📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আফ্রিকা বিজয়

📄 আফ্রিকা বিজয়


উমর ইবনুল খাত্তাব -এর যুগেই বিখ্যাত সাহাবি আমর ইবনুল আস মিশর জয় করেছিলেন। ইসলাম এবং মুসলিমরা সেখানে স্থির হওয়ার পর তারা উত্তর আফ্রিকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। সেখানে সত্তর বছর যাবৎ চালু ছিল বিজয়াভিযান। হিজরি ৯০ সালে মুসা ইবনু নুসাইর আটলান্টিক মহাসাগর অবধি পৌঁছে যান। ভূমধ্যসাগর প্রণালীর আর কোনো নগরীই তখন বিজিত হওয়া বাকি ছিল না।

উত্তর আফ্রিকা বিজয়ের সময়টা যে কেবলই লড়াই-যুদ্ধের জন্য ছিল, তা কিন্তু নয়। প্রকৃতপক্ষে তা ছিল মানবজাতির হিদায়াতের উদ্দেশ্যে ইসলামের দাওয়াত বহনকারী জিহাদ। দেশের সমৃদ্ধি, নগর প্রতিষ্ঠা, আস্তাবলের ব্যবস্থাপনা, দুর্গ নির্মাণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করাটাও ছিল এর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই বার্বার জাতি-সহ উত্তর আফ্রিকার আপামর জনগণ ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার ক্ষেত্রে সামান্যতমও ইতস্তত বোধ করেনি। বরং ইসলাম গ্রহণ করে তারা নিজেরাই দাওয়াতের কাজ আঞ্জাম দিয়েছে। মুজাহিদদের দলে যোগ দিয়ে পদে পদে তাদের অনুসরণ করেছে। আফ্রিকা প্রদেশের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে প্রথমে কায়রুওয়ান নগরী এবং পরবর্তীকালে রাবাত-সহ অন্যান্য শহর প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুজাহিদদের সাথে থেকে বার্বাররাও ইসলামের দাওয়াত প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত থাকে। ক্রমাগত চলতে থাকা বিজয়াভিযানে মূসা ইবনু নুসাইর এবং তারিক ইবনু যিয়াদকে তারা সঙ্গ দিয়েছিল।

টিকাঃ
[৭৬৬] তৎকালীন মরক্কো ছিল বর্তমানের উত্তর আফ্রিকার আরবিভাষী কয়েকটি দেশের সমষ্টি। সেগুলো হচ্ছে মৌরিতানিয়া, মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং লিবিয়া। এ বিষয়টি মনে থাকলে আমাদের আলোচনা বুঝতে সুবিধা হবে।
[৭৬৭] আবদুল ওয়াহিদ আল-মারাকিশি 'আল-মু'জিব ফী তালখীসি আখবারিল মাগরিব' নামে একটি পুস্তক সংকলন করেছেন। যা-তে তিনি তৎকালীন মরক্কোর সুবিশাল সীমানার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, 'আন্দালুসের উপদ্বীপ পিরেনিজ পর্বতমালা থেকে আটলান্টিক মহাসাগর অবধি। আন্দালুসের দক্ষিণে আফ্রিকার উপকূল থেকে আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া হয়ে পশ্চিম মিশরের বর্ডার অবধি। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে এটাই ছিল মরক্কোর সীমানা।' (তাহকীককারীর ভূমিকা দ্রষ্টব্য। পৃ. ১ এবং ৪৩১) ইতিহাসবিদ মুহাম্মাদ ইবনুল হারিস আল-খুশানি (৩১১ হি.) সুস্পষ্টভাবে গোটা উত্তর আফ্রিকা এবং আন্দালুসকে মরক্কো বলে আখ্যায়িত করেছেন। যার রাজধানী ছিল কর্ডোভা। তার লেখা 'কুদ্ধাতু কুরতুবা' বইয়ের ১ নং পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, 'বিচারকদের ফরমান কেবল তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত, যারা মরক্কোর রাজধানী কর্ডোভাতে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
[৭৬৮] উত্তর আফ্রিকাতে বিজয়াভিযান পরিচালনার পর আরবদের নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ নগরসমূহ এবং গ্রিক উপকূলীয় শহরগুলোর মানচিত্র দেখতে আতলাসূত তারীখিল আরাবি, পৃ. ৫৬ এবং আল-মু'জিব ফী তালম্বীসি।

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আন্দালুস বিজয়

📄 আন্দালুস বিজয়


মুসা ইবনু নুসাইর সাগর-পথে আন্দালুস অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদের সাথে পরামর্শ করেন। আবশ্যিক পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত অনুসন্ধানের পর খলিফার অনুমোদন মিলে। মূসা তখন তারিফ ইবনু মালিক নামে তাঁর এক সেনাপতিকে ৪০০ মুজাহিদ এবং ১০০ অশ্বারোহী দিয়ে প্রেরণ করেন। এটা ৯০ হিজরি মোতাবেক ৭০৯ খ্রিস্টাব্দের কথা। ইসলামি বাহিনী বন্দরে প্রথমবারের মতো স্পেনের সৈন্যদের মোকাবিলা করে। বন্দরটি এখন তারিফের নামেই পরিচিত। তারা যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে গনিমতের সম্পদ নিয়ে আফ্রিকায় ফিরে আসেন।

এরপর মূসা পুনরায় অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়ে এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করেন নিজের সাবেক ক্রীতদাস তারিক ইবনু যিয়াদকে। তারিক ৯২ হিজরির রজব বা শাবান মাস মোতাবেক ৭১১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল বা মে মাসে প্রণালি অতিক্রম করে ঘাঁটি স্থাপন করেন। ৯২ হিজরির ২৮ রমজান রডারিকের বিশাল বাহিনীর সাথে তার মোকাবিলা হয়। সপ্তাহব্যাপী চলমান এই যুদ্ধে অবশেষে মুসলিমরা জয়লাভ করে। আন্দালুসে শুরু হয় ইসলামের অগ্রযাত্রা। ৯২ থেকে ৯৫ হিজরি অবধি উত্তর দিক থেকে ক্রমান্বয়ে পূর্ব এবং পশ্চিমে বিজয়াভিযান এগিয়ে চলে। ৭ লক্ষ বর্গমাইলেরও বেশি এলাকা ইসলামের অধীনে চলে আসে। যার অধীনে ছিল স্পেন এবং পর্তুগালের মতো দেশ। লোকেরা ইসলামের আনুগত্য স্বীকার করে নিতে থাকে। আবার কেউ কেউ খ্রিষ্টধর্মে বহাল থেকে স্পেনের উত্তর-পশ্চিমের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেয়। এদের অবস্থা ছিল পিঠের ওপর গজিয়ে ওঠা বিষফোঁড়া এবং টাইমবোমের মতো। অপরদিকে দক্ষিণ ফ্রান্স পর্যন্ত এলাকা মুসলিমদের অধীনে চলে আসে।

ইসলামি সাম্রাজ্যের মাঝে মরক্কো অবধি বিস্তৃত আন্দালুসের রাজধানী ছিল কায়রুওয়ান নগরী। বর্তমানে এটি তিউনিসিয়ায় অবস্থিত। পরবর্তী সময়ে আন্দালুসকে স্বতন্ত্র প্রদেশ বানিয়ে ইশবিলিয়াকে এর রাজধানী করা হয়।

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 প্রশাসকদের যুগ

📄 প্রশাসকদের যুগ


৯৬ হিজরিতে মূসা ইবনু নুসাইর এবং তারিক ইবনু যিয়াদকে তৎকালীন খলিফা দামিস্কে ডেকে পাঠালেন। মূসা তখন ছেলেদেরকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন। আবদুল আজিজকে নিয়োগ দেন আন্দালুসের আমির হিসেবে। যার দফতর ছিল ইশবিলিয়াতে। আবদুল মালিককে মরক্কোতে এবং আবদুল্লাহকে আফ্রিকার আমির নিযুক্ত করে তিনি দামিস্কে গমন করেন। এরপর আবদুল আজিজ নিহত হন এবং তার দুই ভাইকে পদচ্যুত করা হয়। তারপর আন্দালুসের প্রশাসক কখনো দামিস্ক থেকে, কখনো কায়রুওয়ান থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কখনো কখনো আন্দালুসে থাকা সেনাপতিদের পক্ষ থেকেও নিয়োগ দেওয়া হতো।

ইতিহাসের পাতায় এই সময়টি 'প্রশাসকদের যুগ' বলে পরিচিত। কারণ আন্দালুসে ৪০ বছরে ২০ জন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এদের প্রথমজন ছিলেন আইয়ুব ইবনু হাবিব আল-লাখমি। আবদুল আজিজ ইবনু মূসা নিহত হওয়ার কয়েক মাস পর তিনি নিয়োগ পেয়েছিলেন। ৯৭ হিজরি মোতাবেক ৭১৬ খ্রিস্টাব্দের শেষ পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন তিনি। এরপর অন্য কেউ দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। একসময় কর্তৃত্ব আর প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব আসে ইউসুফ ইবনু আবদির রহমান আল-ফিহরির কাছে। যিনি ১৩৮ হিজরি মোতাবেক ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের শেষ অবধি নিয়োজিত ছিলেন।

ইসলামের আহ্বায়কদের নতুন দ্বীন প্রচার, তার বৈশিষ্ট্য এবং তাত্ত্বিক বিশেষত্বের সাথে এই যুগটি ছিল অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে প্রশাসকদের স্থিরতা না থাকায় তাতে বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। স্পেনে লাগাতার যুদ্ধ ও ওপর্যুপরি হামলার কারণে এই বিশৃঙ্খলা আরও দীর্ঘায়িত হতে থাকে। তবে এতকিছুর পরও মুসলিমদের জীবনে জ্ঞানচর্চা, স্থাপত্যশিল্প, সভ্যতার বিনির্মাণ এবং আরবি ভাষার প্রসার কখনোই থেমে থাকেনি। এ যুগের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছিল তিনটি:
✓ রাষ্ট্র পরিচালনা এবং রাজনীতির জন্য প্রশাসক।
✓ আল্লাহর দ্বীন কায়েম, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য বিচারক।
✓ শিক্ষাদান, দিক-নির্দেশনা এবং দাওয়াতি কাজের জন্য দাঈ।

টিকাঃ
[৭৬৯] প্রশাসকদের নাম এবং তাদের প্রত্যেকের শাসনামল সম্পর্কে জানতে দেখুন, ডক্টর আহমাদ বাদর লিখিত দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুসি ওয়া হাদ্বারাতিহা, পৃ. ২৪; যুহরুল ইসলাম: ৩/৩১৪; আল-মু'জাব, পৃ. ৩৫

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উমাইয়া নেতৃত্ব

📄 উমাইয়া নেতৃত্ব


১৩২ হিজরিতে বাগদাদে আব্বাসি খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। যা দামিস্ক থেকে উমাইয়া খিলাফতকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিকের নাতি আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া ছিলেন অত্যন্ত চৌকশ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক। তিনি আব্বাসিদের হাত থেকে পালাতে সমর্থ হন। সেখান থেকে যাত্রা করেন পশ্চিমে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক মরুভূমি এবং বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে থিতু হন আন্দালুসে। নিজস্ব দক্ষতা এবং প্রতিভার জোরে তিনি আন্দালুসের আরব, বার্বার এবং স্প্যানিশদের নিজের অধীনে আনেন। এরপর বাগদাদ এবং আব্বাসিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আন্দালুসে উমাইয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এটা ১৩৯ হিজরি / ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের কথা। এই সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কর্ডোভা।

আবদুর রহমান আদ-দাখিল প্রথম দিকে আব্বাসি খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাতেন। পরবর্তীকালে স্বতন্ত্র নেতৃত্ব প্রকাশ করার পাশাপাশি তার নাম ধরে দুআ করার রীতিও প্রচলন করেন। নিজেকে 'আমির' ঘোষণা করার কারণ ছিল, যাতে খিলাফত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি না হয় এবং একাধিক খলিফা হওয়ার ধারণাও কেউ না করে। তার বংশের আমিররাও তার রীতিই অনুসরণ করেছিলেন।

অন্যায়ের কথা তুলে ধরা এবং ইনসাফ কায়েমের সুবিধার্থে কর্ডোভার বিচারক সবসময় আমিরের সাথে থাকতেন। ৩৪ বছর আমির হিসেবে থাকার পর ৬০ বছর বয়সে আবদুর রহমান আদ-দাখিল মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ‘সাকরু কুরাইশ’ তথা ‘কুরাইশের বাজপাখি’ নামে অভিহিত করা হতো। তিনি যে এ নামের উপযুক্ত— সেটা স্বয়ং খলিফা আল-মানসুরও স্বীকার করতেন। সুবিশাল পরিসরের শক্তিশালী একটি রাজ্যের ভিত তিনি গড়ে দিয়েছিলেন। যার স্থায়িত্ব ছিল আগের উমাইয়া রাজ্যের প্রায় তিনগুণ বেশি সময়ব্যাপী। শাসনব্যবস্থা বিশেষত সেনাবাহিনী, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে তিনি সুসংহত করেছিলেন। এ বিষয়ে আমরা স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আলোচনা করব।

আবদুর রহমানের পর তার বংশধরের মধ্যে ১৮০ হিজরিতে হিশাম, ২০৮ হিজরিতে হাকাম, ২৩৮ হিজরিতে আবদুর রহমান আল-আওসাত, ২৭৩ হিজরিতে মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান, ২৭৫ হিজরিতে মুনযির এবং ৩০০ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে ৩০০ হিজরি মোতাবেক ৯১২ খ্রিষ্টাব্দে আবদুর রহমান আন-নাসিরের যুগটি সর্বাপেক্ষা উৎকর্ষের যুগ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। তার শাসনামলেই আন্দালুসে সর্বপ্রথম খিলাফতের ঘোষণা আসে। ফলে আন্দালুসে ইমারতের পরিবর্তে চালু হয় খিলাফত।

টিকাঃ
[৭৭০] দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুসি ওয়া হাদ্বারাতিহা, পৃ. ৬৪; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ : ২/৪৬৮; আস-সহওয়াতুল ইসলামিয়্যাহ ফিল আন্দালুস, পৃ. ৩১। আন্দালুসের খলিফা এবং আমিরদের নাম জানতে যুহরুল ইসলাম: ৩/৩১৫ দেখুন। সেখানে ২৪জন আমির এবং খলিফা ছিলেন।
[৭৭১] দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুসি ওয়া হাদ্বারাতিহা, পৃ. ৯৩; আস-সহওয়াতুল ইসলামিয়্যাহ ফিল আন্দালুস, পৃ. ৩১, আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/৪৬৮
[৭৭২] আস-সহওয়াতুল ইসলামিয়্যাহ ফিল আন্দালুস, পৃ. ৩৩; দিরাসাতুন ফী তারীখিল আন্দালুসি ওয়া হাগারাতিহা, পৃ. ৯৯; যুহরুল ইসলাম: ৩/৩১৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00