📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ফিকহি মাযহাব অনুসারে চারজন বিচারক

📄 ফিকহি মাযহাব অনুসারে চারজন বিচারক


মিশর এবং শামে সুলতানের সহায়ক প্রধান বিচারপতি ছিলেন শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারী ফকিহ। রাজধানী-সহ অন্যান্য অঞ্চলে সুলতানের প্রতিনিধি এবং বিচারকদের সহযোগিতা, তাদের কার্যক্রম দেখভাল এবং অবস্থা যাচাই করা ছিল প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব।

কিন্তু আয-যাহির বাইবার্স একটি নতুন নিয়মের প্রচলন করেছিলেন। যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। বিচার-সংক্রান্ত বিষয়টি তিনি এককভাবে শাফিয়ি মাযহাবের বিচারকদের ওপর ছাড়তে চাইলেন না। এ চিন্তা থেকেই তিনি শাফিয়ি বিচারপতির সাথে অন্য তিন মাযহাবের অনুসারীকে নিয়োগ দিলেন। উক্ত তিনজন ছিলেন যথাক্রমে হানাফি, মালিকি এবং হাম্বলি মাযহাবের অনুসারী। এটা ৬৬৩ হিজরির (১২৬০ খ্রি.) কথা। কেউ কেউ অবশ্য ৬৬০ হিজরির কথাও বলেছেন।

এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে একটি কারণ ছিল। তখন মিশরের প্রধান বিচারপতি ছিলেন তাজুদ্দিন ইবনু বিনতিল আ'আয। শরীয়তের বিধানাবলি পালনের ক্ষেত্রে তিনি যত্নবান ছিলেন। আমিরদের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। বড় বড় আমিরদের সাক্ষ্যও তার কাছে গ্রহণযোগ্য হতো না। সুলতান আয-যাহিরের আমির জামালুদ্দিন ইদগুরি একবার প্রধান বিচারপতির সাথে হঠকারিতামূলক আচরণ করেন। তার সম্পর্কে সুলতানের কান ভারী করে তাকে ক্ষেপিয়ে তোলেন। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সুলতানের সাথে কথা বলার সময় এমন একটি ঘটনা ঘটে, যাতে জামালুদ্দিন সুযোগ পেয়ে যান। মাদইয়ান থেকে একটি মোকদ্দমা এসেছিল। বিচারপতি কোনো কারণবশত সেটি মুলতুবি রাখতে চাইছিলেন। ফলে সুলতান বিরক্তি বোধ করলেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমির তখন চার মাযহাব থেকে চারজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার কথা বললেন। সুলতানও সে নির্দেশ দিয়ে দিলেন। তবে শাফিয়ি মাযহাবের বিচারক হিসেবে তিনি বহাল রেখেছিলেন তাজুদ্দিনকেই।

কথিত আছে, তাজুদ্দিন ছিলেন সর্বশেষ ন্যায়পরায়ণ বিচারক। তিনি যে ইনসাফ করতেন-এ ব্যাপারে কেউ কখনো দ্বিমত করেনি। একইসাথে তিনি এতগুলো পদ সামলেছেন, যেমনটা আর কেউ করেনি। তার পদের সংখ্যা ছিল ১৫টি। বিচারকার্য, ওয়াকফের তত্ত্বাবধান, মন্ত্রীত্ব, শাফিয়ি মাযহাব অনুসারে পাঠদান, খুতবা, হিসবাহ এবং জামে মসজিদ-সহ অন্যত্র নামাজ পড়ানো ছিল উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব।

অন্যান্য বিচারকদের মধ্যে শাইখ শিহাবুদ্দিন আবু হাফস উমর ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি সালিহ আস-সুবকি ছিলেন মালিকি মাযহাবের বিচারপতি। হানাফি মাযহাবের বিচারপতি ছিলেন বাদরুদ্দিন ইবনু সুলাইমান এবং হাম্বলি মাযহাবের বিচারপতি ছিলেন শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনুশ শাইখ ইমাদুদ্দিন ইবরাহীম আল-কুদসি। এই বিচারপতিদের প্রত্যেকেই স্ব-স্ব মাযহাব অনুসারে কায়রো এবং ফুসতাত নগরীতে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া, সাক্ষীদের নিয়ে বসার পাশাপাশি বিচারের রায়ও বাস্তবায়ন করতেন।

শাফিয়ি বিচারক নিজের বিচারকার্যে ব্যস্ত থাকেন। ইয়াতিমের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, মিশরের উঁচু-নিচু ভূমিতে প্রতিনিধি নিয়োগ, ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধান ইত্যাদি ছিল তার বাড়তি দায়িত্ব। অন্য কোনো বিচারককে এসব দায়িত্ব সামলাতে হতো না।

দামিস্ক এবং শামের বিষয়টিও ছিল একই রকম। শামে শাফিয়ি মাযহাব বিস্তার লাভের আগে বিচারকার্য পরিচালনা, বনু উমাইয়া মসজিদের খুতবা দেওয়া ও নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব আওযায়ি মাযহাবের অনুসারীরাই করতেন। আবু ঘুরআহ মুহাম্মাদ ইবনু উসমান আদ-দিমাশকি প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ অবধি শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারীই কেবল বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এর পরেও অবশ্য শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারীরাই অধিকাংশ সময় বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। শামে শাফিয়ি মাযহাব প্রসারের সময় এবং তার পরবর্তী যুগেও বনু উমাইয়া মসজিদের দায়িত্ব শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

আল-কালকাশান্দি বলেছেন, দামিস্কেও প্রধান বিচারপতির পদ ছিল। সেখানেও চার মাযহাবের চারজন বিচারপতি ছিলেন। এদের মাঝে শাফিয়ি মাযহাবের বিচারক সর্বোচ্চ মর্যাদা রাখতেন। মিরাসের সম্পত্তি, ওয়াকফ-সহ আরও অনেক ব্যাপারে তিনিই মুখপাত্রের ভূমিকা রাখতেন। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার অধিকার তার জন্য সংরক্ষিত ছিল। তার পরবর্তী স্তরেই ছিলেন হানাফি মাযহাবের বিচারক। তারপর যথাক্রমে মালিকি এবং হাম্বলি মাযহাবের। মিশরের পরই দামিস্কে চারজন বিচারকের পদ্ধতি চালু হয়। তবে মিশরের মতো চারজন বিচারককে সেখানে একইসাথে নিয়োগ পাঠদান, খুতবা, হিসবাহ এবং জামে মসজিদ-সহ অন্যত্র নামাজ পড়ানো ছিল উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব।

অন্যান্য বিচারকদের মধ্যে শাইখ শিহাবুদ্দিন আবু হাফস উমর ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি সালিহ আস-সুবকি ছিলেন মালিকি মাযহাবের বিচারপতি। হানাফি মাযহাবের বিচারপতি ছিলেন বাদরুদ্দিন ইবনু সুলাইমান এবং হাম্বলি মাযহাবের বিচারপতি ছিলেন শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনুশ শাইখ ইমাদুদ্দিন ইবরাহীম আল-কুদসি। এই বিচারপতিদের প্রত্যেকেই স্ব-স্ব মাযহাব অনুসারে কায়রো এবং ফুসতাত নগরীতে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া, সাক্ষীদের নিয়ে বসার পাশাপাশি বিচারের রায়ও বাস্তবায়ন করতেন।

শাফিয়ি বিচারক নিজের বিচারকার্যে ব্যস্ত থাকেন। ইয়াতিমের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, মিশরের উঁচু-নিচু ভূমিতে প্রতিনিধি নিয়োগ, ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধান ইত্যাদি ছিল তার বাড়তি দায়িত্ব। অন্য কোনো বিচারককে এসব দায়িত্ব সামলাতে হতো না।

দামিস্ক এবং শামের বিষয়টিও ছিল একই রকম। শামে শাফিয়ি মাযহাব বিস্তার লাভের আগে বিচারকার্য পরিচালনা, বনু উমাইয়া মসজিদে খুতবা দেওয়া ও নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব আওযায়ি মাযহাবের অনুসারীরাই করতেন। আবু ঘুরআহ মুহাম্মাদ ইবনু উসমান আদ-দিমাশকি প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ অবধি শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারীই কেবল বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এর পরেও অবশ্য শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারীরাই অধিকাংশ সময় বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। শামে শাফিয়ি মাযহাব প্রসারের সময় এবং তার পরবর্তী যুগেও বনু উমাইয়া মসজিদের দায়িত্ব শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

আল-কালকাশান্দি বলেছেন, দামিস্কেও প্রধান বিচারপতির পদ ছিল। সেখানেও চার মাযহাবের চারজন বিচারপতি ছিলেন। এদের মাঝে শাফিয়ি মাযহাবের বিচারক সর্বোচ্চ মর্যাদা রাখতেন। মিরাসের সম্পত্তি, ওয়াকফ-সহ আরও অনেক ব্যাপারে তিনিই মুখপাত্রের ভূমিকা রাখতেন। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার অধিকার তার জন্য সংরক্ষিত ছিল। তার পরবর্তী স্তরেই ছিলেন হানাফি মাযহাবের বিচারক। তারপর যথাক্রমে মালিকি এবং হাম্বলি মাযহাবের। মিশরের পরই দামিস্কে চারজন বিচারকের পদ্ধতি চালু হয়। তবে মিশরের মতো চারজন বিচারককে সেখানে একইসাথে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বরং সেটা ধাপে ধাপে হয়েছে।

মিশরের চারজন বিচারক নিয়োগের পদ্ধতিটি ৯২৮ হিজরি অর্থাৎ উসমানিদের মিশর জয়ের পর অবধি চালু ছিল। ৯২৮ হিজরির রজব মাসে উসমানি সুলতান সুলাইমান মিশরে চারজন বিচারক নিয়োগের পদ্ধতি বাতিল করে ফরমান জারি করেন। সে স্থানে সামরিক তুর্কি বিচারক সাইয়িদ শিবলি চার মাযহাব অনুসারে রায় প্রদানের দায়িত্ব নেন।

টিকাঃ
[৯৬৪] তারীখুল কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০৫; তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৫; তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা: ৮/৩১৮ এবং ৩১৯; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/৩২২
[৯৬৫] তারীখুল কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০৬
[৯৬৬] তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা: ৮/৩১৮; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৬; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৬৬
[৯৬৭] তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা: ৮/৩১৯-৩২০। আরও দেখুন, হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৬৫-১৬৬
[৯৬৮] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৭; তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৫; সুবহুল আ'শা: ৪/৩৫
[৯৬৯] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৭

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সামরিক বিচারক

📄 সামরিক বিচারক


আব্বাসি এবং আইয়ুবি যুগে মিশরে সামরিক বিচারক থাকলেও মামলুক শাসনামলে তা স্থায়ী এবং বিকশিত হয়েছিল। আল-কালকাশান্দি বলেছেন, 'সামরিক বাহিনীর বিচার ছিল দ্বিতীয় ধর্মীয় দায়িত্ব। মহান ও প্রাচীন এই দায়িত্বটি মিশরে সুলতান সালাহুদ্দিন ইবনু ইউসুফের সময় চালু ছিল। মিশরে এ সংক্রান্ত দায়িত্বশীলরা অন্যান্য বিচারকের সাথে 'দারুল আদল' নামক দফতরে উপস্থিত থাকতেন। সুলতান সফর করলে তারাও সঙ্গে থাকতেন। তারা শাফিয়ি, হানাফি এবং মালিকি-এই তিন মাযহাব অনুসরণ করতেন। এদের কেউ হাম্বলি মাযহাব অনুসরণ করতেন না। দারুল আদলেও চারজন বিচারকের পরিবর্তে তারা তিনজনই বসতেন। '

আল-কালকাশান্দি অন্যত্র হাম্বলি মাযহাবের বিচারক থাকার ব্যাপারেও ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, 'প্রত্যেক মাযহাব থেকে সর্বমোট চারজন সামরিক বিচারক হওয়ার রীতি চলে আসছে।'

আবু ইউসুফের যুগে সামরিক বিচারকদের 'কুদাতু আমিরিল মুমিনীন' তথা আমিরুল মুমিনীনের বিচারক বলা হতো।

সামরিক বাহিনীর বিচারকদের পরিধি কেবল ফৌজিদের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ থাকত। সিভিলিয়ানদের বিচারকার্য পরিচালনা করার এখতিয়ার তাদের ছিল না। তবে সামরিক বাহিনী এবং নাগরিকদের মাঝে বিবাদ সংঘটিত হলে সে ক্ষেত্রে তারা ফয়সালা করে দিতেন। লিসানুল হুক্কাম গ্রন্থের লেখক ইবনুশ শিহনাহ জামিউল ফাতাওয়ার সূত্রে ইমাম আবু ইউসুফ থেকে বর্ণনা করেছেন, 'খলিফা যেখানে অবস্থান করতেন, তার সাথে-থাকা বিচারকরা সেখানেই বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। কারণ তারা নির্দিষ্ট কোনো এলাকার বিচারক ছিলেন না; বরং তারা ছিলেন খলিফার বিচারক। খলিফার সঙ্গ ছাড়া নিজেরা নিজেরা কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানে তারা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন না। '

সামরিক বিচারকের কিছু পরিধি বর্ণনা প্রসঙ্গে আল-কালকাশান্দি বলেছেন, 'সামরিক বাহিনীতে যেসব বিষয় মীমাংসা করে দেওয়ার প্রয়োজন বেশি হয়, সেসব ব্যাপারে সামরিক বিচারকগণ সচেষ্ট থাকতেন। যেমন গনিমতের মাল, যৌথ সম্পত্তি, বন্টন, ত্রুটিযুক্ত পণ্য ফেরত দেওয়া ইত্যাদি। মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে গিয়ে যেন যুদ্ধ-সংক্রান্ত কাজে উদাসীন না হয়ে পড়তে হয়, সেজন্য তারা দ্রুত বিচার-ফয়সালা করে দিতেন।

তুর্কিরা শাম অঞ্চল এবং মিশর দখল করে নেওয়ার আগ পর্যন্ত সামরিক বিচারক পদ বহাল ছিল। বিজয়ী বাহিনীর সাথে আগত তুর্কি বিচারকই ছিলেন সামরিক বিচারক।

টিকাঃ
[৯৭০] সুবহুল আ'শা: ৪/৩৬। আরও দেখুন, নিযামুল হুকমি, পৃ. ২৬০
[৯৭১] তারী দেওয়া হয়নি। বরং সেটা ধাপে ধাপে হয়েছে।

মিশরের চারজন বিচারক নিয়োগের পদ্ধতিটি ৯২৮ হিজরি অর্থাৎ উসমানিদের মিশর জয়ের পর অবধি চালু ছিল। ৯২৮ হিজরির রজব মাসে উসমানি সুলতান সুলাইমান মিশরে চারজন বিচারক নিয়োগের পদ্ধতি বাতিল করে ফরমান জারি করেন। সে স্থানে সামরিক তুর্কি বিচারক সাইয়িদ শিবলি চার মাযহাব অনুসারে রায় প্রদানের দায়িত্ব নেন।

টিকাঃ
[৯৬৪] তারীখুল কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০৫; তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৫; তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা: ৮/৩১৮ এবং ৩১৯; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/৩২২
[১৬৫] তারীখুল কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০৬
[১৬৬] তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা: ৮/৩১৮; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৬; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৬৬
[১৬৭] তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা: ৮/৩১৯-৩২০। আরও দেখুন, হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৬৫-১৬৬
[১৬৮] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৭; তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৫; সুবহুল আ'শা: ৪/৩৫
[৯৬৯] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১০৭

আব্বাসি এবং আইয়ুবি যুগে মিশরে সামরিক বিচারক থাকলেও মামলুক শাসনামলে তা স্থায়ী এবং বিকশিত হয়েছিল। আল-কালকাশান্দি বলেছেন, 'সামরিক বাহিনীর বিচার ছিল দ্বিতীয় ধর্মীয় দায়িত্ব। মহান ও প্রাচীন এই দায়িত্বটি মিশরে সুলতান সালাহুদ্দিন ইবনু ইউসুফের সময় চালু ছিল। মিশরে এ সংক্রান্ত দায়িত্বশীলরা অন্যান্য বিচারকের সাথে 'দারুল আদল' নামক দফতরে উপস্থিত থাকতেন। সুলতান সফর করলে তারাও সঙ্গে থাকতেন। তারা শাফিয়ি, হানাফি এবং মালিকি-এই তিন মাযহাব অনুসরণ করতেন। এদের কেউ হাম্বলি মাযহাব অনুসরণ করতেন না। দারুল আদলেও চারজন বিচারকের পরিবর্তে তারা তিনজনই বসতেন। '

আল-কালকাশান্দি অন্যত্র হাম্বলি মাযহাবের বিচারক থাকার ব্যাপারেও ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, 'প্রত্যেক মাযহাব থেকে সর্বমোট চারজন সামরিক বিচারক হওয়ার রীতি চলে আসছে।'

আবু ইউসুফের যুগে সামরিক বিচারকদের 'কুদাতু আমিরিল মুমিনীন' তথা আমিরুল মুমিনীনের বিচারক বলা হতো।

সামরিক বাহিনীর বিচারকদের পরিধি কেবল ফৌজিদের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ থাকত। সিভিলিয়ানদের বিচারকার্য পরিচালনা করার এখতিয়ার তাদের ছিল না। তবে সামরিক বাহিনী এবং নাগরিকদের মাঝে বিবাদ সংঘটিত হলে সে ক্ষেত্রে তারা ফয়সালা করে দিতেন। লিসানুল হুক্কাম গ্রন্থের লেখক ইবনুশ শিহনাহ জামিউল ফাতাওয়ার সূত্রে ইমাম আবু ইউসুফ থেকে বর্ণনা করেছেন, 'খলিফা যেখানে অবস্থান করতেন, তার সাথে-থাকা বিচারকরা সেখানেই বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। কারণ তারা নির্দিষ্ট কোনো এলাকার বিচারক ছিলেন না; বরং তারা ছিলেন খলিফার বিচারক। খলিফার সঙ্গ ছাড়া নিজেরা নিজেরা কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানে তারা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন না। '

সামরিক বিচারকের কিছু পরিধি বর্ণনা প্রসঙ্গে আল-কালকাশান্দি বলেছেন, 'সামরিক বাহিনীতে যেসব বিষয় মীমাংসা করে দেওয়ার প্রয়োজন বেশি হয়, সেসব ব্যাপারে সামরিক বিচারকগণ সচেষ্ট থাকতেন। যেমন গনিমতের মাল, যৌথ সম্পত্তি, বন্টন, ত্রুটিযুক্ত পণ্য ফেরত দেওয়া ইত্যাদি। মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে গিয়ে যেন যুদ্ধ-সংক্রান্ত কাজে উদাসীন না হয়ে পড়তে হয়, সেজন্য তারা দ্রুত বিচার-ফয়সালা করে দিতেন।

তুর্কিরা শাম অঞ্চল এবং মিশর দখল করে নেওয়ার আগ পর্যন্ত সামরিক বিচারক পদ বহাল ছিল। বিজয়ী বাহিনীর সাথে আগত তুর্কি বিচারকই ছিলেন সামরিক বিচারক।

টিকাঃ
[৯৭০] সুবহুল আ'শা: ৪/৩৬। আরও দেখুন, নিযামুল হুকমি, পৃ. ২৬০
[৯৭১] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৯৯; তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৫; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়‍্যাহ, পৃ. ৬৮
[৯৭২] লিসানুল হুক্কাম, পৃ. ৯। আরও দেখুন, তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৯৯
[৯৭৩] সুবহুল আ'শা: ১১/৯৬
[৯৭৪] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১০০

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারকদের সহযোগী

📄 বিচারকদের সহযোগী


আগের যুগের মতো মামলুক যুগেও বিচারকের কাজে সহযোগিতার জন্য কয়েকজন কর্মচারী ছিলেন। তবে এ যুগে তাদের বিচার-সংক্রান্ত দায়িত্বগুলো আরও সুস্পষ্ট আকৃতিতে প্রকাশ পেয়েছিল। এই কর্মচারীদের বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হলো।

১. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী: এদের কাজ ছিল বিচারকার্য চলাকালীন ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা এবং উপস্থিতি অনুসারে বাদী-বিবাদীর ধারাবাহিকতা ঠিক করা। আদালতের শৃঙ্খলা ঠিক রাখা, বিচারের এজলাসের শিষ্টাচার রক্ষা এবং বিশৃঙ্খলভাবে বিচারকের কাছাকাছি হওয়া থেকে বাধা দেওয়ার জন্য এরা অনেক সময় হাতে লাঠি বা চাবুক রাখতেন।
২. প্রহরী: এ শ্রেণির কাজ ছিল মানুষকে সুশৃঙ্খলভাবে আদালতে প্রবেশের ব্যবস্থা করা।
৩. সহায়ক: এদের কাজ ছিল বাদী-বিবাদীকে আদালতে উপস্থিত করা এবং শুনানি চলাকালীন বিচারকের সম্মানার্থে তাঁর সামনে উপস্থিত থাকা।
৪. দায়িত্বশীল: ইয়াতিম এবং অনুপস্থিত ব্যক্তিদের সম্পত্তি দেখাশোনা করা ছিল এদের দায়িত্ব।
৫. নিষ্ঠাবান: এরা সাক্ষী হিসেবে থাকার উদ্যোগ নিতেন। নথি এবং চুক্তির বক্তব্য লক্ষ করার পাশাপাশি তা শরীয়ত মোতাবেক হচ্ছে কি না-সেটাও খেয়াল রাখতেন।

টিকাঃ
[৯৭৫] আন-নুযুমুল কাম্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৯; তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৬

আগের যুগের মতো মামলুক যুগেও বিচারকের কাজে সহযোগিতার জন্য কয়েকজন কর্মচারী ছিলেন। তবে এ যুগে তাদের বিচার-সংক্রান্ত দায়িত্বগুলো আরও সুস্পষ্ট আকৃতিতে প্রকাশ পেয়েছিল। এই কর্মচারীদের বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হলো।

১. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী: এদের কাজ ছিল বিচারকার্য চলাকালীন ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা এবং উপস্থিতি অনুসারে বাদী-বিবাদীর ধারাবাহিকতা ঠিক করা। আদালতের শৃঙ্খলা ঠিক রাখা, বিচারের এজলাসের শিষ্টাচার রক্ষা এবং বিশৃঙ্খলভাবে বিচারকের কাছাকাছি হওয়া থেকে বাধা দেওয়ার জন্য এরা অনেক সময় হাতে লাঠি বা চাবুক রাখতেন।

২. প্রহরী: এ শ্রেণির কাজ ছিল মানুষকে সুশৃঙ্খলভাবে আদালতে প্রবেশের ব্যবস্থা করা।

৩. সহায়ক: এদের কাজ ছিল বাদী-বিবাদীকে আদালতে উপস্থিত করা এবং শুনানি চলাকালীন বিচারকের সম্মানার্থে তাঁর সামনে উপস্থিত থাকা।

৪. দায়িত্বশীল: ইয়াতিম এবং অনুপস্থিত ব্যক্তিদের সম্পত্তি দেখাশোনা করা ছিল এদের দায়িত্ব।

৫. নিষ্ঠাবান: এরা সাক্ষী হিসেবে থাকার উদ্যোগ নিতেন। নথি এবং চুক্তির বক্তব্য লক্ষ করার পাশাপাশি তা শরীয়ত মোতাবেক হচ্ছে কি না-সেটাও খেয়াল রাখতেন।

টিকাঃ
[৯৭৫] আন-নুযুমুল কাম্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৯; তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৬

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 অন্যায় ও দুর্নীতির আদালত

📄 অন্যায় ও দুর্নীতির আদালত


বিচারক এবং বাদী-বিবাদীর মধ্যকার অভিযোগ ও মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করতে সুলতান নিজেই এই আদালতের তত্ত্বাবধান করতেন। স্বয়ং সুলতানের তত্ত্বাবধানে এই আদালত সপ্তাহে দুদিন তথা সোম এবং বৃহস্পতিবারে বসত। সুলতান এ কাজের জন্য ৬৬১ হিজরিতে আয-যাহির বাইবার্স কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত 'দারুল আদল' নামক দফতরে বসতেন। পরবর্তীকালে বড় দরবার হলে বসতে শুরু করেন।

এ আদালতে শাফিয়ি ও মালিকি মাযহাবের বিচারক বসতেন সুলতানের ডান দিকে এবং হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের বিচারক বসতেন বাম দিকে। মালিকি বিচারকের ডান দিকে বসতেন সামরিক বিচারকগণ। তাদের কাছাকাছি থাকতেন দারুল আদল এর মুফতিবৃন্দ। এরপর বাইতুল মাল তথা খিলাফতের কোষাগারের দায়িত্বশীল এবং হিসবাহর পরিচালক বসতেন। আর হাম্বলি মাযহাবের বিচারকের বাম দিকে প্রথমে মন্ত্রী, এর পরের জায়গা ছিল প্রধান মুনশির। সুলতানের পেছনে অবস্থান নিত উঠতি বয়সের মামলুকরা। বয়স্ক আর প্রবীণরা বৃত্তাকারে থাকত সুলতানের কাছাকাছি। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকত যাবতীয় কর্মচারী এবং আমিরগণ। বৃত্তের পেছনেই বিচার-সংক্রান্ত দরকারি কাগজপত্র এগিয়ে দেওয়ার জন্য থাকত দারোয়ান এবং সহকারীরা। এরপর সুলতানের কাছে অভিযোগ পেশ করা হলে সেটি নিয়ে তিনি বিচারকদের সাথে পরামর্শ করতেন। সামরিক বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় হলে সামরিক বিচারকদের সাথে আলোচনা করার পর রায় দিতেন। পরবর্তীকালে মামলুক সুলতানরা রাজ্যের রেওয়াজ হিসেবে এভাবে সাজিয়ে হলঘরে সাধারণত খুব কম সময়ই বসতেন। লোকদেরকে প্রথমে বিচারকের কাছে মোকদ্দমা নিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হতো। বিচারকরা ইনসাফ না করলে তবেই তারা সুলতানের দ্বারস্থ হতো।

টিকাঃ
[৯৭৬] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৬-১৩৭; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭১-৭৩

বিচারক এবং বাদী-বিবাদীর মধ্যকার অভিযোগ ও মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করতে সুলতান নিজেই এই আদালতের তত্ত্বাবধান করতেন। স্বয়ং সুলতানের তত্ত্বাবধানে এই আদালত সপ্তাহে দুদিন তথা সোম এবং বৃহস্পতিবারে বসত। সুলতান এ কাজের জন্য ৬৬১ হিজরিতে আয-যাহির বাইবার্স কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত 'দারুল আদল' নামক দফতরে বসতেন। পরবর্তীকালে বড় দরবার হলে বসতে শুরু করেন।

এ আদালতে শাফিয়ি ও মালিকি মাযহাবের বিচারক বসতেন সুলতানের ডান দিকে এবং হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের বিচারক বসতেন বাম দিকে। মালিকি বিচারকের ডান দিকে বসতেন সামরিক বিচারকগণ। তাদের কাছাকাছি থাকতেন দারুল আদল এর মুফতিবৃন্দ। এরপর বাইতুল মাল তথা খিলাফতের কোষাগারের দায়িত্বশীল এবং হিসবাহর পরিচালক বসতেন। আর হাম্বলি মাযহাবের বিচারকের বাম দিকে প্রথমে মন্ত্রী, এর পরের জায়গা ছিল প্রধান মুনশির। সুলতানের পেছনে অবস্থান নিত উঠতি বয়সের মামলুকরা। বয়স্ক আর প্রবীণরা বৃত্তাকারে থাকত সুলতানের কাছাকাছি। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকত যাবতীয় কর্মচারী এবং আমিরগণ। বৃত্তের পেছনেই বিচার-সংক্রান্ত দরকারি কাগজপত্র এগিয়ে দেওয়ার জন্য থাকত দারোয়ান এবং সহকারীরা। এরপর সুলতানের কাছে অভিযোগ পেশ করা হলে সেটি নিয়ে তিনি বিচারকদের সাথে পরামর্শ করতেন। সামরিক বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় হলে সামরিক বিচারকদের সাথে আলোচনা করার পর রায় দিতেন। পরবর্তীকালে মামলুক সুলতানরা রাজ্যের রেওয়াজ হিসেবে এভাবে সাজিয়ে হলঘরে সাধারণত খুব কম সময়ই বসতেন। লোকদেরকে প্রথমে বিচারকের কাছে মোকদ্দমা নিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হতো। বিচারকরা ইনসাফ না করলে তবেই তারা সুলতানের দ্বারস্থ হতো।

টিকাঃ
[৯৭৬] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩৬-১৩৭; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭১-৭৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00