📄 বিচারের উৎস
পৃথিবীর অন্যান্য অংশের মতোই আফ্রিকা (তিউনিসিয়া), মরক্কো এবং আন্দালুসে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। হিজরি প্রথম শতকের পূর্ণ সময় এবং দ্বিতীয় শতকের কিছু সময় অবধি আলিম এবং বিচারকগণ ব্যাপকভাবে ইজতিহাদ করতেন। এই দুই শতকে পূর্বাঞ্চলের ফতোয়া এবং বিচারব্যবস্থার সাথে আন্দালুস ও মরক্কোর ছিল গভীর সম্পর্ক। এই শতক দুটিতে মুফতি এবং বিচারকরা সরাসরি কুরআন, রাসূলের সুন্নাহ এবং আলিমদের ঐকমত্যের পাশাপাশি কিয়াসের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এ ছাড়া সাহাবিদের বক্তব্য এবং উরফের (প্রচলিত প্রথা) মতো অন্যান্য উৎসও সামনে থাকত।
মুসআব ইবনু উমরানের জীবনীতে আন-নুবাহি লিখেছেন, 'মুসআব বিচারকার্য পরিচালনা করতেন ইমাম আওযায়ির বর্ণনা অনুসারে। তিনি নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসারী ছিলেন না। যে মতটাকে সঠিক বলে মনে করতেন, সে অনুসারেই রায় প্রদান করতেন। তিনি ছিলেন নামকরা ব্যক্তি।'
মুজতাহিদ বিচারক সম্পর্কে ইবনু ফারহুন সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, 'বিচার হবে আল্লাহর কিতাব অনুসারে। তাতে সমাধান খুঁজে না পেলে রাসূলের এমন সুন্নাহ দেখতে হবে, যার সাথে বাস্তব আমলের সম্পর্ক রয়েছে। এমন সুন্নাহ পাওয়া না গেলে সাহাবিদের ইজমা খুঁজতে হবে।... এরপর দেখতে হবে তাবিয়িদের ইজমা এবং প্রত্যেক যুগের আলিমগণের ইজমা আছে কি না।... উপস্থাপিত মোকদ্দমাতে কোনো ঐকমত্য না পাওয়া গেলে আলিমদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে মূলনীতি অনুযায়ী কিয়াস এবং ইজতিহাদের মাধ্যমে বিচার করতে হবে।'
আমরা নিয়মও এভাবেই দেখেছি। প্রথমে কুরআন, তারপর সুন্নাহ, এরপর ইজমা এবং সবশেষে কিয়াস। ইবনু ফারহুন আরও বলেছেন, 'বিচারকের মাঝে যদি ইজতিহাদের যোগ্যতা না থাকে, তাহলে সে পরামর্শ মোতাবেক কাজ করবে এবং মাযহাব মেনে চলবে।'
রাসূল-এর সুন্নাহ এবং সাহাবিদের বক্তব্য অনুসরণ করার ব্যাপারে আন্দালুস ও মরক্কোতে ব্যাপক ঝোঁক ছিল। তখন সবেমাত্র পূর্বাঞ্চল থেকে ফিকহি মাযহাবের প্রচলন শুরু হয়েছে। আন্দালুস ও মরক্কোতে হানাফি মাযহাব এসেছিল আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনু ফাররুখের হাত ধরে। বিচারক আসাদ ইবনু ফুরাতের হাত ধরে তা আফ্রিকায় আসে। তিউনিসিয়ার অধিকাংশ অধিবাসী হানাফি মাযহাব মেনে চললেও আন্দালুসের অধিবাসীরা আমল করত ইমাম আওযায়ির মাযহাব অনুসারে। মাযহাবটি আন্দালুসে এসেছিল আফ্রিকা এবং আন্দালুস বিজয়ী সৈনিকদের হাত ধরে। ফাতিমি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মিশর এবং উত্তর আফ্রিকায় যেমন শিয়াদের ফাতিমি মাযহাব প্রভাব বিস্তার করেছিল, ঠিক তেমন করে।
মরক্কো এবং আন্দালুসের একটি দল মিশর এবং হিজাজে সফর করেছিল। হজ এবং জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে। সে-সময় তারা ফিকহ, ইলম এবং হাদিসের জ্ঞান লাভ করে ইমাম মালিক-এর কাছে। এরপর মালিকের ছাত্র এবং সহচরদের কাছে। এ জ্ঞান নিয়ে তারা আন্দালুস ও মরক্কোতে ফিরে এসে সে অনুযায়ী আমল শুরু করে। শুরু হয় মালিকি মাযহাব অনুসারে ফতোয়া প্রদান এবং বিচারকার্য পরিচালনার কাজ। একসময় মালিকি মাযহাব উত্তর আফ্রিকা এবং আন্দালুসের একমাত্র মাযহাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ধীরে ধীরে যাবতীয় আমল এবং বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে তা সরকারি মাযহাবে পরিণত হয়। ব্যাপারটি অবশ্য বিশদ আলোচনার দাবি রাখে।
টিকাঃ
[৮৬৫] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪৭
[৮৬৬] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/৪৪
[৮৬৭] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/৪৫
[৮৬৮] যুহরুল ইসলাম: ৩/২৯; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৪৮ এবং ৫৭
📄 মালিকি মাযহাবের প্রসার
আফ্রিকা এবং আন্দালুসের আলিমরা পূর্বাঞ্চল এবং সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়া নূরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করছিলেন। যাদের টার্গেট ছিল মিশর, হিজাজ এবং মদীনা মুনাওয়ারা থেকে শরীয়তের জ্ঞান আহরণ করা। তাদের আকর্ষণ এতটাই প্রবল ছিল যে, কোনো ফকিহ বা আলিমের পূর্বাঞ্চলে সফর না করাটা দূষণীয় বলে মনে করা হতো।
আন্দালুসে সর্বপ্রথম মালিকি মাযহাব চালু করেছিলেন যিয়াদ ইবনু আবদির রহমান, যিনি বাস্তুর নামে পরিচিত ছিলেন। এরপর ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া আল-আন্দালুসি তরুণ বয়সে পূর্বাঞ্চল সফর করেন। ইমাম মালিক থেকে মুওয়াত্তার সনদ গ্রহণ করেন তিনি। মক্কা এবং মিশরের আলিমদের থেকেও ইলম গ্রহণ করে অবশেষে আন্দালুসে ফিরে আসেন। তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। ইমাম মালিক-এর মাযহাব প্রচারে তার অবদানই সবচেয়ে বেশি। ইয়াহইয়া ছিলেন আন্দালুসে ইলমের পুরোধা। তিনি আমির হিশাম ইবনু আবদির রহমানের সময়কার মানুষ ছিলেন। আর হিশাম ইবনু আবদির রহমান ইমাম মালিককে অনেক সম্মান করতেন। ফলে মালিকি মাযহাব আরও বেশি প্রসার লাভ করে। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া আমির এবং সুলতানদের কাছে উঁচু মর্যাদার অধিকারী হয়ে ওঠেন।
এরপর হাকাম আল-মুরতাযা ইবনু হিশাম আন্দালুসের ক্ষমতায় এসে 'আল- মানসুর' উপাধি গ্রহণ করেন। এটা ১৮০ হিজরির কথা। সে-সময় তিনি আন্দালুসের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ আলিমদের মধ্য থেকে একজনকে নিজের জন্য বিশিষ্ট করে নেন। সেই বিশিষ্টজনটি ছিলেন ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া। যাবতীয় বিষয়ে ইয়াহইয়ার সাথে পরামর্শ করতেন হিশাম। তার পরামর্শ ব্যতীত আন্দালুসের কোনো প্রান্তেই বিচারক নিয়োগ দিতেন না। প্রতিটি বিচারকই ছিল ইয়াহইয়ার বাছাইকৃত এবং তার তত্ত্বাবধানে নিয়োগকৃত। ফলে মালিকি মাযহাব প্রাধান্য দিয়েই বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো। সাধারণ মানুষ এবং বিচারব্যবস্থা ইমাম আওযায়ির অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও বিচারক নিয়োগ চলত মালিকি মাযহাব অনুসারে। কোনো বিচারক মালিকি মাযহাবের বিপরীত ফয়সালা করলেই ইয়াহইয়া তার বরখাস্তের জন্য আবেদন করতেন। এভাবে ইয়াহইয়ার পরামর্শে তৎকালীন আমির আবদুর রহমান আল-আওসাত ১১জন বিচারককে পদচ্যুত করেন।
ইয়াহইয়ার পর আসেন মালিকি মাযহাবের বিখ্যাত ফকিহ আবদুল মালিক ইবনু হাবিব আল-কুরতুবি। ২০৮ হিজরিতে মিশর এবং মদীনা মুনাওয়ারায় সফর করে তিনি প্রভূত ইলম হাসিল করেন। এরপর ২১৬ হিজরিতে ফিরে আসেন আন্দালুসে। তৎকালীন আমির আবদুর রহমান ইবনুল হাকাম পরামর্শ এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কের জন্য তাকে মুফতিদের বোর্ডে নিয়োগ প্রদান করেন। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়ার পরে তিনিই ছিলেন আন্দালুসে মালিকি মাযহাবের পুরোধা। মালিকি মাযহাবের প্রচার-প্রসারের জন্য তিনি 'আল-ওয়াদ্বিহাহ' গ্রন্থ রচনা করেন। ক্রমেই আন্দালুসের অধিবাসীরা এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এভাবেই আন্দালুসে ছড়িয়ে পড়ে মালিকি মাযহাব।
অপরদিকে আফ্রিকার তিউনিসিয়াতে ছিলেন মালিকি মাযহাবের বিখ্যাত আলিম সাহনুন। তার পুরো নাম ছিল আবদুস সালাম ইবনু সাঈদ আত-তানুখি। তিনি মূলত সিরিয়ার হিমসের লোক। তার বাবা হিমসের সেনাবাহিনীর সাথে তাকে মরক্কোতে নিয়ে এসেছিলেন। সাহনুন মরক্কোতে পড়াশোনা করার পর ১৮৮ হিজরিতে সফর করেন পূর্বাঞ্চলে। মিশরে ইমাম মালিকের ছাত্র ইবনুল কাসিম, ওয়াহাব এবং আশহাবের কাছে তিনি ফিকহ শিক্ষা করেন। এরপর সরাসরি ইমাম মালিক থেকে ইলম গ্রহণের জন্য মদীনায় গমন করেন। কিন্তু তিনি সেখানে পৌঁছার আগেই মালিক-এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। এরপর ১৯১ হিজরিতে সাহনুন ফিরে আসেন আফ্রিকায়। আফ্রিকার তিউনিসিয়াতে তিনিই ছিলেন মালিকি মাযহাবের পুরোধা। আসাদ ইবনুল ফুরাতের পর তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ এবং মালিকি মাযহাব প্রচার করেন। যার কারণে বিচারব্যবস্থা মালিকি মাযহাবের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বর্ণিত আছে, একবার সাহনুন জনৈক ব্যক্তিকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। লোকটি ইরাকি তথা হানাফিদের থেকে ইলম শিখেছিলেন বিধায় সাহনুন তাকে মদীনাবাসীদের মতাদর্শ তথা মালিকি মাযহাব অনুসারে বিচার পরিচালনার শর্তারোপ করেছিলেন। সাহনুন বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ২৪০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। সে-সময় তার বয়স ছিল ৭৪ বছর।
সাহনুন এবং মালিকি মাযহাবের অন্যান্য আলিমরা মনে করতেন, মরক্কোতে মালিকি মাযহাব পরিপূর্ণভাবে ছড়িয়ে পড়ায় আফ্রিকাতে এখন ভিন্ন কোনো মাযহাবের ফতোয়া গ্রহণযোগ্য হবে না। তারা মানুষকে মালিকি মাযহাবের ওপরই সীমাবদ্ধ করে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা পারেননি। ৪০৬ হিজরিতে তিউনিসিয়াতে প্রশাসক হয়েছিলেন মুইয ইবনু বাদিস আল-মানসুরি আস-সানহাজি। মিশর এবং মরক্কোর ফাতিমি মতাবলম্বী শাসকরাও তাকে স্বপদে বহাল রেখে 'শারাফুদ্দৌলা' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তার শাসনামলে রাজ্যের সর্বত্র নিরাপত্তা বিরাজ করত। তিনি আলিমদের কাছাকাছি রাখতেন। এ ছাড়া অনেক মসজিদও তার হাত ধরে নির্মিত হয়েছিল। শিয়াদের ফাতিমি মাযহাব তখন প্রচলিত। তার বক্তব্য ছিল ফাতিমিদের উদ্দেশ্য করে। কিন্তু ৪৪০ হিজরিতে তিনি সেটা বদল করে আব্বাসিদের টার্গেট বানিয়ে দেন। আফ্রিকার মানুষকে তিনি মালিকি মাযহাব অনুসারে চলতে বাধ্য করেন। আগে সেখানে হানাফি মাযহাবের প্রচলন ছিল। কিন্তু তিনি মরক্কোর সকল অধিবাসীকে মালিকি মাযহাব অনুসরণ করার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ করেন। এভাবে মরক্কো থেকে হানাফি মাযহাব প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। শুধু মালিকি মাযহাব মেনে চলা আবশ্যক হওয়ায় একসময় আন্দালুস এবং আফ্রিকার যাবতীয় মানুষ এর অনুসারী হয়ে পড়ে। তখন বিচারকার্য পরিচালনা এবং ফতোয়া প্রদানের জন্য সর্বত্র কেবল মালিকি মাযহাব অনুসারীকে নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। আপামর জনসাধারণও এই নীতি অনুসরণ করতে থাকে। একপর্যায়ে মালিকি মাযহাব রাষ্ট্রীয় মাযহাব হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এখন পর্যন্ত সেখানে তা বহাল রয়েছে। অবশ্য আফ্রিকা যখন উসমানি সালতানাতভুক্ত ছিল, তখন কিছুকালের জন্য মালিকি মাযহাব অনুসারে আমল বন্ধ ছিল।
এভাবে বিচারব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য মাযহাব হিসেবে মালিকি মাযহাবই আমলযোগ্য উৎস হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কোনো একটি নির্দিষ্ট মাযহাব মেনে চলা জায়েজ হওয়ার সপক্ষে প্রমাণ দিতে গিয়ে ইবনু ফারহুন লিখেছেন, 'কর্ডোভার প্রশাসকরা কাউকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিলে এই শর্ত লিখে দিতেন যে, ইমাম মালিকের সূত্রে ইবনুল কাসিমের বর্ণনা পরিত্যাগ করা চলবে না। তবে কোনো ব্যাপারে তাঁর বর্ণনা না পাওয়া গেলে সেটা ভিন্ন কথা।'
মালিকি মাযহাবকে বিচারব্যবস্থার উৎস হিসেবে অনুমোদন দেওয়ার জোরদার সমর্থন করে তিনি লিখেন, 'এটা ইজতিহাদের পরবর্তী যুগ এবং নির্দিষ্ট একটি মাযহাবকে অনুসরণের বিষয়টি এখন প্রচলিত। মালিকি মাযহাবের আলিমরা বলেছেন, মানুষ তাদের কাছে কোনো মোকদ্দমা নিয়ে এজন্যই আসে, যাতে তারা এই মাযহাব অনুসারে ফয়সালা করে দেন।'
তা ছাড়া আন্দালুস এবং উত্তর আফ্রিকার বিচারকরা কাযিউল জামাআহ-এর ইজতিহাদ এবং রায়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। যাকে পূর্ববর্তী বিচারকার্যের মতো রেফারেন্স মনে করা হতো। বিচারকরা সামাজিক প্রচলন এবং নিয়ম-কানুনের মতো সেসব মেনে চলতেন।
ওপর্যুক্ত আলোচনার অর্থ এটা নয় যে, আন্দালুস এবং উত্তর আফ্রিকাতে অন্যান্য মাযহাব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বরং পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত যাহিরি মাযহাবের সাথে এর শক্তিশালী বিরোধ চলতে থাকে। সে-সময় (৪৫৬ হিজরিতে) ইবনু হাযাম যাহিরি কঠিনভাবে মালিকি মাযহাবের বিরোধিতা শুরু করেন। একপর্যায়ে ৫৫০ হিজরির কাছাকাছি সময়ে আমির আবদুল মুমিন যাহিরি চিন্তাচেতনা গ্রহণ করে নেন। তিনি সমস্ত মানুষকে যাহিরি মতাদর্শের ওপর একত্র করতে চাইলে মালিকি মাযহাবের আলিম এবং ফকিহরা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তারা আমিরকে এই সংকল্প থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করেন। এভাবেই চলতে থাকে ফিকহি মতবিরোধ। এরপর মুওয়াহহিদরা আন্দালুসে প্রবেশ করলে পুনরায় ইজতিহাদের ধারা চালু হয়। নির্দিষ্ট কোনো মাযহাব অনুসারে আমল করতে তারা নিষেধ করে। অবশেষে বনু মারিন ক্ষমতায় আসলে তাদের এই প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়। মালিকি মাযহাবের ফিকহি গ্রন্থগুলো তারা পুনরায় চালু করেন।
মরক্কোর আমির ইউসুফ ইবনু আবদিল মুমিনের সহিহুল বুখারি মুখস্থ ছিল। ফকিহদের মাঝে ব্যাপক মতানৈক্য এবং গোঁড়ামি দেখে তিনি সমস্ত মাযহাব বর্জন করার নির্দেশ দিয়ে ফরমান জারি করেন। শুধু তা-ই নয়, মালিকি মাযহাবের সকল গ্রন্থ তিনি পুড়িয়ে ফেলার আদেশও দিয়েছিলেন। ফকিহদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল কিতাবুল্লাহ এবং সুন্নাহ অনুযায়ী ফতোয়া প্রদান করা। কোনো ব্যক্তি-বিশেষের অনুসরণও নিষেধ ছিল সে-সময়। বিচারকের রায় দিতে হতো কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং কিয়াস অনুযায়ী। তবে এ নির্দেশনা স্থায়ী হয়নি। আমির ইউসুফের মৃত্যুর পর লোকেরা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়।
মুনযির ইবনু সাঈদ (৩৫৫ হি.) -এর জীবনীতে আছে যে, দাউদ যাহিরির ফিকহের দ্বারা তিনি প্রভাবিত ছিলেন। দাউদের মতাদর্শিক গ্রন্থগুলো একত্রিত করা, তার বক্তব্য দিয়ে দলিল প্রদান করা ছিল তার অভ্যাস। তবে সেগুলো ছিল একান্তই ব্যক্তিগত। বিচারকার্য মালিকি মাযহাব অনুসারেই পরিচালিত হতো।
আবদুল মুমিনের নাতি ইয়াকুব দায়িত্ব গ্রহণের পর মানুষকে ইবনু হাযামের মতাদর্শে অনুপ্রাণিত করতে চাইলে তৎকালীন ফকিহরা তার বিরোধিতা শুরু করেন। আবু ইয়াহইয়া ইবনুল মাওয়াক ছিলেন এসব ফকিহদের অন্যতম। তৎকালীন আলিমদের মাঝে হাদিস এবং ফিকহশাস্ত্রের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত ছিলেন তিনি। আমিরের ঘটনা শুনতে পেয়ে তিনি লাগাতার কয়েকদিন নিজের ঘরে অবস্থান করে ইবনু হাযামের বিপক্ষে উত্থাপিত মাসআলাগুলো সংকলন করেন। তিনি সবসময় আমিরের বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন। এবার টানা কয়েকদিন অনুপস্থিত থাকলে আমির এর কারণ জানতে চাইলেন। উত্তরে ইবনুল মাওয়াক বললেন, 'আমি তো আপনাদের কাজেই ছিলাম। শুনতে পেলাম, আপনারা মানুষকে ইবনু হাযামের মতাদর্শে অনুপ্রাণিত করার চিন্তাভাবনা করছেন। অথচ তাতে এমন এমন বিষয় রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।' এই বলে তিনি একটা নোটখাতা বের করলে আমির সেটা উলটেপালটে দেখলেন। তারপর বললেন, 'এমন বিষয়ে উম্মতে মুহাম্মাদিকে অনুপ্রাণিত করার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে পানাহ চাচ্ছি।' এরপর তিনি ইবনুল মাওয়াকের প্রশংসা করে নিজের ঘরে চলে গেলেন। তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।
মারাকিশি বর্ণনা করেছেন, মুরাবিতদের আমির আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনু ইউসুফ কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী ফয়সালা করার নির্দেশ দিয়ে মালিকি মাযহাবের গ্রন্থগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ জারি করেছিলেন।
আন্দালুস ও মরক্কোতে মালিকি মাযহাবের প্রচার-প্রসার এবং গ্রহণযোগ্যতার কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে ইবনু খালদুন বলেন, 'মরক্কো এবং আন্দালুসের বাসিন্দারা ইমাম মালিকের মাযহাব বিশেষভাবে গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদের মধ্যে মালিকি মাযহাব পাওয়া গেলেও আন্দালুস এবং মরক্কোর লোকেরা খুব কম ক্ষেত্রেই মালিকি মাযহাব ছাড়া অন্য কিছুর অনুসরণ করত। এর অন্যতম কারণ ছিল-এখানকার বাসিন্দারা প্রায়ই হিজাজে সফর করত। আর সে-সময় মদীনা ছিল ইলমের প্রাণকেন্দ্র। ইলম তো মদীনা থেকেই ইরাকে গিয়েছিল। আন্দালুস থেকে হিজাজ গমনের পথে ইরাক না পড়ায় তাদের দারসগ্রহণ কেবল মদীনার আলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। সে-সময় তাদের উসতায বলতে ছিলেন ইমাম মালিক, তাঁর শাইখগণ এবং তাঁর ছাত্রবৃন্দ। এজন্য মরক্কো ও আন্দালুস-সহ যাদের পথ মদীনার দিকে ছিল, তারা কেবল ইমাম মালিকের কাছেই যাতায়াত করত।
আরেকটি কারণ হলো, আন্দালুস ও মরক্কোর অধিবাসীদের মাঝে গ্রামীণ জীবনের বেশ প্রভাব ছিল। ইরাকের বাসিন্দাদের মতো শহুরে জীবনে তারা অভ্যস্ত ছিল না। ফলে হিজাজের প্রতিই তারা বেশি আকৃষ্ট হয়। এ কারণেই মালিকি মাযহাব তাদের কাছে প্রথম যুগের মতো সরল রয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সভ্যতার সংস্করণ এবং পরিমার্জনের কোনো ছোঁয়া তাতে লাগেনি। যেমনটা অপরাপর মাযহাবের ক্ষেত্রে হয়েছিল। '
আন্দালুস ও মরক্কোর বাসিন্দাদের ওপর মালিকি মাযহাব প্রভাব বিস্তার করার আরও অনেক কারণ আছে। তার মধ্যে একটি হলো মদীনার ক্বারি নাফে-এর ক্বিরাত অনুসরণ করা। নাফে ছিলেন প্রসিদ্ধ সাতজন ক্বারির অন্যতম। কথিত আছে, ইমাম মালিক বলেছিলেন, 'মদীনাবাসীদের ক্বিরাত হলো সুন্নতি পদ্ধতি।' তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সেটা কি নাফে-এর পঠনপদ্ধতি? মালিক তখন হাঁ-বাচক উত্তর দিয়েছিলেন। মরক্কো ও আন্দালুসের লোকেরা কুরআনের হরকত এবং নোকতার ক্ষেত্রেও মদীনার রীতি অনুসরণ করত।
আন্দালুসের লোকেরা আকীদার ব্যাপারেও ইমাম মালিকের অনুসরণ করত। যিম্মি তথা ইসলামি দেশে কর দিয়ে বসবাসরত কাফিরদের ব্যাপারেও আন্দালুসের ফকিহগণ মালিক-এর সাথে সহমত পোষণ করতেন।
আন্দালুস ও মরক্কোতে মালিকি মাযহাব এককভাবে প্রভাব বিস্তারের কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল সৃষ্টি হয়েছিল। আর সেটা হলো আলিমদের ঐক্য, তাদের শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব এবং বিচারের রায়ের ক্ষেত্রে কোনো দ্বিমত না থাকা। এর ফলে শাসক এবং জনগণের দৃষ্টিতে বিচারকদের অবস্থান, সম্মান ও মর্যাদা বেড়ে গিয়েছিল।
আল-মাকদিসির সূত্রে শাইখ মাহমুদ আরনুস বর্ণনা করেছেন, 'স্পেনের লোকেরা কুরআন এবং ইমাম মালিকের মুওয়াত্তা ছাড়া কিছুই বুঝত না। হানাফি অথবা শাফিয়ি মাযহাবের অনুসারীদের দেখলে স্পেন থেকে তাড়িয়ে দিত। মুতাযিলা, শিয়া বা অন্য কোনো মতাদর্শের ব্যক্তি যে সেখানে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতো-তা তো বলাই বাহুল্য। কেননা অধিকাংশ সময় তারা এমন ব্যক্তিদের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করত।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল র-এর শিষ্য বাকি ইবনু মাখলাদ পূর্বাঞ্চলে সফরের সময় বাগদাদের অনেক আলিমদের থেকে ইলম অর্জন করেছিলেন। তিনি নির্দিষ্ট কোনো মাযহাব মেনে চলতেন না। আন্দালুসে তিনিও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন।
টিকাঃ
[৮৬৯] গ্রন্থকার এখানে 'বাস্তুর' বললেও আমাদের খোঁজমতে 'শাবতুন' পাওয়া গেছে। সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৯/৩১২- অনুবাদক
[৮৭০] যুহরুল ইসলাম: ৩/২৩; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৪৮; কুরতুবাতু ফিল আসরিল ইসলামি, পৃ. ৩১৮; মারজিউল উলুমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৩০৩
[৮৭১] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/৪৬; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৯৫ এবং ১৮৭; তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২৮; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০৪
[৮৭২] আল-আ'লাম: ৮/১৮৬; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৪৯ এবং ১৮৮; যুহরুল ইসলাম, পৃ. ১২৯; আল-মু'জিব ফি তালম্বীসি আখবারিল মাগরিব, পৃ. ২৭৩
[৮৭৩] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/৪৫
[৮৭৪] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/৪৬
[৮৭৫] কুরতুবাতু ফিল আসরিল ইসলামি, পৃ. ৩০৫
[৮৭৬] তারীখুল কাম্বা, পৃ ৫১; যুহরুল ইসলাম: ৩/৬৬; আল-মু'জিব, পৃ. ৩০৬
[৮৭৭] তারীখুল কুযা, পৃ. ৮৫; যুহরুল ইসলাম: ৩/৬৬; আল-মু'জিব, পৃ ৩০০-৩১১ এবং ৩১৬
[৮৭৮] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৭৪
[৮৭৯] তারীখুল কুযা, পৃ. ৫৬
[৮৮০] আল-মু'জিব ফী তালখীসি আখবারিল মাগরিব, পৃ. ৩৩৬ এবং ৩৫৪
[৮৮১] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ৪৪৯
[৮৮২] নাফের জীবনী এবং ইমাম মালিকের বক্তব্য জানতে দেখুন, গায়াতুন নিহায়া ফী তবাকাতিল কুররা: ২/৩৩০; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৫২। আমির আবদুর রহমান আদ-দাখিলের সময় আবু মুহাম্মাদ আল-আন্দালুসি গাযি ইবনু কায়স (১৯৯ হি.) আন্দালুসে সর্বপ্রথম নাফের পঠনপদ্ধতি চালু করেছিলেন। গাযির জীবনী জানতে দেখুন, গায়াতুন নিহায়া: ২/২।
[৮৮৩] দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুস ওয়া হাদ্বারাতিহা, পৃ. ১৬৩
[৮৮৪] তারীখুল কুদ্বা, পৃ. ৬১
[৮৮৫] বাকি ইবনু মাখলাদের জীবনী জানতে দেখুন, আল-মু'জিব ফী আখবারিল মাগরিব, পৃ. ৪৯ এবং বুগইয়াতুল মুলতামিস ফী তারীখি রিজালি আহলিল আন্দালুস, পৃ. ২২৯
📄 বিচার-সংক্রান্ত পরিধি
ইতিপূর্বে 'বিচারের সময়' নিয়ে আলোচনা করার সময় আমরা বিচারের সময়গত পরিধি নিয়ে আলোচনা করেছি। আর বিচারের স্থানগত পরিধি নির্দিষ্ট শহর, গ্রাম বা সরকারি নিয়োগপত্রে উল্লেখিত নির্ধারিত প্রদেশের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত। বাকি আছে কেবল পরিধির ধরন সংক্রান্ত আলোচনা। এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকা এবং আন্দালুসেও এটার অনেক প্রশংসনীয় বিস্তৃতি ছিল। নৈপুণ্য, বিন্যাস এবং বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে এই পরিধি অনেক সময় পূর্বাঞ্চলকেও ছাড়িয়ে যেত।
• বিচারকার্যের বিন্যাস
বিচারকার্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহে বিন্যস্ত করার মাধ্যমে পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলে বিচারব্যবস্থা স্থায়িত্ব লাভ করেছিল। বিচার সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল: (ক) সাধারণ বিচার বিভাগ, (খ) হিসবাহ বিভাগ এবং (গ) সামরিক বিচার বিভাগ।
আন্দালুসে এসব বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানকে বলা হতো 'খুত্তাহ'। কিংবা প্রতিটি বিভাগ তার পরিচালকের নামে পরিচিতি লাভ করত। সুতরাং খুত্তাতুল কাদ্বা, খুত্তাতুল মাযালিম এবং খুত্তাতুল হিসবাহ বা খুত্তাতুস সুক বলার মতো সাহিবুল মাযালিম, সাহিবুল হিসবাহও বলা হতো। আন্দালুসে এই প্রধান খুত্তাহ তথা বিভাগ তিনটির সাথে আরও কিছু বিভাগ ছিল। যেমন: (ক) বিচারের রায় পুনঃনিরীক্ষণ বিভাগ, (খ) অভিজাত শ্রেণির বিচার বিভাগ, (গ) পুলিশ বিভাগ এবং (ঘ) খ্রিষ্টান এবং অনারবদের বিচার বিভাগ। এগুলোর আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে।
আমরা প্রথমে আলোচনা করব সাধারণ বিচার বিভাগ নিয়ে। রাজধানী বা প্রধান শহরে যার পরিচালনায় থাকতেন কাযিউল জামাআহ। তারপর পর্যায়ক্রমে বড় শহরের বিচারক, তারপর ছোট ছোট শহর এবং গ্রামের বিচারকের কথা আসবে। যাকে 'মুসাদ্দাদে খাস' তথা ছোটখাটো বিচারক বলা হতো। এ কথা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। পুনঃনিরীক্ষণ, অভিজাত শ্রেণির বিচার এবং খ্রিষ্টান বা অনারবদের বিচার-এই বিভাগ তিনটি ছিল সাধারণ বিচার বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত।
• সাধারণ বিচার বিভাগের পরিধি
আন্দালুসের সাধারণ বিচার বিভাগের পরিধি হুবহু পূর্বাঞ্চলের মতোই ছিল। আন-নুবাহি বলেছেন, 'বিচারকের অতীত এবং বর্তমানের পরিধির সীমা একই রকম ছিল। এর মাঝে কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটত না। বিচারক ছাড়া শাসকরাও এর মাঝে রদবদল করতেন না। আলি ইবনু ইয়াহইয়া তার গ্রন্থে বিচারকের কর্মপরিধি বর্ণনা করেছেন এভাবে:
১. বাদী-বিবাদীর মধ্যকার বিবাদ মীমাংসা করা। সেটা পারস্পরিক বৈধ সমঝোতার মাধ্যমেও হতে পারে, আবার কোনো আয়াতের নির্দেশনা মানার জন্য তাদেরকে চাপ প্রয়োগ করার মাধ্যমেও হতে পারে।
২. অধিকারপ্রার্থীকে তার হক পূর্ণরূপে আদায় করে দেওয়া। স্বীকারোক্তি বা দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে অধিকার পৌঁছে দেওয়া।
৩. মানসিক বিকারগ্রস্ত ও বোকা লোকদের সম্পত্তি রক্ষার জন্য তাদের অভিভাবক ঠিক করে দেওয়া। দেউলিয়া ব্যক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আরোপ করা।
৪. ওয়াকফকৃত সম্পত্তি এবং সেগুলোর মুতাওয়াল্লীদের খোঁজখবর রাখা।
৫. কোনো ব্যক্তি শরীয়ত অনুমোদিত শর্তসাপেক্ষে ওসিয়ত করে গেলে সেটা বাস্তবায়ন করা। নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে ওসিয়ত করে গেলে সে সম্পত্তি তার হাতে অর্পণ করা। অনির্ধারিত ব্যক্তির জন্য ওসিয়ত করে গেলে তার অধিকার সাব্যস্ত হবে কি না, সে ব্যাপারে ইজতিহাদ করা। এই সম্পত্তির কোনো ওয়ারিশ পাওয়া গেলে সে এগুলোর দেখাশোনা করবে। অন্যথায় এ দায়িত্ব ন্যস্ত হবে বিচারকের ওপর।
৬. অভিভাবক না থাকলে উপযুক্ত পাত্র বা পাত্রীর সাথে ইয়াতিমের বিবাহ দেওয়া। বিবাহের পরও তাদের খোঁজখবর রাখা।
৭. দণ্ডবিধি প্রয়োগ করা। বিষয়টি আল্লাহর হক-সংক্রান্ত হলে স্বীকারোক্তি বা দলিলের মাধ্যমে বিচারক নিজেই সেটা প্রয়োগ করবেন। পক্ষান্তরে সেটা যদি বান্দার হক হয়, তাহলে অধিকারপ্রার্থীর দাবি অনুযায়ী সেটা প্রয়োগ করা হবে।
৮. জনস্বার্থ দেখভাল করা। রাস্তাঘাট-সহ সর্বত্র যাবতীয় অন্যায় প্রতিরোধ করা। ঘর থেকে শরীয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড দূর করা।
৯. সাক্ষীদের যাচাই-বাছাই করা। আমানতের মাল গ্রহীতাদের খোঁজখবর রাখা। এ কাজে উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচন করা।
১০. শক্তিশালী এবং দুর্বলের মাঝে বিচারের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা। অভিজাত এবং অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মাঝে ইনসাফ করা।
এরপর আন-নুবাহি লিখেন, 'অধিকাংশ আলিমের মতে, দণ্ডবিধি প্রয়োগ এবং যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করা বিচারকের দায়িত্ব। যেমন: মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, অন্যায় প্রতিহত করা এবং জনস্বার্থের প্রতি খেয়াল রাখা। তবে সেনাবাহিনী প্রস্তুত এবং কর আদায় করার অধিকার আমির কিংবা খলিফার জন্য সংরক্ষিত।'
ইবনু খালদুন আল-মুকাদ্দিমাহ গ্রন্থের ৩১তম পরিচ্ছেদে দ্বীনের বিভিন্ন বিভাগ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন। এগুলোর প্রথমটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তারপর হচ্ছে নামাজের ইমামতি। তিনি লিখেন, 'বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব হচ্ছে খিলাফতের অধীনে পরিচালিত দায়িত্বসমূহের একটি।' এরপর তিনি বিচারকের কর্মপরিধি বর্ণনা করেছেন। যেমনটা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। বাগদাদে আল-মাওয়ারদি আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ গ্রন্থে যেসব আলোচনা করেছেন, আবুল হাসান আন-নুবাহি এবং ইবনু খালদুনের বক্তব্য মনে হয় সেখান থেকেই নেওয়া হয়েছে।
• সাধারণ বিচার বিভাগের কর্মপরিধির বিন্যাস
সাধারণ বিচার বিভাগে যেসকল দায়িত্ব ও কর্মপরিধি রয়েছে, সেগুলো দু'ধরনের হতে পারে। হয়তো তাতে বিচারক পরিপূর্ণ কতৃত্বের অধিকারী হবেন। তার কর্মপরিধি হবে সার্বজনীন। নয়তো তাকে কোন অংশের দায়িত্ব দেওয়া হবে। অথবা বিচারকার্যের দায়িত্বের পাশাপাশি কিছু সংখ্যক নির্ধারিত পরিধির দায়িত্ব থাকবে।
সাধারণ বিচারক: তিনি হচ্ছেন শরয়ী কাযী। আমরা ইতিপূর্বে শরীয়তের বিধিবিধান সংশ্লিষ্ট যেসব বিচারাচার নিয়ে আলোচনা করেছি সেসব ক্ষেত্রে বিচারকের সার্বজনীন পরিধি থাকবে। মূলত সাধারণ বিচারকের এই বৈশিষ্ট্য প্রত্যেক শরয়ি বিচারকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অধিকাংশ শরয়ি বিচারকের ক্ষেত্রে এ বৈশিষ্ট্য কার্যত প্রয়োগ হবে। বিশেষত কাযীউল জামাআহ, বড় বড় শহরের বিচারক এবং বাকি অন্যান্য বিচারকের মধ্যেও এ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।
আর বিচারকের কর্মপরিধি যদি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় বা নির্দিষ্ট কোনো অংশের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয় অথবা যদি নির্দিষ্ট পরিধির বাইরে অন্য এক বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে অন্যান্য ব্যাপারে তাকে দেখাশোনা করতে নিষেধ করে দেওয়া হয় তাহলে এই বৈশিষ্ট্য আর থাকবে না। এ কারণেই আন্দালুসে বিচারের এমন কিছু নির্ধারিত বা সীমিত কর্মপরিধির কথা জানা যায় যেগুলো উমাইয়া এবং আব্বাসী যুগে পূর্বাঞ্চলে ছিল না। কিন্তু সার্বজনীন কর্মপরিধিই মৌলিক আর কেন্দ্রীয় পরিধি হিসেবে থেকে যায়। অপরাপর পরিধি ছিল এর ব্যতিক্রম। সাধারণ বিচারক তথা শরয়ী কাযীর দায়িত্ব হলো, হদ (শাস্তিদণ্ড), কিসাস (বদলা), তাযির (শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নয় এমন শাস্তি, যা নির্ধারণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের), পরিবারনীতি এবং সবধরনের লেনদেন এবং যাবতীয় অধিকারের ব্যাপারে ফয়সালা করা। যেগুলোর বিবরণ পূর্বে গিয়েছে।
উসতায আহমাদ আমিন বলেন, 'আন্দালুসের মুসলিমদের কাছে বিচার-সংক্রান্ত দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বড় পদ। কারণ এটা ছিল দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত। বিচারকের ক্ষমতা ছিল সবচেয়ে বিস্তৃত। কেননা বিচারক নিজের বক্তব্য শোনানোর জন্য খলিফা অথবা প্রশাসককে উপস্থিত করতে পারতেন। সাধারণ বিচারকের ওপরে থাকত আরেকজন বড় বিচারক। যাকে "কাযিউল জামাআহ” তথা প্রধান বিচারপতি বলা হতো। শাসকের অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অধিকার কেবল তিনিই সংরক্ষণ করতেন। মদ্যপান এবং ব্যভিচারের কারণে তিনি শাস্তি দিতেন।' আমরা এগুলো 'তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস' গ্রন্থ থেকে ইতিমধ্যেই বর্ণনা করেছি। আবুল হাসান আন-নুবাহি সেগুলো নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা করেছেন।
গ্রাম্য সালিশের বিচারক: এটি ছিল বিচার-সংক্রান্ত একটি শাখা। বিচারের ব্যাপারে এই দপ্তরের পরিচালকের অভিজ্ঞতা থাকত একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। বড় বিচারকরা তাকে মফস্বল বা কোনো পাড়া-মহল্লায় সালিশ পরিচালনার দায়িত্ব দিতেন।
ছোটখাটো বিষয়ের বিচারক: বিচার বিভাগের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কার্যাবলি পরিচালনা করতেন। ছোটখাটো কোনো গ্রাম তার আওতাধীন থাকত।
সামরিক বিচারক: স্বাভাবিকভাবে তার দায়িত্ব ছিল পূর্বে উল্লেখিত গণ্ডির ভেতর বিচারকার্য পরিচালনা করা। তবে বেশির ভাগ সময় সৈনিক এবং অফিসারদের মধ্যকার বিভিন্ন বিরোধ নিরসনের দায়িত্ব তিনি পালন করতেন। আবদুর রহিম ইবনু ইসমাঈল মরক্কোর 'সালা' শহরে এই দায়িত্ব পরিচালনা করতেন। আরও ছিলেন আসাদ ইবনুল ফুরাত। যিনি একাধারে বিজ্ঞ ফকিহ, সেনাপতি এবং সামরিক বিচারক। ২১৩ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
নিকাহ বিচার বিভাগ: বিবাহ সংঘটিত হওয়া এবং বিবাহের সাথে শাখাগত বিভিন্ন বিষয় এর আওতাধীন ছিল। বিবাহ, তালাক ইত্যাদি ব্যক্তিগত বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত যে বিচারক বর্তমানকালে প্রচলিত আছে, সে যুগে তাকেই বিবাহের বিচারক বলা হতো। আন্দালুসে এ কাজের দায়িত্ব স্পেশাল জজের ওপর অর্পণ করা হতো। অনেক জজ এই বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যায়দুন আল-মাখযুমি ছিলেন তাদের অন্যতম। তার জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে 'আত-তাকমিলাহ' গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে আল-কাসিমি বর্ণনা করেন, 'যায়দুন আল-মাখযুমিকে প্রধান বিচারপতি আবুল কাসিম ইবনু হামদাইন নিকাহ-সংক্রান্ত দায়িত্ব দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনু কায়সারের জীবনীতেও এমনটা এসেছে। মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-মুরাদির জীবনীতে আছে, তিনি মারাকিশের অধিবাসী ছিলেন। দীর্ঘদিন যাবৎ সেখানে নিকাহ-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুখাল্লাদ ইবনু ইয়াজিদের জীবনীতে আছে, তিনি নিজ শহরে দীর্ঘদিন বিয়েশাদি-সংক্রান্ত জজের দায়িত্ব পালন করেছেন। পূর্বাঞ্চলে সুনির্দিষ্টভাবে এই পরিধি কোনো জজের দায়িত্বে ছিল না। তবে ইয়াতিম বা অসহায়ের বিবাহের ব্যবস্থা করা ছিল সাধারণ বিচারকের পরিধির আওতাভুক্ত।
উত্তরাধিকার সম্পত্তির দায়িত্ব: এই বিভাগ শরীয়তের আইন অনুসারে উত্তরাধিকার সম্পত্তি (ইলমুল ফারায়েয) বণ্টনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-আনসারির জীবনী উদ্ধৃত করে আল-কাসিমি লিখেন-'তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আন্দালুসের ভ্যালেন্সিয়া শহরে উত্তরাধিকার সম্পত্তি সংক্রান্ত যাবতীয় বিচারের দায়িত্ব পালন করেছেন।' আহমাদ ইবনু আবদিল আজিজ আল-আযদির জীবনীতে আছে, 'তাকে একাধিক বার আরবোলার বিচার-ফয়সালার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিচার উপদেষ্টার পাশাপাশি উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের অতিরিক্ত দায়িত্বও তিনি পালন করেন।' কারী তারিক ইবনু মূসা আল-মুআফিরির জীবনীতে আছে, 'তিনি হিসবাহ এবং মিরাস বণ্টনের দায়িত্ব একসাথে পালন করেছেন।' এই বিভাগটি পূর্বাঞ্চলে স্বতন্ত্রভাবে চালু ছিল না। সেখানে এটি সাধারণ বিচারকের আওতাধীন দপ্তর হিসেবে পরিচালিত হতো। এই দায়িত্ব এখন শারঈ বিচারকের সাথে সম্পৃক্ত। সাধারণত শারঈ বিচারব্যবস্থায় এই বিভাগের জন্য একজন স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। যার দায়িত্ব থাকে হিসবাহ ও ফারায়েয। যার কারণে তাকে 'আল-ফারযি'-ও বলা হয়।
টিকাঃ
[৮৮৬] তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫-৬
[৮৮৭] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২১৮-২২১
[৮৮৮] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭০
[৮৮৯] যুহরুল ইসলাম: ৩/১৮
[৮৯০] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫৩-৫৪; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৫৯
[৮৯১] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩৬৫-৩৬৬; আত-তাকমিলাহ: ১/৩৩৫ এবং ৪৩৮
[৮৯২] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৬৭ এবং ২৬৮; আত-তাকমিলাহ: ১/৬৮, ৭২, ২৪৪
📄 বিচারকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব
আন্দালুসের বিচারকদের দায়িত্ব কেবল আইন-সংক্রান্ত দিকের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ছিল পূর্বাঞ্চলের বিচারকদের মতোই। বিচারের পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তাদের পালন করতে হতো। তাদের মর্যাদা উঁচু হওয়ার কারণে শাসক এবং জনগণ—উভয়েই তাদের ওপর আস্থা রাখত। তাই গুরুতর, কঠিন ও জটিল বিষয়াদির দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত হতে থাকে। কারণ তাদের একনিষ্ঠতার প্রতি সকলের আস্থা ছিল। তারা নিপুণভাবে নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতেন। তাদের রাষ্ট্রীয় আমানতদারিতার ব্যাপারে শাসক-প্রশাসক কিংবা সাধারণ মানুষ—কারোরই কোনো অভিযোগ ছিল না। আন্দালুসে বিচারকরা অতিরিক্ত যেসব দায়িত্ব পালন করতেন, সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।
বিচারপতি এবং ইমামতি
আন্দালুস ও মরক্কোর অধিকাংশ বিচারক দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চলে নামাজের ইমামতি করতেন। এ ক্ষেত্রে রাজধানী এবং কর্ডোভা জামে মসজিদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব ছিল খলিফা, প্রশাসক এবং আমির-উমারাদের নামাজে ইমামতি করা।
মুহাম্মাদ ইবনু বাশির আল-মুআফিরির জীবনীতে ইবনুল হারিস আল-খুশানি লিখেন—'মুসআব ইবনু উমরান মৃত্যুবরণ করলে কর্ডোভার বিচারপতির দায়িত্ব কাকে দেওয়া যায়, এ নিয়ে আব্বাস ইবনু আবদুল মালিকের সাথে পরামর্শ করলেন হাকাম। আব্বাস তখন বললেন, মুসআব তো মুহাম্মাদ ইবনু বাশিরের কথা বলে গিয়েছিলেন। মুসআবের জীবনের শেষ দিকে মুহাম্মাদ ছিলেন তার সহযোগী। হাকাম তখন মুহাম্মাদ ইবনু বাশিরকে কর্ডোভায় আসতে বললেন। তিনি এলে, তাকে কাযিউল জামাআহ এবং নামাজের ইমাম নিযুক্ত করলেন।
আবুল হাসান আন-নুবাহি বলেছেন, 'পরবর্তী ফকিহদের মধ্যে ইলম এবং দ্বীনের ব্যাপারে আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আইয়াশ আল-আনসারি ছিলেন অন্যতম। আমাদের মালাগা শহরের অন্যতম প্রধান শাইখ তিনি। বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞানগরিমা, আভিজাত্য, আল্লাহভীতি এবং দুনিয়াবিমুখতায় তিনি ছিলেন অনন্য ব্যক্তি। আমিরুল মুসলিমীন আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ ইবনু ইসমাঈল তাকে মালাগা শহরের প্রধান বিচারপতি এবং আলহামরা মসজিদের খুতবার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তার সবচেয়ে বেশি মিল ছিল মূসা ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি যিয়াদের সাথে। উমাইয়া প্রশাসক আবদুল্লাহ মূসাকে কর্ডোভার বিচারক এবং নামাজের ইমাম বানিয়েছিলেন।
বিচারপতি ও ইমামতির দায়িত্ব পালনকারী মুহাম্মাদ ইবনু হাসানের জীবনীতে আন-নুবাহি লিখেছেন, 'হিজরির সপ্তম শতকের একজন ছিলেন মুহাম্মাদ ... আল-আনসারি আল-মালাগি। ইলম, ইনসাফ, দ্বীনদারি এবং শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ব্যক্তিদের মাঝে তিনি ছিলেন অনন্য। মুহাম্মাদ সফর করেছেন পূর্বাঞ্চলে। সেখানকার শীর্ষস্থানীয় আলিমদের থেকে হাদিসের জ্ঞান আহরণ করেছেন। আন্দালুসে ফিরে আসার পর তাকে শহরের পশ্চিম দুর্গগুলোতে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারপর লোকদের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে মালাগার জামে মসজিদের ইমামতি এবং জুমুআর খুতবা প্রদানের দায়িত্বও অর্পণ করা হয় তার ওপর।
• বিচারকার্য এবং মন্ত্রীত্ব
আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি যাকওয়ানকে আন্দালুসের প্রধান বিচারপতি বলা হতো। তার সম্পর্কে আবুল হাসান আন-নুবাহি বলেন, 'জ্ঞান-গরিমা, স্বচ্ছতা, ইনসাফ এবং দৃঢ়তায় তিনি ছিলেন সেরা বিচারক। আমির আল-মানসুর ইবনু আবি আমিরের নেতৃত্বে পরিচালিত কোনো যুদ্ধ থেকেই তিনি পিছিয়ে থাকেননি। পরবর্তীকালে আমির আবদুর রহমান তাকে প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি মন্ত্রীত্বের দায়িত্বও অর্পণ করেন। বনু আমির সাম্রাজ্যের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি উভয় দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
তদ্রূপ আবদুর রহমান ইবনু ফুতাইসও একাধারে নামাজের ইমামতি, দুর্নীতির বিচার এবং মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন।
• বিচার ও যাকাত তহবিলের দায়িত্ব
কাযি ইয়ায সূত্রে আন-নুবাহি বর্ণনা করেছেন, আহমাদ ইবনু বাকি ৩১৪ হিজরিতে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ এবং প্রাজ্ঞ বিচারক। তিনি একইসাথে যাকাতের তহবিল বণ্টন ও নামাজের ইমামতির দায়িত্বে ছিলেন। তারপর কাযিউল জামাআহর দায়িত্বও পালন করেন।
• বিচারক এবং উপদেষ্টা
বিচারালয়ে উপদেষ্টা পরিষদ কেবল আন্দালুসেই ছিল। হিজরি তৃতীয় শতকে কর্ডোভায় বিচারকদের পরামর্শের জন্য যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অনেক বিচারপতিই এই পরিষদের সদস্য ছিলেন। বিচারকদের উপদেষ্টা পরিষদ শিরোনামে আমরা এটা নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করব।
• সাধারণ বিচার এবং দুর্নীতির বিচার
এ বিভাগটি ছিল সাধারণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বয়ে গঠিত। এটা ছিল সবচেয়ে জটিল এবং সর্বোচ্চ বিভাগ। আবুল মুতাররিফ আবদুর রহমান ইবনু ফাতিসের জীবনীতে আন-নুবাহি লিখেন, 'খলিফা আল-মানসুরের যুগে দুর্নীতি দমন কমিশনের বিচার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনু আবি আমির। তার রায়ের কোনো নড়চড় হতো না। সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই বাস্তবায়িত হতো। জালিমদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল খুবই দুর্দান্ত। মতামত প্রদানের লক্ষ্যে তিনি মন্ত্রীদের বৈঠকে অংশগ্রহণ করতেন। মন্ত্রীত্ব এবং নামাজের ইমামতির পাশাপাশি তিনি কর্ডোভার বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন। আন্দালুসে এমন বিচারক খুবই কম ছিলেন, যিনি একাধারে এতগুলো দায়িত্ব সামলেছেন।
• বিচারকার্য ও নেতৃত্ব
কোনো কোনো বিচারক সেনাপতির দায়িত্বও পালন করতেন। যেমনটা আসাদ ইবনুল ফুরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সামরিক বিচারক হওয়ার পাশাপাশি তিনি খোদ সেনাপতিও ছিলেন।
আমিরের কেউ রাজধানীর বাইরে গেলে রাষ্ট্রের যাবতীয় বিষয় পরিচালনার জন্য বিচারককে স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। এভাবে বিচারকদের অনেকেই খলিফা বা আমিরের প্রতিনিধিত্ব করতেন।
অনেক বিচারপতি খলিফা, আমির এবং শাসকদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। আর শাসকরা তাদের উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না।
• সাধারণ বিচার এবং হিসবাহ
আফ্রিকার বিচারক আবদুস সালাম ইবনু সাঈদের ব্যাপারে আবুল হাসান আন-নুবাহি লিখেন, 'বিচারকদের মাঝে তিনিই সর্বপ্রথম হিসবাহ বিভাগ পরিচালনা করেছেন। তিনি অন্যায় প্রতিহত করার নির্দেশ দিয়েছেন। জামে মসজিদ থেকে বিদআতের আড্ডাগুলো সরিয়ে দিয়েছেন। প্রবৃত্তির অনুসারীদের মসজিদ থেকে বিতাড়িত করেছেন। আমানতের সম্পদ বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষের কাছে রাখার নীতি প্রচলন করেছেন। এর আগে আমানতের সম্পদ থাকত বিচারকদের জিম্মায়।'
• লেখালেখি এবং বিচারকার্য
আবুল কাসিম আবদুর রহমান ইবনু রবির ব্যাপারে আন-নুবাহি লিখেছেন, 'বিভিন্ন শাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পূর্বসূরিদের ন্যায়। সীমালঙ্ঘন এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীর ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। একজন বিজ্ঞ লেখক হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন স্বভাবজাত কবি। বিভিন্ন গোত্রকে (জিহাদের জন্য) সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে তিনি সুলতানের পক্ষ থেকে এমন এক বই লিখেছিলেন, যা মনোবলকে শাণিত করে এবং ঘুমন্তকে বিবেককে করে জাগ্রত। তিনি আমৃত্যু এ পদে বহাল ছিলেন। '
• বিচারপতি এবং সীমান্তরক্ষী
মুনযির ইবনু সাঈদ সম্পর্কে যাফির আল-কাসিমি লিখেন, সরকারি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি সীমান্তেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ফিরিঙ্গি দেশগুলো থেকে মরক্কোতে যাতায়াতকারীরা তার নজরদারিতে থাকত। এটা ৩৩০ হিজরির কথা। সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বর্তমানে যাকে 'বর্ডার গার্ড সিস্টেম' বলা হয়। আর সরকারি কর্মকর্তাদের মনিটর করার জন্য বর্তমানে তদন্ত কমিশন চালু রয়েছে। ফিরিঙ্গি দেশগুলো থেকে যাতায়াতকারীদের নজরদারিতে রাখার অর্থ হলো, আগন্তুকদের পরিচয় জেনে রাখা এবং তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা।
৩৫৫ হিজরি অবধি এসকল দায়িত্ব পালন করে মুনযির ইবনু সাঈদ ইন্তেকাল করেন।
টিকাঃ
[৮৯৩] কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২৮-২৯, ঈষৎ পরিবর্তিত
[৮৯৪] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২০-২১
[৮৯৫] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১১৫। আন-নুবাহি এমন অনেক বিচারকের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা বিচারকার্য পরিচালনার পাশাপাশি নামাজের ইমামতিও করতেন। তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস গ্রন্থের ৮৬ নং পৃষ্ঠায় আবদুর রহমান ইবনু ফুতাইসের কথা আছে। আবার তারতীবুল মাদারিক: ২/৪২৪-এও এমন বিচারকদের কথা আছে।
[৮৯৬] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৮৪, ৮৬ এবং ৮৭
[৮৯৭] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৬৩ এবং ৬৫
[৮৯৮] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩০২
[৮৯৯] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১২৫; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩০২