📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচার-সংক্রান্ত পরিধি

📄 বিচার-সংক্রান্ত পরিধি


ইতিপূর্বে 'বিচারের সময়' নিয়ে আলোচনা করার সময় আমরা বিচারের সময়গত পরিধি নিয়ে আলোচনা করেছি। আর বিচারের স্থানগত পরিধি নির্দিষ্ট শহর, গ্রাম বা সরকারি নিয়োগপত্রে উল্লেখিত নির্ধারিত প্রদেশের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত। বাকি আছে কেবল পরিধির ধরন সংক্রান্ত আলোচনা। এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকা এবং আন্দালুসেও এটার অনেক প্রশংসনীয় বিস্তৃতি ছিল। নৈপুণ্য, বিন্যাস এবং বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে এই পরিধি অনেক সময় পূর্বাঞ্চলকেও ছাড়িয়ে যেত।

• বিচারকার্যের বিন্যাস
বিচারকার্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহে বিন্যস্ত করার মাধ্যমে পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলে বিচারব্যবস্থা স্থায়িত্ব লাভ করেছিল। বিচার সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল: (ক) সাধারণ বিচার বিভাগ, (খ) হিসবাহ বিভাগ এবং (গ) সামরিক বিচার বিভাগ।

আন্দালুসে এসব বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানকে বলা হতো 'খুত্তাহ'। কিংবা প্রতিটি বিভাগ তার পরিচালকের নামে পরিচিতি লাভ করত। সুতরাং খুত্তাতুল কাদ্বা, খুত্তাতুল মাযালিম এবং খুত্তাতুল হিসবাহ বা খুত্তাতুস সুক বলার মতো সাহিবুল মাযালিম, সাহিবুল হিসবাহও বলা হতো। আন্দালুসে এই প্রধান খুত্তাহ তথা বিভাগ তিনটির সাথে আরও কিছু বিভাগ ছিল। যেমন: (ক) বিচারের রায় পুনঃনিরীক্ষণ বিভাগ, (খ) অভিজাত শ্রেণির বিচার বিভাগ, (গ) পুলিশ বিভাগ এবং (ঘ) খ্রিষ্টান এবং অনারবদের বিচার বিভাগ। এগুলোর আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে।

আমরা প্রথমে আলোচনা করব সাধারণ বিচার বিভাগ নিয়ে। রাজধানী বা প্রধান শহরে যার পরিচালনায় থাকতেন কাযিউল জামাআহ। তারপর পর্যায়ক্রমে বড় শহরের বিচারক, তারপর ছোট ছোট শহর এবং গ্রামের বিচারকের কথা আসবে। যাকে 'মুসাদ্দাদে খাস' তথা ছোটখাটো বিচারক বলা হতো। এ কথা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। পুনঃনিরীক্ষণ, অভিজাত শ্রেণির বিচার এবং খ্রিষ্টান বা অনারবদের বিচার-এই বিভাগ তিনটি ছিল সাধারণ বিচার বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত।

• সাধারণ বিচার বিভাগের পরিধি
আন্দালুসের সাধারণ বিচার বিভাগের পরিধি হুবহু পূর্বাঞ্চলের মতোই ছিল। আন-নুবাহি বলেছেন, 'বিচারকের অতীত এবং বর্তমানের পরিধির সীমা একই রকম ছিল। এর মাঝে কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটত না। বিচারক ছাড়া শাসকরাও এর মাঝে রদবদল করতেন না। আলি ইবনু ইয়াহইয়া তার গ্রন্থে বিচারকের কর্মপরিধি বর্ণনা করেছেন এভাবে:

১. বাদী-বিবাদীর মধ্যকার বিবাদ মীমাংসা করা। সেটা পারস্পরিক বৈধ সমঝোতার মাধ্যমেও হতে পারে, আবার কোনো আয়াতের নির্দেশনা মানার জন্য তাদেরকে চাপ প্রয়োগ করার মাধ্যমেও হতে পারে।
২. অধিকারপ্রার্থীকে তার হক পূর্ণরূপে আদায় করে দেওয়া। স্বীকারোক্তি বা দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে অধিকার পৌঁছে দেওয়া।
৩. মানসিক বিকারগ্রস্ত ও বোকা লোকদের সম্পত্তি রক্ষার জন্য তাদের অভিভাবক ঠিক করে দেওয়া। দেউলিয়া ব্যক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আরোপ করা।
৪. ওয়াকফকৃত সম্পত্তি এবং সেগুলোর মুতাওয়াল্লীদের খোঁজখবর রাখা।
৫. কোনো ব্যক্তি শরীয়ত অনুমোদিত শর্তসাপেক্ষে ওসিয়ত করে গেলে সেটা বাস্তবায়ন করা। নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে ওসিয়ত করে গেলে সে সম্পত্তি তার হাতে অর্পণ করা। অনির্ধারিত ব্যক্তির জন্য ওসিয়ত করে গেলে তার অধিকার সাব্যস্ত হবে কি না, সে ব্যাপারে ইজতিহাদ করা। এই সম্পত্তির কোনো ওয়ারিশ পাওয়া গেলে সে এগুলোর দেখাশোনা করবে। অন্যথায় এ দায়িত্ব ন্যস্ত হবে বিচারকের ওপর।
৬. অভিভাবক না থাকলে উপযুক্ত পাত্র বা পাত্রীর সাথে ইয়াতিমের বিবাহ দেওয়া। বিবাহের পরও তাদের খোঁজখবর রাখা।
৭. দণ্ডবিধি প্রয়োগ করা। বিষয়টি আল্লাহর হক-সংক্রান্ত হলে স্বীকারোক্তি বা দলিলের মাধ্যমে বিচারক নিজেই সেটা প্রয়োগ করবেন। পক্ষান্তরে সেটা যদি বান্দার হক হয়, তাহলে অধিকারপ্রার্থীর দাবি অনুযায়ী সেটা প্রয়োগ করা হবে।
৮. জনস্বার্থ দেখভাল করা। রাস্তাঘাট-সহ সর্বত্র যাবতীয় অন্যায় প্রতিরোধ করা। ঘর থেকে শরীয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড দূর করা।
৯. সাক্ষীদের যাচাই-বাছাই করা। আমানতের মাল গ্রহীতাদের খোঁজখবর রাখা। এ কাজে উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচন করা।
১০. শক্তিশালী এবং দুর্বলের মাঝে বিচারের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা। অভিজাত এবং অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মাঝে ইনসাফ করা।

এরপর আন-নুবাহি লিখেন, 'অধিকাংশ আলিমের মতে, দণ্ডবিধি প্রয়োগ এবং যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করা বিচারকের দায়িত্ব। যেমন: মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, অন্যায় প্রতিহত করা এবং জনস্বার্থের প্রতি খেয়াল রাখা। তবে সেনাবাহিনী প্রস্তুত এবং কর আদায় করার অধিকার আমির কিংবা খলিফার জন্য সংরক্ষিত।'

ইবনু খালদুন আল-মুকাদ্দিমাহ গ্রন্থের ৩১তম পরিচ্ছেদে দ্বীনের বিভিন্ন বিভাগ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন। এগুলোর প্রথমটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তারপর হচ্ছে নামাজের ইমামতি। তিনি লিখেন, 'বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব হচ্ছে খিলাফতের অধীনে পরিচালিত দায়িত্বসমূহের একটি।' এরপর তিনি বিচারকের কর্মপরিধি বর্ণনা করেছেন। যেমনটা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। বাগদাদে আল-মাওয়ারদি আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ গ্রন্থে যেসব আলোচনা করেছেন, আবুল হাসান আন-নুবাহি এবং ইবনু খালদুনের বক্তব্য মনে হয় সেখান থেকেই নেওয়া হয়েছে।

• সাধারণ বিচার বিভাগের কর্মপরিধির বিন্যাস
সাধারণ বিচার বিভাগে যেসকল দায়িত্ব ও কর্মপরিধি রয়েছে, সেগুলো দু'ধরনের হতে পারে। হয়তো তাতে বিচারক পরিপূর্ণ কতৃত্বের অধিকারী হবেন। তার কর্মপরিধি হবে সার্বজনীন। নয়তো তাকে কোন অংশের দায়িত্ব দেওয়া হবে। অথবা বিচারকার্যের দায়িত্বের পাশাপাশি কিছু সংখ্যক নির্ধারিত পরিধির দায়িত্ব থাকবে।

সাধারণ বিচারক: তিনি হচ্ছেন শরয়ী কাযী। আমরা ইতিপূর্বে শরীয়তের বিধিবিধান সংশ্লিষ্ট যেসব বিচারাচার নিয়ে আলোচনা করেছি সেসব ক্ষেত্রে বিচারকের সার্বজনীন পরিধি থাকবে। মূলত সাধারণ বিচারকের এই বৈশিষ্ট্য প্রত্যেক শরয়ি বিচারকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অধিকাংশ শরয়ি বিচারকের ক্ষেত্রে এ বৈশিষ্ট্য কার্যত প্রয়োগ হবে। বিশেষত কাযীউল জামাআহ, বড় বড় শহরের বিচারক এবং বাকি অন্যান্য বিচারকের মধ্যেও এ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।

আর বিচারকের কর্মপরিধি যদি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় বা নির্দিষ্ট কোনো অংশের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয় অথবা যদি নির্দিষ্ট পরিধির বাইরে অন্য এক বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে অন্যান্য ব্যাপারে তাকে দেখাশোনা করতে নিষেধ করে দেওয়া হয় তাহলে এই বৈশিষ্ট্য আর থাকবে না। এ কারণেই আন্দালুসে বিচারের এমন কিছু নির্ধারিত বা সীমিত কর্মপরিধির কথা জানা যায় যেগুলো উমাইয়া এবং আব্বাসী যুগে পূর্বাঞ্চলে ছিল না। কিন্তু সার্বজনীন কর্মপরিধিই মৌলিক আর কেন্দ্রীয় পরিধি হিসেবে থেকে যায়। অপরাপর পরিধি ছিল এর ব্যতিক্রম। সাধারণ বিচারক তথা শরয়ী কাযীর দায়িত্ব হলো, হদ (শাস্তিদণ্ড), কিসাস (বদলা), তাযির (শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নয় এমন শাস্তি, যা নির্ধারণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের), পরিবারনীতি এবং সবধরনের লেনদেন এবং যাবতীয় অধিকারের ব্যাপারে ফয়সালা করা। যেগুলোর বিবরণ পূর্বে গিয়েছে।

উসতায আহমাদ আমিন বলেন, 'আন্দালুসের মুসলিমদের কাছে বিচার-সংক্রান্ত দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বড় পদ। কারণ এটা ছিল দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত। বিচারকের ক্ষমতা ছিল সবচেয়ে বিস্তৃত। কেননা বিচারক নিজের বক্তব্য শোনানোর জন্য খলিফা অথবা প্রশাসককে উপস্থিত করতে পারতেন। সাধারণ বিচারকের ওপরে থাকত আরেকজন বড় বিচারক। যাকে "কাযিউল জামাআহ” তথা প্রধান বিচারপতি বলা হতো। শাসকের অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অধিকার কেবল তিনিই সংরক্ষণ করতেন। মদ্যপান এবং ব্যভিচারের কারণে তিনি শাস্তি দিতেন।' আমরা এগুলো 'তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস' গ্রন্থ থেকে ইতিমধ্যেই বর্ণনা করেছি। আবুল হাসান আন-নুবাহি সেগুলো নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা করেছেন।

গ্রাম্য সালিশের বিচারক: এটি ছিল বিচার-সংক্রান্ত একটি শাখা। বিচারের ব্যাপারে এই দপ্তরের পরিচালকের অভিজ্ঞতা থাকত একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। বড় বিচারকরা তাকে মফস্বল বা কোনো পাড়া-মহল্লায় সালিশ পরিচালনার দায়িত্ব দিতেন।

ছোটখাটো বিষয়ের বিচারক: বিচার বিভাগের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কার্যাবলি পরিচালনা করতেন। ছোটখাটো কোনো গ্রাম তার আওতাধীন থাকত।

সামরিক বিচারক: স্বাভাবিকভাবে তার দায়িত্ব ছিল পূর্বে উল্লেখিত গণ্ডির ভেতর বিচারকার্য পরিচালনা করা। তবে বেশির ভাগ সময় সৈনিক এবং অফিসারদের মধ্যকার বিভিন্ন বিরোধ নিরসনের দায়িত্ব তিনি পালন করতেন। আবদুর রহিম ইবনু ইসমাঈল মরক্কোর 'সালা' শহরে এই দায়িত্ব পরিচালনা করতেন। আরও ছিলেন আসাদ ইবনুল ফুরাত। যিনি একাধারে বিজ্ঞ ফকিহ, সেনাপতি এবং সামরিক বিচারক। ২১৩ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

নিকাহ বিচার বিভাগ: বিবাহ সংঘটিত হওয়া এবং বিবাহের সাথে শাখাগত বিভিন্ন বিষয় এর আওতাধীন ছিল। বিবাহ, তালাক ইত্যাদি ব্যক্তিগত বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত যে বিচারক বর্তমানকালে প্রচলিত আছে, সে যুগে তাকেই বিবাহের বিচারক বলা হতো। আন্দালুসে এ কাজের দায়িত্ব স্পেশাল জজের ওপর অর্পণ করা হতো। অনেক জজ এই বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যায়দুন আল-মাখযুমি ছিলেন তাদের অন্যতম। তার জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে 'আত-তাকমিলাহ' গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে আল-কাসিমি বর্ণনা করেন, 'যায়দুন আল-মাখযুমিকে প্রধান বিচারপতি আবুল কাসিম ইবনু হামদাইন নিকাহ-সংক্রান্ত দায়িত্ব দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনু কায়সারের জীবনীতেও এমনটা এসেছে। মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-মুরাদির জীবনীতে আছে, তিনি মারাকিশের অধিবাসী ছিলেন। দীর্ঘদিন যাবৎ সেখানে নিকাহ-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুখাল্লাদ ইবনু ইয়াজিদের জীবনীতে আছে, তিনি নিজ শহরে দীর্ঘদিন বিয়েশাদি-সংক্রান্ত জজের দায়িত্ব পালন করেছেন। পূর্বাঞ্চলে সুনির্দিষ্টভাবে এই পরিধি কোনো জজের দায়িত্বে ছিল না। তবে ইয়াতিম বা অসহায়ের বিবাহের ব্যবস্থা করা ছিল সাধারণ বিচারকের পরিধির আওতাভুক্ত।

উত্তরাধিকার সম্পত্তির দায়িত্ব: এই বিভাগ শরীয়তের আইন অনুসারে উত্তরাধিকার সম্পত্তি (ইলমুল ফারায়েয) বণ্টনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-আনসারির জীবনী উদ্ধৃত করে আল-কাসিমি লিখেন-'তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আন্দালুসের ভ্যালেন্সিয়া শহরে উত্তরাধিকার সম্পত্তি সংক্রান্ত যাবতীয় বিচারের দায়িত্ব পালন করেছেন।' আহমাদ ইবনু আবদিল আজিজ আল-আযদির জীবনীতে আছে, 'তাকে একাধিক বার আরবোলার বিচার-ফয়সালার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিচার উপদেষ্টার পাশাপাশি উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের অতিরিক্ত দায়িত্বও তিনি পালন করেন।' কারী তারিক ইবনু মূসা আল-মুআফিরির জীবনীতে আছে, 'তিনি হিসবাহ এবং মিরাস বণ্টনের দায়িত্ব একসাথে পালন করেছেন।' এই বিভাগটি পূর্বাঞ্চলে স্বতন্ত্রভাবে চালু ছিল না। সেখানে এটি সাধারণ বিচারকের আওতাধীন দপ্তর হিসেবে পরিচালিত হতো। এই দায়িত্ব এখন শারঈ বিচারকের সাথে সম্পৃক্ত। সাধারণত শারঈ বিচারব্যবস্থায় এই বিভাগের জন্য একজন স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। যার দায়িত্ব থাকে হিসবাহ ও ফারায়েয। যার কারণে তাকে 'আল-ফারযি'-ও বলা হয়।

টিকাঃ
[৮৮৬] তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫-৬
[৮৮৭] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২১৮-২২১
[৮৮৮] আল-আহকামুস সুলতানিয়‍্যাহ, পৃ. ৭০
[৮৮৯] যুহরুল ইসলাম: ৩/১৮
[৮৯০] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫৩-৫৪; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৫৯
[৮৯১] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩৬৫-৩৬৬; আত-তাকমিলাহ: ১/৩৩৫ এবং ৪৩৮
[৮৯২] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৬৭ এবং ২৬৮; আত-তাকমিলাহ: ১/৬৮, ৭২, ২৪৪

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব

📄 বিচারকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব


আন্দালুসের বিচারকদের দায়িত্ব কেবল আইন-সংক্রান্ত দিকের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ছিল পূর্বাঞ্চলের বিচারকদের মতোই। বিচারের পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তাদের পালন করতে হতো। তাদের মর্যাদা উঁচু হওয়ার কারণে শাসক এবং জনগণ—উভয়েই তাদের ওপর আস্থা রাখত। তাই গুরুতর, কঠিন ও জটিল বিষয়াদির দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত হতে থাকে। কারণ তাদের একনিষ্ঠতার প্রতি সকলের আস্থা ছিল। তারা নিপুণভাবে নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতেন। তাদের রাষ্ট্রীয় আমানতদারিতার ব্যাপারে শাসক-প্রশাসক কিংবা সাধারণ মানুষ—কারোরই কোনো অভিযোগ ছিল না। আন্দালুসে বিচারকরা অতিরিক্ত যেসব দায়িত্ব পালন করতেন, সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।

বিচারপতি এবং ইমামতি

আন্দালুস ও মরক্কোর অধিকাংশ বিচারক দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চলে নামাজের ইমামতি করতেন। এ ক্ষেত্রে রাজধানী এবং কর্ডোভা জামে মসজিদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব ছিল খলিফা, প্রশাসক এবং আমির-উমারাদের নামাজে ইমামতি করা।

মুহাম্মাদ ইবনু বাশির আল-মুআফিরির জীবনীতে ইবনুল হারিস আল-খুশানি লিখেন—'মুসআব ইবনু উমরান মৃত্যুবরণ করলে কর্ডোভার বিচারপতির দায়িত্ব কাকে দেওয়া যায়, এ নিয়ে আব্বাস ইবনু আবদুল মালিকের সাথে পরামর্শ করলেন হাকাম। আব্বাস তখন বললেন, মুসআব তো মুহাম্মাদ ইবনু বাশিরের কথা বলে গিয়েছিলেন। মুসআবের জীবনের শেষ দিকে মুহাম্মাদ ছিলেন তার সহযোগী। হাকাম তখন মুহাম্মাদ ইবনু বাশিরকে কর্ডোভায় আসতে বললেন। তিনি এলে, তাকে কাযিউল জামাআহ এবং নামাজের ইমাম নিযুক্ত করলেন।

আবুল হাসান আন-নুবাহি বলেছেন, 'পরবর্তী ফকিহদের মধ্যে ইলম এবং দ্বীনের ব্যাপারে আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আইয়াশ আল-আনসারি ছিলেন অন্যতম। আমাদের মালাগা শহরের অন্যতম প্রধান শাইখ তিনি। বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞানগরিমা, আভিজাত্য, আল্লাহভীতি এবং দুনিয়াবিমুখতায় তিনি ছিলেন অনন্য ব্যক্তি। আমিরুল মুসলিমীন আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ ইবনু ইসমাঈল তাকে মালাগা শহরের প্রধান বিচারপতি এবং আলহামরা মসজিদের খুতবার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তার সবচেয়ে বেশি মিল ছিল মূসা ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি যিয়াদের সাথে। উমাইয়া প্রশাসক আবদুল্লাহ মূসাকে কর্ডোভার বিচারক এবং নামাজের ইমাম বানিয়েছিলেন।

বিচারপতি ও ইমামতির দায়িত্ব পালনকারী মুহাম্মাদ ইবনু হাসানের জীবনীতে আন-নুবাহি লিখেছেন, 'হিজরির সপ্তম শতকের একজন ছিলেন মুহাম্মাদ ... আল-আনসারি আল-মালাগি। ইলম, ইনসাফ, দ্বীনদারি এবং শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ব্যক্তিদের মাঝে তিনি ছিলেন অনন্য। মুহাম্মাদ সফর করেছেন পূর্বাঞ্চলে। সেখানকার শীর্ষস্থানীয় আলিমদের থেকে হাদিসের জ্ঞান আহরণ করেছেন। আন্দালুসে ফিরে আসার পর তাকে শহরের পশ্চিম দুর্গগুলোতে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারপর লোকদের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে মালাগার জামে মসজিদের ইমামতি এবং জুমুআর খুতবা প্রদানের দায়িত্বও অর্পণ করা হয় তার ওপর।

• বিচারকার্য এবং মন্ত্রীত্ব

আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি যাকওয়ানকে আন্দালুসের প্রধান বিচারপতি বলা হতো। তার সম্পর্কে আবুল হাসান আন-নুবাহি বলেন, 'জ্ঞান-গরিমা, স্বচ্ছতা, ইনসাফ এবং দৃঢ়তায় তিনি ছিলেন সেরা বিচারক। আমির আল-মানসুর ইবনু আবি আমিরের নেতৃত্বে পরিচালিত কোনো যুদ্ধ থেকেই তিনি পিছিয়ে থাকেননি। পরবর্তীকালে আমির আবদুর রহমান তাকে প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি মন্ত্রীত্বের দায়িত্বও অর্পণ করেন। বনু আমির সাম্রাজ্যের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি উভয় দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

তদ্রূপ আবদুর রহমান ইবনু ফুতাইসও একাধারে নামাজের ইমামতি, দুর্নীতির বিচার এবং মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন।

• বিচার ও যাকাত তহবিলের দায়িত্ব

কাযি ইয়ায সূত্রে আন-নুবাহি বর্ণনা করেছেন, আহমাদ ইবনু বাকি ৩১৪ হিজরিতে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ এবং প্রাজ্ঞ বিচারক। তিনি একইসাথে যাকাতের তহবিল বণ্টন ও নামাজের ইমামতির দায়িত্বে ছিলেন। তারপর কাযিউল জামাআহর দায়িত্বও পালন করেন।

• বিচারক এবং উপদেষ্টা

বিচারালয়ে উপদেষ্টা পরিষদ কেবল আন্দালুসেই ছিল। হিজরি তৃতীয় শতকে কর্ডোভায় বিচারকদের পরামর্শের জন্য যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অনেক বিচারপতিই এই পরিষদের সদস্য ছিলেন। বিচারকদের উপদেষ্টা পরিষদ শিরোনামে আমরা এটা নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করব।

• সাধারণ বিচার এবং দুর্নীতির বিচার

এ বিভাগটি ছিল সাধারণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বয়ে গঠিত। এটা ছিল সবচেয়ে জটিল এবং সর্বোচ্চ বিভাগ। আবুল মুতাররিফ আবদুর রহমান ইবনু ফাতিসের জীবনীতে আন-নুবাহি লিখেন, 'খলিফা আল-মানসুরের যুগে দুর্নীতি দমন কমিশনের বিচার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনু আবি আমির। তার রায়ের কোনো নড়চড় হতো না। সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই বাস্তবায়িত হতো। জালিমদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল খুবই দুর্দান্ত। মতামত প্রদানের লক্ষ্যে তিনি মন্ত্রীদের বৈঠকে অংশগ্রহণ করতেন। মন্ত্রীত্ব এবং নামাজের ইমামতির পাশাপাশি তিনি কর্ডোভার বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন। আন্দালুসে এমন বিচারক খুবই কম ছিলেন, যিনি একাধারে এতগুলো দায়িত্ব সামলেছেন।

• বিচারকার্য ও নেতৃত্ব

কোনো কোনো বিচারক সেনাপতির দায়িত্বও পালন করতেন। যেমনটা আসাদ ইবনুল ফুরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সামরিক বিচারক হওয়ার পাশাপাশি তিনি খোদ সেনাপতিও ছিলেন।

আমিরের কেউ রাজধানীর বাইরে গেলে রাষ্ট্রের যাবতীয় বিষয় পরিচালনার জন্য বিচারককে স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। এভাবে বিচারকদের অনেকেই খলিফা বা আমিরের প্রতিনিধিত্ব করতেন।

অনেক বিচারপতি খলিফা, আমির এবং শাসকদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। আর শাসকরা তাদের উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না।

• সাধারণ বিচার এবং হিসবাহ

আফ্রিকার বিচারক আবদুস সালাম ইবনু সাঈদের ব্যাপারে আবুল হাসান আন-নুবাহি লিখেন, 'বিচারকদের মাঝে তিনিই সর্বপ্রথম হিসবাহ বিভাগ পরিচালনা করেছেন। তিনি অন্যায় প্রতিহত করার নির্দেশ দিয়েছেন। জামে মসজিদ থেকে বিদআতের আড্ডাগুলো সরিয়ে দিয়েছেন। প্রবৃত্তির অনুসারীদের মসজিদ থেকে বিতাড়িত করেছেন। আমানতের সম্পদ বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষের কাছে রাখার নীতি প্রচলন করেছেন। এর আগে আমানতের সম্পদ থাকত বিচারকদের জিম্মায়।'

• লেখালেখি এবং বিচারকার্য

আবুল কাসিম আবদুর রহমান ইবনু রবির ব্যাপারে আন-নুবাহি লিখেছেন, 'বিভিন্ন শাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পূর্বসূরিদের ন্যায়। সীমালঙ্ঘন এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীর ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। একজন বিজ্ঞ লেখক হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন স্বভাবজাত কবি। বিভিন্ন গোত্রকে (জিহাদের জন্য) সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে তিনি সুলতানের পক্ষ থেকে এমন এক বই লিখেছিলেন, যা মনোবলকে শাণিত করে এবং ঘুমন্তকে বিবেককে করে জাগ্রত। তিনি আমৃত্যু এ পদে বহাল ছিলেন। '

• বিচারপতি এবং সীমান্তরক্ষী

মুনযির ইবনু সাঈদ সম্পর্কে যাফির আল-কাসিমি লিখেন, সরকারি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি সীমান্তেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ফিরিঙ্গি দেশগুলো থেকে মরক্কোতে যাতায়াতকারীরা তার নজরদারিতে থাকত। এটা ৩৩০ হিজরির কথা। সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বর্তমানে যাকে 'বর্ডার গার্ড সিস্টেম' বলা হয়। আর সরকারি কর্মকর্তাদের মনিটর করার জন্য বর্তমানে তদন্ত কমিশন চালু রয়েছে। ফিরিঙ্গি দেশগুলো থেকে যাতায়াতকারীদের নজরদারিতে রাখার অর্থ হলো, আগন্তুকদের পরিচয় জেনে রাখা এবং তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা।

৩৫৫ হিজরি অবধি এসকল দায়িত্ব পালন করে মুনযির ইবনু সাঈদ ইন্তেকাল করেন।

টিকাঃ
[৮৯৩] কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২৮-২৯, ঈষৎ পরিবর্তিত
[৮৯৪] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২০-২১
[৮৯৫] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১১৫। আন-নুবাহি এমন অনেক বিচারকের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা বিচারকার্য পরিচালনার পাশাপাশি নামাজের ইমামতিও করতেন। তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস গ্রন্থের ৮৬ নং পৃষ্ঠায় আবদুর রহমান ইবনু ফুতাইসের কথা আছে। আবার তারতীবুল মাদারিক: ২/৪২৪-এও এমন বিচারকদের কথা আছে।
[৮৯৬] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৮৪, ৮৬ এবং ৮৭
[৮৯৭] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৬৩ এবং ৬৫
[৮৯৮] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩০২
[৮৯৯] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১২৫; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩০২

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মোকদ্দমার পদ্ধতি

📄 মোকদ্দমার পদ্ধতি


মামলা-মোকদ্দমার কিছু পদ্ধতি পর্যালোচনা করে আমরা এই আলোচনার ইতি টানব। এসব পদ্ধতির কিছু ছিল প্রশাসনিক, কিছু সিস্টেমেটিক। এজন্য এই আলোচনাগুলো প্রশাসনিক এবং গঠনমূলক ব্যবস্থাপনার পরে করা হয়েছে। এসব পদ্ধতির কোনো কোনোটা সে-সময় পূর্বাঞ্চলেও জারি ছিল। আর কিছু পদ্ধতি ছিল একেবারে অত্যাধুনিক, যা মূলত আন্দালুসের একক আবিষ্কার।

• ডেটা সংরক্ষণ

এজলাসের বিবরণ এবং বিচারকের কাছে উত্থাপিত আলোচনা-পর্যালোচনাগুলোর আদ্যোপান্ত নথিভুক্ত রাখার প্রচলন ছিল। এমনটা তখন পূর্বাঞ্চলেও ছিল না। সেখানে বিচারের ডেটা নথিভুক্ত করার বিষয়টি পর্যায়ক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। পক্ষান্তরে আন্দালুসে লেখালেখির ব্যাপক প্রচলন ছিল। সর্বত্রই তখন জ্ঞানের ছড়াছড়ি। সেখানকার উজ্জ্বল সভ্যতার মাঝে লিপিবদ্ধ ছিল বাহ্যিক জীবন-পদ্ধতির রূপরেখা।

মুহাম্মাদ ইবনু বাশির আল-মুআফিরির জীবনীতে আন-নুবাহি লিখেন, মুহাম্মাদ ইবনু বাশিরই সর্বপ্রথম আমির হাকামের বিচার করে তার সমস্ত বিবরণ লিখে রেখেছিলেন। মোকদ্দমাটি ছিল জাঁতাকল-সংক্রান্ত। বাদীর কাছে থাকা দলিল- প্রমাণ মুহাম্মাদ ইবনু বাশির আমলে নিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে আমিরের কাছে দলিল না থাকায় তিনি বাদীর যুক্তি-তর্ক খণ্ডন করতে পারেননি। বিচারপতি মুহাম্মাদ এই মোকদ্দমা নথিভুক্ত করে এ ব্যাপারে সাক্ষী রেখে দেন। এরপর সময় পেরিয়ে গেলে জাঁতাকলটি আইনমাফিক বিক্রি করেন। এ ঘটনার পর থেকে হাকাম বলতেন, 'মুহাম্মাদ ইবনু বাশিরের প্রতি আল্লাহ রহম করুন। আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি সঠিকভাবে আমাদের বিচার করেছেন। আমাদের হাতে থাকা সন্দেহজনক বস্তুকে তিনি সংশোধন করে দিয়েছেন।'

■ রায়ের ব্যাপারে সাক্ষী রাখা

এটা ছিল আন্দালুসে প্রচলিত একটি বিশেষ নীতি। পূর্বাঞ্চলে এটি ততটা পরিচিতি লাভ করেনি। পদ্ধতিটি ছিল এমন—বিচারক শহর, অঞ্চল বা জনপদ থেকে কিছু সংখ্যক ব্যক্তিদের নির্বাচন করতেন। যাতে বিভিন্ন ঘটনা এবং ব্যক্তির ব্যাপারে তারা সাক্ষ্য প্রদানের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। এদেরকে ‘আল-উদুল’ তথা নির্ভরযোগ্য সাক্ষী বলা হতো। কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত থেকে নামটা গ্রহণ করা হয়েছিল:
وَأَشْهِدُوا ذَوَى عَدْلٍ مِّنْكُمْ | তোমরা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের সাক্ষী রাখো।

আস-সিলাহ গ্রন্থ থেকে যাফির আল-কাসিমি এমন কয়েকজন সাক্ষীর কথা আলোচনা করেছেন। সুলাইমান ইবনু ইয়াহইয়ার ব্যাপারে এসেছে, 'তিনি ছিলেন কর্ডোভার নির্ভরযোগ্য সাক্ষীদের অন্যতম।' আবদুর রহমান ইবনু আবদিল্লাহর জীবনীতে আছে, 'তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ, জ্ঞানী এবং চরিত্রবান। সর্বদা শ্রেষ্ঠত্ব ও সততায় তিনি ছিলেন অনন্য। সাক্ষ্যদানে তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। তার নির্ভরযোগ্যতার কথা লোকমুখে প্রচলিত ছিল। তিনি মসজিদে মসজিদে মানুষকে নসিহত করতেন। জনসাধারণ তাকে সমীহ করত। কর্ডোভার জামে মসজিদে তিনি ইমামতির দায়িত্বও পালন করেছেন।'

বিচারকরা নিজে থেকেই আস্থাভাজন সাক্ষীদের নির্বাচন করতেন। বিচারপতি, ফকিহ এবং মুফতিরা অনেক সময় শাস্তিস্বরূপ কারও কারও সাক্ষ্য রহিত করে দিতেন। এ ব্যাপারে সম্মিলিত ফতোয়া প্রদান করতেন অনেক সময়। আমিরের রীতি ছিল-বিচারকের চুক্তিনামা এবং নিয়োগপত্র তিনি লিখিত আকারে প্রদান করতেন। পাশাপাশি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন।

• বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষদের কাছে আমানতের মাল

বিচারকদের কাছে অনেক আমানতের মাল গচ্ছিত থাকত। অনেক সময় দেখা যেত, কিছু কিছু সম্পদের মালিক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু সম্পদের মালিক পাওয়া গেলেও নাবালক বা বেআইনি ব্যক্তি হওয়ার কারণে তাদের কাছে সোপর্দ করা যেত না। উপযুক্ত ওয়ারিশের জন্য এসব সম্পদ সংরক্ষণ করে রাখা শরীয়তের স্পষ্ট দাবি। নষ্ট হওয়ার ভয় থাকলে এগুলো বিনিয়োগ করার অনুমতিও শরীয়ত দিয়েছে। আন্দালুস, মরক্কো এবং পূর্বাঞ্চলের বিচারকরা এসব সম্পদ নিজেদের কাছে কিংবা বিচার বিভাগে সংরক্ষণ করে রাখতেন। ইতিপূর্বে তার আলোচনা গত হয়েছে।

আমানতের সম্পদ পরিমাণে অনেক বেশি হয়ে গেলে তা সংরক্ষণ কিংবা বিনিয়োগ করাটা বিচারকদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় এ সম্পদের কারণে বিচারক তার মূল দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খেতেন। তাই আন্দালুস, মরক্কো এবং মিশরের বিচারকরা নির্ভরযোগ্য, আস্থাবান এবং বিশ্বস্ত কয়েকজন কোষাধ্যক্ষের কাছে আমানতের সম্পদ গচ্ছিত রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

আফ্রিকার বিচারক আবদুস সালাম ইবনু সাঈদ সাহনুন সর্বপ্রথম আমানতের সম্পদ বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষদের কাছে গচ্ছিত রাখেন। পরবর্তী বিচারকরাও তার পন্থা অবলম্বন করেন। আন-নুবাহি তার জীবনীতে লিখেছেন, 'বিচারকদের মাঝে তিনিই সর্বপ্রথম হিসবাহ বিভাগ পরিচালনা করেছেন। তিনি অন্যায় প্রতিহত করার নির্দেশ দিয়েছেন। জামে মসজিদ থেকে বিদআতের আখড়াগুলো সরিয়ে দিয়েছেন। প্রবৃত্তির অনুসারীদের মসজিদ থেকে বিতাড়িত করেছেন। আমানতের সম্পদ বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষের কাছে রাখার নীতি প্রচলন করেছেন। এর আগে আমানতের সম্পদ থাকত বিচারকদের জিম্মায়।' ঈসা ইবনু মিসকিন বলেছেন, 'তাই মানুষ তার নেতৃত্বে শরীয়তের সঠিক পথের দিশা পেয়েছিল। তার মতো দায়িত্ব আফ্রিকায় আর কেউ পালন করেননি।

■ সাক্ষী এবং শপথের মাধ্যমে বিচার

সাক্ষ্য এবং শপথ হচ্ছে প্রমাণ সাব্যস্তকরণের অন্যতম মাধ্যম। এটা ইমাম মালিক এবং তাঁর মাযহাবের অনুসারী আলিমদের অভিমত। শাফিয়ি এবং হাম্বলি মাযহাবের অনুসারীরাও এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করেছেন। পক্ষান্তরে হানাফি আলিমগণ একজন সাক্ষী এবং শপথের মাধ্যমে বিচার করার মতটি গ্রহণ করেননি। আন্দালুসের বিচারকরা এই ক্ষেত্রে ইমাম মালিকের বক্তব্য গ্রহণ করেননি। তারা একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং বিচারপ্রার্থীর শপথের মাধ্যমে ফয়সালা করার অনুমোদন দেননি।

মুহাম্মাদ ইবনু বাশির আল-মুআফিরির জীবনীতে আবুল হাসান আন-নুবাহি উল্লেখ করেছেন, 'ওয়াকফের সম্পত্তি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে লিখিত বিষয়ে সাক্ষ্যের অনুমোদন তিনি দিতেন না। সাক্ষীর সাথে বিচারপ্রার্থীর শপথের মাধ্যমে বিচার করা তার কাছে অনুমোদিত ছিল না।' এরপর আন-নুবাহি আরও লিখেন, 'একজন সাক্ষী এবং শপথের মাধ্যমে বিচার করাকে ইবনু বাশির সেই চারটি মাসআলার অন্তর্ভুক্ত করেছেন, আন্দালুসের বাসিন্দারা যেগুলোর ক্ষেত্রে ইমাম মালিকের অনুসরণ থেকে বিরত ছিল। মাসআলাগুলো হচ্ছে:
✓ (ক) মিশ্র সম্পদ তথা যৌথ সম্পদের ব্যাপারে তারা ফয়সালা করতেন না।
✓ (খ) কেবল একজন সাক্ষী এবং বিচারপ্রার্থীর শপথের মাধ্যমেই বিচার করতেন না।
✓ (গ) ইমাম লাইস ইবনু সা'দের মত অনুসারে তারা উৎপাদিত ফসলের বিনিময়ে জমি ভাড়া দেওয়ার অনুমোদন দিতেন।
✓ (ঘ) ইমাম আওযায়ির মাযহাব অনুসারে তারা মসজিদে গাছ রোপণের বৈধতা দিতেন।

টিকাঃ
[১০০] সূরা তলাক, ৬৫: ২
[১০১] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩৬১। মুনযির ইবনু সাঈদকে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী গ্রহণের বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়ার ঘটনা জানতে তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৭৩-৭৪ দেখুন।
[১০২] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩০২
[১০৩] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২৯
[১০৪] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪৯-৫১

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচার বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা

📄 বিচার বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা


আন্দালুসে এমন কিছু বিশেষ রাজনৈতিক সময় গিয়েছিল, যখন বিচার বিভাগ কর্মহীন ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। তেমনই একটি সময় ছিল বিচারক ইয়াহইয়া ইবনু মা'নের ইন্তেকালের পর। তখন প্রায় ছয় মাসের মতো মানুষের মাঝে কোনো বিচারক ছিল না। এতে মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। আমির আবদুর রহমান তখন বিশেষভাবে ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়াকে নিয়োগ দিতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু ইয়াহইয়া অসম্মতি জানালে আবদুর রহমান তাকে অন্য কারও নাম প্রস্তাব করতে বাধ্য করেন। ইয়াহইয়া তখন ইবরাহীম ইবনু আব্বাসের নাম প্রস্তাব করেন। ইবরাহীমকে দায়িত্ব দিয়ে তখন ইয়াহইয়া থেকে হাত গুটিয়ে নেন আমির।

এমনই আরেকটা শাসক সুলাইমান ইবনুল হাকামের শাসনামলে। তার শাসনামলের দীর্ঘ সময় কর্ডোভার বিচার বিভাগ নিষ্ক্রিয় করে রাখা ছিল। সুলাইমানের দাবি ছিল, বিচারকার্য পরিচালনার উপযুক্ত কাউকে তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে প্রশাসক আহমাদ ইবনু যাকওয়ান তার কথা মানতে নারাজ ছিলেন। ফলে সুলাইমান বিচার বিভাগের নামটাই তিন বছর তিন মাস যাবৎ নিষ্ক্রিয় করে রাখেন।

৪০৪ হিজরির মুহাররম মাসে সুলাইমান মারা যাওয়ার পর আলি ইবনু হামুদ আল-ফাতিমি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বিচার বিভাগ পুনরায় চালু করেন। দায়িত্ব প্রদান করেন ফকিহ আবদুর রহমান ইবনু বিশরকে। যিনি আলির উপদেষ্টাও ছিলেন। তিনি ছিলেন আন্দালুসের খলিফার পক্ষ থেকে নিযুক্ত সর্বশেষ বিচারক। এটা ৪০৭ হিজরির কথা। আলি ইবনু হামুদ তখন আন্দালুসে মারওয়ান বংশের শাসক সুলাইমান ইবনু হাকামের বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে রাজধানী কর্ডোভা দখল করে নিয়েছিলেন।

টিকাঃ
[১০৫] তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ১৪-১৫
[১০৬] তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ৮৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00