📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারকগণ এবং বিভিন্ন দায়িত্ব

📄 বিচারকগণ এবং বিভিন্ন দায়িত্ব


বিচারকদের আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, বিচারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির কারণে উমাইয়া যুগের খলিফা এবং প্রশাসকগণ তাদের বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু দায়িত্বের বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।

**পুলিশ**
বিচারকগণ তাদের দায়িত্বের পাশাপাশি পুলিশ-প্রধানের দায়িত্ব পালন করতেন। একইসাথে তারা বিচারকার্য পরিচালনা এবং পুলিশ-প্রধান—উভয় দায়িত্বই পালন করতেন। এই দায়িত্ব পরিচালনার স্থান ছিল কয়েকটি ইসলামি শহর।

ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, মুআবিয়া ৫০ হিজরিতে সাঈদ ইবনুল আস -কে মদীনার প্রশাসকের পদ থেকে অপসারণ করেন। কেউ কেউ অবশ্য ৫৪ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের কথা বলেছেন। মারওয়ান ইবনুল হাকাম তাকে পুনর্বহাল করে আবু সালামাকে বরখাস্ত করেন। আবু সালামার জায়গায় তার ভাই মুসআব ইবনু আবদির রহমান ইবনি আউফকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ দেন। পাশাপাশি পুলিশের দায়িত্বও তাকে প্রদান করেন। মুসআব ছিলেন দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত কঠোর। পুলিশের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি মানুষকে কঠোরভাবে পাকড়াও শুরু করলেন।

মাসলামা ইবনু মুখাল্লাদ সূত্রে কিনদি বর্ণনা করেছেন, 'মাসলামা ফুসতাত নগরীতে এসে সায়েব ইবনু হিশাম ইবনি কিনানা আল-আমিরিকে পুলিশের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে আবিস ইবনু সাঈদকে তার স্থলে নিয়োগ দেন। সুলাইম ইবনু ইতরকেও বিচারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে আবিসকে বিচারের দায়িত্ব প্রদান করেন। ফলে আবিস বিচারকার্য এবং পুলিশ-প্রধান-উভয় দায়িত্বই লাভ করেন। আবিসই সর্বপ্রথম একসাথে দুই দায়িত্ব লাভ করেছিলেন। এটা ৬০ হিজরির কথা। ১০ বছরেরও অধিক সময় মিশরের প্রশাসক থাকার পর ৬২ হিজরিতে মাসলামার ইন্তেকাল হয়। ৬২ হিজরির রমজান মাসে সাঈদ ইবনু ইয়াজিদ আল-আজদি মিশরের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনিও আবিস ইবনু সাঈদকে উভয় পদেই বহাল রাখেন। এরপর আবদুর রহমান ইবনু উতবা আল-ফিহরি মিশরের গভর্নর হওয়ার পরও আবিসকে বহাল তবিয়তে তার উভয় দায়িত্বে রেখে দেন।

কিনদি বলেন, আবিসকে মিশরের প্রশাসক মাসলামা ইবনু মুখাল্লাদ প্রথমে পুলিশ-প্রধানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তারপর তাকে পুলিশ-প্রধান এবং বিচারক-উভয় দায়িত্বই প্রদান করেন। এটা ছিল ৬১ হিজরির প্রথম দিকে। এরপর ৬৫ হিজরিতে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান মিশরের প্রশাসক হওয়ার পরও আবিসকে উভয় দায়িত্বে বহাল রাখেন। আবিস এভাবে ৬৮ হিজরি পর্যন্ত সারাজীবন এ দায়িত্ব দুটি পালন করে যান।

এরপর বিচার এবং পুলিশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইউনুস ইবনু আতিয়্যাহ আল-হাদরামি। ৮৬ হিজরি পর্যন্ত আমরণ তিনি উভয় দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে আবদুর রহমান ইবনু খুদাইজ আল-কিনদি এবং ইমরান ইবনু আবদির রহমান আল-হাসানি দুই দায়িত্ব একসাথে পালন করেছিলেন।

মিশরের বিচারকদের ব্যাপারে কিনদি বলেন, 'এরপর বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইউনুস ইবনু আতিয়্যাহ। আর হাসসান ইবনু আতাহিয়্যাহর ছেলে আবদুর রহমান ছিলেন আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ানের পুলিশ-প্রধান। ৮৪ হিজরির জুমাদাল উলায় তিনি ইন্তেকাল করলে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান তার জায়গায় ইউনুস ইবনু আতিয়্যাহ আল-হাদরামিকে বসান। তাকে প্রদান করেন যুগপৎ বিচার পরিচালনা এবং পুলিশ-প্রধানের দায়িত্ব।

আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়ার দায়িত্বের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে কিনদি বলেন, '৮৬ হিজরির জুমাদাল উলায় আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান ইন্তেকাল করেন। আর এদিকে আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া তখনো পুলিশ এবং বিচারক হিসেবে বহাল আছেন। আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান জুমাদাল আখিরায় আমির হিসেবে আসেন। আবদুর রহমানকে তিনি ৮৬ হিজরির রমজান অবধি স্বপদে বহাল রাখেন। এরপর তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।

বিচারক ও পুলিশ-প্রধানের উভয় দায়িত্ব একত্রে পালনের আরও অনেক উদাহরণ আছে। যেগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইনসাফ বাস্তবায়ন করত। বিচারের আইন বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিত।

**বাইতুল মালের দায়িত্ব**
খলিফাদের অনেকেই বিচারকদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বের পাশাপাশি বাইতুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এটা শুরু হয়েছিল উমর কর্তৃক আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ -কে বাইতুল মালের দায়িত্বশীল নিযুক্ত করার মাধ্যমে। এরপর উমাইয়া বংশের শাসনামল এই নীতিই অনুসরণ করে চলেছে।

এ বিষয়টি আলোচনা করতে গিয়ে কিনদি বলেন, 'আবদুর রহমান ইবনু হুজাইরাহ ছিলেন তৎকালীন বিজ্ঞ ফকিহ ও আলিম। উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে একাধারে বিচারক, শিক্ষক এবং বাইতুল মালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। প্রতিটি দায়িত্বের জন্য তিনি আলাদা আলাদা করে বেতন পেতেন।

**নেতৃত্ব**
বিচারকদের কেউ কেউ অনেক সময় প্রশাসক নিযুক্ত করার দায়িত্বও পালন করেছিলেন। যেমন, খলিফা দামিস্কের বাইরে কোথাও গেলে বিচারককে তার স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। আবার প্রশাসকদের অনেকে অনুপস্থিত থাকলে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাইরে গেলে তখন প্রশাসন পরিচালনা এবং নগরের সার্বিক বিষয় দেখাশোনা করার জন্য বিচারককে তাদের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। আবু যুরআহ বলেন, ‘মুআবিয়া সিফফিনের যুদ্ধে বের হওয়ার সময় ফাদ্বালাহ ইবনু উবাইদ-কে দামিস্কের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন।

হাজ্জাজ মদীনা থেকে বের হওয়ার সময় বিচারক আবদুল্লাহ ইবনু কায়স ইবনি মাখরামাকে মদীনায় তার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন। বিচারক আবু বকর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি হাযাম মদীনার আমির ছিলেন। আবু মূসা আশআরি -এর পৌত্র বিলাল ইবনু আবি বুরদা অনেক সময় বসরার আমির ছিলেন এবং বিচারকার্যও পরিচালনা করেছেন। আবিসকে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান বিচারকার্য এবং পুলিশের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আবার তিনি কোনো সময় শামে সফরে গেলে তাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে যেতেন। মালিক ইবনু শারাহিল ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবাইর-এর বিপক্ষে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান কর্তৃক প্রেরিত বাহিনীর সেনাপতি। তারপর তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন।

**টিকাঃ**
[৪৬৪] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১১৮
[৪৬৫] ফুসতাত নগরী হচ্ছে আমর ইবনুল আস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মিশরের সর্বপ্রথম রাজধানী।
[৪৬৬] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ২৬; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩১১-৩১৩
[৪৬৭] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৯ এবং ৩১৩; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ, ১৮৮
[৪৬৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/২২৫; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩২২, ৩২৪ এবং ৩২৭
[৪৬৯] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩২২
[৪৭০] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩২৫; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৮৯
[৪৭১] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/১৮৮
[৪৭২] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩১৪ এবং ৩১৭; আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২২৫
[৪৭৩] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৪১৩; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ২/২1৮; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৮৯
[৪৭৪] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১২৪
[৪৭৫] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১৩৫
[৪৭৬] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৩৭
[৪৭৭] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩১২
[৪৭৮] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩২১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00