📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য

📄 বিচারব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য


মামলুক শাসনামলে মিশর এবং শামে বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল। সেগুলোর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈশিষ্ট্য এখানে তুলে ধরা হচ্ছে।

১. চমৎকার ব্যবস্থাপনা: সার্বিকভাবে এ যুগের বিচারব্যবস্থা চমৎকার ছিল। বিচারের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়নও ছিল সুন্দর। সাইয়িদ মাহমুদ আসিম বলেন, 'সারকথা হচ্ছে, মামলুক শাসনামলে মিশরের বিচারব্যবস্থা ছিল একটি চমৎকার ব্যবস্থাপনা। উত্তম পরিচালনা আর পবিত্র দায়িত্বে তা খ্যাতি ছড়িয়েছিল। বিচারের অবস্থানকে বিচারকরা সম্মান করতেন। যত ওপরের পর্যায়েরই হোক না কেন, কাউকেই তারা বিচারকার্যে হস্তক্ষেপ করতে দিতেন না।'

২. চার মাযহাব অনুসারে বিচারকার্য পরিচালনা: একমাত্র মামলুক শাসনামলে একইসাথে চার মাযহাব থেকে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো। সাধারণ বিচার থেকে সামরিক বিচার, সমস্ত বিভাগেই এ পদ্ধতি চালু ছিল। ৬৬৩ হিজরিতে সুলতান আয-যাহির বাইবার্সের হাত ধরে এ পদ্ধতির সূচনা হয়ে মামলুক যুগের দীর্ঘ সময় এ পদ্ধতি চালু ছিল। এরপর উসমানি খিলাফতকালে এ পদ্ধতি বাতিল হয়। বিচারক নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি তখন কেবল হানাফি মাযহাবেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ বিষয়টি নিয়ে সামনে আলোচনা করা হবে।

৩. বিচারকার্যের ধারাবাহিকতা এবং সুরক্ষা: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিশর এবং শামের বিচারব্যবস্থা ছিল আব্বাসি যুগ এবং আইয়ুবি সাম্রাজ্যের বিচারব্যবস্থার প্রসার। এটা প্রশাসনিক এবং গঠনমূলক-উভয় দিক থেকেই ছিল। তবে একেবারে যে পরিবর্তন হয়নি, তা কিন্তু নয়। সামান্য কিছু পরিবর্তন অবশ্য হয়েছিল।

৪. রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বরখাস্তকরণ: মামলুক শাসনামল ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগ। বিচারকার্যে ছিল চরম বৈপরীত্য। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ছিল অস্থিতিশীল। আবার বাহির থেকে ছিল শত্রুর ব্যাপক আক্রমণ। ক্রুসেডার, তাতারি এবং মোঙ্গলদের সামাল দিয়েছে এই মামলুক শাসনব্যবস্থা। অবশেষে শাম এবং মিশর ক্রুসেডারদের নাপাক অবস্থান থেকে পবিত্র হয়েছে। তাতারি এবং মোঙ্গলরাও শায়েস্তা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এই অস্থিরতার বিশাল প্রভাব পড়েছিল বিচারকদের রদবদল এবং অধিক হারে তাদের বরখাস্তকরণের ওপর।

৫. দ্বৈত বিচারব্যবস্থা: মামলুক শাসনামল ছিল দ্বৈত বিচারব্যবস্থায় প্রসিদ্ধ। এ সময় শারঈ বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি বেসামরিক বিচারব্যবস্থাও ছিল। বেসামরিক বিচারক তখন মুসলিমদের ওপর তাতারিদের আইন 'ইয়াশা' চাপিয়ে দেয়। বাতিল করে দেয় মহান শারঈ ব্যবস্থা। তবে এ চাপাচাপি দীর্ঘায়িত হয়নি। বিফল হয়ে যায় ওদের চেষ্টা। মুসলিম বিচারক এবং সাধারণ মানুষ পুনরায় শরীয়তের বিধিনিষেধ মেনে চলতে শুরু করে। আবার বাস্তবায়িত হয় ইসলামি আইনশাস্ত্র।

৬. জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ: মামলুক যুগে সভ্যতার অগ্রগতি হয়েছিল। জ্ঞান- বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছিল। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এবং ইবনু কাইয়িমিল জাওযিয়্যাহর মতো অনেক শীর্ষস্থানীয় আলিম, আইনবিদ এবং ঐতিহাসিকের জন্ম হয়। প্রকাশিত হয় বিচার-সংক্রান্ত অনেক বইপুস্তক। যেমন ইবনু ফারহুন (৭৯৯ হি.) লিখিত তাবসিরাতুল হুক্কাম, আত-তরাবলুসির মুঈনুল আহকাম এবং ইবনুশ শাহিনাহর লিসানুল হুক্কাম। এ ছাড়াও সুবহুল আ'শা এবং নিহায়াতুল আরাব-এর মতো অনেক বিশ্বকোষ প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি আল্লামা আয-যাহাবির আদ-দুরারুল কামিনাহ এবং হাফিজ ইবনু হাজার আল-আসকালানির ফাতহুল বারি-র মতো অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

৭. মামলুকদের শাসনকাল এবং স্থান: মামলুকদের শাসন প্রথমে মিশর, শাম এবং পার্শ্ববর্তী কিছু জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর ক্রমে তা হিজাজ এবং ইরাকে সম্প্রসারিত হয়। মামলুক শাসন ২৫০ বছরের অধিক কাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

টিকাঃ
[১০৩৫] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়‍্যাহ ফিদ দুওয়ালিল আরাবিয়্যাহ, পৃ. ৬৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00