📄 বিচারকদের বেতন-ভাতা
মুসলিমদের বৃহত্তর স্বার্থে নিজেদের নিয়োজিত রাখা এবং বিচারের দায়িত্ব পালন করার বিনিময়ে আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকরা বেতন-ভাতা গ্রহণ করতেন। পূর্বাঞ্চলের মতো সেখানেও একই রীতি ছিল। তবে আন্দালুসে বিচারকদের বেতন-ভাতা ছিল অনেক বেশি। জীবনযাত্রার মান ছিল অপেক্ষাকৃত উন্নত। যা সেখানকার সামাজিক অবস্থান, অগ্রগতি এবং সভ্যতার সাথে সংগতিপূর্ণ।
পূর্বাঞ্চলে বিচারকদের বড় এক সংখ্যা ছিল, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের আশা এবং ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবন আর সম্পদের প্রতি অনীহা থাকায় যারা বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে কোনো ধরনের বেতন-ভাতা গ্রহণ করতেন না। আন্দালুসেও তাদের মতো বিচারক পাওয়া যেত। তাদের কেউ কেউ জীবিকা নির্বাহের জন্য বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ অন্যান্য কাজ করতেন। আবার অনেকে সংশয়ের আশঙ্কায় এবং সম্পদ থেকে স্বচ্ছ থাকার জন্য প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায় এতটুকু পরিমাণ সামান্য জীবিকা গ্রহণ করে দুনিয়াবিরাগী জীবন কাটিয়ে দিতেন।
মালিকি মাযহাবের বিখ্যাত ফকিহ বিচারক আবদুস সালাম ইবনু সাঈদ ইবনি হাবিব আত-তানুখি ছিলেন তাদেরই অন্যতম। তার উপাধি ছিল সাহনুন। ২৩৪ হিজরিতে আফ্রিকাস্থ কায়রুওয়ানের বিচারক ছিলেন তিনি। ২৪০ হিজরিতে মৃত্যু পর্যন্ত বিচারকার্যের দায়িত্বরত ছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য তিনি আমিরকে দুটি শর্ত দিয়েছিলেন। একটি শর্ত ছিল এমন: 'আমি যা চাই, আমাকে তা করতে দিতে হবে। আমার আগ্রহের বিষয়ে আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে; কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা যাবে না। আমি যেন এ কথা বলতে পারি, আপনার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সহযোগীদের বিচারের মাধ্যমে আমার দায়িত্ব পালন শুরু করব। কারণ দীর্ঘদিন থেকে তাদের পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি অনেক জুলুম করা হয়েছে। তারা অনেক সম্পদ আত্মসাৎ করেছে।' তখন আমির বললেন, 'ঠিক আছে। তাদের দিয়ে আপনার বিচারকার্যের সূচনা করুন। আমার মাথার সিঁথির ক্ষেত্রেও আপনি ন্যায় প্রয়োগ করুন।' এসব ক্ষেত্রে একজন মানুষ নিজের ব্যাপারে শঙ্কা বোধ করে। তা সত্ত্বেও সাহনুনের সাথে আমির সম্মানজনক আচরণ করেছিলেন।
আবদুর রহমান আয-যাহিদ তার উদ্দেশ্যে প্রেরিত পত্রে লিখেছিলেন, 'আপনাকে আমি ওসিয়ত করছি, মানা না-মানার বিষয়টি একান্তই আপনার। আপনি ভালো করেই জানেন, এই উম্মতের দায়িত্ব আপনি গ্রহণ করেছেন। পার্থিব বিষয়ে মানুষকে শাসন করা আপনার দায়িত্ব। অপরাধী সম্মানিত ব্যক্তি হোক কিংবা নিচু শ্রেণির লোক, আপনার সামনে তাকে নত হতেই হবে। শত্রু এবং বন্ধু-সবাই যেন আপনার কাছে সমান হয়। তবে হ্যাঁ, প্রত্যেকেরই ইনসাফ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।'
উত্তরে বিচারক সাহনুন মণিমুক্তা সমৃদ্ধ একটি পত্র লিখেছিলেন। যার প্রতিটি কথাই ছিল প্রজ্ঞাপূর্ণ। যা জ্ঞান এবং আল্লাহভীতির পরিচয় দিচ্ছিল। তার লেখা থেকে প্রমাণিত হয়েছিল যে, তিনি এক উত্তম পথের পথিক। বিচারকদের মধ্য থেকে তিনিই সর্বপ্রথম হিসবাহ পরিচালনা এবং অন্যায় প্রতিহত করেছেন। আমানতের সম্পদ বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষদের কাছে রাখার নীতি তিনিই চালু করেন। এর আগে আমানতের সম্পদ থাকত বিচারকের ঘরে। তার কর্তৃত্বে মানুষ সত্য শরীয়ত লাভ করত। আফ্রিকার বিচারকার্য পরিচালনায় তার মতো কেউ আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। তার আচরণে ও উচ্চারণে ফুটে উঠত প্রজ্ঞার ছাপ।
সাহনুন ছিলেন সত্যিকারের দুনিয়াবিমুখ। আন-নুবাহি বলেন, 'সাহনুন দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিচারের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে শাসকের থেকে নিজের জন্য কিছুই গ্রহণ করেননি।'
আবুল কাসিম হামাস ইবনু মারওয়ান আল-হামাদানি ছিলেন সাহনুনের সহচর। দুনিয়াবিরাগী এই বিজ্ঞ ফকিহ আফ্রিকার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তার দুনিয়াবিমুখতা এবং বিনয়ের অবস্থা এমন ছিল যে, তিনি নিজেই খাল খনন করতেন। বাড়ির সামনে তিনি লাকড়ি কাটছেন-এমতাবস্থায় মানুষ তার কাছে মোকদ্দমা নিয়ে আসত। বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইত। তিনি মোটা কাপড় পরিধান করতেন। বিচারকার্যের দায়িত্ব পালনকালে শহরের মধ্যে কখনো বাহনে চড়েননি। পরিশ্রম করে কামাইকৃত সম্পদ থেকেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক গ্রহণ করেননি।
এমনই আরেকজন বিচারক ছিলেন আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক (৩৬৭ হি.)। তিনি কর্ডোভার কাযিউল জামাআহ ছিলেন। ৩৫৬ হিজরিতে তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে ৩৫৮ হিজরিতে কর্ডোভায় নামাজের ইমামতির দায়িত্বও পালন করেন। তার শ্রেষ্ঠত্ব, ইলম, বুদ্ধিমত্তা, সুনিপুণ পরিচালনা এবং উত্তম আচরণের কথা ছিল মানুষের মুখে মুখে। কর্ডোভার নদী থেকে শিকার করা মাছ বিক্রি করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।
বিচারকদের তৃতীয় আরেকটি শ্রেণি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে বেতন-ভাতা নিতেন বটে। কিন্তু যেদিন কাজ করতেন না, সেদিনের বেতন মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে দিতেন।
নাসর ইবনু যারিফ আল-ইয়াহসুবি ছিলেন এই শ্রেণির বিচারকদের অন্যতম। আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া যাকে কোনো এক সময় কর্ডোভার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। প্রশংসিত চরিত্রের অধিকারী নাসর ছিলেন একজন সজ্জন ব্যক্তি। তার সম্পর্কে আবুল হাসান আন-নুবাহি বলেছেন, 'এই বিচারকের আল্লাহভীতি এবং দুনিয়াবিমুখতা এমন ছিল যে, কোনোদিন বিচারকার্য পরিচালনা না করলে সেদিনের বেতন তিনি গ্রহণ করতেন না।
ইবনুল হারিস আল-খুশানি বর্ণনা করেছেন, 'উমর ইবনু শারাহিলকে আমির আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাকে বরখাস্ত করে সাবেক বিচারক মুআবিয়া ইবনু সালিহ আল-হাদরামিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। মুআবিয়া ছিলেন মূলত হিমসের অধিবাসী। তারা দুজন অনেকদিন ধরে পালাক্রমে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। এক বছর মুআবিয়া দায়িত্ব পালন করতেন তো আরেক বছর উমর করতেন। এভাবেই কয়েক বছর কেটে যায়।' ইবনুল হারিস আরও বলেছেন, 'অন্য কোনো কাজের জন্য কোনো এক দিন বিচারকার্য পরিচালনা করতে না পারলে তাদের দুজনের কেউই সেদিনের বেতন গ্রহণ করতেন না।
সুলাইমান ইবনুল আসওয়াদ আল-গাফিকি ছিলেন অনাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত একজন সৎ বিচারক। নিজের প্রদত্ত বিচারের রায়ে কঠোরভাবে অবিচল থাকতেন। তিনি ব্যক্তিত্ব-সম্পন্ন লোক ছিলেন। আল-খুশানি বলেছেন, সুলাইমানকে মারিদা অঞ্চলের বিচারের দায়িত্ব থেকে যখন অব্যাহতি দেওয়া হয়, তখন তিনি কর্ডোভার প্রাসাদের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে মারিদার আমির মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমানের কাছে লিখলেন, 'আমার বেতন থেকে উদ্বৃত্ত কিছু অর্থ আমার হাতে আছে। এগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া আমার কর্তব্য। এগুলো জুমুআর দিন এবং যেসব দিনে আমি বিচারকার্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলাম বা যে-সময়গুলোতে আমি বিচারকার্যের দায়িত্ব পালন করিনি, সেসব সময়ের বেতন থেকে আমার হিসাব করে পৃথক করে রাখা অর্থ।' তখন আমিরের পক্ষ থেকে জবাব পাঠানো হলো, 'এগুলো আমাদের পক্ষ থেকে আপনাকে উপহারস্বরূপ দেওয়া হয়েছে।' কিন্তু সুলাইমান সেগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে অবশেষে আমির এই অর্থ বুঝে নিয়েছিলেন।
একবার আমির মুহাম্মাদের জনৈক সহযোগী একজন ইহুদির ওপর জুলুম করে আমিরের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বিচারক সুলাইমান তখন আমিরকে ধমকি দিয়েছিলেন। এ ঘটনা দুটির কারণেই আমির মুহাম্মাদ যখন পিতার স্থলাভিষিক্ত হন, তখন বিচারক সুলাইমানকে কর্ডোভার কাযিউল জামাআহ হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।
মুহাম্মাদ ইবনু বাশির আল-মুআফিরির ছিলেন সেসব বিচারকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা হজের সময় ইমাম মালিক ইবনু আনাস-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এরপর তিনি আন্দালুসে ফিরে আসার পর হাকাম ইবনু হিশাম তাকে বিচারকার্য পরিচালনায় নিয়োগ দিতে চাইলেন। তিনি কিছু শর্তসাপেক্ষে দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। একটা শর্ত ছিল এমন: তাকে প্রয়োজন পরিমাণ ভাতা দিতে হবে।
তিনি ছিলেন প্রথম সারির বিচারকদের অন্তর্ভুক্ত। বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠিন অবস্থান গ্রহণ করতেন। শরীয়তের বিধানাবলি পালনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী।
মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াবকা বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তার সমস্ত উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারীদের একত্র করে এবং তাদেরকে নিজের যাবতীয় সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং মালিকানাধীন সবকিছুর তথ্য জানিয়ে দিলেন। যাতে দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণের পর এসব নিয়ে কেউ তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা না করে।
টিকাঃ
[৮২৭] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২৯; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০৪
[৮২৮] তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ৩০
[৮২৯] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৩২
[৮৩০] আল-মু'জিব ফী তালখীসি আখবারিল মাগরিব, পৃ. ৭৩; কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ১২০; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২১৬
[৮৩১] তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪৪ এবং ১৯৩; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২১৬
[৮৩২] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২২; তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪৩
[৮৩৩] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৭০; তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫৬
[৮৩৪] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪৭-৪৮
[৮৩৫] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৭৭
📄 বিচারকদের বেশ-ভূষা
আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকরা সাধারণ জনগণ থেকে ভিন্ন নির্দিষ্ট কোনো পোশাকে অভ্যস্ত ছিলেন না। তবে বিচারকার্য চলাকালীন তারা নির্ধারিত এক ধরনের পোশাক পরতেন। এ ক্ষেত্রে একেক বিচারকের বিশেষ পোশাক একেক ধরনের হতো। তবে ইমাম আবু ইউসুফ সর্বসাধারণ থেকে বিচারকদের পৃথক রাখার সুবিধার্থে বাগদাদ এবং পূর্বাঞ্চলের আলিম, ফকিহ এবং বিচারকদের পোশাক এক ধরনের হওয়ার নীতি প্রচলন করেছিলেন। পক্ষান্তরে আন্দালুসে প্রত্যেক বিচারককে ইচ্ছামাফিক পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। এ কারণেই আন্দালুসের বিচারকদের বেশ-ভূষার ব্যাপারে নানাধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়।
আবদুর রহমান ইবনু আহমাদ প্রত্যেক সোম এবং বৃহস্পতিবারে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বসতেন। এ দুদিন তিনি কালো পোশাক পরিধান করতেন। আর অন্যান্য দিন পরতেন সাদা পোশাক।
সাঈদ ইবনু সুলাইমান আল-গাফিকি সম্পর্কে ইবনুল হারিস আল-খুশানি বলেন, 'তিনি কর্ডোভায় আগমন করলে আমির মুহাম্মাদ তাকে বিচারকার্যের দায়িত্ব প্রদান করেন। তিনি মসজিদে বসে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তখন তার পরনে থাকত পশমের সাদা জুব্বা। তার মাথায় থাকত "আকরুফ" নামে পরিচিত সাদা টুপি এবং গায়ে থাকত একই জাতীয় সাদা রঙের বিশেষ কপ।'
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া সম্পর্কে বিচারক ইয়াদ্ব বলেন, 'তিনি জুমুআর দিন পাগড়ি পরিধান করে পায়ে হেঁটে মসজিদে যেতেন।
ইবনু ফাতিন ছিলেন একজন দুনিয়াদার ব্যক্তি। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তার বেশ-ভূষা পালটে গেল। মন্ত্রীদের পোশাক ছেড়ে ফকিহদের সবুজ পোশাক পরতে লাগলেন। এই পোশাকের রং হালকা সবুজ অথবা গাঢ় সবুজ হতো।
তবে ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ বিচারকদের বেশ-ভূষার বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে থাকতেন। অভিজাত শ্রেণির এবং ফকিহগণের পোশাকের মাঝামাঝি স্তরের পোশাক পরিধান করতেন তিনি। যা থেকে আন্দালুসের প্রচলিত পোশাক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
ড. আহমাদ ফিকরি বর্ণনা করেছেন, আন্দালুসের বিচারকরা সবুজ রঙের বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান করতেন। কিন্তু আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকদের সম্পর্কে রচিত গ্রন্থাবলিতে এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।
উসতায আহমাদ আমিন বলেন, 'আন্দালুসের এই সভ্যতায় মানুষের বেশ-ভূষাতে পাগড়ির ব্যবহার খুব কমই দেখা যেত। তবে তাদের শাইখ, আলিম এবং বিচারকদের মাঝে পাগড়ির ব্যবহার চোখে পড়ত।'... আন্দালুসবাসীর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। বিচারক অথবা মুফতিকে আপনি খালি মাথায় দেখতে পাবেন। আর পাগড়ির ব্যবহার তো ছিল না বললেই চলে।
উসতাযের এই বক্তব্যটি সাধারণ গবেষণা মাত্র। আন্দালুসের বিচারকদের জীবনীতে এ কথার সমর্থনে কোনো বর্ণনা আমরা খুঁজে পাইনি।
আন্দালুসের কোনো কোনো বিচারক দায়িত্ব গ্রহণের আগে পরিধেয় পোশাক পরিবর্তন করতেন না। আর এটাই গ্রহণযোগ্য এবং অধিকাংশের মতামত। খালফ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি ফাতহুনের জীবনীতে এসেছে, তিনি পোশাক পরিবর্তন করেননি।
অনেকে নির্ধারিত পোশাক বাধ্য থাকতেন না। মুহাম্মাদ ইবনু বাশির আল-মুআফিরির জীবনীতে আল-খুশানি লিখেন, 'তিনি আমাদের জুমুআর নামাজ পড়াতেন। তার মাথায় থাকত একটি পশমি টুপি।' ... 'জুমুআর দিনে তিনি একটি হলুদ আলখাল্লা গায়ে দিয়ে এলেন। তার পায়ে ছিল চটি জুতা। মাথার চুল একটু এলোমেলো হয়ে ছিল। এরপর এই পোশাকেই দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন তিনি। একজন অপরিচিত আগন্তুক এই বিশেষ পোশাক, এলোমেলো মাথার চুল, হলুদ হয়ে যাওয়া চাদর, চোখে লাগানো সুরমা, মিসওয়াক এবং হাতে লেগে থাকা মেহেদির দিকে তাকিয়ে তাকে বিচারক বলে চিনতে পারল না। লোকটি তাকে বাঁশিওয়ালা বলে ভ্রম করছিল। অবশেষে চিনতে পারার পর তার মাঝে সে ন্যায়পরায়ণতা আর ইনসাফ দেখতে পেল।
টিকাঃ
[৮৩৬] কুদ্বাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৬২
[৮৩৭] তারতীবুল মাদারিক: ১/৫৩৭
[৮৩৮] নিয়ামুল হুকমি ফিশ শাবীআহ, পৃ. ২৩৭
[৮৩৯] নিযামুল হকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৩৭-
[৮৪০] কুরতুবার ফিল আহদিল ইসলামি, পৃ. ৩০৬
[৮৪১] বুহরুল ইসলাম। ৩/৪ এবং ৮
[৮৪২] নিযামূল হকমি ফিশ শাহীআহ, পৃ. ২৩৮
[৮৪৩] কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২৮ এবং ৩২
📄 বিচারকদের সহায়ক
পূর্বাঞ্চলের মতো আন্দালুস ও মরক্কোতে বিচারকদের কাজে সহায়তা করার জন্য সহায়ক ছিল। সহায়করা হলেন বিচারকের কাতিব বা মুনশি। যিনি বিচারকের পাশে বসতেন। বিভিন্ন মামলা, দলিল-প্রমাণ এবং স্বীকারোক্তি লেখার কাজে তিনি বিচারককে সহযোগিতা করতেন। তিনি যা লিখতেন, সেটা সাক্ষীদের পড়ে শোনানোর পর লেখার নিচে বিচারক নিজে স্বাক্ষর করে দিতেন।
অনারবি ভাষা অনুবাদ করার জন্য বিচারক নির্ভরযোগ্য ও আস্থাভাজন কোনো দোভাষী নির্বাচন করতেন। আন্দালুসে পরিপূর্ণভাবে আরবি ভাষার প্রচার হওয়ার পূর্বে এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি আন্দালুসের যেসব অঞ্চলে স্থানীয় ভাষার প্রচলন ছিল, সেসব অঞ্চলেও বিচারকরা দোভাষীর সহায়তা গ্রহণ করতেন।
বিচারকের দরজায় একজন রক্ষী থাকতেন। যার দায়িত্ব ছিল মানুষকে ধারাবাহিকভাবে প্রবেশের ব্যবস্থা করা। প্রবেশের ক্ষেত্রে বাদী-বিবাদীদের ধারাবাহিকতার ব্যবস্থাপনা রক্ষা করার পাশাপাশি হট্টগোল এবং বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।
আন্দালুস ও মরক্কো এবং পূর্বাঞ্চলের দেশগুলো এসব বিষয়ে ছিল বরাবর। ফকিহ আর আলিমদের থেকে সহযোগিতা গ্রহণের ব্যাপারেও এসব দেশের অবস্থান ছিল অভিন্ন। তবে একটি ব্যাপারে আন্দালুসের সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য এবং পরিষ্কার ভিন্নতা ছিল। আন্দালুসে প্রচলিত স্বতন্ত্র শূরা পদ্ধতি ছিল একটি মৌলিক বিষয় এবং উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। আমির এবং বিচারকদের কাছে যা 'মাজলিসুশ শূরা' তথা উপদেষ্টা পরিষদ নামে পরিচিতি লাভ করে। আন্দালুস-সংক্রান্ত সামনের আলোচনায় আমরা এর বিশদ বর্ণনা দেওয়ার আশা রাখি।
আন্দালুসে বিচারকের সহায়কদের মাঝে যাচাইকারীদের এক শ্রেণির প্রসিদ্ধ সহায়ক ছিল। গঠনমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থার আলোচনায় 'ফয়সালার ব্যাপারে সাক্ষী' শিরোনামের অধীনে একটি বিশেষ অনুচ্ছেদে তাদের আলোচনা আমরা করব।
টিকাঃ
[৮৪৪] কুরতুবাতু ফিল আসরিল ইসলামি, পৃ. ৩০৬
📄 বিচারক অপসারণ
আন্দালুসে বিচারক অপসারণের বিষয়টি কম এবং সীমিত পর্যায়ে ছিল। অধিকাংশ সময় বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবীণ হওয়ার পাশাপাশি ইলম, তাকওয়া ও পরহেজগারির ক্ষেত্রে খ্যাতিমান কোনো ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনিই আমরণ বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন। বেশির ভাগ বিচারকদের জীবনীতে এমনটাই পাওয়া যায়।
আমির আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়ার যুগে দুজন বিচারককে পালাক্রমে অপসারণ করার বিষয় দেখা গিয়েছিল। তখন মুআবিয়া ইবনু সালিহের পাশাপাশি উমর ইবনু শারাহিল পালাক্রমে কর্ডোভায় বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এক বছর মুআবিয়া দায়িত্ব পালন করতেন তো আরেক বছর উমর পালন করতেন। হিসাব রাখার সুবিধার্থে বছর শেষ হলে পালা পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি আমিরকে জানিয়ে দিতে হতো।
ইমাম মালিকের মাযহাব অনুসারে বিচারকার্য পরিচালনা না করার কারণেও অনেক সময় বিচারক অপসারণ করা হতো। আমির আবদুর রহমান আল-আওসাতের যুগে ১১জন বিচারক একের পর এক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রখ্যাত আলিম ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া ছিলেন আমিরের কাছে অগ্রগণ্য এবং মর্যাদাবান ব্যক্তি। তিনিই আমিরকে বিচারক নিয়োগ এবং অপসারণের ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন। কোনো বিচারকের পক্ষ থেকে মালিকি মাযহাব প্রয়োগ না করার বিষয়টি আঁচ করতে পারলেই তাকে অপসারণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতেন তিনি। এ ব্যাপারে তার কঠোরতা ছিল সর্বজনবিদিত। ২৩৪ হিজরিতে তার মৃত্যুর পর বলা হলো, বিচারকরা তার তৎপরতা থেকে রেহাই পেয়েছে।
অনেক সময় আকস্মিক কিছু কারণেও বিচারকদের অপসারণ করা হতো। এর আবার কিছু সময় পর তাকে পুনরায় নিয়োগ দিয়ে বিচারকের দায়িত্ব প্রদান করা হতো। যেমনটা ঘটেছিল আমর ইবনু আবদুল্লাহ ইবনি লাইসের সাথে। ‘মাওয়ালি’ তথা মুক্ত ক্রীতদাসদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ‘কাযিউল জামাআহ’ হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সহনশীল, আত্মসংযমী এবং গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তাকে অপসারণ করার কিছুকাল পর পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়। এরকম আরেকজন ছিলেন সুলাইমান ইবনু আসওয়াদ আল-গাফিকি। আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া তিনি করতেন না। কোনো ব্যাপক ফিতনার কারণে আমির প্রথমে তাকে অপসারণ করলেও পরবর্তীকালে পুনরায় বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ প্রদান করেন।
টিকাঃ
[৮৪৫] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২১-২২
[৮৪৬] কুরতুবাতু ফিল আসরিল ইসলামি, পৃ. ৩১৮
[৮৪৭] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৬৭, ৭২, ৭৩, ৮১, ৮২ এবং ৮৩