📄 দ্বিতীয় টার্মের আব্বাসি যুগের বিচারক
খলিফা মুতাওয়াক্কিলের পর বাগদাদ থেকে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে প্রাদেশিক শাসকদের কর্তৃত্ব শক্তিশালী হয়। আব্বাসি খিলাফতের অধীনে থেকেই তারা স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকে। বাগদাদেও অনেক সময় খলিফার কর্তৃত্ব কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। খলিফার নাম ব্যবহার এবং তার জন্য দুআর প্রচলন থাকলেও প্রাদেশিক শাসক এবং বিচারকই শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। যেমন: ইদরিসীয় রাজবংশ, উত্তর আফ্রিকায় আগলাবি সালতানাত, সিরিয়ার উত্তরাংশে হামদানি রাজবংশ, মিশর ও সিরিয়াতে ফাতিমিরা, বাগদাদ ও পারস্যে বুওয়াইয়া রাজবংশ, পূর্ব দিকে খোয়ারিজমীয় সাম্রাজ্য এবং ইয়ামানে ছিল যিয়াদিরা। স্বায়ত্তশাসিত এসব প্রদেশ নিজেরাই নিজেদের বিচারক নিয়োগ দিত। কখনো-বা বিচারক নিয়োগে তারা বাগদাদে থাকা প্রধান বিচারপতিকে সহায়তা করত।
সংক্ষেপে বলা চলে, আব্বাসি যুগে অনেকের পক্ষ থেকে বিচারক নিয়োগের প্রচলন ছিল। যেমন খলিফা নিজেই বিচারক নিয়োগ দিতেন। আবার খলিফার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত উজিররা বিচারকদের নিয়োগ দিতেন। আমিরুল উমারা তথা উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং প্রধান বিচারপতি ও বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনকর্তাদের মাধ্যমেও বিচারক নিয়োগ হতো।
টিকাঃ
[৫৬৬] আল-খিলাফাতুল আব্বাসিয়্যাহ, পৃ. ৮৫, ১০২, ১১৭, ১৬৮ এবং ৩০৯।
📄 বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা
আব্বাসি যুগে বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে পৃথক হয়ে যায়। এটার ধারাবাহিকতা মূলত নবি-যুগ থেকেই শুরু হয়েছিল। আসলে সে-সময় প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং বিচার বিভাগ সাধারণত একজনের অধীনেই পরিচালিত হতো। আবু বকর-এর পূর্ণ খিলাফতকাল এবং উমর-এর খিলাফতকালের একাংশ অবধি পরিস্থিতি এমনই ছিল। অবশেষে উমর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এজন্যই মুআবিয়া-কে তিনি বলে পাঠিয়েছিলেন, ‘উবাদার ব্যাপারে আপনার কোনো কর্তৃত্ব নেই।’
কিন্তু খলিফা এবং প্রাদেশিক শাসক কর্তৃক বিচারক নিয়োগ দান এবং অপসারণের রীতি চলমান ছিল। আবার কোনো কোনো প্রশাসক নিজেরাই বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এভাবেই চলে আসে মুআবিয়া-এর সময়কাল। তখন তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারক নিযুক্ত করার দায়িত্ব প্রাদেশিক শাসকদের ওপর ন্যস্ত করেন। ক্ষমতাকে তিনি এক স্থানে কেন্দ্রীভূত করেননি। কেননা প্রাদেশিক শাসকই তার প্রদেশের লোকদের যোগ্যতা সম্পর্কে ভালো জানবেন। অধিকতর যোগ্য, বিদ্বান, জ্ঞানী এবং পরহেজগার ব্যক্তিকে নিয়োগ দান তাদের পক্ষেই সম্ভব। আর প্রদেশে সুবিচার এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা হলো বিচারকের দায়িত্ব। পরবর্তী সময়ে তার উত্তম সহযোগী এবং শ্রেষ্ঠ সহায়ক তৈরি হবে। আর প্রাদেশিক শাসকের কর্তব্য হলো বিচারকের বিধান বাস্তবায়ন করা। এজন্যই উভয়ের মাঝে জোরদার সম্পর্ক আর পূর্ণ সামঞ্জস্য হওয়া প্রয়োজন। তাহলেই পারস্পরিক সহযোগিতা পূর্ণতা পাবে। এটা ছিল মুআবিয়া-এর দৃষ্টিভঙ্গি।
নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষণ এবং গুরুত্ব আর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনের অভিপ্রায়ে খলিফা মানসুর বিভিন্ন স্থানে বিচারক নিযুক্তির দায়িত্ব নিজের কাছে ফিরিয়ে আনেন। আরেকটি কারণ ছিল, বিচারক নিযুক্তি এবং অপসারণের দায়িত্ব পেয়ে কিছু কিছু প্রশাসক সুযোগের অসদ্ব্যবহার করছিল। যার ফলে কতক অঞ্চল নষ্ট হয়ে যায়। তাই মানসুরের ইচ্ছা ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং খিলাফতের প্রতিটি প্রান্তে ন্যায়বিচারের ধারা চালু করে দেওয়া। অবশ্য পরবর্তীকালে এই দায়িত্ব তিনি বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ এবং প্রাদেশিক শাসকদের কাছে ন্যস্ত করেন। এভাবেই চলছিল। অবশেষে খলিফা হারুনুর রাশিদ তার সময়কালে আবু ইউসুফকে প্রধান বিচারপতি বানিয়ে খিলাফতের অধীনস্থ সমস্ত অঞ্চলে বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব তাঁকে প্রদান করেন। খলিফা কেবল প্রধান বিচারপতির মনোনীত লোকদেরই বিচারক নিযুক্ত করতেন। বিচারকদের নিয়োগের আগে যাচাই-বাছাই, সার্বিক খোঁজখবর, নজরদারি, বিচারকার্য পরিচালনার পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হওয়া-সহ বিচারকদের ভাতা নির্ধারণ, তাদের সুযোগ-সুবিধা এবং কর্তব্যে অবহেলাকারীকে পদচ্যুত করা ছিল প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব।
আর-রাশিদের পর খলিফাগণ রাজধানী-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারক নিযুক্ত করা থেকে সম্পূর্ণরূপে হাত গুটিয়ে নেন। এ বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে প্রধান বিচারপতির কাছে ছেড়ে দেন। খলিফা এবং প্রাদেশিক শাসকদের কেউই বিচার-সংক্রান্ত কাজে হস্তক্ষেপ করতেন না। এভাবেই খলিফা এবং প্রাদেশিক শাসকদের প্রভাব থেকে বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়ে যায়।
কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কার্যগত ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ছিল। প্রাদেশিক শাসক এবং বিচারকদের মাঝে কখনো কখনো ক্ষমতা নিয়ে হালকা রেষারেষি চলত। উভয় পক্ষই একে অপরের কাজে নাক গলানোর চেষ্টায় রত ছিল। তবে জনগণ সাধারণত বিচারককেই বেশি মূল্যায়ন করত। নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে তাদের কাছেই মানুষের যাতায়াত ছিল বেশি। অনেক সময় জালিমরা প্রশাসকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় লাভ করত। ফলে প্রশাসক এবং বিচারক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতেন। কখনো তো ক্ষমতা নিয়ে খলিফা এবং বিচারককে বিরোধে জড়িয়ে পড়তেও দেখা গেছে।
একবার এক মহিলা কুফু বিবেচনায় সমকক্ষ নয় এমন এক পুরুষকে বিবাহ করে। মহিলার অভিভাবক তা মেনে নিতে পারেনি। সে বিচারক সমীপে বিবাহ বাতিলের আবেদন জানায়। কিন্তু বিচারক তা নাকচ করে দেন। কারণ কুফুতে অসমতা বিবাহ বাতিল করার যৌক্তিক কারণ নয়। মহিলার পরিবার তখন বিষয়টি নিয়ে আমিরের কাছে গেলে তিনি বিচারককে বিবাহ বাতিলকরণের নির্দেশ দিতে বলেন। কিন্তু হাকিম নড়লেও হুকুম নড়ল না। অবশেষে আমির নিজেই মহিলা এবং তার স্বামীকে পৃথক করে দিলেন।
আবু হামিদ আল-ইসফারাঈনি (মৃত্যু ৪০৬ হিজরি) ছিলেন বাগদাদের বিচারপতি। একবার কোনো কারণবশত খলিফা তাকে বরখাস্ত করলে তিনি খলিফার উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, ‘জেনে রাখুন, আল্লাহ আমাকে যে পদে অধিষ্ঠিত করেছেন, আপনি চাইলেই আমাকে তা থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন না। খোরাসানের উদ্দেশ্যে আমার দুটি বা তিনটি শব্দ বলাই যথেষ্ট। আমিই আপনাকে বরখাস্ত করলাম।’
বিচারকরা বিভিন্ন ধরনের মোকদ্দমা এবং সাক্ষ্য সংক্রান্ত কাজ নিয়ে খলিফা এবং প্রশাসকদের কাছে আসতেন। খলিফা-সহ প্রশাসকদের অনেকেই প্রসন্ন চিত্তে বিচারককে সাদরে গ্রহণ করতেন। বিচারকের ইনসাফভিত্তিক কথা মানতে কোনো রকম আপত্তি জানাতেন না তারা। অবশ্য কোনো কোনো প্রশাসক বিরক্তি প্রকাশ করতেন। বিচারকের কথা তারা গ্রাহ্যই করতে চাইতেন না। বিচারক তখন পীড়াপীড়ি করতে থাকতেন। কিংবা পদচ্যুত করার হুমকি দিয়ে বিষয়টি উত্থাপন করতেন খলিফার কাছে। অথবা জনসাধারণের কাছে বিচার চাইতেন।
মুহাম্মাদ ইবনু ইমরান আত-তুলাহি যখন মদীনার বিচারক ছিলেন, তখনকার কথা। একবছর খলিফা আবু জাফর মানসুর হজে এলেন। খলিফার ইচ্ছা ছিল, উটচালকদের নিয়ে শামে যাবেন। কিন্তু তারা এতে সম্মত ছিল না। একপর্যায়ে তারা ইবনু ইমরানের কাছে অভিযোগ দায়ের করল। বিচারক তখন খলিফার কাছে আদালতে উপস্থিতির জন্য সমন পাঠালেন। চাপরাশিকে বলে দিলেন, খলিফাকে যেন সম্মানের সাথে না ডাকা হয়। বরং তাকে নাম ধরে ডাকতে হবে। অবশেষে খলিফা উপস্থিত হলে বিচারক তার সাথে বিশেষ কোনো আচরণ করলেন না। এমনকি বিচারের রায়ও দিলেন খলিফার বিপক্ষে। বিচারকার্য সমাপ্তির পর তিনি খলিফাকে যথারীতি সম্মান প্রদর্শন করলেন। খলিফাও তখন বিচারকের আচরণ সমর্থন করলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করে দিলেন। বিচারক তখন এ কথাও বলেছিলেন, ‘অনেকে তো আপনার বিপক্ষে জুলুমের অভিযোগ করে থাকে। এমনটা হলে আপনি অভিযুক্ত হিসেবে নিজেই তাদের সাথে উপস্থিত হবেন। নাহয় আপনার উকিলকে পাঠাবেন।’
বিচারকার্যের ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ ইবনু ইমরান ছিলেন অনমনীয়তার মূর্ত প্রতীক। মানবিকতাই তার কাছ মুখ্য ছিল। অন্যায়ভাবে কেউ তার কাছে বিন্দুমাত্রও সুবিধা নিতে পারত না। আবু আইয়ুব আল-মূরিয়ানি ছিলেন খলিফা মানসুরের মন্ত্রী এবং কয়েকটি দপ্তরের দায়িত্বশীল। একবার তার কয়েকজন আত্মীয় তার বিপক্ষে মুহাম্মাদ ইবনু ইমরানের কাছে অভিযোগ দায়ের করল। বিচারক তখন সমন পাঠালেও আবু আইয়ুব উপস্থিত হলেন না। পরবর্তীকালে মদীনার প্রশাসক যিয়াদ ইবনু উবাইদিল্লাহ আল-হারিসির কাছে তাকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘আপনার কাছে আমি সমন পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি নিজেও উপস্থিত হননি, আপনার উকিলও পাঠাননি।’ আবু আইয়ুব তখন বিচারকের সাথে রূঢ় আচরণ করলেন। ইবনু ইমরান তখনই হাত বাড়িয়ে আবু আইয়ুবকে ধরতে যাচ্ছিলেন। সামনে আমির-উমারা এবং নিরাপত্তাকর্মী থাকায় সে যাত্রায় রেহাই পেয়ে গেলেন আবু আইয়ুব।
মুরগাব নদী নিয়ে বসরাবাসী খলিফা আল-মাহদির খিলাফতকালে বিচারক উবাইদুল্লাহ ইবনুল হাসান আল-আনবারির কাছে মোকদ্দমা দায়ের করেছিল। কিন্তু তিনি কোনো ফয়সালা করেননি। এরপর খলিফা আল-হাদির সময়ও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। অবশেষে খলিফা আর-রাশিদ খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কর্মকর্তা জাফর ইবনু ইয়াহইয়া তখন খলিফার কাছে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানালেন। বসরাবাসীদের কাছে প্রমাণ না থাকায় খলিফা তাদের সপক্ষে ফয়সালা করেননি। অবশ্য পরবর্তীকালে তাদের এমনিতেই দিয়ে দেন।
অধিকাংশ বিচারকই প্রভাবশালী ছিলেন। বিচারকার্যে তাদের সুনাম ছিল। এজন্য জনগণের বড় একটা অংশের সমর্থনের পাশাপাশি খলিফা এবং প্রধান বিচারপতির ওপর তারা একদিক থেকে নির্ভর করতেন। অপরদিকে তাদের নির্ভরতা ছিল শারঈ বিধান পালন এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দ্বীনি অনুভূতির ওপর। এ কারণে বিচারক কোনো আমিরকে বন্দি করার নির্দেশ দিতে পারতেন। এর থেকেই বিচারকদের বিচার-সংক্রান্ত নিরাপত্তা প্রকাশ পায়। বিচারকরা সত্য, ন্যায়, দ্বীন এবং শরীয়ত বাস্তবায়ন করতেন বিধায় খলিফা বা প্রশাসক কেউই বিচারকদের বরখাস্ত করার দুঃসাহস দেখাতেন না। তাদের দুনিয়াবিমুখতা, পরহেজগারি ও অবিচলতার কারণে জনগণ তাদের সমর্থন করত এবং মেনে নিত।
আমিররা স্বয়ং বিচারকের কাছে আসতেন। আবার বিচারকরাও আমিরদের কাছে গমন করতেন। চতুর্থ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মিশরে এই রীতির প্রচলন ছিল। ইবনুস সুবকি লিখেছেন, বিচারক আলি ইবনুল হুসাইন ২৯৩ হিজরিতে বিচারক নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন ইবনু হারবুওয়াইহ নামে পরিচিত। ৩১৯ হিজরিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন মিশরের শেষ বিচারক, যার কাছে আমিররা আগমন করতেন। আত্মসম্মান এবং ন্যায়পরায়ণতার খাতিরে তিনি আমিরের সম্মানার্থে দাঁড়ানো থেকে বিরত থাকতেন। বিচারকদের এই রীতির কথা সবাই জানত। তৎকালীন লেখক আর সাহিত্যিকদের লেখাতেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে। এখানে এ সংক্রান্ত কয়েকটি শিরোনামের দিকে আমরা শুধু ইঙ্গিত প্রদান করছি। বিচারকের সামনে খলিফা, বিচারের কাঠগড়ায় আমির, বিচারক কর্তৃক খলিফার সাক্ষ্য গ্রহণ না করা এবং আল-মামুনের বিরুদ্ধে জনৈক ব্যক্তির অভিযোগ।
খলিফাদের মতো প্রশাসক আর আমিরদের অনেকেই সাধারণ মানুষের মতো সুবিচার এবং ন্যায়পরায়ণতা মেনে নিতেন। শুধু তা-ই নয়: বিচারককে তার অবস্থানে অনমনীয় থাকতে তারা সহায়তাও করতেন। রাক্কাহ নগরীর আমিরকে অভিযুক্ত হয়ে বিচারকের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে আমরা দেখতে পাই। বিচারকার্য সমাপ্তির পর তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম করে বলছি—সবল এবং দুর্বলের ওপর সমানভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে যে ব্যক্তি অক্ষম, সে সফল বিচারক নয়।’
টিকাঃ
[৫৬৭] এ ঘটনাটি পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
[৫৬৮] যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৬৯] যুহরুল ইসলাম: ২/২৫০
[৫৭০] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৯৩; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৬৬
[৫৭১] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১৮৪; কাসাসুল আরব: ৩/৬৫
[৫৭২] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৯০-৯১
[৫৭৩] যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৭৪] তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতুল কুবরা: ৩/৪৪৭; যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ১/৩১২
[৫৭৫] কাসাসুল আরব: ৩/৪৭, ৬৫, ৭১, ৭৪, ৭৮; যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৭৬] কাসাসুল আরব: ৩/৭৮
📄 বিচারক বরখাস্ত করা
উমাইয়া যুগের আলোচনায় আমরা অধিক হারে বিচারক বরখাস্ত করতে দেখেছি। কারণ সে যুগে সাধারণত বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো আমির কিংবা প্রশাসকের পক্ষ থেকে। প্রশাসক বা আমির পরিবর্তন হলে আগের বিচারক বরখাস্ত হয়ে সে জায়গায় নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতো। অনেক সময় প্রশাসক নিজেও বারংবার বিচারক বরখাস্ত করতেন।
পক্ষান্তরে আব্বাসি যুগে বিচারক খুব কম বরখাস্ত হয়েছে। সে-সময় বিচারকরা বেশির ভাগই স্থায়ী নিয়োগ পেতেন। কারণ প্রশাসক এবং আমিরদের বিচারক বরখাস্ত করার অধিকার খর্ব করা হয়েছিল। এ অধিকার ছিল সাধারণভাবে প্রধান বিচারপতি এবং খলিফার জন্য সীমাবদ্ধ। তাই বিচারক বরখাস্তকরণ কদাচিৎ ঘটত। শারিক বলেছেন, ‘বিচারক নিয়োগ দান এবং বরখাস্ত কেবল খলিফাই করতে পারতেন।’ পূর্বে আমাদের আলোচিত বিচার-সংক্রান্ত সুরক্ষার কথা বলে এটাই বোঝানো হয়েছে। আব্বাসি যুগে বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে এটা ছিল প্রসিদ্ধ।
বিচারক অপসারণ এবং নতুন বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি প্রশাসনিক নিয়ম ছিল। নব নিযুক্ত বিচারক নির্ভরযোগ্য দুজন ব্যক্তিকে সাবেক বিচারকের কাছে পাঠাতেন। লোক দুজন তখন বিচার-সংক্রান্ত নথিপত্র সাবেক বিচারক থেকে নিয়ে নতুন বিচারকের কাছে পৌঁছে দিতেন।
টিকাঃ
[৫৭৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৮২; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৮৯
[৫৭৮] শারহু আদাবিল কাযি: ১/২৫৮
📄 বিচারের দায়িত্ব থেকে বিরত থাকা
খলিফা এবং দায়িত্বশীলরা বিচারকার্য পরিচালনার জন্য সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তিকে নিযুক্ত করতেন। বড় বড় এবং প্রসিদ্ধ আলিমদের নিযুক্ত করতে চাওয়ার মৌলিকভাবে কয়েকটি কারণ ছিল। যেমন, এর মাধ্যমে হাদিসের নির্দেশনা বাস্তবায়িত হবে। মানুষের অধিকার এবং সম্পদ রক্ষার মাধ্যমে সমাজে সুবিচার আর ন্যায় যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে, তেমনি জনগণের কাছাকাছিও থাকা যাবে। ফলে বিচারব্যবস্থার মান রক্ষার মতো খলিফা এবং প্রশাসকদের কাজের সপক্ষে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করে তাতে শরীয়তের রং চড়ানোও সহজ হবে।
নবি-রাসূল এবং নেককার ব্যক্তিদের অনুসরণে আলিমদের অনেকেই বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মাঝে ছিল অর্পিত দায়িত্ব পালনের চেতনাবোধ। সত্য এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সওয়াব আর পুরস্কার লাভের ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী ছিলেন। তাই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
তবে অনেক আলিম বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন। এ তালিকায় সর্বাগ্রে পাওয়া যাবে রাশিদুন যুগে আবদুল্লাহ ইবনু উমর-এর নাম। উমাইয়া যুগে এমন ব্যক্তিদের সংখ্যা যে বেড়ে গিয়েছিল, ইতিপূর্বে আমরা তা উল্লেখ করেছি। আব্বাসি যুগে তা আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এমনকি বিচারকার্য থেকে দূরে সরে যাওয়া আলিমদের একাংশের কাছে প্রশংসনীয় রীতিতে পরিণত হয়। কারণ খলিফা এবং প্রশাসকগণ কিছু প্রসিদ্ধ আলিমদের বিচারকের পদ গ্রহণে বাধ্য করছিলেন। তবে এ ক্ষেত্রে খলিফা এবং প্রশাসকদের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। আসলে তারা চাচ্ছিলেন, সবাই যেন আলিমদের শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন করে। তাঁদের ইলম এবং ফিকহ থেকে সবাই যেন উপকৃত হতে পারে। সাধারণ মানুষ যেন আলিমদের সম্মান করে; তাঁদের ওপর থেকে যেন আস্থা না হারায়। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে অনুৎসাহের পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল। যেমন:
১. হাদিসে থাকা নানাধরনের ভীতি প্রদর্শন এবং দায়িত্ব পালনকারীর প্রতি সতর্কবার্তা। উলামায়ে কেরাম এ কারণে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে বিরত থাকতেন। এ ছাড়া দুনিয়া-আখিরাতে কঠিন জবাবদিহিতার আশঙ্কা তাদের ছিল। এ ভয় থেকেই তারা দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করতেন। কারণ ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণ হেরফের বা জুলুম করে ফেললে জাহান্নামি হতে হবে।
২. দুনিয়াবিমুখতা। পার্থিব পদ-পদবির কারণে আল্লাহর নৈকট্য থেকে মাহরুম হওয়ার পাশাপাশি নেককার, দরিদ্র এবং দুর্বল লোকদের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হওয়া।
৩. ইলম চর্চা, গবেষণা, দাওয়াত এবং শিক্ষাদানের কাজকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বের ওপর প্রাধান্য দেওয়া।
৪. আকীদাভিত্তিক এবং ফিকহকেন্দ্রিক নানান ফিরকা সৃষ্টি হওয়া। খলিফা বা প্রশাসকরা নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শের অনুসরণ করতেন। তাই কোনো কোনো আলিম এমন খলিফা বা প্রশাসক এর অধীনে কাজ করে তাদের সমর্থন জোগানো অপছন্দ করতেন। তাদের ভয় ছিল, খলিফা বা প্রশাসক নিজেদের মতাদর্শ প্রচারে আলিমদের সুখ্যাতির অপব্যবহার করবেন।
৫. খলিফা বা প্রশাসকদের বিচারক-সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা এবং বিচারককে একদিকে ঝুঁকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার আশঙ্কা করা। এ কারণে অনেক বিচারকই খলিফা এবং প্রশাসককে অনুরোধ করতেন, তাকে যেন স্বাধীনভাবে কাজের সুবিধা দেওয়া হয়। তার কাজে যেন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করা হয়। খলিফা বা প্রশাসক থেকে তারা এ মর্মে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করতেন যে, ফয়সালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব হবে শাসকগোষ্ঠীর। শাসকের আত্মীয়স্বজন, সহযোগী, এমনকি আমিরদের বিপক্ষে হলেও তারা সত্য এবং ন্যায় বাস্তবায়ন করবেন। খলিফা বা প্রশাসক শুধু যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতেন তা-ই নয়; বরং কার্যত বাস্তবায়নও করতেন। পক্ষান্তরে যেসব আলিম দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকতেন তাদের আশঙ্কা ছিল যে, শাসকগোষ্ঠী তাদের গবেষণার সাথে সহমত পোষণ করবেন না। বরং ফয়সালা তাদের বিপক্ষে গেলে চাপ প্রয়োগ করবেন।
৬. অনেক সময় খলিফা এবং প্রশাসকদের সাথে আলিম এবং ফকিহদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকত। ইমাম এবং আলিমদের অনেকেই এইসব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করতেন। অনেক সময় তো খলিফা এবং প্রশাসক-বিরোধী আন্দোলনের সাথে তাদের পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকত। অনেক সময় শাসকগোষ্ঠীর কার্যকলাপ অপছন্দ করার কারণে আলিমগণ তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। কেউ যাতে তাদের প্রতি ভুল ধারণা না করে বসে, এজন্য বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে চাইতেন না। তারা মনে করতেন, বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলে কেউ ভাবতে পারে যে, তারা শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন করছেন। কিংবা রাজনৈতিক কার্যক্রমে তাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করছেন। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে অসম্মত ছিলেন—এমন কয়েকজনের কথা আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
■ ইমাম আবু হানিফা নুমান
খলিফা আবু জাফর মানসুর তাঁকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে বললে তিনি কেবল বিরতই থাকেননি; বরং পালিয়ে বেড়িয়েছেন। এর কারণ কী ছিল, সে সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন এক বর্ণনায় এসেছে, ইমাম আবু হানিফা খলিফা মানসুর কর্তৃক প্রদত্ত দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকায় প্রহারের স্বীকার হয়েছিলেন। কারণ নিন্দুকরা এ কথা ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, আবু হানিফা খলিফার বিরুদ্ধে বসরায় বিদ্রোহকারী ইবরাহীম ইবনু আবদিল্লাহকে সমর্থন করেন।
আরেক বর্ণনামতে তাকওয়া, পরহেজগারি এবং দুনিয়াবিমুখতার কারণেই আবু হানিফা বিচারকের দায়িত্ব থেকে দূরে ছিলেন। খলিফার উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করুন। এমন ব্যক্তিকেই কেবল দায়িত্ব প্রদান করুন, যে আল্লাহকে ভয় করে। সন্তুষ্টির ক্ষেত্রেই আমি বিশ্বাসযোগ্য নই। তাহলে অসন্তুষ্টির ব্যাপারে কিভাবে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারি? আপনার বিপক্ষে রায় প্রদান করলে আমাকে বলা হবে: ‘রায় পরিবর্তন করো, নয়তো ফুরাত নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হবে।’ এ ক্ষেত্রে ডুবে যাওয়াটাই আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়। আপনার আশেপাশে থাকা লোকেরা আপনাকে তোষামোদী করে চলে, যা আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়।’
অন্য বর্ণনায় এসেছে, খলিফা মানসুর ইমাম আবু হানিফাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইমাম সাহেব তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিরত থাকেন। তখন মানসুর শপথ করেন, আবু হানিফাকে দিয়ে কোনো দায়িত্ব পালন না করানো অবধি তিনি নিবৃত্ত হবেন না। এদিকে আবু হানিফা এ-ও শপথ করেন যে, তিনি খলিফার থেকে কোনো দায়িত্ব নেবেন না। অবশেষে তাকে খলিফা মানসুর নির্মাণ-শ্রমিকদের কাজ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করেন। এভাবেই খলিফার কসম পূর্ণ হয়, আবার আবু হানিফা -এর কসমও রক্ষা পায়। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন, আবু হানিফাকে মানসুর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চাইলে ইমাম সাহেব তা গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশ করেন। খলিফাও পীড়াপীড়ি শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁকে প্রহার করে জেলে ভরে রাখেন। এর কিছুদিন পরই তাঁর মৃত্যু হয়। লেখকরা আরও অনেক কারণ এবং অন্যান্য বর্ণনাও অবশ্য উল্লেখ করেছেন।
■ ইমাম মালিক
তিনি আব্বাসিদের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন। শাইখ আবুল হাসান নুবাহি লিখেন, ‘... অবশেষে আব্বাসিদের আত্মপ্রকাশ ঘটল। একপর্যায়ে তারা শাসনক্ষমতা লাভ করে। বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে অনেক কড়াকড়ি করল তারা। শারঈ কাজের দায়িত্ব পালনের জন্য তারা সেরা আলিমদের বেছে নিলো। সে হিসেবে মালিক ইবনু আনাস, ইবনু আবি যিব এবং আবু হানিফাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলা হয়। মালিক তখন দায়িত্ব গ্রহণ না করার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, “আমি একবার শাস্তির সম্মুখীন হয়েছি। আর সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিচারকার্য পরিচালনার উপযুক্ত নয়।” তখন ইবনু আবি যিব বলেন, “আমি তো কুরাইশ বংশীয়। বংশগতভাবে সমকক্ষ ব্যক্তির দায়িত্ব পালনে সমকক্ষ হওয়া উচিত নয়।” ওদিকে আবু হানিফা বললেন, “আমি তো মিত্র গোষ্ঠীভুক্ত। আর মিত্র গোষ্ঠীর কেউ বিচারকার্য পরিচালনার উপযুক্ত নয়।” এভাবে তাঁদের তিনজনই নিজেদের নিয়তের সপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে দায়িত্ব পালন থেকে রেহাই পেয়ে গেলেন।’
• ইমাম শাফিয়ি
নুবাহি লিখেন, ‘বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে পিছিয়ে থাকা অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইদরিস আশ-শাফিয়ি। আমিরুল মুমিনীন তাঁকে দায়িত্ব গ্রহণের ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করলে তিনি বললেন, “আপনার বংশীয় কেউ এ কাজের যোগ্য নয়। এমন ব্যক্তিও এ কাজের অনুপযুক্ত, যে সব কাজ ছেড়ে দেয়।” তিনি আরও বলতেন, “বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পরও যে ব্যক্তি নিঃস্ব হয়নি, সে তো চোর। আর যে ব্যক্তি নিজেকে বাঁচাতে পারেনি, তার ইলম কোনো কাজে আসেনি।”
• ওয়াকি ইবনুল জাররাহ
তিনি খলিফা হারুনুর রাশিদের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনু ইদরিস, হাফস ইবনু গিয়াস এবং ওয়াকি ইবনুল জাররাহকে খলিফা হারুনুর রাশিদের কাছে নেওয়া হলো। উদ্দেশ্য ছিল, তাদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা। ইবনু ইদরিস তো দরবারে প্রবেশ করে খলিফাকে সালাম দিয়ে এমন ভাব প্রকাশ করলেন, যেন তিনি একজন প্যারালাইজড ব্যক্তি। খলিফা তখন উপস্থিত লোকদের বললেন, ‘তোমরা শাইখের হাত ধরো। একে দিয়ে কোনো কাজ হবে না।’ এরপর ওয়াকি এক হাত দিয়ে নিজের এক চোখ চেপে ধরে বললেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! এই চোখ দিয়ে আমি দেখতে পাই না।’ খলিফা তখন তাকেও ছাড় দিলেন। তারপর হাফস বললেন, ‘ঋণের বোঝা এবং পরিবারের দায়িত্ব আমার কাঁধে না থাকলে আমি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকতাম।’ এই বলে পরিবারের ভরণপোষণের সুবিধার্থে তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তবে এ কাজে তিনি খুব যে আগ্রহী ছিলেন—এমনও নয়। বরং তার জীবনীতে এসেছে, বিচারকার্য পরিচালনা করা এবং হাদিসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী হওয়া—এ দুয়ের মাঝে তাকে ইচ্ছাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
বিশুদ্ধতম মতানুসারে, ১৯৪ হিজরিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন কুফার বিচারক। পরে অবশ্য বাগদাদের বিচারকার্যও পরিচালনা করেছেন।
• মুগীরা আল-মাখযুমি
আমিরুল মুমিনীন আর-রাশিদ চার হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে তাকে মদীনার বিচারক করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সম্মত হননি। খলিফা পীড়াপীড়ি করতে থাকলে তিনি বলেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন অপেক্ষা শয়তানের ক্রোধের পাত্র হওয়া আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।’ তখন খলিফা বললেন, ‘এরপর তো আর কিছু বলার বাকি থাকে না।’ তারপর তাকে অব্যাহতি দিয়ে দুই হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিলেন।
অনেক মুতাজিলা মতাদর্শের ব্যক্তি তো দুনিয়াবিমুখতা এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন যে, ভীষণ অভাবে পড়েও তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্রহণ করেননি। বর্ণিত আছে, মুতাজিলা নেতা আহমাদ ইবনু দাউদের কাছে একবার খলিফা আল-ওয়াসিক বিল্লাহ জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনি মুতাজিলাদের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করেন না কেন?’ উত্তরে আহমাদ বলেছিলেন, ‘তারা এ কাজের উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। যেমন, ধরুন জাফর ইবনু বিশরের কথা। তার কাছে আপনি দশ হাজার দিরহাম পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণ করেননি। তারপর আমাকে নিয়ে তার কাছে আপনি গেলেন। তখন আমি ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দেননি। অগত্যা অনুমতি ছাড়াই ঢুকতে চাইলে তিনি তরবারি কোষমুক্ত করে আমাকে হুমকি দেন, “ভেতরে ঢুকলে আর জান নিয়ে ফিরতে পারবে না।” তখন আমি ফিরে আসি। এমন লোকদের কিভাবে দায়িত্ব দেওয়া যায় সেটা আপনিই বলুন!’ এরপর আহমাদ নিজের প্রয়োজন সমাধার জন্য মাত্র দুই দিরহাম গ্রহণ করলেন।
• আবদুল্লাহ ইবনু ফাররুখ
বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব যারা এড়িয়ে চলতেন, তাদের শীর্ষে ছিলেন কাইরুওয়ানের ফকিহ আবদুল্লাহ ইবনু ফাররুখ। খলিফা আর-রাশিদের পক্ষ থেকে তার কাছে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন রাওহ ইবনু হাতিম। কিন্তু তিনি সম্মত হননি। তখন ইবনু হাতিমের নির্দেশে তাকে বেঁধে মসজিদের ছাদে তোলা হয়। এরপর তাকে পুনরায় প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন তাকে ছাদের কিনারায় নিয়ে যাওয়া হয়। ধাক্কা দিয়ে নিশ্চিত ফেলে দেওয়া হবে দেখে তিনি দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। তখন কয়েকজন প্রহরী-সহ তাকে মসজিদের ভেতরে বসিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দুজন ব্যক্তি তার কাছে মোকদ্দমা নিয়ে আসে। তাদের দেখে তিনি দীর্ঘসময় ধরে কান্না করেন। তারপর মাথা তুলে তাদের বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে এ মোকদ্দমা থেকে আমাকে রেহাই দিন।’
লোক দুজন তখন তার জন্য দুআ করতে করতে চলে গেল। প্রহরীরা রাওহকে বিষয়টি জানালে সে বলল, ‘ঠিক আছে। তবে এ কাজের উপযুক্ত কে হতে পারে, সেটা তার থেকে জেনে নাও।’ তখন তিনি আবদুল্লাহ ইবনু গানিমের কথা বলেন। কারণ বিচার-সংক্রান্ত মাসআলা-মাসায়েলের ব্যাপারে তাকেই বেশি আগ্রহী দেখা গেছে।
* আবদুল্লাহ ইবনু ওয়াহাব
তিনি ছিলেন ইমাম মালিকের সহচর। দুনিয়াবিমুখতা এবং সততার কারণে তিনি খলিফা কর্তৃক প্রদত্ত বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। জনসমাজ থেকে সরে গিয়ে তিনি ঘরে অবস্থান করতে থাকেন।
* আবদুল মালিক ইবনু আবদিল আজিজ
ইবনুল মাজিশুন নামে পরিচিত মালিকি মাযহাবের এই ফকিহ ছিলেন ইমাম মালিক-এর ছাত্র। খলিফা আল-মামুন তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিয়ে পত্র প্রেরণ করলে তিনি সম্মত হননি।
* মূসা ইবনু সুলাইমান আল-জুযজানি
খলিফা আল-মামুন তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তিনি বললেন, ‘বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। আমার মতো ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করবেন না। কারণ আমি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমার মনে হয় না, আল্লাহর জমিনে তাঁর বান্দাদের বিচার করার মতো যোগ্যতা আমার মাঝে আছে।’ উত্তরে খলিফা বললেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন। আমরা আপনাকে অব্যাহতি দিচ্ছি।’ মূসা তখন খলিফার জন্য দুআ করলেন। তিনি ছিলেন মুআল্লা ইবনু মানসুর (মৃত্যু ২১১ হি.)-এর সহচর। খলিফা তাকেও বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও সম্মত হননি।
* সুফইয়ান আস-সাওরি
খলিফা মানসুর তাঁকে কুফায় বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সম্মত না হয়ে ১৪৪ হিজরিতে কুফা থেকে হিজাজে চলে যান। পরবর্তীকালে খলিফা মাহদি তাঁকে একই প্রস্তাব দিলে তিনি আত্মগোপন করেন। কিন্তু একসময় তিনি ধরা পড়ে যান। অবশেষে খলিফা তাঁকে বলেন, ‘আপনি এখানে-ওখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন! আপনি কি ভেবেছেন, আমরা আপনাকে শাস্তি দিতে পারব না? এখন তো আপনি ঠিকই ধরা পড়ে গেলেন।’ খলিফা তখন সুফইয়ান-কে কুফার বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে একটি ফরমান লেখালেন। যা-তে এ কথাও লেখা ছিল, সুফইয়ানের কথার ওপর কারও কথা চলবে না। ফরমানটি সুফইয়ানের হাতে তুলে দিলে তিনি সেটা নিয়ে দরবার থেকে বেরিয়ে এলেন। তারপর সেটি দজলা নদীতে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেলেন। এরপর আর তাঁকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আসলে তিনি বসরায় চলে গিয়েছিলেন। আত্মগোপনরত অবস্থায় সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়।
• ইবনু সুরাইজ
তাঁর পূর্ণ নাম ছিল আহমাদ ইবনু আমর ইবনি সুরাইজ। তাঁর উপনাম ছিল আবুল আব্বাস। শাফিয়ি মাযহাবের ফকিহ এবং মুজতাহিদ ছিলেন। তৎকালীন শাফিয়ি মাযহাবের পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। ৩০৬ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। তিনি শিরাজে কিছুদিন ইনসাফের সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন। এরপর পুনরায় দায়িত্ব দিতে চাওয়া হলে তিনি আর সম্মত হননি। ঘরে আটকে রেখেও তাঁকে রাজি করানো যায়নি। সৈন্যরা প্রায় ১০ দিন তাঁর ঘর ঘেরাও করে রাখে। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থানেই অটল থাকেন। তখন উজির আলি ইবনু ঈসা জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা মূলত শাইখের কোনো ক্ষতি করতে চাইনি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়াবাসীকে এ কথা জানিয়ে দেওয়া—আমাদের রাজ্যে এমন ব্যক্তি আছেন যাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চাওয়া হয়, কিন্তু তিনি গ্রহণ করতে অসম্মতি জানান।’
আব্বাসি যুগে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালনে অসম্মতি সংক্রান্ত উদাহরণের আমরা এখানেই ইতি টানছি। এমন অসম্মত ব্যক্তিদের সংখ্যা অনেক। অধিকাংশ সময়ই সেটা অনুসরণীয় রীতি আর প্রশংসনীয় পন্থায় পরিণত হয়েছিল। আবু বকর ইবনু মূসা আল-খাওয়ারিযমি (৪০৩ হিজরি), শামবাসীদের ফকিহ আওযায়ি (১৫৭ হিজরি), জাসসাস আল-হানাফি (৩৭০ হিজরি) -সহ আরও অনেকেই আছেন এই তালিকাতে।
টিকাঃ
[৫৭৯] যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯-এ অধ্যাপক আহমাদ আমিন দাবি করেছেন, আব্বাসি যুগের বিচারকরা বাধ্য হয়ে নয়তো সম্পদের লোভে পড়ে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এটা নিঃসন্দেহে বানোয়াট ইতিহাস এবং বাস্তবতা বিবর্জিত কথা। এ কথা ঠিক যে, কোনো কোনো বিচারক সম্মানত বা বস্তুগত চাপের কারণে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তবে নিরাপত্তার খাতিরে যারা এ দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহী হয়েছিলেন, তাদের কথা ভিন্ন। আর কারও কারও দায়িত্ব গ্রহণ ছিল সম্পদের লোভে পড়ে কিংবা জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে। তবে এ ধরনের অবস্থা খুবই বিরল আর কম ছিল। বিরল বিষয় দিয়ে উদাহরণ পেশ করা যায় না। বরং তা ব্যতিক্রম হিসেবেই সাব্যস্ত হয়। আবার দ্বিতীয় আব্বাসি যুগের একটা সময় পর্যন্তই সেটা সাব্যস্ত বলে জানা যায়। কিন্তু ঢালাওভাবে এবং ব্যাপক হারে সবার ওপর তা চাপিয়ে দেওয়া কোনোমতেই বৈধ হতে পারে না। যেসব বিচারক জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তারাও যে সত্য এবং ন্যায়পরায়ণতার প্রতি যত্নবান ছিলেন—তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
[৫৮০] যুদ্ধাইল ইবনু ইয়াছ বলতেন, ‘বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালনকারীর উচিত এক দিন দায়িত্ব পালন করা এবং এক দিন কান্না করা।’ আখবারুল কুদ্দাহ: ১/২৪-২৫
[৫৮১] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৭৩ এবং ৭৪
[৫৮২] যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৮৩] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১০/৯৭
[৫৮৪] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৫৯; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৭২
[৫৮৫] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৭২ এবং ৭৪; তারীখু কুদ্ধাতিল উনদুলুস, পৃ. ১৫ এবং ২৪
[৫৮৬] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ২৪; যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৮৭] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ১৫
[৫৮৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/২৭ এবং ৩/১৮৪
[৫৮৯] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/১৮৪; খুলাসাতু তাহযীবিল কামাল: ১/২৪১; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/২২
[৫৯০] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ১৫; মারজিউল উলুমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৩৯৯
[৫৯১] তারীখুল মাযাহিবিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৬৩
[৫৯২] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ১৫ এবং ২৫
[৫৯৩] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ১/৩০২; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০০
[৫৯৪] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪০১
[৫৯৫] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৩৭৮
[৫৯৬] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১২৯; মুরূজুয যাহাব: ৩/৩২২
[৫৯৭] মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৪২০