📄 কাযি শারীক আন-নাখায়ি
তাঁর পূর্ণ নাম ছিল শারীক ইবনু আবদিল্লাহ ইবনিল হারিস। উপনাম আবু আবদিল্লাহ। বিচারক এবং ফকিহ হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন হাদিসবেত্তা ছিলেন। বুখারার খোরাসানে ৯৫ হিজরিতে তাঁর জন্ম এবং ১৭৭ হিজরিতে কুফায় তাঁর ইন্তেকাল।
শারীক অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং প্রখর ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁর বুদ্ধিমত্তা এবং বিচক্ষণতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ইলম অর্জনে অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন তিনি। আজীবন নিজেকে নিমগ্ন রেখেছিলেন। প্রকৃত অর্থেই আলিম এবং ফকিহ ছিলেন শারীক ইবনু আবদিল্লাহ।
তিনি ছিলেন কুফা এবং আহভাজ নগরীর বিচারক। খলিফা আবু জাফর মানসুর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদানের জন্য তাঁকে ডেকে পাঠালে তিনি বিনয় সহকারে বললেন, 'আমিরুল মুমিনীন! আমি তো কেবল নামাজ-রোজাই জানি। বিচারকার্যের বিষয়ে আমি কিছু বুঝি না।' তখন খলিফা বললেন, 'আপনি যেটা বুঝেন, সেটাই বাস্তবায়ন করবেন। আর যেটা বুঝবেন না, সেটার বিষয়ে আমার কাছে চিঠি পাঠাবেন।'
খলিফা একবার তাঁকে বলেছিলেন, 'আপনার অনমনীয়তার কথা আমি জানতে পেরেছি। আপনি সেটা আরও বাড়িয়ে দিন।' শারীক তখন বললেন, 'তাহলে আপনার কথায় আমি কি ভরসা পেতে পারি?' উত্তরে খলিফা সম্মতি জানিয়েছিলেন। তিনি নিজে থেকেই দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিন্তু খলিফা আল-মাহদি তাঁকে পুনরায় নিয়োগ দেন। অবশেষে খলিফা মূসা আল-হাদি তাঁকে পদচ্যুত করেন।
শারীকের বিচার ছিল ইনসাফপূর্ণ। অধিকাংশ বিচারকার্যই ছিল নির্ভুল। যে-কোনো পরিস্থিতিতে উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারতেন। বিচারব্যবস্থায় তাঁর অনেক কীর্তি রয়েছে।
একবার খলিফা আল-মাহদির কাছে অভিযোগ দায়ের করা হলো যে, শারীক একজন শিয়া। তখন খলিফা তাঁর কাছে এর সত্যতা জানতে চাইলেন। জবাবে শারীক বললেন, 'শিয়ারা যদি প্রকৃত অর্থেই রাসূলুল্লাহ এবং আহলে বাইতের প্রতি অধিক ভালোবাসা রেখে থাকে, তাহলে আমিরুল মুমিনীনকে সাক্ষী রেখে আমি নিজেকে তাদের অনুসারী ঘোষণা করছি।' তখন খলিফা বললেন, 'আল্লাহর পানাহ, এ কী বলছেন আপনি! আমরা আপনাকে পরহেজগার এবং সম্মানিত হিসেবেই জানি।'
আরেকবার বিতর্কের সময় তাঁকে অপবাদ দেওয়া হলো যে, তিনি নাকি আবু বকর এবং উমর-কে গালমন্দ করেন। তখন শারীক বললেন, 'যুবাইর-কে গালমন্দ করাটাই আমি যেখানে বৈধ মনে করি না, সেখানে আবু বকর এবং উমর-এর অবস্থান তো আরও ঊর্ধ্বে।'
খলিফা আল-মাহদির সাথে, খলিফা আর-রাশিদের উপস্থিতিতে আবু ইউসুফের সাথে, কাসিম ইবনু মা'নের সাথে তাঁর অনেক ঘটনা রয়েছে। খলিফা আল-মাহদি বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁকে ডেকে পাঠালে তিনি কিছু অজুহাত দেখিয়ে বলেছিলেন, 'আমি এই দায়িত্বের উপযুক্ত নই।' এমনকি তিনি এ কথাও বলেছিলেন, 'বিচারের ক্ষেত্রে আমি কাউকে ছাড় দিই না। যে-কোনো পরিস্থিতিতে সবাইকে পাকড়াও করি।' তখন খলিফা বললেন, 'আপনি আমার এবং আমার ছেলের বিচারও করতে পারবেন।' তখন শারীক বললেন, 'তার মানে আমি আপনার সঙ্গ পাচ্ছি?' খলিফা বললেন, 'হ্যাঁ, আমি আপনার সাথেই আছি।'
শারীক সকালে এজলাসে বসার আগেই একটি কাগজের টুকরা বের করে ভালো করে দেখতেন। এরপর বাদী-বিবাদীকে হাজির করা হতো। তাঁর সহচররা একবার আগ্রহী হয়ে কাগজের টুকরাটি খুলে দেখল। তাতে লেখা ছিল, 'হে শারীক ইবনু আবদিল্লাহ! পুলসিরাতের কথা স্মরণ করো, যা তোমাকে একাই পাড়ি দিতে হবে। হে শারীক ইবনু আবদিল্লাহ! তোমাকে আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড়াতে হবে-এ কথা ভুলে যেয়ো না।'
টিকাঃ
[৭৪৭] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ১৩২
[৭৪৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৫৫
[৭৪৯] আখবারুল কুদ্ধাহ : ৩/১৭৪; আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৩৮
[৭৫০] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১০/১৭১
📄 কাযি সাওয়ার
তাঁর পূর্ণ নাম সাওয়্যার ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি সাওয়্যার ইবনি কুদামাহ আল-আনবারি আত-তামিমি। উপনাম আবু আবদিল্লাহ। ইমাম নাসায়ি এবং ইবনু হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইমাম আবু দাউদ, তিরমিযি এবং নাসায়ি তাঁর সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেছেন। মূলত বসরার অধিবাসী হলেও তিনি বাগদাদে বসবাস করতেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল রুসাফায় বিচারকার্য পরিচালনা করা। ২৪৫ হিজরিতে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন তিনি।
খলিফা মানসুর তাঁকে বসরার বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। একবার খলিফা তাঁকে লিখেছিলেন, 'যে জমিটি নিয়ে ব্যবসায়ী এবং সেনাপতির মাঝে বিরোধ দেখা যাচ্ছে, তাতে আপনি সেনাপতির পক্ষে রায় দিন।' উত্তরে সাওয়্যার লিখলেন, 'প্রাপ্ত দলিল হিসেবে আমি বুঝতে পারছি, ব্যবসায়ীই হচ্ছেন জমিটির মালিক। এখন আমি তো অন্যায়ভাবে তার থেকে সেটি নিতে পারি না। ... আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি অন্যায়ভাবে ব্যবসায়ীর জমিটি দখল করব না।' জবাব পেয়ে মানসুর বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। আমার নিযুক্ত বিচারক আমার বিরোধিতা করে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।'
টিকাঃ
[৭৫১] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৬৫
📄 আরও কয়েকজন প্রসিদ্ধ বিচারক
আমরা এখানে কেবল কয়েকজন আব্বাসি বিচারকের কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।
✓ কাযি আবদুল ওয়াহাব ইবনু আলি আল-মালিকি (৩৬২ হি.)।
✓ কাযি হুসাইন ইবনু মুহাম্মাদ আল-মারুযি (৪৬২ হি.)। শাফিয়ি ফিকহের বিখ্যাত পার্শ্বটীকার রচয়িতা।
✓ কাযি আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ, আবু হামিদ আল-ইসফারাঈনি আশ-শাফিয়ি (৪০৬ হি.)। খলিফাকে পদচ্যুত করার হুমকি দিয়ে তিনি পত্র লিখেছিলেন।
✓ কাযি আলি ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি হাবিব আল-মাওয়ারদি (৪৫০ হি.)। বিচারকার্য পরিচালনায় সর্বাধিক পারদর্শী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন।
✓ কাযি মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন, আবু ইয়ালা আল-ফাররা (৪৫৮ হি.)। তাঁর ছেলে এবং নাতির নামও ছিল মুহাম্মাদ। তারাও বিচারক ছিলেন। তাঁর নাতি আবু ইয়ালা আস-সগির (৫৬০ হি.) নামে পরিচিত।
✓ কাযি আবু বকর আল-বাকিল্লানি, মুহাম্মাদ ইবনুত তাইয়িব। তিনি ছিলেন মালিকি মাযহাবের ফকিহ, মূলনীতি বিশেষজ্ঞ এবং কালামশাস্ত্রে পারদর্শী। ৩৩৭ হিজরিতে বসরায় জন্মগ্রহণ করেন। বাগদাদে থাকতেন। ৪০৩ হিজরিতে সেখানেই ইন্তেকাল করেন।
✓ কাযি আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি হিবাতিল্লাহ (৫৮৫ হি.)। ইবনু আবি আসরুন নামে তিনি পরিচিত। দামিস্কের বিচারক ছিলেন।
✓ কাযি ইবরাহীম ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি আবদিল মুনইম (৬৪২ হি.)। ইবনু আবিদ দাম আল-হামাবি নামে পরিচিত ছিলেন। হামা শহরে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন তিনি।
টিকাঃ
[৭৫২] মারজিউল উলুমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০৭
[৭৫৩] তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা : ৪/৩৫৬; ওয়াফায়াতুল আইয়ান : ১/৪০০; তাহযীবুল আসমা : ১/১৬৪; আল-আলাম : ১/২৭৮
[৭৫৪] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪২৫; যুহরুল ইসলাম : ২/২৫০
[৭৫৫] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪২৮
[৭৫৬] মারজিউল উলুমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৫৮১
[৭৫৭] মারজিউল উলুমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৩৩৯
[৭৫৮] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪৩১; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৪৯
[৭৫৯] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪৩২
📄 মিশরের কয়েকজন বিচারক
আমরা এখানে মিশরের কয়েকজন আব্বাসি বিচারকের নাম উল্লেখ করছি:
✔ গাউস ইবনু সুলাইমান আল-হাদরামি। ১৩৫ থেকে ১৪০ হিজরি অবধি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। দীর্ঘসময় বিচারকার্য পরিচালনার পর দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব গ্রহণ করেন। খলিফা মানসুরের যুগে মিশরে তিনিই সর্বপ্রথম সাক্ষ্যদের সম্পর্কে গোপনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। মোট তিন বার মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
✔ আবদুল্লাহ ইবনু লাহিআহ ১৫৫ হিজরির শুরুতে খলিফা আবু জাফরের পক্ষ থেকে বিচারক নিযুক্ত হন। মিশরে খলিফার পক্ষ থেকে নিযুক্ত সর্বপ্রথম বিচারক ছিলেন তিনি। তাঁর বেতন ছিল মাসে ৩০ দিনার।
✓ ইসমাঈল ইবনুল ইয়াসা আল-কিন্দি। তিনি ছিলেন মিশরে হানাফি মাযহাবের অনুসারী প্রথম বিচারক। খলিফা আল-মাহদির পক্ষ থেকে বিচারক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ বিচারকদের অন্যতম। মিশরের বাসিন্দাদের সাথে তাঁর ফিকহি মতাদর্শের অমিল হওয়ায় তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
✔ আল-মুফাদদাল ইবনু ফাদ্বালাহ। খলিফা আল-মাহদির তরফ থেকে প্রেরিত পত্র মারফত তিনি মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বেতন ছিল মাসে ৩০ দিনার। তিনিই প্রথম নথি সম্প্রসারণ করে তাতে ওসিয়ত এবং ঋণ অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর আগে এটার প্রচলন ছিল না।
✓ আলি ইবনুল হুসাইন ইবনি হারব। বাগদাদের লোকদের কাছে ইবনু হারবুয়াহ নামে পরিচিত ছিলেন তিনি। ২৯৩ হিজরিতে মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ১৮ বছর এ দায়িত্বরত ছিলেন। তাঁর অনেক কীর্তি রয়েছে।
টিকাঃ
[৭৬০] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩৫৯, ৩৬১ ও ৩৭৩
[৭৬১] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩৬৮
[৭৬২] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৭১
[৭৬৩] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৭৭
[৭৬৪] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৪৮১, ৫২৩; তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা: ৩/৪৪৬ এবং ৪৮০