📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারের সময়

📄 বিচারের সময়


আন্দালুসে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য সুনির্ধারিত এবং বাধ্যতামূলক কোনো সময় ছিল না। কেননা বিচারের উদ্দেশ্য হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন তথা বিবাদ মীমাংসা করার মাধ্যমে হক প্রতিষ্ঠা করা। তা যে-কোনো সময়েই হতে পারে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিচারকরা যথোপযুক্ত সময় গ্রহণ করতেন। যদিও সময় এবং দেশ হিসেবে তাতে ভিন্নতা থাকত। এ ব্যাপারে থাকা মূলনীতি সম্পর্কে ইবনু ফারহুন বলেছেন, 'বিচারকের উচিত বিচারকার্য পরিচালনায় বসার জন্য এমন একটা সময় নির্ধারণ করা, যখন মানুষের কাজকর্মে কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটাবে না।'

কর্ডোভার বিচারক মুহাম্মাদ ইবনু বাশিরের জীবনীতে ইবনুল হারিস আল-খুশানি লিখেন, 'বিচারকার্য পরিচালনা এবং মামলা শুনানির জন্য তিনি সকাল থেকে যুহরের এক ঘণ্টা আগ পর্যন্ত বসতেন। এরপর যুহরের নামাজের পর থেকে আসরের নামাজের আগ পর্যন্ত বসতেন। এ সময় তার মূল কাজ হতো দলিল-প্রমাণ শোনা। এ সময় ভিন্ন কোনো সময় তিনি দলিল-প্রমাণ শুনতেন না।'

আবদুর রহমান ইবনু আহমাদ প্রত্যেক সোম এবং বৃহস্পতিবারে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বসতেন। সম্ভবত তার ধারণা ছিল, শহরের মামলা-মোকদ্দমা এবং বিচারকার্য পরিচালনা করার জন্য দুদিনই যথেষ্ট।

ইবনু আবদিল হাকামের সূত্রে ইবনু ফারহুন বর্ণনা করেছেন, 'দুই ঈদে বা ঈদের কাছাকাছি দিনে, যেমন: আরাফার দিন, তারবিয়ার দিন, হাজিদের যাত্রা করার দিন, হাজিদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের দিন এবং নববর্ষের দিন বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বসতে হতো না। তদ্রূপ অতি বৃষ্টির কারণে রাস্তায় কাদা জমে গেলে সেদিনও বিচারকার্য স্থগিত থাকত। পরবর্তী আলিমদের কেউ কেউ জুমুআর দিনেও বিচারকার্য পরিচালনার জন্য না বসার কথা বলেছেন। এগুলো ছিল সমাজে প্রচলিত ছুটির দিন। এ কারণেই ফকিহগণ বলেছেন, বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বিচারক সাধ্যানুসারে দিনে দুই বেলায় বসবেন।

আন্দালুসে কর্ডোভার বিচারক মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াবকা সম্পর্কে আন-নুবাহি বলেছেন, 'তিনি রমজান মাসে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন না। এ সময়টা আমল এবং ইবাদতের জন্য নিজেকে অবসর রাখতেন। আমৃত্যু এ পদ্ধতি তিনি অব্যাহত রেখেছিলেন। আন-নুবাহির বক্তব্য উল্লেখের পর আল-কাসিমি লিখেন, 'আন-নুবাহির বক্তব্যে "আমল” শব্দটা আছে। এর থেকে বোঝা যায়, তিনি ইবাদত এবং বিচারকার্য সংক্রান্ত অধ্যয়নে মগ্ন থাকতেন। সুতরাং রমজানের এই দিনগুলো বিচারকার্যের ছুটির মতোই ছিল।

আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়ার ছেলে হিশাম যখন মুসআব ইবনু উমরানের কাছে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তাব পেশ করেন, তখন মুসআব অসম্মতি জানালেন। হিশাম তখন পীড়াপীড়ি করতে থাকেন এবং একপর্যায়ে তাকে হুমকিও দেন। মুসআব তখন এই শর্তে দায়িত্ব গ্রহণ করেন যে, জুমুআর দিন-সহ দুদিন তথা শনি এবং রবিবার তাকে নিজের জায়গা-জমি দেখাশোনা করার অনুমতি দিতে হবে। বাকি দিনগুলোতে তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করবেন। হিশাম এ শর্ত মেনে নিয়েছিলেন।

আমির আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া বিচারকার্য পরিচালনায় পালাবদলের পদ্ধতি চালু করেছিলেন। অর্থাৎ দুজন বিচারক পালাবদল করে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন। দুজনের প্রত্যেকের কাজের মেয়াদ হবে এক বছর। সে হিসেবে উমর ইবনু শারাহিল কর্ডোভায় মুআবিয়া ইবনু সালিহের সাথে পালাবদল করে বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন। এক বছর মুআবিয়া দায়িত্ব পালন করতেন, আরেক বছর করতেন উমর।

বর্তমানে প্রচলিত 'দ্রুত বিচার বিভাগ' ছিল পূর্বোল্লেখিত নির্ধারিত সময়ের বাইরে। এ ক্ষেত্রে বিচারকের দায়িত্ব ছিল বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন করা। তা যে সময়ই হোক না কেন। ইবনু ফারহুন বলেছেন, 'এসব ছুটির দিন এবং সময় থেকে ভিন্ন ছিল সেসব বিচার, যেগুলো ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এসব বিচারকার্য হালকাভাবে দেখে দ্রুত সম্পন্ন করা হতো।

এ ব্যাপারে আল-মাওয়ারদি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আদাবুল কাদ্বি'-তে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন এভাবে, 'এক দিনে যদি এমন কোনো মোকদ্দমা বারংবার আসে-যা বিলম্ব করা ঠিক নয়, তাহলে বিচারক সেটাকে মুলতুবি না রেখে তার প্রতি মনোযোগ দেবেন। '

আল-মাওয়ারদি আরও লিখেছেন, 'এই মোকদ্দমা ছাড়া সেদিন যদি এমন আরও বিশেষ মোকদ্দমা আসে-যা বিলম্ব করার কারণে ক্ষতি হয়, তাহলে বিলম্ব করা উচিত নয়।

এসব তথ্য থেকে এটা বুঝে আসে যে, বিচার-সংক্রান্ত আধুনিক আইনকানুন এবং নীতিমালা প্রণীত হওয়ার আগেই ইসলামি ফিকহ এবং ইসলামের বিচারব্যবস্থা ভবিষ্যতের দিকে কতটা অগ্রসর ছিল।

টিকাঃ
[৮৫৪] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/২৭। আল-মাওয়ারদির আদাবুল কাদ্বি: ২/২৪৪ দেখা যেতে পারে।
[৮৫৫] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৩০
[৮৫৬] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/২৮
[৮৫৭] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/২৮; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১২৭
[৮৫৮] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৭৮
[৮৫৯] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪৮৬
[৮৬০] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২১ এবং ২২
[৮৬১] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/২৮
[৮৬২] আদাবুল কাদ্বি: ১/১৯৬
[৮৬৩] আদাবুল কাদ্বি: ২/২৪৪
[৮৬৪] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪৮৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00