📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস 📄 আব্বাসি যুগের বিচারব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য

📄 আব্বাসি যুগের বিচারব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য


ইসলামের ইতিহাসে আব্বাসি যুগ ছিল সর্বাধিক দীর্ঘ যুগ। আর আব্বাসি খিলাফত ছিল সর্বাধিক বিস্তৃত রাষ্ট্র। যা পূর্ব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে-এক কথায় চতুর্দিকেই সর্বাধিক সীমানা ছড়িয়েছিল। ইসলামি বিচারব্যবস্থাও আব্বাসি যুগের ক্রমবিকাশ থেকে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি সমস্ত প্রয়োজনে সাড়া দিয়েছিল। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জান, মাল ও অধিকার রক্ষা করা ছিল তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সীমালঙ্ঘন ও অন্যায়কে সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য পন্থায় দমন করতে সে সক্ষম হয়েছিল। আব্বাসি যুগের বিচারব্যবস্থার আরও কিছু বিশেষত্ব ছিল, যা আমরা এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করব:

✓ এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মাঝে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সে-সময় ইসলামি বিচারব্যবস্থা মৌলিক এবং শাখাগত পর্যায়ে পূর্ণতা লাভ করেছিল। লিপিবদ্ধ হয়েছিল যাবতীয় ধারা-উপধারা, বিধিবিধান এবং পদ্ধতি। ফলে ইমারত নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক চিত্র এবং ব্যবস্থাপনাও পরিব্যাপ্ত হয়।

✔ পক্ষান্তরে দ্বিতীয় আব্বাসি যুগে বিচারব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত চিত্রের পাশাপাশি কিছু দোষত্রুটিও প্রকাশ পায়। কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে। বিচারব্যবস্থার উজ্জ্বল চিত্র এবং দীপ্তিমান প্রসিদ্ধি আর বহাল থাকেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ফলে তার সংস্কার, সংশোধন এবং রক্ষণাবেক্ষণের আওয়াজ উঠতে থাকে।

✓ প্রথম আব্বাসি যুগে ব্যক্তিগত পর্যায়ের ইজতিহাদ বিকাশ লাভ করেছিল। বিচারক মাত্রই ছিলেন মুজতাহিদ। তখনকার দিনে ইমামগণও পরিচিতি লাভ করেন। ফিকহ-সংক্রান্ত মাযহাবের সূচনা ঘটে। শারঈ বিধানাবলি সংকলিত হতে থাকে। ফিকহ-সংক্রান্ত গ্রন্থাদি এবং বিশেষভাবে বিচার-সংক্রান্ত গ্রন্থ রচিত হতে থাকে।

✓ হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে ব্যক্তিগত পর্যায়ের গবেষণা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফিকহি মাযহাব স্থিতি লাভ করে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিচারকরাও মাযহাবগুলোর রায়, ধারা-উপধারা এবং গবেষণা মেনে চলতে থাকেন। বিচারকরা অনুকরণ-প্রবণতা এবং নির্দিষ্ট মাযহাবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। মামলা-মোকদ্দমা, দাবি-দাওয়া এবং রায়ের ক্ষেত্রে সেটার প্রতিফলন ঘটতে থাকে।

☑ চার মাযহাবের চারজন বিচারক নিয়োগের মতো একই শহরে একাধিক বিচারক নিয়োগের ধারাও চালু হয়ে যায়।

☑ প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রথা চালু হয়। যিনি হতেন বিচারব্যবস্থা এবং বিচারকদের ব্যাপারে প্রধান দায়িত্বশীল। বিচারকদের জন্য বিশেষ পোশাক পরিধানের ব্যবস্থা করা হয়। খলিফা, প্রশাসক এবং আমিরদের থেকে বিচার বিভাগ পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে।

☑ জনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিচারব্যবস্থা পূর্ণতা পায়। এর জন্য স্বতন্ত্র পদ্ধতি রচিত হয়। ব্যক্তিগত এবং সামাজিক অধিকার রক্ষায় এর কার্যকর প্রভাব পরিলক্ষিত হতে থাকে। ফলত সংরক্ষিত থাকে বিধিবিধান। ব্যবস্থাপনা হয় সুসংহত এবং প্রতিষ্ঠিত হয় শিষ্টাচার।

☑ সামরিক বাহিনীর জন্য আলাদা বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় তা স্বয়ংসম্পন্ন এবং পৃথক বিচারব্যবস্থায় রূপ নেয়। বিচার-সংক্রান্ত কার্যাবলি এবং পরিধিগুলো অন্যান্য বিচারিক প্রতিষ্ঠানের মাঝে বিভক্ত হয়ে যায়।

আব্বাসি খলিফাগণ অন্যায় ও দুর্নীতির বিচার করতে বসতেন। এ বিষয়ে তারা বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। আব্বাসি খিলাফতের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তা বহাল ছিল। এরপর তারা এ সংক্রান্ত মোকদ্দমা বিচারকের কাছে অর্পণ করেন।

☑ বিচারকের ক্ষমতা বেড়ে যায়। লেনদেন, শাস্তি প্রদান, ব্যক্তিগত অবস্থা, শারীরিক দণ্ডবিধি-সহ বিভিন্ন ধরনের মামলা-মোকদ্দমায় তাদের হস্তক্ষেপ বাড়তে থাকে। চালু হয় 'মসজিদের বিচারক' নামে নতুন পদ। যারা ২০০ দিরহামের কম পরিমাণ দণ্ডের মোকদ্দমা পরিচালনা করতে পারতেন।

বিচারকরা নিজেদের কাজের পাশাপাশি আরও কিছু কাজ করতেন। এর কিছু কিছু ছিল বিচারকার্যের সাথে সংশ্লিষ্ট, আর কিছু পরিচালনা সংক্রান্ত। ফলে বিচারককে ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধান করতে হতো। ইয়াতিমদের সম্পদ দেখভাল করা, ওসিয়ত পূর্ণ করা, কোষাগারের খোঁজখবর রাখা, টাকশালের ওপর নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, মসজিদ এবং ব্রিজ সংস্কারের দায়িত্ব ছিল তাদের হাতে। এ ছাড়াও নির্মাণকাজের পর্যবেক্ষক, পুলিশ এবং জনশৃঙ্খলার দায়িত্বও তারা পালন করতেন। জুমুআ এবং ঈদের নামাজ পরিচালনা, সর্বজনীন অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ এবং খলিফা নির্বাচন বা অপসারণ এই বিচারকরাই করতেন। কোনো কোনো বিচারক মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এবং নাজুক বিষয়ে তারা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দূত হিসেবে কর্মরত থাকতেন।

✔ আব্বাসি যুগে বিচারকার্য পরিচালনায় বিচারকের জন্য সহযোগীর ব্যবস্থা করা হয়। যেমন: সহকারী বিচারক, আদালতের মুনশি, ঘোষক, প্রহরী, তদন্ত কর্মকর্তা, পেশকার এবং আদালতের নথিরক্ষক ইত্যাদি।

✔ আব্বাসি যুগে বিচারকরা মামলা-মোকদ্দমার জন্য নতুন নতুন ধারা এবং বিচারব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবস্থাপনা চালু করেছিলেন। যেমন: বাদী-বিবাদীর ধারাবাহিকতা রক্ষা, সাক্ষী যাচাই, রায় সংরক্ষণ, নথিভুক্তকরণ, বিচারকের দফতর ও কোষাগার ব্যবস্থাপনা, বিচারকের সিন্দুক, ন্যায়পরায়ণ কিংবা সার্বক্ষণিক উপস্থিত সাক্ষীর ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। বিচারকের দফতরে তাকের ব্যবস্থা ছিল। নথিপত্র সিল করে সেখানে সংরক্ষণ করে রাখা হতো।

✓ অনেক আলিম এবং ফকিহ নানান কারণে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন। যেমন তাকওয়া, দুনিয়াবিমুখতা, রাজনৈতিক কারণ এবং মতাদর্শগত অমিল। তাদের ভয় ছিল, ন্যায়বিচার পরিচালনা হয়তো তাদের দ্বারা সম্ভব হবে না। কারণ প্রভাবশালীরা তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

বিচারকরা নিজেদের প্রভাব এবং গাম্ভীর্য ধরে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। এ কারণে প্রশাসকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং তাদের দরবারে যাতায়াত থেকে বিরত থাকতেন। তাদের সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীনভাবে রায় দিতেন। খলিফা বা প্রশাসক-যে-ই অপরাধী হোক না কেন, তাকে বিচারকের সামনে হাজিরা দিতে হতো। এমন অনমনীয়তার কারণে বিচারকের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। জনগণ তাদের প্রতি আস্থা রাখতে শুরু করে। সরকারের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে বিচারককে অন্যায়ভাবে পদচ্যুত করা হলে জনতা বিচারকের পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। বিচারিক নিরাপত্তা আব্বাসি যুগে জারি ছিল।

বিচারকদের ইজতিহাদের ফলে প্রথম দিকে একই রকম মামলার আদেশে ভিন্নতা দেখা দিয়েছিল। পরবর্তীকালে তারা বিরোধপূর্ণ রায়ের ক্ষেত্রে ফিকহি মাযহাব অনুসরণ করতে থাকেন।

✔ আব্বাসি যুগে বিচারকের সংখ্যা ছিল বেশি। সে-সময় থেকেই বিচারকদের নিয়ে বিশেষ গ্রন্থাবলি রচিত হতে থাকে। যেমন: ওয়াকি (৩০৬ হি.) রচিত আখবারুল কুদ্বাহ, আল-কিন্দি (৩৫০) রচিত আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ এবং আবু উবাইদ মামার ইবনুল মুসান্না (২০৯ হি.) রচিত আখবারু কুদ্বাতিল বাসরাহ। এসব গ্রন্থের হাত ধরেই পরবর্তীকালে লেখালেখির ধারা চলতে থাকে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px