📄 বিচারক নিয়োগ এবং নিয়োগের শর্তাবলি
আন্দালুসের বিচারকরা ছিলেন কেন্দ্রীয় মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। অন্যান্য ইসলামি রাষ্ট্রের মতো সেখানেও বিচারকদের মর্যাদা ছিল চোখে পড়ার মতো। ইসলামি আইনে স্বীকৃত যাবতীয় শর্ত তাদের কাজের মধ্যে পরিপূর্ণ ছিল। শরীয়তের বিধানাবলি এবং বিচারকার্যের গুণাবলির কথা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এ বিধানের মাধ্যমে তারা মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করবে এবং এরই ওপর ভিত্তি করে ন্যায় এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। রক্ষা পাবে মানুষের অধিকার এবং প্রয়োগ হবে আল্লাহর নির্ধারিত দণ্ড। বিচারক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তির শর্তসমূহের মতো শরীয়তের আরও অনেক নীতি বিচারকদের মধ্যে পরিপূর্ণ ছিল। যেমন: চারিত্রিক স্বচ্ছতা, অবিচলতা, সত্যনিষ্ঠা, আমানতদারিতা, বীরত্ব আর সাহসিকতা এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে অধ্যবসায়। কেননা তাদের প্রদত্ত ফতোয়া এবং রায় দূর করত সমাজে প্রচলিত যাবতীয় সংশয়। সমস্ত মোকদ্দমার নিরসন করত। সমাধা করত সব বিবাদ। বিচারকদের আরও যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল সেগুলো হচ্ছে: পক্ষপাত করা থেকে দূরে থাকা, গোঁড়ামি না করা, কুপ্রবৃত্তি এবং ব্যক্তিগত লোভ-লালসা নিয়ন্ত্রণে রাখা, ব্যক্তিগত স্বার্থ না দেখা, আবেগপ্রবণ না হওয়া এবং রাজনৈতিক তৎপরতা আর আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখা।
আন্দালুসের বিচারক সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্য থেকেই নির্বাচন করা হতো। অধিকাংশ সময় বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো সংশ্লিষ্ট শহর বা অঞ্চল থেকে। যাতে বিচারক সেই শহরের মানুষের স্বভাব-চরিত্র এবং অবস্থাদি সম্পর্কে অবগত থাকেন। সংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে তাদের পরিচিত ব্যক্তি হওয়ার সুবিধা হচ্ছে, লোকেরা বিচারকের ওপর আস্থা রাখতে পারবে এবং তার জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সবাই অবগত থাকবে। তাহলে বিচারকের বিচার এবং ফয়সালায় সবাই আশ্বস্ত থাকবে।
আন্দালুস এবং মরক্কোতে বিচারক নিয়োগের প্রধান অধিকার থাকত প্রশাসকের। তারপর খিলাফত না থাকলে আমিরের থাকত বিচারক নিয়োগের অধিকার। পক্ষান্তরে খিলাফত প্রতিষ্ঠা হলে খলিফাই সবচেয়ে বেশি অধিকার রাখতেন। খলিফা শহরের লোকদের প্রস্তাবনা অনুসারে বিচারক নিয়োগ দিতেন। বিচারককে সর্বজনস্বীকৃত শ্রেষ্ঠ এবং খ্যাতিমান কোনো ব্যক্তি হতে হতো। পূর্ব থেকে রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি কিংবা আরব বংশোদ্ভূত হওয়ার কোনো শর্ত ছিল না। যেমন উত্তর আফ্রিকার বার্বার জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়েও ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া ইবনি আকসাম বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আবার সিরিয়ান এবং মিশরীয় বংশোদ্ভূত-এমন অনেকেই বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন, যারা আন্দালুসকে স্থায়ী নিবাস বানিয়েছিলেন।
আমির বা খলিফা কোথাও বিচারক নিয়োগ দেওয়ার আগে আলিম, মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দাদের সাথে পরামর্শ করে নিতেন। ১৮০ হিজরিতে আমির মুরতাযা ছিলেন সেখানকার শাসক। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া আল-আন্দালুসি (২৩৪ হি.) ছিলেন তখনকার বিচারক। তাদের দুজনের সম্পর্ক ছিল খলিফা হারুনুর রাশিদের সাথে বিচারপতি আবু ইউসুফের মতো। আন্দালুসের সকল প্রান্তে, যাবতীয় অঞ্চলে তার পরামর্শ এবং মতামত ছাড়া বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো না। শাসক এবং আপামর জনসাধারণের কাছে তার বিশেষ মর্যাদা ছিল। বিচারকার্য থেকেও ঊর্ধ্বে ছিল তার অবস্থান। তিনিই আন্দালুসে মালিকি মাযহাবের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। উত্তর আফ্রিকার তানজাহ বা টাঙিয়ের থেকে আগত ইয়াহইয়া ছিলেন মূলত বার্বার জাতিগোষ্ঠীর লোক। কর্ডোভাতে পড়াশোনা করেছেন। যুবক বয়সে আরবে সফর করেছেন। ইমাম মালিক থেকে আল-মুওয়াত্তা গ্রন্থের হাদিস শ্রবণ করেছেন। মক্কা এবং মিশরের আলিমদের থেকেও ইলম আহরণ করেছেন। তারপর দেশে ফিরে এলে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি বিরত থাকেন। কারণ তার মর্যাদা ছিল বিচারকের মর্যাদারও ঊর্ধ্বে। বিচার বিভাগের ব্যাপারে তার বিমুখতা, দায়িত্ব গ্রহণ থেকে তার বিরত থাকা, অগাধ পাণ্ডিত্য এবং বিচক্ষণতার কারণে অন্যান্য বিচারকদের তুলনায় আমিরদের কাছে তার মর্যাদা ছিল সবার শীর্ষে।
আমির বা খলিফা অনেক সময় প্রশাসক, মন্ত্রী বা আঞ্চলিক শাসককে বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব দিতেন। মাঝে মাঝে কাযিউল জামাআহর কাছে দায়িত্ব অর্পণ করতেন। তবে এমন ঘটনা ছিল নিতান্তই বিরল। এ কারণেই রাষ্ট্রের যেসব বিভাগের অধীনে বিচারকার্যের দায়িত্ব ছিল-সেগুলো এবং বিচারক নিয়োগের অধিকারপ্রাপ্ত দায়িত্বশীলদের কথা প্রসঙ্গে ইবনু ফারহুন বলেছেন, 'রাষ্ট্রের যেসব বিভাগের অধীনে বিচারের দায়িত্ব থাকত, সেগুলো ছিল কয়েক ধরনের। প্রথমত: আল-ইমামাতুল কুবরা তথা বড় নেতৃত্ব। বিচারের যোগ্যতা এই প্রকারেরই একটি অংশ। তদ্রূপ সাধারণ রাজনীতির যোগ্যতাও এর একটি অংশবিশেষ। দ্বিতীয়ত: মন্ত্রণালয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো وزیر التفويض বা দপ্তরবিহীন মন্ত্রী ; وزير التنفيذ তথা কার্যকর মন্ত্রী নয়। তৃতীয়ত: প্রশাসন ...।'
বিচারক নিয়োগ দেওয়ার আগে যাচাই এবং নির্বাচন করার পর দায়িত্ব পালন করতে পাঠানোর আগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা ছিল কর্ডোভা বা অন্যান্য অঞ্চলের কাযিউল জামাআহর দায়িত্ব।
এরপর খলিফা বা আমির বিচারক নিয়োগের ব্যাপারে একটি নির্দেশনা জারি করতেন। যা-তে বিচারকের জায়গা এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেওয়া থাকত। আন্দালুসের তৎকালীন শাসক উকবাহ ইবনুল হাজ্জাজ আস-সালুলি এমন করেছিলেন। উকবাহ ছিলেন বাহাদুর মুজাহিদ ও শক্তিশালী যোদ্ধা। প্রখ্যাত আলিমে দ্বীন ও বুজুর্গ, বিজ্ঞ ফকিহ মাহদি ইবনু মুসলিম পরিচিত ছিলেন বিধায় উকবাহ তাকে কর্ডোভায় নিজের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য আদেশ দিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় ফরমান লিখে দেন। যা-তে লেখা ছিল, 'এটা উকবাহ ইবনুল হাজ্জাজের নির্দেশনা। যা তিনি লিখেছেন মাহদি ইবনু মুসলিমের প্রতি, তিনি বিচারের দায়িত্বে নিয়োগের সময়। মাহদিকে উকবাহ ওসিয়ত করছেন: তিনি যেন আল্লাহকে ভয় করেন, তাঁর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেন এবং প্রকাশ্যে-গোপনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী চলেন। মাহদিকে উকবাহ আরও আদেশ করছেন, তিনি যেন আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাহকে পথ চলার রাহবার হিসেবে গ্রহণ করেন। কারণ এটা এমন আলোর মশাল, যার মাধ্যমে তিনি চলতি পথে আলো লাভ করবেন। এ এমন এক প্রদীপ, যা থেকে আলো নিয়ে তিনি সকল গোমরাহি থেকে বেঁচে থাকতে পারবেন। ... মাহদির জেনে রাখা দরকার, দেশ ও দশের স্বার্থে মহান বিচারকার্যের দায়িত্ব দিয়ে উকবাহ তাকে পরীক্ষায় ফেলেননি; বরং এ দায়িত্ব তাকে দেওয়ার কারণ হচ্ছে, আল্লাহর কাছে থাকা বিচারের বিশেষ মর্যাদা। বিচারের মাঝে রয়েছে দ্বীনের বিধিবিধান, মুসলিমদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, যথাযথ স্থানে যথাযথ ব্যক্তির ওপর শাস্তিদণ্ড প্রয়োগ, সঠিক হকদারকে তার অধিকার প্রদান করা।... সুতরাং মাহদি যেন নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করেন।... মাহদির প্রতি উকবাহর আদেশ থাকল, তিনি যেন বাদী-বিবাদীর মাঝে সমতা রক্ষা করেন, তার সহকর্মী, উপদেষ্টামণ্ডলী এবং তার ইহকালীন ও পরকালীন সহযোগীরা যেন আগের সহযোগীদের চেয়েও বড় জ্ঞানী, বড় ফকিহ, অধিক দ্বীনদার আর বেশি আমানতদার হয়। তার রক্ষী এবং সহকারীরা যেন হয় স্বচ্ছ ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারী।...
টিকাঃ
[৮১২] তারীখুল মাগরিবি ওয়াল আন্দালুসি ফী আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ২৮৪; হাসান ইবরাহীম সংকলিত তারীখুল ইসলাম: ২/৩১৩। আরও দেখুন কুদ্ধাতু কুরতুবাহ।
[৮১৩] তারীখুল কাম্বা, পৃ. ৯৭; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০৩; তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১৪; কুন্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৫
[৮১৪] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/১৪-১৫ (পরিবর্তিত এবং সংক্ষেপিত)
[৮১৫] কুদ্দাতু কুরতুবাহ
[৮১৬] কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৯; তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪২
📄 বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি
বেশি উপযুক্ত, শ্রেষ্ঠ, আল্লাহভীরু, বুজুর্গ এবং অধিক বিজ্ঞ ফকিহ ব্যক্তিকে বিচারকার্যের দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারে খলিফা এবং প্রশাসকরা সচেষ্ট থাকতেন। কিন্তু নানান কারণে এসব ব্যক্তিদের অনেকেই দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন। যেসব কারণে তারা বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকতেন, সেসবের মাঝে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল বিচারের দায়িত্বের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন এবং সতর্কবাণী, দুনিয়া ও আখিরাতের বিশাল জবাবদিহিতা, হক বাস্তবায়ন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং সকলের ওপর আল্লাহর আইন প্রয়োগ করা। এ ছাড়াও আখিরাতে আল্লাহর সামনে এ ব্যাপারে জবাবদিহির ভয়ও তাদের ছিল।
আন্দালুসের আলিম এবং ফকিহদের অবস্থান ছিল উমাইয়া এবং আব্বাসি আলিমদের অবস্থানের মতোই। বরং আন্দালুস ও মরক্কোর আলিমদের আল্লাহভীতি এবং দুনিয়াবিমুখতা ছিল পূর্বাঞ্চলের আলিমদের তুলনায় বেশি। কারণ আন্দালুস ও মরক্কো ভৌগোলিক দিক থেকে এবং জনসংখ্যার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। এ কারণেই মুহাম্মাদ ইবনুল হারিস আল-খুশানি (৩৬১ হি.) তার গ্রন্থ 'কুদ্ধাতু কুরতুবাহ' এবং আবুল হাসান আন-নুবাহি (৭৯৩ হি.) তার 'তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস' গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে এমন সব ব্যক্তির আলোচনা করেছেন, যাদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা অসম্মতি জানিয়ে বিরত থেকেছেন।
এর বিভিন্ন কারণ উপস্থাপন করে আল-খুশানি বলেন, 'গুরুত্বের দিক থেকে এমন খলিফার পরই একজন বিচারকের স্থান, যাকে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের দায়িত্ব দান করার পাশাপাশি দুনিয়া পরিচালনার দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত করেছেন। কারণ একজন বিচারক যেসব দায়িত্ব পালন করেন সেগুলো হচ্ছে: বিচারের রায় বাস্তবায়ন এবং জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু আর চরিত্রের হেফাজত নিশ্চিতকরণ। পাশাপাশি এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত যত ধরনের উপকার এবং অপকার রয়েছে- সবগুলোর দায়িত্বও বিচারকের। এ দায়িত্বের পরিণামে আল্লাহর কাছেও ভয়াবহ অবস্থান আর কঠিন ভয় আছে। এই দায়িত্ব এতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ হওয়ার কারণেই বুদ্ধিমান মানুষ এবং জ্ঞানীগণ এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। অনেকে তো বিচারকার্যের মর্যাদার প্রতি আগ্রহী হয়ে, আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে সাহায্যের প্রত্যাশা করার পাশাপাশি তাঁর ব্যাপক ক্ষমার ওপর ভরসা করে দায়িত্ব গ্রহণ করে নিয়েছেন। আবার কিছু লোক আখিরাতের ভয়ে এবং নিজেদের আর অধীনস্থদের পক্ষ থেকে ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তির আশঙ্কায় দায়িত্ব গ্রহণ থেকে পলায়ন করেছেন।
আল-খুশানি আরও বলেন, 'আন্দালুসের রাজধানী কর্ডোভার বাসিন্দাদের মধ্য থেকে কিছু লোক এমন ছিলেন, যাদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তারা সে ডাকে সাড়া দেননি। তারা এ আহ্বান উপেক্ষা করার কারণ ছিল, দায়িত্বের পেছনে অপেক্ষমাণ পরিণামের ব্যাপারে নিজেদের শঙ্কা। তাদের আলোচনা, খলিফাদের কাছে তাদের অবস্থান এবং তাদের যে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ডাকা হতো-সে ব্যাপারে তাদের কী শঙ্কা ছিল, সেটাও তো পাঠক অবশ্যই পড়েছেন। বইয়ের শুরুতেই এ ব্যাপারে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আমি সব আলোচনা করেছি।'
এ ধরনের ব্যক্তিদের শীর্ষে ছিলেন ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া ইবনি কাসির আল-আন্দালুসি। বিচারক ইয়াহইয়া ইবনু ইয়া'মারের মৃত্যুর পর প্রায় ছয় মাস যাবৎ লোকদের কোনো বিচারক ছিল না। আন্দালুসের আমির আবদুর রহমান তখন বিচার বিভাগ নিয়ে অস্থির হয়ে পড়লেন। লোকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করলে তিনি বললেন, 'ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করছি বলেই আমি তাড়াহুড়া করে বিচারক নিয়োগ দিতে পারছি না। যাকে আমার পছন্দ হয়, তিনি ছাড়া যোগ্য কাউকে আমি পাচ্ছি না। আবার সেই যোগ্য ব্যক্তিটিও আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না।' তখন কেউ কেউ আমিরকে পরামর্শ দিলো, তিনি যেন যোগ্য ব্যক্তিটিকে দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য করেন। এরপর ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়াকে উপস্থিত করে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য জোর করা হলে তিনি অসম্মতি জানান। তখন কাকে নিয়োগ দেওয়া যায়-এ ব্যাপারে তার কাছে পরামর্শ চাওয়া হলে তিনি তাতেও অপারগতা প্রকাশ করেন। অবশেষে প্রচণ্ড চাপে পড়ে তিনি ইবরাহীম ইবনু আব্বাসকে নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। আন্দালুসে ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়ার পরামর্শ ছাড়া বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো না।
এরপর আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া আন্দালুসের আমির হলেন। তিনি ছিলেন আন্দালুসের মাটিতে উমাইয়া বংশের প্রথম খলিফা। কর্ডোভার বিচারক নিয়োগের ব্যাপারে তিনি সভাসদদের সাথে আলাপ করেন। তার ছেলে হিশাম এবং রক্ষী ইবনু মুগিস পরামর্শ দেন মুসআব ইবনু উমরানকে বিচারক নিয়োগ করতে। তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দানের ব্যাপারে সবাই একমত হলে আমিরেরও তা মনঃপূত হয়। তখন তিনি পত্র পাঠিয়ে মুসআবকে ডেকে পাঠান। তিনি আগমন করলে ছেলে হিশাম, রক্ষী ইবনু মুগিস এবং বিশেষ সভাসদদের উপস্থিতিতে তাকে সামনে আনেন। এরপর বিচারের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মুসআবকে প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে প্রতিবন্ধক অনেক অজুহাত এবং সমস্যার কথা তুলে ধরেন তিনি। মুসআবের পেশকৃত এসব অজুহাত আমির না মেনে চাপ প্রয়োগ করলেন। কিন্তু মুসআব ছিলেন নিজের অবস্থানে অনড়। বারংবার পীড়াপীড়ি করেও তাকে মানাতে না পেরে আমির ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। অবশেষে দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে রেখে গোঁফে তা দিতে লাগলেন। এরপর মাথা তুলে মুসআবের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনি যেতে পারেন। আপনার অজুহাত আমি মেনে নিলাম। আপনার ব্যাপারে যারা পরামর্শ দিয়েছিল, তাদেরও আমি ক্ষমা করে দিলাম।'
পরবর্তীকালে হিশাম কর্ডোভার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য যিয়াদ ইবনু আবদিল্লাহকে প্রস্তাব দেন। হিশামের জোরাজুরি দেখে যিয়াদ কর্ডোভা থেকে পালিয়ে যান। তখন হিশাম ইবনু আবদির রহমান বললেন, 'যিয়াদের মতো মানুষই হয় না। মানুষ যদি যিয়াদের মতো হতো, তাহলে দুনিয়ার প্রতি দুনিয়াদারদের মোহ আর লিপ্সা থেকে আমি বেঁচে যেতাম।' এরপর তিনি নিজের ঘরে ফিরে যান। মন্ত্রীদের কাছে প্রস্তাবটি তুলে ধরে তাদের ধমকি দিলে তারা হিশামকে জটিলতা থেকে বাঁচাতে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
ফকিহদের মধ্যে আরও যাদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি বার ছিলেন তাদের অন্যতম। কোনো এক ঘটনার প্রেক্ষিতে আমির মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমানের কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পেলে আমির তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। তখন তার সহচর হাশিম ইবনু আবদিল আজিজকে তার কাছে পাঠানো হয়। ইবরাহীম তখনো সম্মত হলেন না। আমির তখন হাশিমকে দিয়ে ইবরাহীমের উদ্দেশ্যে একটি অনুরোধ লিখে পাঠান। যা-তে লেখা ছিল: 'আপনি যদি বিচার বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ না করেন, তাহলে অন্তত আমাদের মজলিসে উপস্থিত হোন। আমাদের কাছে আসা-যাওয়া করুন। যাতে আমাদের নানান বিষয় নিয়ে আপনার সাথে আমরা পরামর্শ করতে পারি। আপনার থেকে আমরা যেন জনগণের কথা জানতে পারি।'
পত্রের বার্তা শুনে ইবরাহীম বললেন, 'আবু খালিদ! আমির যদি এভাবে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন, তাহলে আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি কিন্তু তার শহর থেকে পালিয়ে যাব। তার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক!' আমির তখন ইবরাহীমকে আর ঘাঁটালেন না।
আমির মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান জিয়ানের গ্রামাঞ্চলে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আবান ইবনু ঈসা ইবনি দিনারের কাছে প্রস্তাব পেশ করলে আবান তা গ্রহণে জোরদার অসম্মতি প্রকাশ করেন। আমির তখন আবানকে বাধ্য করার আদেশ জারি করেন। একদল পুলিশকে নির্দেশ দিলে তারা আবানকে জিয়ানস্থ বিচারের স্থানে উপস্থিত করে বসিয়ে দেয়। অপরদিকে সাধারণ মানুষও বিচারকার্য পরিচালনার জন্য আবানকে ঘিরে ধরে। ইবনু ঈসা তখন একদিন বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেলেন। তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, 'বিচারক পালিয়ে গেছে।' বিষয়টি আমিরের কানে গেলে তিনি মন্তব্য করলেন, 'এই হচ্ছে সৎ লোক, যে নিজের দ্বীন নিয়ে পালিয়েছে। সে কোথায় আছে খোঁজ নাও। যে কাজে তাকে বাধ্য করা হয়েছিল, সেটা থেকে তাকে নিরাপত্তা দাও।'
আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে অনেকেই অসম্মতি প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রত্যেকেরই চমৎকার ঘটনা রয়েছে। তাদের আলোচনা অবিস্মরণীয়। প্রত্যেকেরই অবস্থান সম্মানজনক এবং আগ্রহ সত্যনিষ্ঠ।
তবে আন্দালুসে আলিমদের আরেকটি শ্রেণি ছিল, যারা বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে অসম্মতি জানালেও আমির এবং বিচারকদের পরামর্শ দেওয়ার ব্যাপারে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হাতিম ইবনু মুহাম্মাদ আত-তামিমি ছিলেন যাদের অন্যতম। ইবনুত তরাবলুসি আল-কুরতুবি নামে তিনি পরিচিত। আরও ছিলেন ঈসা ইবনু মুহাম্মাদ এবং মুহাম্মাদ ইবনু আত্তাব। শেষোক্তজন ছিলেন উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান। আন্দালুসে ফতোয়া প্রদান তাকে কেন্দ্র করেই চলত।
টিকাঃ
[৮১৭] কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৩; তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১১
[৮১৮] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২।
[৮১৯] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২-৩
[৮২০] তারিখু কুদাতিল আন্দালুস, পৃ. ১৪; কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৪-৫
[৮২১] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১২; কুদ্বাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৩
[৮২২] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১২; কুদ্বাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৩-৪
[৮২৩] তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ১৩; কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৬
[৮২৪] তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ১২-১৩; কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৭
[৮২৫] বাড়তি জানতে তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস এবং কুদ্ধাতু কুরতুবাহ দেখতে পারেন।
[৮২৬] নিযামুল ফকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩৩৩
📄 বিচারকদের বেতন-ভাতা
মুসলিমদের বৃহত্তর স্বার্থে নিজেদের নিয়োজিত রাখা এবং বিচারের দায়িত্ব পালন করার বিনিময়ে আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকরা বেতন-ভাতা গ্রহণ করতেন। পূর্বাঞ্চলের মতো সেখানেও একই রীতি ছিল। তবে আন্দালুসে বিচারকদের বেতন-ভাতা ছিল অনেক বেশি। জীবনযাত্রার মান ছিল অপেক্ষাকৃত উন্নত। যা সেখানকার সামাজিক অবস্থান, অগ্রগতি এবং সভ্যতার সাথে সংগতিপূর্ণ।
পূর্বাঞ্চলে বিচারকদের বড় এক সংখ্যা ছিল, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের আশা এবং ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবন আর সম্পদের প্রতি অনীহা থাকায় যারা বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে কোনো ধরনের বেতন-ভাতা গ্রহণ করতেন না। আন্দালুসেও তাদের মতো বিচারক পাওয়া যেত। তাদের কেউ কেউ জীবিকা নির্বাহের জন্য বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ অন্যান্য কাজ করতেন। আবার অনেকে সংশয়ের আশঙ্কায় এবং সম্পদ থেকে স্বচ্ছ থাকার জন্য প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায় এতটুকু পরিমাণ সামান্য জীবিকা গ্রহণ করে দুনিয়াবিরাগী জীবন কাটিয়ে দিতেন।
মালিকি মাযহাবের বিখ্যাত ফকিহ বিচারক আবদুস সালাম ইবনু সাঈদ ইবনি হাবিব আত-তানুখি ছিলেন তাদেরই অন্যতম। তার উপাধি ছিল সাহনুন। ২৩৪ হিজরিতে আফ্রিকাস্থ কায়রুওয়ানের বিচারক ছিলেন তিনি। ২৪০ হিজরিতে মৃত্যু পর্যন্ত বিচারকার্যের দায়িত্বরত ছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য তিনি আমিরকে দুটি শর্ত দিয়েছিলেন। একটি শর্ত ছিল এমন: 'আমি যা চাই, আমাকে তা করতে দিতে হবে। আমার আগ্রহের বিষয়ে আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে; কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা যাবে না। আমি যেন এ কথা বলতে পারি, আপনার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সহযোগীদের বিচারের মাধ্যমে আমার দায়িত্ব পালন শুরু করব। কারণ দীর্ঘদিন থেকে তাদের পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি অনেক জুলুম করা হয়েছে। তারা অনেক সম্পদ আত্মসাৎ করেছে।' তখন আমির বললেন, 'ঠিক আছে। তাদের দিয়ে আপনার বিচারকার্যের সূচনা করুন। আমার মাথার সিঁথির ক্ষেত্রেও আপনি ন্যায় প্রয়োগ করুন।' এসব ক্ষেত্রে একজন মানুষ নিজের ব্যাপারে শঙ্কা বোধ করে। তা সত্ত্বেও সাহনুনের সাথে আমির সম্মানজনক আচরণ করেছিলেন।
আবদুর রহমান আয-যাহিদ তার উদ্দেশ্যে প্রেরিত পত্রে লিখেছিলেন, 'আপনাকে আমি ওসিয়ত করছি, মানা না-মানার বিষয়টি একান্তই আপনার। আপনি ভালো করেই জানেন, এই উম্মতের দায়িত্ব আপনি গ্রহণ করেছেন। পার্থিব বিষয়ে মানুষকে শাসন করা আপনার দায়িত্ব। অপরাধী সম্মানিত ব্যক্তি হোক কিংবা নিচু শ্রেণির লোক, আপনার সামনে তাকে নত হতেই হবে। শত্রু এবং বন্ধু-সবাই যেন আপনার কাছে সমান হয়। তবে হ্যাঁ, প্রত্যেকেরই ইনসাফ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।'
উত্তরে বিচারক সাহনুন মণিমুক্তা সমৃদ্ধ একটি পত্র লিখেছিলেন। যার প্রতিটি কথাই ছিল প্রজ্ঞাপূর্ণ। যা জ্ঞান এবং আল্লাহভীতির পরিচয় দিচ্ছিল। তার লেখা থেকে প্রমাণিত হয়েছিল যে, তিনি এক উত্তম পথের পথিক। বিচারকদের মধ্য থেকে তিনিই সর্বপ্রথম হিসবাহ পরিচালনা এবং অন্যায় প্রতিহত করেছেন। আমানতের সম্পদ বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষদের কাছে রাখার নীতি তিনিই চালু করেন। এর আগে আমানতের সম্পদ থাকত বিচারকের ঘরে। তার কর্তৃত্বে মানুষ সত্য শরীয়ত লাভ করত। আফ্রিকার বিচারকার্য পরিচালনায় তার মতো কেউ আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। তার আচরণে ও উচ্চারণে ফুটে উঠত প্রজ্ঞার ছাপ।
সাহনুন ছিলেন সত্যিকারের দুনিয়াবিমুখ। আন-নুবাহি বলেন, 'সাহনুন দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিচারের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে শাসকের থেকে নিজের জন্য কিছুই গ্রহণ করেননি।'
আবুল কাসিম হামাস ইবনু মারওয়ান আল-হামাদানি ছিলেন সাহনুনের সহচর। দুনিয়াবিরাগী এই বিজ্ঞ ফকিহ আফ্রিকার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তার দুনিয়াবিমুখতা এবং বিনয়ের অবস্থা এমন ছিল যে, তিনি নিজেই খাল খনন করতেন। বাড়ির সামনে তিনি লাকড়ি কাটছেন-এমতাবস্থায় মানুষ তার কাছে মোকদ্দমা নিয়ে আসত। বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইত। তিনি মোটা কাপড় পরিধান করতেন। বিচারকার্যের দায়িত্ব পালনকালে শহরের মধ্যে কখনো বাহনে চড়েননি। পরিশ্রম করে কামাইকৃত সম্পদ থেকেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক গ্রহণ করেননি।
এমনই আরেকজন বিচারক ছিলেন আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক (৩৬৭ হি.)। তিনি কর্ডোভার কাযিউল জামাআহ ছিলেন। ৩৫৬ হিজরিতে তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে ৩৫৮ হিজরিতে কর্ডোভায় নামাজের ইমামতির দায়িত্বও পালন করেন। তার শ্রেষ্ঠত্ব, ইলম, বুদ্ধিমত্তা, সুনিপুণ পরিচালনা এবং উত্তম আচরণের কথা ছিল মানুষের মুখে মুখে। কর্ডোভার নদী থেকে শিকার করা মাছ বিক্রি করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন।
বিচারকদের তৃতীয় আরেকটি শ্রেণি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে বেতন-ভাতা নিতেন বটে। কিন্তু যেদিন কাজ করতেন না, সেদিনের বেতন মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে দিতেন।
নাসর ইবনু যারিফ আল-ইয়াহসুবি ছিলেন এই শ্রেণির বিচারকদের অন্যতম। আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া যাকে কোনো এক সময় কর্ডোভার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। প্রশংসিত চরিত্রের অধিকারী নাসর ছিলেন একজন সজ্জন ব্যক্তি। তার সম্পর্কে আবুল হাসান আন-নুবাহি বলেছেন, 'এই বিচারকের আল্লাহভীতি এবং দুনিয়াবিমুখতা এমন ছিল যে, কোনোদিন বিচারকার্য পরিচালনা না করলে সেদিনের বেতন তিনি গ্রহণ করতেন না।
ইবনুল হারিস আল-খুশানি বর্ণনা করেছেন, 'উমর ইবনু শারাহিলকে আমির আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাকে বরখাস্ত করে সাবেক বিচারক মুআবিয়া ইবনু সালিহ আল-হাদরামিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। মুআবিয়া ছিলেন মূলত হিমসের অধিবাসী। তারা দুজন অনেকদিন ধরে পালাক্রমে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। এক বছর মুআবিয়া দায়িত্ব পালন করতেন তো আরেক বছর উমর করতেন। এভাবেই কয়েক বছর কেটে যায়।' ইবনুল হারিস আরও বলেছেন, 'অন্য কোনো কাজের জন্য কোনো এক দিন বিচারকার্য পরিচালনা করতে না পারলে তাদের দুজনের কেউই সেদিনের বেতন গ্রহণ করতেন না।
সুলাইমান ইবনুল আসওয়াদ আল-গাফিকি ছিলেন অনাড়ম্বর জীবন যাপনে অভ্যস্ত একজন সৎ বিচারক। নিজের প্রদত্ত বিচারের রায়ে কঠোরভাবে অবিচল থাকতেন। তিনি ব্যক্তিত্ব-সম্পন্ন লোক ছিলেন। আল-খুশানি বলেছেন, সুলাইমানকে মারিদা অঞ্চলের বিচারের দায়িত্ব থেকে যখন অব্যাহতি দেওয়া হয়, তখন তিনি কর্ডোভার প্রাসাদের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে মারিদার আমির মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমানের কাছে লিখলেন, 'আমার বেতন থেকে উদ্বৃত্ত কিছু অর্থ আমার হাতে আছে। এগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া আমার কর্তব্য। এগুলো জুমুআর দিন এবং যেসব দিনে আমি বিচারকার্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলাম বা যে-সময়গুলোতে আমি বিচারকার্যের দায়িত্ব পালন করিনি, সেসব সময়ের বেতন থেকে আমার হিসাব করে পৃথক করে রাখা অর্থ।' তখন আমিরের পক্ষ থেকে জবাব পাঠানো হলো, 'এগুলো আমাদের পক্ষ থেকে আপনাকে উপহারস্বরূপ দেওয়া হয়েছে।' কিন্তু সুলাইমান সেগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে অবশেষে আমির এই অর্থ বুঝে নিয়েছিলেন।
একবার আমির মুহাম্মাদের জনৈক সহযোগী একজন ইহুদির ওপর জুলুম করে আমিরের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বিচারক সুলাইমান তখন আমিরকে ধমকি দিয়েছিলেন। এ ঘটনা দুটির কারণেই আমির মুহাম্মাদ যখন পিতার স্থলাভিষিক্ত হন, তখন বিচারক সুলাইমানকে কর্ডোভার কাযিউল জামাআহ হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।
মুহাম্মাদ ইবনু বাশির আল-মুআফিরির ছিলেন সেসব বিচারকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা হজের সময় ইমাম মালিক ইবনু আনাস-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এরপর তিনি আন্দালুসে ফিরে আসার পর হাকাম ইবনু হিশাম তাকে বিচারকার্য পরিচালনায় নিয়োগ দিতে চাইলেন। তিনি কিছু শর্তসাপেক্ষে দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। একটা শর্ত ছিল এমন: তাকে প্রয়োজন পরিমাণ ভাতা দিতে হবে।
তিনি ছিলেন প্রথম সারির বিচারকদের অন্তর্ভুক্ত। বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠিন অবস্থান গ্রহণ করতেন। শরীয়তের বিধানাবলি পালনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী।
মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াবকা বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তার সমস্ত উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারীদের একত্র করে এবং তাদেরকে নিজের যাবতীয় সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং মালিকানাধীন সবকিছুর তথ্য জানিয়ে দিলেন। যাতে দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণের পর এসব নিয়ে কেউ তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা না করে।
টিকাঃ
[৮২৭] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২৯; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০৪
[৮২৮] তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ৩০
[৮২৯] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৩২
[৮৩০] আল-মু'জিব ফী তালখীসি আখবারিল মাগরিব, পৃ. ৭৩; কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ১২০; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২১৬
[৮৩১] তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪৪ এবং ১৯৩; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২১৬
[৮৩২] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২২; তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪৩
[৮৩৩] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৭০; তারীখু কুদ্দাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫৬
[৮৩৪] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪৭-৪৮
[৮৩৫] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৭৭
📄 বিচারকদের বেশ-ভূষা
আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকরা সাধারণ জনগণ থেকে ভিন্ন নির্দিষ্ট কোনো পোশাকে অভ্যস্ত ছিলেন না। তবে বিচারকার্য চলাকালীন তারা নির্ধারিত এক ধরনের পোশাক পরতেন। এ ক্ষেত্রে একেক বিচারকের বিশেষ পোশাক একেক ধরনের হতো। তবে ইমাম আবু ইউসুফ সর্বসাধারণ থেকে বিচারকদের পৃথক রাখার সুবিধার্থে বাগদাদ এবং পূর্বাঞ্চলের আলিম, ফকিহ এবং বিচারকদের পোশাক এক ধরনের হওয়ার নীতি প্রচলন করেছিলেন। পক্ষান্তরে আন্দালুসে প্রত্যেক বিচারককে ইচ্ছামাফিক পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। এ কারণেই আন্দালুসের বিচারকদের বেশ-ভূষার ব্যাপারে নানাধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়।
আবদুর রহমান ইবনু আহমাদ প্রত্যেক সোম এবং বৃহস্পতিবারে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বসতেন। এ দুদিন তিনি কালো পোশাক পরিধান করতেন। আর অন্যান্য দিন পরতেন সাদা পোশাক।
সাঈদ ইবনু সুলাইমান আল-গাফিকি সম্পর্কে ইবনুল হারিস আল-খুশানি বলেন, 'তিনি কর্ডোভায় আগমন করলে আমির মুহাম্মাদ তাকে বিচারকার্যের দায়িত্ব প্রদান করেন। তিনি মসজিদে বসে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তখন তার পরনে থাকত পশমের সাদা জুব্বা। তার মাথায় থাকত "আকরুফ" নামে পরিচিত সাদা টুপি এবং গায়ে থাকত একই জাতীয় সাদা রঙের বিশেষ কপ।'
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া সম্পর্কে বিচারক ইয়াদ্ব বলেন, 'তিনি জুমুআর দিন পাগড়ি পরিধান করে পায়ে হেঁটে মসজিদে যেতেন।
ইবনু ফাতিন ছিলেন একজন দুনিয়াদার ব্যক্তি। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তার বেশ-ভূষা পালটে গেল। মন্ত্রীদের পোশাক ছেড়ে ফকিহদের সবুজ পোশাক পরতে লাগলেন। এই পোশাকের রং হালকা সবুজ অথবা গাঢ় সবুজ হতো।
তবে ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ বিচারকদের বেশ-ভূষার বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে থাকতেন। অভিজাত শ্রেণির এবং ফকিহগণের পোশাকের মাঝামাঝি স্তরের পোশাক পরিধান করতেন তিনি। যা থেকে আন্দালুসের প্রচলিত পোশাক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
ড. আহমাদ ফিকরি বর্ণনা করেছেন, আন্দালুসের বিচারকরা সবুজ রঙের বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান করতেন। কিন্তু আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকদের সম্পর্কে রচিত গ্রন্থাবলিতে এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।
উসতায আহমাদ আমিন বলেন, 'আন্দালুসের এই সভ্যতায় মানুষের বেশ-ভূষাতে পাগড়ির ব্যবহার খুব কমই দেখা যেত। তবে তাদের শাইখ, আলিম এবং বিচারকদের মাঝে পাগড়ির ব্যবহার চোখে পড়ত।'... আন্দালুসবাসীর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। বিচারক অথবা মুফতিকে আপনি খালি মাথায় দেখতে পাবেন। আর পাগড়ির ব্যবহার তো ছিল না বললেই চলে।
উসতাযের এই বক্তব্যটি সাধারণ গবেষণা মাত্র। আন্দালুসের বিচারকদের জীবনীতে এ কথার সমর্থনে কোনো বর্ণনা আমরা খুঁজে পাইনি।
আন্দালুসের কোনো কোনো বিচারক দায়িত্ব গ্রহণের আগে পরিধেয় পোশাক পরিবর্তন করতেন না। আর এটাই গ্রহণযোগ্য এবং অধিকাংশের মতামত। খালফ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি ফাতহুনের জীবনীতে এসেছে, তিনি পোশাক পরিবর্তন করেননি।
অনেকে নির্ধারিত পোশাক বাধ্য থাকতেন না। মুহাম্মাদ ইবনু বাশির আল-মুআফিরির জীবনীতে আল-খুশানি লিখেন, 'তিনি আমাদের জুমুআর নামাজ পড়াতেন। তার মাথায় থাকত একটি পশমি টুপি।' ... 'জুমুআর দিনে তিনি একটি হলুদ আলখাল্লা গায়ে দিয়ে এলেন। তার পায়ে ছিল চটি জুতা। মাথার চুল একটু এলোমেলো হয়ে ছিল। এরপর এই পোশাকেই দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন তিনি। একজন অপরিচিত আগন্তুক এই বিশেষ পোশাক, এলোমেলো মাথার চুল, হলুদ হয়ে যাওয়া চাদর, চোখে লাগানো সুরমা, মিসওয়াক এবং হাতে লেগে থাকা মেহেদির দিকে তাকিয়ে তাকে বিচারক বলে চিনতে পারল না। লোকটি তাকে বাঁশিওয়ালা বলে ভ্রম করছিল। অবশেষে চিনতে পারার পর তার মাঝে সে ন্যায়পরায়ণতা আর ইনসাফ দেখতে পেল।
টিকাঃ
[৮৩৬] কুদ্বাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৬২
[৮৩৭] তারতীবুল মাদারিক: ১/৫৩৭
[৮৩৮] নিয়ামুল হুকমি ফিশ শাবীআহ, পৃ. ২৩৭
[৮৩৯] নিযামুল হকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৩৭-
[৮৪০] কুরতুবার ফিল আহদিল ইসলামি, পৃ. ৩০৬
[৮৪১] বুহরুল ইসলাম। ৩/৪ এবং ৮
[৮৪২] নিযামূল হকমি ফিশ শাহীআহ, পৃ. ২৩৮
[৮৪৩] কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২৮ এবং ৩২