📄 অঙ্গপ্রতিষ্ঠানসমূহের পরিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা
বিচার বিভাগীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সূচনা নবি-যুগেই হয়েছিল। তবে এই দীর্ঘ সময়ে বিচারব্যবস্থার যে উন্নতি এবং পরিপূর্ণতা লাভ এবং সুসংহত হয়েছিল, সেটা হলো সাধারণ বিচারব্যবস্থা। উমাইয়া যুগে পরিপূর্ণরূপে এবং বিশেষভাবে দুর্নীতির বিচারের সূচনা ঘটে। আব্বাসি যুগে ‘হিসবাহ’ সংক্রান্ত বিচারব্যবস্থা সুসংহত হয়ে উঠেছিল। সরকারি অন্যান্য বিভাগের তুলনায় এই বিভাগটির কিছু বিশেষত্ব ছিল। এখানে স্বতন্ত্র এবং পৃথক কিছু দায়িত্ব থাকত।
তদ্রূপ আব্বাসি যুগেই সামরিক বিচার বিভাগ পূর্ণতা লাভ করে। এর মাধ্যমেই আব্বাসি যুগের বিচার বিভাগের অধীনস্থ তাবৎ প্রতিষ্ঠান পরিপূর্ণ রূপ ধারণ করে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ অবস্থানের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা, নির্ধারিত কাজ এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল। আলিম, ফকিহ এবং বিচারকগণ সব ক’টি প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছু রচনা করেছেন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে স্বতন্ত্রভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে রাখার মতো কিছু গ্রন্থ লিখে গেছেন। এসবের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাজ নির্ধারিত হয়ে থাকত। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে তা পৃথক হয়ে যেত। এগুলো ছিল বিচার বিভাগ, বিচারব্যবস্থাপনা, বিচার-সংক্রান্ত গ্রন্থাদি, বিচারের নীতিমালা, রাষ্ট্রীয় অনুশাসন এবং আইনের অন্তর্ভুক্ত।
টিকাঃ
[৭১৫] আল-মাওয়ারদির আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ-এ বিচার সংক্রান্ত দায়িত্ব, পৃ. ৬৫; অন্যায় দমন সংক্রান্ত দায়িত্ব, পৃ. ৭৭ এবং হিসবাহর বিধান, পৃ. ২৪০ দেখুন। আবু ইয়ালার আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ-এ বিচার সংক্রান্ত দায়িত্ব, পৃ. ৬০; অন্যায় দমন সংক্রান্ত দায়িত্ব, পৃ. ৭৩ এবং হিসবাহর বিধান, পৃ. ২৮৪-ও দেখা যেতে পারে।
📄 পরিধি নির্দিষ্টকরণ
আব্বাসি যুগে বিচারব্যবস্থার পরিধি নির্দিষ্ট ছিল। আলিমগণ মূলত সাধারণ বিচারব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অন্যায় সংক্রান্ত বিচার, জনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিচার এবং সামরিক বিচার সংক্রান্ত পরিধি নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে থাকেন। কিন্তু এসব পরিধি চূড়ান্ত বা স্থায়ী ছিল না। বরং সময়ভেদে এসব পরিধি একটি অপরটির সাথে মিলে যেত। কখনো-বা পরিস্থিতি কিংবা বিচারকের ব্যক্তিত্ব অনুপাতে, খলিফা, প্রশাসক বা প্রধান বিচারপতির সীমা অনুসারে এটি বিস্তৃত হতো। আবার একজন বিচারককে অন্য বিচারকের অধীনস্থ বিষয়ের মাঝে দিতেও দেখা গেছে। সাধারণ বিচার বিভাগ কিংবা জনশৃঙ্খলা অধিদপ্তরের পরিধিতে পড়ে—এমন কিছু দায়িত্ব পুলিশকে অর্পণ করা হতো। কখনো ঘটত এর উলটোটাও। যেমন, কিছু প্রশাসনিক এবং আধা বিচারিক বিভিন্ন ধরনের দায়িত্ব বিচারকের কাছে অর্পণ করা হতো।
আমরা এখানে কেবল সাধারণ বিচারব্যবস্থার পরিধি সংক্রান্ত আলোচনা করব। নিপুণ এবং পূর্ণাঙ্গ বিচারব্যবস্থা ছিল আব্বাসি যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর একটি অংশ ছিল সময়সীমা। অর্থাৎ বিচারক কোন দিনগুলোতে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন এবং কোন দিনগুলোতে ছুটিতে থাকবেন, আব্বাসি যুগে সেটা নির্ধারিত থাকত। যেমন, ঈদের দিন এবং সরকারি ছুটির দিনগুলোতে বিচারকার্য চলত না। আবার দৈনিক কতটুকু সময় বিচারকার্য চলবে, সেটাও নির্ধারিত ছিল। বর্তমানে তা ‘কর্মঘণ্টা’ হিসেবে পরিচিত।
তদ্রূপ স্থানগত পরিধিও ছিল নির্দিষ্ট। প্রথম আব্বাসি যুগে পুরো প্রশাসনিক কাজের জন্য বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো। পরবর্তী জামানার আব্বাসি বিচারকরা নিজ নিজ মাযহাবের প্রতিনিধিত্ব করতেন। বিচারকের পরিধি নির্দিষ্ট শহরে বা শহরের প্রান্তে সীমাবদ্ধ থাকত। যেমন: বাগদাদের পূর্ব প্রান্তের বিচারক এবং পশ্চিম প্রান্তের বিচারক, দামিস্কের বিচারক এবং কায়রোর বিচারক, মিশরের নিম্ন ভূমি এবং উচ্চ ভূমির বিচারক ইত্যাদি।
বিচারকগণ সাধারণত মসজিদেই বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। কিন্তু একসময় খলিফা আল-মুতাদিদ মসজিদে বিচারকার্য পরিচালনা করতে নিষেধ করেন। বিচারক কখনো মসজিদের ভেতরে বসতেন, আবার কখনো মসজিদের সামনে। অনেক সময় নিজের বাড়িতে বা রাস্তাতেই বিচার করতেন। একপর্যায়ে বিচারের আদালত মসজিদের সাথেই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। আবার কখনো শহরের মাঝে প্রশস্ত কোনো জায়গা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো। যাতে বিচারপ্রত্যাশী লোকেরা সেখানে সহজে বসতে পারে। তাহলে বাদী-বিবাদীর কষ্ট করে বসে থাকতে বা অপেক্ষা করতে হবে না।
আব্বাসি যুগে বিচারকের ক্ষমতা ছিল বিস্তৃত। আর্থিক, দেওয়ানি, ফৌজদারি এবং সমস্ত মামলার ক্ষেত্রে সাধারণত বিচারকই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। অনেক সময় তাকে পুলিশি ক্ষমতা, দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব, কিসাস বা বদলা গ্রহণ, জনশৃঙ্খলা, টাকশাল এবং কোষাগারের দায়িত্বও প্রদান করা হতো।
তৎকালীন সাধারণ বিচারব্যবস্থার ধরণ কেমন ছিল, আল-মাওয়ারদি তার বিবরণ দিয়েছেন। যা থেকে বোঝা যায়, সে যুগে সাধারণ বিচারব্যবস্থা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল।
দেওয়ানি বিচার বিভাগ
আল-মাওয়ারদির বর্ণনা অনুসারে, বিচারকের ক্ষমতা সাধারণ হলে এই বিভাগের পরিধি থাকত দশটি। সেগুলো হচ্ছে: (১) বিরোধ-মীমাংসা এবং অধিকার আদায়, (২) অভিভাবকহীন লোকদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ, (৩) ওয়াক্ফ সম্পত্তি দেখাশোনা করা, (৪) ওসিয়ত বাস্তবায়ন, (৫) বিধবাদের বিয়ের ব্যবস্থা, (৬) অপরাধীদের দণ্ড কার্যকর, (৭) জনস্বার্থের প্রতি লক্ষ রাখা, (৮) রাস্তাঘাটে অন্যায় প্রতিহত করা, (৯) সাক্ষী এবং আমানতদারদের তদারকি এবং (১০) প্রতিনিধি নির্বাচন করা এবং জনগণের মাঝে মীমাংসা করার ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা। নিয়োগের প্রজ্ঞাপন অনুসারে কখনো কখনো একটা ক্ষেত্রের মধ্যেই বিচারকের ক্ষমতা নির্ধারিত থাকত।
ফৌজদারি বিচার বিভাগ
এটা ছিল অপরাধ, অন্যায় এবং বিবেচনামূলক শাস্তির সাথে সম্পৃক্ত। তবে এটা সাধারণ দেওয়ানি বিচারকের আওতায় পড়ত না। কারণ আল-মাওয়ারদি তার পরিধি-সংক্রান্ত আলোচনায় এটা উল্লেখ করেননি। বরং স্বতন্ত্রভাবে ‘অপরাধের বিধিবিধান’ শিরোনামের অধীনে অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। এ থেকে বুঝে আসে, একজন স্পেশাল কাযি এ দায়িত্ব পালন করবেন। এ বিষয়ের তত্ত্বাবধান ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ বিশেষভাবে নিযুক্ত সেই কাযির ওপর বর্তায়। বিশেষত অপবাদ আরোপ সংক্রান্ত বিষয়াদি যাচাই-বাছাই করা এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক দণ্ডবিধি আরোপ করা তার দায়িত্ব। এখানে অপরাধ, মুক্তিপণ ও বিশেষ বিবেচনাধীন শাস্তির কথা আল-মাওয়ারদি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
আব্বাসি খিলাফতের পরবর্তী সময়গুলোতে বিচারকের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে যায়। খিলাফতের দুর্বলতা, একাধিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে বিচারকের কর্তৃত্ব সীমিত হয়ে পড়ে। কিছু কিছু বিচারকের কাজ হয়ে যায় কেবল অর্থনৈতিক বিবাদের মীমাংসা এবং ব্যক্তিগত বিষয়ের তত্ত্বাবধান করা।
আব্বাসি যুগে কোনো কোনো বিচারকের পরিধি ছিল নিতান্তই সীমিত। ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বসরার আমিরগণ জামে মসজিদে বিচারক নিয়োগ করতেন। এদেরকে বলা হতো ‘মসজিদের কাযি’। তাদের বিচারের বিষয়গুলো ২০০ দিরহাম বা ২০ দিনারের চেয়ে কম হতো। তিনি নাফাকাহ বা খরচের হুকুম দিতেন। নিজের পদ কিংবা নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে কোনো বিচারকার্য তিনি পরিচালনা করতেন না। তাদের অবস্থা ছিল বর্তমান যুগের সালিশি বৈঠকের মতো।
ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, ইয়াহইয়া ইবনু আকসাম বসরায় এসে আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু আসাদ আল-কিলবিকে মসজিদের বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ দেন। তখন তিনি কিছু ঋণের ব্যাপারে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। স্বামীকে তার স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব আবশ্যক করে দেওয়া-সহ ছোটখাটো বিষয়ের সুরাহা করতেন। তারপর ইয়াহইয়া তাকে চিঠি পাঠিয়ে বললেন, ‘২০ দিরহামের বেশি হয়—এমন কোনো অর্থদণ্ডের বিচার করা থেকে আপনি বিরত থাকবেন।
টিকাঃ
[৭১৬] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৫
[৭১৭] আন-নুযুমুল কাদ্ধাইয়্যাহ, পৃ. ৬৫; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৯৭
[৭১৮] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭০
[৭১৯] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ২২১-২৪১
[৭২০] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৬
[৭২১] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৩; আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ৫৯
[৭২২] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/১৬১
📄 বিচারকদের অন্যান্য দায়িত্ব
বিচারকরা সাধারণত খলিফা, প্রশাসক এবং প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে নিযুক্ত হতেন। সে কারণে তারা ছিলেন জনগণের আস্থার জায়গা। অধিকাংশ সময় এমন সব জটিল এবং নাজুক কাজের ভার তাদের দেওয়া হতো, যা কেবলই বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ লোকদেরই অর্পণ করা যায়।
উমাইয়া যুগের আলোচনাতে আমরা বিচারকদের আধা-বিচারিক বা বিচারবহির্ভূত অনেক কাজ পরিচালনা করতে দেখেছি। যেমন ইয়াতিমদের সম্পত্তি দেখাশোনা, ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধান, ফতোয়া প্রদান ইত্যাদি। এ ধরনের কাজ সাধারণত বিচারকের হাতেই থাকত।
উমাইয়া যুগে বিচারকরা আরও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। যেমন পুলিশের আইজি, রাষ্ট্রীয় কোষাগার, প্রশাসনিক দপ্তর এবং প্রশাসকের প্রতিনিধি ইত্যাদি। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অস্থিরতা এবং বিভাজনের কারণে আব্বাসি যুগের বিচারকরা তুলনামূলক কম হলেও এ জাতীয় অনেক দায়িত্বই পালন করেছেন। আব্বাসি যুগে বিচারকরা নতুন যেসব দায়িত্ব পালন করেছেন, সেসব নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করব।
১. রমজান এবং অন্যান্য মাসের চাঁদ দেখা
কারণ শরীয়তের অনেক বিধিবিধান চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। মাসের শুরুতে নানাধরনের কর পরিশোধ, প্রতিশ্রুতি পূরণ, মানত আদায় এবং ইবাদত পালিত হয়ে থাকে। তাই বিচারকরা এই দ্বীনি দায়িত্ব আবশ্যকীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কারণ এ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ঘটে এবং মতবিরোধের সৃষ্টি হয়ে থাকে। আল-কিন্দি বর্ণনা করেছেন, ‘ইবনু লাহিআহ যখন বিচারের দায়িত্বে ছিলেন (১৫৫-১৬৪ হি.), তখনকার কথা। একবার লোকেরা রমজান মাসের চাঁদ দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু কেউই চাঁদ দেখতে পেল না। এমতাবস্থায় দুজন লোক এসে দাবি করল, তারা চাঁদ দেখেছে। প্রশাসক মূসা ইবনু আলি তখন ইবনু লাহিআহর কাছে পাঠিয়ে তাদের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। কিন্তু তাদের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কিছু জানা গেল না। এদিকে লোকেরা নিজেদের মাঝে মতানৈক্য হওয়ার অভিযোগ করল। পরের বছর আবদুল্লাহ ইবনু লাহিআহ সৎ এবং বিশ্বস্ত একদল মুসল্লি নিয়ে নিজেই বের হয়ে গেলেন। তারা নীলনদের পশ্চিম তীরে গিজায় গিয়ে চাঁদ অনুসন্ধান করলেন। ইবনু লাহিআহই প্রথম বিচারক, যিনি রমজানের চাঁদ দেখার জন্য স্বশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। তার পর থেকে চাঁদ দেখার বিষয়টি বিচারকরা এভাবেই পালন করে আসতেন।
বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম দেশে রমজানের চাঁদ দেখার বিষয়টি আজও বিচার বিভাগের অধীনে রয়েছে।
২. অনুপস্থিত ব্যক্তিদের তহবিল পরিচালনা
কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির যদি অনেক সম্পদ থাকে, কিন্তু তার কোনো ম্যানেজার না থাকে, আর সাধারণ লোকেরাও উক্ত সম্পদ রক্ষা করতে অপারগ হয়—তখন বিচারকের কাছে সেসব হস্তান্তর করা হলে তিনি তাতে নিখোঁজ ব্যক্তিটির নাম লিখে এবং চিহ্ন দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সংরক্ষণ করে রাখতেন। কিংবা মালিক উপস্থিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির জিম্মায় দিয়ে দিতেন। এ দায়িত্ব আজও বিচারকের অধীনে রয়েছে।
৩. প্রকাশনা বিভাগের তত্ত্বাবধান
রফউল ইসর গ্রন্থ থেকে আল-কিনদির বর্ণনায় এসেছে, ‘গভর্নর তার প্রকাশনা বিভাগের দায়িত্ব বিচারক আবদুল আজিজ ইবনু মুহাম্মাদকে দিয়েছিলেন। গভর্নর নিজেই ছিলেন উক্ত প্রকাশনা দপ্তরটির প্রতিষ্ঠাতা। এ ক্ষেত্রে তিনি নিপুণতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থে সমৃদ্ধ একটি বিভাগ। ফকিহদের জন্য তাতে বসা এবং নিজের অভিরুচি অনুযায়ী তা থেকে উপকৃত হওয়ার অবারিত সুযোগ ছিল। গভর্নরের দৃষ্টিতে বিচারকই ছিলেন এই দপ্তর দেখাশোনা এবং পরিচালনার অধিক যোগ্য ব্যক্তি। অনেক দেশেই প্রকাশনা বিভাগের দায়িত্ব এভাবে পরিচালিত হতো।
৪. অন্যান্য
এমন আরও কিছু বিচারকার্য বহির্ভূত দায়িত্ব ছিল, যেগুলো শুধু বিচারকরাই পালন করতেন। যার কারণে মানুষের মধ্যে এবং সমাজের মাঝে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বিচারকগণ সম্মানজনক অবস্থান এবং শ্রদ্ধাভক্তি লাভ করতেন।
এ ব্যাপারে আল-কিন্দি বর্ণনা করেন, বিচারক হারিস ইবনু মিসকিন (২৩৭-২৪৫ হি.)-কে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। হারিস ছিলেন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তাকে হুইল চেয়ারে করে জামে মসজিদে নিয়ে যাওয়া হতো। তিনি অনেক কাজ করেছিলেন। আমরা সেগুলোর মধ্য থেকে মাত্র কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি: হানাফি এবং শাফিয়ি সমর্থকদের মসজিদ থেকে বের করে দেওয়া। কারণ আলোচনা-পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তারা বিতর্কের রীতি মেনে চলত না। মসজিদে নামাজ আদায়কারীদের পরিবেশ তারা ঘোলাটে করে ফেলেছিল। তাদেরকে মসজিদে সমবেত হতে নিষেধ করে সাধারণ মুয়াযযিনদের আযান দিতে বারণ করেন। রমজান মাসে কুরাইশ এবং আনসারিগণ তাদেরকে খাবার দিত। সে ব্যাপারেও তিনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
জামে মসজিদ নির্মাণ এবং আলেকজান্দ্রিয়াতে খাল খননের আদেশ করেছিলেন। শিকারের জন্য ফাঁদ পাততে নিষেধ করলেও পরবর্তীকালে অনুমতি দিয়েছিলেন।
জানাযার ঘোষণা দিতে নিষেধ করতেন। জানাযার ঘোষণা দেওয়া ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মসজিদে মাহমুদ-সহ অন্যান্য মসজিদে যারা গানের সুরে তিলাওয়াত করত, তাদের বাধা দিতেন।
জামে মসজিদে কুরআন শিক্ষা সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পাশাপাশি তার পক্ষ থেকে একজনকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বিচারকদের মাঝে তিনিই সর্বপ্রথম এই কাজ করেছিলেন।
তিনি প্রশাসকদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং সালাম বিনিময় করতেন না।
রফউল ইসর সূত্রে আল-কিনদির বর্ণনায় আরও এসেছে, বিচারক মালিক ইবনু সাঈদ আল-ফারুকি ৩৯৮ হিজরিতে মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। সে-সময় তিনি অনেক কাজ করেছিলেন:
মক্কা-মদীনার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ফাতিমি প্রশাসকের কাছে আসলে তাদের সাথে কথা বলা, তাদের সার্বিক বিষয় দেখভাল করা এবং প্রশাসকের কাছে তাদের পক্ষ থেকে দূতিয়ালি করেছেন। এমনকি প্রশাসক তার হাতেই আগত মেহমানদের উপঢৌকন দিয়েছেন। তারপর থেকে প্রশাসকের কাছে বিচারকের মর্যাদা বেড়ে যায়। তার কাছে বিচারকের অবস্থান হয়ে যায় আগের থেকেও সুদৃঢ়।
উপহার-উপঢৌকন, জায়গা-জমি এবং জায়গিরের দলিল-দস্তাবেজের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। তিনি নিজেই এসব দায়িত্ব পালন করতেন।
অন্যান্য শহরের গভর্নরদের পক্ষ থেকে লিখিত চুক্তিপত্রের প্রতিও তার নজর থাকত। বিভিন্ন কর্মীদের সাথে প্রশাসকের পত্র মারফত যোগাযোগ তার মাধ্যমেই হতো। যাবতীয় দায়িত্বের ক্ষেত্রে তিনিই প্রশাসকের মুখোমুখি হতেন এবং সবার পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন।
এখানে আরও অনেক বিষয় এবং কর্মপরিধি আছে, যেগুলো যাফির আল-কাসিমি উল্লেখ করেছেন। আমরা এখানে শুধু সেগুলোর শিরোনাম উল্লেখ করেই ক্ষান্ত থাকব—অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব গ্রহণ; ঋণে জর্জরিত ব্যক্তির বাড়ি খিলাফতের কাছে বিক্রি করা; নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পদ পরিচালনা; শারঈ বিধানাবলি নিয়ে পুলিশকে কথা বলার অধিকার না দেয়া, যাতে সাধারণ মানুষ পুলিশের কথাকে শরীয়ত মনে না করে বসে; বিভিন্ন বিভাগে পরিচালক নিয়োগ; মালিকানা-বিহীন সম্পদের তত্ত্বাবধান; অশ্বারোহী এবং যোদ্ধাদের আদমশুমারি; জামে মসজিদগুলো পরিচালনা এবং সেখান থেকে বিদআত নির্মূল করা।
মুসেলের বিচারক কামালুদ্দিন আশ-শাহরাজুরির (৫৭২ হি.) অনেকগুলো কর্মপরিধি ছিল। সেগুলো হচ্ছে—জামে মসজিদ দেখাশোনা; টাকশাল পরিচালনা; নগরীর প্রাচীর নির্মাণ; জনস্বার্থ তত্ত্বাবধান; মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ। আরও ছিল—জুয়ার সরঞ্জামাদি ধ্বংস করা; যুদ্ধবন্দিদের দেখাশোনা; নৈশ আড্ডা বাতিল করা; বিচারব্যবস্থা এবং খানকার প্রবীণ সুফিদের মাঝে সমন্বয় সাধন; দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ; ওজন এবং পরিমাপ নিয়ন্ত্রণ; মহিলাদেরকে হট্টগোল করা থেকে নিবৃত্ত করা; খিলাফতের দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় এবং খলিফার কাছে প্রেরিত অর্থ হস্তান্তর করার সময় মহিলাদের উপস্থিত হওয়া থেকে বাধা প্রদান; রাতের বেলা ছদ্মবেশে সাক্ষীদের যাচাই-বাছাই করতে বাধা দেওয়া; রাষ্ট্রীয় কোষাগারের চাবি বুঝে নেওয়া; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগত কালেকশনের অর্থ ছাত্রদের জন্য ব্যয় করা; মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা; যথাসময়ে দোকানপাট বন্ধ করা এবং বন্যার সময় নীলনদের পানির উচ্চতা পরিমাপ করার জন্য দায়িত্বশীল নির্বাচন করা।
টিকাঃ
[৭২৩] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্দাহ, পৃ. ৩৭০
[৭২৪] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৮২
[৭২৫] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৮৩; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৬০০
[৭২৬] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৪৬৭-৪৬৯
[৭২৭] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৬০৫-৬০৬
[৭২৮] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৪৭
[৭২৯] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৮০-২৯৩
📄 আব্বাসি যুগে বিচারব্যবস্থার অধঃপতন
আব্বাসি যুগের প্রথম অংশ ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগের প্রতিনিধিত্ব করত। আব্বাসি খিলাফত উন্নতির শীর্ষে পৌঁছার পর শুরু হয় পতনের ধারা। রাষ্ট্র এবং সমাজের অভ্যন্তরে অস্থিরতা আর গণ্ডগোল দানা বাঁধতে থাকে। ধীরে ধীরে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে থাকে মুসলিম দেশগুলো। আব্বাসি খিলাফতের দ্বিতীয় ধাপে নাগরিক, সামরিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে জুলুম-নির্যাতন ছড়িয়ে পড়ে। যার প্রভাব পড়তে থাকে বিচারব্যবস্থার মাঝেও। এই অঙ্গনে কিছু অসৎ বিচারকের দেখা মিলে, যারা বিচারব্যবস্থার এক কালো অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করছিল।
আব্বাসি খিলাফত ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং চারিত্রিক অধঃপতনের শিকার হতে লাগল। এর প্রভাব পড়ছিল বিচারব্যবস্থা এবং বিচারকদের ওপর। আগেকার ন্যায়পরায়ণ কাযিদের আলোকজ্জ্বল চিত্রের পাশে যুক্ত হলো দুরাচার জালিম কিছু বিচারকের কালো অধ্যায়। যাদের মধ্যে ছিল না পূর্বসূরিদের মতো বিনম্রতা, আধ্যাত্মিকতা এবং সমীহবোধ। তাদের অবস্থা ছিল আগেকার যুগের অসৎ বিচারকের মতো।
সরকারি চাকরি এবং দায়িত্বগুলো বেচাকেনার পণ্য হয়ে যাওয়া ছিল বিচারব্যবস্থার অন্ধকার ট্রাজেডির অন্যতম অংশ। বিচারকের পদ-প্রত্যাশী ব্যক্তিকে বিশাল পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হতো। নিয়োগদাতাকে বার্ষিক প্রতিশ্রুত অর্থ (ঘুস) পরিশোধ করার শর্তে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছিল।
ফকিহ এবং আলিমগণ এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা প্রদান করেছিলেন। তারা এটাকে সুস্পষ্ট ঘুস হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আল-মাওয়ারদি লিখেছেন, ‘বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব লাভের উদ্দেশ্যে বিনিময় প্রদান করা নিষিদ্ধ। কেননা এটা স্পষ্টতই ঘুস। এটা নির্ঘাত হারাম। এর দাতা এবং গ্রহীতা—উভয়েই সমান অপরাধী।’
খলিফা আল-মুতি লিল্লাহর (৩৩৪-৩৬৩ হি.) সময়কাল সম্পর্কে আবুল কাসিম আস-সামনানি বলেন, ‘ইবনু আবিশ শাওয়ারিব ১১২০ দিরহামের বিনিময়ে কাযির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। শরীয়ত বেকার সাব্যস্ত হয়ে পরিস্থিতি আগাগোড়াই পালটে যায়। এরপর খলিফা আল-কাদির বিল্লাহর (৩৮১-৪২২ হি.) সময় ৪০৫ হিজরিতে ইবনু আবিশ শাওয়ারিব প্রধান বিচারপতি হয়ে যান।’
প্রথম আব্বাসি যুগ থেকেই বিচারের রায়ের ক্ষেত্রে বিরোধ ছড়িয়ে পড়েছিল। ইজতিহাদগত তফাতের কারণে বিচারকদের মাঝে একই বিষয়ে সাংঘর্ষিক বিচার দেখা দিয়েছিল। তখন ফিকহি মাযহাবের আবির্ভাব ঘটে। বিচারের ক্ষেত্রে মাযহাবের গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী রায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর থেকে তলে তলে বিরোধ দানা বাঁধতে শুরু করে। ক্রমেই বিষয়টি ব্যাপক হয়ে যায়। ফলে অনেক সময় বিচারকের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। তার কর্মপরিধি সংকুচিত হয়ে যায়। এ কারণেই বিচার বিভাগ সংস্কারের আওয়াজ ওঠে। বিচার বিভাগের তাবৎ বিষয় ঢেলে সাজানোর ডাক আসতে থাকে।
টিকাঃ
[৭৩০] যুহরুল ইসলাম: ২/২৫১
[৭৩১] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়য়াহ, পৃ. ৬৫
[৭০২] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৫
[৭৩০] রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৫১৫, ৪/১৫১৬; কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৩২, ৩৩