📄 আব্বাসি খলিফাগণ
১. আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ। তিনি ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস -এর নাতি মুহাম্মাদ ইবনু আলির ছেলে। তার প্রকৃত নাম আবদুল্লাহ। ১৩২ হিজরিতে তিনি খিলাফতের জন্য বাইয়াত গ্রহণ করেন। ১৩৬ হিজরিতে আনবার-এ তার মৃত্যু হয়।
২. আবু জাফর মানসুর। তার প্রকৃত নাম আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ। সম্পর্কের দিক থেকে তিনি ছিলেন আস-সাফফাহ-এর ভাই। ১৩৭ হিজরি থেকে ১৫৮ হিজরি পর্যন্ত তিনি খিলাফতের দায়িত্বে ছিলেন। তিনিই হলেন আব্বাসি খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা। দাপট, সাহসিকতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, শক্তিমত্তা এবং প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এ বংশের অনন্য ব্যক্তিত্ব।
৩. আল-মাহদি মুহাম্মাদ ইবনুল মানসুর। তার খিলাফতকাল ছিল ১৫৮ থেকে ১৬৯ হিজরি পর্যন্ত। হত্যা বা বিশৃঙ্খলার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য সবাইকে তিনি জেলখানা থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। দুর্নীতি দমনে তিনি ছিলেন অগ্রগামী।
৪. আল-হাদি মূসা ইবনুল মাহদি মুহাম্মাদ। ১৬৯ থেকে ১৭০ হিজরি পর্যন্ত তিনি খলিফা ছিলেন।
৫. আর-রাশিদ হারুন। তার খিলাফতকাল ছিল ১৭০ থেকে ১৯৩ হিজরি অবধি। তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয় খলিফা এবং অধিকতর সম্মানিত বাদশাহগণের অন্যতম।
৬. আল-আমিন মুহাম্মাদ ইবনুর রাশিদ। ১৯৩ থেকে ১৯৮ হিজরি তিনি খিলাফতের দায়িত্বে ছিলেন।
৭. আল-মামুন আবদুল্লাহ ইবনুর রাশিদ। তার খিলাফতকাল ছিল ১৯৮ থেকে ২১৮ হিজরি। আব্বাসি বংশীয়দের মাঝে তার অধ্যবসায় এবং প্রত্যয় ছিল সবার সেরা। জ্ঞান, বিচার, বিচক্ষণতা এবং বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে তার কোনো জুড়ি ছিল না। যেমন ছিল তার বাহাদুরি, তেমনি ছিল নেতৃত্বের গুণ। মহানুভবতা এবং প্রজ্ঞায় তিনি ছিলেন অনন্য। অবশ্য মুতাজিলি মতাদর্শ তার মাধ্যমেই স্থিতি লাভ করছিল।
৮. আল-মুতাসিম বিল্লাহ। তার প্রকৃত নাম ছিল মুহাম্মাদ ইবনু হারুনুর রশিদ। ২১৮ থেকে ২২৭ হিজরি পর্যন্ত তিনি খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে তাদের আরামের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন।
৯. আল-ওয়াসিক বিল্লাহ হারুন ইবনুল মুতাসিম। ২২৭ থেকে ২৩২ হিজরি।
১০. আল-মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ জাফর ইবনুল মুতাসিম। ২৩২ থেকে ২৪৭ হিজরি অবধি তিনি খলিফা ছিলেন। খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পর তিনি মুতাজিলাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে সুন্নাহর প্রতি অনুরাগী হয়ে যান। তার উদ্যোগেই মুহাদ্দিসদের সম্মানিত করা শুরু হয়।
১১. আল-মুনতাসির বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল মুতাওয়াক্কিল। ২৪৭ থেকে ২৪৮ হিজরি। তার খিলাফতকাল ছিল ৫ মাস কয়েকদিন। প্রজাদের মাঝে সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতার বিস্তার ঘটানোয় তার প্রতাপ সকলের কাছে পছন্দনীয় হয়। তিনি ছিলেন প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী এবং কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।
১২. আল-মুসতাইন বিল্লাহ আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনিল মুতাসিম। ২৪৮ থেকে ২৫১ হিজরি। তিনি খিলাফতের দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছিলেন।
১৩. আল-মুতাজ বিল্লাহ মুহাম্মাদ। কেউ কেউ তার নাম যুবাইর আবু আবদিল্লাহ ইবনুল মুতাওয়াক্কিল বলেছেন। ২৫১ থেকে ২৫৫ হিজরি। তিনিও খিলাফতের দায়িত্ব থেকে সরে যান।
১৪. আল-মুহতাদি বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াসিক ইবনিল মুতাসিম। ২৫৫ থেকে ২৫৬ হিজরি পর্যন্ত। পরহেজগারিতা এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনি অন্য খলিফাদের তুলনায় অগ্রগামী ছিলেন। গান-বাজনা নিষিদ্ধ করেছিলেন। ক্ষমতাসীনদের জুলুম কঠোরভাবে দমন করতেন।
১৫. আল-মুতামিদ আলাল্লাহ আহমাদ ইবনুল মুতাওয়াক্কিল। ২৫৬ থেকে ২৭৯ হিজরি।
১৬. আল-মুতাদ্বিদ বিল্লাহ আহমাদ ইবনু তালহা। ২৭৯ - ২৮৯ হিজরি।
১৭. আল-মুকতাফি বিল্লাহ আলি ইবনু আহমাদ। ২৮৯ - ২৯৫ হিজরি।
১৮. আল-মুকতাদির বিল্লাহ জাফর ইবনু আহমাদ। ২৯৫ হিজরি থেকে ৩২০ হিজরি অবধি তিনি খলিফা ছিলেন। খলিফা নিযুক্ত হওয়ার সময় তার বয়স ছিল ১৩ বছর। কম বয়স্ক হওয়ায় উজির আবুল হাসান আলি ইবনুল ফুরাতকে তিনি দায়িত্ব প্রদান করেন। আবুল হাসান সুন্দরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তিনি নিজে মজলুমের পাশে থাকার পাশাপাশি খলিফাকেও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করতেন।
১৯. আল-কাহির বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ আল-মুতাদ্বিদ। ৩২০ - ৩২২ হিজরি।
২০. আর-রাদি বিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু জাফর আল-মুকতাদির। ৩২২ - ৩২৯ হিজরি।
২১. আল-মুত্তাকি বিল্লাহ ইবরাহীম ইবনু জাফর আল মুকতাদির। ৩২৯ - ৩৩৩ হিজরি।
২২. আল-মুসতাকফি বিল্লাহ ইবনুল মুতাদ্বিদ। ৩৩৩ - ৩৩৪ হিজরি। তার খিলাফতকালে বুওয়াইয়ারা বাগদাদ দখল করে নিয়েছিল।
২৩. আল-মুতি লিল্লাহ ফজল ইবনু জাফর আল-মুকতাদির। ৩৩৪ - ৩৬৩ হিজরি। ২৯ বছর খলিফা থাকার পর তিনি অব্যাহতি নেন।
২৪. আত-তাই বিল্লাহ আবদুল কারীম ইবনুল ফজল। ৩৬৩ - ৩৮১ হিজরি।
২৫. আল-কাদির বিল্লাহ আহমাদ ইবনু আবি বকর। ৩৮১ - ৪২১ হিজরি। ৪১ বছর কয়েক মাস খলিফা থাকার পর ৮৬ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ছিলেন। সে-সময় রাষ্ট্রের পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতি হয়েছিল।
২৬. আল-কায়িম বি আমরিল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু আহমাদ। ৪২২ - ৪৬৭ হিজরি। পিতা থেকেও অধিক সময়কাল সর্বমোট ৪৫ বছর তিনি খলিফা ছিলেন।
২৭. আল-মুকতাদি বি আমরিল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ। ৪৬৭ - ৪৮৭ হিজরি।
২৮. আল-মুসতাযহির বিল্লাহ আহমাদ ইবনুল মুকতাদি। ৪৮৭ - ৫১২ হিজরি। তিনি অত্যন্ত কোমলপ্রাণ ন্যায়বিচারক ছিলেন।
২৯. আল-মুসতারশিদ বিল্লাহ ফজল ইবনুল মুসতাযহির। ৫১২ - ৫২৯ হিজরি। খিলাফতকে পুনরুজ্জীবিত করে সুসংহত আর সুদৃঢ় করেছিলেন। শেষে তিনি গুপ্ত-হত্যার শিকার হন।
৩০. আর-রাশিদ বিল্লাহ মানসুর ইবনুল মুসতারশিদ। ৫২৯ - ৫৩২ হিজরি।
৩১. আল-মুকতাফি লি আমরিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল মুসতাযহির। ৫৩২ - ৫৫৫ হিজরি। খিলাফত এবং নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য তিনি নবায়ন করেছিলেন। তার সময়কালে রাজ্যে ইনসাফ আর সুবিচারের পরিবেশ ছিল। হৃত বাগদাদ পুনরায় খলিফাদের হাতে আসে।
৩২. আল-মুসতানজিদ বিল্লাহ ইউসুফ ইবনুল মুকতাফি। ৫৫৫ - ৫৬৬ হিজরি। সুবিচার, নম্রতা, যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বুদ্ধিমত্তায় তার খ্যাতি ছিল। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং আল্লাহর বিধানের বিরোধীদের ব্যাপারে তিনি ছিলেন কঠোর। দামিস্কে আইয়ুবিদের সাথে তার সম্পর্ক ছিল।
৩৩. আল-মুসতাদ্বি বি আমরিল্লাহ হাসান ইবনুল মুসতানজিদ। ৫৬৬ - ৫৭৫ হিজরি।
৩৪. আন-নাসির লি দ্বীনিল্লাহ আহমাদ ইবনুল মুসতাদ্বি। ৫৭৫ - ৬২২ হিজরি। তার সময়কালই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ। এ সময়ই তাতারিদের উপদ্রব শুরু হয়। সাধারণ মানুষ খলিফাকে সমীহ যেমন করত, তেমনি জোর-জুলুমের ভয়ে সবসময় তটস্থ থাকত।
৩৫. আয-যাহির বি আমরিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুন নাসির। ৬২২ - ৬২৩ হিজরি। তার খিলাফতকাল ছিল মাত্র নয় মাস কয়েক দিন। তিনি ছিলেন খুব জনদরদি শাসক। জুলুম এবং ট্যাক্স প্রথা বাতিল করে মানুষের মাঝে সম্পদ বিতরণ করেন। ইনসাফ আর ন্যায়পরায়ণতার ক্ষেত্রে তিনি যেন উমরের যুগ ফিরিয়ে এনেছিলেন।
৩৬. আল-মুসতানসির বিল্লাহ মানসুর ইবনুয যাহির। ৬২৩ - ৬৪০ হিজরি। তিনি সর্বত্র ইনসাফের প্রসার ঘটিয়েছিলেন।
৩৭. আল-মুসতাসিম বিল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনুল মুসতানসির। ৬৪০ - ৬৫৬ হিজরি। তাতারিদের হাতে তিনি নিহত হন। তিনিই ছিলেন শেষ আব্বাসি খলিফা। বাবা এবং দাদার মতো ধর্মপ্রাণ এবং সুন্নাহর প্রতি অনুরাগী ছিলেন। কিন্তু তাদের মতো দৃঢ় প্রত্যয়ী, সচেতন এবং হুঁশিয়ার ছিলেন না।
সোয়া পাঁচশত বছরের সময়কালে অনেক ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ মাত্র কয়েক মাস খলিফা ছিলেন। আবার কারও খিলাফতকাল ছিল ৪০ বছরের বেশি। পরিকল্পিতভাবে খিলাফত পরিচালনা, তাকওয়া, পরহেজগারিতা এবং দুনিয়াবিমুখতায় তাদের অনেকেই ছিলেন অনন্য। জাতিগত এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক অধিকারের প্রতি তাদের লক্ষ থাকত। তারা উন্নত চরিত্রের অধিকারী হওয়ায় মানুষও তাদের সমীহ করত। খিলাফত পরিচালনা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় তাদের দৃষ্টি ছিল সূক্ষ্ম। পক্ষান্তরে নিজেদের বেখেয়ালির কারণে কেউ কেউ পতিত হয়েছিলেন ধ্বংসের অতল গহ্বরে। ফলে তারা পরিণত হন উজির ও সেনাপতিদের খেলার পুতুলে। অনেকেই প্রাণ দিয়েছিলেন, অনেকেই হয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত। আবার কেউ কেউ নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।
খলিফাদের এই ইতিবাচক এবং নেতিবাচক চিত্রের প্রভাব বিচারব্যবস্থার ওপরও পড়েছিল। খলিফা মানসুর, রাশিদ এবং মামুনের সময় যে বিচারব্যবস্থা উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল, আব্বাসি যুগের শেষ দিকে এসে তা মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। বিশেষভাবে বাগদাদে এমনটা হয়েছিল। ফলে কেউ কেউ এটাকে অর্থ কামাইয়ের মাধ্যম বানিয়ে নেয়। ব্যবসায়ী, মূর্খ এবং সম্পদশালীরা এ ব্যবস্থাপনার কর্ণধার হয়ে ওঠে।
খলিফা মানসুরের যুগে আলিমরা হাদিস, ফিকহ, তাফসির, আরবি ভাষা এবং ইতিহাসের মতো নানা বিষয় সংকলনে মনোনিবেশ করেন। ফিকহ-সংক্রান্ত এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক বিভিন্ন মাযহাব প্রকাশ পায়। বিচারক নিয়োগ, অপসারণ, বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনতা, তারা কোন মতাদর্শ অনুসরণ করতেন এবং মতাদর্শ অনুসারে বিচারকের সংখ্যাগত তফাত কেমন ছিল—এসব নিয়ে তারা কথা বলেননি। বিষয়টা আমরা সামনে দেখব।
টিকাঃ
[৫৩৯] রাওদ্বাতুল কুদ্দাহ: ৪/১৫০১
[৫৪০] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ ২/১৯৭; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৫৯
[৫৪১] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৭২; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ ৩/৮৬
[৫৪২] তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ৩/১৭৪; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৩০৬
[৫৪৩] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৬৫; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৩৩৬; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ৩/২২৯
[৫৪৪] তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ৩/২৫৪; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৩৪৬
[৫৪৫] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৩৫৬ ও ৩৫৭; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ৩/২৭০
[৫৪৬] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৩৭৯; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৮০
[৫৪৭] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৩১
[৫৪৮] তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ৩/৪৫০; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৪১
[৫৪৯] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৪৩; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ৩/৪৬৪
[৫৫০] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৪৮; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬৪
[৫৫১] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৫৮; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ৩/৪৭৭
[৫৫২] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬৫; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৬০
[৫৫৩] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৪৬৪
📄 পূর্বের যুগের সাথে আব্বাসি যুগের সম্পর্ক
রাজনৈতিক দিক থেকে আব্বাসি যুগ ছিল উমাইয়া যুগের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ফলাফল। ফলত উমাইয়াদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে তারা ছিল বদ্ধপরিকর। উমাইয়াদের নাম-নিশানা তারা মিটিয়ে ফেলেছিল। এমনকি রাজধানীকেও তারা দামিস্ক এবং শাম থেকে স্থানান্তরিত করে বাগদাদ এবং ইরাকে নিয়ে যায়। রাজনৈতিক জীবন থেকে আরবির প্রভাব সরে গিয়ে সেখানে ফারসি এবং পরবর্তীতে জায়গা করে নেয় তুর্কি। সেইসাথে আঞ্চলিক আর জাতিগত প্রভাব তো ছিলই।
পক্ষান্তরে জ্ঞানগত এবং বিচার-সংক্রান্ত দিকটি এমন ছিল না। তাতে ধারাবাহিক অগ্রগতি অব্যাহত ছিল। বিদ্রোহ আর আন্দোলনের প্রভাব এই সেক্টরে তেমন একটা পড়েনি। জ্ঞানগত এবং বিচারগত অবস্থার দিক থেকে আব্বাসি যুগ ছিল উমাইয়া যুগের সম্প্রসারণ। তবে ইসলামি বিচারব্যবস্থার ভিত্তি এবং পদ্ধতি ছিল সেটাই, যা রাশিদুন যুগ থেকে চলে আসছিল।
আব্বাসিরা ক্ষমতা গ্রহণের পরও উমাইয়া যুগের অধিকাংশ বিচারক বহাল রেখেছিলেন। ইমাম তথা ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, আলিম এবং ফকিহদের অনেকেই উভয় যুগ পেয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ আবু হানিফা এবং আওযায়ি-এর কথা বলা যায়। উভয় খিলাফতকালেই তাঁরা দুজন ছিলেন সমসাময়িক। আবার মদীনার বিচারক ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আনসারি উমাইয়া এবং আব্বাসি—উভয় যুগেই বিচারকার্য পরিচালনা করেন। আবু জাফর মানসুর তাঁকে ইরাকের হাশিমিয়্যাহতে বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন।
আব্বাসি খলিফাগণ অধিকাংশ দেশে নিয়োজিত বিচারকদের কোনো রকম অপসারণ করেননি। যেমন উমাইয়া যুগে মদীনার বিচারক হিসেবে থাকা মুহাম্মাদ ইবনু ইমরান-কে খলিফা আবু জাফর মানসুর সেখানেই বহাল রেখেছিলেন।
উমাইয়া খিলাফতের বিচার-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা থেকে আব্বাসি খিলাফত অনেক উপকৃত হয়েছে। অবশ্য বিস্তৃতি এবং উন্নতির সাথে সাথে অনেক কিছু তারা নিজেরাও যুক্ত করেছিলেন। উমর ইবনু আবদিল আজিজ সূত্রে ইমাম মালিক বলেছেন, ‘মানুষের মাঝে অন্যায় যত বাড়ে, বিচারব্যবস্থার সীমারেখাও তত বড় হতে থাকে।’ এই বক্তব্য থেকে বিচারব্যবস্থার পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ স্পষ্ট হয়। আসলে বিচারব্যবস্থার আবর্তন জীবনকে ঘিরেই হয়ে থাকে। ফলে সাধারণভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এবং বিশেষভাবে আইনের বিকাশ ঘটতে থাকে।
উমাইয়া খিলাফতকালের শেষ দিককার দুর্বলতা আর ত্রুটি আব্বাসিরা ধরতে পেরেছিলেন। তাই পরিচালনা সুসংহত করার লক্ষ্যে বিচারব্যবস্থাপনার প্রতি তারা বিশেষভাবে মনোযোগ দেন। বিভিন্ন স্থানে বিচারক নিযুক্ত করার ক্ষমতাটি আবু জাফর মানসুর খলিফার দায়িত্বে পুনরায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। আব্বাসি খলিফাগণ অভিযোগের তদন্তের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতেন। দুর্নীতি দমন বিষয়ক তাদের বিশেষ ব্যবস্থাপনার কথা আমরা সামনে আলোচনা করব। এ যুগেই মজলুমদের জন্য ‘দারুল আদল’ নামে একটি পৃথক দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়। খলিফাদের অনেকেই অভিযোগের তদন্ত সংক্রান্ত বিচারকার্য নিজেরা পরিচালনা করতেন।
বিচারব্যবস্থা ছিল খলিফা এবং প্রশাসকদের প্রভাবমুক্ত। খলিফা এবং প্রাদেশিক শাসকদের ক্ষমতা কেবল বিচারক নিযুক্তি এবং অপসারণের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত। বিচারব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার তাদের ছিল না। তারপরও কোনো কোনো খলিফা বিচারব্যবস্থাকে নিজের মনমতো পরিচালনা করতে চাইলে আলিমগণ দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। আব্বাসি যুগে বিচার সংশ্লিষ্ট অনেক নতুন নতুন বিষয় প্রকাশিত হয়েছিল। চালু হয়েছিল অনেক রকম ধারা-উপধারা। এসব নিয়ে আমরা সামনে আলোচনা করব।
আব্বাসি যুগে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা
বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আব্বাসি যুগে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। যা-তে প্রকাশ পেয়েছিল অনেক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ। যা ছিল আব্বাসি যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং জ্ঞানগত ক্রমবিকাশের সাথে সম্পৃক্ত। যা ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং আব্বাসিদের ঐতিহাসিক দীর্ঘ শাসনামলকে অন্তর্ভুক্ত করে। সে-সময় বিচারব্যবস্থার প্রতি পরিপূর্ণরূপে লক্ষ রাখা হতো। আব্বাসি শাসনামলের প্রথম অংশ তথা স্বর্ণযুগে এই বিচারব্যবস্থা শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছেছিল। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে তথা আব্বাসি শাসনামলের অবসান পর্যন্ত বিভিন্ন খলিফা, প্রশাসক, সুলতান, সেনাপতি এবং বিচারকদের কারণে তাতে নানারকম উত্থান-পতন চলতে থাকে।
প্রথম দিকের আব্বাসি খলিফাগণ তাদের শাসনামলের শুরু থেকেই বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার পরিচয় দেন। উমাইয়া যুগের শেষ দিকে দেখতে পাওয়া দুর্বলতা এবং শিথিলতা তারা সংশোধন করে নিয়েছিলেন।
শাইখ নুবাহি লিখেছেন, ‘ইয়াজিদ ইবনু আবদিল মালিক এবং তার পুত্র আল-ওয়ালিদের সময় থেকে বিচারব্যবস্থা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে ক্ষমতার পালা-বদল হয়। মসনদে বসে আব্বাসিরা। বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে তারা অত্যন্ত কড়াকড়ি আরোপ করে। শারঈ কাজ পরিচালনার জন্য তারা শীর্ষস্থানীয় আলিমদের নিয়োগ দেওয়া শুরু করে।’
বিচারব্যবস্থা এবং বিচারকদের প্রতি খলিফা আবু জাফর মানসুরের বিশেষ সহানুভূতি ছিল। পরবর্তীকালে খলিফা আল-হাদি, আর-রাশিদ এবং আল-মামুন তার অনুসরণ করেন। তাদের কারণে বিচারব্যবস্থাপনা মজবুত হয়। এরপর সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে সেই কাজ পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়, যার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল নববি যুগে এবং রাশিদুন ও উমাইয়া যুগে যার নির্মাণ কাজ চলছিল। এখান আমরা আব্বাসি যুগের উভয় অংশে ঘটে যাওয়া সেই নতুন নতুন অবস্থা এবং বিবর্তনের কিঞ্চিৎ বিবরণ নিয়ে আলোচনা করব।
টিকাঃ
[৫৫৪] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/২৬২
[৫৫৫] তারীখুল খুলাফা, পৃ. ২৬১; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩৯; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ৩/৭৭
[৫৫৬] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৮৭, ১৮৯ এবং ৩/২৪১
[৫৫৭] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৮২ এবং ১৮৩
[৫৫৮] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৩৯