📄 বিচারকদের অন্যান্য দায়িত্ব
বিচারকরা সাধারণত খলিফা, প্রশাসক এবং প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে নিযুক্ত হতেন। সে কারণে তারা ছিলেন জনগণের আস্থার জায়গা। অধিকাংশ সময় এমন সব জটিল এবং নাজুক কাজের ভার তাদের দেওয়া হতো, যা কেবলই বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ লোকদেরই অর্পণ করা যায়।
উমাইয়া যুগের আলোচনাতে আমরা বিচারকদের আধা-বিচারিক বা বিচারবহির্ভূত অনেক কাজ পরিচালনা করতে দেখেছি। যেমন ইয়াতিমদের সম্পত্তি দেখাশোনা, ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধান, ফতোয়া প্রদান ইত্যাদি। এ ধরনের কাজ সাধারণত বিচারকের হাতেই থাকত।
উমাইয়া যুগে বিচারকরা আরও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। যেমন পুলিশের আইজি, রাষ্ট্রীয় কোষাগার, প্রশাসনিক দপ্তর এবং প্রশাসকের প্রতিনিধি ইত্যাদি। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অস্থিরতা এবং বিভাজনের কারণে আব্বাসি যুগের বিচারকরা তুলনামূলক কম হলেও এ জাতীয় অনেক দায়িত্বই পালন করেছেন। আব্বাসি যুগে বিচারকরা নতুন যেসব দায়িত্ব পালন করেছেন, সেসব নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করব।
১. রমজান এবং অন্যান্য মাসের চাঁদ দেখা
কারণ শরীয়তের অনেক বিধিবিধান চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। মাসের শুরুতে নানাধরনের কর পরিশোধ, প্রতিশ্রুতি পূরণ, মানত আদায় এবং ইবাদত পালিত হয়ে থাকে। তাই বিচারকরা এই দ্বীনি দায়িত্ব আবশ্যকীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কারণ এ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ঘটে এবং মতবিরোধের সৃষ্টি হয়ে থাকে। আল-কিন্দি বর্ণনা করেছেন, ‘ইবনু লাহিআহ যখন বিচারের দায়িত্বে ছিলেন (১৫৫-১৬৪ হি.), তখনকার কথা। একবার লোকেরা রমজান মাসের চাঁদ দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু কেউই চাঁদ দেখতে পেল না। এমতাবস্থায় দুজন লোক এসে দাবি করল, তারা চাঁদ দেখেছে। প্রশাসক মূসা ইবনু আলি তখন ইবনু লাহিআহর কাছে পাঠিয়ে তাদের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। কিন্তু তাদের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কিছু জানা গেল না। এদিকে লোকেরা নিজেদের মাঝে মতানৈক্য হওয়ার অভিযোগ করল। পরের বছর আবদুল্লাহ ইবনু লাহিআহ সৎ এবং বিশ্বস্ত একদল মুসল্লি নিয়ে নিজেই বের হয়ে গেলেন। তারা নীলনদের পশ্চিম তীরে গিজায় গিয়ে চাঁদ অনুসন্ধান করলেন। ইবনু লাহিআহই প্রথম বিচারক, যিনি রমজানের চাঁদ দেখার জন্য স্বশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। তার পর থেকে চাঁদ দেখার বিষয়টি বিচারকরা এভাবেই পালন করে আসতেন।
বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম দেশে রমজানের চাঁদ দেখার বিষয়টি আজও বিচার বিভাগের অধীনে রয়েছে।
২. অনুপস্থিত ব্যক্তিদের তহবিল পরিচালনা
কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির যদি অনেক সম্পদ থাকে, কিন্তু তার কোনো ম্যানেজার না থাকে, আর সাধারণ লোকেরাও উক্ত সম্পদ রক্ষা করতে অপারগ হয়—তখন বিচারকের কাছে সেসব হস্তান্তর করা হলে তিনি তাতে নিখোঁজ ব্যক্তিটির নাম লিখে এবং চিহ্ন দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সংরক্ষণ করে রাখতেন। কিংবা মালিক উপস্থিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির জিম্মায় দিয়ে দিতেন। এ দায়িত্ব আজও বিচারকের অধীনে রয়েছে।
৩. প্রকাশনা বিভাগের তত্ত্বাবধান
রফউল ইসর গ্রন্থ থেকে আল-কিনদির বর্ণনায় এসেছে, ‘গভর্নর তার প্রকাশনা বিভাগের দায়িত্ব বিচারক আবদুল আজিজ ইবনু মুহাম্মাদকে দিয়েছিলেন। গভর্নর নিজেই ছিলেন উক্ত প্রকাশনা দপ্তরটির প্রতিষ্ঠাতা। এ ক্ষেত্রে তিনি নিপুণতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থে সমৃদ্ধ একটি বিভাগ। ফকিহদের জন্য তাতে বসা এবং নিজের অভিরুচি অনুযায়ী তা থেকে উপকৃত হওয়ার অবারিত সুযোগ ছিল। গভর্নরের দৃষ্টিতে বিচারকই ছিলেন এই দপ্তর দেখাশোনা এবং পরিচালনার অধিক যোগ্য ব্যক্তি। অনেক দেশেই প্রকাশনা বিভাগের দায়িত্ব এভাবে পরিচালিত হতো।
৪. অন্যান্য
এমন আরও কিছু বিচারকার্য বহির্ভূত দায়িত্ব ছিল, যেগুলো শুধু বিচারকরাই পালন করতেন। যার কারণে মানুষের মধ্যে এবং সমাজের মাঝে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বিচারকগণ সম্মানজনক অবস্থান এবং শ্রদ্ধাভক্তি লাভ করতেন।
এ ব্যাপারে আল-কিন্দি বর্ণনা করেন, বিচারক হারিস ইবনু মিসকিন (২৩৭-২৪৫ হি.)-কে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। হারিস ছিলেন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তাকে হুইল চেয়ারে করে জামে মসজিদে নিয়ে যাওয়া হতো। তিনি অনেক কাজ করেছিলেন। আমরা সেগুলোর মধ্য থেকে মাত্র কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি: হানাফি এবং শাফিয়ি সমর্থকদের মসজিদ থেকে বের করে দেওয়া। কারণ আলোচনা-পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তারা বিতর্কের রীতি মেনে চলত না। মসজিদে নামাজ আদায়কারীদের পরিবেশ তারা ঘোলাটে করে ফেলেছিল। তাদেরকে মসজিদে সমবেত হতে নিষেধ করে সাধারণ মুয়াযযিনদের আযান দিতে বারণ করেন। রমজান মাসে কুরাইশ এবং আনসারিগণ তাদেরকে খাবার দিত। সে ব্যাপারেও তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
জামে মসজিদ নির্মাণ এবং আলেকজান্দ্রিয়াতে খাল খননের আদেশ করেছিলেন। শিকারের জন্য ফাঁদ পাততে নিষেধ করলেও পরবর্তীকালে অনুমতি দিয়েছিলেন।
জানাযার ঘোষণা দিতে নিষেধ করতেন। জানাযার ঘোষণা দেওয়া ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মসজিদে মাহমুদ-সহ অন্যান্য মসজিদে যারা গানের সুরে তিলাওয়াত করত, তাদের বাধা দিতেন।
জামে মসজিদে কুরআন শিক্ষা সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পাশাপাশি তার পক্ষ থেকে একজনকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বিচারকদের মাঝে তিনিই সর্বপ্রথম এই কাজ করেছিলেন।
তিনি প্রশাসকদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং সালাম বিনিময় করতেন না।
রফউল ইসর সূত্রে আল-কিনদির বর্ণনায় আরও এসেছে, বিচারক মালিক ইবনু সাঈদ আল-ফারুকি ৩৯৮ হিজরিতে মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। সে-সময় তিনি অনেক কাজ করেছিলেন:
মক্কা-মদীনার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ফাতিমি প্রশাসকের কাছে আসলে তাদের সাথে কথা বলা, তাদের সার্বিক বিষয় দেখভাল করা এবং প্রশাসকের কাছে তাদের পক্ষ থেকে দূতিয়ালি করেছেন। এমনকি প্রশাসক তার হাতেই আগত মেহমানদের উপঢৌকন দিয়েছেন। তারপর থেকে প্রশাসকের কাছে বিচারকের মর্যাদা বেড়ে যায়। তার কাছে বিচারকের অবস্থান হয়ে যায় আগের থেকেও সুদৃঢ়।
উপহার-উপঢৌকন, জায়গা-জমি এবং জায়গিরের দলিল-দস্তাবেজের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। তিনি নিজেই এসব দায়িত্ব পালন করতেন।
অন্যান্য শহরের গভর্নরদের পক্ষ থেকে লিখিত চুক্তিপত্রের প্রতিও তার নজর থাকত। বিভিন্ন কর্মীদের সাথে প্রশাসকের পত্র মারফত যোগাযোগ তার মাধ্যমেই হতো। যাবতীয় দায়িত্বের ক্ষেত্রে তিনিই প্রশাসকের মুখোমুখি হতেন এবং সবার পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন।
এখানে আরও অনেক বিষয় এবং কর্মপরিধি আছে, যেগুলো যাফির আল-কাসিমি উল্লেখ করেছেন। আমরা এখানে শুধু সেগুলোর শিরোনাম উল্লেখ করেই ক্ষান্ত থাকব—অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব গ্রহণ; ঋণে জর্জরিত ব্যক্তির বাড়ি খিলাফতের কাছে বিক্রি করা; নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পদ পরিচালনা; শারঈ বিধানাবলি নিয়ে পুলিশকে কথা বলার অধিকার না দেয়া, যাতে সাধারণ মানুষ পুলিশের কথাকে শরীয়ত মনে না করে বসে; বিভিন্ন বিভাগে পরিচালক নিয়োগ; মালিকানা-বিহীন সম্পদের তত্ত্বাবধান; অশ্বারোহী এবং যোদ্ধাদের আদমশুমারি; জামে মসজিদগুলো পরিচালনা এবং সেখান থেকে বিদআত নির্মূল করা।
মুসেলের বিচারক কামালুদ্দিন আশ-শাহরাজুরির (৫৭২ হি.) অনেকগুলো কর্মপরিধি ছিল। সেগুলো হচ্ছে—জামে মসজিদ দেখাশোনা; টাকশাল পরিচালনা; নগরীর প্রাচীর নির্মাণ; জনস্বার্থ তত্ত্বাবধান; মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ। আরও ছিল—জুয়ার সরঞ্জামাদি ধ্বংস করা; যুদ্ধবন্দিদের দেখাশোনা; নৈশ আড্ডা বাতিল করা; বিচারব্যবস্থা এবং খানকার প্রবীণ সুফিদের মাঝে সমন্বয় সাধন; দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ; ওজন এবং পরিমাপ নিয়ন্ত্রণ; মহিলাদেরকে হট্টগোল করা থেকে নিবৃত্ত করা; খিলাফতের দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় এবং খলিফার কাছে প্রেরিত অর্থ হস্তান্তর করার সময় মহিলাদের উপস্থিত হওয়া থেকে বাধা প্রদান; রাতের বেলা ছদ্মবেশে সাক্ষীদের যাচাই-বাছাই করতে বাধা দেওয়া; রাষ্ট্রীয় কোষাগারের চাবি বুঝে নেওয়া; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগত কালেকশনের অর্থ ছাত্রদের জন্য ব্যয় করা; মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা; যথাসময়ে দোকানপাট বন্ধ করা এবং বন্যার সময় নীলনদের পানির উচ্চতা পরিমাপ করার জন্য দায়িত্বশীল নির্বাচন করা।
টিকাঃ
[৭২৩] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্দাহ, পৃ. ৩৭০
[৭২৪] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৮২
[৭২৫] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৮৩; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৬০০
[৭২৬] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৪৬৭-৪৬৯
[৭২৭] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৬০৫-৬০৬
[৭২৮] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৪৭
[৭২৯] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৮০-২৯৩
📄 আব্বাসি যুগে বিচারব্যবস্থার অধঃপতন
আব্বাসি যুগের প্রথম অংশ ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগের প্রতিনিধিত্ব করত। আব্বাসি খিলাফত উন্নতির শীর্ষে পৌঁছার পর শুরু হয় পতনের ধারা। রাষ্ট্র এবং সমাজের অভ্যন্তরে অস্থিরতা আর গণ্ডগোল দানা বাঁধতে থাকে। ধীরে ধীরে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে থাকে মুসলিম দেশগুলো। আব্বাসি খিলাফতের দ্বিতীয় ধাপে নাগরিক, সামরিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে জুলুম-নির্যাতন ছড়িয়ে পড়ে। যার প্রভাব পড়তে থাকে বিচারব্যবস্থার মাঝেও। এই অঙ্গনে কিছু অসৎ বিচারকের দেখা মিলে, যারা বিচারব্যবস্থার এক কালো অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করছিল।
আব্বাসি খিলাফত ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং চারিত্রিক অধঃপতনের শিকার হতে লাগল। এর প্রভাব পড়ছিল বিচারব্যবস্থা এবং বিচারকদের ওপর। আগেকার ন্যায়পরায়ণ কাযিদের আলোকজ্জ্বল চিত্রের পাশে যুক্ত হলো দুরাচার জালিম কিছু বিচারকের কালো অধ্যায়। যাদের মধ্যে ছিল না পূর্বসূরিদের মতো বিনম্রতা, আধ্যাত্মিকতা এবং সমীহবোধ। তাদের অবস্থা ছিল আগেকার যুগের অসৎ বিচারকের মতো।
সরকারি চাকরি এবং দায়িত্বগুলো বেচাকেনার পণ্য হয়ে যাওয়া ছিল বিচারব্যবস্থার অন্ধকার ট্রাজেডির অন্যতম অংশ। বিচারকের পদ-প্রত্যাশী ব্যক্তিকে বিশাল পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হতো। নিয়োগদাতাকে বার্ষিক প্রতিশ্রুত অর্থ (ঘুস) পরিশোধ করার শর্তে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছিল।
ফকিহ এবং আলিমগণ এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা প্রদান করেছিলেন। তারা এটাকে সুস্পষ্ট ঘুস হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আল-মাওয়ারদি লিখেছেন, ‘বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব লাভের উদ্দেশ্যে বিনিময় প্রদান করা নিষিদ্ধ। কেননা এটা স্পষ্টতই ঘুস। এটা নির্ঘাত হারাম। এর দাতা এবং গ্রহীতা—উভয়েই সমান অপরাধী।’
খলিফা আল-মুতি লিল্লাহর (৩৩৪-৩৬৩ হি.) সময়কাল সম্পর্কে আবুল কাসিম আস-সামনানি বলেন, ‘ইবনু আবিশ শাওয়ারিব ১১২০ দিরহামের বিনিময়ে কাযির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। শরীয়ত বেকার সাব্যস্ত হয়ে পরিস্থিতি আগাগোড়াই পালটে যায়। এরপর খলিফা আল-কাদির বিল্লাহর (৩৮১-৪২২ হি.) সময় ৪০৫ হিজরিতে ইবনু আবিশ শাওয়ারিব প্রধান বিচারপতি হয়ে যান।’
প্রথম আব্বাসি যুগ থেকেই বিচারের রায়ের ক্ষেত্রে বিরোধ ছড়িয়ে পড়েছিল। ইজতিহাদগত তফাতের কারণে বিচারকদের মাঝে একই বিষয়ে সাংঘর্ষিক বিচার দেখা দিয়েছিল। তখন ফিকহি মাযহাবের আবির্ভাব ঘটে। বিচারের ক্ষেত্রে মাযহাবের গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী রায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর থেকে তলে তলে বিরোধ দানা বাঁধতে শুরু করে। ক্রমেই বিষয়টি ব্যাপক হয়ে যায়। ফলে অনেক সময় বিচারকের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। তার কর্মপরিধি সংকুচিত হয়ে যায়। এ কারণেই বিচার বিভাগ সংস্কারের আওয়াজ ওঠে। বিচার বিভাগের তাবৎ বিষয় ঢেলে সাজানোর ডাক আসতে থাকে।
টিকাঃ
[৭৩০] যুহরুল ইসলাম: ২/২৫১
[৭৩১] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়য়াহ, পৃ. ৬৫
[৭০২] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৫
[৭৩০] রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৫১৫, ৪/১৫১৬; কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৩২, ৩৩
📄 বিচারব্যবস্থার সংস্কার
আব্বাসি যুগে বিচারব্যবস্থায় অনেক সংস্কার করা হয়েছিল। এই সংস্কারগুলো ছিল দুই ধরনের।
সংস্কারের প্রথম ধরন
উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং সমৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য কিছু সংস্কার করা হয়। যেমন: (ক) বিচারের রায়, ওসিয়ত এবং ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যাপারে নথিপত্র ব্যবহারে যত্নবান হওয়া এবং তার ব্যাপক প্রচলন ঘটানো; (খ) ইয়াতিমদের তহবিল, ওয়াকফ সম্পদ, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পত্তি এবং কুড়িয়ে পাওয়া সম্পদের জন্য বিভিন্ন ধরনের অধিদপ্তর তৈরি করা; (গ) রাষ্ট্রে আশ্রিতদের ব্যবস্থা করা; (ঘ) জনশৃঙ্খলা বিভাগকে কাজের জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান; (ঙ) ওয়াকফকৃত সম্পদ পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং (চ) বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথক করার জন্য জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ।
মুহাম্মাদ ইবনু মাসরুক আল-কিনদি ১৭৭ হিজরিতে খলিফা হারুনুর রাশিদের পক্ষ থেকে মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিচারের ক্ষেত্রে তার অবস্থান ছিল শক্তিশালী। সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে একদিকে তিনি কঠোর নীতি অবলম্বন, অন্যদিকে তাদেরকে পরিপূর্ণ ইনসাফ প্রদান করেন। নিজের অবস্থানকে উন্নত রাখতে কাজ করেন তিনি। বিচারককে প্রশাসকের অধীনে চলার নীতি বর্জন করেন। প্রশাসকের দরবারে উপস্থিত হওয়া থেকে তিনি বিরত থাকতেন। এটা ছিল তার অভ্যাস। তার পরবর্তী বিচারকদের জন্য যা অনুসরণীয় নীতিতে পরিণত হয়।
আল-কিনদি বলেছেন, ‘মিশরের প্রশাসকরা তাদের দরবারে উপস্থিত হতে বিচারকদের বাধ্য করতেন। যেমনটা বর্তমানের ফকিহদের করা হয়। ইবনু মাসরুক মিশরে আসার পর প্রশাসক আবদুল্লাহ ইবনু মুসাইয়াব দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য তার বরাবর পত্র প্রেরণ করেন। উত্তরে ইবনু মাসরুক বলেন, “এ ব্যাপারে আপনার কাছে আসলে আপনার সাথে আমি যাচ্ছেতাই আচরণ করব।” এরপর থেকে দরবারে বিচারকদের যাতায়াত-রীতি বন্ধ হয়ে যায়।
সংস্কারের দ্বিতীয় ধরন
আব্বাসি যুগের দ্বিতীয় অংশে যেসব অধঃপতন, অশান্তি, দুর্নীতি আর অবক্ষয় শুরু হয়েছিল, সেসবের সংস্কার। এই সংস্কারগুলোর মধ্যে ছিল—(ক) মিথ্যা সাক্ষীদের প্রতিহত করার জন্য যাচাই ও স্বচ্ছতার প্রক্রিয়া গ্রহণ এবং (খ) আদালত ও বিচারব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়া ত্রুটি-বিচ্যুতির সংস্কার।
এগুলোর মাঝে সর্বোচ্চ সংস্কার ছিল বিচারের রায়গুলোকে শ্রেণি-বিভক্তকরণ। যাতে বিচারব্যবস্থাকে করে নতুন নতুন ঘটনা প্রবাহে বিচারকদের স্বাধীন ইজতিহাদের ওপরে ছেড়ে না দেওয়া হয়। কারণ বিচারকদের স্বাধীন ইজতিহাদের ফলে বিচারব্যবস্থায় ব্যাপক অসংগতি আর বিরোধ সৃষ্টির পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছিল।
এ কারণে তৎকালীন চিন্তাবিদ আবদুল্লাহ ইবনুল মুকাফফা খলিফা আল- মানসুরের কাছে বিচারব্যবস্থা নিয়ে একটি আইন প্রণয়নের অনুরোধ করেন। যা-তে বিচারের তাবৎ বিধান এক করে দেওয়া হবে। ইবনুল মুকাফফা কর্তৃক লিখিত এ পত্রটি ইতিহাসে রিসালাতুস সাহাবাহ তথা (খলিফার) সহচরদের পত্র নামে পরিচিত। পত্রটিতে খলিফার উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছিলেন, ‘উভয় শহর এবং তার আশপাশে যেসব শহর ও শহরতলি রয়েছে, এগুলোতে চলতে থাকা পরস্পর সাংঘর্ষিক বিচারের রায়ের বিষয়ে আমিরুল মুমিনীন অবগত আছেন। সাধারণ মানুষের জান, মাল এবং সম্ভ্রমের ওপর এর বিরাট প্রভাব পড়েছে। যার কারণে হিরা অঞ্চলে রক্তপাত এবং অশ্লীলতাকে বৈধ মনে করা হচ্ছে। অথচ কুফাতে এ দুটিকে সবাই অবৈধ বলেই জানে। আবার কুফার মধ্যেও এ ধরনের অনেক বিভেদ চলছে। কুফার এক অংশে কোনো জিনিসকে বৈধ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, পক্ষান্তরে অন্য অংশে বলা হচ্ছে তা নাকি অবৈধ। এসব নির্দেশনা আবার বিভিন্নভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে খোদ মুসলিমদের বিপক্ষে। তাদের জীবন এবং সম্মানের ব্যাপারে বিচারকরা এভাবেই নিজেদের বিচারকার্য পরিচালনা করে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকে তো আবার সুন্নত পালনের দাবি করে। আদতে সে এমন বিষয়কে সুন্নত মনে করে চলছে, যা প্রকৃত অর্থে সুন্নত নয়। ফলে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই রক্তপাত ঘটানো হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে রাসূলুল্লাহ -এর যুগে কিংবা তাঁর পরবর্তী হিদায়াতপ্রাপ্ত নেতাদের যুগে অন্যায়ভাবে রক্তমাখা কোনো জামা দেখাতে পারবে না। তাদেরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়: এটা আবার কেমন সুন্নত, যা-তে (হারাম) রক্তপাত করা হয়? তখন তারা উত্তর দেয়: আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান এমনটা করেছেন; কিংবা এসব নেতাদের কেউ কেউ এমনটা করেছেন। মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ভরশীল—এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় অনেকে তা অতি দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করে। অথচ তাদের বিচারকার্য পূর্ববর্তী মুসলিম কাযিদের সাথে একেবারেই মিলে না। সুতরাং আমিরুল মুমিনীন যদি এসব বিচারাচারের পদ্ধতি সম্পর্কে আদেশ দেওয়া সংগত মনে করেন, তাহলে ভালো হবে। প্রস্তাবিত পদ্ধতি হলো, এসব বিষয় সম্পর্কে আমিরুল মুমিনীনের কাছে একটি লিখিত ডকুমেন্ট পেশ করা হবে। যা-তে প্রতিটি গ্রুপের পক্ষের দলিল-আদিল্লা স্থান পাবে। এরপর আমিরুল মুমিনীন সবগুলো পর্যালোচনা করে প্রত্যেক বিচারের ক্ষেত্রে তাঁর মতামত কার্যকর করবেন। আর বিপরীত মতামতের বিচারকার্য নিষিদ্ধ বলে আদেশ জারি করবেন। এভাবে আমিরুল মুমিনীন এ ব্যাপারে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশ করবেন। তাহলে আমরা আশা করতে পারি, ভুল-শুদ্ধ-মিশ্রিত বিচারের এই রায়গুলোকে আল্লাহ তাআলা একটি সঠিক বিধানে পরিণত করবেন। আমাদের আরও আশা আছে, আমিরুল মুমিনিনীনের মতানুসারে বিচারের এই একক পদ্ধতি তাবৎ বিষয় কার্যকর করার উপলক্ষ্য হবে।
এই আগ্রহের মূল্যায়ন করে খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর তখন মদীনার ইমাম মালিক ইবনু আনাসকে মানুষের জন্য এমন একটি কিতাব লিখে দিতে বললেন, যা-তে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর ছাড়ের নীতি এবং আবদুল্লাহ ইবনু উমর-এর কঠোরতার নীতি—দুটোই এড়িয়ে চলবেন। মালিক তখন আল-মুওয়াত্তা সংকলন করলেন। খলিফা তখন মানুষকে আল-মুওয়াত্তা অনুসারে আমল করতে বাধ্য করতে চাইলেন, যেভাবে উসমান সবাইকে এক মুসহাফ অনুযায়ী কুরআন পড়তে বাধ্য করেছিলেন। তখন ইমাম মালিক বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন! এখন আর সে সুযোগ নেই। কারণ রাসূল -এর ইন্তেকালের পরে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তখন প্রত্যেকেই যার কাছে যেটা সঠিক মনে হয়েছে, সে অনুযায়ী আমল করতেন। আর তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর সন্তুষ্টিই ছিল তাঁদের প্রত্যেকের মুখ্য উদ্দেশ্য।’ তখন খলিফা মানসুর এই সংকল্প থেকে সরে আসেন।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবির সূত্রে বিচারক মাহমুদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আরনুস বর্ণনা করেছেন, বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো কোনো বিচারক জুলুম করতে শুরু করলে প্রশাসকরা তখন নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসারে বিচার করা আবশ্যক করে দেন। নিজেদের মাযহাব ছাড়া ভিন্ন কোনো মাযহাব যেন তারা অনুসরণ না করেন। জনগণ সংশয়ে পড়বে না—এমন বিচারকার্যই কেবল তাদের থেকে গৃহীত হবে। তাদের বিচারকার্য পূর্বসূরিদের মতোই হতে হবে।
টিকাঃ
[৭৩৪] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৭
[৭৩৫] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৮৮
[৭৩৬] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৮৪-৮৫
[৭৩৭] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৯৫
📄 বিচারকের সংশোধন বিষয়ক পত্রাবলি
আব্বাসি খিলাফতের সুদীর্ঘ সময়ে অনেক খলিফা, আলিম এবং ফকিহ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন ছিল আব্বাসি খিলাফতের সমৃদ্ধির যুগ। তারপর রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা আর গোলযোগ শুরু হয়। এরপর তা ক্রমান্বয়ে অধঃপতনের দিকে যেতে থাকে। আব্বাসি খিলাফতের স্বর্ণযুগেও বিচারব্যবস্থা সংস্কারের প্রতি অনেক আহ্বান জানানো হয়েছিল। আলিম এবং কাযিদের তরফ থেকে প্রশাসক এবং খলিফাগণের কাছে বহু আবেদন পেশ করা হয়েছে। এসব পত্র ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। ইতিহাসে সেগুলো আজও সোনালি পত্র হিসেবে গণ্য হয়। সেগুলো থেকে নির্বাচিত কিছু অংশ উল্লেখ করে আমরা হালকা-পাতলা আলোচনা করব।
খলিফার উদ্দেশ্যে আল-আম্বারির পত্র
বিচারক আল-আম্বারি ১৫৬ হিজরিতে খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের পক্ষ থেকে বসরার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর ১৫৭ হিজরিতে খলিফা তাকে বিচারকার্যের পাশাপাশি নামাজ পড়ানো-সহ বিভিন্ন ঘটনা অনুসন্ধানের দায়িত্বও প্রদান করেন। ওয়াকির বর্ণনানুসারে জানা যায়, কাযি আল-আম্বারির অনেক মর্যাদা ছিল। অনেক বড় বড় বিচারকার্য তিনি পরিচালনা করেছিলেন।
আল-আম্বারি খলিফা মাহদি বরাবর সুদীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। তাতে লেখা ছিল,
‘আমিরুল মুমিনীনের এটা ভালোভাবেই জানা আছে যে, একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের একদিন, ষাট বছর (নফল) ইবাদত করার চেয়েও উত্তম—এ ধরনের একটা কথা প্রচলিত আছে। সুতরাং হে আমিরুল মুমিনীন! প্রশাসকদের উচিত এমন কাজে প্রতিযোগিতা করা। আমিরুল মুমিনীন তো খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের কারণে মানুষের পক্ষ থেকে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। বিশাল দায়িত্বের পাশাপাশি তাঁর আশাও আছে। আবার লোকেরাও তাঁর কাছে এই প্রত্যাশা করে যে, তারা একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক নেতা পাবে। যিনি নিজেও পূর্বসূরিদের মত ও পথের ওপর চলবেন। আবার তাদেরও সে পথে পরিচালনা করবেন। ফলাফলে তারা পূর্বসূরিদের মতো সফলতা লাভ করবে। সুখময় জান্নাতে সুউচ্চ মর্যাদা তাদের নসিবেও জুটবে। দ্রুতই আসবে ক্ষমতা, বিজয়, সফলতা, নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা, শান্তি আর ভালোবাসা। জনগণের পক্ষ থেকে খলিফার জন্য হিতকামনা যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি তাদের প্রতিও থাকবে খলিফার সহনশীলতা, কোমলতা, দয়া আর ইনসাফপূর্ণ আচরণ। আর বিচারের রায়ের ব্যাপারে লক্ষণীয় হচ্ছে, বিচার হতে হবে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী।
‘কোনো বিধান আল্লাহর কিতাবে না পাওয়া গেলে যেসব বিধানের ওপর পূর্ববর্তী ইমাম এবং ফকিহগণ একমত হয়েছেন, সে অনুযায়ী রায় হবে। আর যদি রাসূলের সুন্নাহতে বিধান না পাওয়া যায়, তাহলে বিচারের রায় হবে কাযির ব্যক্তিগত গবেষণা অনুযায়ী। খলিফার নিয়োগকৃত বিচারক আলিমদের সাথে পরামর্শের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গবেষণার ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের গড়িমসি করবেন না।
‘একজন বিচারকের মধ্যে ন্যূনতম যে যোগ্যতা থাকা দরকার, ইন-শা-আল্লাহ আমিরুল মুমিনীন সে সম্পর্কে অবগত আছেন। সেটা হচ্ছে আল্লাহর ভয় এবং বিচক্ষণতা। এ দুটির একটিতে ভুল হলে আলিমরা তাকে নির্বাচন করবেন না। বিচারককে পরামর্শ দেওয়া হবে যে, তার চেয়ে উপযুক্ত এবং উত্তম ব্যক্তির পরামর্শ গ্রহণ করার যোগ্যতা রাখতে হবে। এ যোগ্যতাগুলির পাশাপাশি তার মাঝে যদি কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান থাকে, তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
‘এর বাইরে তার মধ্যে ন্যায়বিচার, সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানুষের রুচিবোধ, মন-মানসিকতা এবং জটিল বিষয় বোঝার যোগ্যতা থাকতে হবে। তাকে বুঝতে হবে কিসের জোরে সাধারণত মানুষ অন্যের ওপর জুলুম করে, একে অন্যকে তার দ্বীন এবং দুনিয়ার ক্ষেত্রে হারানোর প্রতিযোগিতায় করে। তবেই তিনি হবেন একেবারে পরিপূর্ণ এবং পূর্ণাঙ্গ বিচারক।
‘সাধারণ মানুষের সাথে যাদের ঘরবাড়ি আছে, তাদের মাঝে সমতা রক্ষা করা দরকার। আমিরুল মুমিনীন ভালো মনে করলে শহরের কিছু সুনাগরিক তাঁর আশপাশে রাখতে পারেন। যারা হবে সুন্নাহর জ্ঞান, তাকওয়া, সততা এবং সত্যবাদিতার গুণে গুণান্বিত। যাদের থাকবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তা। কারণ আমিরুল মুমিনীনের কাছে মানুষ নানাধরনের সমস্যা, বিচার-আচার এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে হাজির হয়ে থাকে।’
বিচারক আল-আম্বারি তার প্রেরিত পুরো পত্রে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাতে আরও লেখা আছে, এই নির্দেশনাটি ১৫৯ হিজরির সফর মাসে লেখা হয়েছিল।
আবু ইউসুফের পত্র
এই পত্রটি একটি মূল্যবান গ্রন্থ। খলিফা হারুনুর রাশিদের উদ্দেশ্যে প্রধান বিচারপতি আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনু ইবরাহীম (১৮২ হি.) লিখেছিলেন। খলিফার কাছে তিনি সম্মানজনক স্থানের অধিকারী ও শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। হারুন তাই আবু ইউসুফের কাছে একটি গ্রন্থ রচনার আবেদন জানালেন। যা-তে ট্যাক্স, কর, ওশর এবং যাকাত সংক্রান্ত মূলনীতির বিবরণ থাকবে। সেমতে ইমাম সাহেব একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে তার নাম আল-খারাজ রাখেন। তাতে তিনি দূরদর্শী অর্থনীতির বিবরণ দিয়েছিলেন। সেখানে আরও ছিল দ্বীনি উপদেশমালা-সহ নানান প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা। এ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এনেছেন। যার কিয়দংশ এখানে তুলে ধরছি।
খলিফার উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহর জন্য। আল্লাহ তো আপনার কাঁধে বিশাল এক দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। যার প্রতিদান যেমন সবচেয়ে বড়, তেমনি যার শাস্তিও সর্বাধিক কঠিন শাস্তি। আল্লাহ আপনার কাঁধে এই উম্মতের নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।
আজকের কাজ যেন আগামীকাল পর্যন্ত বিলম্বিত না হয়। এমনটা করলে আপনার সবকিছু বরবাদ হয়ে যাবে। নির্ধারিত সময় এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা তো এক নয়। অতএব আপনি সময়ের কাজ সময়ের মাঝে করুন। কেননা নির্ধারিত সময়ের পর আর কোনো কাজ করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা আপনাকে যে কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন, তার মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করুন। যদিও তা দিনের সামান্য সময় হয় না কেন। কেননা কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বাধিক সৌভাগ্যবান দায়িত্বশীল সে ব্যক্তিই হবে, যার মাধ্যমে তার জনগণ সৌভাগ্যবান হয়েছে। আপনার যেন কোনো ধরনের বিচ্যুতি না হয়। এমনটা হলে তো আপনার জনগণ বিচ্যুত হয়ে যাবে। প্রবৃত্তির তাড়নায় আপনি কোনো আদেশ করবেন না। উত্তেজিত অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।
‘আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়, দূর সম্পর্কের আত্মীয়, কাছের এবং দূরের সমস্ত মানুষকে আপনি সমান দৃষ্টিতে দেখবেন। আল্লাহর বিধানকে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবেন না।
‘একটি উজ্জ্বল সময়, একটি অনুসৃত পথ, একটি গৃহীত রাস্তা, একটি সংরক্ষিত কাজ এবং সর্বজনস্বীকৃত একটি মতাদর্শের জন্য আপনি কাজ করে যান। কেননা এটাই সত্য আদর্শ। এখানেই সর্বোচ্চ অবস্থান। হৃদয়গুলো যেখানে উড়ে বেড়ায়। দলিল-প্রমাণ যেখানে চূড়ান্ত হয়ে যায়। এমন এক পরাক্রম অধিপতি, যার সর্বোচ্চ ক্ষমতার সামনে সকলেই পরাস্ত। সবার সৃষ্টি যার সামনে অবনত। তাঁর বিচারের অপেক্ষায় আছে সবাই। সবাই তাঁর শাস্তিকে ভয় করে।
‘আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহ তাআলা আপনাকে যে দায়িত্ব সংরক্ষণ করতে দিয়েছেন—তা সংরক্ষণ করতে এবং যে কর্তব্য আপনাকে পালন করতে বলেছেন—তা পালন করার জন্য আপনাকে আমি নসিহত করছি। সর্বক্ষেত্রে আপনার দৃষ্টি যেন কেবল আল্লাহ তাআলার প্রতিই নিবদ্ধ থাকে। আপনার সব কাজ যেন কেবল তাঁর জন্যই করা হয়। রাখালের হাতে নষ্ট হওয়া সম্পদের ক্ষতিপূরণের জিম্মাদারি তার ওপরই আসে। আল্লাহ তাআলা তো নিজ অনুগ্রহে, দয়া করে এবং তাঁর মহানুভবতার কারণেই ক্ষমতাবানদের পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি বানিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আলো দান করেছেন। যার মাধ্যমে তারা জনগণের অন্ধকার দূর করবে। অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া অধিকারগুলো সে আলোর মাধ্যমে স্পষ্ট করতে পারে।
‘ক্ষমতাবানরা আলোকিত করার অর্থ হলো দণ্ডবিধি প্রতিষ্ঠা করা। হকদারদের কাছে তাদের অধিকার দৃঢ়তার সাথে এবং স্পষ্ট প্রমাণের সাথে ফিরিয়ে দেওয়া। নেককার লোকদের মাধ্যমে সূচিত হওয়া মহান কাজগুলো পুনরায় চালু করা। কেননা আদর্শবানদের আদর্শ পুনর্জীবিত করা চিরন্তন কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত। দায়িত্বশীল ব্যক্তির জুলুম করা মানে জনগণের ধ্বংস অনিবার্য। আস্থাহীন এবং মন্দ লোকদের কাছে দায়িত্বশীলদের সাহায্য চাওয়ার অর্থ সাধারণ জনগণকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া।
‘আল্লাহর কাছে সংশোধন অপেক্ষা উত্তম কোনো কাজ নেই এবং ফিতনা- ফাসাদের চেয়ে ঘৃণিত কোনো কাজ নেই। গুনাহে লিপ্ত হওয়া আল্লাহ তাআলার নিয়ামতকে অস্বীকার করার নামান্তর। যারা আল্লাহ তাআলার দেওয়া নিয়ামত অস্বীকার করে কুফরিতে লিপ্ত হয়, এরপর তাওবা করে—এমন লোকের সংখ্যা নিতান্তই কম। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের ইজ্জত ছিনিয়ে নেন এবং তাদের শত্রুকে তাদের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেন।’
তাহির ইবনুল হুসাইনের পত্র
খলিফা মামুন যখন আবদুল্লাহকে খারিজি ইবনু শাবসের সাথে লড়াইয়ের জন্য সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন, তখন আবদুল্লাহর পিতা তাহির ইবনুল হুসাইন নিজের ছেলের উদ্দেশ্যে একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রটি সে যুগে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। লোকেরা তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনায় লিপ্ত হয়। একে কেন্দ্র করে লেখালেখি শুরু করে দেয়। সবাই সেটি পড়তে থাকে। পত্রটির খ্যাতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, তা খলিফার কানেও পৌঁছে যায়।
পত্রটি ছিল দ্বীনি উপদেশমালায় ভরপুর। রাজনৈতিক কৌশল, শিক্ষা-দীক্ষা, আধ্যাত্মিক এবং প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তাতে যুক্ত ছিল। পত্রটির বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হলো:
‘যেসব কাজে মানুষকে নিয়োগ দেবে, যাচাই-বাছাই না করে সেসব কাজের ক্ষেত্রে কাউকে অপবাদ দিতে যেয়ো না। মানুষকে অপবাদ দেওয়া এবং কারও প্রতি খারাপ ধারণা করা একটি গুনাহের কাজ।
‘সহকর্মীদের ব্যাপারে ভালো ধারণা এবং অধীনস্থদের প্রতি দয়া যেন তোমাকে তাবৎ বিষয় অনুসন্ধান করা থেকে বিরত না রাখে। তুমি নিজেই সমস্ত বিষয় তদারকি করবে। অধীনস্থদের প্রতি তোমার যেন সদা সতর্ক দৃষ্টি সতর্ক থাকে। তাবৎ বিষয়ে সংশোধন এবং পরিমার্জনের প্রতি যেন তোমার মনোযোগ থাকে।
‘অপরাধীদের মাঝে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির বিধান প্রয়োগ করবে। এটাকে হালকা মনে করবে না। অপরাধীকে শাস্তি প্রদানে বিলম্ব কোরো না। কেননা এই অবহেলা তোমার প্রতি মানুষের সুধারণা নষ্ট করে দেবে।
‘প্রবৃত্তির নিকৃষ্ট চাহিদা ও অন্যায় থেকে বেঁচে থাকবে। এসব থেকে দৃষ্টিকে সরিয়ে রেখো। এ ব্যাপারে অধীনস্থদের কাছে তোমার পরিচ্ছন্নতা ফুটিয়ে তুলবে। ইনসাফের মাধ্যমে তাদের নেতৃত্ব দাও। তাদের মাঝে হক প্রতিষ্ঠা করো। যে জ্ঞান তোমাকে হিদায়াত অবধি পৌঁছে দেয়, সেই জ্ঞান তাদের মাঝে প্রসার করো।
‘কোনো অপরাধকেই ছোট করে দেখবে না। কোনো হিংসুককে সহযোগিতা করবে না। কোনো পাপাচারীর প্রতি নরম হবে না। কোনো অকৃতজ্ঞের সাথে সম্পর্ক রাখবে না। কোনো শত্রুকে তোষামোদ করবে না। কোনো চোগলখোরকে সত্যবাদী মনে করবে না। আখিরাত তালাশে অবহেলা করবে না। কোনো দিনকে তিরস্কার করে কাটাবে না। জালিমের ভয়ে জুলুম দেখেও না-দেখার ভান করবে না। দুনিয়ায় থেকে আখিরাতের প্রতিদান প্রত্যাশা করবে না।
‘ফকিহদের সাথে বেশি বেশি পরামর্শ করবে। নিজেকে সহনশীলতার সাথে কাজে লাগাবে। অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ, চিন্তাশীল এবং প্রজ্ঞাবানদের পরামর্শ গ্রহণ করবে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট এবং তাদের ব্যারাকগুলোতে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেবে। তাদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা দেবে। তাদেরকে জীবিকা নির্বাহের সুবিধা দেবে।’
এরপর তাহির বিচারব্যবস্থা এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জনগণ যেন যোগ্য নাগরিক হয়ে গড়ে ওঠে। রাস্তাগুলো সব যেন নিরাপদ হয়ে যায়। মজলুম যেন ইনসাফ পায়। মানুষ যেন ফিরে পায় তাদের অধিকার। যেন সুন্দর হয় নাগরিকের জীবন। আল্লাহর আনুগত্যের হক যেন আদায় করা হয়। সত্যের ওপর চলতে সমস্ত মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে। কেননা এটাই তোমার প্রতি তাদের আন্তরিকতা সৃষ্টি করবে। সাধারণ জনগণের সন্তুষ্টিকে তোমার জন্য আবশ্যক করে নেবে।
‘জেনে রাখবে, তোমার কাজের সুবিধার্থে একজন কোষাধক্ষ, একজন রক্ষক এবং একজন দায়িত্বশীলকে নিয়োগ দিয়েছ। তোমার কর্মচারীরা কিন্তু তোমারই অধীন। কারণ তুমিই তাদের পরিচালক। সুতরাং তাদের মধ্য থেকে বিচক্ষণ, অভিজ্ঞতা-সম্পন্ন ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতার অধিকারী ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দিয়ো। তাদেরকে বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা দিয়ো।
‘দিনের কাজ দিনেই করে ফেলবে। আজকের কাজ আগামীকালের জন্য রেখে দিয়ো না। তুমি নিজে সরাসরি থেকে তোমার কাজ পরিচালনা করবে। তোমার কাছের কর্মকর্তা এবং সচিবকে নজরদারিতে রাখবে। তাদের প্রত্যেকের জন্য প্রতিদিন একটা সময় নির্ধারণ করবে। যে-সময় ওরা তোমার সাথে দেখা করবে। তাদের কাজের মধ্য থেকে যেটা সঠিক হবে, তা কার্যকর করবে। কার্যকর করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার কাছে কল্যাণ কামনা করবে। তাদের কাজের মধ্য থেকে যা কার্যকর করার অনুপযুক্ত, তা পুনঃনিরীক্ষণ এবং যাচাইয়ের জন্য স্থগিত রাখবে। জনগণ ও অন্যদের প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ করবে, তার খোঁটা দিয়ো না। তাদের পক্ষ থেকে তুমি শুধু বিশ্বস্ততা, অবিচলতা এবং আমিরুল মুমিনিনের কাজে সহযোগিতা গ্রহণ করবে। হককে যথাযথ স্থানে ব্যবহার করবে।’
টিকাঃ
[৭৩৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৯৭-১০৮; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩০৬
[৭৩৯] আল-খারাজ লিআবি ইউসুফ, পৃ. ৩-৬; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩১৭
[৭৪০] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৫১-১৫৬; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২২৩-২২৮