📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মামলুক সাম্রাজ্যের অবসান

📄 মামলুক সাম্রাজ্যের অবসান


মুহাম্মাদ ইবনু কাতিয়াবাই ক্ষমতায় আসার পর ৯০২ হিজরিতে (১৪৯৭ খ্রি.) কানসুহ খামসুমিআহ নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন। কিন্তু সফল হননি। মুহাম্মাদ ইবনু কাতিয়াবাই ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই ৯০৪ হিজরিতে তিনি নিহত হন। তার মামা আয-যাহির কানসুহ ক্ষমতা গ্রহণের উদ্যোগ নিলেও পরবর্তীকালে অপসারিত হন। এই অস্থিতিশীল সময়ের মাঝে সুলতানদের দ্রুত পালাবদল ঘটতে থাকে। ৯০৫ হিজরিতে আল-আশরাফ জানবালাত ক্ষমতায় আসলেও পরে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। তারপর ৯০৬ হিজরিতে ক্ষমতায় আসেন আল-আদিল তুমানবাই। কিন্তু তিনিও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তাকে ক্ষমতা এবং প্রাণ-দুটোই দিতে হয়। এরপর ক্ষমতা আসে কানসুহ আল- গাউরির কাছে। এটা ৯০৬ হিজরির কথা। আল-গাউরি নিজেকে শক্তিমান এবং প্রভাবশালী প্রমাণ করতে সক্ষম হন। ফলে দেশে নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। কিন্তু অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষেত্রে তিনি সঠিক নীতির পরিচয় দিতে পারেননি।

মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণের পাশাপাশি হজের পথের প্রতি যত্নবান হয়ে কূপ এবং খাল খননের ব্যবস্থা করেছেন আল-গাউরি। পুরোনো দুর্গগুলো মেরামত করা-সহ আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর প্রতিরোধব্যবস্থা মজবুত করেন। সাহিত্য মজলিসের আয়োজনও তিনি করেছিলেন।

হিজরি নবম শতাব্দীতে তুর্কি উসমানি শক্তির অভ্যুদয় ঘটে। ৮৫৭ হিজরিতে (১৪৫৩ খ্রি.) তারা কনস্টান্টিনোপলও জয় করে ফেলে। শুরু হয় মামলুক এবং উসমানিদের সংঘর্ষ। মুখোমুখি হয় উসমানি সুলতান প্রথম সালিম এবং সুলতান কানসুহর বাহিনী। ৯২২ হিজরিতে (১৫১৬ খ্রি.) উসমানিদের ওপর হামলা করতে কানসুহ আল-গাউরি আলেপ্পো অভিমুখে রওয়ানা হন। মারজদাবিক যুদ্ধে সালিমের জয় হয়। কানসুহ আল-গাউরি মৃত্যুবরণ করেন।

আল-গাউরি যুদ্ধে গমনের সময় তুমানবাইকে কায়রোর দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। আল-গাউরির মৃত্যু এবং তার বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে ৯২২ হিজরিতে তুমানবাইকে সুলতান মনোনীত করা হয়। সৈন্যসংখ্যা কম হওয়ার পরও উসমানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ যুদ্ধে নামেন তিনি। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দের রিদানিয়াতে উসমানিদের কাছে মামলুকরা পরাজিত হয়। এই সালেই উসমানিরা মিশর দখল করে নেয়। এরপর তুমানবাইকে ফাঁসিতে ঝুলায়। তিনিই ছিলেন মিশর এবং শামের সর্বশেষ মামলুক সুলতান। তার মাধ্যমেই মামলুক সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। ক্ষমতা দখল করে নেয় উসমানিরা।

টিকাঃ
[৯৬০] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১১৪-১২২। মিশরের আব্বাসি খলিফাদের নাম জানতে তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৭৭ দ্রষ্টব্য।

মুহাম্মাদ ইবনু কাতিয়াবাই ক্ষমতায় আসার পর ৯০২ হিজরিতে (১৪৯৭ খ্রি.) কানসুহ খামসুমিআহ নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন। কিন্তু সফল হননি। মুহাম্মাদ ইবনু কাতিয়াবাই ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই ৯০৪ হিজরিতে তিনি নিহত হন। তার মামা আয-যাহির কানসুহ ক্ষমতা গ্রহণের উদ্যোগ নিলেও পরবর্তীকালে অপসারিত হন। এই অস্থিতিশীল সময়ের মাঝে সুলতানদের দ্রুত পালাবদল ঘটতে থাকে। ৯০৫ হিজরিতে আল-আশরাফ জানবালাত ক্ষমতায় আসলেও পরে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। তারপর ৯০৬ হিজরিতে ক্ষমতায় আসেন আল-আদিল তুমানবাই। কিন্তু তিনিও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তাকে ক্ষমতা এবং প্রাণ-দুটোই দিতে হয়। এরপর ক্ষমতা আসে কানসুহ আল-গাউরির কাছে। এটা ৯০৬ হিজরির কথা। আল-গাউরি নিজেকে শক্তিমান এবং প্রভাবশালী প্রমাণ করতে সক্ষম হন। ফলে দেশে নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। কিন্তু অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষেত্রে তিনি সঠিক নীতির পরিচয় দিতে পারেননি।

মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণের পাশাপাশি হজের পথের প্রতি যত্নবান হয়ে কূপ এবং খাল খননের ব্যবস্থা করেছেন আল-গাউরি। পুরোনো দুর্গগুলো মেরামত করা-সহ আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর প্রতিরোধব্যবস্থা মজবুত করেন। সাহিত্য মজলিসের আয়োজনও তিনি করেছিলেন।

হিজরি নবম শতাব্দীতে তুর্কি উসমানি শক্তির অভ্যুদয় ঘটে। ৮৫৭ হিজরিতে (১৪৫৩ খ্রি.) তারা কনস্টান্টিনোপলও জয় করে ফেলে। শুরু হয় মামলুক এবং উসমানিদের সংঘর্ষ। মুখোমুখি হয় উসমানি সুলতান প্রথম সালিম এবং সুলতান কানসুহর বাহিনী। ৯২২ হিজরিতে (১৫১৬ খ্রি.) উসমানিদের ওপর হামলা করতে কানসুহ আল-গাউরি আলেপ্পো অভিমুখে রওয়ানা হন। মারজদাবিক যুদ্ধে সালিমের জয় হয়। কানসুহ আল-গাউরি মৃত্যুবরণ করেন।

আল-গাউরি যুদ্ধে গমনের সময় তুমানবাইকে কায়রোর দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। আল-গাউরির মৃত্যু এবং তার বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে ৯২২ হিজরিতে তুমানবাইকে সুলতান মনোনীত করা হয়। সৈন্যসংখ্যা কম হওয়ার পরও উসমানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ যুদ্ধে নামেন তিনি। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দের রিদানিয়াতে উসমানিদের কাছে মামলুকরা পরাজিত হয়। এই সালেই উসমানিরা মিশর দখল করে নেয়। এরপর তুমানবাইকে ফাঁসিতে ঝুলায়। তিনিই ছিলেন মিশর এবং শামের সর্বশেষ মামলুক সুলতান। তার মাধ্যমেই মামলুক সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। ক্ষমতা দখল করে নেয় উসমানিরা।

টিকাঃ
[৯৫৯] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১০৯
[৯৬০] তারীখুল মামালিক, পৃ. কারণে কিংবা ইসলামি খিলাফতে আমদানিকারক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তাকে চড়া মূল্যে ক্রয় করে নেওয়া হয়েছে। ফলে সে দাসত্বের বন্ধনে আটকা পড়েছে।

২. মামলুকরা ছিল বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ। অনেক সময় তাদের বংশপরিচয় অজানা থাকত। তবে তাদের মাঝে কল্যাণ থাকত। সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করিয়ে তাদেরকে কাজে লাগানো, ব্যবস্থাপনার সংরক্ষণ এবং শাসনের প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদের আমদানি করা হতো। একসময় তারা শক্তিশালী ক্ষমতার কারণে শাসনকার্য দখলে নিয়ে ফেলে।

৩. মামলুক শাসনামল ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমত: বাহরি মামলুক শাসনামল। এ শাসনামলের মামলুকদের অধিকাংশই ছিল তুর্কি বংশোদ্ভূত। নিজের মধ্যে থাকা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জোরেই আইয়ুবিদের পর তারা ক্ষমতা পরিচালনা করে। ৬৪৮-৭৮৪ হিজরি অবধি প্রায় দেড় যুগ তারা মিশর এবং শাম অঞ্চল শাসন করেছিল। সেখানে থাকা যাবতীয় প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং মোঙ্গল আর ক্রুসেডারদের মতো বাইরের শক্তির মোকাবিলাও তারা করেছিল। দ্বিতীয়ত: সারকাশি বা বুরজি মামলুক শাসনামল। ৭৮৪-৯২২ হিজরি পর্যন্ত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তারা শাম অঞ্চল, মিশর এবং এর আশেপাশের অঞ্চল শাসন করেছিল। অবশেষে ১৫১৬-১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে উসমানিরা মিশর এবং শাম অঞ্চল দখল করে নেয়। স্থান দুটিতে মামলুক শাসনামল ছিল আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে।

৪. মামলুকদের ইতিহাসে বিশেষত তাদের শাসনামলের শেষাংশের সুস্পষ্ট উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ব্যবস্থাপনার প্রাণ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, কলহ-বিবাদ, ফিতনা এবং আঞ্চলিক মামলুকদের মাঝে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। মামলুকদের মাঝে উত্তরাধিকারসূত্রে রাজত্ব লাভের রীতি প্রচলিত ছিল না। তা সত্ত্বেও দেখা যেত, তাদের অধিকাংশ সুলতানই নিজের ছেলেকে উত্তরাধিকারী করার বাইয়াত নিতেন। অনেক সময় সন্তান ছোট হওয়ার কারণে দায়িত্ব পালন করতে পারত না। বড় বড় আমিররা তখন ক্ষমতা দখল করে রাজ্য পরিচালনা করত। এমনটা প্রায়ই ঘটত।

৫. মামলুক সাম্রাজ্যের এবং সুলতানদের মাঝে ছিল নানারকম বৈপরীত্য। তাদের কেউ কেউ ইসলাম, মুসলিম এবং দেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে বিশৃঙ্খলা করতে সচেষ্ট ছিল। আবার অনেকেই মনেপ্রাণে ইসলাম কবুল করেছিল। তাদের ইসলাম ছিল যথার্থ। সততা এবং বিশ্বস্ততার সাথে তারা ইসলামের দাওয়াতে নিয়োজিত ছিল। জ্ঞানার্জন এবং প্রচার-প্রসারে তাদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে তারা ছিলেন অগ্রগামী।

৬. সকল ক্ষেত্রে মামলুক সুলতানরাই প্রকৃত ক্ষমতা সংরক্ষণ করতেন। আব্বাসি খলিফারা ছিলেন কেবল নামকা-ওয়াস্তে। মামলুক আমিররা ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং পালাবদল নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। সুলতান অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে আমিররা অনেক সময় তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। সুলতানকে হত্যা করে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতেও আমিরদের দ্বিধা ছিল না। ফলে অনেক সময় দেখা গেছে, কোনো কোনো সুলতানের ক্ষমতা দুই মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি।

৭. মামলুক সাম্রাজ্যে অনেকগুলো বিশেষ পদ এবং স্বতন্ত্র প্রশাসনিক পদবি চালু করা হয়েছিল। যেমন 'নায়েবুস সালতানাহ' বলে একটা পদবি ছিল, যার অধিকারীকে সুলতানের প্রতিনিধির সমপর্যায়ের বলে ধরা হয়। 'আল-আইমান'-এর কাজ ছিল রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনায় সুলতানকে সহযোগিতা করা। এ ছাড়াও সিদ্ধান্ত প্রকাশ, উপাধি প্রদান, জায়গীর বণ্টন এবং বড় বড় পদে নিয়োগ দানে তিনি সুলতানের পাশে থাকতেন। মামলুক সাম্রাজ্যের সাধারণ সেনাপতিকে 'আল-আতাবাক' বলা হতো। রাজ্যের ওপর তিনি একচেটিয়া অধিকার রাখতেন। সুলতান বা সুলতানের নায়েবের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা এবং অর্থনৈতিক দিকটির প্রতি লক্ষ রাখা ছিল উজির বা মন্ত্রীর দায়িত্ব। মামলুক সাম্রাজ্যের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রশাসকদের বড় ভূমিকা ছিল। এ যুগের রাজ্যপালের দায়িত্ব পালনের জন্য তারা আমির নির্বাচন করে দিতেন। এদের মাঝে সর্বোচ্চ ক্ষমতা রাখতেন কায়রোর প্রশাসক। রাষ্ট্রের জনহিতকর কাজ পরিচালনার জন্য কিছু দপ্তর ছিল। যেমন সামরিক বাহিনীর দপ্তর, রচনার দপ্তর, ওয়াকফ দপ্তর, সম্পদ নজরদারির দপ্তর এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের দপ্তর।

টিকাঃ
[৯৬১] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১
[৯৬২] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৬৭
[৯৬৩] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩০-১৩৪

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মামলুক সাম্রাজ্যের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক

📄 মামলুক সাম্রাজ্যের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক


এখানে ইতিহাস থেকে জানতে পারা মামলুক সাম্রাজ্যের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক নিয়ে আলোচনা করা হবে।

১. মামলুক শব্দটি ইসলামের ইতিহাসে একটি বিশেষ পরিভাষা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এমন শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাস, যুদ্ধবন্দি হওয়ার-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৪৫৭
[৯৫৪] শাইখ ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান। শাইখুল ইসলাম আল-বুলকিনির সূত্রে তিনি সহিহুল বুখারির ইজাযাহ পেয়েছিলেন। হাফিজ ইবনু হাজার তার আল-মুজামুল মুফাহরাস গ্রন্থে শাইখের জীবনী সংকলন করেছেন। ৮২৪ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়। দেখুন, হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১২০।
[৯৫5] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৭২; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১২০
[৯৫৬] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৯৮
[৯৫৭] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১০১-১০২
[৯৫৮] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১০৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00