📄 বিচারকার্য এবং মোকদ্দমার পদ্ধতি
আব্বাসি যুগে নতুন চালু হওয়া বিচারকার্য এবং মোকদ্দমা সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব। এর মাধ্যমেই তৎকালীন বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কথা শেষ হবে।
ক. মোকদ্দমা এবং বাদী-বিবাদীর ধারাবাহিকতা
বিরোধকারীরা একটি কাগজে বাদী এবং বিবাদীর নাম আদালতের উদ্দেশ্যে লিখে জমা দিত মুনশির কাছে। মুনশি তখন উপস্থিত ব্যক্তিদের ধারাক্রম অনুসারে নামগুলো সাজিয়ে নিত। এরপর বিচারক আগমন করলে তার কাছে সেগুলো পেশ করত। তারপর ধারাবাহিকভাবে বাদী-বিবাদীকে ডাকা এবং মীমাংসা করার কাজ চলতে থাকত। এ ক্ষেত্রে পদমর্যাদা বা সামাজিক অবস্থানের কারণে কিংবা বিত্তশালী হওয়ায় কাউকে আগে সুযোগ দেওয়ার প্রচলন ছিল না। তবে দূর থেকে আগত ব্যক্তিদের আগে সুযোগ দেওয়া হতো। যাতে তার ফিরে যেতে অসুবিধা না হয়। এভাবেই সমস্ত স্লিপ শেষ হওয়া অবধি আদালতের কার্যক্রম চলত। কোনো দিন সময় সংক্ষিপ্ত হলে অবশিষ্ট কার্যক্রম পরদিন শেষ করা হতো।
খ. সাক্ষী যাচাই
জীবনের ব্যাপ্তির সাথে বিচারব্যবস্থার কর্মপরিধি ক্রমান্বয়ে বড় হয়ে চলছিল। সময়ের সঙ্গে মিথ্যা সাক্ষ্যরও প্রচলন ঘটে। তাই বিচারকরা সাক্ষীকে যাচাই করে নিতে শুরু করেন। সাক্ষীর ন্যায়পরায়ণতা ও তার সম্পর্কে আপত্তিজনক কিছু না জানা গেলেই কেবল তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হতো। সাক্ষীর অবস্থা অজানা থাকলে তার সাক্ষ্য বিচারক গ্রহণ করতেন না। সাক্ষী অজ্ঞাত হলে তার পড়শি কিংবা পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে তার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হতো। আব্বাসি যুগে এভাবেই সাক্ষীদের যাচাইকরণ পদ্ধতি চালু হয়। পাশাপাশি তৈরি হয় তদন্ত কর্মকর্তাদের একটি টিম। সহকারী বিচারক সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা এর উল্লেখ করেছি।
খলিফা মানসুরের সময় মিশরে গাউস ইবনু সুলাইমান সর্বপ্রথম সাক্ষীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। এর আগে মানুষ যাকে ভালো বলে জানতেন, তার সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। যার সম্পর্কে জানা থাকত না, বাহ্যিক অবস্থার বিচারে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন না। একসময় মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া শুরু হয়। গাউসের সময় তা ব্যাপক হয়ে যাওয়ায় তিনি সাক্ষীদের সম্পর্কে গোপনে খোঁজ নিতে শুরু করেন। বিষয়টি তখন এভাবেই চলছিল।
বিচারক আল-মুফাদদাল ইবনু ফাদ্বালাহ ১৭৪ হিজরিতে মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সাক্ষীদের যাচাই করার জন্য এক ব্যক্তিকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন।
মুহাম্মাদ ইবনু মাসরুক ১৯৭ হিজরিতে খলিফা হারুনুর রাশিদের পক্ষ থেকে মিশরে বিচারক নিযুক্ত হয়ে আসেন। এ কাজের জন্য একটি টিমকে তিনি অফিসিয়ালি নিযুক্ত করে সাধারণ মানুষকে তা জানিয়ে দেন। এরপর ১৮৫ হিজরিতে মিশরে খলিফা হারুনুর রাশিদের পক্ষ থেকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবদুর রহমান ইবনু আবদিল্লাহ আল-উমরি। সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনিও মাসরুকের অনুসরণ করেন। তবে তিনি এর পাশাপাশি সাক্ষীদের নাম লিখে রাখতে শুরু করেন। তিনিই ছিলেন সর্বপ্রথম নথিভুক্তকারী। পরবর্তী বিচারকরাও তাকে অনুসরণ করতে থাকেন।
শাইখ মুহাম্মাদ আল-খিদ্বরি বর্ণনা করেছেন, ৬৩৫ হিজরিতে শামসুদ্দিন আহমাদ আল-জুনি দামিস্কের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনিই শহরের মাঝে সর্বপ্রথম সাক্ষীদের জন্য অফিস চালু করেন। এর আগে সাক্ষী নির্ধারণের জন্য ন্যায়পরায়ণ লোকদের ঘরে যাওয়ার প্রচলন ছিল।
গ. রায় সংরক্ষণ এবং নথিভুক্তকরণ
উমাইয়া যুগেও বিচারের রায় নথিভুক্ত করে রাখার প্রচলন ছিল। তবে সেটা ছিল সীমিত পর্যায়ে এবং স্বল্প পরিসরে। আব্বাসি যুগের বিচারকগণ সাধারণ মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এবং বিধানের স্থিতির জন্য বিচারের রায় সংকলন এবং নথিভুক্ত করার প্রচলন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় আল-মুফাদদাল ইবনু ফাদ্বালাহ (১৬৮-১৬৯ হিজরি) ওসিয়ত এবং ঋণ সংক্রান্ত ফয়সালা সংরক্ষণ করতে থাকেন। বিচারকদের মাঝে তার নথিই সর্বপ্রথম দীর্ঘ হয়েছিল। যা-তে তিনি রায়গুলো কপি করে রেখেছিলেন। তার আগে কেউ এমনটা করেনি।
১৯৮ হিজরিতে লাহিআহ ইবনু ঈসা আল-হাদরামি মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর ওয়াকফ সম্পত্তি সুবিন্যস্ত করে তার হিসাব নথিভুক্ত করেন। এরপর মিশরে থাকা উপযুক্ত ব্যক্তিদের মাঝে তা বিতরণ করে তাদের জন্য ভাতা চালু করে দেন। তিনি ছিলেন এই পদ্ধতির সর্বপ্রথম প্রবর্তক। তার পর থেকে এই পদ্ধতি চালু হয়ে যায়, যা মানুষের মাঝে ‘লাহিআহর পদ্ধতি’ বলে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে সেটাকে ‘বিচারকের পদ্ধতি’ বলে নামকরণ করা হয়।
এভাবেই আলিমদের মাঝে নথিভুক্তকরণের প্রচলন ঘটে। যা-তে পর্যায়ক্রমে ভিন্নতা আসে এবং ধীরে ধীরে মানুষ তার ওপর নির্ভরশীল হতে থাকে।
ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, ‘মিশরের বিচারকদের মাঝে ফাদল ইবনু ফাদ্বালাহ-ই সর্বপ্রথম নথিপত্রের বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত গুণী মানুষ এবং সজ্জন ব্যক্তি। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন বিদ্বান।
ঘ. বিচারের দফতর
আব্বাসি যুগেই সর্বপ্রথম বিচারের দফতর প্রতিষ্ঠিত হয়। বিচারকার্য পরিচালনা সংক্রান্ত নথি এবং দলিল-দস্তাবেজের নানান কপি সেখানে সংরক্ষণ করা হতো। এই দফতরে মুনশি, রক্ষী এবং বিচারকের সহায়কের মতো বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী চাকরি করতেন। এর সদর দফতর ছিল বাগদাদে। খলিফা আর-রাশিদের যুগে জাফর আল-বারমাকি এই দফতরের প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন। এরপর পর্যায়ক্রমে তা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
ঙ. বিচারকের কোষাগার
আব্বাসি যুগে বিশেষ এলাকা বা জায়গাকে নির্দিষ্ট করে বিচারকের কোষাগার নামকরণ করা হয়। বিচারক সেখানে তার দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং তত্ত্বাবধান করতেন। এই জায়গা থেকে প্রাপ্ত সুবিধাগুলো যথাস্থানে ব্যয় করা এবং ওসিয়ত বাস্তবায়নের জন্য ওসিয়তকৃত সম্পত্তির দেখাশোনা করা ছিল বিচারকের দায়িত্ব। ইয়াতিম, পাগল, দেউলিয়া এবং নির্বোধের সম্পদের তত্ত্বাবধান, বিতর্কিত উত্তরাধিকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, মালিকের খোঁজ পাওয়া অবধি কুড়িয়ে পাওয়া সম্পত্তির হেফাজত করা এবং ভিনদেশি ব্যক্তি মারা গেলে তার ওয়ারিশ আসার আগ পর্যন্ত তার সম্পত্তি দেখাশোনা করা প্রভৃতির জিম্মাদারিও বিচারককেই পালন করতে হতো। ফলে বিচারকের কাছে আমানতের অনেক সম্পত্তি জমা হয়ে যেত। সেগুলো তিনি এই কোষাগারে জমা করে রাখতেন।
আগে বিচারকরা এসব সম্পত্তি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের জিম্মায় রাখতেন। কিন্তু তাতে বড়সড় গরমিল পরিলক্ষিত হতে থাকে। বিচারক খায়র ইবনু নুআইম যখন দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন আমিরুল মুমিনীন আবু জাফরের নির্দেশে প্রথমবারের মতো ইয়াতিমের সম্পদ কোষাগারে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। কোষাগারে যা রাখা হতো এবং সেখান থেকে যা নেওয়া হতো—সবকিছুই লিখে রাখার প্রচলন ছিল।
বিচারকরা নিজেদের সম্পত্তির তুলনায় এসব সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের প্রতি অধিক যত্নবান ছিলেন। এ ব্যাপারে তারা কোনো ব্যক্তিবিশেষের পরোয়া করতেন না। এমনকি এসব সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের খাতিরে প্রয়োজনবোধে শাসককে উপেক্ষা করার মতো মানসিক প্রস্তুতিও তাদের থাকত। অবশ্য কেউ কেউ যে এসব সম্পত্তির ব্যাপারে লালায়িত ছিল না—এমনটা বলা যায় না। আল-কিন্দি লিখেছেন, ‘বিচারকের কোষাগার থেকে ইবরাহীম ইবনু আবি আইয়ুব ত্রিশ হাজার দিনার চুরি করেছিল। এর বাইরে অনেক অসৎ বিচারকেরও এ ব্যাপারে লালায়িত হওয়ার কথা জানা যায়। রফউল ইসর গ্রন্থে আছে, ‘ইবরাহীম ইবনু মাহমুদের কার্যক্রম প্রশংসনীয় ছিল না। তিনি বিচারের রায় দিতেন, আবার তার জিম্মায় থাকা সম্পত্তিও আত্মসাৎ করতেন।
চ. বিচারকের সিন্দুক
বিচারকরা যাতে কোষাগারের সম্পদ রক্ষা করতে পারেন সেজন্য সিন্দুকের ব্যবস্থা করা হয়। সম্পত্তি সিন্দুকে ভরে সংরক্ষণ করা হতো। আবদুর রহমান ইবনু আবদিল্লাহ আল-উমারি ছিলেন আমানতদার বিচারক। কোষাগারে সিন্দুক রাখার পদ্ধতি তিনিই প্রথম চালু করেছিলেন। আল-কিন্দি লিখেছেন, বিচারক মুহাম্মাদ ইবনু আবিল লাইস কোষাগারের সিন্দুকের দায়িত্ব হারুন ইবনু আবদিল্লাহকে দিয়েছিলেন। হারুন একবার অবিশ্বস্ত লোকের হাতে সিন্দুকের চাবি দেওয়ায় কোষাগারের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়। বিচারক তখন ইবনু আবদিল্লাহকে ডেকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং শাস্তি দেন।
টিকাঃ
[৬৮৩] আন-নুযুমুল কাদ্ধাইয়্যাহ, পৃ. ৬৯; যুহরুল ইসলাম: ২/২৫০; নিযামূল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৫০০
[৬৮৪] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ২৬১
[৬৮৫] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩৮৫
[৬৮৬] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৮৯
[৬৮৭] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৯৪
[৬৮৮] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৬২
[৬৮৯] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ২৭৯
[৬৯০] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৪১৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৩৬৪
[৬৯১] আদাবুল কাদ্বি: ২/৭৩; আদাবুল কাদ্ধা, পৃ. ৪৯৪
[৬৯২] আখবারুল কুদ্ধদ্বাহ: ৩/২৩৭
[৬৯৩] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১১৮
[৬৯৪] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩৫৫
[৬৯৫] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১১৮; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৪৭০
[৬৯৬] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৪৭০। আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ গ্রন্থের ৪০৪ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।
[৬৯৭] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৫৩৪
[৬৯৮] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৪০৫
[৬৯৯] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৪৫০