📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 প্রশাসকদের যুগ

📄 প্রশাসকদের যুগ


৯৬ হিজরিতে মূসা ইবনু নুসাইর এবং তারিক ইবনু যিয়াদকে তৎকালীন খলিফা দামিস্কে ডেকে পাঠালেন। মূসা তখন ছেলেদেরকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন। আবদুল আজিজকে নিয়োগ দেন আন্দালুসের আমির হিসেবে। যার দফতর ছিল ইশবিলিয়াতে। আবদুল মালিককে মরক্কোতে এবং আবদুল্লাহকে আফ্রিকার আমির নিযুক্ত করে তিনি দামিস্কে গমন করেন। এরপর আবদুল আজিজ নিহত হন এবং তার দুই ভাইকে পদচ্যুত করা হয়। তারপর আন্দালুসের প্রশাসক কখনো দামিস্ক থেকে, কখনো কায়রুওয়ান থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কখনো কখনো আন্দালুসে থাকা সেনাপতিদের পক্ষ থেকেও নিয়োগ দেওয়া হতো।

ইতিহাসের পাতায় এই সময়টি 'প্রশাসকদের যুগ' বলে পরিচিত। কারণ আন্দালুসে ৪০ বছরে ২০ জন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এদের প্রথমজন ছিলেন আইয়ুব ইবনু হাবিব আল-লাখমি। আবদুল আজিজ ইবনু মূসা নিহত হওয়ার কয়েক মাস পর তিনি নিয়োগ পেয়েছিলেন। ৯৭ হিজরি মোতাবেক ৭১৬ খ্রিস্টাব্দের শেষ পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন তিনি। এরপর অন্য কেউ দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। একসময় কর্তৃত্ব আর প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব আসে ইউসুফ ইবনু আবদির রহমান আল-ফিহরির কাছে। যিনি ১৩৮ হিজরি মোতাবেক ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের শেষ অবধি নিয়োজিত ছিলেন।

ইসলামের আহ্বায়কদের নতুন দ্বীন প্রচার, তার বৈশিষ্ট্য এবং তাত্ত্বিক বিশেষত্বের সাথে এই যুগটি ছিল অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে প্রশাসকদের স্থিরতা না থাকায় তাতে বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। স্পেনে লাগাতার যুদ্ধ ও ওপর্যুপরি হামলার কারণে এই বিশৃঙ্খলা আরও দীর্ঘায়িত হতে থাকে। তবে এতকিছুর পরও মুসলিমদের জীবনে জ্ঞানচর্চা, স্থাপত্যশিল্প, সভ্যতার বিনির্মাণ এবং আরবি ভাষার প্রসার কখনোই থেমে থাকেনি। এ যুগের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছিল তিনটি:
✓ রাষ্ট্র পরিচালনা এবং রাজনীতির জন্য প্রশাসক।
✓ আল্লাহর দ্বীন কায়েম, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য বিচারক।
✓ শিক্ষাদান, দিক-নির্দেশনা এবং দাওয়াতি কাজের জন্য দাঈ।

টিকাঃ
[৭৬৯] প্রশাসকদের নাম এবং তাদের প্রত্যেকের শাসনামল সম্পর্কে জানতে দেখুন, ডক্টর আহমাদ বাদর লিখিত দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুসি ওয়া হাদ্বারাতিহা, পৃ. ২৪; যুহরুল ইসলাম: ৩/৩১৪; আল-মু'জাব, পৃ. ৩৫

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উমাইয়া নেতৃত্ব

📄 উমাইয়া নেতৃত্ব


১৩২ হিজরিতে বাগদাদে আব্বাসি খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। যা দামিস্ক থেকে উমাইয়া খিলাফতকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিকের নাতি আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া ছিলেন অত্যন্ত চৌকশ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক। তিনি আব্বাসিদের হাত থেকে পালাতে সমর্থ হন। সেখান থেকে যাত্রা করেন পশ্চিমে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক মরুভূমি এবং বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে থিতু হন আন্দালুসে। নিজস্ব দক্ষতা এবং প্রতিভার জোরে তিনি আন্দালুসের আরব, বার্বার এবং স্প্যানিশদের নিজের অধীনে আনেন। এরপর বাগদাদ এবং আব্বাসিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আন্দালুসে উমাইয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এটা ১৩৯ হিজরি / ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের কথা। এই সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কর্ডোভা।

আবদুর রহমান আদ-দাখিল প্রথম দিকে আব্বাসি খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাতেন। পরবর্তীকালে স্বতন্ত্র নেতৃত্ব প্রকাশ করার পাশাপাশি তার নাম ধরে দুআ করার রীতিও প্রচলন করেন। নিজেকে 'আমির' ঘোষণা করার কারণ ছিল, যাতে খিলাফত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি না হয় এবং একাধিক খলিফা হওয়ার ধারণাও কেউ না করে। তার বংশের আমিররাও তার রীতিই অনুসরণ করেছিলেন।

অন্যায়ের কথা তুলে ধরা এবং ইনসাফ কায়েমের সুবিধার্থে কর্ডোভার বিচারক সবসময় আমিরের সাথে থাকতেন। ৩৪ বছর আমির হিসেবে থাকার পর ৬০ বছর বয়সে আবদুর রহমান আদ-দাখিল মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ‘সাকরু কুরাইশ’ তথা ‘কুরাইশের বাজপাখি’ নামে অভিহিত করা হতো। তিনি যে এ নামের উপযুক্ত— সেটা স্বয়ং খলিফা আল-মানসুরও স্বীকার করতেন। সুবিশাল পরিসরের শক্তিশালী একটি রাজ্যের ভিত তিনি গড়ে দিয়েছিলেন। যার স্থায়িত্ব ছিল আগের উমাইয়া রাজ্যের প্রায় তিনগুণ বেশি সময়ব্যাপী। শাসনব্যবস্থা বিশেষত সেনাবাহিনী, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে তিনি সুসংহত করেছিলেন। এ বিষয়ে আমরা স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আলোচনা করব।

আবদুর রহমানের পর তার বংশধরের মধ্যে ১৮০ হিজরিতে হিশাম, ২০৮ হিজরিতে হাকাম, ২৩৮ হিজরিতে আবদুর রহমান আল-আওসাত, ২৭৩ হিজরিতে মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান, ২৭৫ হিজরিতে মুনযির এবং ৩০০ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে ৩০০ হিজরি মোতাবেক ৯১২ খ্রিষ্টাব্দে আবদুর রহমান আন-নাসিরের যুগটি সর্বাপেক্ষা উৎকর্ষের যুগ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। তার শাসনামলেই আন্দালুসে সর্বপ্রথম খিলাফতের ঘোষণা আসে। ফলে আন্দালুসে ইমারতের পরিবর্তে চালু হয় খিলাফত।

টিকাঃ
[৭৭০] দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুসি ওয়া হাদ্বারাতিহা, পৃ. ৬৪; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ : ২/৪৬৮; আস-সহওয়াতুল ইসলামিয়্যাহ ফিল আন্দালুস, পৃ. ৩১। আন্দালুসের খলিফা এবং আমিরদের নাম জানতে যুহরুল ইসলাম: ৩/৩১৫ দেখুন। সেখানে ২৪জন আমির এবং খলিফা ছিলেন।
[৭৭১] দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুসি ওয়া হাদ্বারাতিহা, পৃ. ৯৩; আস-সহওয়াতুল ইসলামিয়্যাহ ফিল আন্দালুস, পৃ. ৩১, আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/৪৬৮
[৭৭২] আস-সহওয়াতুল ইসলামিয়্যাহ ফিল আন্দালুস, পৃ. ৩৩; দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুসি ওয়া হাগারাতিহা, পৃ. ৯৯; যুহরুল ইসলাম: ৩/৩১৫

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফত

📄 আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফত


আবদুর রহমান আন-নাসির ৩১৭ হিজরিতে নিজেকে আন্দালুসের খলিফা হিসেবে ঘোষণা দেন। তার সময় উমাইয়ারা আন্দালুসে প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করে। আন্দালুসের খলিফাদের মাঝে তিনিই সর্বাধিক ক্ষমতাধর ছিলেন। তিনি ফিরিঙ্গিদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করার পর আন্দালুস সভ্যতায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। তবে ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধি কমে ৪.৪০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারে নেমে আসে। মুসলিমদের অনেক অঞ্চল স্প্যানিশরা দখল করে নেয়।

৩৫০ হিজরিতে (৯৬১ ঈ.) আবদুর রহমানের মৃত্যুর পর বেশ কয়েকজন উমাইয়া খলিফা দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তারা কেউ আবদুর রহমানের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারেননি। তাদের সময়কালে রাজ্য ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে থাকে। হিজরি ৫ম শতকের শুরুতে উমাইয়া খিলাফত সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। অবশেষে ৪২২ হিজরিতে (১০২১ ঈ.) তা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এরপর আন্দালুস বিভাজিত হয়ে যায় বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজাদের কাছে। এইসব রাজারা বাগদাদের আব্বাসি খলিফাদের উপাধি নিজেদের সাথে সম্পৃক্ত করতেন。

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুলুকুত তাওয়াইফ বা আঞ্চলিক রাজা

📄 মুলুকুত তাওয়াইফ বা আঞ্চলিক রাজা


আন্দালুসে উমাইয়া খিলাফত অবসানের পর বিভিন্ন অঞ্চল আর শহরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। প্রতিটি রাজ্য চলত একজন পৃথক রাজার অধীনে। একপর্যায়ে রাজার সংখ্যা ২৩ জনে গিয়ে ঠেকে। প্রত্যেক রাজা খলিফা নাম ধারণ করে জনগণ থেকে বাইয়াত নিতেন। এর ফলে, কোথাও কোথাও ৮০ কিলোমিটার দূরত্বের মাঝে চারজন আমিরুল মুমিনীনের দেখা মিলত। যেমন: ইশবিলিয়া, আল-জাযিরাতুল খাদ্বরা, মালাকা এবং সাবতাহ অঞ্চল।

স্প্যানিশরা মুসলিমদের এই বিভক্তির সুযোগ নেয়। তারা একের পর এক ইসলামি অঞ্চল দখল করতে থাকে। অবশেষে ৪৮৭ হিজরিতে (১০৮৫ ঈ.) টলেডো নগরীর পতন হয়। আন্দালুসের মুসলিমরা তখন মরক্কোর আমির ইউসুফ ইবনু তাশফিনের কাছে সাহায্য চেয়ে খবর পাঠান।

টিকাঃ
[৭৭৩] আঞ্চলিক রাজাদের সময় আন্দালুসের সীমানা, রাজাদের নাম এবং আল-মুরাবিত রাজবংশের আমিরগণের নাম জানতে আতলাসুত তারীখিল আরাবি, পৃ. ৫৩ দেখুন। যুহরুল ইসলাম: ৩/৩১৬; আল-মু'জিব, পৃ. ১১১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00