📄 বিচারের দায়িত্ব থেকে বিরত থাকা
খলিফা এবং দায়িত্বশীলরা বিচারকার্য পরিচালনার জন্য সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তিকে নিযুক্ত করতেন। বড় বড় এবং প্রসিদ্ধ আলিমদের নিযুক্ত করতে চাওয়ার মৌলিকভাবে কয়েকটি কারণ ছিল। যেমন, এর মাধ্যমে হাদিসের নির্দেশনা বাস্তবায়িত হবে। মানুষের অধিকার এবং সম্পদ রক্ষার মাধ্যমে সমাজে সুবিচার আর ন্যায় যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে, তেমনি জনগণের কাছাকাছিও থাকা যাবে। ফলে বিচারব্যবস্থার মান রক্ষার মতো খলিফা এবং প্রশাসকদের কাজের সপক্ষে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করে তাতে শরীয়তের রং চড়ানোও সহজ হবে।
নবি-রাসূল এবং নেককার ব্যক্তিদের অনুসরণে আলিমদের অনেকেই বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মাঝে ছিল অর্পিত দায়িত্ব পালনের চেতনাবোধ। সত্য এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সওয়াব আর পুরস্কার লাভের ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী ছিলেন। তাই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
তবে অনেক আলিম বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন। এ তালিকায় সর্বাগ্রে পাওয়া যাবে রাশিদুন যুগে আবদুল্লাহ ইবনু উমর-এর নাম। উমাইয়া যুগে এমন ব্যক্তিদের সংখ্যা যে বেড়ে গিয়েছিল, ইতিপূর্বে আমরা তা উল্লেখ করেছি। আব্বাসি যুগে তা আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এমনকি বিচারকার্য থেকে দূরে সরে যাওয়া আলিমদের একাংশের কাছে প্রশংসনীয় রীতিতে পরিণত হয়। কারণ খলিফা এবং প্রশাসকগণ কিছু প্রসিদ্ধ আলিমদের বিচারকের পদ গ্রহণে বাধ্য করছিলেন। তবে এ ক্ষেত্রে খলিফা এবং প্রশাসকদের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। আসলে তারা চাচ্ছিলেন, সবাই যেন আলিমদের শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন করে। তাঁদের ইলম এবং ফিকহ থেকে সবাই যেন উপকৃত হতে পারে। সাধারণ মানুষ যেন আলিমদের সম্মান করে; তাঁদের ওপর থেকে যেন আস্থা না হারায়। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে অনুৎসাহের পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল। যেমন:
১. হাদিসে থাকা নানাধরনের ভীতি প্রদর্শন এবং দায়িত্ব পালনকারীর প্রতি সতর্কবার্তা। উলামায়ে কেরাম এ কারণে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে বিরত থাকতেন। এ ছাড়া দুনিয়া-আখিরাতে কঠিন জবাবদিহিতার আশঙ্কা তাদের ছিল। এ ভয় থেকেই তারা দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করতেন। কারণ ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণ হেরফের বা জুলুম করে ফেললে জাহান্নামি হতে হবে।
২. দুনিয়াবিমুখতা। পার্থিব পদ-পদবির কারণে আল্লাহর নৈকট্য থেকে মাহরুম হওয়ার পাশাপাশি নেককার, দরিদ্র এবং দুর্বল লোকদের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হওয়া।
৩. ইলম চর্চা, গবেষণা, দাওয়াত এবং শিক্ষাদানের কাজকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বের ওপর প্রাধান্য দেওয়া।
৪. আকীদাভিত্তিক এবং ফিকহকেন্দ্রিক নানান ফিরকা সৃষ্টি হওয়া। খলিফা বা প্রশাসকরা নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শের অনুসরণ করতেন। তাই কোনো কোনো আলিম এমন খলিফা বা প্রশাসক এর অধীনে কাজ করে তাদের সমর্থন জোগানো অপছন্দ করতেন। তাদের ভয় ছিল, খলিফা বা প্রশাসক নিজেদের মতাদর্শ প্রচারে আলিমদের সুখ্যাতির অপব্যবহার করবেন।
৫. খলিফা বা প্রশাসকদের বিচারক-সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা এবং বিচারককে একদিকে ঝুঁকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার আশঙ্কা করা। এ কারণে অনেক বিচারকই খলিফা এবং প্রশাসককে অনুরোধ করতেন, তাকে যেন স্বাধীনভাবে কাজের সুবিধা দেওয়া হয়। তার কাজে যেন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করা হয়। খলিফা বা প্রশাসক থেকে তারা এ মর্মে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করতেন যে, ফয়সালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব হবে শাসকগোষ্ঠীর। শাসকের আত্মীয়স্বজন, সহযোগী, এমনকি আমিরদের বিপক্ষে হলেও তারা সত্য এবং ন্যায় বাস্তবায়ন করবেন। খলিফা বা প্রশাসক শুধু যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতেন তা-ই নয়; বরং কার্যত বাস্তবায়নও করতেন। পক্ষান্তরে যেসব আলিম দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকতেন তাদের আশঙ্কা ছিল যে, শাসকগোষ্ঠী তাদের গবেষণার সাথে সহমত পোষণ করবেন না। বরং ফয়সালা তাদের বিপক্ষে গেলে চাপ প্রয়োগ করবেন।
৬. অনেক সময় খলিফা এবং প্রশাসকদের সাথে আলিম এবং ফকিহদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকত। ইমাম এবং আলিমদের অনেকেই এইসব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করতেন। অনেক সময় তো খলিফা এবং প্রশাসক-বিরোধী আন্দোলনের সাথে তাদের পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকত। অনেক সময় শাসকগোষ্ঠীর কার্যকলাপ অপছন্দ করার কারণে আলিমগণ তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। কেউ যাতে তাদের প্রতি ভুল ধারণা না করে বসে, এজন্য বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে চাইতেন না। তারা মনে করতেন, বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলে কেউ ভাবতে পারে যে, তারা শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন করছেন। কিংবা রাজনৈতিক কার্যক্রমে তাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করছেন। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে অসম্মত ছিলেন—এমন কয়েকজনের কথা আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
■ ইমাম আবু হানিফা নুমান
খলিফা আবু জাফর মানসুর তাঁকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে বললে তিনি কেবল বিরতই থাকেননি; বরং পালিয়ে বেড়িয়েছেন। এর কারণ কী ছিল, সে সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন এক বর্ণনায় এসেছে, ইমাম আবু হানিফা খলিফা মানসুর কর্তৃক প্রদত্ত দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকায় প্রহারের স্বীকার হয়েছিলেন। কারণ নিন্দুকরা এ কথা ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, আবু হানিফা খলিফার বিরুদ্ধে বসরায় বিদ্রোহকারী ইবরাহীম ইবনু আবদিল্লাহকে সমর্থন করেন।
আরেক বর্ণনামতে তাকওয়া, পরহেজগারি এবং দুনিয়াবিমুখতার কারণেই আবু হানিফা বিচারকের দায়িত্ব থেকে দূরে ছিলেন। খলিফার উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করুন। এমন ব্যক্তিকেই কেবল দায়িত্ব প্রদান করুন, যে আল্লাহকে ভয় করে। সন্তুষ্টির ক্ষেত্রেই আমি বিশ্বাসযোগ্য নই। তাহলে অসন্তুষ্টির ব্যাপারে কিভাবে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারি? আপনার বিপক্ষে রায় প্রদান করলে আমাকে বলা হবে: ‘রায় পরিবর্তন করো, নয়তো ফুরাত নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হবে।’ এ ক্ষেত্রে ডুবে যাওয়াটাই আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়। আপনার আশেপাশে থাকা লোকেরা আপনাকে তোষামোদী করে চলে, যা আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়।’
অন্য বর্ণনায় এসেছে, খলিফা মানসুর ইমাম আবু হানিফাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইমাম সাহেব তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিরত থাকেন। তখন মানসুর শপথ করেন, আবু হানিফাকে দিয়ে কোনো দায়িত্ব পালন না করানো অবধি তিনি নিবৃত্ত হবেন না। এদিকে আবু হানিফা এ-ও শপথ করেন যে, তিনি খলিফার থেকে কোনো দায়িত্ব নেবেন না। অবশেষে তাকে খলিফা মানসুর নির্মাণ-শ্রমিকদের কাজ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করেন। এভাবেই খলিফার কসম পূর্ণ হয়, আবার আবু হানিফা -এর কসমও রক্ষা পায়। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন, আবু হানিফাকে মানসুর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চাইলে ইমাম সাহেব তা গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশ করেন। খলিফাও পীড়াপীড়ি শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁকে প্রহার করে জেলে ভরে রাখেন। এর কিছুদিন পরই তাঁর মৃত্যু হয়। লেখকরা আরও অনেক কারণ এবং অন্যান্য বর্ণনাও অবশ্য উল্লেখ করেছেন।
■ ইমাম মালিক
তিনি আব্বাসিদের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন। শাইখ আবুল হাসান নুবাহি লিখেন, ‘... অবশেষে আব্বাসিদের আত্মপ্রকাশ ঘটল। একপর্যায়ে তারা শাসনক্ষমতা লাভ করে। বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে অনেক কড়াকড়ি করল তারা। শারঈ কাজের দায়িত্ব পালনের জন্য তারা সেরা আলিমদের বেছে নিলো। সে হিসেবে মালিক ইবনু আনাস, ইবনু আবি যিব এবং আবু হানিফাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলা হয়। মালিক তখন দায়িত্ব গ্রহণ না করার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, “আমি একবার শাস্তির সম্মুখীন হয়েছি। আর সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিচারকার্য পরিচালনার উপযুক্ত নয়।” তখন ইবনু আবি যিব বলেন, “আমি তো কুরাইশ বংশীয়। বংশগতভাবে সমকক্ষ ব্যক্তির দায়িত্ব পালনে সমকক্ষ হওয়া উচিত নয়।” ওদিকে আবু হানিফা বললেন, “আমি তো মিত্র গোষ্ঠীভুক্ত। আর মিত্র গোষ্ঠীর কেউ বিচারকার্য পরিচালনার উপযুক্ত নয়।” এভাবে তাঁদের তিনজনই নিজেদের নিয়তের সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে দায়িত্ব পালন থেকে রেহাই পেয়ে গেলেন।’
• ইমাম শাফিয়ি
নুবাহি লিখেন, ‘বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে পিছিয়ে থাকা অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইদরিস আশ-শাফিয়ি। আমিরুল মুমিনীন তাঁকে দায়িত্ব গ্রহণের ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করলে তিনি বললেন, “আপনার বংশীয় কেউ এ কাজের যোগ্য নয়। এমন ব্যক্তিও এ কাজের অনুপযুক্ত, যে সব কাজ ছেড়ে দেয়।” তিনি আরও বলতেন, “বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পরও যে ব্যক্তি নিঃস্ব হয়নি, সে তো চোর। আর যে ব্যক্তি নিজেকে বাঁচাতে পারেনি, তার ইলম কোনো কাজে আসেনি।”
• ওয়াকি ইবনুল জাররাহ
তিনি খলিফা হারুনুর রাশিদের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনু ইদরিস, হাফস ইবনু গিয়াস এবং ওয়াকি ইবনুল জাররাহকে খলিফা হারুনুর রাশিদের কাছে নেওয়া হলো। উদ্দেশ্য ছিল, তাদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা। ইবনু ইদরিস তো দরবারে প্রবেশ করে খলিফাকে সালাম দিয়ে এমন ভাব প্রকাশ করলেন, যেন তিনি একজন প্যারালাইজড ব্যক্তি। খলিফা তখন উপস্থিত লোকদের বললেন, ‘তোমরা শাইখের হাত ধরো। একে দিয়ে কোনো কাজ হবে না।’ এরপর ওয়াকি এক হাত দিয়ে নিজের এক চোখ চেপে ধরে বললেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! এই চোখ দিয়ে আমি দেখতে পাই না।’ খলিফা তখন তাকেও ছাড় দিলেন। তারপর হাফস বললেন, ‘ঋণের বোঝা এবং পরিবারের দায়িত্ব আমার কাঁধে না থাকলে আমি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকতাম।’ এই বলে পরিবারের ভরণপোষণের সুবিধার্থে তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তবে এ কাজে তিনি খুব যে আগ্রহী ছিলেন—এমনও নয়। বরং তার জীবনীতে এসেছে, বিচারকার্য পরিচালনা করা এবং হাদিসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী হওয়া—এ দুয়ের মাঝে তাকে ইচ্ছাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
বিশুদ্ধতম মতানুসারে, ১৯৪ হিজরিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন কুফার বিচারক। পরে অবশ্য বাগদাদের বিচারকার্যও পরিচালনা করেছেন।
• মুগীরা আল-মাখযুমি
আমিরুল মুমিনীন আর-রাশিদ চার হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে তাকে মদীনার বিচারক করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সম্মত হননি। খলিফা পীড়াপীড়ি করতে থাকলে তিনি বলেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন অপেক্ষা শয়তানের ক্রোধের পাত্র হওয়া আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।’ তখন খলিফা বললেন, ‘এরপর তো আর কিছু বলার বাকি থাকে না।’ তারপর তাকে অব্যাহতি দিয়ে দুই হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিলেন।
অনেক মুতাজিলা মতাদর্শের ব্যক্তি তো দুনিয়াবিমুখতা এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন যে, ভীষণ অভাবে পড়েও তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্রহণ করেননি। বর্ণিত আছে, মুতাজিলা নেতা আহমাদ ইবনু দাউদের কাছে একবার খলিফা আল-ওয়াসিক বিল্লাহ জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনি মুতাজিলাদের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করেন না কেন?’ উত্তরে আহমাদ বলেছিলেন, ‘তারা এ কাজের উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। যেমন, ধরুন জাফর ইবনু বিশরের কথা। তার কাছে আপনি দশ হাজার দিরহাম পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণ করেননি। তারপর আমাকে নিয়ে তার কাছে আপনি গেলেন। তখন আমি ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দেননি। অগত্যা অনুমতি ছাড়াই ঢুকতে চাইলে তিনি তরবারি কোষমুক্ত করে আমাকে হুমকি দেন, “ভেতরে ঢুকলে আর জান নিয়ে ফিরতে পারবে না।” তখন আমি ফিরে আসি। এমন লোকদের কিভাবে দায়িত্ব দেওয়া যায় সেটা আপনিই বলুন!’ এরপর আহমাদ নিজের প্রয়োজন সমাধার জন্য মাত্র দুই দিরহাম গ্রহণ করলেন।
• আবদুল্লাহ ইবনু ফাররুখ
বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব যারা এড়িয়ে চলতেন, তাদের শীর্ষে ছিলেন কাইরুওয়ানের ফকিহ আবদুল্লাহ ইবনু ফাররুখ। খলিফা আর-রাশিদের পক্ষ থেকে তার কাছে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন রাওহ ইবনু হাতিম। কিন্তু তিনি সম্মত হননি। তখন ইবনু হাতিমের নির্দেশে তাকে বেঁধে মসজিদের ছাদে তোলা হয়। এরপর তাকে পুনরায় প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন তাকে ছাদের কিনারায় নিয়ে যাওয়া হয়। ধাক্কা দিয়ে নিশ্চিত ফেলে দেওয়া হবে দেখে তিনি দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। তখন কয়েকজন প্রহরী-সহ তাকে মসজিদের ভেতরে বসিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দুজন ব্যক্তি তার কাছে মোকদ্দমা নিয়ে আসে। তাদের দেখে তিনি দীর্ঘসময় ধরে কান্না করেন। তারপর মাথা তুলে তাদের বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে এ মোকদ্দমা থেকে আমাকে রেহাই দিন।’
লোক দুজন তখন তার জন্য দুআ করতে করতে চলে গেল। প্রহরীরা রাওহকে বিষয়টি জানালে সে বলল, ‘ঠিক আছে। তবে এ কাজের উপযুক্ত কে হতে পারে, সেটা তার থেকে জেনে নাও।’ তখন তিনি আবদুল্লাহ ইবনু গানিমের কথা বলেন। কারণ বিচার-সংক্রান্ত মাসআলা-মাসায়েলের ব্যাপারে তাকেই বেশি আগ্রহী দেখা গেছে।
* আবদুল্লাহ ইবনু ওয়াহাব
তিনি ছিলেন ইমাম মালিকের সহচর। দুনিয়াবিমুখতা এবং সততার কারণে তিনি খলিফা কর্তৃক প্রদত্ত বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। জনসমাজ থেকে সরে গিয়ে তিনি ঘরে অবস্থান করতে থাকেন।
* আবদুল মালিক ইবনু আবদিল আজিজ
ইবনুল মাজিশুন নামে পরিচিত মালিকি মাযহাবের এই ফকিহ ছিলেন ইমাম মালিক-এর ছাত্র। খলিফা আল-মামুন তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিয়ে পত্র প্রেরণ করলে তিনি সম্মত হননি।
* মূসা ইবনু সুলাইমান আল-জুযজানি
খলিফা আল-মামুন তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তিনি বললেন, ‘বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। আমার মতো ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করবেন না। কারণ আমি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমার মনে হয় না, আল্লাহর জমিনে তাঁর বান্দাদের বিচার করার মতো যোগ্যতা আমার মাঝে আছে।’ উত্তরে খলিফা বললেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন। আমরা আপনাকে অব্যাহতি দিচ্ছি।’ মূসা তখন খলিফার জন্য দুআ করলেন। তিনি ছিলেন মুআল্লা ইবনু মানসুর (মৃত্যু ২১১ হি.)-এর সহচর। খলিফা তাকেও বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও সম্মত হননি।
* সুফইয়ান আস-সাওরি
খলিফা মানসুর তাঁকে কুফায় বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সম্মত না হয়ে ১৪৪ হিজরিতে কুফা থেকে হিজাজে চলে যান। পরবর্তীকালে খলিফা মাহদি তাঁকে একই প্রস্তাব দিলে তিনি আত্মগোপন করেন। কিন্তু একসময় তিনি ধরা পড়ে যান। অবশেষে খলিফা তাঁকে বলেন, ‘আপনি এখানে-ওখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন! আপনি কি ভেবেছেন, আমরা আপনাকে শাস্তি দিতে পারব না? এখন তো আপনি ঠিকই ধরা পড়ে গেলেন।’ খলিফা তখন সুফইয়ান-কে কুফার বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে একটি ফরমান লেখালেন। যা-তে এ কথাও লেখা ছিল, সুফইয়ানের কথার ওপর কারও কথা চলবে না। ফরমানটি সুফইয়ানের হাতে তুলে দিলে তিনি সেটা নিয়ে দরবার থেকে বেরিয়ে এলেন। তারপর সেটি দজলা নদীতে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেলেন। এরপর আর তাঁকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আসলে তিনি বসরায় চলে গিয়েছিলেন। আত্মগোপনরত অবস্থায় সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়।
• ইবনু সুরাইজ
তাঁর পূর্ণ নাম ছিল আহমাদ ইবনু আমর ইবনি সুরাইজ। তাঁর উপনাম ছিল আবুল আব্বাস। শাফিয়ি মাযহাবের ফকিহ এবং মুজতাহিদ ছিলেন। তৎকালীন শাফিয়ি মাযহাবের পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। ৩০৬ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। তিনি শিরাজে কিছুদিন ইনসাফের সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন। এরপর পুনরায় দায়িত্ব দিতে চাওয়া হলে তিনি আর সম্মত হননি। ঘরে আটকে রেখেও তাঁকে রাজি করানো যায়নি। সৈন্যরা প্রায় ১০ দিন তাঁর ঘর ঘেরাও করে রাখে। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থানেই অটল থাকেন। তখন উজির আলি ইবনু ঈসা জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা মূলত শাইখের কোনো ক্ষতি করতে চাইনি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়াবাসীকে এ কথা জানিয়ে দেওয়া—আমাদের রাজ্যে এমন ব্যক্তি আছেন যাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চাওয়া হয়, কিন্তু তিনি গ্রহণ করতে অসম্মতি জানান।’
আব্বাসি যুগে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালনে অসম্মতি সংক্রান্ত উদাহরণের আমরা এখানেই ইতি টানছি। এমন অসম্মত ব্যক্তিদের সংখ্যা অনেক। অধিকাংশ সময়ই সেটা অনুসরণীয় রীতি আর প্রশংসনীয় পন্থায় পরিণত হয়েছিল। আবু বকর ইবনু মূসা আল-খাওয়ারিযমি (৪০৩ হিজরি), শামবাসীদের ফকিহ আওযায়ি (১৫৭ হিজরি), জাসসাস আল-হানাফি (৩৭০ হিজরি) -সহ আরও অনেকেই আছেন এই তালিকাতে।
টিকাঃ
[৫৭৯] যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯-এ অধ্যাপক আহমাদ আমিন দাবি করেছেন, আব্বাসি যুগের বিচারকরা বাধ্য হয়ে নয়তো সম্পদের লোভে পড়ে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এটা নিঃসন্দেহে বানোয়াট ইতিহাস এবং বাস্তবতা বিবর্জিত কথা। এ কথা ঠিক যে, কোনো কোনো বিচারক সম্মানত বা বস্তুগত চাপের কারণে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তবে নিরাপত্তার খাতিরে যারা এ দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহী হয়েছিলেন, তাদের কথা ভিন্ন। আর কারও কারও দায়িত্ব গ্রহণ ছিল সম্পদের লোভে পড়ে কিংবা জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে। তবে এ ধরনের অবস্থা খুবই বিরল আর কম ছিল। বিরল বিষয় দিয়ে উদাহরণ পেশ করা যায় না। বরং তা ব্যতিক্রম হিসেবেই সাব্যস্ত হয়। আবার দ্বিতীয় আব্বাসি যুগের একটা সময় পর্যন্তই সেটা সাব্যস্ত বলে জানা যায়। কিন্তু ঢালাওভাবে এবং ব্যাপক হারে সবার ওপর তা চাপিয়ে দেওয়া কোনোমতেই বৈধ হতে পারে না। যেসব বিচারক জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তারাও যে সত্য এবং ন্যায়পরায়ণতার প্রতি যত্নবান ছিলেন—তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
[৫৮০] যুদ্ধাইল ইবনু ইয়াছ বলতেন, ‘বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালনকারীর উচিত এক দিন দায়িত্ব পালন করা এবং এক দিন কান্না করা।’ আখবারুল কুদ্দাহ: ১/২৪-২৫
[৫৮১] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৭৩ এবং ৭৪
[৫৮২] যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৮৩] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১০/৯৭
[৫৮৪] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৫৯; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৭২
[৫৮৫] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৭২ এবং ৭৪; তারীখু কুদ্ধাতিল উনদুলুস, পৃ. ১৫ এবং ২৪
[৫৮৬] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ২৪; যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৮৭] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ১৫
[৫৮৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/২৭ এবং ৩/১৮৪
[৫৮৯] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/১৮৪; খুলাসাতু তাহযীবিল কামাল: ১/২৪১; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/২২
[৫৯০] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ১৫; মারজিউল উলুমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৩৯৯
[৫৯১] তারীখুল মাযাহিবিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৬৩
[৫৯২] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ১৫ এবং ২৫
[৫৯৩] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ১/৩০২; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০০
[৫৯৪] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০১
[৫৯৫] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৩৭৮
[৫৯৬] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১২৯; মুরূজুয যাহাব: ৩/৩২২
[৫৯৭] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪২০
📄 প্রধান বিচারপতি
আব্বাসি যুগে ইসলামি বিচারব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো ‘কাযিউল কুযাত’ তথা প্রধান বিচারপতির পদ চালু হয়েছিল। হিজরি ১৭০ সালে বা তারও পরে আব্বাসি খলিফা হারুনুর রাশিদ বাগদাদে এই পদ চালু করেন। এ সময় ইতিহাসে ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধি সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পেয়েছিল। খিলাফতের নানাধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে খলিফা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। রাষ্ট্রের দায়িত্বগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছিল। তাই খলিফা নিজের বোঝা লাঘব করার জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এমন কাউকে দেবেন বলে মনস্থ করলেন, যিনি বিচারব্যবস্থা সহজীকরণ এবং বিচারকদের তত্ত্বাবধান করার ক্ষেত্রে খলিফার স্থলবর্তী হবেন। এসব চিন্তা করেই খলিফা আর-রাশিদ এই পদ চালু করেন। প্রথমবার এই পদের অধিকারী হলেন বাগদাদের বিচারপতি ইমাম আবু ইউসুফ। তিনি ছিলেন আবু হানিফা -এর সহচর এবং আল-খারাজ গ্রন্থের লেখক। ১৮২ হিজরিতে ইন্তেকাল করা পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। আল-হাদি, আল-মাহদি এবং আর-রাশিদ—এই তিন আব্বাসি খলিফার সময় তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। আবু ইউসুফ-কে খলিফা আর-রাশিদ খুব সম্মান করতেন। পরবর্তীকালে প্রাচ্য এবং প্রতীচ্যে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর কাছে অর্পণ করেন। তখন তাঁকে ‘কাযি কুযাতিদ দুনইয়া’ তথা দুনিয়ার প্রধান বিচারপতি বলা হতো।
কোনো কোনো লেখক প্রধান বিচারপতি নিয়োগের এই পদ্ধতিটি পারসিকদের থেকে গৃহীত বলেছেন। তাদের মাঝে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রচলন ছিল। প্রমাণস্বরূপ তারা আরবি সাহিত্যিক আল-জাহিযের সাথে সম্পৃক্ত পত্রের কথা উল্লেখ করেন, যা খলিফা হারুনুর রাশিদের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছিল। আবার এ কথাও বলা হয় যে, হারুনুর রাশিদের যুগে বার্মাকিরা ইসলামি রাষ্ট্রে এ পদটি চালু করেছিল। তারপর খলিফা নিজেই তার প্রচলন এবং বাস্তবায়ন করেন।
প্রধান বিচারপতির পদটি বর্তমানে আইনমন্ত্রীর সমপর্যায়ের ধরা যায়। এর মাধ্যমে খলিফা ও প্রশাসকদের কর্তৃত্ব থেকে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা যেমন পোক্ত হয়, তেমনি প্রশাসনের নাগপাশ থেকে বিচারকরা মুক্তি লাভ করেন। তারা কেবল প্রধান বিচারপতিরই অনুগত থাকতেন। খিলাফতের মাঝে বিচার-সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের দায়িত্বশীল হতেন প্রধান বিচারপতি। বিচারক নিয়োগ, তাদের তত্ত্বাবধান, বিচারকদের নজরদারিতে রাখা ছিল প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব। বিচারকদের জীবনচরিত তালাশ, তাদের প্রদত্ত রায় নিরীক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণ তিনিই করতেন। প্রয়োজনবোধে বিচারকদের পদচ্যুত যেমন করতেন, তেমনি তাদের কর্মপরিধিও নির্দিষ্ট করে দিতেন। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের বিচারক হলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন প্রধান বিচারপতি। তার নির্বাচনের মাধ্যমেই বিচারকরা ধারা মেনে কাজ করতেন। পরবর্তীকালে বাগদাদের এবং পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন আঞ্চলিক বিচারক নিযুক্ত করা প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব হয়ে যায়।
প্রধান বিচারপতির অবস্থান ছিল খলিফার অতি নিকটবর্তী। অনেক সময় তাকে ‘খলিফার বিচারক’ নামেও অভিহিত করা হতো। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নির্ধারণে তার সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। অনেক সময় সফরে, শোভাযাত্রায় এবং মন্ত্রীদের বিচারের শুনানিতে তিনি খলিফার সাথেই থাকতেন। আর খলিফা হারুনুর রাশিদ তো ইরাক, খোরাসান, শাম এবং মিশরে কেবল সেসব লোকদেরই বিচারকরূপে নিযুক্ত করতেন, যাদের ব্যাপারে বিচারপতি আবু ইউসুফ সন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন।
আবু ইউসুফ এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ভালোমতোই পালন করেছিলেন। বিচারকদের তত্ত্বাবধানের কাজে তিনি ছিলেন বিশেষভাবে মনোযোগী। তিনিই সর্বপ্রথম আলিম এবং বিচারকদের পোশাক পরিবর্তন করে বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধানের রেওয়াজ চালু করেন। এর আগে সাধারণ মানুষের পোশাকের সাথে তাদের কোনো তফাত ছিল না। লম্বা টুপির ওপর পাগড়ি এবং সবুজ রঙের লম্বা চাদর পরিধানের পদ্ধতি চালু করেন তিনি। যা ছিল আপমার জনতার মাঝে তাদেরকে সহজে চেনার পরিচায়ক এবং বিচারকদের বিশেষ মর্যাদা জানতে পারার সুবিধাজনক পদ্ধতি।
বাগদাদে ছিল ‘দিওয়ানু কাযিল কুযাত’ তথা প্রধান বিচারপতির বিশেষ দফতর। এখানে যারা চাকরি করতেন তাদের মাঝে দেহরক্ষী, মুনশি, পেশকার এবং নথি সংরক্ষক ছিল প্রসিদ্ধ। এখানে বিচার-সংক্রান্ত বিষয়াদি সুসংগঠিত করা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারকের কার্যাবলী বিন্যস্ত করা হতো।
প্রধান বিচারপতির পদটি প্রথম যখন চালু হয়, তখন সেটি বাগদাদেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাগদাদের বিচারককেই কেবল এই পদবি প্রদান করা হতো। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ইসলামি অঞ্চলগুলো যখন বাগদাদের শাসন থেকে পৃথক হয়ে যায়, তখন প্রশাসকরা প্রতিটি অঞ্চলে বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বিচারক নিয়োগ দেন। এই বিচারকরা ছিলেন প্রধান বিচারপতির স্থলবর্তী। অনেক সময় তাদেরকে এই পদবিও প্রদান করা হতো। দামিস্ক, মিশর, বাগদাদ, মদীনা, খোরাসান-সহ অন্যান্য অঞ্চলে আলাদা আলাদা প্রধান বিচারপতি ছিলেন। কখনো কখনো একই অঞ্চলে একাধিক প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করতেও দেখা গেছে। সেটা হতো চার মাযহাবের ভিত্তিতে কিংবা স্থানগত পরিধি হিসেবে। যেমন, মিশরের উচ্চ ভূমি এবং নিম্ন ভূমিতে পৃথক পৃথক প্রধান বিচারপতি ছিল।
ফাতিমি সাম্রাজ্যের সময় মিশরে প্রধান বিচারপতি ছিল ফাতিমি শিয়া। তার দায়িত্ব ছিল মিশরের প্রতিটি শহরে বিচারক নিয়োগ দেওয়া। যাদেরকে ‘নাওয়াবুল হুকম’ নামে অভিহিত করা হতো। ফাতিমি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর ছড়িয়ে পড়া শিয়াদের নীতি থেকেই অধিকাংশ বিচারকরা সহায়তা গ্রহণ করতেন। আবুল হাসান আলি ইবনুন নুমান ছিল একজন কট্টরপন্থি শিয়া। ৩৬৬ হিজরিতে সে মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সে-ই মিশরে নিযুক্ত সর্বপ্রথম প্রধান বিচারপতি। তার ওপর ছিল তৎকালীন মিশরের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। মিশরের সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি ছিল সে। তাকে কেউ টেক্কা দিতে পারত না। আইনি বিধানাবলি, নামাজ কায়েম, শাস্তি বিষয়ক অধিদপ্তর এবং স্বর্ণ-রৌপ্যের কোষাগার তার অধীন হতো। সে ছিল মন্ত্রীর পদমর্যাদায়। মিশরের সুলতান তাকে সাথে নিয়ে মিম্বরে বসত। তাকে কিছু বলার সাহস কেউ রাখত না, আর তার পদের প্রতিও আকাঙ্ক্ষা করার সাহস কারও হতো না। আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের খোঁজখবর রাখা, তাদের কাজ পর্যালোচনা করা এবং তাদের ফয়সালার ওপর সে নজরদারি করত। ফাতিমি সাম্রাজ্যের প্রদেশগুলোর ওপর তার কর্তৃত্বের বিস্তার ঘটছিল।
আইয়ুবি যুগে মিশরে একজন মাত্র বিচারক কায়রোতে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। আর বাকি অন্য সব প্রদেশ ছিল কায়রোর অনুগামী। কায়রোর বিচারকই কেবল অন্যান্য প্রদেশে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন। এ হিসেবে তিনি ছিলেন প্রধান বিচারপতির সমপর্যায়ের। আবার অনেক সময় কায়রোর জন্য এবং মিশরের নিম্ন ভূমির জন্য একজন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো। যেমনটা ঘটেছিল আল-ইজ্জ ইবনু আবদিস সালামের ক্ষেত্রে। তিনি কায়রো এবং মিশরের উঁচু ভূমিতে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
যাহির বাইবার্সের সময় মিশরে চার মাযহাব অনুসারে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য চারজন বিচারক নিযুক্ত করা হয়েছিল। এই চারজনের প্রত্যেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচারক নিয়োগ প্রদানের অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন। সে হিসেবে এদের প্রত্যেকেই ছিলেন নিজ নিজ মাযহাবের প্রধান বিচারপতি। যারা প্রধান বিচারপতি নামে প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন—ইয়াকুব আবু ইউসুফ ইবনু ইবরাহীম, ইয়াহইয়া ইবনু আকসাম, আবু আবদিল্লাহ আহমাদ ইবনু আবি দাউদ, আবু ইসহাক ইসমাঈল আল-আযদি এবং আবু আবদিল্লাহ দাউদ আল-আয়াদি প্রমুখ। আবু ইউসুফের মাধ্যমে এই পদের সূচনা হয়েছিল। ইবনু আকসাম ছিলেন খলিফা আল-মামুনের প্রধান বিচারপতি এবং মন্ত্রী। এই পদের মাধ্যমে তিনি যে সম্মান আর মর্যাদা পেয়েছিলেন, তা অন্য কেউ পাননি। আবু আবদিল্লাহ দাউদ ছিলেন খলিফা আল-মুতাসিম কর্তৃক নিযুক্ত প্রধান বিচারপতি। খলিফার শোভাযাত্রাতেও তিনি শরিক থাকতেন।
টিকাঃ
[৫৯৮] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৩৭৭
[৫৯৯] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৯৬; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৪২; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৭/১৮৩
[৬০০] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৯৬
[৬০২] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ ফী ইযযিল আরব, পৃ. ১৪৭
[৬০২] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৫
[৬০০] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৫; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৯৭
[৬০৪] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৯৭; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৪৮; আবকারিয়্যাতুল ইসলাম, পৃ. ৪২৪
[৬০৫] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৪৩; আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ৪৮; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৯৮; হুসনুলমুহাদ্বারাহ: ২/১৫৩
[৬০৬] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৯৮; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৭; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ১/৫২১, ২/১৪৮; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৪৪
[৬০৭] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৮
[৬০৮] কাযিউল কুযাতকে স্পেনে কাযিউল জামাআত বলা হতো। এই পদাধিকারীর কর্তব্য ছিল বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারক নিযুক্ত করা। সামনে বিষয়টি আলোচনা হবে। (নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৪৪)
📄 বিচারকের সহকারী
আব্বাসি যুগে প্রধান বিচারপতির পাশাপাশি প্রধান বিচারকের সহায়কের কথাও জানা যায়। উমাইয়া যুগেও এই সহকারীর প্রচলন ছিল। আব্বাসি যুগে রাজত্বের পরিধি বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে জনগণের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। স্বভাবতই ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ আগের যুগের তুলনায় শিথিল হয়ে পড়ে। ফলে মামলা-মোকদ্দমাও বেড়ে চলছিল। তাই সুষ্ঠুভাবে মোকদ্দমা নিরসন করার জন্য সহকারী আবশ্যক হয়ে পড়ে।
ক. সহকারী বিচারক: তার দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন শহরে এবং গ্রামে বিচারকের প্রতিনিধি হিসেবে মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা করা। সফর, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে বিচারক অনুপস্থিত থাকলে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েও তিনি বিচার করতেন। এ ক্ষেত্রে শর্ত প্রযোজ্য ছিল। প্রধান বিচারপতির পদ চালু হওয়ার পর তার পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষ অনুমতি ছাড়া কেউ তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারতেন না। আর তিনিই দেশের সর্বত্র বিচারক নিযুক্ত করতেন।
খ. মুনশি: রাশিদুন যুগ এবং উমাইয়া যুগেও ক্ষেত্রবিশেষে এই মুনশির প্রচলন ছিল। তবে আব্বাসি যুগে তার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়। মুনশির বিবরণ নিয়ে আলিমদের অনেকেই বই লিখেছেন। যাদের মাঝে আছেন মুনশি আবদুল হামিদ। যার গ্রন্থের অনেক রেফারেন্স ইবনু খালদুনের আল-মুকাদ্দিমাহ গ্রন্থে আছে। এ ছাড়াও জাহশিয়ারি, আল-মাওয়ারদি-সহ আরও অনেকেই এ বিষয়ে কলম ধরেছেন। মুনশি কী কী কাজ করতেন, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখানে তুলে ধরা সম্ভব নয়। উভয় পক্ষের বক্তব্য, সাক্ষীদের সাক্ষ্য আর বিচারকের রায় লিখে রাখা, বাদী-বিবাদীর উপস্থিতি অনুসারে মোকদ্দমা প্রস্তুত করা, বিচারকের সামনে তা সুন্দরভাবে পেশ করা এবং মুসাফির বা অক্ষম ব্যক্তি ছাড়া কাউকে সুবিধা না দেওয়াটাও ছিল তার কাজের অন্তর্ভুক্ত।
গ. ঘোষক: তার দায়িত্ব ছিল বিচারকের পাশে দাঁড়িয়ে তার মর্যাদা বিষয়ক ঘোষণা দেওয়া। বাদী-বিবাদীর উদ্দেশ্যেও বিভিন্ন ঘোষণা দিতেন। উমাইয়া যুগেও এ ঘোষকের প্রচলন ছিল।
ঘ. প্রহরী, পুলিশ এবং সহায়ক: এরা ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। বিচারকার্য সুষ্ঠুভাবে হওয়ার জন্য পরিবেশ নিরাপদ রাখা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং বাদী-বিবাদী পক্ষের লোকেরা কে কোথায় বসবে সেটা ঠিক করে দেওয়া ছিল এদের কাজ। আদালতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, বিচারকের কাছে হুজুম না করা, এজলাসের নীতি মেনে চলা, আদালতের বাইরের পরিবেশ সুশৃঙ্খল রাখা এবং বিচারক আর এজলাসের ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখার দায়িত্বও তারা পালন করতেন।
ঙ. তদন্ত কর্মকর্তা: আব্বাসি যুগেই এ পদটি সর্বপ্রথম চালু হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বিচারকের সামনে উত্থাপিত বিষয়ের যথার্থতা যাচাই করা। আবু হানিফা -এর বিশিষ্ট সহচর বিচারক মুহাম্মাদ ইবনু আবদির রহমান ইবনি আবি লাইলা সর্বপ্রথম এ পদটি চালু করেন। উমাইয়া যুগেও তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। সর্বমোট ৩৩ বছর বিচারকার্য পরিচালনার পর অবশেষে ১৪৮ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। আল-কিনদি বর্ণনা করেন, ১৭৪ হিজরিতে মিশরের বিচারক ছিলেন আল-মুফাদদাল ইবনু ফাদ্বালাহ। সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনি তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিলেন। যার মূল কাজ ছিল সততা যাচাই করা। সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে নাকি প্রত্যাখ্যাত, যাচাইকারী সেটা বিচারকের কাছে উল্লেখ করতেন। আল-কিনদি আরও বলেছেন, খলিফা মানসুরের সময় গাউস ইবনু সুলাইমানই সাক্ষীদের ব্যাপারে প্রথম তদন্ত করেন।
চ. বণ্টনকারী: পাওনাদারদের মাঝে পাওনা বণ্টন করা এবং জমি-সংক্রান্ত মোকদ্দমার ক্ষেত্রে সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছিল তার কর্তব্য। অনেক সময় তাকে ‘হিসাবকারী’-ও বলা হতো। যার বিবরণ ও নীতি সম্পর্কে আল-মাওয়ারদি বলেছেন, ‘বিচারকের মতোই গবেষণার ভিত্তিতে বণ্টনের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। তবে মুনশি কর্তৃক রায় সংরক্ষণ করা এবং শোনা বক্তব্য নথিভুক্ত করার বিষয়টি ছিল ভিন্ন। তার কোনো রকম গবেষণার সুযোগ থাকত না।’ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ -এর পৌত্র কাসিম ইবনু আবদির রহমান বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না। তিনি বলতেন, ‘চারটি কাজে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক নেওয়া যায় না। সেগুলো হচ্ছে: বিচারকার্য পরিচালনা, আযান দেওয়া, হিসাব-নিকাশ করা এবং কুরআন পড়া বা পড়ানো। আর হিসাব-নিকাশ মানে হচ্ছে বণ্টন করা।’
ছ. দায়িত্বশীল: এই কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ছিল বিচারকদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করা। যেমন ইয়াতিম, অসহায়-অক্ষম, নাবালেগ এবং অনুপস্থিত ব্যক্তিদের সম্পত্তি দেখাশোনা করা। উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি বণ্টন হওয়ার আগ পর্যন্ত দেখভাল করাও ছিল তাদের দায়িত্ব। বিচারক আবদুল্লাহ ইব্ন সাওয়্যার সর্বপ্রথম লোক নিয়োগ দিয়ে সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব প্রদান করেন। এর আগে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ওসিয়তকৃত ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দেওয়া হতো। হারিস ইবনু মিসকিন ছিলেন মিশরে এ পদ চালুকারী বিচারকদের অন্যতম।
জ. আদালতের নথি সংরক্ষক: এ পদের লোকের দায়িত্ব ছিল বিচারকের সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ বিশেষ স্থানে সংরক্ষণ করে রাখা। যাতে বহিরাগত লোকজন থেকে তা নিরাপদ থাকে এবং বিচারক সহজেই তা খুঁজে বের করতে পারেন। আবার বিচারকের মৃত্যু হলে কিংবা তাকে পদচ্যুত করা হলে নতুন নিযুক্ত বিচারকও যেন তা দেখতে পারেন। প্রয়োজনে পূর্ববর্তী সাক্ষ্য, মোকদ্দমা ও রায়কে সামনে রাখতে পারেন। এ ধরনের ব্যবস্থা মিশরেও চালু ছিল বলে আল-কিন্দি জানিয়েছেন।
এসব সহায়ক ছাড়া দোভাষীরও প্রচলন ছিল। কারণ অনেক জনগোষ্ঠী ইসলামি খিলাফতের অধীনে চলে আসছিল। যাদের মাঝে ভাষাগত কোনো মিল ছিল না। তাই ভিনভাষী বাদী-বিবাদী এবং সাক্ষীদের বক্তব্য বোঝার সুবিধার্থে বিচারকরা দোভাষী নিয়োগ দিয়েছিলেন। বিচারকের রায় ভাষান্তর করে দেওয়াও ছিল এই দোভাষীদের কাজ।
টিকাঃ
[৬০৯] তারীখুল কাদা, পৃ. ৯৬
[৬১০] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২৪৮; আল-উযাবাউ ওয়াল কুত্তাব, পৃ. ৭৪; আদাবুল কাছি: ২/৫৭; উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ, পৃ. ৬৬
[৬১১] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৯
[৬১২] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪০৮
[৬১৩] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪১১; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৯
[৬১৪] আখবারুল কুদ্বাহ : ৩/১৩৮; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৮৫; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪০৯; উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ, পৃ. ৬৬
[৬১৫] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৬১
[৬১৬] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪০৭
[৬১৭] আদাবুল কাদ্বি: ২/৬৫
[৬১৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/৭
[৬১৯] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪১৮; আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৬৯
[৬২০] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৪৬৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪১৯
[৬২১] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৫৭৪
[৬২২] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪২৩
📄 আব্বাসি খলিফাগণ এবং অন্যায়ের বিচার
আব্বাসি খিলাফতকালে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করা এবং অপসারণের দায়িত্ব থেকে খলিফাদের সরে যাওয়ার কথা শুনলে মনে হতে পারে, তারা বুঝি বিচারকার্য সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন, সত্য এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না। অথচ বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিচারব্যবস্থার প্রতি পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে তারা ভীষণ যত্নবান ছিলেন। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য বিচারক এবং প্রধান বিচারপতিকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। অপরদিকে বিচারব্যবস্থার এমন দিকে তারা নিজেরা মনোনিবেশ করেছিলেন, যা বাস্তবায়ন করতে ন্যায়পরায়ণতার পাশাপাশি প্রশাসকের ক্ষমতারও দরকার পড়ে। সেটা হলো অন্যায় দমন সংক্রান্ত বিচার। আব্বাসি খলিফাগণ প্রথম থেকেই এর প্রতি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন।
উমাইয়া যুগে শাসকগোষ্ঠী, প্রশাসক এবং নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে হওয়া দুর্নীতি আর অন্যায়ের বিচারকার্যের জন্য সপ্তাহে একদিন বরাদ্দ ছিল। পরবর্তীকালে কোনো কোনো খলিফা এই নীতির ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে আব্বাসি যুগের খলিফাগণ এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অনেক সময় তারা নিজেরাই এ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। আবার কখনো-বা কোনো মন্ত্রী বা বিচারককে দায়িত্ব দেওয়া হতো।
সরকারি কর্মকর্তাদের দেখভাল করা এবং তাদের ন্যায়পরায়ণতার ওপর নজরদারি করার ব্যাপারে খলিফা মানসুর নিজেই উদ্যোগ নেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থেকে এক দানিকের হিসাবও তিনি গ্রহণ করতেন। এজন্য তাকে ‘আবুদ দাওয়ানিক’ বা প্রধান ব্যবস্থাপক বলা হতো। মানসুরের পর অন্যায়ের বিচারের জন্য খলিফা আল-মাহদি নিজেই এজলাসে বসতে শুরু করেন। আব্বাসি খলিফাদের মাঝে এ রীতি তিনিই প্রথম চালু করেছিলেন। তিনি এত বিপুল পরিমাণে দান-খয়রাত শুরু করেন যে, খলিফা মানসুরের সঞ্চয়কৃত সম্পদ শেষ হয়ে যায়। দুর্নীতি দমন আর অন্যায়ের বিচার করার জন্য তিনি বিশেষ প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি এ সংক্রান্ত দফতরও খুলেছিলেন। যা ‘দিওয়ানুল মাযালিম’ বা মজলুমদের অধিদপ্তর নামে পরিচিত ছিল। তার পর এজলাসে বসেন খলিফা আল-হাদি। এরপর খলিফা আর-রাশিদ এ ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি অনেকটা সময় এই কাজে ব্যয় করতেন। যার পেছনে অনুঘটক ছিল আবু ইউসুফ -এর হিতাকাঙ্ক্ষাসূচক পত্র। যা-তে খলিফার উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছিলেন, ‘ন্যায়পরায়ণতা, অত্যাচারিতের প্রতি সুবিচার এবং অত্যাচার থেকে বিরত থাকলে দেশ আবাদ হবে। ... আমিরুল মুমিনীন! আপনি মাসে কিংবা দুই মাসে এক বার প্রজাদের সাথে হওয়া অন্যায় নিয়ে বসলে ভালো হবে। উক্ত বৈঠকে আপনি মজলুমের কথা শুনবেন এবং জালিমকে শাস্তি দেবেন।’
খলিফাদের মাঝে আর-রাশিদই প্রজাদের ব্যাপারে অধিক খোঁজখবর রাখতেন। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন বেশি যত্নবান। এ ক্ষেত্রে তিনিই সর্বাধিক দৃঢ় প্রত্যয়ের পরিচয় দিয়েছিলেন।
আমিরুল মুমিনীন আল-মামুন প্রতি রবিবার অন্যায়ের বিচার করতে বসতেন। অন্যায়কারী কর্মকর্তাদের শাস্তি খলিফা কিংবা উজিরদের সামনেই কার্যকর হতো।
খলিফা হওয়ার পর আল-ওয়াসিক বিল্লাহ বনু উমাইয়ার দখলকৃত সম্পত্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আল-মুহতাদি বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসিক খলিফা হলে তিনি চারটি দরজাবিশিষ্ট একটি গম্বুজ নির্মাণ করেছিলেন। যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘কুব্বাতুল মাযালিম’ তথা অত্যাচার দমনের গম্বুজ। খলিফা নিজেই সাধারণ এবং বিশেষ শ্রেণির নাগরিকের বিচারকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে সেখানে বসতেন। আব্বাসি খলিফাদের মাঝে তিনিই ছিলেন সর্বশেষ, যিনি সেখানে অন্যায় দমনের উদ্দেশ্যে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বসতেন। অবশেষে উপযুক্ত ব্যক্তিদের হাতে রাজত্ব চলে যায়।
প্রথম মন্ত্রী বা সুলতান অথবা কোনো বিচারক অন্যায় দমনের জন্য বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এরপর খলিফা আয-যাহির বি আমরিল্লাহও মজলুমের কাছে তার হক ফিরিয়ে দিতেন।
সাধারণত সৈনিকরা তাদের বেতন কমিয়ে দেওয়া কিংবা বেতন প্রদানে বিলম্ব হওয়ার যে অভিযোগ করত, তা দেখা ছিল অন্যায় দমন সংক্রান্ত বিচারকের দায়িত্ব। যদিও এর সমাধান করা সাধারণ বিচারকের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
বাগদাদের আব্বাসি খিলাফত থেকে যেসব অঞ্চল পৃথক হয়ে গিয়েছিল, সেসব অঞ্চলেও অন্যায় ও দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত বিচারে নজরদারি করার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছিল। মিশরে তুলুনি রাজবংশ, ইখশিদি রাজবংশ এবং ফাতিমি খিলাফতের সময়ও অন্যায় আর দুর্নীতি দমন বিষয়ক অধিদপ্তর ছিল। ফাতিমি খলিফাগণ অন্যায় ও দুর্নীতির বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এর আগে ৩৪০ হিজরি সালে মুহাররম মাসের শুরুতে প্রত্যেক শনিবারে কাফুর আল-ইখশিদিও দুর্নীতির বিচার করতে বসতেন।
দুর্নীতি-সংক্রান্ত আদালতের কার্যক্রম চলত খলিফা, মন্ত্রী, প্রশাসক কিংবা এ সংক্রান্ত বিচারকের নেতৃত্বে। এ আদালতে পাঁচটি ইউনিটের কাজ ছিল। ইউনিটগুলো এবং তাদের কাজ ছিল এমন,
ক. রক্ষীবাহিনী এবং তাদের সহযোগী। যাদের কাজ ছিল সহিংসতা করতে বা পালাতে চাওয়া লোকদের নিয়ন্ত্রণ করা।
খ. প্রশাসক এবং বিচারক। বিচারের রায় পরিপূর্ণরূপে জেনে হকদারের কাছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের দলিল-প্রমাণ পর্যবেক্ষণ করা এবং তাদের ওপর শারঈ আইন বাস্তবায়ন করার জন্য এরা থাকতেন।
গ. ফকিহগণ। শারঈ কোনো মাসআলায় জটিলতা তৈরি হলে তার সমাধানকল্পে পরামর্শের জন্য তারা উপস্থিত থাকতেন।
ঘ. মুনশি। এ ইউনিটের কাজ ছিল পক্ষে-বিপক্ষের দলিল-প্রমাণ এবং বক্তব্য লিখে রাখা।
ঙ. বাদী-বিবাদী এবং বিচারকের ফয়সালার ব্যাপারে সাক্ষী হিসেবে একটি ইউনিট থাকত।
অনেক সময় খলিফা নির্দিষ্ট একটি দিনে বিচারপ্রার্থীদের উদ্দেশ্যে বসতেন। বিচার নিয়ে লোকেরা তার কাছে আসত। আবার অনেক সময় নির্ধারিত ব্যক্তির অন্যায় বা দুর্নীতির বিচার করতে ডাকা হতো। প্রতিদিনই এরকম কার্যক্রম চলমান ছিল। দুর্নীতি ও অন্যায় দমনে আব্বাসি যুগের চমৎকার সব উদাহরণ রয়েছে। সেগুলোর প্রতিটির ধরনে যেমন ভিন্নতা ছিল, তেমনি সেসবের গভীরতাও ছিল চমকপ্রদ। তবে এখানে তা আলোচনা করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য।
টিকাঃ
[৬২৪] এক দিরহাম তথা রৌপ্যমুদ্রার ছয় ভাগের এক ভাগকে এক দানিক বলা হয়।
[৬২৫] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৫৯; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ : ২/২০১; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১২৭
[৬২৬] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৮; তারীখুদ দাওলাতিল আব্বাসিয়্যাহ, পৃ. ৯৪; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৩৬; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ৯৪
[৬২৭] আল-খারাজ, পৃ. ১১১ এবং ১১২
[৬২৭] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৪০; আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৮
[৬২৮] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৮; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৬৭
[৬২৯] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৭০
[৬৩০] মুরূজুয যাহাব: ২/৪৩১; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৭৫; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৪৫
[৬৩১] সুবহুল আ’শা: ৩/৪৯৭, ৩/৫২৫, ৪/৪৪, ৫/১৪৪, ৬/২০২, ৬/২০৪ এবং ৬/২০৭ দ্রষ্টব্য
[৬৩২] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬৫
[৬৩৩] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭১; সুবহুল আ’শা: ৩/৪৯৭; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৯৫
[৬৩৪] আন-নুযুমুল কাদ্বাইয়্যাহ, পৃ. ৭১; আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ১৩৭
[৬৩৫] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৯
[৬৩৬] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৮৪, ৮৫, ৯০ এবং ৯১। আরও দেখতে পারেন, আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ১৪৬; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৮৩, ৫৫৩, ৫৬১ এবং ৫৮৫।