📄 আল-মুরাবিত রাজবংশ
আমির ইউসুফ ইবনু তাশফিন আল-মুরাবিতি আন্দালুসের মুসলিমদের সাহায্য করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ৪৭৯ হিজরিতে (১০৮৬ ঈ.) তার বাহিনী যালাকার যুদ্ধে স্প্যানিশ খ্রিষ্টানদের পরাজিত করে। আঞ্চলিক রাজাদের বিচার করে আন্দালুসকে তিনি মরক্কোর সাথে জুড়ে দেন। আব্বাসি খলিফাদের জন্য দুআ করার নীতি প্রচলন করেন। খলিফার আদবের প্রতি লক্ষ রেখে তাকে ‘আমিরুল মুমিনীন’ না বলে ‘আমিরুল মুসলিমীন’ বলা হতো।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, আন্দালুসের সীমানা তখন ২৫ হাজার বর্গ কিলোমিটারে নেমে আসে। টলেডো-সহ বিশাল অঞ্চল জুড়ে চলতে থাকে খ্রিষ্টানদের শাসন।
টিকাঃ
[৭৭৪] যুহরুল ইসলাম: ৩/৩৭
📄 মুওয়াহিদিদের রাজত্ব
শাসকদের অবহেলা, ইবাদতে ব্যস্ত থাকা এবং যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ মহিলাদের হাতে চলে যাওয়ার দরুন তাশফিন বংশের রাজত্ব দুর্বল হয়ে যায়। আন্দালুস পুনরায় আঞ্চলিক রাজত্বে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জনগণ তখন মরক্কোর মুওয়াহহিদদের কাছে সাহায্য চায়।
মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ (৫২৪ হি.) নিজেকে প্রতিক্ষিত মাহদি বলে দাবি করে মরক্কোতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের নাম 'মাহদি' রেখে অনুসারীদের মুওয়াহহিদ তথা একত্ববাদী বলে আখ্যায়িত করেন। এরপর ৫২৮ হিজরিতে তাদের সর্দার আবদুল মুমিন ইবনু আলি বারবারির নেতৃত্বে আফ্রিকা বিজিত হয়। উমাইয়া যুগের পর মরক্কোতে মাহদিকেই সর্বপ্রথম 'আমিরুল মুমিনীন' বলে অভিহিত করা হয়।
এরপর মুওয়াহহিদ রাজারা আন্দালুসের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৫৪০ হিজরিতে (১১৪৫ ঈ.) তাদের উদ্ধার করে। আন্দালুসকে দ্বিতীয়বারের মতো মরক্কোর সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আন্দালুসের আরও কিছু জায়গা মুসলিমদের হাতছাড়া হয়ে যায়। যার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা ছিল সারকাসতা। এটা ৫১২ হিজরির (১১১৮ ঈ.) কথা।
স্প্যানিশ খ্রিষ্টানরা মুসলিমদের ওপর ঘন ঘন হামলা করে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে ৬০৯ হিজরির (১২১২ ঈ.) আল-ইকাব যুদ্ধে খ্রিষ্টানদের হাতে মুওয়াহহিদ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ইবনু হুদ এবং ইবনুল আহমারের নেতৃত্বে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে গণযুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু তারা কর্ডোভাকে খ্রিষ্টানদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেননি। অবশেষে ৬৩৩ হিজরিতে (১২৩৬ ঈ.) কর্ডোভা মুসলিমদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ৬৩৫ হিজরিতে ইবন হুদের মৃত্যু হলে তার অনুসরণ করে ইবনুল আহমার আন্দালুসে মুওয়াহহিদদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন।
টিকাঃ
[৭৭৫] আল-মু'জিব ফী তালখীসি আখবারিল মাগরিব, পৃ. ২৪৫; যুহরুল ইসলাম: ৩/৩৮
📄 আল-আহমার/আন-নাসর বংশের রাজত্ব
আল-আহমার বংশের প্রথম রাজা ছিলেন আমিরুল মুসলিমীন আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ আল-খাযরাজি। তিনিই ছিলেন নাসরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি শক্তভাবে এর ভিত স্থাপন করে যাবতীয় বিষয় সুবিন্যস্ত করেছিলেন। যেসব স্প্যানিশ খ্রিষ্টান সৈন্য ৬৪৩ হিজরিতে গ্রানাডা ঘেরাও করে রেখেছিল, তাদের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তোষামোদ এবং রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে তাদের হাত থেকে মুসলিমদের রক্ষা করেন। ৬৭১ হিজরিতে (১২৭২ ঈ.) তার মৃত্যুর পর আন্দালুসের সীমানা এক শতাব্দীর মধ্যেই ৩০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের নিচে নেমে আসে। আন্দালুসের ক্ষমতা কেবল গ্রানাডা এবং পার্শ্ববর্তী অংশের মাঝেই টিকে থাকে। গ্রানাডা তখন পরিণত হয় আন্দালুসে বসবাসরত মুসলিমদের আশ্রয়কেন্দ্রে।
ইবনুল আহমার মৃত্যুবরণ করলে তার ছেলে আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ দায়িত্ব গ্রহণের পর কাস্টিলের খ্রিষ্টানরা তৎপর হয়ে ওঠে। তারা গ্রানাডা দখলের তোড়জোড় শুরু করে। মারিনি সাম্রাজ্যের অধীনে পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের পরও গ্রানাডা ত্যাগ করে তারা আবু আবদিল্লাহর সাথে সন্ধিচুক্তি করে। সুলতান আবু ইউসুফ আল-মানসুর ৬৭৪ হিজরিতে (১২৭৫ ঈ.) আন্দালুসে এসে খ্রিষ্টানদের পরাজিত করেছিলেন। এরকম ঘটনা চার বার ঘটেছিল। অবশেষে জাযিরাতুল খাদ্বরাতে তার মৃত্যু হয়। গ্রানাডার অভিজ্ঞ সমরবিদরা বনু মারিনের প্রবীণ ব্যক্তির নেতৃত্বে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগীদের যাওয়ার বন্দোবস্ত করেন। তারপর সুলতান আবু ইয়াকুব আল-মারিনি খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে সুলতান আবু আবদিল্লাহর পাশে দাঁড়ান। পরে ৭০১ হিজরিতে (১৩০২ ঈ.) সুলতান আবু আবদিল্লাহ মৃত্যুবরণ করলে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। ৭১৩ হিজরিতে (১৩১৪ ঈ.) আবুল ওয়ালিদ ইসমাঈলের কাছে ক্ষমতা চলে যায়, যিনি ইবনুল আহমারের বংশীয় ছিলেন না। তিনি তার সাম্রাজ্যের ভিত মজবুত করেন।
এভাবেই ক্ষমতার পালাবদল চলতে থাকে। ৭৪০ হিজরিতে (১৩৪০ ঈ.) খ্রিষ্টানরা আন্দালুস এবং মরক্কোর বাহিনীকে পরাজিত করে। মরক্কোর বাহিনীর সহায়তা আন্দালুসে এসেই শেষ হয়ে যায়। খ্রিষ্টানদের বারংবার আক্রমণ চালায় এবং তাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি গ্রানাডায় অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সেখানকার মুসলিমরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ খ্রিষ্টানদের সাহায্য নেওয়ার ফলে গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি হয়। খ্রিষ্টান রাজা আল-আহমার বংশের অন্য রাজাদের কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠালেও তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন ৮৯৫ হিজরিতে (১৪৯০ ঈ.) তারা গ্রানাডা ঘেরাও করে। কিন্তু জিততে পারেনি। এরপর ১২/৬/৮৯৬ হিজরিতে (২৩/৪/১৪৯১ ঈ.) তারা পুনরায় গ্রানাডা ঘেরাও করে। এবার সান্তা ফে নগরী তৈরি করে অবরোধ শক্তিশালী করতে থাকে। ২১/১/৮৯৭ হিজরিতে (২৫/১১/১৪৯১ ঈ.) আত্মসমর্পণের চুক্তিতে স্বাক্ষরের মাধ্যমে আলাপ-আলোচনা সমাপ্ত হয়। অবশেষে এক কালো দিনে ইসলামের নগরী হস্তান্তরের মাধ্যমে আন্দালুসে ইসলামি শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেই দিনটি ছিল ২/১/১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ।
এরপর স্প্যানিশরা তাদের ভেতরে থাকা ঘৃণ্য বিদ্বেষ উগড়ে দেয়। মুসলিমদেরকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের জন্য নিপীড়ন চালাতে থাকে, যা ছিল চুক্তির খেলাফ। এসব আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলতে হয় যে, মুসলিমদের নির্মূল করার জন্য খ্রিষ্টানরা এমনভাবে উঠেপড়ে লেগেছিল—যার কোনো নজির ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। এতকিছুর পরও আন্দালুসে আরব রক্তের ছিটেফোঁটা থেকেই যায়। ঈমানের প্রদীপ গোপনে মিটমিট করে জ্বলতে থাকে। ফলে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে সেখানে নতুন করে ইসলামের আলো দেখা যেতে শুরু করে।
টিকাঃ
[৭৭৬] যুহরুল ইসলাম: ৩/৪০
[৭৭৭] এ বিষয়ে মূল্যবান গ্রন্থ হচ্ছে ডক্টর আলি আল-মুনতাসির আল-কাত্তানি লিখিত 'আস-সহওয়াতুল ইসলামিয়্যাহ ফিল উনদুলুসিল ইয়াওমা: জুযূরুহা ওয়া মাসাররুহা।' ঐতিহাসিক শেষদিককার ঘটনাগুলো আমরা উক্ত গ্রন্থের ভূমিকা (পৃ. ২৯, ৩২ এবং ৩৭) থেকে নিয়েছি। উসতায আহমাদ আমিন বলেছেন, 'স্প্যানিশদের শরীরে এখন পর্যন্ত আরব রক্ত আছে।'— দুহাল ইসলাম: ৩/২০ গ্রানাডা পতনের আগের মানচিত্র এবং গ্রানাডা পতনের পর পশ্চিম আরবের মানচিত্র দেখতে পারেন। মরক্কোর উপকূলসমূহে স্প্যানিশদের হামলাগুলো সম্পর্কে জানতে আতলাসুত তারীখিল আরাবি, পৃ. ৫৪ এবং যুহরুল ইসলাম: ৩/৪১ দেখুন।
📄 মরক্কো এবং উত্তর আফ্রিকা
আমরা ইতিমধ্যেই মরক্কো এবং উত্তর আফ্রিকা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষ করেছি। এখানে আরেকটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করব। কিছু সাম্রাজ্য বাগদাদের আব্বাসি খিলাফতের আনুগত্য থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য বা সালতানাত প্রতিষ্ঠা করে। যাদের মাঝে প্রথম ছিল ইবাদ্বি খারিজিদের প্রতিষ্ঠিত রুস্তমী সাম্রাজ্য। আব্বাসি খলিফা আল-মানসুরের সময়ে প্রতিষ্ঠিত এই সাম্রাজ্যটি ১৩০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। ২০২ হিজরিতে এর সমাপ্তি ঘটে। এ ছাড়াও মুরাবিত, মুওয়াহ্হিদ, বনু মারিন এবং হাফসিয় সালতানাতের মতো আগলাবি এবং ইদরিসি রাজবংশও ছিল।
মরক্কোর সিজিলমাসায় ২৯৬ হিজরিতে চালু হওয়া ফাতিমি সাম্রাজ্য ক্রমান্বয়ে পূর্ব দিকে বিস্তৃত হয়। এরা ছিল আব্বাসি সাম্রাজ্যের গলার কাঁটা। এদের রাজারা মৌলিকভাবে ইসমাঈলি শিয়া। শামের সালামিয়াতে ছিল এদের আদি নিবাস। ক্রমান্বয়ে মরক্কোতে এদের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। এরপর ২৯৭ হিজরিতে আবু উবাইদিল্লাহ আল-মাহদি এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে আমিরুল মুমিনীন নাম গ্রহণ করে। রাজত্বের অপর দাবিদার আবু আবদিল্লাহ আশ-শিয়ায়ি তার হাতে নিহত হয়। রাসূলুল্লাহ -এর আদরের দুলালি ফাতিমা -এর সাথে সম্পৃক্ত করে নিজেদের ফাতিমি দাবি করলেও তারা আসলে উবাইদি। এই নামকরণ হয়েছে আবু উবাইদিল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করে।
ক্রমে গোটা উত্তর আফ্রিকায় তাদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়। আবু আবদিল্লাহ রাজনীতি গুছিয়ে নিয়ে নিজের সাম্রাজ্যকে সুসংহত করে। মিশর জয়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে দুআ চাইতে থাকে। অবশেষে ৩৫৮ হিজরিতে তার সেনাপতি জাওহার সিকলির হাতে মিশর বিজিত হয়। তখন রাজধানী চলে যায় কায়রোতে। উপাধি গ্রহণের ক্ষেত্রে ফাতিমিদের অনেক বাড়াবাড়ি ছিল। ৩৬২ হিজরিতে তাদের পক্ষে হারামাইনে বক্তব্যও দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ৩৯৬ হিজরিতে আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ নিজেও হারামাইনে বক্তব্য দিয়েছেন। শাম অঞ্চল দখল করে নেওয়ায় তাদের রাজত্বের পরিধি ইরাক অবধি বিস্তৃত হয়ে যায়।
খলিফা আল-হাকিমের সপক্ষে বনু আকিলের আমির ৪০১ হিজরিতে মুসেলে, আনবারে, মাদায়েনে এবং কুফাতে বক্তব্য দিয়েছেন। আবুল হারিস আরসালান ইবনু আবদিল্লাহ আল-বাসাসিরি বাগদাদস্থ আল-মানসুর জামে মসজিদে তাদের সপক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। উত্তর আফ্রিকাতে তাদের ক্ষমতা খর্ব হতে থাকে। অবশেষে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির নিরলস প্রচেষ্টা এবং উবাইদিদের সর্বশেষ খলিফা আল-আদ্বিদের মৃত্যুর মাধ্যমে ফাতিমি যুগের অবসান ঘটে।
আল্লাহ তাআলার দয়ায় মরক্কো এবং উত্তর আফ্রিকাতে এখনো আরবি ভাষার প্রচলন আছে এবং মুসলিমরা সেখানে অবস্থান করছে।