📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 দামিস্কের বিচারকগণ

📄 দামিস্কের বিচারকগণ


দামিস্কের যারা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন, তারা ছিলেন খলিফার বিচারক। তাদের কর্মস্থল ছিল ইসলামি খিলাফতের প্রাণকেন্দ্রে। এতদসত্ত্বেও তারা ছিলেন অন্যান্য বিচারকদের মতোই সাধারণ। অন্যদের মাঝে তাদের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না। এমনকি বিভিন্ন শহরে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের থেকে কোনো মতামতও নেওয়া হতো না। তবে ইনসাফপূর্ণ বিচারকার্য পরিচালনা এবং স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে দামিস্কের বিচারকরা ছিলেন প্রসিদ্ধ। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা এখানে উল্লেখ করছি।

১. ফাদ্বালাহ ইবনু উবাইদ: আবুদ দারদা-এর প্রস্তাবনামতে মুআবিয়া তাঁকে শামের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ করেছিলেন। আমৃত্যু তিনি এ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ৫৩ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। মুআবিয়া তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করে খাটলির একাংশ নিজে বহন করেন। খলিফা মুআবিয়া দামিস্কের বাইরে গেলে ফাদ্বালাহ-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত বানিয়ে যেতেন।

একবার ফাদ্বালাহ-এর কাছে এক চোরকে চোরাই মাল সমেত নিয়ে আসা হলো। বিচারক তখন চোরকে বললেন, 'হয়তো এই সম্পদ তুমি কোথাও পেয়েছ। নয়তো কুড়িয়ে পেয়েছ।' তখন চোরকে ধরে নিয়ে আসা ব্যক্তিটি বলে উঠল, 'ইন্নালিল্লাহ, তিনি তো দেখি চোরকে অজুহাত শিখিয়ে দিচ্ছেন!' তখন চোরটি বলল, 'আল্লাহ আপনার সবকিছু ঠিক করে দিন। আল্লাহর কসম! আমি তো এই মাল কোথাও পেয়েছি।'

এরপর বিচারক দণ্ড রহিত করে লোকটিকে ছেড়ে দেন। ফকিহগণ শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিকে তালকিন তথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমোদন দিয়েছেন। মাইয-এর সাথে রাসূল যেমনটা করেছিলেন।

২. নুমান ইবনু বাশির ইবনি সাদ: তার উপনাম ছিল আবু ইদরিস আনসারি খাযরাজি। ফাদ্বালাহ-এর পর তিনি শামের বিচারক হয়েছিলেন। হিমসের কাছে ৬৪ হিজরিতে নিহত হন।

৩. বিলাল ইবনু আবিদ দারদা: নুমান ইবনু বাশিরের পর তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দামিস্কে খলিফা আবদুল মালিকের প্রতিনিধি হিসেবে নামাজ পড়াতেন এবং তাদের বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।

৪. আয়িযুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ: তার উপনাম ছিল আবু ইদরিস আল-খাওলানি। ইয়াজিদ ইবনু মুআবিয়া, মারওয়ান ইবনুল হাকাম এবং আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের সময় তিনি বিচারক ছিলেন। আবদুল মালিকের খিলাফতকালে তার মৃত্যু হয়।

৫. আবদুল্লাহ ইবনু আমির আল-ইয়াহসাবি আদ-দিমাশকি: তিনি ছিলেন সাতজন ক্বারির অন্যতম। বিচারক বিলালের পর তিনি দামিস্কের বিচারক হন। দামিস্কের মসজিদের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। শামবাসীরা তাকে ইলমুল ক্বিরাতের ইমামরূপে গ্রহণ করে।

৬. ঘুরআহ ইবনু আইয়ুব আল-মাআররি: খলিফা ওয়ালিদ ইবনু আবদিল মালিকের সময় তিনি বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর বিনিময়ে তিনি কোনো বেতন নিতেন না। তাকে ঘুরআহ ইবনু ছাওব নামেও উল্লেখ করা হয়।

৭. নুমাইর ইবনু আউস আল-আশআরি: খলিফা আবদুল মালিকের সময় তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে তার দৃষ্টিশক্তি চলে যায়। যেসব কঠিন মোকদ্দমায় কুরআন-হাদিসের কোনো দলিল পাওয়া যেত না, সেক্ষেত্রে তিনি খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিকের সাথে পত্র মারফত যোগাযোগ করতেন এবং তার জবাব অনুসারে ফয়সালা দিতেন। তিনি নির্ভরযোগ্য দাসের সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। একবার তিনি দামিস্কের এক লোকের ওসিয়ত অনুসারে ফয়সালা করলে শামের বিজ্ঞ ফকিহ মাকহুল তার সাথে সহমত পোষণ করেন। সাক্ষীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি—এমন ওসিয়তের ব্যাপারে সাক্ষ্য নাজায়েজ হওয়ার ব্যাপারে তারা দুজনই একমত। নুমাইর শারীরিক দুর্বলতার কারণে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলে খলিফা হিশাম তখন তার স্থলে নিযুক্ত করা যায় এমন বিচারকের পরামর্শ দিতে বলেন। তখন তিনি দামিস্কের ফকিহ ইয়াজিদ ইবনু আবি মালিক-সহ আরও কয়েকজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন। খলিফা তখন ইয়াজিদকে নিয়োগ দেন।

৮. সুলাইমান ইবনু হাবিব আল-মুহারিবি: তিনি ছিলেন খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজ এবং তাঁর পরবর্তী খলিফাদের বিচারক। সুদীর্ঘ ৩০ বছর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হিমসের বিচারক ছিলেন। আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের সাথে তার পত্র মারফত যোগাযোগ হতো। সুলাইমান বলেছেন, 'উমর ইবনু আবদিল আজিজ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, অগ্নিপূজারিদের সম্পত্তির হালাল বস্তুর ব্যাপারে আমি যেন মিরাস বণ্টনের ফয়সালা করি। আর হারাম বস্তুর মিরাস যেন রহিত করে দিই।' কাযি সুলাইমান সাক্ষীর পাশাপাশি কসমের মাধ্যমে বিচার করতেন। ইবনু শিহাব আয-যুহরির সাথে ফতোয়া প্রদানের দায়িত্বও তিনি পালন করতেন।

**টিকাঃ**
[৪৭৯] দামিস্ত এবং শামে উমাইয়া যুগের খলিফাদের বিস্তারিত বিবরণ জানতে দেখুন, আখবারুল কুদ্দাহ : ৩/১৯৯; রাওদ্বাতুল কুদ্দাহ: ৪/১৫০০ এবং কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ১।
[৪৮০] আখবারুল কুদ্দাহ: ৩/১৯৯ এবং ২০১; কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২
[৪৮১] আখবারুল কুদ্দাহ: ৩/২০১; কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৩
[৪৮২] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২০১; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৩
[৪৮৩] আখবারুল কুদ্বাহ : ৩/২০১; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৫০০; তারীখুত তবারি: ৫/৩৫; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৫
[৪৮৪] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৫; মারজিউল উলুমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৫২
[৪৮৫] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২০২; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৬
[৪৮৬] আখবারুল কুদ্বাই: ৩/২০৪; ২০৬; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৫০১: কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৮
[৪৮৭] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/৩১০; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৫০১; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৯

দামিস্কের যারা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন, তারা ছিলেন খলিফার বিচারক। তাদের কর্মস্থল ছিল ইসলামি খিলাফতের প্রাণকেন্দ্রে। এতদসত্ত্বেও তারা ছিলেন অন্যান্য বিচারকদের মতোই সাধারণ। অন্যদের মাঝে তাদের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না। এমনকি বিভিন্ন শহরে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের থেকে কোনো মতামতও নেওয়া হতো না। তবে ইনসাফপূর্ণ বিচারকার্য পরিচালনা এবং স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে দামিস্কের বিচারকরা ছিলেন প্রসিদ্ধ। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা এখানে উল্লেখ করছি।

১. ফাদ্বালাহ ইবনু উবাইদ: আবুদ দারদা-এর প্রস্তাবনামতে মুআবিয়া তাঁকে শামের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ করেছিলেন। আমৃত্যু তিনি এ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ৫৩ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। মুআবিয়া তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করে খাটলির একাংশ নিজে বহন করেন। খলিফা মুআবিয়া দামিস্কের বাইরে গেলে ফাদ্বালাহ-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত বানিয়ে যেতেন।

একবার ফাদ্বালাহ-এর কাছে এক চোরকে চোরাই মাল সমেত নিয়ে আসা হলো। বিচারক তখন চোরকে বললেন, 'হয়তো এই সম্পদ তুমি কোথাও পেয়েছ। নয়তো কুড়িয়ে পেয়েছ।' তখন চোরকে ধরে নিয়ে আসা ব্যক্তিটি বলে উঠল, 'ইন্নালিল্লাহ, তিনি তো দেখি চোরকে অজুহাত শিখিয়ে দিচ্ছেন!' তখন চোরটি বলল, 'আল্লাহ আপনার সবকিছু ঠিক করে দিন। আল্লাহর কসম! আমি তো এই মাল কোথাও পেয়েছি।'

এরপর বিচারক দণ্ড রহিত করে লোকটিকে ছেড়ে দেন। ফকিহগণ শাস্তিযোগ্য ব্যক্তিকে তালকিন তথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমোদন দিয়েছেন। মাইয-এর সাথে রাসূল যেমনটা করেছিলেন।

২. নুমান ইবনু বাশির ইবনি সাদ: তার উপনাম ছিল আবু ইদরিস আনসারি খাযরাজি। ফাদ্বালাহ-এর পর তিনি শামের বিচারক হয়েছিলেন। হিমসের কাছে ৬৪ হিজরিতে নিহত হন।

৩. বিলাল ইবনু আবিদ দারদা: নুমান ইবনু বাশিরের পর তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দামিস্কে খলিফা আবদুল মালিকের প্রতিনিধি হিসেবে নামাজ পড়াতেন এবং তাদের বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।

৪. আয়িযুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ: তার উপনাম ছিল আবু ইদরিস আল-খাওলানি। ইয়াজিদ ইবনু মুআবিয়া, মারওয়ান ইবনুল হাকাম এবং আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের সময় তিনি বিচারক ছিলেন। আবদুল মালিকের খিলাফতকালে তার মৃত্যু হয়।

৫. আবদুল্লাহ ইবনু আমির আল-ইয়াহসাবি আদ-দিমাশকি: তিনি ছিলেন সাতজন ক্বারির অন্যতম। বিচারক বিলালের পর তিনি দামিস্কের বিচারক হন। দামিস্কের মসজিদের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। শামবাসীরা তাকে ইলমুল ক্বিরাতের ইমামরূপে গ্রহণ করে।

৬. ঘুরআহ ইবনু আইয়ুব আল-মাআররি: খলিফা ওয়ালিদ ইবনু আবদিল মালিকের সময় তিনি বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর বিনিময়ে তিনি কোনো বেতন নিতেন না। তাকে ঘুরআহ ইবনু ছাওব নামেও উল্লেখ করা হয়।

৭. নুমাইর ইবনু আউস আল-আশআরি: খলিফা আবদুল মালিকের সময় তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে তার দৃষ্টিশক্তি চলে যায়। যেসব কঠিন মোকদ্দমায় কুরআন-হাদিসের কোনো দলিল পাওয়া যেত না, সেক্ষেত্রে তিনি খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিকের সাথে পত্র মারফত যোগাযোগ করতেন এবং তার জবাব অনুসারে ফয়সালা দিতেন। তিনি নির্ভরযোগ্য দাসের সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। একবার তিনি দামিস্কের এক লোকের ওসিয়ত অনুসারে ফয়সালা করলে শামের বিজ্ঞ ফকিহ মাকহুল তার সাথে সহমত পোষণ করেন। সাক্ষীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি—এমন ওসিয়তের ব্যাপারে সাক্ষ্য নাজায়েজ হওয়ার ব্যাপারে তারা দুজনই একমত। নুমাইর শারীরিক দুর্বলতার কারণে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলে খলিফা হিশাম তখন তার স্থলে নিযুক্ত করা যায় এমন বিচারকের পরামর্শ দিতে বলেন। তখন তিনি দামিস্কের ফকিহ ইয়াজিদ ইবনু আবি মালিক-সহ আরও কয়েকজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন। খলিফা তখন ইয়াজিদকে নিয়োগ দেন।

৮. সুলাইমান ইবনু হাবিব আল-মুহারিবি: তিনি ছিলেন খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজ এবং তাঁর পরবর্তী খলিফাদের বিচারক। সুদীর্ঘ ৩০ বছর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হিমসের বিচারক ছিলেন। আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের সাথে তার পত্র মারফত যোগাযোগ হতো। সুলাইমান বলেছেন, 'উমর ইবনু আবদিল আজিজ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, অগ্নিপূজারিদের সম্পত্তির হালাল বস্তুর ব্যাপারে আমি যেন মিরাস বণ্টনের ফয়সালা করি। আর হারাম বস্তুর মিরাস যেন রহিত করে দিই।' কাযি সুলাইমান সাক্ষীর পাশাপাশি কসমের মাধ্যমে বিচার করতেন। ইবনু শিহাব আয-যুহরির সাথে ফতোয়া প্রদানের দায়িত্বও তিনি পালন করতেন।

**টিকাঃ**
[৪৭৯] দামিস্ত এবং শামে উমাইয়া যুগের খলিফাদের বিস্তারিত বিবরণ জানতে দেখুন, আখবারুল কুদ্দাহ : ৩/১৯৯; রাওদ্বাতুল কুদ্দাহ: ৪/১৫০০ এবং কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ১।
[৪৮০] আখবারুল কুদ্দাহ: ৩/১৯৯ এবং ২০১; কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ২
[৪৮১] আখবারুল কুদ্দাহ: ৩/২০১; কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৩
[৪৮২] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২০১; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৩
[৪৮৩] আখবারুল কুদ্বাহ : ৩/২০১; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৫০০; তারীখুত তবারি: ৫/৩৫; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৫
[৪৮৪] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৫; মারজিউল উলুমিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৫২
[৪৮৫] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২০২; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৬
[৪৮৬] আখবারুল কুদ্বাই: ৩/২০৪; ২০৬; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৫০১: কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৮
[৪৮৭] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/৩১০; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৫০১; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৯

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মদীনার বিচারকগণ

📄 মদীনার বিচারকগণ


উমাইয়া যুগে মদীনায় অনেক বিচারক ছিলেন। তাদের কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা এখানে তুলে ধরছি।

১. আবু হুরায়রা আবদুর রহমান ইবনু সাখর: প্রসিদ্ধ এই সাহাবি মদীনায় বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। নুআইম থেকে ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, 'আবু হুরায়রাকে বিচার করতে আমি দেখেছি।' তিনি বাদী-বিবাদীর মাঝে ইনসাফের আদেশ দিতেন। দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে ঋণের দায়ে বন্দি করতেন না। অপবাদদাতা অপরাধীকে ৮০টি বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিতেন। তিনি মদীনাতেই থাকতেন। ৫৯ হিজরিতে মদীনাতেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। সম্ভবত আবদুল্লাহ ইবনুল হারিসের আগে তাঁকে বিচারক নিযুক্ত করা হয়েছিল।

২. আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনি নাওফাল: কিংবা আবদুল্লাহ ইবনু নাওফাল ইবনিল হারিস। খলিফা মুআবিয়া-এর খিলাফতকালে তিনি ছিলেন মারওয়ান ইবনুল হাকামের পক্ষ থেকে মদীনার প্রথম বিচারক। মারওয়ান পরিবারের ব্যাপারে তিনিই সর্বপ্রথম যথাযথ বিচার করেছিলেন। ফলে মারওয়ানের কাছে তার মর্যাদা আরও বেড়ে যায়। তিনি বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষীর সাথে শপথও গ্রহণ করতেন। তিনি ছিলেন একজন নেককার মুসলিম এবং ফকিহ। ৮৪ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়।

৩. আবদুর রহমান ইবনু আউফ-এর ছেলে আবু সালামা: ৯৪ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয় তাবিয়িদের অন্যতম। মুআবিয়া -এর প্রশাসক সাঈদ ইবনুল আস তাকে মদীনার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। একজন সাক্ষী-সহ বাদীর কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করা ছিল তার রীতি।

৪. আবদুর রহমান ইবন আউফ-এর ছেলে মুসআব: ৬৪ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। ৫৩ বা ৫৪ হিজরিতে মারওয়ান ইবনুল হাকাম তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বের পাশাপাশি পুলিশ-প্রধানের দায়িত্বও পালন করতেন। দায়িত্বের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনেক কঠোর। সে-সময় মদীনায় হত্যার অপরাধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ অপরাধ দমনের জন্য তিনি মানুষকে কঠোরভাবে পাকড়াও করতেন।

এরপর যখন মুআবিয়া-এর ইন্তেকালের পর ইয়াজিদ খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করে উসমান ইবনু মুহাম্মাদকে মদীনার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন, উসমান ইবনু মুহাম্মাদ তখন জ্বলহা ইবনু আবদিল্লাহকে বিচারক নিযুক্ত করেন। ত্বলহা ছিলেন অনেক দানবীর। তাকে দানবীর জ্বলহা নামে সবাই চিনত। এরপর আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবাইর এবং আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের মধ্যকার ফিতনা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বনু উমাইয়া মদীনা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর এ ফিতনার সমাপ্তি ঘটে। ৭৩ হিজরিতে সবাই আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের কাছে বাইয়াত নিলে ৭৪ হিজরিতে হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ মদীনার প্রশাসক নিযুক্ত হন।

৫. সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু কায়স ইবনি মাখরামা: তিনি ছিলেন হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ কর্তৃক নিযুক্ত মদীনার বিচারক। হাজ্জাজ মদীনার বাইরে কোথাও গেলে ইবনু কায়স-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন।

৬. নাওফাল ইবনু মুসাহিক আল-আমিরি: তিনি ছিলেন উল্লেখযোগ্য তাবিয়ি এবং একজন হাদিসবিশারদ। অনেক বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। মারওয়ান ইবনুল হাকাম তাকে মদীনার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। একবার জনৈক ব্যক্তি তার কাছে মারওয়ানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে আসে। তখন মারওয়ানের কাছে তিনি এ মর্মে সমন পাঠান, 'রায় আপনার পক্ষে হোক কিংবা বিপক্ষে, তবুও আপনি নিজেই উপস্থিত হোন।'

এরপর ৮২ হিজরিতে আবান ইবনু উসমানকে পদচ্যুত করা হয়। যিনি সাত বছর আগে তার দায়িত্বের সময় নাওফালকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে বহাল রেখেছিলেন। আবান ছিলেন খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের পক্ষ থেকে মদীনার প্রশাসক। নাওফালের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিচার বিভাগের তদারকি করতেন। ইবনুয যুবাইর-এর মোকদ্দমা সম্পর্কে আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের কাছে জানতে চেয়ে আবান লিখেছিলেন, 'আমিরুল মুমিনীন কী বলেন? ইবনুয যুবাইরের ফয়সালা আমি কার্যকর করব, নাকি করব না?' জবাবে আবদুল মালিক লিখেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা তো ইবনুয যুবাইরকে দোষারোপ করি না। তবে যে বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে, তার জন্য আমরা সমালোচনা করি। আমার পত্র পাওয়ামাত্র তার ফয়সালা কার্যকর করবে। কেননা তার ফয়সালা প্রত্যাখ্যান করা আমাদের জন্য অসম্ভব।'

৭. উমর ইবনু খালদাহ আয-যুরকি: আবানকে বরখাস্ত করার পর তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে রবীআ বলেছেন, তিনি একজন শ্রেষ্ঠ বিচারক। আমাদের মাঝে তিনি এমন এক বিচারক ছিলেন, যার ব্যাপারে কোনো সমস্যা ছিল না। বাদী-বিবাদী বিচারের জন্য বসলে তিনি বিচারকের কর্তব্য বাতলে দিতেন। তার ইচ্ছা ছিল যত দ্রুত সম্ভব বিচার করে রেহাই দেওয়া। কারণ এটাই যে রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায়।

উমর ছিলেন একজন স্বচ্ছ মানুষ। একবার তিনি একজন অপবাদদাতার বিপক্ষে ফয়সালা দিয়ে তাকে বলেন, 'এই দুষ্ট! যাও, তুমি নিজেই নিজেকে বন্দি করে রাখো।' লোকটির সাথে তখন কোনো পুলিশ ছিল না। সে একা একাই জেলে এসে নিজেকে নিজেই বন্দি করে রাখল।

উমর ইবনু খালদাহকে বরখাস্ত করার পর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'আপনি যে দায়িত্বে ছিলেন, সে ব্যাপারে আপনার কী মতামত?' তিনি বললেন, 'আমাদের কিছু ভাই ছিল, যাদের সাথে আমরা আজ সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। আমাদের বসবাস করার মতো অল্প-স্বল্প কিছু জায়গা ছিল। যেগুলো আজ আমরা বিক্রি করে তার কিছু মূল্য খরচ করে ফেলেছি।'

৮. আমর ইবনু হাযাম আল-আনসারির পৌত্র আবু বকর ইবনু মুহাম্মাদ: মদীনার তৎকালীন প্রশাসক উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে ৮৭ হিজরিতে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ৯৪ হিজরিতে যখন উমর ইবনু আবদিল আজিজের অপসারণের পর উসমান ইবনু হাইয়ান আল-মুররি প্রশাসক হন, তিনিও আবু বকরকে স্বপদে বহাল রাখেন।

উসমান ইবনু হাইয়ানের পর আবু বকর প্রশাসক হন। তিনি অনেক বিচারাচার পরিচালনা করেছেন। তার প্রশাসক জীবনের অনেক ঘটনা রয়েছে। অপবাদের শাস্তিস্বরূপ তিনি ৮০টি বেত্রাঘাতের ফয়সালা করতেন। কিসাসের বিচার করেছেন। অতর্কিত হামলা করে এক যিম্মি তথা অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করার দায়ে এক মুসলিমকে তিনি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। কোনো রকম ওজর ছাড়া বিবাদী শহরে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আদালতে নিজে উপস্থিত না হয়ে উকিল পাঠালে সেটা তিনি গ্রহণ করতেন। কসম এবং সাক্ষী—উভয়টা নিয়ে তিনি বিচার করতেন। মদিনাবাসীদের ঐকমত্য তার মতে গ্রহণযোগ্য দলিল ছিল। মায়ের পক্ষে ছেলের সাক্ষ্য গ্রহণে তার আপত্তি ছিল না। মসজিদে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তার চারপাশে থাকত পাহারাদার। তারা মানুষকে ভিড়াভিড়ি থেকে ফিরিয়ে রাখত। ১২০ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

৯. আবদুর রহমান ইবনু আউফ-এর পৌত্র সাদ ইবনু ইবরাহীম ইবনু আয-যুহরি: ১২৭ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়। তিনি ছিলেন একজন আল্লাহভীরু ও পরহেজগার ব্যক্তি। তিনি-সহ তার আরও তিন ভাই মসজিদের এক কোণে অনেক নামাজ পড়তেন বলে তাদের লোকেরা 'মসজিদের খুঁটি' বলে অভিহিত করত।

নির্বোধ হওয়ার কারণে এক ব্যক্তির সাক্ষ্য তিনি গ্রহণ করেননি। একজন নেশাগ্রস্তের ওপর তিনি হদ কার্যকরের ফয়সালা দিয়েছিলেন। ঘটনা ছিল এমন, জনৈক নেশাগ্রস্তকে মসজিদে তার কাছে নিয়ে আসা হলে তাকে ৮০টি বেত্রাঘাত করেন। শাস্তির পর জানতে পারলেন, লোকটি আমিরুল মুমিনীন ওয়ালিদ ইবনু ইয়াজিদের মামা। আমিরুল মুমিনীনের সাথে সে মদীনায় এসেছিল। এরপর খলিফা মামার দোষ জানতে চাইলে উত্তরে সাদ বললেন, 'আমিরুল মুমিনীন! আপনিই আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি দেখলাম, আল্লাহর হক নষ্ট করা হচ্ছে। একজন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি মসজিদে ঘুরছে! আর মসজিদে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত লোকদের মাঝে অনেক সম্মানিত লোকও আছেন। আমার কাছে এটা পছন্দ হলো না যে, মানুষ আপনার কাছ থেকে হদ রহিত হওয়ার ধারণা নিয়ে যাবে। এজন্যই তার ওপর আমি হদ প্রয়োগ করেছি।' খলিফা বললেন, 'আল্লাহ আপনাকে এর উত্তম বদলা দান করুন।' এরপর তাকে কিছু উপঢৌকন দেওয়ার আদেশ দিলেন।

সাদ ইবনু ইবরাহীম একবার এক লোককে গান গাইতে দেখেন। তারপর ভালো করে লক্ষ করে দেখলেন, সে মদ্যপও বটে। তখন তার নির্দেশে লোকটিকে শাস্তি দেওয়া হয়।

সাদ ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত লোক। সবাই তাকে সমীহ করত। তার পর আরও যারা ধারাবাহিকভাবে মদীনার বিচারক ছিলেন তারা হলেন: যায়িদ ইবনু সাবিত-এর ছেলে সাঈদ, মুহাম্মাদ ইবনু সাফওয়ান আল-জুমাহি, সলত ইবনু যুবায়দ ইবনিস সলত আল-কিনদি, আবু বকর ইবনু আবদুর রহমান এবং মুহাম্মাদ ইবনু আমর ইবনু হাযামের পৌত্র মুহাম্মাদ ইবনু আবু বকর। মুহাম্মাদ ইবনু আবু বকর ছিলেন একজন হাদিসবিশারদ। তিনি মদীনাবাসীদের ইজমা তথা ঐকমত্য অনুসারে ফয়সালা করতেন। তারপর সাদ ইবনু ইবরাহীম আয-যুহরিকে পুনরায় বিচারক বানানো হয়। এর কিছুকাল পরে অল্প সময়ের জন্য বিখ্যাত ফকিহ ও হাদিসবিশারদ ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মুহাম্মাদ ইবনু ইমরান আত-তাইমি ছিলেন মদীনায় বনু উমাইয়া কর্তৃক নিযুক্ত সর্বশেষ বিচারক। তিনি একাধারে ফিকহ এবং কুরআন-সুন্নাহর ইলমের পাশাপাশি সাহিত্য-জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন উচ্চমর্যাদাশীল ব্যক্তি। আব্বাসীয় যুগ পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন।

**টিকাঃ**
[৪৮৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১১১; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৫
[৪৮৯] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১১০; ১১৪; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়িয়াহ, পৃ. ৪৭
[৪৯০] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১১৩
[৪৯১] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১১৬
[৪৯২] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১১৮
[৪৯৩] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১২০
[৪৯৪] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১২৩-১২৪
[৪৯৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১২৪
[৪৯৬] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১২৫; তারীখুত তবারি: ৫/১৬২
[৪৯৭] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১২৯; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৫/১১৬
[৪৯৮] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৩০
[৪৯৯] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৩৫-১৪৬
[৫০০] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৫০
[৫০১] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১৬৭ এবং ১৮৩; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৯৫; তারীখুত তবারি: ৫/৫৩৫

উমাইয়া যুগে মদীনায় অনেক বিচারক ছিলেন। তাদের কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা এখানে তুলে ধরছি।

১. আবু হুরায়রা আবদুর রহমান ইবনু সাখর: প্রসিদ্ধ এই সাহাবি মদীনায় বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। নুআইম থেকে ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, 'আবু হুরায়রাকে বিচার করতে আমি দেখেছি।' তিনি বাদী-বিবাদীর মাঝে ইনসাফের আদেশ দিতেন। দরিদ্র ঋণগ্রস্তকে ঋণের দায়ে বন্দি করতেন না। অপবাদদাতা অপরাধীকে ৮০টি বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিতেন। তিনি মদীনাতেই থাকতেন। ৫৯ হিজরিতে মদীনাতেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। সম্ভবত আবদুল্লাহ ইবনুল হারিসের আগে তাঁকে বিচারক নিযুক্ত করা হয়েছিল।

২. আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনি নাওফাল: কিংবা আবদুল্লাহ ইবনু নাওফাল ইবনিল হারিস। খলিফা মুআবিয়া-এর খিলাফতকালে তিনি ছিলেন মারওয়ান ইবনুল হাকামের পক্ষ থেকে মদীনার প্রথম বিচারক। মারওয়ান পরিবারের ব্যাপারে তিনিই সর্বপ্রথম যথাযথ বিচার করেছিলেন। ফলে মারওয়ানের কাছে তার মর্যাদা আরও বেড়ে যায়। তিনি বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষীর সাথে শপথও গ্রহণ করতেন। তিনি ছিলেন একজন নেককার মুসলিম এবং ফকিহ। ৮৪ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়।

৩. আবদুর রহমান ইবনু আউফ-এর ছেলে আবু সালামা: ৯৪ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয় তাবিয়িদের অন্যতম। মুআবিয়া -এর প্রশাসক সাঈদ ইবনুল আস তাকে মদীনার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। একজন সাক্ষী-সহ বাদীর কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করা ছিল তার রীতি।

৪. আবদুর রহমান ইবন আউফ-এর ছেলে মুসআব: ৬৪ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। ৫৩ বা ৫৪ হিজরিতে মারওয়ান ইবনুল হাকাম তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বের পাশাপাশি পুলিশ-প্রধানের দায়িত্বও পালন করতেন। দায়িত্বের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনেক কঠোর। সে-সময় মদীনায় হত্যার অপরাধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ অপরাধ দমনের জন্য তিনি মানুষকে কঠোরভাবে পাকড়াও করতেন।

এরপর যখন মুআবিয়া-এর ইন্তেকালের পর ইয়াজিদ খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করে উসমান ইবনু মুহাম্মাদকে মদীনার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন, উসমান ইবনু মুহাম্মাদ তখন জ্বলহা ইবনু আবদিল্লাহকে বিচারক নিযুক্ত করেন। ত্বলহা ছিলেন অনেক দানবীর। তাকে দানবীর জ্বলহা নামে সবাই চিনত। এরপর আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবাইর এবং আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের মধ্যকার ফিতনা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বনু উমাইয়া মদীনা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর এ ফিতনার সমাপ্তি ঘটে। ৭৩ হিজরিতে সবাই আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের কাছে বাইয়াত নিলে ৭৪ হিজরিতে হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ মদীনার প্রশাসক নিযুক্ত হন।

৫. সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু কায়স ইবনি মাখরামা: তিনি ছিলেন হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ কর্তৃক নিযুক্ত মদীনার বিচারক। হাজ্জাজ মদীনার বাইরে কোথাও গেলে ইবনু কায়স-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন।

৬. নাওফাল ইবনু মুসাহিক আল-আমিরি: তিনি ছিলেন উল্লেখযোগ্য তাবিয়ি এবং একজন হাদিসবিশারদ। অনেক বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। মারওয়ান ইবনুল হাকাম তাকে মদীনার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। একবার জনৈক ব্যক্তি তার কাছে মারওয়ানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে আসে। তখন মারওয়ানের কাছে তিনি এ মর্মে সমন পাঠান, 'রায় আপনার পক্ষে হোক কিংবা বিপক্ষে, তবুও আপনি নিজেই উপস্থিত হোন।'

এরপর ৮২ হিজরিতে আবান ইবনু উসমানকে পদচ্যুত করা হয়। যিনি সাত বছর আগে তার দায়িত্বের সময় নাওফালকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে বহাল রেখেছিলেন। আবান ছিলেন খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের পক্ষ থেকে মদীনার প্রশাসক। নাওফালের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিচার বিভাগের তদারকি করতেন। ইবনুয যুবাইর-এর মোকদ্দমা সম্পর্কে আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের কাছে জানতে চেয়ে আবান লিখেছিলেন, 'আমিরুল মুমিনীন কী বলেন? ইবনুয যুবাইরের ফয়সালা আমি কার্যকর করব, নাকি করব না?' জবাবে আবদুল মালিক লিখেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা তো ইবনুয যুবাইরকে দোষারোপ করি না। তবে যে বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে, তার জন্য আমরা সমালোচনা করি। আমার পত্র পাওয়ামাত্র তার ফয়সালা কার্যকর করবে। কেননা তার ফয়সালা প্রত্যাখ্যান করা আমাদের জন্য অসম্ভব।'

৭. উমর ইবনু খালদাহ আয-যুরকি: আবানকে বরখাস্ত করার পর তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তার ব্যাপারে রবীআ বলেছেন, তিনি একজন শ্রেষ্ঠ বিচারক। আমাদের মাঝে তিনি এমন এক বিচারক ছিলেন, যার ব্যাপারে কোনো সমস্যা ছিল না। বাদী-বিবাদী বিচারের জন্য বসলে তিনি বিচারকের কর্তব্য বাতলে দিতেন। তার ইচ্ছা ছিল যত দ্রুত সম্ভব বিচার করে রেহাই দেওয়া। কারণ এটাই যে রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায়।

উমর ছিলেন একজন স্বচ্ছ মানুষ। একবার তিনি একজন অপবাদদাতার বিপক্ষে ফয়সালা দিয়ে তাকে বলেন, 'এই দুষ্ট! যাও, তুমি নিজেই নিজেকে বন্দি করে রাখো।' লোকটির সাথে তখন কোনো পুলিশ ছিল না। সে একা একাই জেলে এসে নিজেকে নিজেই বন্দি করে রাখল।

উমর ইবনু খালদাহকে বরখাস্ত করার পর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'আপনি যে দায়িত্বে ছিলেন, সে ব্যাপারে আপনার কী মতামত?' তিনি বললেন, 'আমাদের কিছু ভাই ছিল, যাদের সাথে আমরা আজ সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। আমাদের বসবাস করার মতো অল্প-স্বল্প কিছু জায়গা ছিল। যেগুলো আজ আমরা বিক্রি করে তার কিছু মূল্য খরচ করে ফেলেছি।'

৮. আমর ইবনু হাযাম আল-আনসারির পৌত্র আবু বকর ইবনু মুহাম্মাদ: মদীনার তৎকালীন প্রশাসক উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে ৮৭ হিজরিতে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ৯৪ হিজরিতে যখন উমর ইবনু আবদিল আজিজের অপসারণের পর উসমান ইবনু হাইয়ান আল-মুররি প্রশাসক হন, তিনিও আবু বকরকে স্বপদে বহাল রাখেন।

উসমান ইবনু হাইয়ানের পর আবু বকর প্রশাসক হন। তিনি অনেক বিচারাচার পরিচালনা করেছেন। তার প্রশাসক জীবনের অনেক ঘটনা রয়েছে। অপবাদের শাস্তিস্বরূপ তিনি ৮০টি বেত্রাঘাতের ফয়সালা করতেন। কিসাসের বিচার করেছেন। অতর্কিত হামলা করে এক যিম্মি তথা অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করার দায়ে এক মুসলিমকে তিনি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। কোনো রকম ওজর ছাড়া বিবাদী শহরে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আদালতে নিজে উপস্থিত না হয়ে উকিল পাঠালে সেটা তিনি গ্রহণ করতেন। কসম এবং সাক্ষী—উভয়টা নিয়ে তিনি বিচার করতেন। মদিনাবাসীদের ঐকমত্য তার মতে গ্রহণযোগ্য দলিল ছিল। মায়ের পক্ষে ছেলের সাক্ষ্য গ্রহণে তার আপত্তি ছিল না। মসজিদে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তার চারপাশে থাকত পাহারাদার। তারা মানুষকে ভিড়াভিড়ি থেকে ফিরিয়ে রাখত। ১২০ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

৯. আবদুর রহমান ইবনু আউফ-এর পৌত্র সাদ ইবনু ইবরাহীম ইবনু আয-যুহরি: ১২৭ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়। তিনি ছিলেন একজন আল্লাহভীরু ও পরহেজগার ব্যক্তি। তিনি-সহ তার আরও তিন ভাই মসজিদের এক কোণে অনেক নামাজ পড়তেন বলে তাদের লোকেরা 'মসজিদের খুঁটি' বলে অভিহিত করত।

নির্বোধ হওয়ার কারণে এক ব্যক্তির সাক্ষ্য তিনি গ্রহণ করেননি। একজন নেশাগ্রস্তের ওপর তিনি হদ কার্যকরের ফয়সালা দিয়েছিলেন। ঘটনা ছিল এমন, জনৈক নেশাগ্রস্তকে মসজিদে তার কাছে নিয়ে আসা হলে তাকে ৮০টি বেত্রাঘাত করেন। শাস্তির পর জানতে পারলেন, লোকটি আমিরুল মুমিনীন ওয়ালিদ ইবনু ইয়াজিদের মামা। আমিরুল মুমিনীনের সাথে সে মদীনায় এসেছিল। এরপর খলিফা মামার দোষ জানতে চাইলে উত্তরে সাদ বললেন, 'আমিরুল মুমিনীন! আপনিই আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি দেখলাম, আল্লাহর হক নষ্ট করা হচ্ছে। একজন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি মসজিদে ঘুরছে! আর মসজিদে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত লোকদের মাঝে অনেক সম্মানিত লোকও আছেন। আমার কাছে এটা পছন্দ হলো না যে, মানুষ আপনার কাছ থেকে হদ রহিত হওয়ার ধারণা নিয়ে যাবে। এজন্যই তার ওপর আমি হদ প্রয়োগ করেছি।' খলিফা বললেন, 'আল্লাহ আপনাকে এর উত্তম বদলা দান করুন।' এরপর তাকে কিছু উপঢৌকন দেওয়ার আদেশ দিলেন।

সাদ ইবনু ইবরাহীম একবার এক লোককে গান গাইতে দেখেন। তারপর ভালো করে লক্ষ করে দেখলেন, সে মদ্যপও বটে। তখন তার নির্দেশে লোকটিকে শাস্তি দেওয়া হয়।

সাদ ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত লোক। সবাই তাকে সমীহ করত। তার পর আরও যারা ধারাবাহিকভাবে মদীনার বিচারক ছিলেন তারা হলেন: যায়িদ ইবনু সাবিত-এর ছেলে সাঈদ, মুহাম্মাদ ইবনু সাফওয়ান আল-জুমাহি, সলত ইবনু যুবায়দ ইবনিস সলত আল-কিনদি, আবু বকর ইবনু আবদুর রহমান এবং মুহাম্মাদ ইবনু আমর ইবনু হাযামের পৌত্র মুহাম্মাদ ইবনু আবু বকর। মুহাম্মাদ ইবনু আবু বকর ছিলেন একজন হাদিসবিশারদ। তিনি মদীনাবাসীদের ইজমা তথা ঐকমত্য অনুসারে ফয়সালা করতেন। তারপর সাদ ইবনু ইবরাহীম আয-যুহরিকে পুনরায় বিচারক বানানো হয়। এর কিছুকাল পরে অল্প সময়ের জন্য বিখ্যাত ফকিহ ও হাদিসবিশারদ ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মুহাম্মাদ ইবনু ইমরান আত-তাইমি ছিলেন মদীনায় বনু উমাইয়া কর্তৃক নিযুক্ত সর্বশেষ বিচারক। তিনি একাধারে ফিকহ এবং কুরআন-সুন্নাহর ইলমের পাশাপাশি সাহিত্য-জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন উচ্চমর্যাদাশীল ব্যক্তি। আব্বাসীয় যুগ পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন।

**টিকাঃ**
[৪৮৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১১১; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৫
[৪৮৯] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১১০; ১১৪; মারজিউল উলূমিল ইসলামিয়িয়াহ, পৃ. ৪৭
[৪৯০] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১১৩
[৪৯১] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১১৬
[৪৯২] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১১৮
[৪৯৩] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১২০
[৪৯৪] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১২৩-১২৪
[৪৯৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১২৪
[৪৯৬] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১২৫; তারীখুত তবারি: ৫/১৬২
[৪৯৭] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১২৯; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৫/১১৬
[৪৯৮] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৩০
[৪৯৯] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৩৫-১৪৬
[৫০০] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৫০
[৫০১] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১৬৭ এবং ১৮৩; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৯৫; তারীখুত তবারি: ৫/৫৩৫

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বসরার বিচারকগণ

📄 বসরার বিচারকগণ


বসরায় অনেকেই বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তাদের কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।

১. উমাইরা ইবনু ইয়াসরিবি আদ-দিব্বি: মুআবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত বসরার প্রশাসক আবদুল্লাহ ইবনু আমির ইবনি কুরাইয তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। ধার নেওয়া সম্পদ নষ্ট হয়ে গেলে উমাইরা সেটার ভর্তুকি প্রদানের ফয়সালা করতেন। ৪৫ হিজরি পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। অবশেষে বসরার পরবর্তী প্রশাসক যিয়াদ তাকে বরখাস্ত করে ইমরান ইবনু হুসাইনকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু তিনি অব্যাহতি চাইলে প্রথমে আবদুল্লাহ ইবনু ফাদ্বালাহকে, এরপর তার ভাই আসিম ইবনু ফাদ্বালাহকে নিয়োগ দেয়। তারপর নিয়োগ পান যুরারাহ ইবনু আউফা। ঘুরারাহ বিচারের ক্ষেত্রে একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যই গ্রহণ করতেন।

২. হাসান বসরি: ইবনু আউন বলেন, হাসান বসরি বিচারক হলে লোকেরা তাঁর কাছে ভিড় জমাল। তখন তিনি বললেন, মানুষকে তার বিবেকই সংশোধন করতে পারে। প্রশাসক আদি ইবনু আরতাত হাসানকে বিচারকার্য পরিচালনার কাজে নিযুক্ত করেছিল। তার কাছ থেকে বের হয়ে হাসান বললেন, 'এই লোকটি আমাকে মানুষের সামনে বিচারক হিসেবে বসিয়েছে। আমি তাকে আমার বার্ধক্যের কথা বলেছি। আমার দুর্বলতার কথা জানিয়েছি। বিচারকার্য পরিচালনা করার মতো শক্তি আমার নেই। তখন সে বলল, "আপনার জায়গায় আরেকজন লোক বসানোর আগ পর্যন্ত কিছুদিন আমাকে সহযোগিতা করুন।" হাসান বসরি বেশিদিন বিচারকার্য পরিচালনা করেননি।

৩. ইয়াস ইবনু মুআবিয়া ইবনি কুররা আল-মুযানি: তিনি ছিলেন বসরায় বনু উমাইয়া কর্তৃক নিযুক্ত সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ বিচারক। প্রখর মেধা, অন্তর্দৃষ্টি, দূরদর্শিতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, নির্ভুল সিদ্ধান্ত, সঠিক নির্ভুল মতামত এবং উত্তম চরিত্রে তার প্রসিদ্ধি ছিল। উমর ইবনু আবদিল আজিজ খলিফা হওয়ার পর আদি ইবনু আরতাতকে বসরার প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। আদি তখন ইয়াস ইবনু মুআবিয়াকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করলেন।

ইবনু আরতাত একবার বিদ্বেষবশত কুৎসা রটিয়ে ইয়াসকে অপমান করতে চাইলে তিনি বসরা থেকে বেরিয়ে শামে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের কাছে চলে গেলেন। আদি তখন খলিফার কাছে চিঠি লিখলেন, 'ইয়াস তার দায়িত্ব রেখে পালিয়ে আপনার কাছে গিয়েছে। অগত্যা হাসান ইবনু আবিল হাসানকে আমি বিচারের দায়িত্ব দিয়েছি।' জবাবে উমর ইবনু আবদিল আজিজ বললেন, 'তুমি হাসানকে যে দায়িত্ব দিয়েছ, নিঃসন্দেহে সে তার উপযুক্ত। কিন্তু তোমার সাথে বিচারব্যবস্থার কী সম্পর্ক! তুমি বিচারকাজে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছ। আল্লাহ তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে দেবেন।'

ইয়াসের অভ্যাস ছিল বিচক্ষণ হাদিসবিশারদ খালিদ আল-হাযযার সাথে পরামর্শ করা। বিভিন্ন মোকদ্দমার ক্ষেত্রে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের সাথে তিনি পত্র বিনিময় করতেন। তিনি দ্রুত-সময়ের মধ্যে বিচার করতে পারতেন। সাধারণত এক বৈঠকে কয়েকটি মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করতেন। আইয়ুব বলেছেন, 'ইয়াসের মতো কোনো বিচারক আমি দেখিনি।' তিনি তালাকের ক্ষেত্রে মহিলাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। বাদীর শপথ ও সাক্ষীর মাধ্যমে বিচার করতেন। তিনি প্রতিবেশীকে শুফআর অধিকার দিতেন। এরপর উমর ইবনু আবদিল আজিজের পত্র আসলে তখন থেকে শুফআর অধিকার অংশীদারদের দেওয়া শুরু করেন। অপবাদের বিষয়টি উদঘাটন এবং যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতেন। দাসদের ক্ষেত্রে কিসাসের ফয়সালা করতেন না। বাবার খরচ দেওয়া ছেলের কর্তব্য বলে ফয়সালা করতেন। অন্ধ ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করতেন না। কিয়াফাহ তথা হাবভাব অনুসারেও বিচার করতেন। তিনি বলতেন, 'মানুষের জন্য সংগতিপূর্ণ ক্ষেত্রে তোমরা অনুমান করে বিচার করতে পারো। এমন বিচার সংগতিপূর্ণ না হলে দলিলভিত্তিক বিচার করবে।'

তার প্রদত্ত ফতোয়ার মতো বিচারকার্যের সংখ্যাও অনেক। তিনি জীবনে যত ফতোয়া দিয়েছেন এবং যত বিচারাচার করেছেন-তা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। তার মেধা, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতা ছিল প্রবাদতুল্য। ওয়াসেত নামক এলাকায় ১২২ হিজরি মোতাবেক ৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন। বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক জাহিয তার প্রশংসায় বলেন, ইয়াস ছিলেন মুযার বংশের গৌরব। একজন প্রথম সারির বিচারক। তার অনুমান ছিল নির্ভুল। তথ্য তালাশকারী, প্রখর বিচক্ষণ, বিস্ময়কর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং খলিফাগণের কাছে সমাদৃত।

ইয়াসের প্রশংসায় ইবনু খাল্লিকান বলেন, তিনি ছিলেন বাকপটু, চৌকশ, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম, মেধা ও বিচক্ষণতায় অনন্য, ধীমান এবং সুভাষী, সর্বোপরি প্রবাদতুল্য ব্যক্তিত্ব। দিগদিগন্তে তার খ্যাতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মানুষ বিচারকার্য পরিচালনা শিখতে তার কাছে আসত। তখন শিক্ষার্থীদের তিনি বলতেন, 'বিচারকার্য শেখার বিষয় নয়; অনুধাবনের বিষয়। তোমরা বলো, "আমাদেরকে ইলমের দীক্ষা দিন।"' তার জীবনী, জীবনাচার এবং বিচারকার্য সম্পর্কে বিশাল আকৃতির গ্রন্থ লেখা সম্ভব।

৪. আবদুল মালিক ইবনু ইয়ালা: হাসান বসরির সমমতের লোক ছিলেন। ত্রুটির কারণে বিক্রিত পণ্য ফিরিয়ে দেওয়ার ফয়সালা দিতেন তিনি। মিথ্যা সাক্ষীদের শাস্তি দিতেন। ওসিয়তকারীর লিখিত এবং সিলকৃত ওসিয়তের ব্যাপারে না জেনেই সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমোদন প্রদান করতেন।

৫. সুমামা ইবনু আবদিল্লাহ আনসারি: তিনি ১০৬ সনে বসরার বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ১১০ হিজরি অবধি সে দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। বকর ইবনু আবদিল্লাহ আল-মুযানি তার আগে বসরার বিচার বিভাগের দায়িত্বে থাকার পরও একসময় ইস্তফা দিয়েছিলেন।

৬. বিলাল ইবনু আবি বুরদা: আবু মূসা আশআরি -এর নাতি। খালিদ আল- কুসারি ১১০ হিজরিতে বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তাকে বিচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বসরার প্রশাসক এবং বিচারক হয়ে যান।

৭. আমির ইবনু উবাইদ আল-বাহিলি: তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি উমর ইবনু আবদিল আজিজের কোনো কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ঘটনা ছিল এমন, একবার উমর ইবনু আবদিল আজিজ একটি জানাযার উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন একটি চাদর আনা হলো। তৎকালীন খলিফারা কোনো জানাযায় বের হলে বসার জন্য তাদের সামনে চাদর পেশ করা হতো। চাদর পেশ করা হলে আমির ইবনু উবাইদ সেটা পা দিয়ে সরিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন।

৮. আব্বাদ ইবনু মানসুর আন-নাজি: তিনি বেশ কয়েকবার বসরার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছিলেন। আমিরের পর তিনি বিচারক হয়েছিলেন। ১৩২ হিজরিতে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনায় নিয়োজিত ছিলেন।

**টিকাঃ**
[৫০২] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/২৯০, ২৯২, ২৯৬; তারীখুত তবারি: ৫/৪৫
[৫০৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৩; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৯; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৭/১৫৬, ১৫৮
[৫০৪] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/৩১২-৩৭৪; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৯৮; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৭/৩৩৪; আল-আলাম: ১/৩৭৬; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩৪; আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৩২; ওয়াফায়াতুল আইয়ান: ১/২২৩
[৫০৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/১৫
[৫০৬] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৩০
[৫০৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/২২-৪২
[৫০৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪২
[৫০৯] আখবারুল কুদ্দাহ: ২/৪৩

বসরায় অনেকেই বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তাদের কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।

১. উমাইরা ইবনু ইয়াসরিবি আদ-দিব্বি: মুআবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত বসরার প্রশাসক আবদুল্লাহ ইবনু আমির ইবনি কুরাইয তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। ধার নেওয়া সম্পদ নষ্ট হয়ে গেলে উমাইরা সেটার ভর্তুকি প্রদানের ফয়সালা করতেন। ৪৫ হিজরি পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। অবশেষে বসরার পরবর্তী প্রশাসক যিয়াদ তাকে বরখাস্ত করে ইমরান ইবনু হুসাইনকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু তিনি অব্যাহতি চাইলে প্রথমে আবদুল্লাহ ইবনু ফাদ্বালাহকে, এরপর তার ভাই আসিম ইবনু ফাদ্বালাহকে নিয়োগ দেয়। তারপর নিয়োগ পান যুরারাহ ইবনু আউফা। ঘুরারাহ বিচারের ক্ষেত্রে একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যই গ্রহণ করতেন।

২. হাসান বসরি: ইবনু আউন বলেন, হাসান বসরি বিচারক হলে লোকেরা তাঁর কাছে ভিড় জমাল। তখন তিনি বললেন, মানুষকে তার বিবেকই সংশোধন করতে পারে। প্রশাসক আদি ইবনু আরতাত হাসানকে বিচারকার্য পরিচালনার কাজে নিযুক্ত করেছিল। তার কাছ থেকে বের হয়ে হাসান বললেন, 'এই লোকটি আমাকে মানুষের সামনে বিচারক হিসেবে বসিয়েছে। আমি তাকে আমার বার্ধক্যের কথা বলেছি। আমার দুর্বলতার কথা জানিয়েছি। বিচারকার্য পরিচালনা করার মতো শক্তি আমার নেই। তখন সে বলল, "আপনার জায়গায় আরেকজন লোক বসানোর আগ পর্যন্ত কিছুদিন আমাকে সহযোগিতা করুন।" হাসান বসরি বেশিদিন বিচারকার্য পরিচালনা করেননি।

৩. ইয়াস ইবনু মুআবিয়া ইবনি কুররা আল-মুযানি: তিনি ছিলেন বসরায় বনু উমাইয়া কর্তৃক নিযুক্ত সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ বিচারক। প্রখর মেধা, অন্তর্দৃষ্টি, দূরদর্শিতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, নির্ভুল সিদ্ধান্ত, সঠিক নির্ভুল মতামত এবং উত্তম চরিত্রে তার প্রসিদ্ধি ছিল। উমর ইবনু আবদিল আজিজ খলিফা হওয়ার পর আদি ইবনু আরতাতকে বসরার প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। আদি তখন ইয়াস ইবনু মুআবিয়াকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করলেন।

ইবনু আরতাত একবার বিদ্বেষবশত কুৎসা রটিয়ে ইয়াসকে অপমান করতে চাইলে তিনি বসরা থেকে বেরিয়ে শামে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের কাছে চলে গেলেন। আদি তখন খলিফার কাছে চিঠি লিখলেন, 'ইয়াস তার দায়িত্ব রেখে পালিয়ে আপনার কাছে গিয়েছে। অগত্যা হাসান ইবনু আবিল হাসানকে আমি বিচারের দায়িত্ব দিয়েছি।' জবাবে উমর ইবনু আবদিল আজিজ বললেন, 'তুমি হাসানকে যে দায়িত্ব দিয়েছ, নিঃসন্দেহে সে তার উপযুক্ত। কিন্তু তোমার সাথে বিচারব্যবস্থার কী সম্পর্ক! তুমি বিচারকাজে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছ। আল্লাহ তোমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে দেবেন।'

ইয়াসের অভ্যাস ছিল বিচক্ষণ হাদিসবিশারদ খালিদ আল-হাযযার সাথে পরামর্শ করা। বিভিন্ন মোকদ্দমার ক্ষেত্রে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের সাথে তিনি পত্র বিনিময় করতেন। তিনি দ্রুত-সময়ের মধ্যে বিচার করতে পারতেন। সাধারণত এক বৈঠকে কয়েকটি মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করতেন। আইয়ুব বলেছেন, 'ইয়াসের মতো কোনো বিচারক আমি দেখিনি।' তিনি তালাকের ক্ষেত্রে মহিলাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতেন। বাদীর শপথ ও সাক্ষীর মাধ্যমে বিচার করতেন। তিনি প্রতিবেশীকে শুফআর অধিকার দিতেন। এরপর উমর ইবনু আবদিল আজিজের পত্র আসলে তখন থেকে শুফআর অধিকার অংশীদারদের দেওয়া শুরু করেন। অপবাদের বিষয়টি উদঘাটন এবং যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতেন। দাসদের ক্ষেত্রে কিসাসের ফয়সালা করতেন না। বাবার খরচ দেওয়া ছেলের কর্তব্য বলে ফয়সালা করতেন। অন্ধ ব্যক্তির সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করতেন না। কিয়াফাহ তথা হাবভাব অনুসারেও বিচার করতেন। তিনি বলতেন, 'মানুষের জন্য সংগতিপূর্ণ ক্ষেত্রে তোমরা অনুমান করে বিচার করতে পারো। এমন বিচার সংগতিপূর্ণ না হলে দলিলভিত্তিক বিচার করবে।'

তার প্রদত্ত ফতোয়ার মতো বিচারকার্যের সংখ্যাও অনেক। তিনি জীবনে যত ফতোয়া দিয়েছেন এবং যত বিচারাচার করেছেন-তা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। তার মেধা, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতা ছিল প্রবাদতুল্য। ওয়াসেত নামক এলাকায় ১২২ হিজরি মোতাবেক ৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন। বিশিষ্ট আরবি সাহিত্যিক জাহিয তার প্রশংসায় বলেন, ইয়াস ছিলেন মুযার বংশের গৌরব। একজন প্রথম সারির বিচারক। তার অনুমান ছিল নির্ভুল। তথ্য তালাশকারী, প্রখর বিচক্ষণ, বিস্ময়কর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং খলিফাগণের কাছে সমাদৃত।

ইয়াসের প্রশংসায় ইবনু খাল্লিকান বলেন, তিনি ছিলেন বাকপটু, চৌকশ, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম, মেধা ও বিচক্ষণতায় অনন্য, ধীমান এবং সুভাষী, সর্বোপরি প্রবাদতুল্য ব্যক্তিত্ব। দিগদিগন্তে তার খ্যাতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মানুষ বিচারকার্য পরিচালনা শিখতে তার কাছে আসত। তখন শিক্ষার্থীদের তিনি বলতেন, 'বিচারকার্য শেখার বিষয় নয়; অনুধাবনের বিষয়। তোমরা বলো, "আমাদেরকে ইলমের দীক্ষা দিন।"' তার জীবনী, জীবনাচার এবং বিচারকার্য সম্পর্কে বিশাল আকৃতির গ্রন্থ লেখা সম্ভব।

৪. আবদুল মালিক ইবনু ইয়ালা: হাসান বসরির সমমতের লোক ছিলেন। ত্রুটির কারণে বিক্রিত পণ্য ফিরিয়ে দেওয়ার ফয়সালা দিতেন তিনি। মিথ্যা সাক্ষীদের শাস্তি দিতেন। ওসিয়তকারীর লিখিত এবং সিলকৃত ওসিয়তের ব্যাপারে না জেনেই সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমোদন প্রদান করতেন।

৫. সুমামা ইবনু আবদিল্লাহ আনসারি: তিনি ১০৬ সনে বসরার বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ১১০ হিজরি অবধি সে দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। বকর ইবনু আবদিল্লাহ আল-মুযানি তার আগে বসরার বিচার বিভাগের দায়িত্বে থাকার পরও একসময় ইস্তফা দিয়েছিলেন।

৬. বিলাল ইবনু আবি বুরদা: আবু মূসা আশআরি -এর নাতি। খালিদ আল- কুসারি ১১০ হিজরিতে বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তাকে বিচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বসরার প্রশাসক এবং বিচারক হয়ে যান।

৭. আমির ইবনু উবাইদ আল-বাহিলি: তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি উমর ইবনু আবদিল আজিজের কোনো কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ঘটনা ছিল এমন, একবার উমর ইবনু আবদিল আজিজ একটি জানাযার উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন একটি চাদর আনা হলো। তৎকালীন খলিফারা কোনো জানাযায় বের হলে বসার জন্য তাদের সামনে চাদর পেশ করা হতো। চাদর পেশ করা হলে আমির ইবনু উবাইদ সেটা পা দিয়ে সরিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন।

৮. আব্বাদ ইবনু মানসুর আন-নাজি: তিনি বেশ কয়েকবার বসরার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছিলেন। আমিরের পর তিনি বিচারক হয়েছিলেন। ১৩২ হিজরিতে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বিচারকার্য পরিচালনায় নিয়োজিত ছিলেন।

**টিকাঃ**
[৫০২] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/২৯০, ২৯২, ২৯৬; তারীখুত তবারি: ৫/৪৫
[৫০৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৩; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৯; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৭/১৫৬, ১৫৮
[৫০৪] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/৩১২-৩৭৪; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৯৮; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৭/৩৩৪; আল-আলাম: ১/৩৭৬; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩৪; আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৩২; ওয়াফায়াতুল আইয়ান: ১/২২৩
[৫০৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/১৫
[৫০৬] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৩০
[৫০৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/২২-৪২
[৫০৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪২
[৫০৯] আখবারুল কুদ্দাহ: ২/৪৩

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উমাইয়া যুগে কুফার বিচারকগণ

📄 উমাইয়া যুগে কুফার বিচারকগণ


সে যুগে কুফা ছিল জ্ঞানতৎপরতায় সর্বাধিক চাঞ্চল্যে ভরপুর নগরী। উমর -এর যুগে কুফা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সেটা ছিল তৎপর, গতিমুখর এবং জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র। আলি এ শহরকে ইসলামি খিলাফতের রাজধানী বানিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য অনেক বিচারক এখানে ছিলেন, যারা এই শহরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। উরওয়া ইবনুল জাদি আল-বারীকি, সালমান ইবনু রবীআ আল-বাহিলি, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ, জাবর ইবনুল কাসআম আল-কিনদি, শারহাবিল ইবনু জাবর এবং আবু কুররা আল-কিনদি ছিলেন তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য। আবু কুররার নাম কেউ কেউ সালামা ইবনু মুআবিয়া বলেছেন। এদের প্রত্যেকেই ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব-এর যুগের বিচারক। আমিরুল মুমিনীন সর্বশেষে শুরাইহকে কুফার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি রাশিদুন যুগের দীর্ঘসময় বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। উমাইয়া যুগেও শুরাইহ দীর্ঘকাল বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। ৩৫ বছরের চেয়েও বেশি সময় তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাঝে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর এবং আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের মধ্যকার ফিতনার সময় তিনি দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর প্রশাসক হাজ্জাজের কাছে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলে ৭৮ হিজরিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এরপর আরও কয়েকজন বিচারক কুফার বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের কথা আমরা এখানে আলোচনা করব।

১. মাসরুক ইবনুল আজদা আল-হামাদানি: মুআবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক যিয়াদের অধীনে বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্যতম। তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে থাকা কোনো জিনিসের ব্যাপারে দুজন ব্যক্তি দাবি করেছে—এমতাবস্থায় উভয়ের প্রমাণ সমান হলে জিনিসটা উভয় দাবিদারের মাঝে বণ্টন করে দিতেন।

২. আবদুর রহমান ইবনু আবি লাইলা: হাজ্জাজ কুফায় আগমন করে তাকে বিচারক নিযুক্ত করেন। ফয়সালা প্রদানের পূর্বে পরামর্শ করার জন্য সাঈদ ইবনু জুবায়রকে সাথে নিয়ে তিনি বিচার করতে বসতেন।

৩. আমির ইবনু আবদুল্লাহ ইবনি কায়স: আবু বুরদা ইবনু আবি মূসা আশআরি নামে তিনি পরিচিত। ইবনু আবি লাইলার পর হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ তাকে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ দিয়েছিল। আবু বুরদা নিজের বাড়িতে বসেই বিচার করতেন। তিন বছর দায়িত্ব পালন করার পর তিনি হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের কাছে অব্যাহতি চাইলে হাজ্জাজ তাকে অব্যাহতি দিয়ে তার ভাই আবু বকর ইবনু আবি মূসাকে তার স্থলাভিষিক্ত করে।

ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি শাবির কাছে কোনো কিছু জানতে চাইলে তাকে আবু বকর ইবনু মূসার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আবু বকর ইবনু মূসা তখন বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। উমর ইবনু আবদিল আজিজ বসরার প্রশাসক হওয়ার আগ পর্যন্ত আবু বকর ইবনু মূসা বসরায় বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন।

৪. আমের ইবনু শারাহিল শাবি : উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। শাবি ছিলেন বসরার অন্যতম খ্যাতিমান বিচারক। অনেকবার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েও অবশেষে ১০৩ হিজরি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কেউ কেউ অবশ্য ১০৪ হিজরির কথা বলেছেন। তার অনেক প্রসিদ্ধ বিচারকার্য রয়েছে। বিচারকার্যে তার চমৎকার আচরণ আজও প্রশংসনীয়।

৫. আবদুল মালিক ইবনু উমাইর আল-লাখমি: শাবির পর কে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, আবদুল মালিক। আবার কারও কারও মতে, আল-কাসিম। আবদুল মালিক ছিলেন অত্যন্ত বিশুদ্ধভাষী, ধীশক্তির অধিকারী।

৬. কাসিম ইবনু আবদুর রহমান: আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ-এর নাতি। তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব বাবদ কোনো ভাতা নিতেন না। উমর ইবনু আবদিল আজিজ এ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইতেন। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। স্বাধীন ব্যক্তিকে অপবাদ আরোপ করায় একজন ক্রীতদাসকে তিনি ৮০ ঘা চাবুক মেরেছিলেন। মোকদ্দমায় শপথ করা থেকে তিনি বিরত থাকতেন।

উমর ইবন হুবায়রা বসরার প্রশাসক হওয়ার পর আল-কাসিমকে বরখাস্ত করে তার জায়গায় হুসাইন ইবনু হাসান আল-কিনদিকে বিচারক নিযুক্ত করলেন। তারপর খালিদ ইবন আবদিল্লাহ আল-কুসারি প্রশাসক হয়ে হুসাইনকে পদচ্যুত করে তার জায়গায় সাঈদ ইবন আশওয়াকে বিচারক নিযুক্ত করলেন। তারপর নিয়োগ দেন ঈসা ইবনুল মুসাইয়াব আল-বাজালিকে। ঈসা ছিলেন সাঈদের অন্যতম সহযোগী। কেউ কেউ বলেন, সাঈদকে বরখাস্ত করে খালিদ তার জায়গায় হাকাম ইবনু উতাইবা আল-ইজলিকে নিয়োগ দেন। তারপর পর্যায়ক্রমে আবদুল্লাহ ইবনু নাউফ আত-তাইমিকে এবং মুহারিব ইবনু দিসার আস-সাদুসিকে। আবু বকর এবং উমর-এর প্রতি ভালোবাসা রাখে না-এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য মুহারিব গ্রহণ করতেন না। এরপর আবদুল্লাহ ইবনু শুবরুমাহকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি আব্বাসি যুগ অবধি দায়িত্ব পালন করেন। ১৪৪ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়।

তার অব্যাহতির পরই কুফার বিচারব্যবস্থার দায়িত্বে আসেন মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রহমান ইবনি আবি লাইলা। ইউসুফ ইবনু উমর আস-সাকাফি যাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কুফাবাসীদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ ফকিহ। ইলম এবং জীবনযাত্রায় তিনি ছিলেন ইবনু শুবরুমাহর সহযাত্রী। কুফার বিচারকার্য পরিচালনায় হাজ্জাজ ইবনু মানসুর আল-মুহারিবিকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারপর নিয়োগ দেওয়া হয় মানসুর ইবনু মুতামিরকে। তিনি ছিলেন উমাইয়া যুগে সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি।

**টিকাঃ**
[৫১০] আখবারুল কাদ্ধা: ২/১৮৪; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৩১। আলি -ও কুফাতে কয়েকজন বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। অবশেষে শুরাইহ সেখানে স্থির হন। (আখবারুল কাদ্বা: ২/৩৯৯)
[৫১১] রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৮
[৫১২] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪০৭
[৫১৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪০৬, ৪০৮, ৪১২, ৪১৩
[৫১৪] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৪১৩; আল-আলাম: ৪/১৮; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৭; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩১
[৫১৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/৩
[৫১৬] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/৬ এবং ৭
[৫১৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৬-৪০
[৫১৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৭৪

সে যুগে কুফা ছিল জ্ঞানতৎপরতায় সর্বাধিক চাঞ্চল্যে ভরপুর নগরী। উমর -এর যুগে কুফা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সেটা ছিল তৎপর, গতিমুখর এবং জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র। আলি এ শহরকে ইসলামি খিলাফতের রাজধানী বানিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য অনেক বিচারক এখানে ছিলেন, যারা এই শহরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। উরওয়া ইবনুল জাদি আল-বারীকি, সালমান ইবনু রবীআ আল-বাহিলি, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ, জাবর ইবনুল কাসআম আল-কিনদি, শারহাবিল ইবনু জাবর এবং আবু কুররা আল-কিনদি ছিলেন তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য। আবু কুররার নাম কেউ কেউ সালামা ইবনু মুআবিয়া বলেছেন। এদের প্রত্যেকেই ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব-এর যুগের বিচারক। আমিরুল মুমিনীন সর্বশেষে শুরাইহকে কুফার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি রাশিদুন যুগের দীর্ঘসময় বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। উমাইয়া যুগেও শুরাইহ দীর্ঘকাল বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। ৩৫ বছরের চেয়েও বেশি সময় তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাঝে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর এবং আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের মধ্যকার ফিতনার সময় তিনি দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর প্রশাসক হাজ্জাজের কাছে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলে ৭৮ হিজরিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এরপর আরও কয়েকজন বিচারক কুফার বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের কথা আমরা এখানে আলোচনা করব।

১. মাসরুক ইবনুল আজদা আল-হামাদানি: মুআবিয়া কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক যিয়াদের অধীনে বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্যতম। তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে থাকা কোনো জিনিসের ব্যাপারে দুজন ব্যক্তি দাবি করেছে—এমতাবস্থায় উভয়ের প্রমাণ সমান হলে জিনিসটা উভয় দাবিদারের মাঝে বণ্টন করে দিতেন।

২. আবদুর রহমান ইবনু আবি লাইলা: হাজ্জাজ কুফায় আগমন করে তাকে বিচারক নিযুক্ত করেন। ফয়সালা প্রদানের পূর্বে পরামর্শ করার জন্য সাঈদ ইবনু জুবায়রকে সাথে নিয়ে তিনি বিচার করতে বসতেন।

৩. আমির ইবনু আবদুল্লাহ ইবনি কায়স: আবু বুরদা ইবনু আবি মূসা আশআরি নামে তিনি পরিচিত। ইবনু আবি লাইলার পর হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ তাকে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ দিয়েছিল। আবু বুরদা নিজের বাড়িতে বসেই বিচার করতেন। তিন বছর দায়িত্ব পালন করার পর তিনি হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের কাছে অব্যাহতি চাইলে হাজ্জাজ তাকে অব্যাহতি দিয়ে তার ভাই আবু বকর ইবনু আবি মূসাকে তার স্থলাভিষিক্ত করে।

ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি শাবির কাছে কোনো কিছু জানতে চাইলে তাকে আবু বকর ইবনু মূসার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আবু বকর ইবনু মূসা তখন বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। উমর ইবনু আবদিল আজিজ বসরার প্রশাসক হওয়ার আগ পর্যন্ত আবু বকর ইবনু মূসা বসরায় বিচারকার্য পরিচালনা করেছিলেন।

৪. আমের ইবনু শারাহিল শাবি : উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। শাবি ছিলেন বসরার অন্যতম খ্যাতিমান বিচারক। অনেকবার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েও অবশেষে ১০৩ হিজরি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কেউ কেউ অবশ্য ১০৪ হিজরির কথা বলেছেন। তার অনেক প্রসিদ্ধ বিচারকার্য রয়েছে। বিচারকার্যে তার চমৎকার আচরণ আজও প্রশংসনীয়।

৫. আবদুল মালিক ইবনু উমাইর আল-লাখমি: শাবির পর কে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, আবদুল মালিক। আবার কারও কারও মতে, আল-কাসিম। আবদুল মালিক ছিলেন অত্যন্ত বিশুদ্ধভাষী, ধীশক্তির অধিকারী।

৬. কাসিম ইবনু আবদুর রহমান: আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ-এর নাতি। তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব বাবদ কোনো ভাতা নিতেন না। উমর ইবনু আবদিল আজিজ এ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইতেন। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী। স্বাধীন ব্যক্তিকে অপবাদ আরোপ করায় একজন ক্রীতদাসকে তিনি ৮০ ঘা চাবুক মেরেছিলেন। মোকদ্দমায় শপথ করা থেকে তিনি বিরত থাকতেন।

উমর ইবন হুবায়রা বসরার প্রশাসক হওয়ার পর আল-কাসিমকে বরখাস্ত করে তার জায়গায় হুসাইন ইবনু হাসান আল-কিনদিকে বিচারক নিযুক্ত করলেন। তারপর খালিদ ইবন আবদিল্লাহ আল-কুসারি প্রশাসক হয়ে হুসাইনকে পদচ্যুত করে তার জায়গায় সাঈদ ইবন আশওয়াকে বিচারক নিযুক্ত করলেন। তারপর নিয়োগ দেন ঈসা ইবনুল মুসাইয়াব আল-বাজালিকে। ঈসা ছিলেন সাঈদের অন্যতম সহযোগী। কেউ কেউ বলেন, সাঈদকে বরখাস্ত করে খালিদ তার জায়গায় হাকাম ইবনু উতাইবা আল-ইজলিকে নিয়োগ দেন। তারপর পর্যায়ক্রমে আবদুল্লাহ ইবনু নাউফ আত-তাইমিকে এবং মুহারিব ইবনু দিসার আস-সাদুসিকে। আবু বকর এবং উমর-এর প্রতি ভালোবাসা রাখে না-এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য মুহারিব গ্রহণ করতেন না। এরপর আবদুল্লাহ ইবনু শুবরুমাহকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি আব্বাসি যুগ অবধি দায়িত্ব পালন করেন। ১৪৪ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়।

তার অব্যাহতির পরই কুফার বিচারব্যবস্থার দায়িত্বে আসেন মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রহমান ইবনি আবি লাইলা। ইউসুফ ইবনু উমর আস-সাকাফি যাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কুফাবাসীদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ ফকিহ। ইলম এবং জীবনযাত্রায় তিনি ছিলেন ইবনু শুবরুমাহর সহযাত্রী। কুফার বিচারকার্য পরিচালনায় হাজ্জাজ ইবনু মানসুর আল-মুহারিবিকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারপর নিয়োগ দেওয়া হয় মানসুর ইবনু মুতামিরকে। তিনি ছিলেন উমাইয়া যুগে সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি।

**টিকাঃ**
[৫১০] আখবারুল কাদ্ধা: ২/১৮৪; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৩১। আলি -ও কুফাতে কয়েকজন বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। অবশেষে শুরাইহ সেখানে স্থির হন। (আখবারুল কাদ্বা: ২/৩৯৯)
[৫১১] রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৮
[৫১২] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪০৭
[৫১৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৪০৬, ৪০৮, ৪১২, ৪১৩
[৫১৪] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৪১৩; আল-আলাম: ৪/১৮; রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৭; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩১
[৫১৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/৩
[৫১৬] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/৬ এবং ৭
[৫১৭] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৬-৪০
[৫১৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৭৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00