান সুলাইমান আল-কানুনির কৃত চুক্তির মাধ্যমে। এটাই ছিল সর্বপ্রথম চুক্তি, যা-তে উসমানি সালতানাতের ‘ছাড়নীতি’ প্রকাশ পেয়েছিল। অথচ উসমানি সালতানাত সে-সময় প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং শক্তির শীর্ষে অবস্থান করছিল। এই চুক্তিতে ফিরিঙ্গি রাজার সামনে উসমানি সালতানাত আনুগত্য এবং বিনয় প্রকাশ করে। এই চুক্তিপত্রের কয়েকটি পয়েন্ট ছিল এমন :
১. আইন অনুসারে ফ্রান্সের জনগণের মাঝে রাষ্ট্রদূতের পরিধির অধীনে ঘটে যাওয়া যাবতীয় দেওয়ানি এবং ফৌজদারি মামলা শুনানি, বিচারকার্য পরিচালনা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল ফরাসি রাষ্ট্রদূতের জন্যই সংরক্ষিত থাকবে। কোনো শাসক, শারঈ বিচারক কিংবা অন্য যে-কোনো সরকারি কর্মকর্তা এ ব্যাপারে তাকে বাধা দিতে পারবে না।
২. উসমানি সালতানাতের কোনো শারঈ বিচারক কিংবা অন্য যে-কোনো সরকারি কর্মকর্তার কোনো অবস্থাতেই ফরাসি ব্যবসায়ী এবং ফরাসি জনগণের মধ্যে সৃষ্ট সকল বিরোধের মীমাংসা বা বিচার করার অধিকার থাকবে না। এমনকি তারা যদি ফয়সালা করে দেওয়ার দাবি জানায় তবুও না। তথাপি এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেউ কোনো ফয়সালা করে ফেললেও সেটা বাতিল বলে গণ্য হবে। তা বাস্তবায়ন হবে না। তবে হ্যাঁ, রাষ্ট্রদূত বা রাষ্ট্রদূতের মুখপাত্র উক্ত ফয়সালা সমর্থন করলে তবে সেটা বাস্তবায়ন করা যাবে। (অনুচ্ছেদ ৩)
৩. ফরাসি বণিক এবং প্রজাদের বিরুদ্ধে তুর্কি কর সংগ্রহকারী বা রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের জনগণের অভিযোগের ভিত্তিতে শারঈ বিচারক বা উসমানি সরকারের অপরাপর কর্মকর্তাদের জন্য কোনো ফৌজদারি মামলার শুনানি করা বা রায় দেওয়া বৈধ নয়। বরং যে বিচারক বা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে, তার কর্তব্য হবে অভিযুক্তকে সরকারি বাসভবনে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো। (অনুচ্ছেদ ৫)
৪. উসমানি রাষ্ট্রে নিয়োজিত ফরাসি ব্যবসায়ীদের ধর্মীয় বিষয়ে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না। এ ব্যাপারে তাদেরকে বাধ্যও করা যাবে না।
৫. ভিনদেশিকে গ্রেফতার করা, তার বাড়িতে প্রবেশ করা, তার কাছে বিচারের কাগজপত্র পৌঁছে দেওয়া, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা বা তার বিরুদ্ধে রায় কার্যকর করা যাবে না। অবশ্য এটা যদি তার দেশের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে হয়, তাহলে ঠিক আছে।
৬. সুলতান সুলাইমান এই চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্সের রাজাকে উসমানি সালতানাতে ফরাসি রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন। বিচারকার্য পরিচালনা করার সময় একজন ফরাসি প্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকার অনুমতিও তিনি প্রদান করছেন।
বিদেশিদের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা মূলত শুরু হয়েছিল ৮৫৭ হিজরিতে ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ যখন কনস্টান্টিনোপল জয় করেন, তখন থেকে। তাদের সাথে মুসলিমদের অনন্য বৈশিষ্ট্য উদারতার আচরণ করতে চাওয়াই ছিল সুলতানের উদ্দেশ্য। উদারতাবশতই উসমানি সালতানাতের যে-কোনো অংশে ভিনদেশিদের বসবাসের সুবিধা করে দেওয়া-সহ আরও বেশ কিছু শিথিল আচরণ তাদের সাথে করেছিলেন। যাতে উসমানি সাম্রাজ্যে বসবাস করতে তারা আগ্রহ বোধ করে। অন্যান্য স্থানের তুলনায় উসমানি সালতানাতভুক্ত স্থানে বসবাস করাকেই যেন তারা প্রাধান্য দেয়।
তাদের প্রতি তিনি এতটুকু নম্রতা দেখিয়েছিলেন যে, খ্রিষ্টান ধর্মযাজক এবং তাদের প্রধান ব্যক্তিরা নিজেদের সম্প্রদায়ের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে। রোমান গির্জাপ্রধানকে তাদের লেনদেন এবং শাস্তির বিচার করার কর্তৃত্ব তিনি দিয়ে রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে পর্যায়ক্রমে আর্মেনিয়ান প্রধান বিশপ এবং ইহুদি সন্ন্যাসীদেরও তিনি এমন সুবিধা প্রদান করেছিলেন।
পরবর্তী খলিফা বায়েজিদও মুহাম্মাদকে অনুসরণ করেন। অতিরিক্ত হিসেবে রাশিয়ার সাথে বিভিন্ন চুক্তিও তিনি এর সাথে যুক্ত করেন। রাশিয়ান বণিকদের তিনি অনেক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। তার পরে সুলতান সালিম এবং তার পর সুলতান সুলাইমান ক্ষমতায় আসেন। যিনি বিজয়ের মহান ধারা আরও আগে বাড়িয়ে নিয়ে যান। উসমানি রাষ্ট্র তখন সামরিক শক্তির শীর্ষে পৌঁছে যায়। তবে অমুসলিমদের সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং অন্যান্য দেশের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে তিনি সীমালঙ্ঘন করেন। যার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল ৯৪১ হিজরিতে ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের সাথে কৃত চুক্তিটি। যার বিবরণ আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি।
পরে সবচেয়ে বড় সুবিধা দেওয়া হয় চতুর্থ মুহাম্মাদ খানের শাসনামলে। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দের তিনি ফ্রান্সকে নতুন করে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেন। চুক্তিতে একটি নতুন ধারা সংযুক্ত করেন, যা ফ্রান্সকে উসমানি রাজ্যে বসবাসকারী ক্যাথলিকদের রক্ষক বানিয়ে দেয়। এই সুবিধা ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় সুবিধা’ হিসেবে প্রসিদ্ধ। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে সুবিধাগুলো পুনরায় নবায়ন করা হয়। ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনও অনুরূপ সুবিধা পায়। তারপর ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোও এই সুবিধা লাভ করে। পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকাও ১৮৩০ সালে এমন সুবিধা পেয়েছিল। ক্রমান্বয়ে জার্মানিও একসময় তা লাভ করে। বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ এখানে নেই। বিচারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বিদেশিদের বিচারের কী কী সুবিধা ছিল, সেটা আমরা সামনে উল্লেখ করব।
বিদেশি সুযোগ-সুবিধাগুলোর প্রভাব ছিল খুবই খারাপ। এগুলো বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে এনেছিল। তাই ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে উসমানি সালতানাত যাবতীয় বিদেশি সুবিধা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেয়। খলিফা ষষ্ঠ মুহাম্মাদের সিদ্ধান্তে সে বছরেরই ১৮ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ১৩৩০ হিজরিতে তা নিশ্চিত করা হয়। বৈদেশিক রাষ্ট্রগুলো প্রাথমিকভাবে এই সিদ্ধান্ত মেনে না নিলেও ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত লোজান চুক্তিতে তারা এর স্বীকৃতি দেয়। ফলে উসমানি সালতানাত এবং বাকি আরব দেশগুলো সুবিধার শৃঙ্খল এবং খারাপ প্রভাব থেকে মুক্ত হয়। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে আগস্ট মিশরেও ব্রিটেনের সাথে কৃত মৈত্রী চুক্তিতে উল্লেখিত সুবিধাগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়। তারপর ৮/৫/১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মন্ট্রেক্স চুক্তিতে সুবিধাগুলো বাতিল করা হয়। ১৪/১০/১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত একটি ক্রান্তিকালীন সময়ে বাতিল করে দেওয়া হয় বিশেষাধিকারগুলো। এই সময়ে সবগুলো বিশেষাধিকার পরিপূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১০৫২] উসমানি যুগের আধ্যাত্মিক ধর্মীয় সংগঠনের অধিকার প্রদানের মাধ্যমেই সুযোগ-সুবিধার প্রচলন শুরু হয়। যা পরবর্তীকালে বিদেশি সুযোগ-সুবিধা অবধি গড়ায়। হুমায়ুনলিপিতে সুলতান আবদুল মাজিদ লিখেছিলেন, 'আমার মহান পূর্বপুরুষগণ যেসব আধ্যাত্মিক সুযোগ-সুবিধা এবং সহায়তা খ্রিষ্টান ও অমুসলিমদেরকে দিয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলো যথারীতি বহাল এবং সংরক্ষিত থাকবে।' (তানযীমুল আহওয়ালিশ শাখসিয়্যাহ লিগায়রিল মুসলিমিন, পৃ. ৫৩)
[১০৫৩] তানযীমুল আহওয়ালিশ শাখসিয়্যাহ লিগায়রিল মুসলিমিন, পৃ. ৪২
[১০৫৪] তারীখুদ দাওলাতিল উসমানিয়্যাতিল আলিয়্যাহ, পৃ. ৯৩; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭৯
[১০৫৫] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭৯
[১০৫৬] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৮১
📄 উসমানি যুগে ধর্মীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উসমানি যুগের ধর্মীয় কর্মকর্তাগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। তারা ছিলেন মুফতি বা শাইখুল ইসলাম, সামরিক বিচারক, সাধারণ বিচারক এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধায়ক। বিচারের সাথে সম্পর্ক থাকায় আমরা কেবল প্রথম তিনজনের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
১. মুফতি বা শাইখুল ইসলাম পদটি সুলতান সুলাইমান আল-কানুনির শাসনামলে শুরু হয়েছিল। ইস্তাম্বুলের মুফতিকে সুলতান সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্মকর্তা এবং আলিমদের প্রধান হিসেবে বিবেচনা করতেন। যাকে ‘শাইখুল ইসলাম’ উপাধি দেওয়া হতো। মুফতিকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ ছিল, সে-সময় উসমানি সাম্রাজ্যের আইনের ওপর ভিত্তি করেই অধিক পরিমাণে ফতোয়া প্রদান করা হতো। বিপুল সংখ্যক প্রশাসনিক আইন প্রণয়নের কারণে সুলতান সুলাইমানকে ‘আল-কানুনি’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ইস্তাম্বুলের মুফতির এ অধিকার থাকত যে, তিনি সরাসরি সুলতানকে বরখাস্ত করার ব্যাপারেও ফতোয়া জারি করতে পারতেন। আবার বৃহৎ রাজ্যের কেন্দ্রগুলোতেও তিনি মুফতিদের নিয়োগ দিতেন। প্রদেশসমূহের বেশির ভাগ কেন্দ্রে সিনিয়র হানাফি বিচারক নিয়োগ দেওয়ার দায়িত্বও শাইখুল ইসলাম পালন করতেন। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে জোট এবং প্রগতিশীল দলের পক্ষ থেকে শাসনের দায়িত্ব নেওয়া হলে কেবল সামরিক অফিসারেরই প্রভাব থাকে। ১৯২৩ সালে শাইখুল ইসলামের পদ বাতিল ঘোষণা করা হয়।
২. ইস্তাম্বুলের পদমর্যাদায় শাইখুল ইসলামের পরেই আসে রুমিয়ার সামরিক বিচারক এবং আনাতোলিয়ায় সামরিক বিচারকের পদ। প্রথম মুরাদের শাসনামলে (১৩৬০-১৩৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) এই পদটি চালু হয়। এই বিচারক উসমানি বাহিনীর সাথে থাকতেন বিধায় তাকে এ নামে নামকরণ করা হয়েছিল। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রধান বিচারকের সমান পদমর্যাদার অধিকারী। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদের শাসনামলে (১৪৫১-১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দে) সামরিক বিচারকের আরেকটি পদ চালু করা হয়। যার উপাধি দেওয়া হয় আনাতোলিয়ার সামরিক বিচারক। তিনি সাম্রাজ্যের পূর্ব দিক এবং এশিয়ার অংশ সামাল দিতেন। আর প্রথমজন দেখতেন রুমিয়া তথা ইউরোপের সামরিক দিক।
৩. প্রদেশসমূহের কেন্দ্রীয় বিচারক। এই বিচারকের উপাধি ছিল ‘মুল্লা’ বা ‘মুনলা’। যার অর্থ ছিল সর্দার বা প্রধান। ১৮ শতকের বিচারের প্রশাসনিক বিভাগ অনুসারে সামরিক বিচারক এবং ইস্তাম্বুলের বিচারককে একই পদমর্যাদার অধিকারী বলে গণ্য করা হতো। তার পরবর্তী স্তরেই ছিলেন মক্কা এবং মদীনার বিচারক। তারপর সাবেক দুই রাষ্ট্রের রাজধানী বুরসা এবং এডিরনার বিচারক। তার পরবর্তী স্তরে থাকতেন ইসলামি খিলাফতের দুই কেন্দ্র দামিস্ক এবং কায়রোর বিচারক। রাষ্ট্রের দাপ্তরিক বিচারক হতেন হানাফি মাযহাবের অনুসারী। তবে পাশাপাশি অন্যান্য মাযহাবের স্বীকৃত বিচারকরাও থাকতেন।
টিকাঃ
[১০৫৭] বিলাদুশ শামি ওয়া মিশর মিনাল ফাতহিল উসমানি ইলা হামলাতি নাবিলিয়ন, পৃ. ৮১