📄 পূর্বের যুগের সাথে আব্বাসি যুগের সম্পর্ক
রাজনৈতিক দিক থেকে আব্বাসি যুগ ছিল উমাইয়া যুগের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ফলাফল। ফলত উমাইয়াদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে তারা ছিল বদ্ধপরিকর। উমাইয়াদের নাম-নিশানা তারা মিটিয়ে ফেলেছিল। এমনকি রাজধানীকেও তারা দামিস্ক এবং শাম থেকে স্থানান্তরিত করে বাগদাদ এবং ইরাকে নিয়ে যায়। রাজনৈতিক জীবন থেকে আরবির প্রভাব সরে গিয়ে সেখানে ফারসি এবং পরবর্তীতে জায়গা করে নেয় তুর্কি। সেইসাথে আঞ্চলিক আর জাতিগত প্রভাব তো ছিলই।
পক্ষান্তরে জ্ঞানগত এবং বিচার-সংক্রান্ত দিকটি এমন ছিল না। তাতে ধারাবাহিক অগ্রগতি অব্যাহত ছিল। বিদ্রোহ আর আন্দোলনের প্রভাব এই সেক্টরে তেমন একটা পড়েনি। জ্ঞানগত এবং বিচারগত অবস্থার দিক থেকে আব্বাসি যুগ ছিল উমাইয়া যুগের সম্প্রসারণ। তবে ইসলামি বিচারব্যবস্থার ভিত্তি এবং পদ্ধতি ছিল সেটাই, যা রাশিদুন যুগ থেকে চলে আসছিল।
আব্বাসিরা ক্ষমতা গ্রহণের পরও উমাইয়া যুগের অধিকাংশ বিচারক বহাল রেখেছিলেন। ইমাম তথা ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, আলিম এবং ফকিহদের অনেকেই উভয় যুগ পেয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ আবু হানিফা এবং আওযায়ি-এর কথা বলা যায়। উভয় খিলাফতকালেই তাঁরা দুজন ছিলেন সমসাময়িক। আবার মদীনার বিচারক ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আনসারি উমাইয়া এবং আব্বাসি—উভয় যুগেই বিচারকার্য পরিচালনা করেন। আবু জাফর মানসুর তাঁকে ইরাকের হাশিমিয়্যাহতে বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন।
আব্বাসি খলিফাগণ অধিকাংশ দেশে নিয়োজিত বিচারকদের কোনো রকম অপসারণ করেননি। যেমন উমাইয়া যুগে মদীনার বিচারক হিসেবে থাকা মুহাম্মাদ ইবনু ইমরান-কে খলিফা আবু জাফর মানসুর সেখানেই বহাল রেখেছিলেন।
উমাইয়া খিলাফতের বিচার-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা থেকে আব্বাসি খিলাফত অনেক উপকৃত হয়েছে। অবশ্য বিস্তৃতি এবং উন্নতির সাথে সাথে অনেক কিছু তারা নিজেরাও যুক্ত করেছিলেন। উমর ইবনু আবদিল আজিজ সূত্রে ইমাম মালিক বলেছেন, ‘মানুষের মাঝে অন্যায় যত বাড়ে, বিচারব্যবস্থার সীমারেখাও তত বড় হতে থাকে।’ এই বক্তব্য থেকে বিচারব্যবস্থার পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ স্পষ্ট হয়। আসলে বিচারব্যবস্থার আবর্তন জীবনকে ঘিরেই হয়ে থাকে। ফলে সাধারণভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এবং বিশেষভাবে আইনের বিকাশ ঘটতে থাকে।
উমাইয়া খিলাফতকালের শেষ দিককার দুর্বলতা আর ত্রুটি আব্বাসিরা ধরতে পেরেছিলেন। তাই পরিচালনা সুসংহত করার লক্ষ্যে বিচারব্যবস্থাপনার প্রতি তারা বিশেষভাবে মনোযোগ দেন। বিভিন্ন স্থানে বিচারক নিযুক্ত করার ক্ষমতাটি আবু জাফর মানসুর খলিফার দায়িত্বে পুনরায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। আব্বাসি খলিফাগণ অভিযোগের তদন্তের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতেন। দুর্নীতি দমন বিষয়ক তাদের বিশেষ ব্যবস্থাপনার কথা আমরা সামনে আলোচনা করব। এ যুগেই মজলুমদের জন্য ‘দারুল আদল’ নামে একটি পৃথক দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়। খলিফাদের অনেকেই অভিযোগের তদন্ত সংক্রান্ত বিচারকার্য নিজেরা পরিচালনা করতেন।
বিচারব্যবস্থা ছিল খলিফা এবং প্রশাসকদের প্রভাবমুক্ত। খলিফা এবং প্রাদেশিক শাসকদের ক্ষমতা কেবল বিচারক নিযুক্তি এবং অপসারণের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত। বিচারব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার তাদের ছিল না। তারপরও কোনো কোনো খলিফা বিচারব্যবস্থাকে নিজের মনমতো পরিচালনা করতে চাইলে আলিমগণ দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। আব্বাসি যুগে বিচার সংশ্লিষ্ট অনেক নতুন নতুন বিষয় প্রকাশিত হয়েছিল। চালু হয়েছিল অনেক রকম ধারা-উপধারা। এসব নিয়ে আমরা সামনে আলোচনা করব।
আব্বাসি যুগে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা
বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আব্বাসি যুগে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। যা-তে প্রকাশ পেয়েছিল অনেক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ। যা ছিল আব্বাসি যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং জ্ঞানগত ক্রমবিকাশের সাথে সম্পৃক্ত। যা ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং আব্বাসিদের ঐতিহাসিক দীর্ঘ শাসনামলকে অন্তর্ভুক্ত করে। সে-সময় বিচারব্যবস্থার প্রতি পরিপূর্ণরূপে লক্ষ রাখা হতো। আব্বাসি শাসনামলের প্রথম অংশ তথা স্বর্ণযুগে এই বিচারব্যবস্থা শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছেছিল। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে তথা আব্বাসি শাসনামলের অবসান পর্যন্ত বিভিন্ন খলিফা, প্রশাসক, সুলতান, সেনাপতি এবং বিচারকদের কারণে তাতে নানারকম উত্থান-পতন চলতে থাকে।
প্রথম দিকের আব্বাসি খলিফাগণ তাদের শাসনামলের শুরু থেকেই বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার পরিচয় দেন। উমাইয়া যুগের শেষ দিকে দেখতে পাওয়া দুর্বলতা এবং শিথিলতা তারা সংশোধন করে নিয়েছিলেন।
শাইখ নুবাহি লিখেছেন, ‘ইয়াজিদ ইবনু আবদিল মালিক এবং তার পুত্র আল-ওয়ালিদের সময় থেকে বিচারব্যবস্থা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে ক্ষমতার পালা-বদল হয়। মসনদে বসে আব্বাসিরা। বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে তারা অত্যন্ত কড়াকড়ি আরোপ করে। শারঈ কাজ পরিচালনার জন্য তারা শীর্ষস্থানীয় আলিমদের নিয়োগ দেওয়া শুরু করে।’
বিচারব্যবস্থা এবং বিচারকদের প্রতি খলিফা আবু জাফর মানসুরের বিশেষ সহানুভূতি ছিল। পরবর্তীকালে খলিফা আল-হাদি, আর-রাশিদ এবং আল-মামুন তার অনুসরণ করেন। তাদের কারণে বিচারব্যবস্থাপনা মজবুত হয়। এরপর সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে সেই কাজ পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল নববি যুগে এবং রাশিদুন ও উমাইয়া যুগে যার নির্মাণ কাজ চলছিল। এখান আমরা আব্বাসি যুগের উভয় অংশে ঘটে যাওয়া সেই নতুন নতুন অবস্থা এবং বিবর্তনের কিঞ্চিৎ বিবরণ নিয়ে আলোচনা করব।
টিকাঃ
[৫৫৪] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬২
[৫৫৫] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৬১; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩৯; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ৩/৭৭
[৫৫৬] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৮৭, ১৮৯ এবং ৩/২৪১
[৫৫৭] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৮২ এবং ১৮৩
[৫৫৮] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৩৯