📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারকের সহকারী

📄 বিচারকের সহকারী


আব্বাসি যুগে প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি প্রধান বিচারকের সহায়কের কথাও জানা যায়। উমাইয়া যুগেও এই সহকারীর প্রচলন ছিল। আব্বাসি যুগে রাজত্বের পরিধি বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে জনগণের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। স্বভাবতই ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ আগের যুগের তুলনায় শিথিল হয়ে পড়ে। ফলে মামলা-মোকদ্দমাও বেড়ে চলছিল। তাই সুষ্ঠুভাবে মোকদ্দমা নিরসন করার জন্য সহকারী আবশ্যক হয়ে পড়ে।

ক. সহকারী বিচারক: তার দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন শহরে এবং গ্রামে বিচারকের প্রতিনিধি হিসেবে মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা করা। সফর, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে বিচারক অনুপস্থিত থাকলে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েও তিনি বিচার করতেন। এ ক্ষেত্রে শর্ত প্রযোজ্য ছিল। প্রধান বিচারপতির পদ চালু হওয়ার পর তার পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষ অনুমতি ছাড়া কেউ তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারতেন না। আর তিনিই দেশের সর্বত্র বিচারক নিযুক্ত করতেন।

খ. মুনশি: রাশিদুন যুগ এবং উমাইয়া যুগেও ক্ষেত্রবিশেষে এই মুনশির প্রচলন ছিল। তবে আব্বাসি যুগে তার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়। মুনশির বিবরণ নিয়ে আলিমদের অনেকেই বই লিখেছেন। যাদের মাঝে আছেন মুনশি আবদুল হামিদ। যার গ্রন্থের অনেক রেফারেন্স ইবনু খালদুনের আল-মুকাদ্দিমাহ গ্রন্থে আছে। এ ছাড়াও জাহশিয়ারি, আল-মাওয়ারদি-সহ আরও অনেকেই এ বিষয়ে কলম ধরেছেন। মুনশি কী কী কাজ করতেন, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখানে তুলে ধরা সম্ভব নয়। উভয় পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষীদের সাক্ষ্য আর বিচারকের রায় লিখে রাখা, বাদী-বিবাদীর উপস্থিতি অনুসারে মোকদ্দমা প্রস্তুত করা, বিচারকের সামনে তা সুন্দরভাবে পেশ করা এবং মুসাফির বা অক্ষম ব্যক্তি ছাড়া কাউকে সুবিধা না দেওয়াটাও ছিল তার কাজের অন্তর্ভুক্ত।

গ. ঘোষক: তার দায়িত্ব ছিল বিচারকের পাশে দাঁড়িয়ে তার মর্যাদা বিষয়ক ঘোষণা দেওয়া। বাদী-বিবাদীর উদ্দেশ্যেও বিভিন্ন ঘোষণা দিতেন। উমাইয়া যুগেও এ ঘোষকের প্রচলন ছিল।

ঘ. প্রহরী, পুলিশ এবং সহায়ক: এরা ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। বিচারকার্য সুষ্ঠুভাবে হওয়ার জন্য পরিবেশ নিরাপদ রাখা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং বাদী-বিবাদী পক্ষের লোকেরা কে কোথায় বসবে সেটা ঠিক করে দেওয়া ছিল এদের কাজ। আদালতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, বিচারকের কাছে হুজুম না করা, এজলাসের নীতি মেনে চলা, আদালতের বাইরের পরিবেশ সুশৃঙ্খল রাখা এবং বিচারক আর এজলাসের ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখার দায়িত্বও তারা পালন করতেন।

ঙ. তদন্ত কর্মকর্তা: আব্বাসি যুগেই এ পদটি সর্বপ্রথম চালু হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বিচারকের সামনে উত্থাপিত বিষয়ের যথার্থতা যাচাই করা। আবু হানিফা -এর বিশিষ্ট সহচর বিচারক মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান ইবনি আবি লাইলা সর্বপ্রথম এ পদটি চালু করেন। উমাইয়া যুগেও তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। সর্বমোট ৩৩ বছর বিচারকার্য পরিচালনার পর অবশেষে ১৪৮ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। আল-কিনদি বর্ণনা করেন, ১৭৪ হিজরিতে মিশরের বিচারক ছিলেন আল-মুফাদদাল ইবনু ফাদ্বালাহ। সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনি তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিলেন। যার মূল কাজ ছিল সততা যাচাই করা। সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে নাকি প্রত্যাখ্যাত, যাচাইকারী সেটা বিচারকের কাছে উল্লেখ করতেন। আল-কিনদি আরও বলেছেন, খলিফা মানসুরের সময় গাউস ইবনু সুলাইমানই সাক্ষীদের ব্যাপারে প্রথম তদন্ত করেন।

চ. বণ্টনকারী: পাওনাদারদের মাঝে পাওনা বণ্টন করা এবং জমি-সংক্রান্ত মোকদ্দমার ক্ষেত্রে সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছিল তার কর্তব্য। অনেক সময় তাকে ‘হিসাবকারী’-ও বলা হতো। যার বিবরণ ও নীতি সম্পর্কে আল-মাওয়ারদি বলেছেন, ‘বিচারকের মতোই গবেষণার ভিত্তিতে বণ্টনের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। তবে মুনশি কর্তৃক রায় সংরক্ষণ করা এবং শোনা বক্তব্য নথিভুক্ত করার বিষয়টি ছিল ভিন্ন। তার কোনো রকম গবেষণার সুযোগ থাকত না।’ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ -এর পৌত্র কাসিম ইবনু আবদির রহমান বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না। তিনি বলতেন, ‘চারটি কাজে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক নেওয়া যায় না। সেগুলো হচ্ছে: বিচারকার্য পরিচালনা, আযান দেওয়া, হিসাব-নিকাশ করা এবং কুরআন পড়া বা পড়ানো। আর হিসাব-নিকাশ মানে হচ্ছে বণ্টন করা।’

ছ. দায়িত্বশীল: এই কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ছিল বিচারকদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করা। যেমন ইয়াতিম, অসহায়-অক্ষম, নাবালেগ এবং অনুপস্থিত ব্যক্তিদের সম্পত্তি দেখাশোনা করা। উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি বণ্টন হওয়ার আগ পর্যন্ত দেখভাল করাও ছিল তাদের দায়িত্ব। বিচারক আবদুল্লাহ ইব্ন সাওয়্যার সর্বপ্রথম লোক নিয়োগ দিয়ে সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব প্রদান করেন। এর আগে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ওসিয়তকৃত ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দেওয়া হতো। হারিস ইবনু মিসকিন ছিলেন মিশরে এ পদ চালুকারী বিচারকদের অন্যতম।

জ. আদালতের নথি সংরক্ষক: এ পদের লোকের দায়িত্ব ছিল বিচারকের সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ বিশেষ স্থানে সংরক্ষণ করে রাখা। যাতে বহিরাগত লোকজন থেকে তা নিরাপদ থাকে এবং বিচারক সহজেই তা খুঁজে বের করতে পারেন। আবার বিচারকের মৃত্যু হলে কিংবা তাকে পদচ্যুত করা হলে নতুন নিযুক্ত বিচারকও যেন তা দেখতে পারেন। প্রয়োজনে পূর্ববর্তী সাক্ষ্য, মোকদ্দমা ও রায়কে সামনে রাখতে পারেন। এ ধরনের ব্যবস্থা মিশরেও চালু ছিল বলে আল-কিন্দি জানিয়েছেন।

এসব সহায়ক ছাড়া দোভাষীরও প্রচলন ছিল। কারণ অনেক জনগোষ্ঠী ইসলামি খিলাফতের অধীনে চলে আসছিল। যাদের মাঝে ভাষাগত কোনো মিল ছিল না। তাই ভিনভাষী বাদী-বিবাদী এবং সাক্ষীদের বক্তব্য বোঝার সুবিধার্থে বিচারকরা দোভাষী নিয়োগ দিয়েছিলেন। বিচারকের রায় ভাষান্তর করে দেওয়াও ছিল এই দোভাষীদের কাজ।

টিকাঃ
[৬০৯] তারীখুল কাদা, পৃ. ৯৬
[৬১০] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২৪৮; আল-উযাবাউ ওয়াল কুত্তাব, পৃ. ৭৪; আদাবুল কাছি: ২/৫৭; উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ, পৃ. ৬৬
[৬১১] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৯
[৬১২] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪০৮
[৬১৩] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪১১; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৯
[৬১৪] আখবারুল কুদ্বাহ : ৩/১৩৮; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৮৫; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪০৯; উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ, পৃ. ৬৬
[৬১৫] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৬১
[৬১৬] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪০৭
[৬১৭] আদাবুল কাদ্বি: ২/৬৫
[৬১৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/৭
[৬১৯] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪১৮; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৯
[৬২০] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৪৬৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪১৯
[৬২১] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৫৭৪
[৬২২] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪২৩

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আব্বাসি খলিফাগণ এবং অন্যায়ের বিচার

📄 আব্বাসি খলিফাগণ এবং অন্যায়ের বিচার


আব্বাসি খিলাফতকালে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করা এবং অপসারণের দায়িত্ব থেকে খলিফাদের সরে যাওয়ার কথা শুনলে মনে হতে পারে, তারা বুঝি বিচারকার্য সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন, সত্য এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না। অথচ বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিচারব্যবস্থার প্রতি পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে তারা ভীষণ যত্নবান ছিলেন। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য বিচারক এবং প্রধান বিচারপতিকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। অপরদিকে বিচারব্যবস্থার এমন দিকে তারা নিজেরা মনোনিবেশ করেছিলেন, যা বাস্তবায়ন করতে ন্যায়পরায়ণতার পাশাপাশি প্রশাসকের ক্ষমতারও দরকার পড়ে। সেটা হলো অন্যায় দমন সংক্রান্ত বিচার। আব্বাসি খলিফাগণ প্রথম থেকেই এর প্রতি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন।
উমাইয়া যুগে শাসকগোষ্ঠী, প্রশাসক এবং নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে হওয়া দুর্নীতি আর অন্যায়ের বিচারকার্যের জন্য সপ্তাহে একদিন বরাদ্দ ছিল। পরবর্তীকালে কোনো কোনো খলিফা এই নীতির ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে আব্বাসি যুগের খলিফাগণ এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অনেক সময় তারা নিজেরাই এ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। আবার কখনো-বা কোনো মন্ত্রী বা বিচারককে দায়িত্ব দেওয়া হতো।
সরকারি কর্মকর্তাদের দেখভাল করা এবং তাদের ন্যায়পরায়ণতার ওপর নজরদারি করার ব্যাপারে খলিফা মানসুর নিজেই উদ্যোগ নেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থেকে এক দানিকের হিসাবও তিনি গ্রহণ করতেন। এজন্য তাকে ‘আবুদ দাওয়ানিক’ বা প্রধান ব্যবস্থাপক বলা হতো। মানসুরের পর অন্যায়ের বিচারের জন্য খলিফা আল-মাহদি নিজেই এজলাসে বসতে শুরু করেন। আব্বাসি খলিফাদের মাঝে এ রীতি তিনিই প্রথম চালু করেছিলেন। তিনি এত বিপুল পরিমাণে দান-খয়রাত শুরু করেন যে, খলিফা মানসুরের সঞ্চয়কৃত সম্পদ শেষ হয়ে যায়। দুর্নীতি দমন আর অন্যায়ের বিচার করার জন্য তিনি বিশেষ প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি এ সংক্রান্ত দফতরও খুলেছিলেন। যা ‘দিওয়ানুল মাযালিম’ বা মজলুমদের অধিদপ্তর নামে পরিচিত ছিল। তার পর এজলাসে বসেন খলিফা আল-হাদি। এরপর খলিফা আর-রাশিদ এ ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি অনেকটা সময় এই কাজে ব্যয় করতেন। যার পেছনে অনুঘটক ছিল আবু ইউসুফ -এর হিতাকাঙ্ক্ষাসূচক পত্র। যা-তে খলিফার উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছিলেন, ‘ন্যায়পরায়ণতা, অত্যাচারিতের প্রতি সুবিচার এবং অত্যাচার থেকে বিরত থাকলে দেশ আবাদ হবে। ... আমিরুল মুমিনীন! আপনি মাসে কিংবা দুই মাসে এক বার প্রজাদের সাথে হওয়া অন্যায় নিয়ে বসলে ভালো হবে। উক্ত বৈঠকে আপনি মজলুমের কথা শুনবেন এবং জালিমকে শাস্তি দেবেন।’
খলিফাদের মাঝে আর-রাশিদই প্রজাদের ব্যাপারে অধিক খোঁজখবর রাখতেন। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন বেশি যত্নবান। এ ক্ষেত্রে তিনিই সর্বাধিক দৃঢ় প্রত্যয়ের পরিচয় দিয়েছিলেন।
আমিরুল মুমিনীন আল-মামুন প্রতি রবিবার অন্যায়ের বিচার করতে বসতেন। অন্যায়কারী কর্মকর্তাদের শাস্তি খলিফা কিংবা উজিরদের সামনেই কার্যকর হতো।
খলিফা হওয়ার পর আল-ওয়াসিক বিল্লাহ বনু উমাইয়ার দখলকৃত সম্পত্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আল-মুহতাদি বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসিক খলিফা হলে তিনি চারটি দরজাবিশিষ্ট একটি গম্বুজ নির্মাণ করেছিলেন। যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘কুব্বাতুল মাযালিম’ তথা অত্যাচার দমনের গম্বুজ। খলিফা নিজেই সাধারণ এবং বিশেষ শ্রেণির নাগরিকের বিচারকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে সেখানে বসতেন। আব্বাসি খলিফাদের মাঝে তিনিই ছিলেন সর্বশেষ, যিনি সেখানে অন্যায় দমনের উদ্দেশ্যে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বসতেন। অবশেষে উপযুক্ত ব্যক্তিদের হাতে রাজত্ব চলে যায়।
প্রথম মন্ত্রী বা সুলতান অথবা কোনো বিচারক অন্যায় দমনের জন্য বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এরপর খলিফা আয-যাহির বি আমরিল্লাহও মজলুমের কাছে তার হক ফিরিয়ে দিতেন।
সাধারণত সৈনিকরা তাদের বেতন কমিয়ে দেওয়া কিংবা বেতন প্রদানে বিলম্ব হওয়ার যে অভিযোগ করত, তা দেখা ছিল অন্যায় দমন সংক্রান্ত বিচারকের দায়িত্ব। যদিও এর সমাধান করা সাধারণ বিচারকের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
বাগদাদের আব্বাসি খিলাফত থেকে যেসব অঞ্চল পৃথক হয়ে গিয়েছিল, সেসব অঞ্চলেও অন্যায় ও দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত বিচারে নজরদারি করার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছিল। মিশরে তুলুনি রাজবংশ, ইখশিদি রাজবংশ এবং ফাতিমি খিলাফতের সময়ও অন্যায় আর দুর্নীতি দমন বিষয়ক অধিদপ্তর ছিল। ফাতিমি খলিফাগণ অন্যায় ও দুর্নীতির বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এর আগে ৩৪০ হিজরি সালে মুহাররম মাসের শুরুতে প্রত্যেক শনিবারে কাফুর আল-ইখশিদিও দুর্নীতির বিচার করতে বসতেন।
দুর্নীতি-সংক্রান্ত আদালতের কার্যক্রম চলত খলিফা, মন্ত্রী, প্রশাসক কিংবা এ সংক্রান্ত বিচারকের নেতৃত্বে। এ আদালতে পাঁচটি ইউনিটের কাজ ছিল। ইউনিটগুলো এবং তাদের কাজ ছিল এমন,
ক. রক্ষীবাহিনী এবং তাদের সহযোগী। যাদের কাজ ছিল সহিংসতা করতে বা পালাতে চাওয়া লোকদের নিয়ন্ত্রণ করা।
খ. প্রশাসক এবং বিচারক। বিচারের রায় পরিপূর্ণরূপে জেনে হকদারের কাছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের দলিল-প্রমাণ পর্যবেক্ষণ করা এবং তাদের ওপর শারঈ আইন বাস্তবায়ন করার জন্য এরা থাকতেন।
গ. ফকিহগণ। শারঈ কোনো মাসআলায় জটিলতা তৈরি হলে তার সমাধানকল্পে পরামর্শের জন্য তারা উপস্থিত থাকতেন।
ঘ. মুনশি। এ ইউনিটের কাজ ছিল পক্ষে-বিপক্ষের দলিল-প্রমাণ এবং বক্তব্য লিখে রাখা।
ঙ. বাদী-বিবাদী এবং বিচারকের ফয়সালার ব্যাপারে সাক্ষী হিসেবে একটি ইউনিট থাকত।
অনেক সময় খলিফা নির্দিষ্ট একটি দিনে বিচারপ্রার্থীদের উদ্দেশ্যে বসতেন। বিচার নিয়ে লোকেরা তার কাছে আসত। আবার অনেক সময় নির্ধারিত ব্যক্তির অন্যায় বা দুর্নীতির বিচার করতে ডাকা হতো। প্রতিদিনই এরকম কার্যক্রম চলমান ছিল। দুর্নীতি ও অন্যায় দমনে আব্বাসি যুগের চমৎকার সব উদাহরণ রয়েছে। সেগুলোর প্রতিটির ধরনে যেমন ভিন্নতা ছিল, তেমনি সেসবের গভীরতাও ছিল চমকপ্রদ। তবে এখানে তা আলোচনা করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য।

টিকাঃ
[৬২৪] এক দিরহাম তথা রৌপ্যমুদ্রার ছয় ভাগের এক ভাগকে এক দানিক বলা হয়।
[৬২৫] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৫৯; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ : ২/২০১; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১২৭
[৬২৬] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৮; তারীখুদ দাওলাতিল আব্বাসিয়্যাহ, পৃ. ৯৪; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৩৬; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ৯৪
[৬২৭] আল-খারাজ, পৃ. ১১১ এবং ১১২
[৬২৭] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৪০; আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৮
[৬২৮] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৮; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৬৭
[৬২৯] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৭০
[৬৩০] মুরূজুয যাহাব: ২/৪৩১; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৭৫; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৪৫
[৬৩১] সুবহুল আ’শা: ৩/৪৯৭, ৩/৫২৫, ৪/৪৪, ৫/১৪৪, ৬/২০২, ৬/২০৪ এবং ৬/২০৭ দ্রষ্টব্য
[৬৩২] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬৫
[৬৩৩] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭১; সুবহুল আ’শা: ৩/৪৯৭; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৯৫
[৬৩৪] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭১; আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ১৩৭
[৬৩৫] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৯
[৬৩৬] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৮৪, ৮৫, ৯০ এবং ৯১। আরও দেখতে পারেন, আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ১৪৬; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৮৩, ৫৫৩, ৫৬১ এবং ৫৮৫।

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আব্বাসি যুগে ‘হিসবাহ’ বিচার

📄 আব্বাসি যুগে ‘হিসবাহ’ বিচার


আমরা ইতিপূর্বে হিসবাহ-এর সংজ্ঞা উল্লেখ করেছি। সেখানে আমরা এটাও স্পষ্ট করেছি যে, এর বীজ নববি যুগেই অঙ্কুরিত হয়েছিল। খুলাফায়ে রাশিদুন নিজেরাই হিসবাহ পরিচালনা করতেন। তাঁরা নিজেরাই বাজার পর্যবেক্ষণ করতেন। কিংবা বাজার পরিদর্শনের জন্য কাউকে নিযুক্ত করতেন। উমর রাতে-দিনে বাজার এবং সাধারণ মানুষের অবস্থা পরিদর্শন করতেন। উমাইয়া যুগের খলিফাগণ, এমনকি আব্বাসি যুগের অনেক প্রশাসকও নিজেরাই এই কাজ করতেন।
তবে আব্বাসি যুগে নতুন যে বিষয়টি চালু হয়েছিল তা হলো স্বাধীন হিসবাহ সংক্রান্ত বিচারব্যবস্থা। যার ফলে এর একটি বিশেষ অবকাঠামো গড়ে ওঠে। এটি পরিণত হয় বিশেষ রাষ্ট্রীয় বিচার বিভাগে। একজন বিশেষ বিচারক এটার দায়িত্ব পালন করতেন। এটা প্রথমবারের মতো হয়েছিল ১৫৮ হিজরিতে আব্বাসি খলিফা আল-হাদির শাসনামলে। তারপর গোটা আব্বাসি সাম্রাজ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। হিসবাহ-এর বিশেষ দফতর তৈরি করা হয়। চালু হয় স্বতন্ত্র বিভাগ। যা বিলায়াতুল হিসাবাহ তথা হিসবাহ ব্যবস্থাপনা নামে পরিচিতি লাভ করে। এ বিভাগ থেকে পরিচালিত হওয়া বিভিন্ন কার্যাবলির মাঝে একটি হলো বিচারকার্য। খলিফা আল-মাহদির অভ্যাস ছিল রাষ্ট্রের জটিল জটিল সব বিষয় দেখাশোনা করে সেসব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। তাই নিজের খিলাফতের সময় তিনি হিসবাহ-সহ আরও অনেক নতুন কিছুর প্রচলন করেছিলেন।
হিসবাহকে বিচারব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কারণ মুহতাসিব বা হিসবাহ পরিচালকের কাজ ছিল— সৎ কাজ করা হচ্ছে না দেখলে সৎ কাজের আদেশ করা এবং অন্যায় কাজ হতে দেখলে বাধা প্রদান করা। আদেশলঙ্ঘনকারীকে তিনি বিচারের মুখোমুখি করবেন এবং শাস্তি দেবেন। প্রয়োজনবোধে তাকে বন্দি করবেন। তিনি নিজে অথবা নিজের সহযোগীদের মাধ্যমে সরাসরি অন্যায় প্রতিহত করবেন। কারও পক্ষ থেকে মোকদ্দমার ওপর নির্ভর না করে শারঈ নীতির প্রতি লক্ষ রেখে জনগণের মাঝেই তার বিচার করবেন। হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধ বিধানের প্রতি তার দৃষ্টি থাকবে। আল্লাহর হক যেমন মনে রাখবেন, তেমনি জাতি, সমাজ এবং ব্যক্তির অধিকার ভুলে যাবেন না।
আসলে হিসবাহ ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। কারণ সাধারণ বিচারব্যবস্থা দরকার পড়ে কেউ যদি অন্যের অধিকারের ব্যাপারে অন্যায় করে। দুই ব্যক্তির মাঝে কোনো বিবাদ হলে সুনির্দিষ্ট জায়গায় বিচারক এবং বিচারালয়ের প্রয়োজন পড়ে। যা বাদীর আবেদন এবং মামলা দায়েরের ওপর নির্ভরশীল। উভয় পক্ষের কেউ কোনো দিক থেকে দুর্বল হলে বা সাধারণ বিচারের কোনো একটি শর্ত হারিয়ে গেলে বিচারব্যবস্থা আর কোনো কাজ করতে পারে না। এ দিকগুলো থেকে বিচারালয় বেকার হয়ে যায়। দুর্বল হয়ে পড়ে বিচারব্যবস্থা।
এই বিষয়গুলো দৈনন্দিন জীবনে প্রচুর পরিমাণে এবং বারংবার ঘটে থাকে। বিচার বিভাগকে এসব বিষয়ে জড়িত হওয়া থেকে দূরে রাখতে ইসলামে হিসবাহ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাহলে খলিফা, প্রশাসক, আমির-উমারা এবং বিচারকদের দায়িত্বের বোঝা লাঘব যেমন হবে, তেমনি কাজ বণ্টন হয়ে যাবে। ফলে সমগ্র মুসলিম জাতির ওপর প্রয়োগ হবে পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুরক্ষিত থাকবে তার অধিকার। সর্বসাধারণের অধিকার নজরদারিতে থাকবে।
অনেক সময় মামলায় বাদী পক্ষ থাকে। সে ধরনের মামলায় বাদীর ক্ষতি এবং দাবি তুলনা করে দেখা হয়। তার অধিকার পুনরুদ্ধারে কর্মতৎপরতা দেখা যায় না। সুতরাং এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অর্জন না হওয়ায় সে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। অপরদিকে অন্যায়কারীর আগ্রাসন বেড়ে যায়। বিক্রয়ের ক্ষেত্রে যে প্রতারণা করে এবং বিধিবিধান লঙ্ঘন করে, সে আরও আশকারা পেয়ে যায়। অন্যায় তখন আগের থেকে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলুম বৃদ্ধি পায় মারাত্মকভাবে। পূর্বের তুলনায় সীমালঙ্ঘন হয়ে যায় আরও গুরুতর। আপামর জনসাধারণের জন্যে যা বিশাল হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহর হক এবং জনসাধারণের অধিকারের ক্ষেত্রে তা বিরাট ঝুঁকি হয়ে যায়। সর্বোপরি তা সমাজের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। নষ্ট হয়ে যায় এর মূল্যবোধ, বিধিবিধান এবং নৈতিকতা।
পরিচালকের দায়িত্ব ছিল এ ক্ষেত্রগুলোকে দেখভাল করা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নিজের পরিধির মধ্যে অন্যায় নিয়ন্ত্রণ করা। তিনি হেঁটে হেঁটে হাট-বাজার, রাস্তাঘাট, সেতু, নদী এবং জনসমাগমের স্থানগুলো পরিদর্শন করার জন্য কাউকে দায়িত্ব দিতেন। নির্মাণ স্থাপনার সমস্ত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, সমাজের নৈতিকতা এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত হচ্ছে কি না—তা খতিয়ে দেখতে বলতেন। অনেক সময় তিনি নিজেই বিষয়টির মীমাংসা করতেন। ভালো কাজের নির্দেশ এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করতেন। অত্যাচারী আর আগ্রাসীদের প্রতিহত করতেন। সামাজিক মর্যাদা এবং পবিত্রতা রক্ষায় অনুপ্রেরণা দিতেন। সামাজিক ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর বিরোধগুলো মিটমাট করে দিতেন। এ ব্যাপারে সাধারণ বিচারব্যবস্থার নিয়ম, মামলা, প্রমাণের উপায় তিনি মেনে চলতেন না। কারণ তার বিচার হতো বাহ্যিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। সাধারণ বিচারে বিবাদ ও বিরোধের যে সকল কৌশল অবলম্বন করা হতো, যেসব দলিল-প্রমাণের প্রয়োজন হতো—সেগুলোই তিনি অবলম্বন করতেন। মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা, নৈতিকতা বিরোধী কাজগুলোর ক্ষেত্রে কঠোরতা করা এবং আনুগত্য, ইবাদত আর নৈতিকতাপূর্ণ কাজে উৎসাহ দেওয়া ছিল পরিচালকের দায়িত্ব।
মুহতাসিব বা হিসবাহ পরিচালকের অন্যতম দায়িত্ব ছিল পরিমাপ মনিটরিং, সিন্ডিকেট আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রতিরোধ করা। নির্মাণশিল্প ও উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়া। শিল্পের ক্ষেত্রে কে কতটা নিখুঁত—তার গুণমান যাচাই করা। জালিয়াতি প্রতিরোধ, বাজার এবং মসজিদের পরিচ্ছন্নতা তত্ত্বাবধান করা। কর্মচারী এবং মুয়াযযিনদের নজরদারি করা। ওই সময় মুহতাসিবের কর্তৃত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এমনকি বিচারকরা দায়িত্ব পালনে বিলম্ব করলে বা বিচারকার্য পালন না করলেও তাদের কাছে জবাবদিহি করতে হতো।
বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের পেশা এবং পেশাগত ক্ষেত্রে তাদের নৈপুণ্যের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য মুহতাসিবরা তাদের পরীক্ষা করতেন। যাতে তারা অন্যদের শোষণ করতে না পারে। আব্বাসি খলিফা আল-মুতাদিদ বিল্লাহ তৎকালীন প্রধান চিকিৎসক সিনান ইবনু সাবিতকে বাগদাদে থাকা সকল চিকিৎসককে যাচাই করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তখন সেখানে প্রায় ৮৬০ জন ডাক্তার ছিলেন। মুহতাসিবের প্রতি খলিফার নির্দেশনা ছিল, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছাড়া একজন চিকিৎসককেও যেন প্র্যাকটিস করতে দেওয়া না হয়। ফার্মাসিস্ট এবং অন্যান্যদের ক্ষেত্রেও একই বিধান ছিল। কায়রোতে ওজন পরিমাপক দফতরটিতে বিক্রেতারা নির্দিষ্ট সময়ে যাতায়াত করত। তাতে কোনো ধরনের ত্রুটি থাকলে তা পরিবর্তন করা বা সারিয়ে নেওয়ার আদেশ ছিল। আদেশ অমান্যকারীকে শাস্তি দেওয়া হতো। এই দফতরটি মামলুকদের রাজত্বকাল পর্যন্ত বহাল ছিল।
এভাবে হিসবাহ বিভাগ সাধারণ বিচার বিভাগের পাশাপাশি একটি স্বাধীন বিভাগে পরিণত হয়েছিল। প্রকাশ পেয়েছিল এ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বই-পুস্তক। যেগুলোতে মুহতাসিবের শর্তাবলি এবং তার এখতিয়ারের সীমার বর্ণনা থাকত। একজন সাধারণ বিচারক এবং দুর্নীতি-সংক্রান্ত বিশেষ বিচারকের মধ্যকার পার্থক্য এবং তাদের ওপর আরোপিত দায়িত্ব নির্ধারণ করাও ছিল হিসবাহর কর্তব্য। অনেক প্রসিদ্ধ আলিম এবং ফকিহ বাগদাদ এবং বাগদাদের বাইরে বিভিন্ন শহরে হিসবাহর দায়িত্বে ছিলেন। আবু ইসহাক ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ আল-আসতাখারি শাফিয়ি ছিলেন তাদের অন্যতম।

টিকাঃ
[৬৩৭] উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়‍্যাহ, পৃ. ২১; নিযামুল হিসবাহ ফিল ইসলাম, পৃ. ৩৩১; আদ-দাওলাতু ওয়া নিযামুল হিসবাহ ইনদা ইবনি তাইমিয়্যাহ, পৃ. ৭৬; আল-হিসবাহ ফিল ইসলাম, পৃ. ১৩; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৩৫
[৬৩৮] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ২৪০
[৬৩৯] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ২৪৩; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৫৯৯; আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ২৮৭

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সামরিক বাহিনীর বিচার

📄 সামরিক বাহিনীর বিচার


আব্বাসি যুগে চালু হওয়া আরেকটি পদ ছিল সামরিক বাহিনীর বিচারক। সামরিক বাহিনীর নিজেদের মধ্যকার বিরোধ কিংবা অন্যদের সাথে তাদের ঘটে যাওয়া বিরোধ নিরসনের জন্য বিচারক তাদের সাথেই থাকতেন।
সামরিক বাহিনীর বিচারক পদ্ধতি চালু হয়েছিল প্রথম আব্বাসি যুগে। ওয়াকি এ সংক্রান্ত প্রথম ঘটনাটি সাদ ইবনু ইবরাহীম আয-যুহরির জীবনীতে উল্লেখ করেছেন। সাদ ইবনু ইবরাহীম ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি আবদুর রহমান ইবনু আউফ -এর বংশধর। বাগদাদের পূর্বাঞ্চলে তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। আল-মানসুর ইবনুল মাহদির ফিতনার সময় সাদকে পদচ্যুত করা হয়। সে-সময় আল-মুরতাদ্বা নাম দিয়ে ইবনুল মাহদির খিলাফতের জন্য মিম্বরে দুআ করা হতো। পদচ্যুতির পর সাদ গিয়ে হাসান ইবনু সাহলের সাথে মিলিত হন। ইবনু সাহল ছিলেন খলিফা আল-মামুনের মন্ত্রী। তিনি সাদকে সামরিক বাহিনীর বিচারক নিযুক্ত করেন। এটা হিজরি ২০১ সালের কথা।
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের আগে ১৫১ হিজরিতে আল-মাহদি রায় নগরীতে নিজেই সামরিক বাহিনীর মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি কেবল সৈন্যদের মাঝে কলহ মিটিয়ে দেওয়ার কাজ করতেন। অন্যদের ব্যাপারে তার কোনো কাজ ছিল না।
সামরিক বাহিনীর বিচারক একটি ভালো জায়গা করে নেয়। বিভিন্ন স্থানে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি তার সুবহুল আ’শা গ্রন্থে ধর্মীয় দায়িত্ব সংক্রান্ত আলোচনায় লিখেছেন, ‘দ্বিতীয় প্রকার ধর্মীয় দায়িত্ব হচ্ছে সামরিক বাহিনীর বিচারকার্য পরিচালনা করা। এটা এক সম্মানজনক প্রাচীন দায়িত্ব, যা সুলতান সালাহুদ্দিন ইউসুফের সময় চালু ছিল। এ দায়িত্ব পালনকারী মিশরে বিচারকদের সাথে বিচারালয়ে উপস্থিত থাকতেন। সুলতানের সফরকালে তারা সাথে থাকতেন। তারা তিনজন যথাক্রমে শাফিয়ি, হানাফি এবং মালিকি মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। সেখানে হাম্বলি মাযহাবের কেউ থাকতেন না। বিচারালয়ে তারা ছাড়াও চারজন বিচারক থাকতেন। পরবর্তীকালে হাম্বলি মাযহাবের বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়।
সামরিক বাহিনীর বিচারকদের অন্যতম ছিলেন ওয়াহাব ইবনু ওয়াহাব ইবনি কাসির আল-আনসারি। খলিফা আর-রাশিদ তাকে আল-মাহদির বাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ইসমাঈল ইবনু ইসহাক ২৫৫ হিজরি পর্যন্ত আল-মাহদির সেনানিবাসে বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন। এরপর তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যান।

টিকাঃ
[৬৪০] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৫৮; আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ৫৯
[৬৪১] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২৬৯
[৬৪২] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৯৬
[৬৪৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২৮০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00