📄 হিসবাহর বিচার
মামলুক শাসনামলে হিসবাহর দায়িত্ব এবং বিচার সংক্রান্ত কর্তৃত্ব শক্তিশালী হয়েছিল। অধিকাংশ সময় বিচারকার্য এবং হিসবাহ-উভয়টি এক ব্যক্তিরই নিয়ন্ত্রণে থাকত। সাধারণ শিষ্টাচার, বাজারের নীতি, ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে আমানতদারিতা, রাস্তা আর ঘরের নিয়ম, ওজনের পদ্ধতি এবং দোকান, খাবার, সরাইখানা, গোসলখানা ইত্যাদির ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দ্রুত ফয়সালা করে দিতেন।
সদরুদ্দিন ইবনু আমিনুদ্দিন আল-আদামির জীবনীতে ইবনু তুলুন লিখেছেন, 'আল-মুআইয়াদের যুগে বিচারকার্য এবং হিসবাহর দায়িত্ব তিনি একাই পালন করেছেন।'
মামলুক শাসনামলে হিসবাহ-সংক্রান্ত প্রসিদ্ধ কিতাবাদি প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন ইবনু তাইমিয়্যাহ রচিত কিতাবুল হিসবাহ ফিল ইসলাম এবং ইবনুল ইখওয়াহ রচিত আল-হিসবাহ।
টিকাঃ
[৯৭৭] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৭
[৯৭৮] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ২০৭
মামলুক শাসনামলে হিসবাহর দায়িত্ব এবং বিচার সংক্রান্ত কর্তৃত্ব শক্তিশালী হয়েছিল। অধিকাংশ সময় বিচারকার্য এবং হিসবাহ-উভয়টি এক ব্যক্তিরই নিয়ন্ত্রণে থাকত। সাধারণ শিষ্টাচার, বাজারের নীতি, ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে আমানতদারিতা, রাস্তা আর ঘরের নিয়ম, ওজনের পদ্ধতি এবং দোকান, খাবার, সরাইখানা, গোসলখানা ইত্যাদির ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দ্রুত ফয়সালা করে দিতেন।
সদরুদ্দিন ইবনু আমিনুদ্দিন আল-আদামির জীবনীতে ইবনু তুলুন লিখেছেন, 'আল-মুআইয়াদের যুগে বিচারকার্য এবং হিসবাহর দায়িত্ব তিনি একাই পালন করেছেন।'
মামলুক শাসনামলে হিসবাহ-সংক্রান্ত প্রসিদ্ধ কিতাবাদি প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন ইবনু তাইমিয়্যাহ রচিত কিতাবুল হিসবাহ ফিল ইসলাম এবং ইবনুল ইখওয়াহ রচিত আল-হিসবাহ।
টিকাঃ
[৯৭৭] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৭
[৯৭৮] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ২০৭
📄 বিচারব্যবস্থার অধঃপতন
মামলুক শাসনামলকে অবসন্নতা পেয়ে বসেছিল। তা ছিল শক্তি এবং দুর্বলতার মাঝে দোদুল্যমান। শাসনকার্য পরিচালক সুলতানদের শক্তি, ক্ষমতা এবং যোগ্যতার মাঝে অনেক তারতম্য ছিল। সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থানখুল কাদ্বা, পৃ. ৯৯; তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৫; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৮
[৯৭২] লিসানুল হুক্কাম, পৃ. ৯। আরও দেখুন, তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৯৯
[৯৭৩] সুবহুল আ'শা: ১১/৯৬
[৯৭৪] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১০০
মামলুক শাসনামলকে অবসন্নতা পেয়ে বসেছিল। তা ছিল শক্তি এবং দুর্বলতার মাঝে দোদুল্যমান। শাসনকার্য পরিচালক সুলতানদের শক্তি, ক্ষমতা এবং যোগ্যতার মাঝে অনেক তারতম্য ছিল। সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান উৎকর্ষ এবং স্থবিরতার মাঝে তারা হাবুডুবু খাচ্ছিল। যার প্রভাব পড়েছিল বিচারব্যবস্থার ওপর। কিছু কিছু স্তর একটু একটু করে ক্ষয় হচ্ছিল। যা অর্থের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় শুরু হয়। অনেক সময় বিচারব্যবস্থার পদে মূর্খ এবং ব্যবসায়ীরা বসতে থাকে। অনেক বিচারক তো নিজেদের পদ ধরে রাখার জন্য সুলতানকে ঘুষ দিতেও বাধ্য হয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ শামসুদ্দিন ইবনু তুলুন তারীখু দিমাশক গ্রন্থে এসব আলোচনা সুস্পষ্টভাবে করেছেন। এ গ্রন্থের ভূমিকায় এসেছে: 'বিচারব্যবস্থা সেদিন সম্মানের শীর্ষে অবস্থান করছিল, যেদিন এর দায়িত্ব নিয়েছিল আস্থাভাজন এবং বিশ্বস্ত জ্ঞানী ব্যক্তিরা। আবার যেদিন বিচারব্যবস্থা অর্থের মাধ্যমে কিনে নেওয়া হচ্ছিল, সেদিন ব্যবসায়ী এবং মূর্খরা এ দায়িত্ব পালন করে। বিচারব্যবস্থা তখন পতনের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়। এ গ্রন্থে সেসব বিচারকের কথাও আছে, যারা মামলুক শাসনামলে নিজেদের পদ এবং পূর্বের অবস্থান ধরে রাখতে মিশরের প্রশাসক এবং সুলতানদের ঘুষ দিয়েছিল। মিশরের প্রশাসকরা ঘুষ কেবল পছন্দই করত না, এটা তাদের প্রত্যাশাও ছিল।'
এরপর ইবনু তুলুন উদাহরণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, '২রা যিলকদ, ৮৩৯ হিজরি রোজ শনিবারে শামসুদ্দিন আস-সফাদি নিজের সাথে থাকা সম্পত্তির বিনিময়ে দামিস্কের হানাফি মাযহাবের বিচার বিভাগে বহাল থাকলেন। কিছুটা কম দিলে কাজ হবে-এ আশায় তিনি কায়রোতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও মোটা অঙ্কের (ঘুষ) দিতে হয়। ... এরপর তাকে বরখাস্ত করা হলে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে আবার পদ ফিরে পান।'
বিচারক কিওয়ামুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ আর-রুমি (৭৯৮-৮৫৮ হি.) ছিলেন হানাফি মাযহাবের প্রধান বিচারপতি। তার সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনু তুলুন লিখেন, 'তিনি ছিলেন ফিকহ ও ফতোয়ার প্রতি মনোযোগী। ঘুষ প্রদান ব্যতীত একাধিকবার দামিস্কে হানাফি বিচারপতি পদে নিয়োগ পাওয়ায় তিনি অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তিনি ছিলেন সচ্ছল এবং উন্নত মানসিকতার অধিকারী শ্রেষ্ঠ বিচারক। বুদ্ধিমত্তা, দ্বীনদারি, বিনয় এবং মর্যাদার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য। দামিস্কের অন্যতম সদাচারী হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়।
ইবনুল কুতুব আল-হানাফির জীবনীতে ইবনু তুলুন লিখেছেন, 'তিনি নববর্ষ উপলক্ষে দামিস্কের নায়েবের জন্য অর্থ ব্যয় করলে তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
টিকাঃ
[৯৭৯] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৭-৮
[৯৮০] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২১৮; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৫২
[৯৮১] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২২২
[৯৮২] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ২২৫
[৯৮৩] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ২০৬
📄 বিচারকদের অপসারণ এবং তাদের অব্যাহতি
মামলুক শাসনামলে অনেক বিচারককে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের রদবদলের কারণে রাজনৈতিক পটভূমির পরিবর্তন ঘটত। এটা ছিল ব্যাপক হারে বিচারপতি অপসারণের কারণ। সুলতান বা আমির প্রায়ই আগের বিচারককে বরখাস্ত করতেন। রাজনৈতিক কারণবশত এবং বিচারক বা বিচারকের সহযোগীর সমর্থন পাওয়া যাওয়ার কারণে এক থেকে একাধিক বারও বরখাস্ত করা হতো। তবে বিচারক নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ হওয়ার কারণেই অধিকাংশ সময় তাকে পদচ্যুত করা হতো। অবশ্য অপবাদের কারণেও অপসারণ করার কথা জানা যায়।
পূর্বে প্রধান বিচারপতি শামসুদ্দিন আস-সফাদির কথা আলোচনা করা হয়েছে। তার জীবনীতে ইতিহাসবিদ ইবনু তুলুন লিখেছেন, 'আস-সফাদি তরাবলুসের বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এরপর তাকে বদলি করা হয় দামিস্কে। পরবর্তীকালে তাকে অপসারণ করা হয়। এরপর এক হাজার দিনারের বিনিময়ে তাকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আবার অপসারণ করা হয়। এভাবে নিয়োগ এবং অপসারণের ধারা চলতে থাকে। অবশেষে ৮৫২ হিজরিতে দামিস্কে তার মৃত্যু হয়।'
আবদুর রহমান ইবনু আবদিল্লাহ ইবনিল খাশশাব আল-হানাফির জীবনীতে ইবনু তুলুন লিখেন, 'এরপর ৮০৯ হিজরিতে শামের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর মাত্র দুদিন পদে ছিলেন। এরপর ইবনুল কিফরির চেষ্টা-তদবিরে তিনি পুনরায় দায়িত্ব ফিরে পান। ইবনু তুলুন আরও কয়েকজন বিচারকের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা পালাক্রমে বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। একজন অপসারিত হলে অপরজন নিযুক্ত হতেন। পরবর্তী সময়ে আবার প্রথমজন দায়িত্বপ্রাপ্ত হতেন। এভাবেই নিয়োগ প্রক্রিয়া চলত। যেমন তাকিউদ্দিন আল-কিফরি, মুহিউদ্দিন ইবনুল কিশক এবং বিচারক শামসুদ্দিন আল-ইখনায়ি। এরা বারংবার নিয়োগপ্রাপ্ত এবং বরখাস্ত হয়েছিলেন। ইলমুদ্দিন আল-মালিকি ২৫ বছরের চাকরিজীবনে ১১ বার বিচারপতির দায়িত্ব পেয়েছিলেন। শামসুদ্দিন আন-নাবুলুসির নিয়োগ এবং অপসারণ হয়েছিল কয়েকবার। শামসুদ্দিন ইবনু উবাদাহ আল-হাম্বলি এবং বিচারক ইযযুদ্দিন আল-খতিবের মাঝে দায়িত্ব পরিবর্তিত হতে থাকত।
এ তো গেল বিচারক অপসারণের কথা। অনেক সময় ব্যক্তিগত বা সর্বজনীন কোনো কারণে বিচারক নিজেও মোকদ্দমা পরিচালনা থেকে বিরত থাকতেন। হানাফি প্রধান বিচারপতি শামসুদ্দিন আল-কিফরি সম্পর্কে ইবনু তুলুন লিখেছেন, ৭৬৩ হিজরিতে ছেলে ইউসুফের কারণে তিনি বিচারকার্য থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। এরপর ৭৭৬ হিজরিতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাঠদান ও হাদিস বর্ণনার কাজে নিয়োজিত থাকেন।
বাদরুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনু জামাআহর জীবনীতে এসেছে, তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করে আসছিলেন। অবশেষে ৭২২ হিজরিতে বার্ধক্যজনিত কারণে তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। তখন তিনি অব্যাহতি গ্রহণ করতে চাইলে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ৭৩৩ হিজরিতে ৯৪ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তাকিউদ্দিন আস-সুবকির জীবনীতে এসেছে, শেষ বয়সে তিনি শামের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে ইস্তফা চেয়ে তার ছেলে তাজুদ্দিনকে দায়িত্ব প্রদানের অনুরোধ জানান। তার অনুরোধ রক্ষা করা হলে তিনি নিজ দেশ মিশরে ফিরে যান। ৭৫৬ হিজরিতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
প্রধান বিচারপতি জামালুদ্দিন ইউসুফ ইবনু ইবরাহীম ইবনি জুমলাহ (৮৩৭ হি.)-এর জীবনীতে আছে, তিনি নিজেই ইস্তফা দিয়ে ইলম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি নির্জনতা অবলম্বন করতেন এবং মানুষের সাথে মেলামেশা কম করতেন। তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী, অকাট্য ফয়সালাদাতা এবং বহুগুণের আধার।
মামলুক শাসনামলে মিশরেও বিচারকদের বরখাস্তকরণ এবং অব্যাহতি প্রদানের এমন ঘটনা আছে। আস-সুয়ুতি বলেন, সুলতান মুহাম্মাদ ইবনু কালাউন তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসলে তিনি বাদরুদ্দিন ইবনু জামাআহর সাথে হানাফি এবং হাম্বলি বিচারক দুজনকে বরখাস্ত করেন। তবে তার পিতা কালাউনের পক্ষ থেকে ওসিয়ত থাকায় মালিকি বিচারককে তিনি বহাল রেখেছিলেন।
টিকাঃ
[৯৮৪] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ২২২। একই রকম অবস্থা হয়েছিল আহমাদ ইবনু আবিল ইয-এর ক্ষেত্রেও। ৭৭৭ হিজরিতে তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তীকালে তাকে অপসারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে আবার নিয়োগ দেওয়ার পর ৭৯১ হিজরিতে সালিহিয়্যাহ নামক স্থানে তিনি নিহত হন। (কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ২০২।) ইবনু খাল্লিকান সম্পর্কে জানা যায়, তিনি একাধিক বার অপসারিত হয়েছিলেন। (কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৭৬।)
[৯৮৫] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ২০৫। আল-কিফরি ছিলেন বিচারক এবং নায়েব।
[৯৮৬] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ১২৫, ২০৩, ২৪৯, ২৮৭, ২৯০
[৯৮৭] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ২০০
[৯৮৮] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৮১-৮২
[৯৮৯] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ১০২
[৯৯০] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৯৫
[৯৯১] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৮৪-১৮৫ দ্রষ্টব্য
[৯৯২] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১১৪