📄 প্রথম টার্মের আব্বাসি যুগের বিচারক
বিচারব্যবস্থা খিলাফতের অংশবিশেষ। বিচারক নিযুক্ত করার ক্ষমতা স্বয়ং খলিফা কিংবা খলিফার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক এবং বিচারকের হয়ে থাকে। উমাইয়া যুগে রাজধানী দামিস্কের বিচারক স্বয়ং খলিফাই নিযুক্ত করতেন। আর অন্যান্য অঞ্চলের বিচারক নিযুক্তির দায়িত্ব ছেড়ে দিতেন প্রশাসক, প্রধান বিচারক-সহ নেতৃস্থানীয় লোকদের হাতে। আবু জাফর মানসুর খলিফা হওয়ার পর বিভিন্ন অঞ্চলের বিচারক নিযুক্তির দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেন। আব্বাসি খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা খলিফা মানসুর মনে করতেন, বিচারক হচ্ছে খিলাফত পরিচালনার জন্য অপরিহার্য চারটি অনুষঙ্গের অন্যতম। অপর অনুষঙ্গ তিনটি ছিল ট্যাক্স কালেক্টর, পুলিশ-প্রধান এবং ডাক বিভাগের ব্যবস্থাপক। ডাক বিভাগের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে নিযুক্ত বিচারকদের খবরাখবর রাজধানীতে খলিফার কাছে পৌঁছে যেত। কিন্তু সমস্ত অঞ্চলে বিচারক নিযুক্ত করা খলিফার পক্ষে সম্ভবপর হতো না। এই কাজের ধারাবাহিকতায় ঘাটতি আসাই ছিল স্বাভাবিক। তাই খলিফা প্রশাসকদের কাছে এই দায়িত্ব অর্পণ করেন। দেখা যায়, মানসুরের সময়ই অনেক প্রশাসক নিজ নিজ এলাকায় বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। ওয়াকি বলেছেন, মুহাম্মাদ ইবনু ইমরান ছিলেন খলিফা মানসুরের যুগে যিয়াদ ইবনু উবাইদিল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত মদীনার বিচারক। সে-সময় আঞ্চলিক শাসনকর্তারাই বিচারক নিয়োগ দিতেন।
এরপর খলিফা আর-রাশিদ ইরাক-সহ বিভিন্ন শহরে বিচারক নির্বাচনের জন্য আবু ইউসুফ -কে কাযিউল কুযাত তথা প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেন। তিনি নির্বাচিত ব্যক্তিদের নাম খলিফার সামনে পেশ করতেন। আর খলিফা সেসব লোককে নিয়োগের ঘোষণা দিতেন। প্রধান বিচারপতির কাজ ছিল খলিফার সামনে পেশ করার জন্য জ্ঞানী এবং যোগ্য লোক বাছাই করা। এরপর খলিফা সেসব বাছাইকৃত লোকদের ইরাক, খোরাসান, শাম এবং মিশরে নিয়োগ দিতেন।
এরপর খলিফারা বিচারক নিয়োগ, তাদের দেখাশোনা, পর্যবেক্ষণ এবং অপসারণের দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির কাছে ন্যস্ত করেন। খলিফা বা প্রশাসক এ সংক্রান্ত কোনো দায়িত্ব পালন করতেন না। এভাবেই বিচারব্যবস্থা খলিফা, শাসক, প্রশাসক এবং কর্মকর্তার নির্বাহী ক্ষমতা থেকে পৃথক হয়ে যায়।
প্রথম আব্বাসি যুগে খলিফা, প্রধান বিচারপতি এবং প্রশাসকরা উপযুক্ত, আস্থাভাজন, বিদ্বান এবং দ্বীনের ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন এমন বিচারক মনোনীত করতেন। তারা লক্ষ রাখতেন, নির্বাচিত ব্যক্তির চরিত্র উত্তম হওয়ার পাশাপাশি সমাজে তার অবস্থানটাও যেন উন্নত হয়। লোকদের মাঝে তারা যেন ন্যায়ানুগভাবে ফয়সালা করে। ফিকহ, ফতোয়া এবং শারঈ বিধানাবলি যেন তাদের ভালোভাবে আয়ত্তে থাকে।
কুফার শাসক ছিলেন ইউসুফ ইবনু ইমরান। সেখানে বিচারক নিযুক্ত করার আগে আবদুল্লাহ ইবনুল আজলাহর কাছে জানতে চাইলেন, বিচারকার্য পরিচালনার উপযুক্ত, বুদ্ধিমান এবং কর্মচঞ্চল ব্যক্তি কেউ আছে কি? ইবনুল আজলাহ তখন মুহাম্মাদ ইবনু আবি লাইলার কথা প্রস্তাব করলেন। ইবনু আবি লাইলা প্রথমে অসম্মতি প্রকাশ করলেও পরে রাজি হয়ে যান।
শারিক ইবনু আবদিল্লাহ নাখায়িকে কুফার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সময় খলিফা আবু জাফর মানসুর বলেছিলেন, ‘তোমার দৃঢ়তার কথা আমি শুনেছি। সেটা যেন বৃদ্ধি পায় সেদিকে খেয়াল রেখো।’
ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ ছিলেন তৎকালীন মদীনা মুনাওয়ারার সবচেয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। তাই খলিফা মানসুর তাকে সেখানকার বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন।
খলিফা মামুন তার প্রধান বিচারপতি আবু মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া ইবনু আকসামের কাছে লিখেছিলেন: বাগদাদের যেসব বিদ্বান এবং জ্ঞানী ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে, তাদের যেন তিনি যাচাই করে নেন।
কোথাও বিচারক নিয়োগ দেওয়ার আগে লোকদের বা সেখানকার বাসিন্দাদের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া ছিল খলিফা বা প্রাদেশিক শাসকদের রীতি।
টিকাঃ
[৫৫৯] আখবারুল কুুদ্ধাহ: ১/১৮৪
[৫৬০] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৭
[৫৬১] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৬৮; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ : ৩/২৩৯
[৫৬২] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৩০
[৫৬৩] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৫১
[৫৬৪] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/২৪৩
[৫৬৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/১৩১ এবং ১৪৫
📄 দ্বিতীয় টার্মের আব্বাসি যুগের বিচারক
খলিফা মুতাওয়াক্কিলের পর বাগদাদ থেকে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে প্রাদেশিক শাসকদের কর্তৃত্ব শক্তিশালী হয়। আব্বাসি খিলাফতের অধীনে থেকেই তারা স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকে। বাগদাদেও অনেক সময় খলিফার কর্তৃত্ব কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। খলিফার নাম ব্যবহার এবং তার জন্য দুআর প্রচলন থাকলেও প্রাদেশিক শাসক এবং বিচারকই শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। যেমন: ইদরিসীয় রাজবংশ, উত্তর আফ্রিকায় আগলাবি সালতানাত, সিরিয়ার উত্তরাংশে হামদানি রাজবংশ, মিশর ও সিরিয়াতে ফাতিমিরা, বাগদাদ ও পারস্যে বুওয়াইয়া রাজবংশ, পূর্ব দিকে খোয়ারিজমীয় সাম্রাজ্য এবং ইয়ামানে ছিল যিয়াদিরা। স্বায়ত্তশাসিত এসব প্রদেশ নিজেরাই নিজেদের বিচারক নিয়োগ দিত। কখনো-বা বিচারক নিয়োগে তারা বাগদাদে থাকা প্রধান বিচারপতিকে সহায়তা করত।
সংক্ষেপে বলা চলে, আব্বাসি যুগে অনেকের পক্ষ থেকে বিচারক নিয়োগের প্রচলন ছিল। যেমন খলিফা নিজেই বিচারক নিয়োগ দিতেন। আবার খলিফার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত উজিররা বিচারকদের নিয়োগ দিতেন। আমিরুল উমারা তথা উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং প্রধান বিচারপতি ও বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনকর্তাদের মাধ্যমেও বিচারক নিয়োগ হতো।
টিকাঃ
[৫৬৬] আল-খিলাফাতুল আব্বাসিয়্যাহ, পৃ. ৮৫, ১০২, ১১৭, ১৬৮ এবং ৩০৯।
📄 বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা
আব্বাসি যুগে বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে পৃথক হয়ে যায়। এটার ধারাবাহিকতা মূলত নবি-যুগ থেকেই শুরু হয়েছিল। আসলে সে-সময় প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং বিচার বিভাগ সাধারণত একজনের অধীনেই পরিচালিত হতো। আবু বকর-এর পূর্ণ খিলাফতকাল এবং উমর-এর খিলাফতকালের একাংশ অবধি পরিস্থিতি এমনই ছিল। অবশেষে উমর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এজন্যই মুআবিয়া-কে তিনি বলে পাঠিয়েছিলেন, ‘উবাদার ব্যাপারে আপনার কোনো কর্তৃত্ব নেই।’
কিন্তু খলিফা এবং প্রাদেশিক শাসক কর্তৃক বিচারক নিয়োগ দান এবং অপসারণের রীতি চলমান ছিল। আবার কোনো কোনো প্রশাসক নিজেরাই বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। এভাবেই চলে আসে মুআবিয়া-এর সময়কাল। তখন তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারক নিযুক্ত করার দায়িত্ব প্রাদেশিক শাসকদের ওপর ন্যস্ত করেন। ক্ষমতাকে তিনি এক স্থানে কেন্দ্রীভূত করেননি। কেননা প্রাদেশিক শাসকই তার প্রদেশের লোকদের যোগ্যতা সম্পর্কে ভালো জানবেন। অধিকতর যোগ্য, বিদ্বান, জ্ঞানী এবং পরহেজগার ব্যক্তিকে নিয়োগ দান তাদের পক্ষেই সম্ভব। আর প্রদেশে সুবিচার এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা হলো বিচারকের দায়িত্ব। পরবর্তী সময়ে তার উত্তম সহযোগী এবং শ্রেষ্ঠ সহায়ক তৈরি হবে। আর প্রাদেশিক শাসকের কর্তব্য হলো বিচারকের বিধান বাস্তবায়ন করা। এজন্যই উভয়ের মাঝে জোরদার সম্পর্ক আর পূর্ণ সামঞ্জস্য হওয়া প্রয়োজন। তাহলেই পারস্পরিক সহযোগিতা পূর্ণতা পাবে। এটা ছিল মুআবিয়া-এর দৃষ্টিভঙ্গি।
নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষণ এবং গুরুত্ব আর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনের অভিপ্রায়ে খলিফা মানসুর বিভিন্ন স্থানে বিচারক নিযুক্তির দায়িত্ব নিজের কাছে ফিরিয়ে আনেন। আরেকটি কারণ ছিল, বিচারক নিযুক্তি এবং অপসারণের দায়িত্ব পেয়ে কিছু কিছু প্রশাসক সুযোগের অসদ্ব্যবহার করছিল। যার ফলে কতক অঞ্চল নষ্ট হয়ে যায়। তাই মানসুরের ইচ্ছা ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং খিলাফতের প্রতিটি প্রান্তে ন্যায়বিচারের ধারা চালু করে দেওয়া। অবশ্য পরবর্তীকালে এই দায়িত্ব তিনি বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ এবং প্রাদেশিক শাসকদের কাছে ন্যস্ত করেন। এভাবেই চলছিল। অবশেষে খলিফা হারুনুর রাশিদ তার সময়কালে আবু ইউসুফকে প্রধান বিচারপতি বানিয়ে খিলাফতের অধীনস্থ সমস্ত অঞ্চলে বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব তাঁকে প্রদান করেন। খলিফা কেবল প্রধান বিচারপতির মনোনীত লোকদেরই বিচারক নিযুক্ত করতেন। বিচারকদের নিয়োগের আগে যাচাই-বাছাই, সার্বিক খোঁজখবর, নজরদারি, বিচারকার্য পরিচালনার পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হওয়া-সহ বিচারকদের ভাতা নির্ধারণ, তাদের সুযোগ-সুবিধা এবং কর্তব্যে অবহেলাকারীকে পদচ্যুত করা ছিল প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব।
আর-রাশিদের পর খলিফাগণ রাজধানী-সহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারক নিযুক্ত করা থেকে সম্পূর্ণরূপে হাত গুটিয়ে নেন। এ বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে প্রধান বিচারপতির কাছে ছেড়ে দেন। খলিফা এবং প্রাদেশিক শাসকদের কেউই বিচার-সংক্রান্ত কাজে হস্তক্ষেপ করতেন না। এভাবেই খলিফা এবং প্রাদেশিক শাসকদের প্রভাব থেকে বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়ে যায়।
কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কার্যগত ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ছিল। প্রাদেশিক শাসক এবং বিচারকদের মাঝে কখনো কখনো ক্ষমতা নিয়ে হালকা রেষারেষি চলত। উভয় পক্ষই একে অপরের কাজে নাক গলানোর চেষ্টায় রত ছিল। তবে জনগণ সাধারণত বিচারককেই বেশি মূল্যায়ন করত। নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে তাদের কাছেই মানুষের যাতায়াত ছিল বেশি। অনেক সময় জালিমরা প্রশাসকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় লাভ করত। ফলে প্রশাসক এবং বিচারক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতেন। কখনো তো ক্ষমতা নিয়ে খলিফা এবং বিচারককে বিরোধে জড়িয়ে পড়তেও দেখা গেছে।
একবার এক মহিলা কুফু বিবেচনায় সমকক্ষ নয় এমন এক পুরুষকে বিবাহ করে। মহিলার অভিভাবক তা মেনে নিতে পারেনি। সে বিচারক সমীপে বিবাহ বাতিলের আবেদন জানায়। কিন্তু বিচারক তা নাকচ করে দেন। কারণ কুফুতে অসমতা বিবাহ বাতিল করার যৌক্তিক কারণ নয়। মহিলার পরিবার তখন বিষয়টি নিয়ে আমিরের কাছে গেলে তিনি বিচারককে বিবাহ বাতিলকরণের নির্দেশ দিতে বলেন। কিন্তু হাকিম নড়লেও হুকুম নড়ল না। অবশেষে আমির নিজেই মহিলা এবং তার স্বামীকে পৃথক করে দিলেন।
আবু হামিদ আল-ইসফারাঈনি (মৃত্যু ৪০৬ হিজরি) ছিলেন বাগদাদের বিচারপতি। একবার কোনো কারণবশত খলিফা তাকে বরখাস্ত করলে তিনি খলিফার উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, ‘জেনে রাখুন, আল্লাহ আমাকে যে পদে অধিষ্ঠিত করেছেন, আপনি চাইলেই আমাকে তা থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন না। খোরাসানের উদ্দেশ্যে আমার দুটি বা তিনটি শব্দ বলাই যথেষ্ট। আমিই আপনাকে বরখাস্ত করলাম।’
বিচারকরা বিভিন্ন ধরনের মোকদ্দমা এবং সাক্ষ্য সংক্রান্ত কাজ নিয়ে খলিফা এবং প্রশাসকদের কাছে আসতেন। খলিফা-সহ প্রশাসকদের অনেকেই প্রসন্ন চিত্তে বিচারককে সাদরে গ্রহণ করতেন। বিচারকের ইনসাফভিত্তিক কথা মানতে কোনো রকম আপত্তি জানাতেন না তারা। অবশ্য কোনো কোনো প্রশাসক বিরক্তি প্রকাশ করতেন। বিচারকের কথা তারা গ্রাহ্যই করতে চাইতেন না। বিচারক তখন পীড়াপীড়ি করতে থাকতেন। কিংবা পদচ্যুত করার হুমকি দিয়ে বিষয়টি উত্থাপন করতেন খলিফার কাছে। অথবা জনসাধারণের কাছে বিচার চাইতেন।
মুহাম্মাদ ইবনু ইমরান আত-তুলাহি যখন মদীনার বিচারক ছিলেন, তখনকার কথা। একবছর খলিফা আবু জাফর মানসুর হজে এলেন। খলিফার ইচ্ছা ছিল, উটচালকদের নিয়ে শামে যাবেন। কিন্তু তারা এতে সম্মত ছিল না। একপর্যায়ে তারা ইবনু ইমরানের কাছে অভিযোগ দায়ের করল। বিচারক তখন খলিফার কাছে আদালতে উপস্থিতির জন্য সমন পাঠালেন। চাপরাশিকে বলে দিলেন, খলিফাকে যেন সম্মানের সাথে না ডাকা হয়। বরং তাকে নাম ধরে ডাকতে হবে। অবশেষে খলিফা উপস্থিত হলে বিচারক তার সাথে বিশেষ কোনো আচরণ করলেন না। এমনকি বিচারের রায়ও দিলেন খলিফার বিপক্ষে। বিচারকার্য সমাপ্তির পর তিনি খলিফাকে যথারীতি সম্মান প্রদর্শন করলেন। খলিফাও তখন বিচারকের আচরণ সমর্থন করলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করে দিলেন। বিচারক তখন এ কথাও বলেছিলেন, ‘অনেকে তো আপনার বিপক্ষে জুলুমের অভিযোগ করে থাকে। এমনটা হলে আপনি অভিযুক্ত হিসেবে নিজেই তাদের সাথে উপস্থিত হবেন। নাহয় আপনার উকিলকে পাঠাবেন।’
বিচারকার্যের ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ ইবনু ইমরান ছিলেন অনমনীয়তার মূর্ত প্রতীক। মানবিকতাই তার কাছ মুখ্য ছিল। অন্যায়ভাবে কেউ তার কাছে বিন্দুমাত্রও সুবিধা নিতে পারত না। আবু আইয়ুব আল-মূরিয়ানি ছিলেন খলিফা মানসুরের মন্ত্রী এবং কয়েকটি দপ্তরের দায়িত্বশীল। একবার তার কয়েকজন আত্মীয় তার বিপক্ষে মুহাম্মাদ ইবনু ইমরানের কাছে অভিযোগ দায়ের করল। বিচারক তখন সমন পাঠালেও আবু আইয়ুব উপস্থিত হলেন না। পরবর্তীকালে মদীনার প্রশাসক যিয়াদ ইবনু উবাইদিল্লাহ আল-হারিসির কাছে তাকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘আপনার কাছে আমি সমন পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি নিজেও উপস্থিত হননি, আপনার উকিলও পাঠাননি।’ আবু আইয়ুব তখন বিচারকের সাথে রূঢ় আচরণ করলেন। ইবনু ইমরান তখনই হাত বাড়িয়ে আবু আইয়ুবকে ধরতে যাচ্ছিলেন। সামনে আমির-উমারা এবং নিরাপত্তাকর্মী থাকায় সে যাত্রায় রেহাই পেয়ে গেলেন আবু আইয়ুব।
মুরগাব নদী নিয়ে বসরাবাসী খলিফা আল-মাহদির খিলাফতকালে বিচারক উবাইদুল্লাহ ইবনুল হাসান আল-আনবারির কাছে মোকদ্দমা দায়ের করেছিল। কিন্তু তিনি কোনো ফয়সালা করেননি। এরপর খলিফা আল-হাদির সময়ও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। অবশেষে খলিফা আর-রাশিদ খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কর্মকর্তা জাফর ইবনু ইয়াহইয়া তখন খলিফার কাছে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানালেন। বসরাবাসীদের কাছে প্রমাণ না থাকায় খলিফা তাদের সপক্ষে ফয়সালা করেননি। অবশ্য পরবর্তীকালে তাদের এমনিতেই দিয়ে দেন।
অধিকাংশ বিচারকই প্রভাবশালী ছিলেন। বিচারকার্যে তাদের সুনাম ছিল। এজন্য জনগণের বড় একটা অংশের সমর্থনের পাশাপাশি খলিফা এবং প্রধান বিচারপতির ওপর তারা একদিক থেকে নির্ভর করতেন। অপরদিকে তাদের নির্ভরতা ছিল শারঈ বিধান পালন এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দ্বীনি অনুভূতির ওপর। এ কারণে বিচারক কোনো আমিরকে বন্দি করার নির্দেশ দিতে পারতেন। এর থেকেই বিচারকদের বিচার-সংক্রান্ত নিরাপত্তা প্রকাশ পায়। বিচারকরা সত্য, ন্যায়, দ্বীন এবং শরীয়ত বাস্তবায়ন করতেন বিধায় খলিফা বা প্রশাসক কেউই বিচারকদের বরখাস্ত করার দুঃসাহস দেখাতেন না। তাদের দুনিয়াবিমুখতা, পরহেজগারি ও অবিচলতার কারণে জনগণ তাদের সমর্থন করত এবং মেনে নিত।
আমিররা স্বয়ং বিচারকের কাছে আসতেন। আবার বিচারকরাও আমিরদের কাছে গমন করতেন। চতুর্থ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মিশরে এই রীতির প্রচলন ছিল। ইবনুস সুবকি লিখেছেন, বিচারক আলি ইবনুল হুসাইন ২৯৩ হিজরিতে বিচারক নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন ইবনু হারবুওয়াইহ নামে পরিচিত। ৩১৯ হিজরিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন মিশরের শেষ বিচারক, যার কাছে আমিররা আগমন করতেন। আত্মসম্মান এবং ন্যায়পরায়ণতার খাতিরে তিনি আমিরের সম্মানার্থে দাঁড়ানো থেকে বিরত থাকতেন। বিচারকদের এই রীতির কথা সবাই জানত। তৎকালীন লেখক আর সাহিত্যিকদের লেখাতেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে। এখানে এ সংক্রান্ত কয়েকটি শিরোনামের দিকে আমরা শুধু ইঙ্গিত প্রদান করছি। বিচারকের সামনে খলিফা, বিচারের কাঠগড়ায় আমির, বিচারক কর্তৃক খলিফার সাক্ষ্য গ্রহণ না করা এবং আল-মামুনের বিরুদ্ধে জনৈক ব্যক্তির অভিযোগ।
খলিফাদের মতো প্রশাসক আর আমিরদের অনেকেই সাধারণ মানুষের মতো সুবিচার এবং ন্যায়পরায়ণতা মেনে নিতেন। শুধু তা-ই নয়: বিচারককে তার অবস্থানে অনমনীয় থাকতে তারা সহায়তাও করতেন। রাক্কাহ নগরীর আমিরকে অভিযুক্ত হয়ে বিচারকের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে আমরা দেখতে পাই। বিচারকার্য সমাপ্তির পর তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম করে বলছি—সবল এবং দুর্বলের ওপর সমানভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে যে ব্যক্তি অক্ষম, সে সফল বিচারক নয়।’
টিকাঃ
[৫৬৭] এ ঘটনাটি পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
[৫৬৮] যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৬৯] যুহরুল ইসলাম: ২/২৫০
[৫৭০] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৯৩; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৬৬
[৫৭১] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১৮৪; কাসাসুল আরব: ৩/৬৫
[৫৭২] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৯০-৯১
[৫৭৩] যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৭৪] তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতুল কুবরা: ৩/৪৪৭; যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ১/৩১২
[৫৭৫] কাসাসুল আরব: ৩/৪৭, ৬৫, ৭১, ৭৪, ৭৮; যুহরুল ইসলাম: ২/২৪৯
[৫৭৬] কাসাসুল আরব: ৩/৭৮
📄 বিচারক বরখাস্ত করা
উমাইয়া যুগের আলোচনায় আমরা অধিক হারে বিচারক বরখাস্ত করতে দেখেছি। কারণ সে যুগে সাধারণত বিচারক নিয়োগ দেওয়া হতো আমির কিংবা প্রশাসকের পক্ষ থেকে। প্রশাসক বা আমির পরিবর্তন হলে আগের বিচারক বরখাস্ত হয়ে সে জায়গায় নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতো। অনেক সময় প্রশাসক নিজেও বারংবার বিচারক বরখাস্ত করতেন।
পক্ষান্তরে আব্বাসি যুগে বিচারক খুব কম বরখাস্ত হয়েছে। সে-সময় বিচারকরা বেশির ভাগই স্থায়ী নিয়োগ পেতেন। কারণ প্রশাসক এবং আমিরদের বিচারক বরখাস্ত করার অধিকার খর্ব করা হয়েছিল। এ অধিকার ছিল সাধারণভাবে প্রধান বিচারপতি এবং খলিফার জন্য সীমাবদ্ধ। তাই বিচারক বরখাস্তকরণ কদাচিৎ ঘটত। শারিক বলেছেন, ‘বিচারক নিয়োগ দান এবং বরখাস্ত কেবল খলিফাই করতে পারতেন।’ পূর্বে আমাদের আলোচিত বিচার-সংক্রান্ত সুরক্ষার কথা বলে এটাই বোঝানো হয়েছে। আব্বাসি যুগে বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে এটা ছিল প্রসিদ্ধ।
বিচারক অপসারণ এবং নতুন বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি প্রশাসনিক নিয়ম ছিল। নব নিযুক্ত বিচারক নির্ভরযোগ্য দুজন ব্যক্তিকে সাবেক বিচারকের কাছে পাঠাতেন। লোক দুজন তখন বিচার-সংক্রান্ত নথিপত্র সাবেক বিচারক থেকে নিয়ে নতুন বিচারকের কাছে পৌঁছে দিতেন।
টিকাঃ
[৫৭৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৮২; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৮৯
[৫৭৮] শারহু আদাবিল কাযি: ১/২৫৮