📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচার-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান

📄 বিচার-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান


সে-সময় বিচার-সংক্রান্ত অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছিল। বিচার বিভাগ পরিচালনা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, অপরাধ দমন এবং শরীয়তের বিধানাবলি বাস্তবায়ন করা ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ। আবুল হাসান আন-নুবাহি বিচার-সংক্রান্ত এসব প্রতিষ্ঠানকে 'খুত্তাহ' অর্থাৎ বিচারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বলে উল্লেখ করেছেন। আন-নুবাহি লিখেন, 'বিচারক আবুল আসবাগ ইবনু সাহল বলেছেন, প্রশাসকদের ছয়টি খুত্তাহ ছিল। সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমে:

ক) বিচার বিভাগ: এ বিভাগের সর্বোচ্চ স্তর ছিল প্রধান বিচারপতির বিচার।
খ) মধ্যম স্তরের পুলিশ বিভাগ,
গ) অধস্তন পুলিশ বিভাগ,
ঘ) দুর্নীতি দমন বিভাগ,
ঙ) বিচারের রায় পুনঃনিরীক্ষণ বিভাগ,
চ) শহর পরিদর্শন এবং
ছ) বাজার নিয়ন্ত্রণ।

প্রকল্পগুলো কর্ডোভার একজন লেখক তার রচনায় এভাবেই উল্লেখ করেছেন- বিচারব্যবস্থা, পুলিশ প্রশাসন, দুর্নীতি দমন, পুনঃনিরীক্ষণ, নগর পরিদর্শন এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ।

প্রতিটি প্রকল্প নিয়ে আমরা পৃথকভাবে সবিস্তারে আলোচনা করব। এগুলোর সাথে আরও কিছু বিচার-সংক্রান্ত বিভাগ ছিল। সেগুলো হচ্ছে: (ক) সামরিক আদালতের বিচারক, (খ) নিম্ন আদালতের বিচারক, (গ) উচ্চ আদালতের বিচারক এবং (ঘ) খ্রিষ্টানদের বিচারক।

উল্লেখ্য যে, বিচার-সংক্রান্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারেই নতুন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে—ব্যাপারটা এমন নয়। বরং বিচার-সংক্রান্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলো আন্দালুসের পুরোটা ইতিহাস জুড়েই পাওয়া গেছে। এগুলোর কোনোটার সাথে পূর্বাঞ্চলের বিচারব্যবস্থার কিছু কিছু মিল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটা অন্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে ছিল। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল এমন, যা কেবল আন্দালুসেই স্থাপিত হয়েছিল। সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

• কাযিউল জামাআহ
পূর্বাঞ্চলের 'কাযিউল কুযাত' তথা প্রধান বিচারপতির সাথে এই পদের অনেকটাই মিল আছে। তবে এই নামটি কেবল আন্দালুস এবং মরক্কোর লোকেরাই ব্যবহার করত। এটা ছিল বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদ। রাষ্ট্রে এর থেকে উচ্চ পর্যায়ের কোনো পদ ছিল না। যেমন আবুল হাসান আন-নুবাহির বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, 'কাযিউল জামাআহ ছিল বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় পদ।' তবে আন্দালুস এবং মরক্কো মুসলিমদের হাতে বিজিত হওয়ার সময় এই নামটির প্রচলন ছিল না। সে-সময় আফ্রিকা এবং আন্দালুসের বড় বড় শহরগুলোতে কেবল বিচারককে নিয়োগ দেওয়ার চল ছিল। আন্দালুসে উমাইয়ারা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় এই নামটির প্রচলন করা হয়। আন্দালুসের শহরস্থ বিচারককে 'সেনাবাহিনীর বিচারক' বলা হতো। যাদের এই নাম দেওয়া হয়েছিল, ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াজিদ ছিলেন তাদের অন্যতম। তার আগে এই নাম দেওয়া হয়েছিল কর্ডোভাস্থ সেনাবাহিনীর বিচারক মুহাম্মাদ ইবনু বাশিরকে। আর এটা আন্দালুসে আবদুর রহমান আদ-দাখিল আসার আগের কথা। পরবর্তীকালে আবদুর রহমান এসে সেখানকার নেতৃত্ব গ্রহণ করার পরও ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াজিদ আন্দালুসের বিচারক ছিলেন। আবদুর রহমান তাকে আর অপসারণ করেননি।

আবদুর রহমানের কাজকে ইয়াহইয়া আরও সহজ করে দিয়েছিলেন। আব্বাসিদের সমর্থিত আন্দালুসের প্রশাসক ইউসুফ আল-ফিহরি আবদুর রহমান আদ-দাখিলের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেননি। একপর্যায়ে আবদুর রহমান আদ- দাখিল তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। তখন তিনি বিচারক ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াজিদকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করার দাবি জানান। তিনি হাজির হলে আবদুর রহমান তার নামের আগে 'কাযিউল জামাআহ' শব্দটি জুড়ে দিয়ে চুক্তিপত্র রচনা করেন।

আবুল হাসান আন-নুবাহি বলেছেন, কাজা (বিচার) শব্দকে জামাআ (জামাআত) শব্দের সাথে ব্যবহার করার রীতি আন্দালুসেই চালু করা হয়েছিল। যার প্রচলন দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। জামা তথা দল দ্বারা যে বিচারকদের জামাত উদ্দেশ্য—এটা তো সুস্পষ্ট। কারণ সে যুগে সুলতানের উপস্থিতিতে মামলা- মোকদ্দমা বিচারকদের দ্বারাই সম্পন্ন হতো। আর পূর্বাঞ্চলের শহরগুলোতে খিলাফতের বিচারককে 'কাযিউল কুযাত' বলা হতো। ... বর্তমানে বিচারককে যে 'কাযিউল জামাআহ' বলা হয়—এ পদ্ধতিটি অভিনব। অতীতে এটার কোনো প্রচলন ছিল না।

উত্তর আফ্রিকার মারাকিশেও 'কাযিউল জামাআহ' ছিল। কখনো কখনো তাকে 'কাযিউল হাদরাহ'-ও বলা হতো। উত্তর আফ্রিকায় তিউনিসিয়া এবং কায়রুওয়ানের মতো যেসব ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিটি শহরেই 'কাযিউল জামাআহ' পরিভাষাটি ছড়িয়ে পড়েছিল। মুরাবিতরা আন্দালুসে প্রবেশ করে সেটাকে পূর্ব, মধ্য এবং পশ্চিম—এই তিন ভাগে ভাগ করে। তারা এসব এলাকার প্রতিটি অঞ্চলেই একজন করে 'কাযিউল জামাআহ' নিয়োগ দিয়েছিলেন। সারাকুস্তার মতো বড় বড় শহরেও একজন করে 'কাযিউল জামাআহ' নিয়োগ দেওয়া হতো।

হিজরি পঞ্চম শতাব্দীর শুরুর দিকে বাগদাদের মতো আন্দালুসেও কাযিউল জামাআহকে 'কাযিউল কুযাত' নামে আখ্যায়িত করা হয়। হিজরি ৪০৫ সালে সর্বপ্রথম এই উপাধি দেওয়া হয় আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু আবদিল্লাহ যাকওয়ানকে। স্বচ্ছতা, পবিত্রতা, ইলম, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভাবগাম্ভীর্য, ন্যায়পরায়ণতা এবং বিচক্ষণতায় তিনি ছিলেন অনন্য। এরপর কাযিউল কুযাত ছিলেন আবু বকর ইয়াহইয়া ইবনু আবদির রহমান ইবনি ওয়াফিদ আল-লাখমি। এদের পর পুনরায় 'কাযিউল জামাআহ' নাম ব্যবহার শুরু হয়।

আন্দালুসে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে প্রশাসকের পক্ষ থেকেই 'কাযিউল জামাআহ' নিয়োগ দেওয়া হতো। এরপর থেকে 'কাযিউল জামাআহ' নিয়োগ দেওয়ার অধিকার কেবল খলিফার জন্যই সংরক্ষিত হয়ে থাকে। জ্ঞানগত ও প্রশাসনিক যোগ্যতার বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যক্তিকে খলিফা খুঁজে খুঁজে বিচারক পদে নিয়োগ দিতেন।

আন্দালুসস্থ 'কাযিউল জামাআহ'-এর দায়িত্ব পূর্বাঞ্চলের 'কাযিউল কুযাত'-এর থেকে কিছুটা ভিন্ন হতো। বিচারকার্য পরিচালনা, মামলা-মোকদ্দমা দেখাশোনা এবং রাজধানীর সকল বিবাদ শরীয়ত অনুসারে মীমাংসা করা ছিল কাযিউল জামাআহর মৌলিক দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পরিচালনা করার কারণেই কাযিউল জামাআহ এত মর্যাদা লাভ করতেন। কারণ এগুলো সকল জনপদ এবং শহরের বিচারকদের জন্য অবশ্যপালনীয় রাষ্ট্রীয় ফরমান হিসেবে বিবেচিত হতো। উত্তর আফ্রিকার বিচারকরা এগুলোকে পূর্বসূরিদের বিচারের মূলনীতির মতো নির্ভরযোগ্য মনে করতেন। এসবের ওপর ভিত্তি করেই তারা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। নিজেদের বক্তব্য এবং বিচারের ফয়সালার ক্ষেত্রে তারা সেগুলো রেফারেন্স হিসেবে পেশ করতেন। তারা বলতেন-'এর ওপরই কর্ডোভার বিচারকার্য চলে।' অর্থাৎ সেখানকার কাযিউল জামাআহ থেকে এই রায় প্রকাশ পেয়েছে।

কাযিউল জামাআহর সাথে উত্তম আচরণ এবং তাকে সম্মান প্রদর্শন করা ছিল অন্যান্য অঞ্চলের বিচারকদের জন্য আবশ্যক। প্রশাসক এবং খলিফা নিজেও কাযিউল জামাআহর প্রতি অনেকটাই নির্ভরশীল থাকতেন। বিচারক নিয়োগের ব্যাপারে তার সাথে পরামর্শ করতেন। কখনো-বা বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব তার কাছেই ন্যস্ত করা হতো।

রাষ্ট্রের পলিসি-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে খলিফা পরামর্শ করতেন কাযিউল জামাআহর সাথে। রাজধানীর জামে মসজিদে ইমামতির দায়িত্বও তার কাঁধেই থাকত। খলিফার প্রতিনিধি হিসেবে সেনাপতির মতো আরও বড় বড় এবং কঠিন সব দায়িত্ব তার কাছে অর্পণ করা হতো। আবার খলিফা রাজধানীর বাইরে গেলে তাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন।

আন্দালুস এবং মরক্কোতে বিচারকদের বিরাট একটা অংশ কাযিউল জামাআহর পদ গ্রহণ করেছিলেন। এদের নাম সরকারি গ্যাজেটে এবং তাদের উদ্দেশ্যে খলিফার পক্ষ থেকে প্রদত্ত বক্তব্যে পাওয়া যায়।

• বড় বড় শহরের বিচারক
আন্দালুসে রাজধানী ছাড়াও বড় বড় শহরগুলোতে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার প্রচলন ছিল। এই বিচারক নিয়োগের জন্য কিছু শর্ত এবং পরিধি থাকত। আবুল হাসান আন-নুবাহি এসব তাদেরকে 'নগর জজ' বলে অভিহিত করেছেন।

• বিশেষ সহকারী
প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং ছোট ছোট শহরগুলোতে একজন বিচারক কাযিউল জামাআহর প্রতিনিধিত্ব করতেন। যাকে 'বিশেষ সহকারী' বলা হতো। এই পরিভাষাটি ছিল নিতান্তই আন্দালুসী। মুহাম্মাদ কুর্দ আলি বলেন, 'বিচারক বড় বড় শহরগুলোতে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। আর সহকারী জজরা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন ছোট ছোট শহরগুলোতে। প্রধান বিচারপতি তথা বিচারকার্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীলকে কাযিউল জামাআহ বলা হতো।" পক্ষান্তরে বিশেষ সহকারী ছিলেন সালিশি আদালতের দায়িত্বশীল। একটি ছোট গ্রামেই যার পরিধি সীমাবদ্ধ থাকত।

• অভিজাত শ্রেণির বিচারক
মুরাবিত প্রশাসক ইউসুফ ইবনু তাশফিনের সময়ে চালু হওয়া এই পদটি ছিল একেবারেই আধুনিক। একজন বিশেষ বিচারক হতেন এই পদের দায়িত্বশীল। অভিজাত এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের মধ্যকার মামলা-মোকদ্দমা এবং বিরোধ মীমাংসা করা ছিল তার দায়িত্ব। এখানে অভিজাত শ্রেণি বলে 'লামতুন' গোত্র উদ্দেশ্য। মুরাবিতগণ এদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। শাসক-পরিবার এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরোধ নিষ্পত্তি এই বিচারকই করতেন। মন্ত্রী আবু বকর ইবনু রহিম এই পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইশবিলিয়ার অভিজাত শ্রেণির বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করায় আবু বকর ইবনু রহিমের উদ্দেশ্যে ইবনু খানকাহ অভিনন্দনবার্তা পাঠিয়েছিলেন। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন চলছিল ৫১৫ হিজরি।

• খ্রিষ্টানদের বিচারক
একে 'অনারবদের বিচারক'-ও বলা হতো। বিচারব্যবস্থার এই প্রকল্পটি ছিল অমুসলিমদের সাথে সংশ্লিষ্ট। এটা কেবল আন্দালুসেই প্রচলিত ছিল। খ্রিষ্টানদেরকে তাদের নিজেদের বিচারক নির্বাচন করা এবং মুসলিমদের সামনেই তাদের বিচারকার্য পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

• বাজার নিয়ন্ত্রক বা হিসবাহ
এই প্রকল্পের দায়িত্বশীলকে বাজার নিয়ন্ত্রক বা হিসবাহর দায়িত্বশীল বলা হতো। আন্দালুসের এই প্রকল্পের বিবরণ দিতে গিয়ে উসতায আহমাদ আমিন বলেন, 'বিচারের দায়িত্বের পাশাপাশি হিসবাহর দায়িত্বও থাকত। এই প্রকল্পের দায়িত্বশীল থাকতেন একজন বিচক্ষণ আলিম, সমাজে যার বিশেষ অবস্থান আছে। বাহনে চড়ে কয়েকজন সাথি নিয়ে তিনি বাজার ঘুরে ঘুরে দেখতেন। তার সাথে ওজন করার মতো নিক্তি থাকত। দোকানে থাকা রুটি তিনি মেপে মেপে দেখতেন। যাচাই করতেন পণ্যের দর-দাম। পণ্যের ওপর লেবেল লাগানো থাকলে সেটা চেক করে দেখতেন। অনেক সময় যাচাইয়ের জন্য বিক্রেতার কাছে গোপনে কাউকে পাঠাতেন। বিক্রেতাকে কোনো ধরনের প্রতারণা করতে দেখলে তাকে বেত্রাঘাত করে অসম্মান করা হতো। এরপরও বিরত না হলে তাকে উচ্ছেদ করা হতো শহর থেকে।

অন্যান্য ইসলামি দেশে হিসবাহর দায়িত্বপালনকারীগণ যা করতেন, আন্দালুসের বাজার নিয়ন্ত্রকও একই কাজ করতেন। ইবনু আবদুনের মতে, হিসবাহ বিচার বিভাগেরই একটি শাখা। আর হিসবাহর পরিচালক হচ্ছেন বিচারক, মন্ত্রী এবং খিলাফতের সহযোগী। কেননা বিচারকের অনেক কাজই হিসবাহর দায়িত্বশীল পালন করে থাকেন। তাকে বিজ্ঞ হতে হয়। আবদুস সালাম ইবনু সাঈদ সাহনুন ছিলেন হিসবাহর দায়িত্ব পালনকারী সর্বপ্রথম বিচারক।

প্রত্যেক শহরের হিসবাহর দায়িত্বশীলকে মুহতাসিব বা বাজার নিয়ন্ত্রক বলা হতো। কেননা তার অধিকাংশ কাজ হতো ব্যবসায়ীদের তদারকি করা। জ্ঞান এবং বিচক্ষণতায় সর্বজনস্বীকৃত হওয়া ছিল মুহতাসিব নির্বাচিত হওয়ার শর্ত। বিচারকার্যের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় অনেক সময় বিচারকদের মধ্য থেকেও মুহতাসিব নির্বাচন করা হতো। মুহতাসিবদের নানাধরনের নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন আইনকানুন সম্পর্কে পড়াশোনা করতে হতো।

মুহাম্মাদ কুর্দ আলি আন্দালুসের হিসবাহ অধিদপ্তরের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'হিসবাহ বিভাগ ছিল বিচার বিভাগের মতোই। বিভিন্ন শহর, শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থাপনা, সমাজ এবং সমাজের উপকারী বা অপকারী জিনিস-অনেক বিষয়ই ছিল হিসবাহর অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানের পরিভাষায় হিসবাহ ছিল শহরের সালিশি কার্যক্রম, পুলিশ এবং চিকিৎসা বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমের মতোই।... হিসবাহ বিভাগ মূলত বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন বিভাগ-এই দুটির সমন্বিত রূপ। এই বিভাগে শরীয়তের মেজাজ এবং রাষ্ট্রীয় কঠোরতা-উভয়টিই ছিল। ব্যাপক জনস্বার্থের প্রতি লক্ষ রেখে প্রথম যুগের খলিফারা নিজেরাই হিসবাহ পরিচালনা করতেন। দ্বীনের ব্যাপারে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী, সত্যের পতাকাবাহী, মার্জিত চরিত্রের অধিকারী, সুউচ্চ মনোবল-সম্পন্ন, ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতায় সুপরিচিত, সহনশীল, ধৈর্যশীল, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়ের সমাধানে সক্ষম এবং গণমানুষের নেতৃত্বে অভিজ্ঞ ব্যক্তিই হিসবাহ পরিচালনা করতেন। কোনো ধরনের লোভ তাকে আকৃষ্ট করতে পারত না, আর চাটুকারিতার দ্বারাও তিনি প্রভাবিত হতেন না। আল্লাহর আইনের ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া তিনি করতেন না। তার প্রতি এমন এক সমীহ কাজ করত যে, কেউ তার সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করার সাহস পেত না। সত্যিকারের অপরাধীরা তার সামনে এসে ভীত হয়ে পড়ত।'

■ পুলিশ

আন্দালুসে এটা ছিল স্বতন্ত্র একটি বিভাগ। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধের ক্ষেত্রে এ বিভাগটি হিসবাহরই একটি অংশ ছিল। বাজার নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তরই পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব পালন করতেন। পরবর্তীকালে আন্দালুসের আমির দ্বিতীয় আবদুর রহমান বাজার নিয়ন্ত্রণ বিভাগকে পুলিশ বিভাগ থেকে পৃথক করে দেন। এ কারণেই আন-নুবাহি এবং ইবনু খালদুন পুলিশ বিভাগকে বিচার সংশ্লিষ্ট স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে গণ্য করে সেটার বর্ণনা দিয়েছেন। পুলিশ বিভাগ আবার ছিল দুই ভাগে বিভক্ত—(ক) ঊর্ধ্বতন পুলিশ বিভাগ এবং (খ) অধস্তন পুলিশ বিভাগ।

আদতে পুলিশ বিভাগ ছিল বিচার সংশ্লিষ্ট একটি বিভাগ। বিচার বিভাগের যাবতীয় কার্যক্রম সাধারণ বিচার বিভাগ, হিসবাহ এবং দুর্নীতি দমন বিভাগের সাথে বিভক্ত ছিল। আর পুলিশি বিভাগের কার্যক্রমের মধ্যে ছিল বিভিন্ন স্তর ও বিভিন্ন এখতিয়ার। আন্দালুসের তৎকালীন পুলিশি বিভাগ ছিল বর্তমানে বাস্তবায়ন বিভাগের পর্যায়ে। যেখানে বিচারকদের প্রদত্ত চূড়ান্ত রায় বাস্তবায়ন হয়ে থাকে।

এ জন্যই মুহাম্মাদ কুর্দ আলি বলেছেন, 'পুলিশ-প্রধান কখনো কখনো বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি ও দণ্ড বাস্তবায়ন করতেন। অপরাধী খলিফার কাছের ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেও প্রধান বিচারপতির মতো শাসকের অনুমতি ছাড়াই অপরাধীকে হত্যা করার অধিকার তিনি সংরক্ষণ করতেন। অপরাধী মদ্যপ এবং ব্যভিচারী হলে তাকেও শাস্তি দেওয়া হতো। শরীয়তের অনেক বিষয়ই তার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। পুলিশ-প্রধান আন্দালুসে নগর রক্ষক বা নৈশ প্রহরী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

• অন্যায় ও দুর্নীতি দমন বিভাগের দায়িত্বশীল
দুর্নীতির বিচার বিভাগ আন্দালুসে 'খুত্তাতুল মাযালিম' নামে পরিচিত ছিল। আন্দালুসে উমাইয়া শাসনের সময় যা ছিল নিতান্তই নতুন বিভাগ। তবে এই বিভাগের কার্যক্রম এবং দায়িত্ব—এগুলো হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে খিলাফতের যুগে সুস্পষ্ট হয়।

এই বিভাগটি তৎকালীন আন্দালুসে এতটাই উন্নতি সাধন করেছিল যে, পূর্বাঞ্চলে উমাইয়া এবং আব্বাসি যুগেও ততটা হয়নি। কাযিউল জামাআহর পরবর্তী অবস্থানটিই ছিল এই বিভাগ পরিচালকের। তবে অন্যান্য বিচারকরা যে বিচারকার্য পরিচালনা করতে অপারগ ছিল, সেটা তিনি পরিচালনা করতে পারতেন। বিশেষত প্রশাসক বা খলিফা যখন তাকে দায়িত্ব দিতেন। তার দায়িত্ব ছিল (সাধারণ) বিচারকের দায়িত্বের চেয়েও ব্যাপক, অধিক প্রভাবক এবং বেশি কঠিন। সরাসরি খলিফার পক্ষ হতে তাকে নিয়োগ দেওয়া হতো। কোনো বাধা ছাড়াই তিনি নির্দেশ জারি করতে পারতেন। ব্যক্তির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, তদন্ত এবং বিচার কার্যকর করবেন তার প্রমাণ পেশের অধিকার তিনি সংরক্ষণ করতেন।

আন্দালুসে এই বিভাগ পরিচালকদের মাঝে কয়েকজন ছিলেন: আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি হুদাইর, আবদুর রহমান ইবনু কুতাইশ, আবু হাতিম মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ এবং মুনযির ইবনু সাঈদ। শেষোক্তজন ছিলেন আবদুর রহমান আন- নাসিরের বিচারক।

মুরাবিতদের শাসনামলে আন্দালুসের এই বিভাগটি ছিল ভাবী উত্তরাধিকারী শাসকের পরিধির অন্তর্ভুক্ত। তাদের শাসনামলের শেষে এই বিভাগের দায়িত্ব মন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়েছিল। তখন আলি ইবনু ইউসুফ ইসহাক ইবনি নাবতানকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর এ বিভাগের দায়িত্ব তার কাছে অর্পণ করা হয়েছিল।

• সামরিক বিচারক
এই বিভাগটি পূর্বাঞ্চলের সামরিক বিচার বিভাগের মতোই ছিল। সামরিক বিভিন্ন বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে আন্দালুস-সহ অন্যান্য অঞ্চলের এই বিভাগটি ছিল একটি বিশেষ বিভাগ। অনেক সময় খোদ সেনাপতিই এ বিভাগের দায়িত্ব পালন করতেন। আসাদ ইবনু ফুরাতের জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে আবুল হাসান আন- নুবাহি এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আসাদ ছিলেন সিসিলিতে যুদ্ধরত বাহিনীর সেনাপতি। সৈন্যদের বিচারকার্যও তিনি পরিচালনা করতেন। আর মরক্কোতে সামরিক বিচারকার্য পরিচালনা করতেন আবদুর রহিম ইবনু ইসমাঈল।

• পুনঃনিরীক্ষণ বিভাগ

আন্দালুসের বিচার বিভাগীয় সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান ছিল পুনঃনিরীক্ষণ বিভাগ। যা ছিল আদালতের সর্বোচ্চ স্তর। এই বিভাগটি ছিল কেবল আন্দালুসের বিচার বিভাগেরই বৈশিষ্ট্য। ইসলামি পূর্বাঞ্চলে এই বিভাগ সম্পর্কে জানা যায় না। বিচারকদের বিচারকার্য দেখাশোনা এবং শাসকরা সংশয় রাখেন এমন বিচারকার্যের রায় প্রত্যাহার করে সেটার ফয়সালা পুনরায় করা ছিল এই বিভাগীয় বিচারকের পরিধিভুক্ত। তিনি ছিলেন শাসক এবং বিচারকদের কার্যক্রমের ব্যাপারে তদন্ত বিভাগের দায়িত্বশীল পর্যায়ের। ছোট ছোট এবং প্রত্যন্ত গ্রামে থাকা সাধারণ মানুষের খোঁজখবর রাখতেন। বিচারকদের সম্পর্কে তথ্য নিতেন।

এই পদের দায়িত্ব যারা পালন করেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনু তামলিখ তামিমি। খলিফা আল-মুসতানসিরের শাসনামলে তিনি এই পদ গ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া আরও ছিলেন মুনযির ইবনু সাঈদের ছেলে আবদুল মালিক, আবদুল্লাহ ইবনু হারসামা, আহমাদ ইবনু আবদিল্লাহ এবং ইউনুস ইবনু মুহাম্মাদ।

এই বিভাগের দায়িত্ব যারা পালন করেছিলেন, তাদের 'সাহিবুর রদ' তথা পুনঃনিরীক্ষক বলা হতো। কারণ বিচারের যাবতীয় ফয়সালা পুনঃনিরীক্ষণের জন্য তাদের কাছে পাঠানো হতো। কাযিউল জামাআহর পরবর্তী অবস্থানটিই ছিল এই পদের অধিকারীর।

এগুলো ছিল আন্দালুসের বিচার-সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। সাধারণ বিচার বিভাগের অধীনে আরও কিছু প্রকল্পের সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলো আমরা বিচার বিভাগের পরিধি সংক্রান্ত অধ্যায়ে আলোচনা করব।

টিকাঃ
[৭৮৯] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫
[৭৯০] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৯৯; দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুস, পৃ. ২৭ এবং ১৭; কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ১৪
[৭৯১] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৯৯; তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ২১
[৭৯২] তারীখুল মাগরিবি ওয়াল আন্দালুসি ফী আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ২৮৭; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৪৫
[৭৯৩] তারীখু কুন্দ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ২১; নিযামুল হকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৪৪
[৭৯৪] কুরতুবাতু ফিল আসরিল ইসলামি, পৃ. ৩০৫-৩০৬
[৭৯৫] কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২৯
[৭৯৬] তাবীণু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ২১ এবং ২৮; কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ১৪
[৭৯৭] তাযীশু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ : ২/২৬৭
[৭৯৮] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬৭
[৭৯৯] তারীখুল মাগরিবি ওয়াল আন্দালুসি ফী আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ২৯১
[৮০০] তারীখুল মাগরিবি ওয়াল আন্দালুসি ফী আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ২৮৯
[৮০১] তারীখুল মাগরিবি ওয়াল আন্দালুসি ফী আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ২৯২
[৮০২] তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫
[৮০৩] যুহরুল ইসলাম: ৩/১৮
[৮০৪] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬৭; নিযামূল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৬১৬
[৮০৫] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬৭ এবং ২৬৮
[৮০৬] তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫; ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২২২
[৮০৭] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬৭; ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২২২
[৮০৮] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২২২; মুনযিরের জীবনী জানতে তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৭৬-৭৭ দেখুন।
[৮০৯] তারীখুল মাগরিবি ওয়াল আন্দালুস ফী আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ২৯০; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, 7.-299
[৮১০] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫৪; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৫৯; তারীখুল মাগরিবি ওয়াল আন্দালুস ফী আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ২৯২
[৮১১] তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ৫

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকগণ

📄 আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকগণ


আমরা দেখেছি, আন্দালুস আর মরক্কোর বিচার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এক দিক থেকে পূর্বাঞ্চলের বিচার-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে সংগতিপূর্ণ থাকলেও আরেক দিক থেকে সংগতিপূর্ণ ছিল না। আন্দালুসে বিচার সংশ্লিষ্ট এমন কিছু অভিনব বিভাগ এককভাবে ছিল, যেগুলোর কোনো দৃষ্টান্ত পূর্বাঞ্চলে পাওয়া যায় না। তবে আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারক এবং পূর্বাঞ্চলের বিচারকদের অবস্থা ছিল এক আর অভিন্ন। যেমনটা আমরা আগে উল্লেখ করেছি। নীতি এবং আদর্শের ক্ষেত্রে তাদের বিচারকার্য, রায় ও ফয়সালা, তাদের চারিত্রিক আর সার্বিক পরিস্থিতি এবং তাদের সাথে সম্পৃক্ত প্রায় যাবতীয় বিষয়ে কোনো ধরনের ভিন্নতা ছিল না। তবে শাখাগত এবং ব্যক্তিগত বিষয়ে কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। বিচারের পন্থা এবং পদ্ধতির মতো কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে পরিভাষা ব্যবহার এবং শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে। আন্দালুস ও মরক্কোর কিছু বিধান নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করছি।

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারক নিয়োগ এবং নিয়োগের শর্তাবলি

📄 বিচারক নিয়োগ এবং নিয়োগের শর্তাবলি


আন্দালুসের বিচারকরা ছিলেন কেন্দ্রীয় মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। অন্যান্য ইসলামি রাষ্ট্রের মতো সেখানেও বিচারকদের মর্যাদা ছিল চোখে পড়ার মতো। ইসলামি আইনে স্বীকৃত যাবতীয় শর্ত তাদের কাজের মধ্যে পরিপূর্ণ ছিল। শরীয়তের বিধানাবলি এবং বিচারকার্যের গুণাবলির কথা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এ বিধানের মাধ্যমে তারা মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করবে এবং এরই ওপর ভিত্তি করে ন্যায় এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। রক্ষা পাবে মানুষের অধিকার এবং প্রয়োগ হবে আল্লাহর নির্ধারিত দণ্ড। বিচারক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তির শর্তসমূহের মতো শরীয়তের আরও অনেক নীতি বিচারকদের মধ্যে পরিপূর্ণ ছিল। যেমন: চারিত্রিক স্বচ্ছতা, অবিচলতা, সত্যনিষ্ঠা, আমানতদারিতা, বীরত্ব আর সাহসিকতা এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে অধ্যবসায়। কেননা তাদের প্রদত্ত ফতোয়া এবং রায় দূর করত সমাজে প্রচলিত যাবতীয় সংশয়। সমস্ত মোকদ্দমার নিরসন করত। সমাধা করত সব বিবাদ। বিচারকদের আরও যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল সেগুলো হচ্ছে: পক্ষপাত করা থেকে দূরে থাকা, গোঁড়ামি না করা, কুপ্রবৃত্তি এবং ব্যক্তিগত লোভ-লালসা নিয়ন্ত্রণে রাখা, ব্যক্তিগত স্বার্থ না দেখা, আবেগপ্রবণ না হওয়া এবং রাজনৈতিক তৎপরতা আর আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখা।

আন্দালুসের বিচারক সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্য থেকেই নির্বাচন করা হতো। অধিকাংশ সময় বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো সংশ্লিষ্ট শহর বা অঞ্চল থেকে। যাতে বিচারক সেই শহরের মানুষের স্বভাব-চরিত্র এবং অবস্থাদি সম্পর্কে অবগত থাকেন। সংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে তাদের পরিচিত ব্যক্তি হওয়ার সুবিধা হচ্ছে, লোকেরা বিচারকের ওপর আস্থা রাখতে পারবে এবং তার জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সবাই অবগত থাকবে। তাহলে বিচারকের বিচার এবং ফয়সালায় সবাই আশ্বস্ত থাকবে।

আন্দালুস এবং মরক্কোতে বিচারক নিয়োগের প্রধান অধিকার থাকত প্রশাসকের। তারপর খিলাফত না থাকলে আমিরের থাকত বিচারক নিয়োগের অধিকার। পক্ষান্তরে খিলাফত প্রতিষ্ঠা হলে খলিফাই সবচেয়ে বেশি অধিকার রাখতেন। খলিফা শহরের লোকদের প্রস্তাবনা অনুসারে বিচারক নিয়োগ দিতেন। বিচারককে সর্বজনস্বীকৃত শ্রেষ্ঠ এবং খ্যাতিমান কোনো ব্যক্তি হতে হতো। পূর্ব থেকে রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি কিংবা আরব বংশোদ্ভূত হওয়ার কোনো শর্ত ছিল না। যেমন উত্তর আফ্রিকার বার্বার জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়েও ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া ইবনি আকসাম বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আবার সিরিয়ান এবং মিশরীয় বংশোদ্ভূত-এমন অনেকেই বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন, যারা আন্দালুসকে স্থায়ী নিবাস বানিয়েছিলেন।

আমির বা খলিফা কোথাও বিচারক নিয়োগ দেওয়ার আগে আলিম, মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দাদের সাথে পরামর্শ করে নিতেন। ১৮০ হিজরিতে আমির মুরতাযা ছিলেন সেখানকার শাসক। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া আল-আন্দালুসি (২৩৪ হি.) ছিলেন তখনকার বিচারক। তাদের দুজনের সম্পর্ক ছিল খলিফা হারুনুর রাশিদের সাথে বিচারপতি আবু ইউসুফের মতো। আন্দালুসের সকল প্রান্তে, যাবতীয় অঞ্চলে তার পরামর্শ এবং মতামত ছাড়া বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো না। শাসক এবং আপামর জনসাধারণের কাছে তার বিশেষ মর্যাদা ছিল। বিচারকার্য থেকেও ঊর্ধ্বে ছিল তার অবস্থান। তিনিই আন্দালুসে মালিকি মাযহাবের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। উত্তর আফ্রিকার তানজাহ বা টাঙিয়ের থেকে আগত ইয়াহইয়া ছিলেন মূলত বার্বার জাতিগোষ্ঠীর লোক। কর্ডোভাতে পড়াশোনা করেছেন। যুবক বয়সে আরবে সফর করেছেন। ইমাম মালিক থেকে আল-মুওয়াত্তা গ্রন্থের হাদিস শ্রবণ করেছেন। মক্কা এবং মিশরের আলিমদের থেকেও ইলম আহরণ করেছেন। তারপর দেশে ফিরে এলে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি বিরত থাকেন। কারণ তার মর্যাদা ছিল বিচারকের মর্যাদারও ঊর্ধ্বে। বিচার বিভাগের ব্যাপারে তার বিমুখতা, দায়িত্ব গ্রহণ থেকে তার বিরত থাকা, অগাধ পাণ্ডিত্য এবং বিচক্ষণতার কারণে অন্যান্য বিচারকদের তুলনায় আমিরদের কাছে তার মর্যাদা ছিল সবার শীর্ষে।

আমির বা খলিফা অনেক সময় প্রশাসক, মন্ত্রী বা আঞ্চলিক শাসককে বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব দিতেন। মাঝে মাঝে কাযিউল জামাআহর কাছে দায়িত্ব অর্পণ করতেন। তবে এমন ঘটনা ছিল নিতান্তই বিরল। এ কারণেই রাষ্ট্রের যেসব বিভাগের অধীনে বিচারকার্যের দায়িত্ব ছিল-সেগুলো এবং বিচারক নিয়োগের অধিকারপ্রাপ্ত দায়িত্বশীলদের কথা প্রসঙ্গে ইবনু ফারহুন বলেছেন, 'রাষ্ট্রের যেসব বিভাগের অধীনে বিচারের দায়িত্ব থাকত, সেগুলো ছিল কয়েক ধরনের। প্রথমত: আল-ইমামাতুল কুবরা তথা বড় নেতৃত্ব। বিচারের যোগ্যতা এই প্রকারেরই একটি অংশ। তদ্রূপ সাধারণ রাজনীতির যোগ্যতাও এর একটি অংশবিশেষ। দ্বিতীয়ত: মন্ত্রণালয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো وزیر التفويض বা দপ্তরবিহীন মন্ত্রী ; وزير التنفيذ তথা কার্যকর মন্ত্রী নয়। তৃতীয়ত: প্রশাসন ...।'

বিচারক নিয়োগ দেওয়ার আগে যাচাই এবং নির্বাচন করার পর দায়িত্ব পালন করতে পাঠানোর আগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা ছিল কর্ডোভা বা অন্যান্য অঞ্চলের কাযিউল জামাআহর দায়িত্ব।

এরপর খলিফা বা আমির বিচারক নিয়োগের ব্যাপারে একটি নির্দেশনা জারি করতেন। যা-তে বিচারকের জায়গা এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেওয়া থাকত। আন্দালুসের তৎকালীন শাসক উকবাহ ইবনুল হাজ্জাজ আস-সালুলি এমন করেছিলেন। উকবাহ ছিলেন বাহাদুর মুজাহিদ ও শক্তিশালী যোদ্ধা। প্রখ্যাত আলিমে দ্বীন ও বুজুর্গ, বিজ্ঞ ফকিহ মাহদি ইবনু মুসলিম পরিচিত ছিলেন বিধায় উকবাহ তাকে কর্ডোভায় নিজের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য আদেশ দিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় ফরমান লিখে দেন। যা-তে লেখা ছিল, 'এটা উকবাহ ইবনুল হাজ্জাজের নির্দেশনা। যা তিনি লিখেছেন মাহদি ইবনু মুসলিমের প্রতি, তিনি বিচারের দায়িত্বে নিয়োগের সময়। মাহদিকে উকবাহ ওসিয়ত করছেন: তিনি যেন আল্লাহকে ভয় করেন, তাঁর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেন এবং প্রকাশ্যে-গোপনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী চলেন। মাহদিকে উকবাহ আরও আদেশ করছেন, তিনি যেন আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাহকে পথ চলার রাহবার হিসেবে গ্রহণ করেন। কারণ এটা এমন আলোর মশাল, যার মাধ্যমে তিনি চলতি পথে আলো লাভ করবেন। এ এমন এক প্রদীপ, যা থেকে আলো নিয়ে তিনি সকল গোমরাহি থেকে বেঁচে থাকতে পারবেন। ... মাহদির জেনে রাখা দরকার, দেশ ও দশের স্বার্থে মহান বিচারকার্যের দায়িত্ব দিয়ে উকবাহ তাকে পরীক্ষায় ফেলেননি; বরং এ দায়িত্ব তাকে দেওয়ার কারণ হচ্ছে, আল্লাহর কাছে থাকা বিচারের বিশেষ মর্যাদা। বিচারের মাঝে রয়েছে দ্বীনের বিধিবিধান, মুসলিমদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, যথাযথ স্থানে যথাযথ ব্যক্তির ওপর শাস্তিদণ্ড প্রয়োগ, সঠিক হকদারকে তার অধিকার প্রদান করা।... সুতরাং মাহদি যেন নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করেন।... মাহদির প্রতি উকবাহর আদেশ থাকল, তিনি যেন বাদী-বিবাদীর মাঝে সমতা রক্ষা করেন, তার সহকর্মী, উপদেষ্টামণ্ডলী এবং তার ইহকালীন ও পরকালীন সহযোগীরা যেন আগের সহযোগীদের চেয়েও বড় জ্ঞানী, বড় ফকিহ, অধিক দ্বীনদার আর বেশি আমানতদার হয়। তার রক্ষী এবং সহকারীরা যেন হয় স্বচ্ছ ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারী।...

টিকাঃ
[৮১২] তারীখুল মাগরিবি ওয়াল আন্দালুসি ফী আহদিল মুরাবিতিন, পৃ. ২৮৪; হাসান ইবরাহীম সংকলিত তারীখুল ইসলাম: ২/৩১৩। আরও দেখুন কুদ্ধাতু কুরতুবাহ।
[৮১৩] তারীখুল কাম্বা, পৃ. ৯৭; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০৩; তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১৪; কুন্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৫
[৮১৪] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/১৪-১৫ (পরিবর্তিত এবং সংক্ষেপিত)
[৮১৫] কুদ্দাতু কুরতুবাহ
[৮১৬] কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৯; তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৪২

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি

📄 বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি


বেশি উপযুক্ত, শ্রেষ্ঠ, আল্লাহভীরু, বুজুর্গ এবং অধিক বিজ্ঞ ফকিহ ব্যক্তিকে বিচারকার্যের দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারে খলিফা এবং প্রশাসকরা সচেষ্ট থাকতেন। কিন্তু নানান কারণে এসব ব্যক্তিদের অনেকেই দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন। যেসব কারণে তারা বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকতেন, সেসবের মাঝে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল বিচারের দায়িত্বের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন এবং সতর্কবাণী, দুনিয়া ও আখিরাতের বিশাল জবাবদিহিতা, হক বাস্তবায়ন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং সকলের ওপর আল্লাহর আইন প্রয়োগ করা। এ ছাড়াও আখিরাতে আল্লাহর সামনে এ ব্যাপারে জবাবদিহির ভয়ও তাদের ছিল।

আন্দালুসের আলিম এবং ফকিহদের অবস্থান ছিল উমাইয়া এবং আব্বাসি আলিমদের অবস্থানের মতোই। বরং আন্দালুস ও মরক্কোর আলিমদের আল্লাহভীতি এবং দুনিয়াবিমুখতা ছিল পূর্বাঞ্চলের আলিমদের তুলনায় বেশি। কারণ আন্দালুস ও মরক্কো ভৌগোলিক দিক থেকে এবং জনসংখ্যার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। এ কারণেই মুহাম্মাদ ইবনুল হারিস আল-খুশানি (৩৬১ হি.) তার গ্রন্থ 'কুদ্ধাতু কুরতুবাহ' এবং আবুল হাসান আন-নুবাহি (৭৯৩ হি.) তার 'তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস' গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে এমন সব ব্যক্তির আলোচনা করেছেন, যাদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা অসম্মতি জানিয়ে বিরত থেকেছেন।

এর বিভিন্ন কারণ উপস্থাপন করে আল-খুশানি বলেন, 'গুরুত্বের দিক থেকে এমন খলিফার পরই একজন বিচারকের স্থান, যাকে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের দায়িত্ব দান করার পাশাপাশি দুনিয়া পরিচালনার দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত করেছেন। কারণ একজন বিচারক যেসব দায়িত্ব পালন করেন সেগুলো হচ্ছে: বিচারের রায় বাস্তবায়ন এবং জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু আর চরিত্রের হেফাজত নিশ্চিতকরণ। পাশাপাশি এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত যত ধরনের উপকার এবং অপকার রয়েছে- সবগুলোর দায়িত্বও বিচারকের। এ দায়িত্বের পরিণামে আল্লাহর কাছেও ভয়াবহ অবস্থান আর কঠিন ভয় আছে। এই দায়িত্ব এতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ হওয়ার কারণেই বুদ্ধিমান মানুষ এবং জ্ঞানীগণ এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। অনেকে তো বিচারকার্যের মর্যাদার প্রতি আগ্রহী হয়ে, আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে সাহায্যের প্রত্যাশা করার পাশাপাশি তাঁর ব্যাপক ক্ষমার ওপর ভরসা করে দায়িত্ব গ্রহণ করে নিয়েছেন। আবার কিছু লোক আখিরাতের ভয়ে এবং নিজেদের আর অধীনস্থদের পক্ষ থেকে ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তির আশঙ্কায় দায়িত্ব গ্রহণ থেকে পলায়ন করেছেন।

আল-খুশানি আরও বলেন, 'আন্দালুসের রাজধানী কর্ডোভার বাসিন্দাদের মধ্য থেকে কিছু লোক এমন ছিলেন, যাদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তারা সে ডাকে সাড়া দেননি। তারা এ আহ্বান উপেক্ষা করার কারণ ছিল, দায়িত্বের পেছনে অপেক্ষমাণ পরিণামের ব্যাপারে নিজেদের শঙ্কা। তাদের আলোচনা, খলিফাদের কাছে তাদের অবস্থান এবং তাদের যে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ডাকা হতো-সে ব্যাপারে তাদের কী শঙ্কা ছিল, সেটাও তো পাঠক অবশ্যই পড়েছেন। বইয়ের শুরুতেই এ ব্যাপারে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আমি সব আলোচনা করেছি।'

এ ধরনের ব্যক্তিদের শীর্ষে ছিলেন ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া ইবনি কাসির আল-আন্দালুসি। বিচারক ইয়াহইয়া ইবনু ইয়া'মারের মৃত্যুর পর প্রায় ছয় মাস যাবৎ লোকদের কোনো বিচারক ছিল না। আন্দালুসের আমির আবদুর রহমান তখন বিচার বিভাগ নিয়ে অস্থির হয়ে পড়লেন। লোকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করলে তিনি বললেন, 'ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করছি বলেই আমি তাড়াহুড়া করে বিচারক নিয়োগ দিতে পারছি না। যাকে আমার পছন্দ হয়, তিনি ছাড়া যোগ্য কাউকে আমি পাচ্ছি না। আবার সেই যোগ্য ব্যক্তিটিও আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না।' তখন কেউ কেউ আমিরকে পরামর্শ দিলো, তিনি যেন যোগ্য ব্যক্তিটিকে দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য করেন। এরপর ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়াকে উপস্থিত করে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য জোর করা হলে তিনি অসম্মতি জানান। তখন কাকে নিয়োগ দেওয়া যায়-এ ব্যাপারে তার কাছে পরামর্শ চাওয়া হলে তিনি তাতেও অপারগতা প্রকাশ করেন। অবশেষে প্রচণ্ড চাপে পড়ে তিনি ইবরাহীম ইবনু আব্বাসকে নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। আন্দালুসে ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়ার পরামর্শ ছাড়া বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো না।

এরপর আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া আন্দালুসের আমির হলেন। তিনি ছিলেন আন্দালুসের মাটিতে উমাইয়া বংশের প্রথম খলিফা। কর্ডোভার বিচারক নিয়োগের ব্যাপারে তিনি সভাসদদের সাথে আলাপ করেন। তার ছেলে হিশাম এবং রক্ষী ইবনু মুগিস পরামর্শ দেন মুসআব ইবনু উমরানকে বিচারক নিয়োগ করতে। তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দানের ব্যাপারে সবাই একমত হলে আমিরেরও তা মনঃপূত হয়। তখন তিনি পত্র পাঠিয়ে মুসআবকে ডেকে পাঠান। তিনি আগমন করলে ছেলে হিশাম, রক্ষী ইবনু মুগিস এবং বিশেষ সভাসদদের উপস্থিতিতে তাকে সামনে আনেন। এরপর বিচারের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মুসআবকে প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে প্রতিবন্ধক অনেক অজুহাত এবং সমস্যার কথা তুলে ধরেন তিনি। মুসআবের পেশকৃত এসব অজুহাত আমির না মেনে চাপ প্রয়োগ করলেন। কিন্তু মুসআব ছিলেন নিজের অবস্থানে অনড়। বারংবার পীড়াপীড়ি করেও তাকে মানাতে না পেরে আমির ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। অবশেষে দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে রেখে গোঁফে তা দিতে লাগলেন। এরপর মাথা তুলে মুসআবের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনি যেতে পারেন। আপনার অজুহাত আমি মেনে নিলাম। আপনার ব্যাপারে যারা পরামর্শ দিয়েছিল, তাদেরও আমি ক্ষমা করে দিলাম।'

পরবর্তীকালে হিশাম কর্ডোভার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য যিয়াদ ইবনু আবদিল্লাহকে প্রস্তাব দেন। হিশামের জোরাজুরি দেখে যিয়াদ কর্ডোভা থেকে পালিয়ে যান। তখন হিশাম ইবনু আবদির রহমান বললেন, 'যিয়াদের মতো মানুষই হয় না। মানুষ যদি যিয়াদের মতো হতো, তাহলে দুনিয়ার প্রতি দুনিয়াদারদের মোহ আর লিপ্সা থেকে আমি বেঁচে যেতাম।' এরপর তিনি নিজের ঘরে ফিরে যান। মন্ত্রীদের কাছে প্রস্তাবটি তুলে ধরে তাদের ধমকি দিলে তারা হিশামকে জটিলতা থেকে বাঁচাতে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

ফকিহদের মধ্যে আরও যাদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি বার ছিলেন তাদের অন্যতম। কোনো এক ঘটনার প্রেক্ষিতে আমির মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমানের কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পেলে আমির তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। তখন তার সহচর হাশিম ইবনু আবদিল আজিজকে তার কাছে পাঠানো হয়। ইবরাহীম তখনো সম্মত হলেন না। আমির তখন হাশিমকে দিয়ে ইবরাহীমের উদ্দেশ্যে একটি অনুরোধ লিখে পাঠান। যা-তে লেখা ছিল: 'আপনি যদি বিচার বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ না করেন, তাহলে অন্তত আমাদের মজলিসে উপস্থিত হোন। আমাদের কাছে আসা-যাওয়া করুন। যাতে আমাদের নানান বিষয় নিয়ে আপনার সাথে আমরা পরামর্শ করতে পারি। আপনার থেকে আমরা যেন জনগণের কথা জানতে পারি।'

পত্রের বার্তা শুনে ইবরাহীম বললেন, 'আবু খালিদ! আমির যদি এভাবে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন, তাহলে আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি কিন্তু তার শহর থেকে পালিয়ে যাব। তার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক!' আমির তখন ইবরাহীমকে আর ঘাঁটালেন না।

আমির মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান জিয়ানের গ্রামাঞ্চলে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আবান ইবনু ঈসা ইবনি দিনারের কাছে প্রস্তাব পেশ করলে আবান তা গ্রহণে জোরদার অসম্মতি প্রকাশ করেন। আমির তখন আবানকে বাধ্য করার আদেশ জারি করেন। একদল পুলিশকে নির্দেশ দিলে তারা আবানকে জিয়ানস্থ বিচারের স্থানে উপস্থিত করে বসিয়ে দেয়। অপরদিকে সাধারণ মানুষও বিচারকার্য পরিচালনার জন্য আবানকে ঘিরে ধরে। ইবনু ঈসা তখন একদিন বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে রাতের আঁধারে পালিয়ে গেলেন। তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, 'বিচারক পালিয়ে গেছে।' বিষয়টি আমিরের কানে গেলে তিনি মন্তব্য করলেন, 'এই হচ্ছে সৎ লোক, যে নিজের দ্বীন নিয়ে পালিয়েছে। সে কোথায় আছে খোঁজ নাও। যে কাজে তাকে বাধ্য করা হয়েছিল, সেটা থেকে তাকে নিরাপত্তা দাও।'

আন্দালুস ও মরক্কোর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে অনেকেই অসম্মতি প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রত্যেকেরই চমৎকার ঘটনা রয়েছে। তাদের আলোচনা অবিস্মরণীয়। প্রত্যেকেরই অবস্থান সম্মানজনক এবং আগ্রহ সত্যনিষ্ঠ।

তবে আন্দালুসে আলিমদের আরেকটি শ্রেণি ছিল, যারা বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে অসম্মতি জানালেও আমির এবং বিচারকদের পরামর্শ দেওয়ার ব্যাপারে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হাতিম ইবনু মুহাম্মাদ আত-তামিমি ছিলেন যাদের অন্যতম। ইবনুত তরাবলুসি আল-কুরতুবি নামে তিনি পরিচিত। আরও ছিলেন ঈসা ইবনু মুহাম্মাদ এবং মুহাম্মাদ ইবনু আত্তাব। শেষোক্তজন ছিলেন উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান। আন্দালুসে ফতোয়া প্রদান তাকে কেন্দ্র করেই চলত।

টিকাঃ
[৮১৭] কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৩; তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১১
[৮১৮] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২।
[৮১৯] কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২-৩
[৮২০] তারিখু কুদাতিল আন্দালুস, পৃ. ১৪; কুদ্দাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৪-৫
[৮২১] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১২; কুদ্বাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৩
[৮২২] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ১২; কুদ্বাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৩-৪
[৮২৩] তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ১৩; কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৬
[৮২৪] তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস, পৃ. ১২-১৩; কুদ্ধাতু কুরতুবাহ, পৃ. ৭
[৮২৫] বাড়তি জানতে তারীখু কুদ্ধাতিল আন্দালুস এবং কুদ্ধাতু কুরতুবাহ দেখতে পারেন।
[৮২৬] নিযামুল ফকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩৩৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00