📄 বসরার বিচারকগণ
বসরায় অনেকেই বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তাদের কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।
১. উমাইরা ইবনু ইয়াসরিবি আদ-দিব্বি: মুআবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত বসরার প্রশাসক আবদুল্লাহ ইবনু আমির ইবনি কুরাইয তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। ধার নেওয়া সম্পদ নষ্ট হয়ে গেলে উমাইরা সেটার ভর্তুকি প্রদানের ফয়সালা করতেন। ৪৫ হিজরি পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। অবশেষে বসরার পরবর্তী প্রশাসক যিয়াদ তাকে বরখাস্ত করে ইমরান ইবনু হুসাইনকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু তিনি অব্যাহতি চাইলে প্রথমে আবদুল্লাহ ইবনু ফাদ্বালাহকে, এরপর তার ভাই আসিম ইবনু ফাদ্বালাহকে নিয়োগ দেয়। তারপর নিয়োগ পান যুরারাহ ইবনু আউফা। ঘুরারাহ বিচারের ক্ষেত্রে একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যই গ্রহণ করতেন।
২. হাসান বসরি: ইবনু আউন বলেন, হাসান বসরি বিচারক হলে লোকেরা তাঁর কাছে ভিড় জমাল। তখন তিনি বললেন, মানুষকে তার বিবেকই সংশোধন করতে পারে। প্রশাসক আদি ইবনু আরতাত হাসানকে বিচারকার্য পরিচালনার কাজে নিযুক্ত করেছিল। তার কাছ থেকে বের হয়ে হাসান বললেন, 'এই লোকটি আমাকে মানুষের সামনে বিচারক হিসেবে বসিয়েছে। আমি তাকে আমার বার্ধক্যের কথা বলেছি। আমার দুর্বলতার কথা জানিয়েছি। বিচারকার্য পরিচালনা করার মতো শক্তি আমার নেই। তখন সে বলল, "আপনার জায়গায় আরেকজন লোক বসানোর আগ পর্যন্ত কিছুদিন আমাকে সহযোগিতা করুন।" হাসান বসরি বেশিদিন বিচারকার্য পরিচালনা করেননি।
৩. ইয়াস ইবনু মুআবিয়া ইবনি কুররা আল-মুযানি: তিনি ছিলেন বসরায় বনু উমাইয়া কর্তৃক নিযুক্ত সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ বিচারক। প্রখর মেধা, অন্তর্দৃষ্টি, দূরদর্শিতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, নির্ভুল সিদ্ধান্ত, সঠিক নির্ভুল মতামত এবং উত্তম চরিত্রে তার প্রসিদ্ধি ছিল। উমর ইবনু আবদিল আজিজ খলিফা হওয়ার পর আদি ইবনু আরতাতকে বসরার প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। আদি তখন ইয়াস ইবনু মুআবিয়াকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করলেন।
ইবনু আরতাত একবার বিদ্বেষবশত কুৎসা রটিয়ে ইয়াসকে অপমান করতে চাইলে তিনি বসরা থেকে বেরিয়ে শামে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের কাছে চলে গেলেন। আদি তখন খলিফার কাছে চিঠি লিখলেন, 'ইয়াস তার দায়িত্ব রেখে পালিয়ে আপনার কাছে গিয়েছে। অগত্যা হাসান ইবনু আবিল হাসানকে আমি বিচারের দায়িত্ব দিয়েছি।' জবাবে উমর ইবনু আবদিল আজিজ বললেন, 'তুমি হাসানকে যে দায়িত্ব দিয়েছ, নিঃসন্দেহে সে তার উপযুক্ত। কিন্তু তোমার সাথে বিচারব্যবস্থার কী সম্পর্ক! তুমি বিচারকাজে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছ। আল্লাহ তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে দেবেন।'
ইয়াসের অভ্যাস ছিল বিচক্ষণ হাদিসবিশারদ খালিদ আল-হাযযার সাথে পরামর্শ করা। বিভিন্ন মোকদ্দমার ক্ষেত্রে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের সাথে তিনি পত্র বিনিময় করতেন। তিনি দ্রুত-সময়ের মধ্যে বিচার করতে পারতেন। সাধারণত এক বৈঠকে কয়েকটি মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করতেন। আইয়ুব বলেছেন, 'ইয়াসের মতো কোনো বিচারক আমি দেখিনি।' তিনি তালাকের ক্ষেত্রে মহিলাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। বাদীর শপথ ও সাক্ষীর মাধ্যমে বিচার করতেন। তিনি প্রতিবেশীকে শুফআর অধিকার দিতেন। এরপর উমর ইবনু আবদিল আজিজের পত্র আসলে তখন থেকে শুফআর অধিকার অংশীদারদের দেওয়া শুরু করেন। অপবাদের বিষয়টি উদঘাটন এবং যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতেন। দাসদের ক্ষেত্রে কিসাসের ফয়সালা করতেন না। বাবার খরচ দেওয়া ছেলের কর্তব্য বলে ফয়সালা করতেন। অন্ধ ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করতেন না। কিয়াফাহ তথা হাবভাব অনুসারেও বিচার করতেন। তিনি বলতেন, 'মানুষের জন্য সংগতিপূর্ণ ক্ষেত্রে তোমরা অনুমান করে বিচার করতে পারো। এমন বিচার সংগতিপূর্ণ না হলে দলিলভিত্তিক বিচার করবে।'
তার প্রদত্ত ফতোয়ার মতো বিচারকার্যের সংখ্যাও অনেক। তিনি জীবনে যত ফতোয়া দিয়েছেন এবং যত বিচারাচার করেছেন-তা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। তার মেধা, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতা ছিল প্রবাদতুল্য। ওয়াসেত নামক এলাকায় ১২২ হিজরি মোতাবেক ৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন। বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক জাহিয তার প্রশংসায় বলেন, ইয়াস ছিলেন মুযার বংশের গৌরব। একজন প্রথম সারির বিচারক। তার অনুমান ছিল নির্ভুল। তথ্য তালাশকারী, প্রখর বিচক্ষণ, বিস্ময়কর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং খলিফাগণের কাছে সমাদৃত।
ইয়াসের প্রশংসায় ইবনু খাল্লিকান বলেন, তিনি ছিলেন বাকপটু, চৌকশ, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম, মেধা ও বিচক্ষণতায় অনন্য, ধীমান এবং সুভাষী, সর্বোপরি প্রবাদতুল্য ব্যক্তিত্ব। দিগদিগন্তে তার খ্যাতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মানুষ বিচারকার্য পরিচালনা শিখতে তার কাছে আসত। তখন শিক্ষার্থীদের তিনি বলতেন, 'বিচারকার্য শেখার বিষয় নয়; অনুধাবনের বিষয়। তোমরা বলো, "আমাদেরকে ইলমের দীক্ষা দিন।"' তার জীবনী, জীবনাচার এবং বিচারকার্য সম্পর্কে বিশাল আকৃতির গ্রন্থ লেখা সম্ভব।
৪. আবদুল মালিক ইবনু ইয়ালা: হাসান বসরির সমমতের লোক ছিলেন। ত্রুটির কারণে বিক্রিত পণ্য ফিরিয়ে দেওয়ার ফয়সালা দিতেন তিনি। মিথ্যা সাক্ষীদের শাস্তি দিতেন। ওসিয়তকারীর লিখিত এবং সিলকৃত ওসিয়তের ব্যাপারে না জেনেই সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমোদন প্রদান করতেন।
৫. সুমামা ইবনু আবদিল্লাহ আনসারি: তিনি ১০৬ সনে বসরার বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ১১০ হিজরি অবধি সে দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। বকর ইবনু আবদিল্লাহ আল-মুযানি তার আগে বসরার বিচার বিভাগের দায়িত্বে থাকার পরও একসময় ইস্তফা দিয়েছিলেন।
৬. বিলাল ইবনু আবি বুরদা: আবু মূসা আশআরি -এর নাতি। খালিদ আল- কুসারি ১১০ হিজরিতে বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তাকে বিচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বসরার প্রশাসক এবং বিচারক হয়ে যান।
৭. আমির ইবনু উবাইদ আল-বাহিলি: তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি উমর ইবনু আবদিল আজিজের কোনো কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ঘটনা ছিল এমন, একবার উমর ইবনু আবদিল আজিজ একটি জানাযার উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন একটি চাদর আনা হলো। তৎকালীন খলিফারা কোনো জানাযায় বের হলে বসার জন্য তাদের সামনে চাদর পেশ করা হতো। চাদর পেশ করা হলে আমির ইবনু উবাইদ সেটা পা দিয়ে সরিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন।
৮. আব্বাদ ইবনু মানসুর আন-নাজি: তিনি বেশ কয়েকবার বসরার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছিলেন। আমিরের পর তিনি বিচারক হয়েছিলেন। ১৩২ হিজরিতে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনায় নিয়োজিত ছিলেন।
**টিকাঃ**
[৫০২] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/২৯০, ২৯২, ২৯৬; তারীখুত তবারি: ৫/৪৫
[৫০৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৩; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৯; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৭/১৫৬, ১৫৮
[৫০৪] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/৩১২-৩৭৪; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৯৮; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৭/৩৩৪; আল-আলাম: ১/৩৭৬; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩৪; আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৩২; ওয়াফায়াতুল আইয়ান: ১/২২৩
[৫০৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/১৫
[৫০৬] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৩০
[৫০৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/২২-৪২
[৫০৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪২
[৫০৯] আখবারুল কুদ্দাহ: ২/৪৩
বসরায় অনেকেই বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তাদের কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।
১. উমাইরা ইবনু ইয়াসরিবি আদ-দিব্বি: মুআবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত বসরার প্রশাসক আবদুল্লাহ ইবনু আমির ইবনি কুরাইয তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। ধার নেওয়া সম্পদ নষ্ট হয়ে গেলে উমাইরা সেটার ভর্তুকি প্রদানের ফয়সালা করতেন। ৪৫ হিজরি পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। অবশেষে বসরার পরবর্তী প্রশাসক যিয়াদ তাকে বরখাস্ত করে ইমরান ইবনু হুসাইনকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু তিনি অব্যাহতি চাইলে প্রথমে আবদুল্লাহ ইবনু ফাদ্বালাহকে, এরপর তার ভাই আসিম ইবনু ফাদ্বালাহকে নিয়োগ দেয়। তারপর নিয়োগ পান যুরারাহ ইবনু আউফা। ঘুরারাহ বিচারের ক্ষেত্রে একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যই গ্রহণ করতেন।
২. হাসান বসরি: ইবনু আউন বলেন, হাসান বসরি বিচারক হলে লোকেরা তাঁর কাছে ভিড় জমাল। তখন তিনি বললেন, মানুষকে তার বিবেকই সংশোধন করতে পারে। প্রশাসক আদি ইবনু আরতাত হাসানকে বিচারকার্য পরিচালনার কাজে নিযুক্ত করেছিল। তার কাছ থেকে বের হয়ে হাসান বললেন, 'এই লোকটি আমাকে মানুষের সামনে বিচারক হিসেবে বসিয়েছে। আমি তাকে আমার বার্ধক্যের কথা বলেছি। আমার দুর্বলতার কথা জানিয়েছি। বিচারকার্য পরিচালনা করার মতো শক্তি আমার নেই। তখন সে বলল, "আপনার জায়গায় আরেকজন লোক বসানোর আগ পর্যন্ত কিছুদিন আমাকে সহযোগিতা করুন।" হাসান বসরি বেশিদিন বিচারকার্য পরিচালনা করেননি।
৩. ইয়াস ইবনু মুআবিয়া ইবনি কুররা আল-মুযানি: তিনি ছিলেন বসরায় বনু উমাইয়া কর্তৃক নিযুক্ত সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ বিচারক। প্রখর মেধা, অন্তর্দৃষ্টি, দূরদর্শিতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, নির্ভুল সিদ্ধান্ত, সঠিক নির্ভুল মতামত এবং উত্তম চরিত্রে তার প্রসিদ্ধি ছিল। উমর ইবনু আবদিল আজিজ খলিফা হওয়ার পর আদি ইবনু আরতাতকে বসরার প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। আদি তখন ইয়াস ইবনু মুআবিয়াকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করলেন।
ইবনু আরতাত একবার বিদ্বেষবশত কুৎসা রটিয়ে ইয়াসকে অপমান করতে চাইলে তিনি বসরা থেকে বেরিয়ে শামে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের কাছে চলে গেলেন। আদি তখন খলিফার কাছে চিঠি লিখলেন, 'ইয়াস তার দায়িত্ব রেখে পালিয়ে আপনার কাছে গিয়েছে। অগত্যা হাসান ইবনু আবিল হাসানকে আমি বিচারের দায়িত্ব দিয়েছি।' জবাবে উমর ইবনু আবদিল আজিজ বললেন, 'তুমি হাসানকে যে দায়িত্ব দিয়েছ, নিঃসন্দেহে সে তার উপযুক্ত। কিন্তু তোমার সাথে বিচারব্যবস্থার কী সম্পর্ক! তুমি বিচারকাজে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছ। আল্লাহ তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে দেবেন।'
ইয়াসের অভ্যাস ছিল বিচক্ষণ হাদিসবিশারদ খালিদ আল-হাযযার সাথে পরামর্শ করা। বিভিন্ন মোকদ্দমার ক্ষেত্রে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের সাথে তিনি পত্র বিনিময় করতেন। তিনি দ্রুত-সময়ের মধ্যে বিচার করতে পারতেন। সাধারণত এক বৈঠকে কয়েকটি মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করতেন। আইয়ুব বলেছেন, 'ইয়াসের মতো কোনো বিচারক আমি দেখিনি।' তিনি তালাকের ক্ষেত্রে মহিলাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। বাদীর শপথ ও সাক্ষীর মাধ্যমে বিচার করতেন। তিনি প্রতিবেশীকে শুফআর অধিকার দিতেন। এরপর উমর ইবনু আবদিল আজিজের পত্র আসলে তখন থেকে শুফআর অধিকার অংশীদারদের দেওয়া শুরু করেন। অপবাদের বিষয়টি উদঘাটন এবং যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতেন। দাসদের ক্ষেত্রে কিসাসের ফয়সালা করতেন না। বাবার খরচ দেওয়া ছেলের কর্তব্য বলে ফয়সালা করতেন। অন্ধ ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করতেন না। কিয়াফাহ তথা হাবভাব অনুসারেও বিচার করতেন। তিনি বলতেন, 'মানুষের জন্য সংগতিপূর্ণ ক্ষেত্রে তোমরা অনুমান করে বিচার করতে পারো। এমন বিচার সংগতিপূর্ণ না হলে দলিলভিত্তিক বিচার করবে।'
তার প্রদত্ত ফতোয়ার মতো বিচারকার্যের সংখ্যাও অনেক। তিনি জীবনে যত ফতোয়া দিয়েছেন এবং যত বিচারাচার করেছেন-তা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। তার মেধা, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতা ছিল প্রবাদতুল্য। ওয়াসেত নামক এলাকায় ১২২ হিজরি মোতাবেক ৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন। বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক জাহিয তার প্রশংসায় বলেন, ইয়াস ছিলেন মুযার বংশের গৌরব। একজন প্রথম সারির বিচারক। তার অনুমান ছিল নির্ভুল। তথ্য তালাশকারী, প্রখর বিচক্ষণ, বিস্ময়কর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং খলিফাগণের কাছে সমাদৃত।
ইয়াসের প্রশংসায় ইবনু খাল্লিকান বলেন, তিনি ছিলেন বাকপটু, চৌকশ, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম, মেধা ও বিচক্ষণতায় অনন্য, ধীমান এবং সুভাষী, সর্বোপরি প্রবাদতুল্য ব্যক্তিত্ব। দিগদিগন্তে তার খ্যাতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মানুষ বিচারকার্য পরিচালনা শিখতে তার কাছে আসত। তখন শিক্ষার্থীদের তিনি বলতেন, 'বিচারকার্য শেখার বিষয় নয়; অনুধাবনের বিষয়। তোমরা বলো, "আমাদেরকে ইলমের দীক্ষা দিন।"' তার জীবনী, জীবনাচার এবং বিচারকার্য সম্পর্কে বিশাল আকৃতির গ্রন্থ লেখা সম্ভব।
৪. আবদুল মালিক ইবনু ইয়ালা: হাসান বসরির সমমতের লোক ছিলেন। ত্রুটির কারণে বিক্রিত পণ্য ফিরিয়ে দেওয়ার ফয়সালা দিতেন তিনি। মিথ্যা সাক্ষীদের শাস্তি দিতেন। ওসিয়তকারীর লিখিত এবং সিলকৃত ওসিয়তের ব্যাপারে না জেনেই সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমোদন প্রদান করতেন।
৫. সুমামা ইবনু আবদিল্লাহ আনসারি: তিনি ১০৬ সনে বসরার বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ১১০ হিজরি অবধি সে দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। বকর ইবনু আবদিল্লাহ আল-মুযানি তার আগে বসরার বিচার বিভাগের দায়িত্বে থাকার পরও একসময় ইস্তফা দিয়েছিলেন।
৬. বিলাল ইবনু আবি বুরদা: আবু মূসা আশআরি -এর নাতি। খালিদ আল- কুসারি ১১০ হিজরিতে বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তাকে বিচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বসরার প্রশাসক এবং বিচারক হয়ে যান।
৭. আমির ইবনু উবাইদ আল-বাহিলি: তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি উমর ইবনু আবদিল আজিজের কোনো কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ঘটনা ছিল এমন, একবার উমর ইবনু আবদিল আজিজ একটি জানাযার উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন একটি চাদর আনা হলো। তৎকালীন খলিফারা কোনো জানাযায় বের হলে বসার জন্য তাদের সামনে চাদর পেশ করা হতো। চাদর পেশ করা হলে আমির ইবনু উবাইদ সেটা পা দিয়ে সরিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন।
৮. আব্বাদ ইবনু মানসুর আন-নাজি: তিনি বেশ কয়েকবার বসরার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছিলেন। আমিরের পর তিনি বিচারক হয়েছিলেন। ১৩২ হিজরিতে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনায় নিয়োজিত ছিলেন।
**টিকাঃ**
[৫০২] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/২৯০, ২৯২, ২৯৬; তারীখুত তবারি: ৫/৪৫
[৫০৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৩; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৯; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৭/১৫৬, ১৫৮
[৫০৪] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/৩১২-৩৭৪; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৯৮; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৭/৩৩৪; আল-আলাম: ১/৩৭৬; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩৪; আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৩২; ওয়াফায়াতুল আইয়ান: ১/২২৩
[৫০৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/১৫
[৫০৬] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৩০
[৫০৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/২২-৪২
[৫০৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪২
[৫০৯] আখবারুল কুদ্দাহ: ২/৪৩
📄 উমাইয়া যুগে কুফার বিচারকগণ
সে যুগে কুফা ছিল জ্ঞানতৎপরতায় সর্বাধিক চাঞ্চল্যে ভরপুর নগরী। উমর -এর যুগে কুফা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সেটা ছিল তৎপর, গতিমুখর এবং জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র। আলি এ শহরকে ইসলামি খিলাফতের রাজধানী বানিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য অনেক বিচারক এখানে ছিলেন, যারা এই শহরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। উরওয়া ইবনুল জাদি আল-বারীকি, সালমান ইবনু রবীআ আল-বাহিলি, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ, জাবর ইবনুল কাসআম আল-কিনদি, শারহাবিল ইবনু জাবর এবং আবু কুররা আল-কিনদি ছিলেন তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য। আবু কুররার নাম কেউ কেউ সালামা ইবনু মুআবিয়া বলেছেন। এদের প্রত্যেকেই ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব-এর যুগের বিচারক। আমিরুল মুমিনীন সর্বশেষে শুরাইহকে কুফার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি রাশিদুন যুগের দীর্ঘসময় বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। উমাইয়া যুগেও শুরাইহ দীর্ঘকাল বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। ৩৫ বছরের চেয়েও বেশি সময় তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাঝে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর এবং আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের মধ্যকার ফিতনার সময় তিনি দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর প্রশাসক হাজ্জাজের কাছে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলে ৭৮ হিজরিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এরপর আরও কয়েকজন বিচারক কুফার বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের কথা আমরা এখানে আলোচনা করব।
১. মাসরুক ইবনুল আজদা আল-হামাদানি: মুআবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক যিয়াদের অধীনে বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্যতম। তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে থাকা কোনো জিনিসের ব্যাপারে দুজন ব্যক্তি দাবি করেছে—এমতাবস্থায় উভয়ের প্রমাণ সমান হলে জিনিসটা উভয় দাবিদারের মাঝে বণ্টন করে দিতেন।
২. আবদুর রহমান ইবনু আবি লাইলা: হাজ্জাজ কুফায় আগমন করে তাকে বিচারক নিযুক্ত করেন। ফয়সালা প্রদানের পূর্বে পরামর্শ করার জন্য সাঈদ ইবনু জুবায়রকে সাথে নিয়ে তিনি বিচার করতে বসতেন।
৩. আমির ইবনু আবদুল্লাহ ইবনি কায়স: আবু বুরদা ইবনু আবি মূসা আশআরি নামে তিনি পরিচিত। ইবনু আবি লাইলার পর হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ তাকে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ দিয়েছিল। আবু বুরদা নিজের বাড়িতে বসেই বিচার করতেন। তিন বছর দায়িত্ব পালন করার পর তিনি হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের কাছে অব্যাহতি চাইলে হাজ্জাজ তাকে অব্যাহতি দিয়ে তার ভাই আবু বকর ইবনু আবি মূসাকে তার স্থলাভিষিক্ত করে।
ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি শাবির কাছে কোনো কিছু জানতে চাইলে তাকে আবু বকর ইবনু মূসার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আবু বকর ইবনু মূসা তখন বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। উমর ইবনু আবদিল আজিজ বসরার প্রশাসক হওয়ার আগ পর্যন্ত আবু বকর ইবনু মূসা বসরায় বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন।
৪. আমের ইবনু শারাহিল শাবি : উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। শাবি ছিলেন বসরার অন্যতম খ্যাতিমান বিচারক। অনেকবার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েও অবশেষে ১০৩ হিজরি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কেউ কেউ অবশ্য ১০৪ হিজরির কথা বলেছেন। তার অনেক প্রসিদ্ধ বিচারকার্য রয়েছে। বিচারকার্যে তার চমৎকার আচরণ আজও প্রশংসনীয়।
৫. আবদুল মালিক ইবনু উমাইর আল-লাখমি: শাবির পর কে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, আবদুল মালিক। আবার কারও কারও মতে, আল-কাসিম। আবদুল মালিক ছিলেন অত্যন্ত বিশুদ্ধভাষী, ধীশক্তির অধিকারী।
৬. কাসিম ইবনু আবদুর রহমান: আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ-এর নাতি। তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব বাবদ কোনো ভাতা নিতেন না। উমর ইবনু আবদিল আজিজ এ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইতেন। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। স্বাধীন ব্যক্তিকে অপবাদ আরোপ করায় একজন ক্রীতদাসকে তিনি ৮০ ঘা চাবুক মেরেছিলেন। মোকদ্দমায় শপথ করা থেকে তিনি বিরত থাকতেন।
উমর ইবন হুবায়রা বসরার প্রশাসক হওয়ার পর আল-কাসিমকে বরখাস্ত করে তার জায়গায় হুসাইন ইবনু হাসান আল-কিনদিকে বিচারক নিযুক্ত করলেন। তারপর খালিদ ইবন আবদিল্লাহ আল-কুসারি প্রশাসক হয়ে হুসাইনকে পদচ্যুত করে তার জায়গায় সাঈদ ইবন আশওয়াকে বিচারক নিযুক্ত করলেন। তারপর নিয়োগ দেন ঈসা ইবনুল মুসাইয়াব আল-বাজালিকে। ঈসা ছিলেন সাঈদের অন্যতম সহযোগী। কেউ কেউ বলেন, সাঈদকে বরখাস্ত করে খালিদ তার জায়গায় হাকাম ইবনু উতাইবা আল-ইজলিকে নিয়োগ দেন। তারপর পর্যায়ক্রমে আবদুল্লাহ ইবনু নাউফ আত-তাইমিকে এবং মুহারিব ইবনু দিসার আস-সাদুসিকে। আবু বকর এবং উমর-এর প্রতি ভালোবাসা রাখে না-এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য মুহারিব গ্রহণ করতেন না। এরপর আবদুল্লাহ ইবনু শুবরুমাহকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি আব্বাসি যুগ অবধি দায়িত্ব পালন করেন। ১৪৪ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়।
তার অব্যাহতির পরই কুফার বিচারব্যবস্থার দায়িত্বে আসেন মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রহমান ইবনি আবি লাইলা। ইউসুফ ইবনু উমর আস-সাকাফি যাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কুফাবাসীদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ ফকিহ। ইলম এবং জীবনযাত্রায় তিনি ছিলেন ইবনু শুবরুমাহর সহযাত্রী। কুফার বিচারকার্য পরিচালনায় হাজ্জাজ ইবনু মানসুর আল-মুহারিবিকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারপর নিয়োগ দেওয়া হয় মানসুর ইবনু মুতামিরকে। তিনি ছিলেন উমাইয়া যুগে সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি।
**টিকাঃ**
[৫১০] আখবারুল কাদ্ধা: ২/১৮৪; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৩১। আলি -ও কুফাতে কয়েকজন বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। অবশেষে শুরাইহ সেখানে স্থির হন। (আখবারুল কাদ্বা: ২/৩৯৯)
[৫১১] রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৮
[৫১২] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪০৭
[৫১৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪০৬, ৪০৮, ৪১২, ৪১৩
[৫১৪] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৪১৩; আল-আলাম: ৪/১৮; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৭; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩১
[৫১৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/৩
[৫১৬] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/৬ এবং ৭
[৫১৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৬-৪০
[৫১৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৭৪
সে যুগে কুফা ছিল জ্ঞানতৎপরতায় সর্বাধিক চাঞ্চল্যে ভরপুর নগরী। উমর -এর যুগে কুফা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সেটা ছিল তৎপর, গতিমুখর এবং জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র। আলি এ শহরকে ইসলামি খিলাফতের রাজধানী বানিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য অনেক বিচারক এখানে ছিলেন, যারা এই শহরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। উরওয়া ইবনুল জাদি আল-বারীকি, সালমান ইবনু রবীআ আল-বাহিলি, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ, জাবর ইবনুল কাসআম আল-কিনদি, শারহাবিল ইবনু জাবর এবং আবু কুররা আল-কিনদি ছিলেন তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য। আবু কুররার নাম কেউ কেউ সালামা ইবনু মুআবিয়া বলেছেন। এদের প্রত্যেকেই ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব-এর যুগের বিচারক। আমিরুল মুমিনীন সর্বশেষে শুরাইহকে কুফার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি রাশিদুন যুগের দীর্ঘসময় বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। উমাইয়া যুগেও শুরাইহ দীর্ঘকাল বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। ৩৫ বছরের চেয়েও বেশি সময় তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাঝে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর এবং আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের মধ্যকার ফিতনার সময় তিনি দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর প্রশাসক হাজ্জাজের কাছে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলে ৭৮ হিজরিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এরপর আরও কয়েকজন বিচারক কুফার বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের কথা আমরা এখানে আলোচনা করব।
১. মাসরুক ইবনুল আজদা আল-হামাদানি: মুআবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক যিয়াদের অধীনে বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্যতম। তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে থাকা কোনো জিনিসের ব্যাপারে দুজন ব্যক্তি দাবি করেছে—এমতাবস্থায় উভয়ের প্রমাণ সমান হলে জিনিসটা উভয় দাবিদারের মাঝে বণ্টন করে দিতেন।
২. আবদুর রহমান ইবনু আবি লাইলা: হাজ্জাজ কুফায় আগমন করে তাকে বিচারক নিযুক্ত করেন। ফয়সালা প্রদানের পূর্বে পরামর্শ করার জন্য সাঈদ ইবনু জুবায়রকে সাথে নিয়ে তিনি বিচার করতে বসতেন।
৩. আমির ইবনু আবদুল্লাহ ইবনি কায়স: আবু বুরদা ইবনু আবি মূসা আশআরি নামে তিনি পরিচিত। ইবনু আবি লাইলার পর হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ তাকে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ দিয়েছিল। আবু বুরদা নিজের বাড়িতে বসেই বিচার করতেন। তিন বছর দায়িত্ব পালন করার পর তিনি হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের কাছে অব্যাহতি চাইলে হাজ্জাজ তাকে অব্যাহতি দিয়ে তার ভাই আবু বকর ইবনু আবি মূসাকে তার স্থলাভিষিক্ত করে।
ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি শাবির কাছে কোনো কিছু জানতে চাইলে তাকে আবু বকর ইবনু মূসার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আবু বকর ইবনু মূসা তখন বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। উমর ইবনু আবদিল আজিজ বসরার প্রশাসক হওয়ার আগ পর্যন্ত আবু বকর ইবনু মূসা বসরায় বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন।
৪. আমের ইবনু শারাহিল শাবি : উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। শাবি ছিলেন বসরার অন্যতম খ্যাতিমান বিচারক। অনেকবার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েও অবশেষে ১০৩ হিজরি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কেউ কেউ অবশ্য ১০৪ হিজরির কথা বলেছেন। তার অনেক প্রসিদ্ধ বিচারকার্য রয়েছে। বিচারকার্যে তার চমৎকার আচরণ আজও প্রশংসনীয়।
৫. আবদুল মালিক ইবনু উমাইর আল-লাখমি: শাবির পর কে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, আবদুল মালিক। আবার কারও কারও মতে, আল-কাসিম। আবদুল মালিক ছিলেন অত্যন্ত বিশুদ্ধভাষী, ধীশক্তির অধিকারী।
৬. কাসিম ইবনু আবদুর রহমান: আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ-এর নাতি। তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব বাবদ কোনো ভাতা নিতেন না। উমর ইবনু আবদিল আজিজ এ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইতেন। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। স্বাধীন ব্যক্তিকে অপবাদ আরোপ করায় একজন ক্রীতদাসকে তিনি ৮০ ঘা চাবুক মেরেছিলেন। মোকদ্দমায় শপথ করা থেকে তিনি বিরত থাকতেন।
উমর ইবন হুবায়রা বসরার প্রশাসক হওয়ার পর আল-কাসিমকে বরখাস্ত করে তার জায়গায় হুসাইন ইবনু হাসান আল-কিনদিকে বিচারক নিযুক্ত করলেন। তারপর খালিদ ইবন আবদিল্লাহ আল-কুসারি প্রশাসক হয়ে হুসাইনকে পদচ্যুত করে তার জায়গায় সাঈদ ইবন আশওয়াকে বিচারক নিযুক্ত করলেন। তারপর নিয়োগ দেন ঈসা ইবনুল মুসাইয়াব আল-বাজালিকে। ঈসা ছিলেন সাঈদের অন্যতম সহযোগী। কেউ কেউ বলেন, সাঈদকে বরখাস্ত করে খালিদ তার জায়গায় হাকাম ইবনু উতাইবা আল-ইজলিকে নিয়োগ দেন। তারপর পর্যায়ক্রমে আবদুল্লাহ ইবনু নাউফ আত-তাইমিকে এবং মুহারিব ইবনু দিসার আস-সাদুসিকে। আবু বকর এবং উমর-এর প্রতি ভালোবাসা রাখে না-এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য মুহারিব গ্রহণ করতেন না। এরপর আবদুল্লাহ ইবনু শুবরুমাহকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি আব্বাসি যুগ অবধি দায়িত্ব পালন করেন। ১৪৪ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়।
তার অব্যাহতির পরই কুফার বিচারব্যবস্থার দায়িত্বে আসেন মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রহমান ইবনি আবি লাইলা। ইউসুফ ইবনু উমর আস-সাকাফি যাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কুফাবাসীদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ ফকিহ। ইলম এবং জীবনযাত্রায় তিনি ছিলেন ইবনু শুবরুমাহর সহযাত্রী। কুফার বিচারকার্য পরিচালনায় হাজ্জাজ ইবনু মানসুর আল-মুহারিবিকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারপর নিয়োগ দেওয়া হয় মানসুর ইবনু মুতামিরকে। তিনি ছিলেন উমাইয়া যুগে সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি।
**টিকাঃ**
[৫১০] আখবারুল কাদ্ধা: ২/১৮৪; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৩১। আলি -ও কুফাতে কয়েকজন বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। অবশেষে শুরাইহ সেখানে স্থির হন। (আখবারুল কাদ্বা: ২/৩৯৯)
[৫১১] রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৮
[৫১২] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪০৭
[৫১৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪০৬, ৪০৮, ৪১২, ৪১৩
[৫১৪] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৪১৩; আল-আলাম: ৪/১৮; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৭; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩১
[৫১৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/৩
[৫১৬] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/৬ এবং ৭
[৫১৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৬-৪০
[৫১৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৭৪