📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মামলুক সাম্রাজ্যের সূচনা

📄 মামলুক সাম্রাজ্যের সূচনা


মামলুক সাম্রাজ্যের কার্যত সূচনা হয়েছিল সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মৃত্যুর পর। তখন সালাহুদ্দিনের ছেলে, ভাই এবং আত্মীয়রা বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল। আইয়ুবি আমিরদের প্রত্যেকেই নিজেদের পদ রক্ষার্থে কিংবা দল ভারী করতে মামলুকদের পছন্দসই গ্রুপকে বেছে নিতে থাকে। অবশ্য মামলুকদের আমদানি এবং ক্রয়ের পেছনে তাদের উদ্দেশ্যই ছিল প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে কাজে লাগানো।

হিজরি সপ্তম শতাব্দী মোতাবেক আইয়ুবি সাম্রাজ্যে মামলুকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাদের পক্ষে জনশ্রুতি শোনা যেতে থাকে। দ্বিতীয় আল-মালিকুল আদিলকে সরিয়ে আস-সালিহ নাজমুদ্দিন আইয়ুবকে বসাতে সক্ষম হয় তারা। নাজমুদ্দিন তার ওপর মামলুকদের অনুগ্রহ উপলব্ধি করেন। মিশরে তার রাজত্ব শক্তিশালীকরণ এবং সংরক্ষণের কথা চিন্তা করে তিনি অধিক হারে মামলুক ক্রয় করতে থাকেন। নীলনদের মাঝামাঝি 'রাওদ্বাহ' নামক দ্বীপে তাদের বসবাসের সুযোগ করে দেন। ইতিহাসে এরা 'বাহরি মামলুক' নামে পরিচিত। যাদের বেশির ভাগই ছিল তুর্কি, মোঙ্গল এবং অন্যান্য জাতিভুক্ত।

মামলুকরা অন্যান্য আরব মুসলিমদের সাথে ক্রুসেডারদের হামলার শিকার হয়েছিল। ৬৪২ হিজরিতে (১২৪৪খ্রি.) তারা ক্রুসেডারদের থেকে দ্বিতীয়বারের মতো বাইতুল মাকদিস জয় করতে সক্ষম হয়। এরপর ৬৪৮ হিজরিতে তারা নবম লুইসের বিরুদ্ধে জয় লাভ করে। সে-বছরই মামলুক আমিরদের হাতে তুরান শাহ নিহত হওয়ার মাধ্যমে আইয়ুবি শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এ কাজের অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন বাইবার্স আল-বুন্দুকদারি, কালাউন আস-সালিহি এবং আকতাই আল-জামদার। মামলুকরা ক্ষমতা দখল করে তুর্কি বংশোদ্ভূত শাজারাতুদ দুরকে নিজেদের সম্রাজ্ঞী নিয়োগ দেয়। ইতিহাসবিদ আল-মাকরিযি তাকে মিশরে মামলুক সাম্রাজ্যের প্রথম শাসক আখ্যায়িত করেছেন। কয়েক মাস পর সম্রাজ্ঞী ক্ষমতা হস্তান্তর করেন সেনাপতি আইবাক আল-আতাবাকের কাছে। এভাবে তিনি সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হন।

টিকাঃ
[৯৩৯] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৫
[৯৪০] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৮

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 প্রসিদ্ধ মামলুক শাসকগণ

📄 প্রসিদ্ধ মামলুক শাসকগণ


আমরা এখানে মামলুক সুলতানদের তালিকা এবং তাদের রেখে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কীর্তির কথা উল্লেখ করব।

১. প্রথম শাসক ছিলেন সুলতান মুইয আইবাক আল-আতাবাক। তাঁর শাসনকাল শুরু হয় ৬৪৮ হিজরিতে (১২৫০ খ্রি.)। ১২৫৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নিহত হন।

২. সুলতান আল-মানসুর আলি ইবনু আইবাক। ৬৫৫ হিজরিতে (১২৫৭ খ্রি.) শুরু করা শাসনকার্য দুই বছর স্থায়ী ছিল। তাঁর সময়ে (৬৫৬ হিজরিতে) মোঙ্গলরা বাগদাদ দখলে নেয় এবং সর্বশেষ আব্বাসি খলিফা আল-মুসতাসিম বিল্লাহকে হত্যা করে।

৩. আল-মুযাফফার কুতুয। ৬৫৭ হিজরির (১২৫৯ খ্রি.) শেষদিকে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৬৫St হিজরিতে সংঘটিত আইনে জালুতের যুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বেই বিজয় অর্জিত হয়। মোঙ্গলদের প্রতিহত করে শাম এবং মিশরের বাহিনীকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি শামের ওপর মামলুক সাম্রাজ্যের ক্ষমতা বিস্তার করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি বলেছেন, 'কুতুয না কুলীন ছিলেন, আর না কাফির বংশোদ্ভূত ছিলেন। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ৬৫St হিজরিতে (১২৬০ খ্রি.) বাইবার্স তাঁকে হত্যা করেন।

৪. আল-মালিকুয যাহির বাইবার্স ৬৫St হিজরিতে ক্ষমতায় আসেন। আব্বাসি খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তিনি কাজ করেছেন। তিনি আহমাদ ইবনুয যাহিরকে খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এরপর তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে তার উপাধি দিয়েছিলেন আল-মুসতানসির বিল্লাহ। আহমাদ ছিলেন তাতারীদের হাতে নিহত হওয়া আব্বাসি খলিফা আল-মুসতাসিমের চাচা এবং খলিফা আল-মুসতানসিরের ভাই। ৬৫৯ হিজরিতে বিচারক, আলিম এবং সাধারণ মানুষ তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে। এদের সর্বাগ্রে ছিলেন আল-ইয ইবনু আবদিস সালাম।

মোঙ্গলদের হাত থেকে বাগদাদ পুনরুদ্ধার করে আব্বাসি খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য খলিফা যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কিন্তু তাতে মোঙ্গলরা জয়ী হয়। খলিফা-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ 'হিত' নামক স্থানে নিহত হন। বাইবার্স এরপর আবুল আব্বাস আহমাদের হাতে খিলাফতের বাইয়াতের ঘোষণা দিয়ে তার উপাধি দেন আল- হাকিম বি আমরিল্লাহ। ৬৬২ হিজরিতে (১২৬৩ খ্রি.) তিনি খলিফার অধীনে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। মামলুক যুগের সময়টাতে আব্বাসি খিলাফত কেবল মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিল। খলিফা সর্বজনীন বিষয়ের দায়িত্ব সুলতানকে প্রদান করলে তিনি প্রশাসনের যাবতীয় বিষয় নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করতেন।

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বাইবার্স দীর্ঘ দশ বছর (৬৫৯-৬৬৯ হি.) যুদ্ধ করেছেন। প্রতিবারই তিনি জয়ী হয়েছেন। শামের পবিত্র ভূমি ক্রুসেডারদের দখলদারিত্ব থেকে পবিত্র করেন। মুসলিমদের বিরুদ্ধে আর্মেনিয়ানরা মোঙ্গলদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। বাইবার্স তাদের বিরুদ্ধেও তৎপর ছিলেন। ৬৬২ হিজরিতে (১২৬৩ খ্রি.) তিনি খলিফার অধীনে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। মামলুক যুগের সময়টাতে আব্বাসি খিলাফত কেবল মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিল। খলিফা সর্বজনীন বিষয়ের দায়িত্ব সুলতানকে প্রদান করলে তিনি প্রশাসনের যাবতীয় বিষয় নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করতেন।

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বাইবার্স দীর্ঘ দশ বছর (৬৫৯-৬৬৯ হি.) যুদ্ধ করেছেন। প্রতিবারই তিনি জয়ী হয়েছেন। শামের পবিত্র ভূমি ক্রুসেডারদের দখলদারিত্ব থেকে পবিত্র করেন। মুসলিমদের বিরুদ্ধে আর্মেনিয়ানরা মোঙ্গলদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। বাইবার্স তাদের বিরুদ্ধেও তৎপর ছিলেন। অবশেষে ৬৬৫ হিজরিতে (১২৬৬ খ্রি.) আর্মেনিয়ার মাটিতেই তারা পরাজিত হয়।

বাইবার্স বিশেষ করে পারসিক মোঙ্গলদের ধাওয়া করেছিলেন। তারা ছিল হালাকু খাঁ'র বাহিনী এবং তার বংশধর। এরই রেশ ধরে তিনি রোমান সেলজুকদের ধাওয়া করতে থাকেন।

৬৭৬ হিজরিতে (১২৭৭ খ্রি.) তিনি দামিস্কে মৃত্যুবরণ করেন। মামলুক সাম্রাজ্যের সুরক্ষার জন্য উদ্যোগ নেওয়ায় তাকে এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলে গণ্য করা হয়। ছেলে আল-মালিকুস সাঈদ বারাকাহকে তিনি সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার হিসেবে মনোনীত করে গিয়েছিলেন।

৫. আল-মালিকুস সাঈদ বারাকাহ ৬৭৬ হিজরিতে (১২৭৭ খ্রি.) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু কিছু সময় পর আমিররা মিশরের কিল্লায় আটকে রেখে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। এটা ৬৭৮ হিজরির কথা।

৬. বাইবার্সের দ্বিতীয় পুত্র আমির বাদরুদ্দিন সালামিশ ৬৭৮ হিজরিতে (১২৭৯ খ্রি.) আল-মালিকুল আমিন উপাধি নিয়ে শাসক নিযুক্ত হন। কালাউন আল- আলফি আতাবাকা তখন ক্ষমতার ভাবী উত্তরাধিকারী এবং সেনাপতি হয়ে ওঠেন।

৭. মাত্র তিন মাস পরেই সালামিশকে পদচ্যুত করে নিজেই ক্ষমতা গ্রহণ করেন (৬৭৮ হি.) আমির সাইফুদ্দিন আল-মানসুর কালাউন। তার বয়স তখনো সাত পার হয়নি। এক শতাব্দীরও বেশি সময় (৬৮৭-৭৮৪ হি.) ক্ষমতা কালাউনের পরিবার এবং বংশধরদের মাঝে থাকে। তখন ছিল উৎকর্ষের স্বর্ণযুগ। শক্তি এবং সম্মানের পাশাপাশি স্থিতি ও শান্তির যুগ। আল-মানসুর ক্ষমতায় ছিলেন ৬৮৯ হিজরি (১২৯০ খ্রি.) পর্যন্ত। রাজস্ব সঞ্চয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল নির্মাণ এবং দুর্গ সংস্কার ছিল তার উজ্জ্বল কীর্তি। ক্রুসেডার এবং মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। অনেক মামলুক ক্রয় করে তাদের সমন্বয়ে বিশেষ সামরিক বাহিনী তৈরি করেছেন। এদের থাকার ব্যবস্থা বুরুজ বা দুর্গে করা হয়েছিল বিধায় তাদের 'বুরজি মামলুক' বলা হয়। নিজের জীবদ্দশাতেই (৬৭৯ হি.) তিনি তার ছেলে আল-মালিকুস সালিহ আলাউদ্দিনকে সুলতান মনোনীত করেন।

৮. ৬৮৭ হিজরিতে (১২৮৮ খ্রি.) বাবার জীবদ্দশাতেই আলাউদ্দিনের মৃত্যু হয়। এরপর কালাউনও মৃত্যুবরণ করলে ৬৯০ হিজরিতে ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হন তার ছেলে আশরাফ খলিল। তিনি ক্রুসেডারদের সর্বশেষ এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ 'আক্কা' জয় করেন। শামে থাকা অবশিষ্ট ক্রুসেডারদেরও বিতাড়িত করেন। ৬৯৩ হিজরিতে (১২৯৩ খ্রি.) আমিরদের হাতে তাকে প্রাণ দিতে হয়।

৯. ৬৯৩ হিজরিতে আল-মালিকুন নাসির মুহাম্মাদ ইবনু কালাউনকে সুলতান নিযুক্ত করা হয়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। এ সুযোগে রাজ্যের যাবতীয় বিষয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করতে থাকে আমির সানজার আল-বিকায়ি এবং আমির কিতবুগা আল-মানসুরি।

১০. ৬৯৪ হিজরিতে (১২৯৪ খ্রি.) আন-নাসির মুহাম্মাদকে পদচ্যুত করে আমির কিতবুগা ক্ষমতা দখল করেন। মোঙ্গল বংশোদ্ভূত কিতবুগার আগমন ঘটেছিল তাতারিদের হাতে বন্দি হয়ে। ক্ষমতা দখলের পর তিনি 'আল- মালিকুল আদিল' উপাধি গ্রহণ করেন।

১১. কিতবুগাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন আমির হুসামুদ্দিন লাজিন। কিতবুগা পালিয়ে আশ্রয় নেন শামে। ৬৯৬ হিজরিতে (১২৯৬ খ্রি.) তিনি পদত্যাগ করলে হুসামুদ্দিন লাজিন আল-মানসুরি নিজেকে সুলতান বলে ঘোষণা দেন। আমিররা তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে। 'আস-সুলতানুল মানসুর' উপাধি গ্রহণ করে তিনি শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ৬৯৮ হিজরিতে (১২৯৮ খ্রি.) দুর্গেই নিহত হন তিনি।

১২. মুহাম্মাদ ইবনু নাসিরকে কারাক থেকে মিশরে ডেকে নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় বসানো হয়। দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতাগ্রহণের সময় তার বয়স ছিল ১৪ বছর। ৬৯৮-৭০৮ হিজরি পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। মামলুক সাম্রাজ্য তখন একাধিক বার মোঙ্গলদের হামলার শিকার হলেও শেষ অবধি মামলুকরাই জয়ী হয়। এরপর আন-নাসির মুহাম্মাদ পদত্যাগ করেন।

১৩. ৭০৮ হিজরিতে (১৩০৮ খ্রি.) আস-সুলতানুল মুযাফফার বাইবার্স আল-জাশানকির ক্ষমতায় আসেন।

১৪. ৭০৯ হিজরিতে আন-নাসির মুহাম্মাদ তৃতীয়বারের মতো। অবশেষে ৬৬৫ হিজরিতে (১২৬৬ খ্রি.) আর্মেনিয়ার মাটিতেই তারা পরাজিত হয়।

বাইবার্স বিশেষ করে পারসিক মোঙ্গলদের ধাওয়া করেছিলেন। তারা ছিল হালাকু খাঁ'র বাহিনী এবং তার বংশধর। এরই রেশ ধরে তিনি রোমান সেলজুকদের ধাওয়া করতে থাকেন।

৬৭৬ হিজরিতে (১২৭৭ খ্রি.) তিনি দামিস্কে মৃত্যুবরণ করেন। মামলুক সাম্রাজ্যের সুরক্ষার জন্য উদ্যোগ নেওয়ায় তাকে এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলে গণ্য করা হয়। ছেলে আল-মালিকুস সাঈদ বারাকাহকে তিনি সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার হিসেবে মনোনীত করে গিয়েছিলেন।

৫. আল-মালিকুস সাঈদ বারাকাহ ৬৭৬ হিজরিতে (১২৭৭ খ্রি.) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু কিছু সময় পর আমিররা মিশরের কিল্লায় আটকে রেখে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। এটা ৬৭৮ হিজরির কথা।

৬. বাইবার্সের দ্বিতীয় পুত্র আমির বাদরুদ্দিন সালামিশ ৬৭৮ হিজরিতে (১২৭৯ খ্রি.) আল-মালিকুল আমিন উপাধি নিয়ে শাসক নিযুক্ত হন। কালাউন আল- আলফি আতাবাকা তখন ক্ষমতার ভাবী উত্তরাধিকারী এবং সেনাপতি হয়ে ওঠেন।

৭. মাত্র তিন মাস পরেই সালামিশকে পদচ্যুত করে নিজেই ক্ষমতা গ্রহণ করেন (৬৭৮ হি.) আমির সাইফুদ্দিন আল-মানসুর কালাউন। তার বয়স তখনো সাত পার হয়নি। এক শতাব্দীরও বেশি সময় (৬৮৭-৭৮৪ হি.) ক্ষমতা কালাউনের পরিবার এবং বংশধরদের মাঝে থাকে। তখন ছিল উৎকর্ষের স্বর্ণযুগ। শক্তি এবং সম্মানের পাশাপাশি স্থিতি ও শান্তির যুগ। আল-মানসুর ক্ষমতায় ছিলেন ৬৮৯ হিজরি (১২৯০ খ্রি.) পর্যন্ত। রাজস্ব সঞ্চয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল নির্মাণ এবং দুর্গ সংস্কার ছিল তার উজ্জ্বল কীর্তি। ক্রুসেডার এবং মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। অনেক মামলুক ক্রয় করে তাদের সমন্বয়ে বিশেষ সামরিক বাহিনী তৈরি করেছেন। এদের থাকার ব্যবস্থা বুরুজ বা দুর্গে করা হয়েছিল বিধায় তাদের 'বুরজি মামলুক' বলা হয়। নিজের জীবদ্দশাতেই (৬৭৯ হি.) তিনি তার ছেলে আল-মালিকুস সালিহ আলাউদ্দিনকে সুলতান মনোনীত করেন।

৮. ৬৮৭ হিজরিতে (১২৮৮ খ্রি.) বাবার জীবদ্দশাতেই আলাউদ্দিনের মৃত্যু হয়। এরপর কালাউনও মৃত্যুবরণ করলে ৬৯০ হিজরিতে ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হন তার ছেলে আশরাফ খলিল। তিনি ক্রুসেডারদের সর্বশেষ এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ 'আক্কা' জয় করেন। শামে থাকা অবশিষ্ট ক্রুসেডারদেরও বিতাড়িত করেন। ৬৯৩ হিজরিতে (১২৯৩ খ্রি.) আমিরদের হাতে তাকে প্রাণ দিতে হয়।

৯. ৬৯৩ হিজরিতে আল-মালিকুন নাসির মুহাম্মাদ ইবনু কালাউনকে সুলতান নিযুক্ত করা হয়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। এ সুযোগে রাজ্যের যাবতীয় বিষয়ে স্বেচ্ছাচারিতা করতে থাকে আমির সানজার আল-বিকায়ি এবং আমির কিতবুগা আল-মানসুরি।

১০. ৬৯৪ হিজরিতে (১২৯৪ খ্রি.) আন-নাসির মুহাম্মাদকে পদচ্যুত করে আমির কিতবুগা ক্ষমতা দখল করেন। মোঙ্গল বংশোদ্ভূত কিতবুগার আগমন ঘটেছিল তাতারিদের হাতে বন্দি হয়ে। ক্ষমতা দখলের পর তিনি 'আল- মালিকুল আদিল' উপাধি গ্রহণ করেন।

১১. কিতবুগাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন আমির হুসামুদ্দিন লাজিন। কিতবুগা পালিয়ে আশ্রয় নেন শামে। ৬৯৬ হিজরিতে (১২৯৬ খ্রি.) তিনি পদত্যাগ করলে হুসামুদ্দিন লাজিন আল-মানসুরি নিজেকে সুলতান বলে ঘোষণা দেন। আমিররা তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে। 'আস-সুলতানুল মানসুর' উপাধি গ্রহণ করে তিনি শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন। একুশ বছর বয়সে ক্ষমতা গ্রহণ করে মোট ৩১ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এটাই ছিল মামলুক সুলতানদের মধ্যে সর্বাধিক দীর্ঘ শাসনামল। এ সময়েই সর্বাধিক উৎকর্ষ সাধিত হয়। ইসলামের প্রাণকেন্দ্র হিজাজ পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তার লাভ করে। মসজিদ, সেতু-সহ অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেন তিনি। আন-নাসির এত অধিক পরিমাণে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন যে, ৭৪১ হিজরিতে তার ইন্তেকালের পর মানুষ তার বংশধরদেরও ক্ষমতায় রাখে। ৭৮৪ হিজরি (১৩৮২ খ্রি.) পর্যন্ত আন-নাসিরের বংশধররা ক্ষমতায় থাকেন।

১৫. তারপর ক্ষমতায় আসেন আমির সাইফুদ্দিন আবু বকর ইবনু মুহাম্মাদ। যার উপাধি 'ছিল আল-মালিকুল মানসুর'। পরবর্তী ২০ বছর আন-নাসিরের সাতজন ছেলে এবং তার পরের ২০ বছর চারজন নাতি ক্ষমতায় ছিলেন।

১৬. অবশেষে বাহরি মামলুকদের থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয় বুরজি মামলুকরা। তাদের ক্ষমতার গোড়াপত্তন হয়। সারকাশি বা দ্বিতীয় মামলুক সাম্রাজ্যের সূচনা ঘটে। এদের প্রথম সুলতান ছিলেন 'আয-যাহির' উপাধি গ্রহণকারী বারকুক। ৭৮৪-৮২২ হিজরি (১৩৮২-১৪১৭ খ্রি.) পর্যন্ত ১৩৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে বহাল থাকা এই সাম্রাজ্যে ৩২ জন সুলতান ক্ষমতায় ছিলেন। এদের মাঝে দশজনের শাসনকাল ছিল সর্বমোট ১০৩ বছর। এরা হচ্ছেন বারকুক, ফারাজ, শাইখ, তাতার, বার্সবাই, জাকমাক, ঈনাল, খুশকাদাম, কাতিয়াবাই এবং কানসুহ আল-গাউরি। সাহিত্য এবং জ্ঞানের আসর জমানোর কারণে তাদের কেউ কেউ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। কারও কারও পরিচিতি ছিল তাকওয়ার কারণে। মসজিদ, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট নির্মাণ-সহ নানাধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ তারা করেছিলেন।

সারকাশি মামলুকদের শক্তি অনেক প্রবল থাকায় তারা তৈমুর লঙের বিরুদ্ধে দৃঢ়পদ থাকতে পেরেছিল। শাম, মিশর এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে তৈমুর লঙের বিরুদ্ধে লড়াই করে। সুলতান বারকুক বাগদাদ উদ্ধারের জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন। অবশেষে ৭৯৬ হিজরিতে (১৩৯৪ খ্রি.) বাগদাদ সারকাশি মামলুক সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। ৮০২ হিজরিতে (১৩৯৯ খ্রি.) সুলতান বারকুক মৃত্যুবরণ করেন।

১৭. বারকুকের পর ক্ষমতায় বসানো হয় আন-নাসির ফারাজকে। এরপর পদচ্যুত করা হয় তাকে। শামে তৈমুর লঙকে প্রতিহত করতে তিনি ব্যর্থ হলে সে দামিস্ক-সহ অন্যান্য অঞ্চল দখল করে নেয়। ৮১৫ হিজরিতে (১৪১২ খ্রি.) ফারাজ নিহত হন। আর তৈমুর লঙ মারা যায় ৮০৮ হিজরিতে।

১৮. ৮১৫ হিজরিতে (১৪১২ খ্রি.) ক্ষমতা গ্রহণ করেন আব্বাসি খলিফা আল-মুসতাইন বিল্লাহ। কিন্তু পাঁচ মাস পরেই আল-মুআইয়াদ তার থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন। ৮২৪ হিজরিতে আল-মুআইয়াদের মৃত্যু হয়। এরপর তাতারের তত্ত্বাবধানে মুআইয়াদ-পুত্র আহমাদকে পিতার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। তারপর তাতার অল্প কিছু সময় শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তাতারের পর তার ছেলে পুত্র মুহাম্মাদ কয়েক মাস ক্ষমতায় থাকেন।

১৯. আস-সুলতানুল আশরাফ বার্সবাই ৮২৫ হিজরিতে (১৪২২ খ্রি.) ক্ষমতায় আসেন। ১৬ বছর শাসন করেন তিনি। সাইপ্রাস দ্বীপ তার শাসনামলেই বিজিত হয়। মামলুক সাম্রাজ্যের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত সেটা তাদের দখলেই ছিল। তবে বার্সবা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম বিপথগামী ছিলেন। তার শাসনামল ছিল ৮৪১ হিজরি পর্যন্ত।

২০. আয-যাহির জাকমাক ক্ষমতায় ছিলেন ৮৪২-৮৫৭ হিজরি পর্যন্ত। তিনিকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ৬৯৮ হিজরিতে (১২৯৮ খ্রি.) দুর্গেই নিহত হন তিনি।

১২. মুহাম্মাদ ইবনু নাসিরকে কারাক থেকে মিশরে ডেকে নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় বসানো হয়। দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতাগ্রহণের সময় তার বয়স ছিল ১৪ বছর। ৬৯৮-৭০৮ হিজরি পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। মামলুক সাম্রাজ্য তখন একাধিক বার মোঙ্গলদের হামলার শিকার হলেও শেষ অবধি মামলুকরাই জয়ী হয়। এরপর আন-নাসির মুহাম্মাদ পদত্যাগ করেন।

১৩. ৭০৮ হিজরিতে (১৩০৮ খ্রি.) আস-সুলতানুল মুযাফফার বাইবার্স আল-জাশানকির ক্ষমতায় আসেন।

১৪. ৭০৯ হিজরিতে আন-নাসির মুহাম্মাদ তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতা গ্রহণ করেন। একুশ বছর বয়সে ক্ষমতা গ্রহণ করে মোট ৩১ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এটাই ছিল মামলুক সুলতানদের মধ্যে সর্বাধিক দীর্ঘ শাসনামল। এ সময়েই সর্বাধিক উৎকর্ষ সাধিত হয়। ইসলামের প্রাণকেন্দ্র হিজাজ পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তার লাভ করে। মসজিদ, সেতু-সহ অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেন তিনি। আন-নাসির এত অধিক পরিমাণে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন যে, ৭৪১ হিজরিতে তার ইন্তেকালের পর মানুষ তার বংশধরদেরও ক্ষমতায় রাখে। ৭৮৪ হিজরি (১৩৮২ খ্রি.) পর্যন্ত আন-নাসিরের বংশধররা ক্ষমতায় থাকেন।

১৫. তারপর ক্ষমতায় আসেন আমির সাইফুদ্দিন আবু বকর ইবনু মুহাম্মাদ। যার উপাধি 'ছিল আল-মালিকুল মানসুর'। পরবর্তী ২০ বছর আন-নাসিরের সাতজন ছেলে এবং তার পরের ২০ বছর চারজন নাতি ক্ষমতায় ছিলেন।

১৬. অবশেষে বাহরি মামলুকদের থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয় বুরজি মামলুকরা। তাদের ক্ষমতার গোড়াপত্তন হয়। সারকাশি বা দ্বিতীয় মামলুক সাম্রাজ্যের সূচনা ঘটে। এদের প্রথম সুলতান ছিলেন 'আয-যাহির' উপাধি গ্রহণকারী বারকুক। ৭৮৪-৮২২ হিজরি (১৩৮২-১৪১৭ খ্রি.) পর্যন্ত ১৩৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে বহাল থাকা এই সাম্রাজ্যে ৩২ জন সুলতান ক্ষমতায় ছিলেন। এদের মাঝে দশজনের শাসনকাল ছিল সর্বমোট ১০৩ বছর। এরা হচ্ছেন বারকুক, ফারাজ, শাইখ, তাতার, বার্সবাই, জাকমাক, ঈনাল, খুশকাদাম, কাতিয়াবাই এবং কানসুহ আল-গাউরি। সাহিত্য এবং জ্ঞানের আসর জমানোর কারণে তাদের কেউ কেউ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। কারও কারও পরিচিতি ছিল তাকওয়ার কারণে। মসজিদ, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট নির্মাণ-সহ নানাধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ তারা করেছিলেন।

সারকাশি মামলুকদের শক্তি অনেক প্রবল থাকায় তারা তৈমুর লঙের বিরুদ্ধে দৃঢ়পদ থাকতে পেরেছিল। শাম, মিশর এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে তৈমুর লঙের বিরুদ্ধে লড়াই করে। সুলতান বারকুক বাগদাদ উদ্ধারের জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন। অবশেষে ৭৯৬ হিজরিতে (১৩৯৪ খ্রি.) বাগদাদ সারকাশি মামলুক সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। ৮০২ হিজরিতে (১৩৯৯ খ্রি.) সুলতান বারকুক মৃত্যুবরণ করেন।

১৭. বারকুকের পর ক্ষমতায় বসানো হয় আন-নাসির ফারাজকে। এরপর পদচ্যুত করা হয় তাকে। শামে তৈমুর লঙকে প্রতিহত করতে তিনি ব্যর্থ হলে সে দামিস্ক-সহ অন্যান্য অঞ্চল দখল করে নেয়। ৮১৫ হিজরিতে (১৪১২ খ্রি.) ফারাজ নিহত হন। আর তৈমুর লঙ মারা যায় ৮০৮ হিজরিতে।

১৮. ৮১৫ হিজরিতে (১৪১২ খ্রি.) ক্ষমতা গ্রহণ করেন আব্বাসি খলিফা আল-মুসতাইন বিল্লাহ। কিন্তু পাঁচ মাস পরেই আল-মুআইয়াদ তার থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন। ৮২৪ হিজরিতে আল-মুআইয়াদের মৃত্যু হয়। এরপর তাতারের তত্ত্বাবধানে মুআইয়াদ-পুত্র আহমাদকে পিতার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। তারপর তাতার অল্প কিছু সময় শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তাতারের পর তার ছেলে পুত্র মুহাম্মাদ কয়েক মাস ক্ষমতায় থাকেন।

১৯. আস-সুলতানুল আশরাফ বার্সবাই ৮২৫ হিজরিতে (১৪২২ খ্রি.) ক্ষমতায় আসেন। ১৬ বছর শাসন করেন তিনি। সাইপ্রাস দ্বীপ তার শাসনামলেই বিজিত হয়। মামলুক সাম্রাজ্যের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত সেটা তাদের দখলেই ছিল। তবে বার্সবা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম বিপথগামী ছিলেন। তার শাসনামল ছিল ৮৪১ হিজরি পর্যন্ত।

২০. আয-যাহির জাকমাক ক্ষমতায় ছিলেন ৮৪২-৮৫৭ হিজরি পর্যন্ত। তিনি ছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাকওয়া-পরহেজগারিতে তার খ্যাতি ছিল। মদপান-সহ যাবতীয় নাফরমানির কাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি রোডস দ্বীপ অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন।

২১. ৭৫৮ হিজরিতে (১৪৫৩ খ্রি.) আস-সুলতানুল আশরাফ ঈনাল ক্ষমতায় বসেন। ৭৬৫ হিজরি অবধি মোট আট বছর তার শাসনামল বহাল ছিল। এরপর ধারাবাহিক কয়েকজন মামলুক সুলতানের হাতে ক্ষমতার অদল-বদল হয়। যা থেকে রাজ্যের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বুঝে আসে। অবশেষে কাতিয়াবাই ক্ষমতা গ্রহণ করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

২২. আস-সুলতানুল আশরাফ কাতিয়াবাই ৮৭২-৯০১ হিজরি অবধি মোট ১৯ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন। সুলতান মুহাম্মাদ ইবনু কালাউনের যুগের পর এটাই ছিল সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ শাসনকাল। কাতিয়াবাই প্রমাণ করেছিলেন যে-যুদ্ধের ময়দানে, সাহসিকতার ক্ষেত্রে, প্রজ্ঞায় এবং পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে তিনিই সেরা। সুলতান আশরাফ উসমানি সমর্থিত তুর্কমান সাম্রাজ্যে হামলা করে তাদের ওপর কর ধার্য করেন। স্থাপনা, রাস্তাঘাট, মসজিদ এবং সেতু নির্মাণ, সেনাবাহিনী প্রস্তুতকরণ, নিদর্শনাবলি সংস্কার এবং স্থাপত্য শিল্পের প্রতি গুরুত্বারোপের জন্য তিনি অনেক সম্পদ সঞ্চয় করেন।

টিকাঃ
[৯৪১] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/৩৮-৩৯। আরও দেখুন তারীখুল মামালিক, পৃ. ২৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/২১৬; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ২৬৪।
[৯৪২] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/৫২-৫৩; তারীখুল মামালিক, পৃ. ৩০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/২২২; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৭৭; আল-মাশরিকুল আরাবি, পৃ. ৩
[৯৪৩] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৩২; তারীখুল খুলাফা, ৪৭৮। আতলাসুত তারীখিল আরাবি, পৃ. ৬৫-এ মামলুক সাম্রাজ্যের মানচিত্র দেখুন।
[৯৪৪] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৩৮; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/৯৫ এবং ১০৫; আল-মাশরিকুল আরাবি, পৃ. ৪
[৯৪৫] আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ২৮৬ এবং ২৯৩
[৯৪৬] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৪০-৪৫; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১০৬; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ২৯৫
[৯৪৭] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৫১; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১১১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/৩১৯; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৩১০
[৯৪৮] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৫১; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১১২; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৩১৬
[৯৪৯] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৫৪; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১১২; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৮৩; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৩২৩
[৯৫০] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৬০; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১১৬
[৯৫১] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/৬৮ এবং ২/১১৬; তারীখুল মামালিক, পৃ. ৬০
[৯৫২] আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৩৬৭
[৯৫৩] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৬৭; আল ছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাকওয়া-পরহেজগারিতে তার খ্যাতি ছিল। মদপান-সহ যাবতীয় নাফরমানির কাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি রোডস দ্বীপ অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন।

২১. ৭৫৮ হিজরিতে (১৪৫৩ খ্রি.) আস-সুলতানুল আশরাফ ঈনাল ক্ষমতায় বসেন। ৭৬৫ হিজরি অবধি মোট আট বছর তার শাসনামল বহাল ছিল। এরপর ধারাবাহিক কয়েকজন মামলুক সুলতানের হাতে ক্ষমতার অদল-বদল হয়। যা থেকে রাজ্যের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বুঝে আসে। অবশেষে কাতিয়াবাই ক্ষমতা গ্রহণ করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

২২. আস-সুলতানুল আশরাফ কাতিয়াবাই ৮৭২-৯০১ হিজরি অবধি মোট ১৯ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন। সুলতান মুহাম্মাদ ইবনু কালাউনের যুগের পর এটাই ছিল সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ শাসনকাল। কাতিয়াবাই প্রমাণ করেছিলেন যে-যুদ্ধের ময়দানে, সাহসিকতার ক্ষেত্রে, প্রজ্ঞায় এবং পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে তিনিই সেরা। সুলতান আশরাফ উসমানি সমর্থিত তুর্কমান সাম্রাজ্যে হামলা করে তাদের ওপর কর ধার্য করেন। স্থাপনা, রাস্তাঘাট, মসজিদ এবং সেতু নির্মাণ, সেনাবাহিনী প্রস্তুতকরণ, নিদর্শনাবলি সংস্কার এবং স্থাপত্য শিল্পের প্রতি গুরুত্বারোপের জন্য তিনি অনেক সম্পদ সঞ্চয় করেন।

টিকাঃ
[৯৪১] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/৩৮-৩৯। আরও দেখুন তারীখুল মামালিক, পৃ. ২৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/২১৬; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ২৬৪।
[৯৪২] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/৫২-৫৩; তারীখুল মামালিক, পৃ. ৩০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/২২২; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৭৭; আল-মাশরিকুল আরাবি, পৃ. ৩
[৯৪৩] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৩২; তারীখুল খুলাফা, ৪৭৮। আতলাসুত তারীখিল আরাবি, পৃ. ৬৫-এ মামলুক সাম্রাজ্যের মানচিত্র দেখুন।
[৯৪৪] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৩৮; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/৯৫ এবং ১০৫; আল-মাশরিকুল আরাবি, পৃ. ৪
[৯৪৫] আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ২৮৬ এবং ২৯৩
[৯৪৬] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৪০-৪৫; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১০৬; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ২৯৫
[৯৪৭] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৫১; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১১১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১৩/৩১৯; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৩১০
[৯৪৮] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৫১; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১১২; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৩১৬
[৯৪৯] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৫৪; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১১২; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৮৩; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৩২৩
[৯৫০] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৬০; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১১৬
[৯৫১] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/৬৮ এবং ২/১১৬; তারীখুল মামালিক, পৃ. ৬০
[৯৫২] আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৩৬৭
[৯৫৩] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৬৭; আল-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৪৫৭
[৯৫৪] শাইখ ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান। শাইখুল ইসলাম আল-বুলকিনির সূত্রে তিনি সহিহুল বুখারির ইজাযাহ পেয়েছিলেন। হাফিজ ইবনু হাজার তার আল-মুজামুল মুফাহরাস গ্রন্থে শাইখের জীবনী সংকলন করেছেন। ৮২৪ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়। দেখুন, হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১২০।
[৯৫5] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৭২; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১২০
[৯৫৬] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৯৮
[৯৫৭] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১০১-১০২
[৯৫৮] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১০৯
[১৫৯] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১০৯

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মামলুক সাম্রাজ্যের অবসান

📄 মামলুক সাম্রাজ্যের অবসান


মুহাম্মাদ ইবনু কাতিয়াবাই ক্ষমতায় আসার পর ৯০২ হিজরিতে (১৪৯৭ খ্রি.) কানসুহ খামসুমিআহ নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন। কিন্তু সফল হননি। মুহাম্মাদ ইবনু কাতিয়াবাই ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই ৯০৪ হিজরিতে তিনি নিহত হন। তার মামা আয-যাহির কানসুহ ক্ষমতা গ্রহণের উদ্যোগ নিলেও পরবর্তীকালে অপসারিত হন। এই অস্থিতিশীল সময়ের মাঝে সুলতানদের দ্রুত পালাবদল ঘটতে থাকে। ৯০৫ হিজরিতে আল-আশরাফ জানবালাত ক্ষমতায় আসলেও পরে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। তারপর ৯০৬ হিজরিতে ক্ষমতায় আসেন আল-আদিল তুমানবাই। কিন্তু তিনিও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তাকে ক্ষমতা এবং প্রাণ-দুটোই দিতে হয়। এরপর ক্ষমতা আসে কানসুহ আল- গাউরির কাছে। এটা ৯০৬ হিজরির কথা। আল-গাউরি নিজেকে শক্তিমান এবং প্রভাবশালী প্রমাণ করতে সক্ষম হন। ফলে দেশে নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। কিন্তু অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষেত্রে তিনি সঠিক নীতির পরিচয় দিতে পারেননি।

মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণের পাশাপাশি হজের পথের প্রতি যত্নবান হয়ে কূপ এবং খাল খননের ব্যবস্থা করেছেন আল-গাউরি। পুরোনো দুর্গগুলো মেরামত করা-সহ আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর প্রতিরোধব্যবস্থা মজবুত করেন। সাহিত্য মজলিসের আয়োজনও তিনি করেছিলেন।

হিজরি নবম শতাব্দীতে তুর্কি উসমানি শক্তির অভ্যুদয় ঘটে। ৮৫৭ হিজরিতে (১৪৫৩ খ্রি.) তারা কনস্টান্টিনোপলও জয় করে ফেলে। শুরু হয় মামলুক এবং উসমানিদের সংঘর্ষ। মুখোমুখি হয় উসমানি সুলতান প্রথম সালিম এবং সুলতান কানসুহর বাহিনী। ৯২২ হিজরিতে (১৫১৬ খ্রি.) উসমানিদের ওপর হামলা করতে কানসুহ আল-গাউরি আলেপ্পো অভিমুখে রওয়ানা হন। মারজদাবিক যুদ্ধে সালিমের জয় হয়। কানসুহ আল-গাউরি মৃত্যুবরণ করেন।

আল-গাউরি যুদ্ধে গমনের সময় তুমানবাইকে কায়রোর দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। আল-গাউরির মৃত্যু এবং তার বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে ৯২২ হিজরিতে তুমানবাইকে সুলতান মনোনীত করা হয়। সৈন্যসংখ্যা কম হওয়ার পরও উসমানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ যুদ্ধে নামেন তিনি। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দের রিদানিয়াতে উসমানিদের কাছে মামলুকরা পরাজিত হয়। এই সালেই উসমানিরা মিশর দখল করে নেয়। এরপর তুমানবাইকে ফাঁসিতে ঝুলায়। তিনিই ছিলেন মিশর এবং শামের সর্বশেষ মামলুক সুলতান। তার মাধ্যমেই মামলুক সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। ক্ষমতা দখল করে নেয় উসমানিরা।

টিকাঃ
[৯৬০] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১১৪-১২২। মিশরের আব্বাসি খলিফাদের নাম জানতে তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৭৭ দ্রষ্টব্য।

মুহাম্মাদ ইবনু কাতিয়াবাই ক্ষমতায় আসার পর ৯০২ হিজরিতে (১৪৯৭ খ্রি.) কানসুহ খামসুমিআহ নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন। কিন্তু সফল হননি। মুহাম্মাদ ইবনু কাতিয়াবাই ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই ৯০৪ হিজরিতে তিনি নিহত হন। তার মামা আয-যাহির কানসুহ ক্ষমতা গ্রহণের উদ্যোগ নিলেও পরবর্তীকালে অপসারিত হন। এই অস্থিতিশীল সময়ের মাঝে সুলতানদের দ্রুত পালাবদল ঘটতে থাকে। ৯০৫ হিজরিতে আল-আশরাফ জানবালাত ক্ষমতায় আসলেও পরে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। তারপর ৯০৬ হিজরিতে ক্ষমতায় আসেন আল-আদিল তুমানবাই। কিন্তু তিনিও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তাকে ক্ষমতা এবং প্রাণ-দুটোই দিতে হয়। এরপর ক্ষমতা আসে কানসুহ আল-গাউরির কাছে। এটা ৯০৬ হিজরির কথা। আল-গাউরি নিজেকে শক্তিমান এবং প্রভাবশালী প্রমাণ করতে সক্ষম হন। ফলে দেশে নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। কিন্তু অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষেত্রে তিনি সঠিক নীতির পরিচয় দিতে পারেননি।

মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণের পাশাপাশি হজের পথের প্রতি যত্নবান হয়ে কূপ এবং খাল খননের ব্যবস্থা করেছেন আল-গাউরি। পুরোনো দুর্গগুলো মেরামত করা-সহ আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর প্রতিরোধব্যবস্থা মজবুত করেন। সাহিত্য মজলিসের আয়োজনও তিনি করেছিলেন।

হিজরি নবম শতাব্দীতে তুর্কি উসমানি শক্তির অভ্যুদয় ঘটে। ৮৫৭ হিজরিতে (১৪৫৩ খ্রি.) তারা কনস্টান্টিনোপলও জয় করে ফেলে। শুরু হয় মামলুক এবং উসমানিদের সংঘর্ষ। মুখোমুখি হয় উসমানি সুলতান প্রথম সালিম এবং সুলতান কানসুহর বাহিনী। ৯২২ হিজরিতে (১৫১৬ খ্রি.) উসমানিদের ওপর হামলা করতে কানসুহ আল-গাউরি আলেপ্পো অভিমুখে রওয়ানা হন। মারজদাবিক যুদ্ধে সালিমের জয় হয়। কানসুহ আল-গাউরি মৃত্যুবরণ করেন।

আল-গাউরি যুদ্ধে গমনের সময় তুমানবাইকে কায়রোর দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। আল-গাউরির মৃত্যু এবং তার বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে ৯২২ হিজরিতে তুমানবাইকে সুলতান মনোনীত করা হয়। সৈন্যসংখ্যা কম হওয়ার পরও উসমানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ যুদ্ধে নামেন তিনি। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দের রিদানিয়াতে উসমানিদের কাছে মামলুকরা পরাজিত হয়। এই সালেই উসমানিরা মিশর দখল করে নেয়। এরপর তুমানবাইকে ফাঁসিতে ঝুলায়। তিনিই ছিলেন মিশর এবং শামের সর্বশেষ মামলুক সুলতান। তার মাধ্যমেই মামলুক সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। ক্ষমতা দখল করে নেয় উসমানিরা।

টিকাঃ
[৯৫৯] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১০৯
[৯৬০] তারীখুল মামালিক, পৃ. কারণে কিংবা ইসলামি খিলাফতে আমদানিকারক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তাকে চড়া মূল্যে ক্রয় করে নেওয়া হয়েছে। ফলে সে দাসত্বের বন্ধনে আটকা পড়েছে।

২. মামলুকরা ছিল বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ। অনেক সময় তাদের বংশপরিচয় অজানা থাকত। তবে তাদের মাঝে কল্যাণ থাকত। সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করিয়ে তাদেরকে কাজে লাগানো, ব্যবস্থাপনার সংরক্ষণ এবং শাসনের প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদের আমদানি করা হতো। একসময় তারা শক্তিশালী ক্ষমতার কারণে শাসনকার্য দখলে নিয়ে ফেলে।

৩. মামলুক শাসনামল ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমত: বাহরি মামলুক শাসনামল। এ শাসনামলের মামলুকদের অধিকাংশই ছিল তুর্কি বংশোদ্ভূত। নিজের মধ্যে থাকা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জোরেই আইয়ুবিদের পর তারা ক্ষমতা পরিচালনা করে। ৬৪৮-৭৮৪ হিজরি অবধি প্রায় দেড় যুগ তারা মিশর এবং শাম অঞ্চল শাসন করেছিল। সেখানে থাকা যাবতীয় প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং মোঙ্গল আর ক্রুসেডারদের মতো বাইরের শক্তির মোকাবিলাও তারা করেছিল। দ্বিতীয়ত: সারকাশি বা বুরজি মামলুক শাসনামল। ৭৮৪-৯২২ হিজরি পর্যন্ত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তারা শাম অঞ্চল, মিশর এবং এর আশেপাশের অঞ্চল শাসন করেছিল। অবশেষে ১৫১৬-১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে উসমানিরা মিশর এবং শাম অঞ্চল দখল করে নেয়। স্থান দুটিতে মামলুক শাসনামল ছিল আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে।

৪. মামলুকদের ইতিহাসে বিশেষত তাদের শাসনামলের শেষাংশের সুস্পষ্ট উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ব্যবস্থাপনার প্রাণ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, কলহ-বিবাদ, ফিতনা এবং আঞ্চলিক মামলুকদের মাঝে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। মামলুকদের মাঝে উত্তরাধিকারসূত্রে রাজত্ব লাভের রীতি প্রচলিত ছিল না। তা সত্ত্বেও দেখা যেত, তাদের অধিকাংশ সুলতানই নিজের ছেলেকে উত্তরাধিকারী করার বাইয়াত নিতেন। অনেক সময় সন্তান ছোট হওয়ার কারণে দায়িত্ব পালন করতে পারত না। বড় বড় আমিররা তখন ক্ষমতা দখল করে রাজ্য পরিচালনা করত। এমনটা প্রায়ই ঘটত।

৫. মামলুক সাম্রাজ্যের এবং সুলতানদের মাঝে ছিল নানারকম বৈপরীত্য। তাদের কেউ কেউ ইসলাম, মুসলিম এবং দেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে বিশৃঙ্খলা করতে সচেষ্ট ছিল। আবার অনেকেই মনেপ্রাণে ইসলাম কবুল করেছিল। তাদের ইসলাম ছিল যথার্থ। সততা এবং বিশ্বস্ততার সাথে তারা ইসলামের দাওয়াতে নিয়োজিত ছিল। জ্ঞানার্জন এবং প্রচার-প্রসারে তাদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রে তারা ছিলেন অগ্রগামী।

৬. সকল ক্ষেত্রে মামলুক সুলতানরাই প্রকৃত ক্ষমতা সংরক্ষণ করতেন। আব্বাসি খলিফারা ছিলেন কেবল নামকা-ওয়াস্তে। মামলুক আমিররা ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং পালাবদল নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। সুলতান অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে আমিররা অনেক সময় তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। সুলতানকে হত্যা করে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতেও আমিরদের দ্বিধা ছিল না। ফলে অনেক সময় দেখা গেছে, কোনো কোনো সুলতানের ক্ষমতা দুই মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি।

৭. মামলুক সাম্রাজ্যে অনেকগুলো বিশেষ পদ এবং স্বতন্ত্র প্রশাসনিক পদবি চালু করা হয়েছিল। যেমন 'নায়েবুস সালতানাহ' বলে একটা পদবি ছিল, যার অধিকারীকে সুলতানের প্রতিনিধির সমপর্যায়ের বলে ধরা হয়। 'আল-আইমান'-এর কাজ ছিল রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনায় সুলতানকে সহযোগিতা করা। এ ছাড়াও সিদ্ধান্ত প্রকাশ, উপাধি প্রদান, জায়গীর বণ্টন এবং বড় বড় পদে নিয়োগ দানে তিনি সুলতানের পাশে থাকতেন। মামলুক সাম্রাজ্যের সাধারণ সেনাপতিকে 'আল-আতাবাক' বলা হতো। রাজ্যের ওপর তিনি একচেটিয়া অধিকার রাখতেন। সুলতান বা সুলতানের নায়েবের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা এবং অর্থনৈতিক দিকটির প্রতি লক্ষ রাখা ছিল উজির বা মন্ত্রীর দায়িত্ব। মামলুক সাম্রাজ্যের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রশাসকদের বড় ভূমিকা ছিল। এ যুগের রাজ্যপালের দায়িত্ব পালনের জন্য তারা আমির নির্বাচন করে দিতেন। এদের মাঝে সর্বোচ্চ ক্ষমতা রাখতেন কায়রোর প্রশাসক। রাষ্ট্রের জনহিতকর কাজ পরিচালনার জন্য কিছু দপ্তর ছিল। যেমন সামরিক বাহিনীর দপ্তর, রচনার দপ্তর, ওয়াকফ দপ্তর, সম্পদ নজরদারির দপ্তর এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের দপ্তর।

টিকাঃ
[৯৬১] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১
[৯৬২] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৬৭
[৯৬৩] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১৩০-১৩৪

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মামলুক সাম্রাজ্যের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক

📄 মামলুক সাম্রাজ্যের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক


এখানে ইতিহাস থেকে জানতে পারা মামলুক সাম্রাজ্যের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক নিয়ে আলোচনা করা হবে।

১. মামলুক শব্দটি ইসলামের ইতিহাসে একটি বিশেষ পরিভাষা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এমন শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাস, যুদ্ধবন্দি হওয়ার-জাওহারুস সামিন, পৃ. ৪৫৭
[৯৫৪] শাইখ ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান। শাইখুল ইসলাম আল-বুলকিনির সূত্রে তিনি সহিহুল বুখারির ইজাযাহ পেয়েছিলেন। হাফিজ ইবনু হাজার তার আল-মুজামুল মুফাহরাস গ্রন্থে শাইখের জীবনী সংকলন করেছেন। ৮২৪ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়। দেখুন, হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১২০।
[৯৫5] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৭২; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১২০
[৯৫৬] তারীখুল মামালিক, পৃ. ৯৮
[৯৫৭] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১০১-১০২
[৯৫৮] তারীখুল মামালিক, পৃ. ১০৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00