📄 কাযি ইবনু শুবরুমাহ
তাঁর পূর্ণ নাম আবদুল্লাহ ইবনু শুবরুমাহ ইবনিত তুফায়ল ইবনি হাসসান। উপনাম ছিল ইবনু শুবরুমাহ। তিনি ছিলেন তাবিয়ি, কুফার বিচারক, প্রবীণ ব্যক্তি এবং শীর্ষস্থানীয় ফকিহ।
খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিক কর্তৃক নিযুক্ত ইরাকের প্রশাসক ছিলেন ইউসুফ ইবনু উমর আস-সাকাফি। ইবনু শুবরুমাহকে তিনিই ১২১ থেকে ১২৬ হিজরি অবধি কুফার বিচারক পদে বহাল রেখেছিলেন। এরপর তাঁকে পদচ্যুত করে সে জায়গায় নিয়োগ দেন ইবনু আবি লাইলাকে। মুগীরা বলেন, 'ইবনু শুবরুমাহ ছিলেন আমার বন্ধু। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর বিচার-সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর সাথে কোনো কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন।' পরবর্তীকালে আবু জাফর মানসুর খলিফা হওয়ার পর তাঁকে কুফার উপকণ্ঠে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন চরিত্রবান, জ্ঞানী এবং বিচক্ষণ। তাঁকে দেখতেই দুনিয়াবিমুখ বলে মনে হতো। ১৪৪ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
ফিকহের ক্ষেত্রে ইবনু শুবরুমাহ নিজেই ছিলেন স্বয়ংসম্পন্ন মুজতাহিদ। কুফা নগরীতে তিনি ফতোয়া প্রদান করতেন। ইমাম আবু হানিফা -এর সমসাময়িক হওয়ায় হানাফিগণ তাঁর অভিমত বেশি বেশি উল্লেখ করে থাকেন। বিচারকার্য এবং সুবিচার করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রসিদ্ধি ছিল। এ ছাড়া তিনি হাদিস বর্ণনাও করতেন। শুবা, সুফইয়ান সাওরি, সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা এবং ইবনুল মুবারক-সহ অনেকেই তাঁর সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
ইবনু শুবরুমাহর অভ্যাস ছিল বিচার-সংক্রান্ত বিষয়ে ইয়াস ইবনু মুআবিয়ার সাথে মতবিনিময় করা। একবার ইয়াস ইবনু মুআবিয়া তাঁকে বললেন, 'এক ব্যক্তির কাছে আমানত রাখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে সে ব্যক্তি আমানত রাখার কথা স্বীকার করেছে। এটাও বলেছে যে, আমানত নাকি সে ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি আমানত রেখেছিল, সে তা বুঝে পাওয়ার কথা অস্বীকার করছে। এখন বিষয়টির সুরাহা হবে কিভাবে?' উত্তরে ইবনু শুবরুমাহ বললেন, 'এখানে মূল বিষয় তথা আমানত রাখা তো নিশ্চিত। সুতরাং শাখাগত বিষয় তথা আমানত ফিরিয়ে দেওয়াটাও নিশ্চিতই হবে।' ইয়াস তখন ইবনু শুবরুমাহর মতামতের প্রশংসা করার পর বললেন, 'আপনার সম্পর্কে কে কী বলল-তা নিয়ে মোটেই ভাববেন না। আপনার উচিত বিচারকার্য পরিচালনা করা।'
খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের ছেলে আবদুল্লাহ ছিলেন আমির। একবার তিনি ইবনু শুবরুমাহকে বলেন, 'আপনার প্রয়োজনের কথা আমাকে জানান। আমি সেটা পূরণ করব। আপনি যদি বাড়তি কিছু গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনাকে দেওয়া হবে।' উত্তরে ইবনু শুবরুমাহ বললেন, 'আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। মানুষের কাছে বেশি কিছু চাওয়া তো পরের কথা, মামুলি জিনিস চাওয়া থেকেও আমি বিরত থেকেছি।'
তিনি অনেক বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব গবেষণামূলক পদ্ধতিতে ফয়সালাও করেছেন। যেমন মিথ্যা সাক্ষ্য দাতাকে তিনি মসজিদেই প্রহার করতেন। বন্ধক দাতা এবং বন্ধক গ্রহীতা— উভয়ের মাঝে মতপার্থক্য হলে বন্ধক দাতার কথাই তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য হতো। সাক্ষ্য এবং শপথের মাধ্যমে ফয়সালা করতেন। অনুপস্থিত ব্যক্তি ও উপস্থিত ব্যক্তির ফয়সালায় তিনি কোনো রকম তফাত করতেন না। তিনি কবিতা আবৃত্তিও জানতেন।
টিকাঃ
[৭৪২] আখবারুল কুদ্দাহ: ৩/৩৬; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১২৬; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৬/৩৫০; তারীখুল কাদ্দা, পৃ. ৬৬
[৭৪৩] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/৪৯, ৩/৭৩, ৩/৮৯, ৩/১২৯
📄 কাযি ইবনু আবি লাইলা
তাঁর পূর্ণ নাম মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান ইবনি আবি লাইলা। উপনাম ছিল আবু আবদির রহমান। ফকিহ এবং কুফার বিচারক হওয়ার পাশাপাশি ক্বারিও ছিলেন তিনি। ১৪৮ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়।
প্রথমে উমাইয়া যুগে এবং পরবর্তীকালে আব্বাসি যুগেও বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। সর্বমোট ৩৩ বছর দায়িত্বরত ছিলেন। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট হাদিসবিশারদ। সুনান গ্রন্থের সংকলকগণ তাঁর সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি স্বয়ংসম্পন্ন মুজতাহিদ ছিলেন। ইমাম আবু হানিফার সাথে তাঁর কিছুটা মতভিন্নতা ছিল। গবেষক পর্যায়ের ফকিহদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ফতোয়া প্রদানের কাজও করতেন।
ইবনু আবি লাইলা সম্পর্কে আবু ইউসুফ বলেছেন, 'কাযিদের মাঝে ইবনু আবি লাইলা ছিলেন আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে অধিক সমঝদার। কুরআনের পঠনপদ্ধতি সম্পর্কেও তিনি সর্বাধিক অবগত। আল্লাহর ব্যাপারে তাঁর চেয়ে অধিক সত্যবাদী এবং সম্পত্তির ব্যাপারে তাঁর চেয়ে অধিক নির্মোহ কোনো বিচারক ছিলেন না।'
ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, ইউসুফ ইবনু উমর সর্বপ্রথম ইবনু আবি লাইলাকে কুফার বিচারক নিযুক্ত করেন। তাঁর জন্য ১৫০ দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করে ইউসুফ বলেছিলেন, 'আপনি মুসলিমদের বেতনভুক্ত কর্মচারী মাত্র। সুতরাং সকাল-সন্ধ্যায় তাদের কল্যাণার্থে বের হবেন।'
কুফাবাসীদের মাঝে তিনি ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তিনি শিয়াদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন না। সাক্ষীদের ভালোমতো যাচাইয়ের নির্দেশ দিতেন। হদ কায়েম করতেন মসজিদের মধ্যেই। ওজর ছাড়া দাম্ভিকতা দেখায়—এমন লোকদের সাক্ষ্য তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য হতো না। তিনি অন্ধ ব্যক্তিকে সাক্ষ্যর অনুমোদন দিতেন। তাঁর একজন ব্যক্তিগত সচিব ছিল।
টিকাঃ
[৭৪৪] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ১২৬
[৭৪৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১২৯-১৩০
[৭৪৬] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/১৩১
📄 কাযি শারীক আন-নাখায়ি
তাঁর পূর্ণ নাম ছিল শারীক ইবনু আবদিল্লাহ ইবনিল হারিস। উপনাম আবু আবদিল্লাহ। বিচারক এবং ফকিহ হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন হাদিসবেত্তা ছিলেন। বুখারার খোরাসানে ৯৫ হিজরিতে তাঁর জন্ম এবং ১৭৭ হিজরিতে কুফায় তাঁর ইন্তেকাল।
শারীক অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং প্রখর ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁর বুদ্ধিমত্তা এবং বিচক্ষণতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ইলম অর্জনে অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন তিনি। আজীবন নিজেকে নিমগ্ন রেখেছিলেন। প্রকৃত অর্থেই আলিম এবং ফকিহ ছিলেন শারীক ইবনু আবদিল্লাহ।
তিনি ছিলেন কুফা এবং আহভাজ নগরীর বিচারক। খলিফা আবু জাফর মানসুর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদানের জন্য তাঁকে ডেকে পাঠালে তিনি বিনয় সহকারে বললেন, 'আমিরুল মুমিনীন! আমি তো কেবল নামাজ-রোজাই জানি। বিচারকার্যের বিষয়ে আমি কিছু বুঝি না।' তখন খলিফা বললেন, 'আপনি যেটা বুঝেন, সেটাই বাস্তবায়ন করবেন। আর যেটা বুঝবেন না, সেটার বিষয়ে আমার কাছে চিঠি পাঠাবেন।'
খলিফা একবার তাঁকে বলেছিলেন, 'আপনার অনমনীয়তার কথা আমি জানতে পেরেছি। আপনি সেটা আরও বাড়িয়ে দিন।' শারীক তখন বললেন, 'তাহলে আপনার কথায় আমি কি ভরসা পেতে পারি?' উত্তরে খলিফা সম্মতি জানিয়েছিলেন। তিনি নিজে থেকেই দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। কিন্তু খলিফা আল-মাহদি তাঁকে পুনরায় নিয়োগ দেন। অবশেষে খলিফা মূসা আল-হাদি তাঁকে পদচ্যুত করেন।
শারীকের বিচার ছিল ইনসাফপূর্ণ। অধিকাংশ বিচারকার্যই ছিল নির্ভুল। যে-কোনো পরিস্থিতিতে উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারতেন। বিচারব্যবস্থায় তাঁর অনেক কীর্তি রয়েছে।
একবার খলিফা আল-মাহদির কাছে অভিযোগ দায়ের করা হলো যে, শারীক একজন শিয়া। তখন খলিফা তাঁর কাছে এর সত্যতা জানতে চাইলেন। জবাবে শারীক বললেন, 'শিয়ারা যদি প্রকৃত অর্থেই রাসূলুল্লাহ এবং আহলে বাইতের প্রতি অধিক ভালোবাসা রেখে থাকে, তাহলে আমিরুল মুমিনীনকে সাক্ষী রেখে আমি নিজেকে তাদের অনুসারী ঘোষণা করছি।' তখন খলিফা বললেন, 'আল্লাহর পানাহ, এ কী বলছেন আপনি! আমরা আপনাকে পরহেজগার এবং সম্মানিত হিসেবেই জানি।'
আরেকবার বিতর্কের সময় তাঁকে অপবাদ দেওয়া হলো যে, তিনি নাকি আবু বকর এবং উমর-কে গালমন্দ করেন। তখন শারীক বললেন, 'যুবাইর-কে গালমন্দ করাটাই আমি যেখানে বৈধ মনে করি না, সেখানে আবু বকর এবং উমর-এর অবস্থান তো আরও ঊর্ধ্বে।'
খলিফা আল-মাহদির সাথে, খলিফা আর-রাশিদের উপস্থিতিতে আবু ইউসুফের সাথে, কাসিম ইবনু মা'নের সাথে তাঁর অনেক ঘটনা রয়েছে। খলিফা আল-মাহদি বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁকে ডেকে পাঠালে তিনি কিছু অজুহাত দেখিয়ে বলেছিলেন, 'আমি এই দায়িত্বের উপযুক্ত নই।' এমনকি তিনি এ কথাও বলেছিলেন, 'বিচারের ক্ষেত্রে আমি কাউকে ছাড় দিই না। যে-কোনো পরিস্থিতিতে সবাইকে পাকড়াও করি।' তখন খলিফা বললেন, 'আপনি আমার এবং আমার ছেলের বিচারও করতে পারবেন।' তখন শারীক বললেন, 'তার মানে আমি আপনার সঙ্গ পাচ্ছি?' খলিফা বললেন, 'হ্যাঁ, আমি আপনার সাথেই আছি।'
শারীক সকালে এজলাসে বসার আগেই একটি কাগজের টুকরা বের করে ভালো করে দেখতেন। এরপর বাদী-বিবাদীকে হাজির করা হতো। তাঁর সহচররা একবার আগ্রহী হয়ে কাগজের টুকরাটি খুলে দেখল। তাতে লেখা ছিল, 'হে শারীক ইবনু আবদিল্লাহ! পুলসিরাতের কথা স্মরণ করো, যা তোমাকে একাই পাড়ি দিতে হবে। হে শারীক ইবনু আবদিল্লাহ! তোমাকে আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড়াতে হবে-এ কথা ভুলে যেয়ো না।'
টিকাঃ
[৭৪৭] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ১৩২
[৭৪৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৫৫
[৭৪৯] আখবারুল কুদ্ধাহ : ৩/১৭৪; আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৩৮
[৭৫০] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১০/১৭১
📄 কাযি সাওয়ার
তাঁর পূর্ণ নাম সাওয়্যার ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি সাওয়্যার ইবনি কুদামাহ আল-আনবারি আত-তামিমি। উপনাম আবু আবদিল্লাহ। ইমাম নাসায়ি এবং ইবনু হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইমাম আবু দাউদ, তিরমিযি এবং নাসায়ি তাঁর সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেছেন। মূলত বসরার অধিবাসী হলেও তিনি বাগদাদে বসবাস করতেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল রুসাফায় বিচারকার্য পরিচালনা করা। ২৪৫ হিজরিতে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন তিনি।
খলিফা মানসুর তাঁকে বসরার বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। একবার খলিফা তাঁকে লিখেছিলেন, 'যে জমিটি নিয়ে ব্যবসায়ী এবং সেনাপতির মাঝে বিরোধ দেখা যাচ্ছে, তাতে আপনি সেনাপতির পক্ষে রায় দিন।' উত্তরে সাওয়্যার লিখলেন, 'প্রাপ্ত দলিল হিসেবে আমি বুঝতে পারছি, ব্যবসায়ীই হচ্ছেন জমিটির মালিক। এখন আমি তো অন্যায়ভাবে তার থেকে সেটি নিতে পারি না। ... আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি অন্যায়ভাবে ব্যবসায়ীর জমিটি দখল করব না।' জবাব পেয়ে মানসুর বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। আমার নিযুক্ত বিচারক আমার বিরোধিতা করে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।'
টিকাঃ
[৭৫১] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৬৫