📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে বিচার বিভাগের সম্পর্ক

📄 রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে বিচার বিভাগের সম্পর্ক


পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্দালুস ও মরক্কোর বিচার-সংক্রান্ত দিকগুলোতে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলেনি। বিশেষত আন্দালুসের বিচারব্যবস্থা ছিল অনেকটাই স্থিতিশীল। প্রত্যেক শাসক ও সরকারের কাছে বিচার বিভাগ অনেক গুরুত্ব রাখত।

ধর্মীয় বিষয়াদির সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে জনসাধারণের কাছে বিচারব্যবস্থার অত্যন্ত কদর ছিল। আন্দালুস এবং মরক্কোর বিচারব্যবস্থা ছিল পূর্বাঞ্চলের বিচারব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধশালী। আন্দালুসের বিচারব্যবস্থা প্রশাসনিক ও গঠনমূলক-উভয় দিক থেকেই সরল নীতি বজায় রেখে চলত। প্রশাসক, আমির-উমারা, খলিফা, শাসক এবং রাজার পরিবর্তনের কারণে আন্দালুসের বিচারব্যবস্থা খুব কমই প্রভাবিত হয়েছিল। কারণ বিচার বিভাগ ছিল সরাসরি সত্য, ন্যায় এবং ইসলামের প্রতিনিধি। যার অবস্থান ছিল শাসক, প্রভাবশালী ব্যক্তি, নেতা এবং বিচারকদের ঊর্ধ্বে।

বিচারক ছিলেন শরীয়ত, ইসলাম এবং ন্যায়বিচারের প্রতিনিধি। তিনি আন্দালুসে সর্বোচ্চ পদ এবং সম্মানের অধিকারী হতেন। শাসকদের মানসিকতা এবং অভিরুচির ভিন্নতা সত্ত্বেও তিনি আন্তরিকভাবে তাদের সম্বোধন করে কথা বলতেন। শাসকরাও বিচারকের নির্দেশনা অনুসরণ করতেন। আন্দালুসের বিচারকদের আলোচনায় আমরা বিষয়টি দেখতে পাব। শাসকবর্গ বিচারকের পরামর্শ কামনা করতেন। তার সঙ্গ লাভের প্রত্যাশায় থাকতেন। সমাজ, জনগণ এবং ব্যক্তি নির্বিশেষে সকলের হৃদয়ে ইসলামি বিচার বিভাগ এবং বিচারকরা মর্যাদার স্থান তৈরি করে নিয়েছিল। আন্দালুসে তো খলিফার পরপরই দ্বিতীয় স্থানটি ছিল বিচারকের। কখনো-বা খলিফা এবং উজিরের পরেই তৃতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির অবস্থানে থাকতেন বিচারক।

মুহাম্মাদ কুর্দ আলি উমাইয়াদের বিন্যাস অনুযায়ী আন্দালুসের বিচার বিভাগের অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন, 'আন্দালুসের মুসলিমরা বিচারব্যবস্থাকে ইসলামের সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহের জন্য সর্বোচ্চ প্রকল্প হিসেবে নির্ধারণ করেছিল। বিচারক ছাড়াও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মীদের জন্য শরীয়ত এবং সরকারের অনুশাসন সম্পর্কে জানা আবশ্যক ছিল।'

আবু মুহাম্মাদ আল-খুশানি বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলার দ্বীন এবং দুনিয়া সংক্রান্ত নেতৃত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরবর্তী স্থানের অধিকারী হচ্ছেন বিচারক। যিনি হতেন প্রশাসকদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী। কেননা রায় কার্যকর এবং শরীয়তের বিধানাবলি সুদৃঢ় করা বিচারকের কর্তব্য।'

আন্দালুসের বিচারব্যবস্থার বর্ণনা প্রসঙ্গে 'আল-ই'লাম বি নাওয়াযিলিল আহকাম' নামক দুর্লভ একটি কিতাবের বরাত দিয়ে আবুল হাসান আন-নুবাহি বলেন, 'বিচারের প্রকল্প শ্রেষ্ঠতম প্রকল্পগুলোর অন্যতম। এটা সর্বাধিক গুরুত্ববহ প্রকল্প। বিশেষ করে যদি এর সাথে মিলিত হয় নামাজ। বিধিবিধানের যাবতীয় দায়িত্ব যদি বিচারকের ওপরই ন্যস্ত থাকে এবং সব ধরনের বিচারক্ষেত্র যদি তিনিই দেখাশোনা করে থাকেন।'

উসতায আহমাদ আমিন বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে-'আন্দালুসের মুসলিমদের রাষ্ট্র পরিচালনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্প ছিল। যেগুলোকে বর্তমানে আমরা "প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা” বলে থাকি। আন্দালুসের মুসলিমদের কাছে বিচার-সংক্রান্ত দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বড় পদ। কারণ এটা ছিল দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত। বিচারকের ক্ষমতা ছিল সবচেয়ে বড়। কেননা বিচারক নিজের বক্তব্য শোনানোর জন্য খলিফা অথবা প্রশাসককে হাজির করতে পারতেন। সাধারণ বিচারকের ওপরে থাকত আরেকজন বড় বিচারক। যাকে “কাযিউল জামাআহ” তথা প্রধান বিচারপতি বলা হতো। শাসকের অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকার কেবল প্রধান বিচারপতিই সংরক্ষণ করতেন।'

কিন্তু আন্দালুসে ইসলামি বিচারব্যবস্থার একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্প্যানিশ খ্রিষ্টানদের জয় এবং মুসলিমদের জীবনে ইসলামি অনুশাসনের বিলুপ্তি। তখনই মুসলিম বিচারক তার পায়ের নিচের মাটি হারিয়ে ফেলেছিল। এর কিছুদিন পরই স্প্যানিশ খ্রিষ্টানরা আনুষ্ঠানিকভাবে শরীয়তসম্মত বিচারব্যবস্থা বাতিল করার আদেশ জারি করে। হিজরি ৫ম শতাব্দীতে খ্রিষ্টানদের হাতে আন্দালুস পতনের পরও কাস্টিলের মতো কিছু এলাকায় শারঈ বিচারব্যবস্থা চালু ছিল। যেসব মুসলিমরা হিজরত করে চলে যায়নি, তারা তখনো শারঈ বিচারব্যবস্থা অনুপাতে নিজেদের জীবন পরিচালিত করতেন। কিন্তু ১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রানি ইসাবেলা সমস্ত শারঈ আদালত বাতিলের নির্দেশনা জারি করে।

অপরদিকে শাসকদের ব্যাপক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও ইসলামি জ্ঞানচর্চা, নির্মাণশিল্প, সভ্যতা বিনির্মাণ-সহ অন্যান্য বিষয়ে কোনো ধরনের প্রভাব পড়েনি। বরং পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সভ্যতা উৎকর্ষের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল। আন্দালুস ছিল বাগদাদ, কায়রো এবং দামিস্কের দুর্বার প্রতিযোগী। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক অঙ্গনেই আন্দালুস এসব দেশকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে উসতায আহমাদ আমিন বলেন, ‘রাজনৈতিক ব্যাপক অস্থিরতার মাঝেও আন্দালুসের মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা এবং সভ্যতায় যেমন উৎকর্ষের সাক্ষর রেখে চলছিল, তা দেখে ইতিহাস-পড়ুয়াদের বিস্মিত হয়ে যেতে হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আন্দালুসে মুসলিমদের রাজত্ব যখন ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে গেল, তখনো প্রত্যেক অঞ্চলের রাজারা নিজেদের আলিমদের নিয়ে গর্ব করতেন। আলিমদের তারা কাছাকাছি রাখতেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, আলিমগণই তাদের সবচেয়ে বড় প্রচারমাধ্যম। ... এমনকি আন্দালুসের সর্বশেষ মুসলিম শাসকগোষ্ঠী আল-আহমার রাজবংশের সময়েও জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য এবং সভ্যতার ব্যাপক অগ্রগতি ঘটেছিল।

এ কারণেই আন্দালুসের মাটিতে মুসলিমরা গতিশীল এবং উন্নত একটি সভ্যতা রেখে গিয়েছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় ছিল তাদের সরব পদচারণা। তাদের মাঝে অনেক বড় বড় আলিম, জ্ঞানী, বিদ্বান এবং তারকাতুল্য ব্যক্তিরা জন্ম নিয়েছিলেন। যাদের নিয়ে কত শত গ্রন্থ আর বই-পুস্তক রচিত হয়েছে।

টিকাঃ
[৭৮০] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬৭
[৭৮১] কুদ্বাতু কুরতুবাহ, পৃ. ২
[৭৮২] তারীখু কুদ্বাতিল আন্দালুস, পৃ. ৭
[৭৮৩] যুহরুল ইসলাম: ৩/১৮
[৭৮৪] আস-সহওয়াতুল ইসলামিয়্যাহ বিল আন্দালুসিল ইয়াওম, পৃ. ৩৪, ৪৫
[৭৮৫] যুহরুল ইসলাম: ৩/১৭
[৭৮৬] যুহরুল ইসলাম: ৩/৪০। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অধিকাংশ সময় বিষয়টি এমনই ছিল। এ কারণেই আবদুর রহমান আদ-দাখিল, আবদুর রহমান আন-নাসির এবং দ্বিতীয় আবদুর রহমানের মতো শক্ত-সমর্থ লোক শাসনক্ষমতা হাতে পেলে আল-ওয়ালিদ ইবনু আবদিল মালিকের মতো রাজত্বের ঔজ্জ্বল্য স্থাপন এবং আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। দেখুন: আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ : ২/৪৬৮ এবং যুহরুল ইসলাম: ৩/১৭, ৩/২২, ৩/৪২, ৩/৪৮

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারব্যবস্থার তুলনামূলক অবস্থান

📄 বিচারব্যবস্থার তুলনামূলক অবস্থান


আন্দালুসের বিচারব্যবস্থা পৃথকভাবে আলোচনা করার অর্থ এই নয় যে, তা অন্যান্য ইসলামি খিলাফতের চেয়ে ভিন্নতর ছিল। কেবল ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক নানান কারণে আন্দালুসের বিচারব্যবস্থার কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। পূর্বে এ আলোচনা গত হয়েছে।

আন্দালুস এবং মরক্কোর তৎকালীন বিচারব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ আক্ষরিক অর্থেই ইসলামি বলা যায়। অন্যান্য অঞ্চলের বিচারব্যবস্থার সাথে অধিকাংশ বিষয়েই এর মিল ছিল। আন্দালুসের বিচারব্যবস্থা ছিল দামেস্কের উমাইয়া, বাগদাদের আব্বাসি এবং কায়রোর ফাতিমি বিচারব্যবস্থার অনুগামী। যা পরবর্তী সময়ে কর্ডোভা, ইশবিলিয়া, গ্রানাডা, ফেজ, কায়রুওয়ান, মারাকিশ এবং অন্য অঞ্চলগুলো মিলে ইসলামি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

আমরা এখানে এসব বিচারব্যবস্থার সাথে আন্দালুসের বিচারব্যবস্থার পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু পয়েন্ট উল্লেখ করব। এর পাশাপাশি উভয় বিচারব্যবস্থার ভিন্নতার কয়েকটি দিকও তুলে ধরব।

১. উভয় ভূখণ্ডে চলা বিচারব্যবস্থা ছিল এক ও অভিন্ন। উভয় স্থানেই চলত শারঈ বিচারব্যবস্থা। এক উৎস থেকেই তা উৎসারিত। যার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ছিল এক। আর তা হচ্ছে ইসলামের প্রচার-প্রসার। এ লক্ষ্য সকল যুগের ইসলামি খিলাফতেই বিদ্যমান ছিল। এটাই হচ্ছে বিচারব্যবস্থা দুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার প্রধান কারণ। যার ওপর ভিত্তি করে এটা প্রমাণিত হয় যে, ইসলামি বিচারব্যবস্থার অভিন্ন এবং সর্বজনস্বীকৃত মূল উৎস ছিল চারটি। সেগুলো হচ্ছে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং কিয়াস।

২. পূর্ব এবং পশ্চিমের পারস্পরিক আদান-প্রদানের বিরাট প্রভাব ছিল। আন্দালুস এবং মরক্কোর বিদ্বানরা কায়রো, দামিস্ক, বাগদাদ এবং হিজাজে আসা-যাওয়া করতেন। এসব দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঝরনাধারা থেকে পরিতৃপ্ত হতেন তারা। উপকৃত হতেন জ্ঞানী-গুণীদের পদচারণা থেকে। তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং গ্রন্থাদির মাধ্যমেও সমৃদ্ধ হতেন। এরপর জ্ঞান-গরিমা অর্জন করে ফিরে আসতেন স্বদেশে। অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্বানরাও মরক্কো এবং আন্দালুসে ছুটে যেতেন। পূর্ব থেকে পশ্চিমে, আবার পশ্চিম থেকে পূর্বে জ্ঞানীদের বিচরণ কখনো থেমে থাকেনি। তৎকালীন ইসলামি বিশ্বের পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত অবধি মুসলিমদের কাছে একটি গ্রামের মতোই ছিল। বিদ্বান ব্যক্তিদের জন্য তা ছিল একই মাতৃভূমির মতো। যেখানে তারা তাদের ইচ্ছেমতো ইসলামি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে চষে বেড়াতে পারতেন। যেখানেই যেতেন, উষ্ণ অভিনন্দন পেতেন। তাদেরকে সম্মান জানিয়ে নানাধরনের উপহারসামগ্রী দেওয়া হতো। কারণ তখন শাসন ছিল ইসলামের, আর জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং মানুষের মুখের ভাষা ছিল আরবি। উসতায আহমাদ আমিন বলেছেন, 'বিদ্বান এবং পর্যটকদের জন্য তৎকালীন ইসলামি সাম্রাজ্য ছিল দাবাবোর্ডের মতো। কোনো রকম বাধা-বিপত্তি ছাড়াই তারা যেখানে ইচ্ছে যেতে পারতেন।

৩. প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিচারব্যবস্থার প্রতি ইসলামি সাম্রাজ্যের ব্যাপক গুরুত্ব ছিল। ইসলামি বিশ্বের সযত্ন তত্ত্বাবধানেই ইসলামি বিচারব্যবস্থা সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে গিয়েছিল। অধিকাংশ খলিফা, প্রশাসক এবং আমির-উমারাগণ বিচারকদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতেন। বিচারকদের তারা সম্মান করতেন। মর্যাদায় কমতি হতে দিতেন না। যে-কোনো কাজে তাদের আগে বাড়িয়ে দিতেন। সবসময় তাদের সাথে পরামর্শ করে কাজ করতেন। তাদের প্রতি অগাধ আস্থা, বিশ্বাস এবং নিশ্চয়তা থাকায় বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, পদ এবং দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করা হতো। খলিফা এবং প্রশাসকগণ যোগ্যতা, সততা এবং ইলমের অধিকারী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বিচারক নির্বাচনের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতেন। সেইসাথে প্রশাসন থেকে বিচারব্যবস্থা স্বাধীন রাখার ব্যাপারেও তারা ছিলেন আন্তরিক।

৪. প্রাচ্যে এবং প্রতীচ্যে সর্বত্রই ইসলামি বিচারকরা নিজেদের অবস্থান, কর্মপদ্ধতি, জীবনাচার, চরিত্র এবং সুখ্যাতির ক্ষেত্রে অভিন্ন ছিলেন। এক কথায় সকল ক্ষেত্রেই তারা ছিলেন অভিভাবক সমতুল্য। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, হক বাস্তবায়ন ও মিথ্যাকে বর্জন করার ক্ষেত্রে বিচারকদের অবস্থান ছিল প্রবাদতুল্য। প্রশাসক বা যার পক্ষ থেকেই অন্যায় সংঘটিত হোক না কেন, এ ব্যাপারে তারা কোনো পরোয়া করতেন না। এর অসংখ্য নজির রয়েছে। অন্যান্য অঞ্চলের বিচারব্যবস্থায় কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও আন্দালুস এবং মাগরিবের বিচারকদের ক্ষেত্রে এসব গুণ ছিল অনন্য। অন্যদের তুলনায় তারা ছিলেন অধিক সত্যনিষ্ঠ। বিচারের রায় বাস্তবায়নে তারাই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন।

৫. প্রাচ্যে এবং প্রতীচ্যে শাসক, সরকার-প্রধান এবং রাজনীতির ব্যাপারে সকল আলিমের অবস্থান ছিল অভিন্ন। এ কারণে উভয় জায়গাতেই আলিমদের অনেকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থেকেছেন। প্রশাসক এবং আমিরদের ব্যাপারেও তাদের অবস্থান আলিমদের মতোই ছিল। অধিকাংশ বিচারকই শাসকদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। রাজনৈতিক পরামর্শে অংশগ্রহণ থেকেও বিরত থাকতেন। প্রশাসক এবং আমিরদের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও সত্য এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতেন। তাদের সামনে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ থেকে পিছু হটতেন না। ইসলাম, দ্বীন এবং ন্যায়ের শাসন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা ভীত হতেন না কখনোই।

অন্যান্য অঞ্চলের সাথে মরক্কো এবং আন্দালুসের বিচারব্যবস্থায় ভিন্নতা দেখা দেওয়ার মৌলিক কারণ ছিল দুটি।

প্রথমত: নির্ভরযোগ্য ফিকহি মাযহাব। সে যুগে প্রাচ্যে সব ফিকহি মাযহাব ছড়িয়ে পড়েছিল। আর ভিন্ন ভিন্ন মাযহাব থেকে বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেক বিচারকের বিচার এবং বিচারের রায় তার মাযহাব অনুসারেই হতো। সে হিসেবে প্রাচ্যের বিচারকগণ হানাফি, মালিকি, শাফিয়ি, হাম্বলি, আওযায়ি, যাহিরি, শিয়া ইমামিয়্যাহ, শিয়া যায়িদিয়্যাহ এবং শিয়া ফাতিমি মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। পক্ষান্তরে মরক্কো এবং আন্দালুসে মালিকি মাযহাবের ছিল একচ্ছত্র প্রভাব। অবশ্য আওযায়ি, যাহিরি, খারিজি, ইবাদ্বিয়া ও শিয়া ফাতিমি মাযহাব নির্দিষ্ট কিছু জায়গাতে পাওয়া যেত। তবে এগুলো ছিল নিতান্তই সাময়িক এবং নির্দিষ্ট জায়গার মাঝেই সীমাবদ্ধ।

দ্বিতীয়ত: বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও গঠনমূলক ব্যবস্থাপনা। আন্দালুস এবং মরক্কোয় বিচারব্যবস্থার এমন কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছিল, যেগুলো অন্যান্য অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা থেকে ভিন্ন ছিল। যেমন: ১. কাযিউল জামাআহ তথা প্রধান বিচারপতি এবং তার যোগ্যতা। ২. অন্যায় ও দুর্নীতির বিচার; হিসবাহর বিচার এবং সেগুলোর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা। ৩. বিচার বিভাগের উপদেষ্টামণ্ডলী। ৪. বিচার বিভাগের অধীনে অনেকগুলো উপবিভাগ স্থাপন করা। এগুলোর একটি হলো পুনঃনিরীক্ষণ ট্রাইবুন্যাল। সামনে এগুলো সবিস্তারে আলোচনা করব। এ ছাড়া বিচারের প্রয়োগ আর বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা ছিল।

আন্দালুস এবং মরক্কোর বিচারব্যবস্থার আলোচনা স্বতন্ত্রভাবে করার এগুলোও অন্যতম কারণ।

টিকাঃ
[৭৮৭] যুহরুল ইসলাম: ৩/২৮
[৭৮৮] যুহরুল ইসলাম: ৩/৩৬-৩৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00