📄 রায় প্রদানের ক্ষেত্রে বিচারকদের ইজতিহাদ
বিচারকগণ কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজতিহাদের ওপর নির্ভর করতেন। উমাইয়া যুগে ইজতিহাদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। বিচারকরা ছিলেন মুজতাহিদ তথা গবেষক। তারা প্রথমে মোকদ্দমা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন। কুরআন-সুন্নাহর মাঝে কোনো দলিল পেলে সে অনুযায়ী ফয়সালা দিতেন। কোনো দলিল খুঁজে না পেলে নিজস্ব চিন্তাভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ফকিহদের সাথে পরামর্শ করতেন। ইজতিহাদ অনুযায়ী বিরোধ মীমাংসা করে দিতেন। সে-সময় অবধি ফিকহ শাস্ত্র শৃঙ্খলাবদ্ধ না হওয়ায় সুনির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসরণ করার প্রচলন ছিল না। খলিফাও বিচারককে বিশেষ কোনো রায়ে বাধ্য করতেন না। বরং খলিফার পক্ষ থেকে ইজতিহাদের ক্ষেত্রে বিচারককে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হতো। মূলত এ সময় থেকেই ইজতিহাদের তোড়জোড় শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে বিচারকরা ফকিহদেরকেও সাথে রাখতেন। তাদের সাথে পরামর্শ করতেন। কারও ফতোয়ার ব্যাপারে আস্থাশীল হলে তারটা গ্রহণ করতেন। বিচারের আইন বাস্তবায়ন, বিরোধ নিরসন আর মোকদ্দমা মিটানোর জন্য বিচারকদেরই ইজতিহাদের বেশি প্রয়োজন পড়ত।
একদিক থেকে ইজতিহাদ ছিল মুজতাহিদের সাথে সম্পৃক্ত। অপরদিক থেকে প্রতিটি অঞ্চলে ইজতিহাদের নির্দিষ্ট অবস্থান ছিল। একসময় বিভিন্ন শহরে এমন কিছু মতানৈক্য সৃষ্টি হয়, যার কারণে মদীনা এবং কুফায় দুটি স্বতন্ত্র একাডেমিয়া গড়ে ওঠে। একটি ছিল ইজতিহাদ-নির্ভর, অপরটি হাদিস-নির্ভর। ফলে বিভিন্ন শহরে বিচারের রায়ের ক্ষেত্রেও তারতম্য দেখা দেয়। কেননা বিচারকরা সবাই মুজতাহিদ পর্যায়ের হওয়ায় প্রত্যেকের রায়ই ছিল ভিন্ন ভিন্ন। তারা নির্দিষ্ট কোনো ফয়সালা অনুকরণ করতেন না। নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসারী তারা ছিলেন না। বিচারকদেরকে খলিফার পক্ষ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া ছিল। তথাপি আলিমদের সাথে পরামর্শ করে এবং খলিফার কাছে পত্র লিখে তারা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। যেমন প্রতিবেশীর জন্য শুফআর অধিকার প্রযোজ্য হবে কি না-তা নিয়ে শুরাইহ, ইয়াস-সহ অন্যদের মতবিরোধ ছিল। ওয়াকি উমাইয়া যুগের বিচার-সংক্রান্ত আলোচনায় এটা তুলে ধরেছেন।
বিচারকদের মধ্যে ইখতিলাফের কারণ ছিল তাদের ইজতিহাদ পদ্ধতি ও মূলনীতির ভিন্নতা। কারণ সাহাবিদের বক্তব্য, বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের রীতিনীতি, মাসআলা-মাসায়েল আহরণ এবং শরীয়তের প্রায়োগিক বিধিবিধানের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ছিল।
উমাইয়া যুগে মক্কার বিচারকদের সম্পর্কে আবুল কাসিম সামনানি বলেছেন, 'সে-সময়ে প্রত্যেক বিচারকই নিজের কাজ এবং কথা দিয়ে দলিল পেশ করতেন।'
**টিকাঃ**
[৪৪৪] তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ২/২১৬
[৪৫৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/৩৩২; ২/২৪৯, ২৫৪, ২৬৯, ২৯২, ৩১৬, ৩৫২, ৩৭৮, ৩৮৯; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৩৪। এরকম আরও অনেক রায়ের ক্ষেত্রে মতভিন্নতা ছিল। যেমন ঋণের ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে বন্দি করা হবে কি না, লক্ষণ আর নিদর্শন দেখে বিচার করা যাবে কি না, নিজের জ্ঞান দিয়ে বিচারকের বিচার করা, মুমূর্ষু ব্যক্তির মৃত্যুশয্যায় সম্পদে হস্তক্ষেপ করার বিধান, তালাকের ক্ষেত্রে মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণ, ব্যক্তির পক্ষে তাব ছেলের সাক্ষ্য, একক ব্যক্তির সাক্ষ্য, অন্ধ ব্যক্তির সাক্ষ্য ইত্যাদি।
[৪৫৬] আমাদের উসূলুল ফিকহ গ্রন্থের ৫৭, ১০২ এবং অন্যান্য পৃষ্ঠায় দেখা যেতে পারে।
[৪৫৭] রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৫
📄 কার্যনির্বাহী বিচারক ও নির্দিষ্ট বিচার
উমাইয়া যুগে ইসলামি রাষ্ট্রের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছিল। জনসংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বিজয়াভিযান, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, ফিতনা দমন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন খলিফারা। যে কারণে তারা বিচারকার্য পরিচালনা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। বিচার-সংশ্লিষ্ট তাবৎ বিষয় ন্যস্ত করেছিলেন বিচারকদের কাছে। বিভিন্ন অপরাধের বিচার এবং দণ্ড নিয়ে চিন্তাভাবনা করার ফুরসতও তারা পাচ্ছিলেন না। তাই এগুলোর ভার বিচারকদের কাঁধেই তুলে দিয়েছিলেন।
মুআবিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি জখমের শাস্তি, হত্যা ও কিসাসের দণ্ড দেখাশোনার দায়িত্ব ছেড়ে দেন। মিশরের বিচারক সুলাইম ইবনু ইতরকে পত্র মারফত আদেশ প্রেরণ করে বলেন, জখম-সংক্রান্ত বিচার পরিচালনার দায়িত্ব এখন থেকে তার ওপর। শুনানির দায়িত্বশীল যেন তার কাছে জখম-সংক্রান্ত মোকদ্দমা উত্থাপন করে।
এ হিসেবে বিচারক সুলাইমই প্রথম ব্যক্তি, যিনি জখম-সংক্রান্ত বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। কোনো ব্যক্তি আহত হলে বিচারকের কাছে এসে আঘাতকারীর বিপক্ষে প্রমাণ পেশ করত। বিচারক সবকিছু শুনে আঘাতকারীর আত্মীয়স্বজনের কাছে সমন পাঠাতেন। এই বিবরণ আবার শুনানির দায়িত্বশীলের কাছেও থাকত। তারপর বার্ষিক জরিমানা আদায়ের সময় আঘাতকারীর আত্মীয়স্বজন থেকে দণ্ড গ্রহণ করা হতো। এই অর্থদণ্ড তিন কিস্তিতে তিন বছরে আদায় করার প্রচলন ছিল। জখমের শাস্তির বিষয়টি তখন এভাবেই চলছিল।
উমাইয়া যুগের আরেকটি বিশেষত্ব হলো সামরিক বাহিনীর বিচারক। যিয়াদ ইবনু আবি লাইলা আল-গাসসানি, কুলসুম ইবনু আবদিল্লাহ আল-হাকামি এবং মুহাম্মাদ ইবনুল আসলামি ছিলেন এই বিচারকদের অন্যতম।
উমাইয়া যুগে বিচারকের দায়িত্ব ছিল ব্যাপক। মানুষের অধিকার, ধনসম্পদ, পরিবার-নীতি, উত্তরাধিকার সম্পত্তি, মুক্তিপণ এবং শাস্তি-দণ্ড-সহ তাবৎ বিষয় দেখাশোনা এবং তদারকি করা ছিল বিচারকের দায়িত্ব। ওয়াকির গ্রন্থ আখবাতুল কুদ্বাহ এবং আল-কিনদির আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এ ধারাবাহিকতায় ফাদ্বালাহ ইবনু উবাইদ দণ্ড-সংক্রান্ত বিচার করতেন এবং আবু হুরায়রা-এর কাজ ছিল অপবাদ আরোপের বিচার করা। শাবি তো এক লোকের ব্যাপারে হদের ফয়সালা দিয়ে মসজিদেই সেই শাস্তি বাস্তবায়ন করেছিলেন।
উমাইয়া যুগে কাযিদের বিচারিক দায়িত্বের পাশাপাশি কিছু প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হতো। ফলে এ যুগে বিচারকদের কর্মপরিধি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আমরা এখন সেগুলো আলোচনা করব।
**টিকাঃ**
[৪৫৮] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩০৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৫৬; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/১৫৭
[৪৫৯] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/২০১ এবং ২০৮
[৪৬০] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২০১, ১/১১১ এবং ২/৪১৫
📄 বিচারকের আরও কিছু দায়-দায়িত্ব
বিচারকার্যের সাথে সম্পৃক্ত আরও কিছু বিষয় দেখাশোনা এবং পরিচালনার দায়িত্ব বিচারকের কাছে ন্যস্ত ছিল। বিচারকদের কাছে এসব দায়িত্ব প্রদানের অন্যতম কারণ ছিল, বিচারকদের প্রতি রাষ্ট্র এবং জনগণের অগাধ আস্থা। উমাইয়া যুগের এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
**ইয়াতিমদের সম্পদ দেখাশোনা**
ইসলামি শরীয়তে ইয়াতিমের সম্পদ তত্ত্বাবধান, মৌলিকভাবে তা সংরক্ষণ এবং বৃদ্ধি করার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ কারণে খলিফা এবং প্রশাসকরা ইয়াতিমের সম্পদ তত্ত্বাবধান এবং তা বৃদ্ধি করার দায়িত্ব বিচারকদের কাছে অর্পণ করেন। কেননা বিচারকরা ছিলেন সমাজের মাঝে সর্বাধিক আমানতদার। জনগণের আস্থার জায়গা এবং তাদের সম্পদের দায়িত্বশীল। ইয়াতিমদের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের এই ব্যবস্থা উমাইয়া যুগেই প্রথম শুরু হয়। এই ব্যবস্থাপনার সর্বপ্রথম পরিচালক ছিলেন হিজরি ৮৬ সনে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ানের পক্ষ থেকে নিয়োগকৃত মিশরের বিচারক আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া ইবনি খুদাইজ। কিনদি বলেন, আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া ছিলেন ইয়াতিমের সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্ব পালনকারী সর্বপ্রথম বিচারক। তিনি প্রত্যেক গোত্রের দায়িত্বে তাদের ইয়াতিমদের সম্পদ রেখেছিলেন। এ বিষয়টি তিনি লিখিত আকারে নিজের কাছে সংরক্ষণ করেন।
অন্য বর্ণনায় আছে, আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া ইবনি খুদাইজ বিচারক হওয়ার পর ইয়াতিমদের কিছু মালের সন্ধান পান। সেটা তিনি গোত্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জিম্মায় রাখেন। সেসব সম্পদের কথা প্রচার করে এ ব্যাপারে সাক্ষী রাখেন। তারপর থেকে ইয়াতিমের সম্পদ হেফাজতের বিষয়টি এভাবে চলতে থাকে।
**ওয়াকফকৃত সম্পদের পৃষ্ঠপোষন**
ওয়াকফকৃত সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, এই খাতের লভ্যাংশের বণ্টন এবং ওয়াকফকারীর শর্তাদি বাস্তবায়ন ইত্যাদির ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামি শরীয়তের বক্তব্য অনেক সুস্পষ্ট। এর আগে ওয়াকফ-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো বিচারব্যবস্থা ছিল না। ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দাতাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকত কিংবা ওসিয়তকারীদের নিয়ন্ত্রণেই তা পরিচালিত হতো। ওয়াকফের সম্পত্তির কার্যনির্বাহী কোনো বিচারকও ছিল না। খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিকের যুগে বিচারক তাওবা ইবনু নামির সর্বপ্রথম ওয়াকফকৃত সম্পদের পৃষ্ঠপোষন শুরু করেন।
ইবনু লাহিআহর সূত্রে কিনদি বর্ণনা করেছেন, 'মিশরের ওয়াকফকৃত সম্পদের ওপর সর্বপ্রথম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিলেন খলিফা হিশামের নিয়োগকৃত বিচারক তাওবা ইবনু নামির। এর আগে ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দাতা-সদস্যদের অধীনে পরিচালিত হতো। ওসিয়তকারীদের নিয়ন্ত্রণেই তা থাকত। তাওবা বিচারক হওয়ার পর বললেন, "আমার মনে হয়, দরিদ্র আর অসহায় মানুষই এই সম্পদগুলোর প্রকৃত হকদার। তাই এগুলোর ওপর আমি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাই। নাহয় এগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে এবং উত্তরাধিকার সূত্রে একজনের পর একজন মুতাওয়াল্লী হয়ে তা নষ্ট করে ফেলবে।" সেমতে তাওবা ইবনু নামিরের ইন্তেকালের আগেই ওয়াকফকৃত সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে একটি বড় প্রশাসনিক বিভাগ তৈরি করা হয়।'
অন্য বর্ণনায় আছে, তাওবা ছিলেন মিশরের সর্বপ্রথম বিচারক, যিনি ওয়াকফকৃত সম্পত্তিকে প্রশাসনিক বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। এটা ছিল ১১৮ হিজরির কথা। এরপর আব্বাসীয় যুগে এ বিষয়টি আরও সুশৃঙ্খল রূপ পায়।
**ফতোয়া প্রদান**
বিচারকগণ প্রায় সবাই ছিলেন বড় বড় আলিম এবং ফকিহ। বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগেও তারা ফতোয়া প্রদান, পাঠদান ও মানুষকে শরীয়তের বিধিনিষেধ বর্ণনা করার দায়িত্ব পালন করতেন। বিচারক থাকা অবস্থায় এবং বরখাস্ত হওয়ার পরও তারা এ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতেন। বিচারক থাকাকালীন তারা মানুষকে ফতোয়া প্রদান করতেন। অধিকাংশ সময় মামলা বা বিরোধের নিষ্পত্তি হতো ফতোয়া আর শারঈ আইন বর্ণনার মাধ্যমে। যেমন, বসরায় হাসান বসরি ফতোয়া প্রদান করতেন। শামে মাকহুল এবং আবান ইবনু উসমান -সহ অন্যদের সাথে ফতোয়া প্রদানের কাজে নিয়োজিত ছিলেন বিচারক নুমাইর আল-আশআরি।
**টিকাঃ**
[৪৬১] তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ২/২১৬; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৮৬; আবকারিয়্যাতুল ইসলাম, পৃ. ৪৪১
[৪৬২] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্দাহ, পৃ. ৩২৫
[৪৬৩] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩৪৬; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ২৭; আবকারিয়্যাতুল ইসলাম, পৃ. ৪৪২
📄 বিচারকগণ এবং বিভিন্ন দায়িত্ব
বিচারকদের আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, বিচারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির কারণে উমাইয়া যুগের খলিফা এবং প্রশাসকগণ তাদের বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু দায়িত্বের বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।
**পুলিশ**
বিচারকগণ তাদের দায়িত্বের পাশাপাশি পুলিশ-প্রধানের দায়িত্ব পালন করতেন। একইসাথে তারা বিচারকার্য পরিচালনা এবং পুলিশ-প্রধান—উভয় দায়িত্বই পালন করতেন। এই দায়িত্ব পরিচালনার স্থান ছিল কয়েকটি ইসলামি শহর।
ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, মুআবিয়া ৫০ হিজরিতে সাঈদ ইবনুল আস -কে মদীনার প্রশাসকের পদ থেকে অপসারণ করেন। কেউ কেউ অবশ্য ৫৪ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের কথা বলেছেন। মারওয়ান ইবনুল হাকাম তাকে পুনর্বহাল করে আবু সালামাকে বরখাস্ত করেন। আবু সালামার জায়গায় তার ভাই মুসআব ইবনু আবদির রহমান ইবনি আউফকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ দেন। পাশাপাশি পুলিশের দায়িত্বও তাকে প্রদান করেন। মুসআব ছিলেন দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত কঠোর। পুলিশের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি মানুষকে কঠোরভাবে পাকড়াও শুরু করলেন।
মাসলামা ইবনু মুখাল্লাদ সূত্রে কিনদি বর্ণনা করেছেন, 'মাসলামা ফুসতাত নগরীতে এসে সায়েব ইবনু হিশাম ইবনি কিনানা আল-আমিরিকে পুলিশের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে আবিস ইবনু সাঈদকে তার স্থলে নিয়োগ দেন। সুলাইম ইবনু ইতরকেও বিচারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে আবিসকে বিচারের দায়িত্ব প্রদান করেন। ফলে আবিস বিচারকার্য এবং পুলিশ-প্রধান-উভয় দায়িত্বই লাভ করেন। আবিসই সর্বপ্রথম একসাথে দুই দায়িত্ব লাভ করেছিলেন। এটা ৬০ হিজরির কথা। ১০ বছরেরও অধিক সময় মিশরের প্রশাসক থাকার পর ৬২ হিজরিতে মাসলামার ইন্তেকাল হয়। ৬২ হিজরির রমজান মাসে সাঈদ ইবনু ইয়াজিদ আল-আজদি মিশরের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনিও আবিস ইবনু সাঈদকে উভয় পদেই বহাল রাখেন। এরপর আবদুর রহমান ইবনু উতবা আল-ফিহরি মিশরের গভর্নর হওয়ার পরও আবিসকে বহাল তবিয়তে তার উভয় দায়িত্বে রেখে দেন।
কিনদি বলেন, আবিসকে মিশরের প্রশাসক মাসলামা ইবনু মুখাল্লাদ প্রথমে পুলিশ-প্রধানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তারপর তাকে পুলিশ-প্রধান এবং বিচারক-উভয় দায়িত্বই প্রদান করেন। এটা ছিল ৬১ হিজরির প্রথম দিকে। এরপর ৬৫ হিজরিতে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান মিশরের প্রশাসক হওয়ার পরও আবিসকে উভয় দায়িত্বে বহাল রাখেন। আবিস এভাবে ৬৮ হিজরি পর্যন্ত সারাজীবন এ দায়িত্ব দুটি পালন করে যান।
এরপর বিচার এবং পুলিশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইউনুস ইবনু আতিয়্যাহ আল-হাদরামি। ৮৬ হিজরি পর্যন্ত আমরণ তিনি উভয় দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে আবদুর রহমান ইবনু খুদাইজ আল-কিনদি এবং ইমরান ইবনু আবদির রহমান আল-হাসানি দুই দায়িত্ব একসাথে পালন করেছিলেন।
মিশরের বিচারকদের ব্যাপারে কিনদি বলেন, 'এরপর বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইউনুস ইবনু আতিয়্যাহ। আর হাসসান ইবনু আতাহিয়্যাহর ছেলে আবদুর রহমান ছিলেন আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ানের পুলিশ-প্রধান। ৮৪ হিজরির জুমাদাল উলায় তিনি ইন্তেকাল করলে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান তার জায়গায় ইউনুস ইবনু আতিয়্যাহ আল-হাদরামিকে বসান। তাকে প্রদান করেন যুগপৎ বিচার পরিচালনা এবং পুলিশ-প্রধানের দায়িত্ব।
আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়ার দায়িত্বের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে কিনদি বলেন, '৮৬ হিজরির জুমাদাল উলায় আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান ইন্তেকাল করেন। আর এদিকে আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া তখনো পুলিশ এবং বিচারক হিসেবে বহাল আছেন। আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান জুমাদাল আখিরায় আমির হিসেবে আসেন। আবদুর রহমানকে তিনি ৮৬ হিজরির রমজান অবধি স্বপদে বহাল রাখেন। এরপর তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।
বিচারক ও পুলিশ-প্রধানের উভয় দায়িত্ব একত্রে পালনের আরও অনেক উদাহরণ আছে। যেগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইনসাফ বাস্তবায়ন করত। বিচারের আইন বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিত।
**বাইতুল মালের দায়িত্ব**
খলিফাদের অনেকেই বিচারকদেরকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বের পাশাপাশি বাইতুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এটা শুরু হয়েছিল উমর কর্তৃক আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ -কে বাইতুল মালের দায়িত্বশীল নিযুক্ত করার মাধ্যমে। এরপর উমাইয়া বংশের শাসনামল এই নীতিই অনুসরণ করে চলেছে।
এ বিষয়টি আলোচনা করতে গিয়ে কিনদি বলেন, 'আবদুর রহমান ইবনু হুজাইরাহ ছিলেন তৎকালীন বিজ্ঞ ফকিহ ও আলিম। উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে একাধারে বিচারক, শিক্ষক এবং বাইতুল মালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। প্রতিটি দায়িত্বের জন্য তিনি আলাদা আলাদা করে বেতন পেতেন।
**নেতৃত্ব**
বিচারকদের কেউ কেউ অনেক সময় প্রশাসক নিযুক্ত করার দায়িত্বও পালন করেছিলেন। যেমন, খলিফা দামিস্কের বাইরে কোথাও গেলে বিচারককে তার স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। আবার প্রশাসকদের অনেকে অনুপস্থিত থাকলে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাইরে গেলে তখন প্রশাসন পরিচালনা এবং নগরের সার্বিক বিষয় দেখাশোনা করার জন্য বিচারককে তাদের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। আবু যুরআহ বলেন, ‘মুআবিয়া সিফফিনের যুদ্ধে বের হওয়ার সময় ফাদ্বালাহ ইবনু উবাইদ-কে দামিস্কের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন।
হাজ্জাজ মদীনা থেকে বের হওয়ার সময় বিচারক আবদুল্লাহ ইবনু কায়স ইবনি মাখরামাকে মদীনায় তার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন। বিচারক আবু বকর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি হাযাম মদীনার আমির ছিলেন। আবু মূসা আশআরি -এর পৌত্র বিলাল ইবনু আবি বুরদা অনেক সময় বসরার আমির ছিলেন এবং বিচারকার্যও পরিচালনা করেছেন। আবিসকে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান বিচারকার্য এবং পুলিশের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আবার তিনি কোনো সময় শামে সফরে গেলে তাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে যেতেন। মালিক ইবনু শারাহিল ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবাইর-এর বিপক্ষে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান কর্তৃক প্রেরিত বাহিনীর সেনাপতি। তারপর তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন।
**টিকাঃ**
[৪৬৪] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১১৮
[৪৬৫] ফুসতাত নগরী হচ্ছে আমর ইবনুল আস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মিশরের সর্বপ্রথম রাজধানী।
[৪৬৬] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ২৬; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩১১-৩১৩
[৪৬৭] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৯ এবং ৩১৩; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ, ১৮৮
[৪৬৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/২২৫; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩২২, ৩২৪ এবং ৩২৭
[৪৬৯] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩২২
[৪৭০] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩২৫; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৮৯
[৪৭১] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/১৮৮
[৪৭২] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩১৪ এবং ৩১৭; আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২২৫
[৪৭৩] কুদ্দাতু দিমাশক, পৃ. ৪১৩; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ২/২1৮; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৮৯
[৪৭৪] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১২৪
[৪৭৫] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১৩৫
[৪৭৬] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৩৭
[৪৭৭] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩১২
[৪৭৮] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩২১