📄 মিশরের বিচারকগণ
মামলুক শাসনামলে শামের অনেক বিচারকই বিচারকার্য পরিচালনার জন্য মিশরে চলে যেতেন। আবার মিশরের অনেক বিচারক চলে যেতেন শামে। কারণ রাজ্য ছিল অভিন্ন। কোনো কোনো বিচারক তো দায়িত্ব গ্রহণের জন্য এ দেশে বা ও দেশে যেতেন কিংবা দুই দেশের কোনো-একটাতে থিত হয়ে যেতেন। কখনো কখনো বিচারককে নিজের ক্ষমতায় মিশর থেকে সিরিয়ায় বা সিরিয়া থেকে মিশরে চলে যেতে দেখা গেছে। যেমনটা আল-ইয ইব্ন আবদিস সালাম এবং আস-সুবকি করেছিলেন।
মিশরে মামলুক শাসনামলের প্রথম বিচারক ছিলেন বাদরুদ্দিন (৬৪৮ হি.)। পরবর্তীকালে সদরুদ্দিন মাওহুব ইবনু উমর আল-জাযারি, ইমাদুদ্দিন আল-হামাতি, পুনরায় বাদরুদ্দিন আস-সিনজারি, তারপর তাজুদ্দিন আবদুল ওয়াহহাব ইবনু বিনতিল আ'আয বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন।
কায়রোর বিচারক এবং মিশর আর উঁচু ভূমির বিচার বিভাগের মাঝে মিশরের বিচারব্যবস্থা বিভক্ত ছিল। অনেক সময় অবশ্য দুটোই একসাথে পরিচালিত হতো। যেমন তাজুদ্দিন ইবনু বিনতিল আ'আয একইসাথে মিশর এবং কায়রোর বিচার বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালে ৬৬১ হিজরিতে তাকে মিশরের বিচারকার্যের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে কেবল কায়রোর বিচার বিভাগের দায়িত্বে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয়বারের মতো মিশরের দায়িত্ব জুড়ে দেওয়া হয়। যা ৬৬৫ হিজরিতে তার মৃত্যু পর্যন্ত বহাল ছিল। তার সময়েই চার মাযহাবের বিচারক ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে।
তাজুদ্দিনের পর মিশর এবং উঁচু ভূমির দায়িত্ব পালন করেন মুহিউদ্দিন আবদুল্লাহ ইবনু শারাফুদ্দিন। আর কায়রো এবং নিম্ন ভূমির দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকিউদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানকে। পরবর্তীকালে তাজুদ্দিন ইবনু বিনতিল আ'আয-এর ছেলে সদরুদ্দিন উমর দায়িত্ব গ্রহণ করলে অনমনীয়তা এবং অনুসন্ধানমূলক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে তিনি বাবার অনুসরণ করেন।
৬৭৯ হিজরিতে শাফিয়ি বিচারকরা একের পর এক দায়িত্ব পালন করেন। কারও দায়িত্ব ছিল মিশর এবং উঁচু ভূমিতে। আবার কেউ ছিলেন কায়রো এবং নিম্ন ভূমির দায়িত্বে। বাদরুদ্দিন ইবনু জামাআহ ৬৯০ হিজরিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ৬৯৫ হিজরি পর্যন্ত তিনি দায়িত্বরত ছিলেন। এরপর প্রচণ্ড অমত সত্ত্বেও ইবনু দাকীকিল ঈদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বারংবার স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেওয়ার পরও তাকে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছিল। সুলতান তাকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। নিজের নায়েবদের উদ্দেশ্যে ঘন ঘন উপদেশ সংবলিত লিখতেন তিনি। মিশর জয়ের পর থেকে ইবনু জামাআহর যুগ পর্যন্ত সমস্ত বিচারকের নাম নিয়ে তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে আস-সুয়ুতি কবিতাটির সাথে আরও কয়েক লাইন বৃদ্ধি করে নিজের যুগ তথা দশম শতাব্দীর সূচনা পর্যন্ত বিচারকদের নাম জুড়ে দেন।
এরপর আস-সুয়ুতি মামলুক শাসনামলে মিশরের হানাফি বিচারকদের কথা উল্লেখ করেছেন। ৬৬৩ হিজরিতে আয-যাহির বাইবার্সের সময় যার সূচনা হয়। মিশরে প্রথম হানাফি বিচারক ছিলেন সদরুদ্দিন সুলাইমান ইবনু আবিল ইয। আরও ছিলেন নাজমুদ্দিন আহমাদ ইবনু ইসমাঈল। ৬৭৭ হিজরিতে তাকে দামিস্ক থেকে নিয়ে আসা হয়।
আয-যাহির বাইবার্সের যুগে ৬৬৩ হিজরিতে মিশরে মালিকি বিচারক ছিলেন শারাফুদ্দিন উমর ইবনুস সুবকি। ৬৬৭ হিজরিতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এরপর অনেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন। আবদুর রহমান ইবনু খালদুন ছিলেন তাদের অন্যতম। যিনি বারংবার অপসারিত এবং নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
আয-যাহির বাইবার্সের যুগে মিশরে সর্বপ্রথম হাম্বলি মাযহাবের বিচারক ছিলেন শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনুল ইমাদ। ৬৭০ হিজরিতে তিনি পদচ্যুত হন। ৬৭৬ হিজরিতে তিনি মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত কেউ এ দায়িত্ব পালন করেননি। মিশরে কয়েকজন হাম্বলি বিচারক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এদের মাঝে মুওয়াফ্ফাকুদ্দিন আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ আল-মাকদিসির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মিশরের অন্যতম প্রসিদ্ধ বিচারক হচ্ছেন ইবনু দাকীকিল ঈদ। তার প্রকৃত নাম ছিল মুহাম্মাদ ইবনু আলি ইবনি ওয়াহাব আল-কুশাইরি আল-মানফালুতি। তার উপনাম তাকিউদ্দিন। ইসলামি আইনবিদ হওয়ার পাশাপাশি তিনি একাধারে সুসাহিত্যিক, কবি এবং বিচারক ছিলেন। মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর একাধিক বার স্বেচ্ছায় ইস্তফা প্রদান করেন। তা সত্ত্বেও তাকে পুনরায় দায়িত্ব প্রদান করা হতে থাকে। অবশেষে ৭০২ হিজরিতে কাজীর পদে বহাল থাকা অবস্থায় কায়রোতে তার মৃত্যু হয়।
টিকাঃ
[১০১১] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৬৪ দ্রষ্টব্য
[১০১২] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৬৪
[১০১৩] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৬৬
[১০১৪] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৮৪
[১০১৫] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৮৮
[১০১৬] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৯০
[১০১৭] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ২৭০; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৯৩
📄 ন্যায়পরায়ণ এবং অসৎ বিচারক
মামলুক শাসনামলে মিশর এবং শাম অঞ্চলে থাকা বিচারকদের অধিকাংশই ছিলেন সত্যনিষ্ঠ আর ন্যায়পরায়ণ। বড় আলিম ও ফকিহ হওয়ায় তাদের মাঝে ছিল ন্যায় এবং স্বচ্ছতার গুণ। অবিচলতার ক্ষেত্রে তারা ছিলেন কিংবদন্তি। শাসক এবং আপামর জনগণ তাদের সম্মান করতেন। সমসাময়িকদের মাঝে তাদের অবস্থান ছিল অনেক উঁচুতে। ফলে বিচারকার্যের পাশাপাশি অন্য দায়িত্বও তারা পালন করতেন। পাঠদান, ফতোয়া প্রদান এবং খতিবের দায়িত্বের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের জীবনীতে এগুলোর উল্লেখ এত অধিক পরিমাণে পাওয়া যায় যে, তা বর্ণনা করা কষ্টসাধ্য। তবে তাদের প্রশংসনীয় গুণাবলি, মহৎ কর্ম এবং সুউচ্চ মর্যাদার জন্য কেবল এগুলোই যথেষ্ট নয়। যেমন ঐতিহাসিক ইবনু তুলুন দামিস্কের প্রধান বিচারপতি শিহাবুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনু শামসুদ্দিন আহমাদের জীবনীতে লিখেছেন: তিনি অনেক ইলম অর্জন যেমন করেছিলেন তেমনি অনেক গ্রন্থও রচনা করেছেন। আল-কুদসে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। পরবর্তীকালে মিশরের বিচারকার্য পরিচালনা করেন। সেখান থেকে শামের বিচারকার্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন স্বীয় যুগের এবং বিশিষ্ট বিদ্বান ব্যক্তিদের সৌন্দর্য তিলক এবং শ্রেষ্ঠ বিদ্যানুরাগীদের অন্যতম।... ৬৯৩ হিজরিতে দামেস্কের বিচারক পদে থাকা অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কাসিযুন পাহাড়ের পাদদেশে তাকে সমাহিত করা হয়। মিশর এবং শামের প্রবীণ বিচারকের অবস্থাও এমন ছিল।
তবে মামলুক শাসনামলে অসৎ বিচারকও ছিল। মূর্খতা এবং স্বল্প জ্ঞানের পুঁজি নিয়ে যারা পদ দখল করেছিল। তাদের নিকৃষ্ট জীবনাচার সমালোচকদের সমালোচনা এবং মন্দ ধারণার সুযোগ করে দেয়। মৃত্যুর পরও তাদের কুকীর্তি আর মন্দ দৃষ্টান্ত রয়ে গেছে। এখানে তাদের সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করা হবে। যাতে তাদের কুকর্ম আর মন্দ দিকগুলো থেকে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি।
শামের বিচারক ছিলেন কামালুদ্দিন আল-মাআররি। একাধিক বার আলেপ্পোতেও বিচারক ছিলেন তিনি। উমাইয়া জামে মসজিদে খুতবাও দিয়েছেন। তবে শরীয়তের বিধানাবলির কিছুই তার জানা ছিল না। সম্পদের লোভও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। ৭৮৩ হিজরিতে মৃত্যুর পর নিজ বাড়িতেই তাকে সমাহিত করা হয়।
যাইনুদ্দিন আল-কিফরি একাধিক বার বিচারকের পদে ছিলেন। তবে তার চরিত্র মোটেই প্রশংসনীয় ছিল না। বইয়ের নাম বিকৃত করে বিক্রি করতেন। ফিকহ-সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন গণ্ডমূর্খ। ৮০৯ হিজরিতে তিনি মারা যান।
জামালুদ্দিন ইবনুল কুতুব বারংবার বিচারকের পদে বসলেও ইলমের সাথে তার ন্যূনতম সম্পর্কও ছিল না। নিন্দনীয়ভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করে গেছেন। ৮১৪ হিজরিতে বয়স সত্তর পেরুনোর আগেই তার মৃত্যু হয়।
আলেপ্পো, হামা এবং দামিস্কের বিচারক ইলমুদ্দিন সচ্চরিত্র এবং বিদ্যানুরাগী হলেও তার বোঝার ক্ষমতা এবং বুদ্ধি কিছুটা কম ছিল।
জামালুদ্দিন আল-মাগরিবি হামা এবং তরাবলুসের বিচারক ছিলেন। পরবর্তীকালে দামিস্কের বিচারক হন। যুক্তি ভালো জানলেও তিনি ছিলেন অস্থির প্রকৃতির লোক। সেইসাথে বদ অভ্যাস তো ছিলই।
প্রধান বিচারপতি সিরাজুদ্দিন আল-হিমসি বিশেষ শ্রেণি এবং সাধারণ মানুষের সাথে মন্দ আচরণ করে কুখ্যাতি লাভ করেছিলেন। অবশেষে আরেকজন বিচারকের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের রেহাই দেন। বিচারকার্য পরিচালনায় তিনি মোটেই প্রশংসনীয় ছিলেন না। ৮৬১ হিজরিতে তার মৃত্যু হয়।
সদরুদ্দিন আল-আউমি প্রথমে কেবল দামিস্কের বিচারক ছিলেন। পরবর্তীকালে কায়রোর বিচারকার্যও লাভ করেন। আল-মুআইয়াদের সময় তিনি বিচার বিভাগের পাশাপাশি হিসবাহর দায়িত্বও প্রাপ্ত হয়েছিলেন। কায়রোতে প্রবেশের সময় তিনি ছিলেন কপর্দকহীন। মৃত্যুর সময় অঢেল সম্পত্তি রেখে গেছেন। তিনি মোটেই চরিত্রবান ছিলেন না।
প্রধান বিচারপতি নাজমুদ্দিন আল-বাগদাদির জীবনীতে ইবনু তুলুন লিখেছেন, 'তিনি শোষণনীতির প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। এত অধিক পরিমাণে সম্পদ সঞ্চয় করেছিলেন, যা পূর্ববর্তীদের সম্পত্তিরও বেশি হয়ে গিয়েছিল।... এরপর বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন নিয়ে তিনি মিশর অভিমুখে রওয়ানা হন।... কিন্তু মৃত্যু তার চেয়ে দ্রুতগামী ছিল। তার মৃত্যু মানুষের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ামত বলে ধরা হয়।'
বিচারপতি শিহাবুদ্দিন আল-উমবি ছিলেন তরাবলুসের বিচারক। পরবর্তীকালে দুই বার দামিস্কের বিচারক হয়েছিলেন। তারপর মিশরের বিচারকার্যও পরিচালনা করেন। তার চরিত্র ছিল অতি মন্দ। প্রকাশ্যে ঘুস গ্রহণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন। যা পরে জানা গিয়েছিল। ৮৩৬ হিজরিতে তার মৃত্যু হয়।
শামসুদ্দিন আন-নাবুলসিকে কয়েকবার বরখাস্ত এবং নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বিরাট সম্মান এবং বুদ্ধিসুদ্ধি না থাকলে কী হবে, ওয়াকফকৃত অনেক সম্পত্তি তিনি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। কথিত আছে, তার সময় ওয়াকফ সম্পত্তি যতটা বিক্রি হয়েছে, ইসলামের ইতিহাসে তেমনটা আর কখনোই হয়নি। মানুষের জন্য এমন সব অপকর্মের দরজা তিনি খুলে দিয়েছেন, যা আর কখনোই বন্ধ হওয়ার নয়। তৈমুর লঙের অন্যায় কাজেও তিনি ছিলেন সহযোগী। মানুষকে কষ্ট দেওয়া এবং সম্পত্তি আত্মসাৎ করার মতো কিছু নিকৃষ্ট বিষয় তার দিকে সম্পৃক্ত করা হয়ে থাকে।
বিচারক ইযযুদ্দিন আল-বাগদাদি বিচারকার্য পরিচালনায় নিকৃষ্ট মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। জবরদখল এবং নীচতায় তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার কবল থেকে কেউ নিস্তার পায়নি। মোটকথা, তার বুদ্ধি বা দ্বীন কোনোটাই ছিল না। ফিকহের পুঁজি ছিল নিতান্তই সামান্য। তার জীবনটা ছিল অদ্ভুত। তার নীচতা ও হীনতা সম্পর্কে অদ্ভুত সব কথা প্রচলিত আছে। বিচারকার্যকে পুঁজি করে কামাই করা ঘুষের অর্থ তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের পেছনে ব্যয় করতেন।
এগুলো কয়েকজন অসৎ বিচারকের কিছু উদাহরণ। হাতে-গোনা এমন কয়েকজন ছাড়া মামলুক জামানার সিংহভাগ বিচারকই ছিলেন অবিচলতা, ন্যায়নিষ্ঠা, ইলম এবং আল্লাহভীতির মূর্ত প্রতীক।
টিকাঃ
[১০১৮] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৭৯। আরও জানতে আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/৩৩৭ এবং শাযারাতুয যাহাব : ৪/৪২৩ দেখুন।
[১০১৯] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ১১১
[১০২০] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২০৫
[১০২১] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২০৬
[১০২২] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২৪৯
[১০২৩] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২৫০-২৫১
[১০২৪] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ১৬৫-১৬৭
[১০২৫] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২০৭
[১০২৬] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২২০-২২১
[১০২৭] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২৫৫
[১০২৮] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২৮৭
[১০২৯] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২৯৭-৩০০
📄 বিচারকার্য থেকে বিরত থাকা
খলিফা, শাসক এবং প্রত্যেক মাযহাবের প্রধান বিচারপতিরা সর্বাধিক প্রসিদ্ধ আলিম, ফকিহ এবং আল্লাহভীরুদের বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। অনেকে তাদের ডাকে সম্মতিও প্রকাশ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ আল্লাহর ভয়, পরিণামের আশঙ্কা, বুজুর্গি এবং দুনিয়াবিমুখতার কারণে সম্মত হননি। এসব কারণের ব্যাখ্যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
মামলুক শাসনামলে আলিম এবং ফকিহদের অনেকেই বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করতে সম্মত হননি। তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এখানে করা হচ্ছে।
■ মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি মাহমুদ
উপনাম আবু আবদিল্লাহ। আকমালুদ্দিন আল-বাবারতি নামে তিনি পরিচিত। হানাফি মাযহাবের অনুসারী এই ফকিহ ছিলেন ধর্মতত্ত্ববিদ এবং মুফাসসির। আমির শাইখুন তাকে কায়রোস্থ শাইখুনি খানকার মুরুব্বি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। আমিরের কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন এবং সম্মানের পাত্র হওয়ায় তাকে বারবার মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু আকমালুদ্দিন তাতে সম্মত হননি। আয-যাহির বারকুক তাকে বিশেষ শ্রদ্ধার নজরে দেখতেন। ৭৮৬ হিজরিতে মিশরে তার ইন্তেকাল হয়। তিনি অনেকগুলো কিতাব রচনা করেছেন।
মুহাম্মদ ইবনু আহমাদ ইবনি মুহাম্মাদ
উপনাম আবু আবদিল্লাহ। শাইখ জালালুদ্দিন আল-মাহাল্লি নামেই তিনি পরিচিত। মিশরের অধিবাসী এই শাফিয়ি ফকিহ ছিলেন মুফাসসির। অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়ার পাশাপাশি অভিজাত শ্রেণি ও জনসাধারণের কাছে তিনি ছিলেন বরণীয় ব্যক্তি। নির্ভয়ে সত্য উচ্চারণ করতেন। শাসক শ্রেণির লোকেরা ভক্তির সাথে তার কাছে উপস্থিত হতো। তার কাছে বিচারকার্য পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি সম্মত হননি। শিক্ষকতা, ফতোয়া প্রদান এবং পড়ানোর প্রতি তিনি অধিক মনোযোগী ছিলেন। সাদামাটা জীবন যাপন করতেন সব সময়। তার জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম ছিল ব্যবসা। ৮৬৪ হিজরিতে মিশরে মৃত্যুবরণ করেন। উপকারী এবং প্রসিদ্ধ কিছু গ্রন্থ রচনা করে গেছেন।
আহমাদ ইবনু আলি ইবনি আবদিল কাদির
উপনাম আবুল আব্বাস আল-হুসাইনি আল-উবাইদি। তাকিউদ্দিন আল-মাকরিযি নামে তিনি পরিচিত। মিশরীয় ইতিহাসবিদ ছিলেন। মূলত বালবাকের বাসিন্দা হলেও তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা কায়রোতে। ৮৪৫ হিজরিতে সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। একাধিক বার সেখানে হিসবাহ, খতিবের দায়িত্ব এবং ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ৮১০ হিজরিতে বারকুকের ছেলে আন-নাসিরের সাথে দামিস্কে প্রবেশ করেন। তার কাছে সেখানকার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পেশ করা হলে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করে মিশরে ফিরে যান। তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন।
শাইখুল ইসলাম যাকারিয়্যা আল-আনসারি
প্রকৃত নাম যাকারিয়্যা ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আহমাদ। যাইনুদ্দিন নামে তিনি পরিচিত। এই শাফিয়ি ফকিহ এবং মুফাসসিরকে সুলতান কাতিয়াবাই আস-সারকাশি প্রধান বিচারপতি হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে রাজ্যের উলামা ও প্রবীণ ব্যক্তিদের ক্রমাগত অনুরোধের প্রেক্ষিতে সম্মত হন। কাজের ক্ষেত্রে তিনি সংযম এবং স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছেন। জুলুমের কারণে সুলতানকে ধমকি দিয়ে পত্র লিখলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। এটা ৯০৬ হিজরির কথা। এরপর তিনি ইলমচর্চায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীকালে পুনরায় বিচারকার্য পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি সেটা উপেক্ষা করে যান। ৯২৬ হিজরিতে কায়রোতে তার ইন্তেকাল হয়। বয়স শত পেরিয়ে গেলেও ইলমচর্চা, অধ্যাপনা এবং কিতাব রচনা থেকে তিনি বিরত থাকেননি।
■ যাইনুদ্দিন আল-আইনি
দামিস্কের দুর্গে তার কাছে হানাফি মাযহাবের বিচারকার্য পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। শরীয়তের ব্যাপারে গভীর পাণ্ডিত্য রাখা সত্ত্বেও এ প্রস্তাবে তিনি সম্মত হননি।
টিকাঃ
[১০৩০] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৩৯৪
[১০৩১] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৬০২
[১০৩২] আল-আ'লাম: ১/১৭২; আল-বাদরুত ত্বালি'উ: ১/৭৯; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ১/৫৫৭
[১০৩৩] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ
[১০৩৪] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ২২৮