📄 উমাইয়া যুগে বিচারের বিধিবিধানের উৎস
উমাইয়া যুগের বিচারকগণ রাশিদুন যুগের বিচারকদের মতো একই উৎস থেকে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। উভয় যুগেই কুরআন, সুন্নাহ, পূর্বের বিচারব্যবস্থা এবং শরীয়তের পাশাপাশি ইজতিহাদ মান্য করা হতো। কুরআন-সুন্নাহ ছিল উভয় যুগের অভিন্ন মৌলিক ভিত্তি। ইসলামি খিলাফত এই দুটিকে কেন্দ্র করেই চলত। এর ওপর ভিত্তি করেই পূর্ণতা লাভ করত খিলাফতের বাইয়াত। যেমনটা হয়েছিল খলিফা আবদুল মালিকের কাছে আবদুল্লাহ ইবনু উমর -এর বাইয়াত গ্রহণের ক্ষেত্রে। সে-সময় আবদুল্লাহ বলেছিলেন, 'আল্লাহর নীতি এবং রাসূলের সুন্নাহর ভিত্তিতে আমি আমিরুল মুমিনীন আবদুল মালিকের কাছে বাইয়াত দিচ্ছি।'
সাধারণত সাহাবিদের বক্তব্য এবং তাঁদের ফয়সালা অনুসরণ করেই পূর্বের বিচারব্যবস্থা চলছিল। কেননা তাঁরাই ছিলেন নববি মাদরাসা এবং ওহি অবতরণের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ যুগের মানুষ। বিশেষত খুলাফায়ে রাশিদুনের বিচারাচারের সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তদুপরি এ যুগে বিচারকদের বিচারের ক্ষেত্রে উরফ তথা প্রচলিত রীতিনীতির প্রভাব দেখা দেয়। যেহেতু উমাইয়া খিলাফতের অধীনস্থ বিস্তৃত ভূখণ্ডে ছিল উরফ তথা প্রচলিত রীতিনীতির বৈচিত্র্য। এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনঘনিষ্ঠতা, তাদের কথাবার্তা আর পরিভাষা স্পষ্ট করে এমন আচার-অনুষ্ঠান, শপথ এবং দাবি-দাওয়ার প্রতি বিচারকদের গভীর দৃষ্টি থাকত। ফকিহ, বিচারক এবং খলিফাগণ বিচারের প্রতি আস্থা-নির্ভরতা সৃষ্টির জন্য নিজেদের রায়কে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সাব্যস্ত করতে সবসময় সচেষ্ট থাকতেন। মুআবিয়া জাল হাদিসের ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন। একবার কুরাইশের একটি প্রতিনিধি দলের মাঝে তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। সেখানে আল্লাহর প্রশংসা করার পর তিনি বলেন, 'আমার কাছে এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, তোমাদের মধ্যকার কিছু লোক এমন এমন কথা বলে বেড়ায়, যেগুলো আল্লাহর কিতাবেও নেই, আল্লাহর রাসূল -এর সুন্নাহতেও নেই। এরাই হচ্ছে তোমাদের মধ্যকার অজ্ঞ লোক।'
খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিকের যুগে আমর ইবনু হাযামের নাতি মুহাম্মাদ ইবনু আবি বকর ছিলেন মদীনার কাযি। মদীনাবাসীদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তিনি বিচার করতেন। অনেক সময় তা হাদিসের সাথে সংগতিপূর্ণ হতো না।
ইতিপূর্বে আমরা উমর ইবনু আবদিল আজিজ -এর বক্তব্য উল্লেখ করেছি। এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, 'কুরআনের পর আর কোনো নতুন কিতাব অবতীর্ণ হবে না, আর মুহাম্মাদ -এর পর আর কেউ নবিও হবে না। জেনে রাখবেন, আমি কোনো বিচারক নই। আমি শুধু এক আসমানি বিধানের অনুসারী। আমি কোনো নয়া দ্বীনের আবিষ্কারক নই; বরং আমি দ্বীনের একজন অনুসারী মাত্র।'
শরীয়তের বিধিমালার উৎস বর্ণনা করে তিনি আদি ইবনু আরতাতের কাছে পত্র পাঠিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, 'আল্লাহর কিতাবের অনুসরণ হচ্ছে বিচারব্যবস্থার মূল। তারপর রাসূলের সুন্নাহ। এরপর হিদায়াতপ্রাপ্ত মুসলিম ইমামদের ফয়সালা। সবশেষে চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ ও বিজ্ঞ আলিমদের পরামর্শ। একজনের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেবেন না। মানুষের মাঝে যে ফয়সালা করবেন, সে সম্পর্কে আপনার জানা থাকতে হবে। অনুমান-নির্ভর বিচার করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ ইলম ছাড়া অনুমান করে বিচারকার্য পরিচালনাকারী অন্ধ পথিকের মতো। সে যদি সঠিক পথের দিশা পায়, তবে তো না জেনেই দিশা পেয়ে গেল। আর যদি সে রাস্তা চিনতে ভুল করে, তাহলে অজ্ঞতার কারণে সে নিজেও ধ্বংস হবে, অন্যদেরকেও ধ্বংস করবে। সুতরাং আপনার কাছে যদি দ্বিধাপূর্ণ কোনো মোকদ্দমা আসে, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করে নিন। কেননা অজানা বিষয়ে প্রশ্নকারীও জ্ঞানীদের একজন।'
উমর ইবনু আবদিল আজিজ বিজ্ঞ বিচারকের মাঝে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকার কথা বলতেন। তার একটি হলো, পূর্বের বিচারকার্য এবং তার পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল থাকা।
বিচারকরা আলিমদের সাথে পরামর্শ করে কাজ করতেন। তাদের সহযোগিতা নিতেন। তারা যেমন আলিমদের মজলিসে শরিক হতেন, আলিমরাও তেমনি তাদের বিচারালয়ে উপস্থিত হতেন। যাতে বিচারকরা কোনো ভুল করলে আলিমরা দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হতো খলিফা এবং প্রশাসকদের তরফ থেকে। বিচারের বিভিন্ন নীতি এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিচারকদের কর্তৃত্ব থাকলেও গবেষণামূলক আইনের ক্ষেত্রে তাদের নির্দিষ্ট কোনো মতামত থাকত না। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, পূর্ববর্তীদের বিচারনীতি এবং সাহাবাদের বক্তব্য অনুসারে তারা বিচার পরিচালনা করতেন। এটা সে-সময়ের কথা, যখন ফিকহি মাযহাবের সূচনা হয়নি। শারঈ আইনও পরিপূর্ণভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। তাই বিচারকদের কাছেই বিচারের ভার ন্যস্ত ছিল। স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক শহরে থাকা ফকিহ, আলিম ও মুজতাহিদদের সাথে পরামর্শ করে বিচারকরা সিদ্ধান্ত নিতেন। আর তাই ইজতিহাদের ফলাফলে ভিন্নতা থাকত।
**টিকাঃ**
[৪৪৬] সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৭২০৩
[৪৪৭] আল-মাদখালুল ফিকহি: ১/১৫০
[৪৪৮] ইলামুল মুওয়াকিয়ীন: ১/৬৩
[৪৪৯] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৪৩ এবং ১৭৬
[৪৫০] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/১৮৭
[৪৫১] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪৬৮; আখবারুল কুদ্বাহ: ১/৭৭
[৪৫২] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/৭৭
[৪৫৩] আখবারুল কুদ্দাহ: ২/৪১৫ এবং ৩/৮৬
📄 রায় প্রদানের ক্ষেত্রে বিচারকদের ইজতিহাদ
বিচারকগণ কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজতিহাদের ওপর নির্ভর করতেন। উমাইয়া যুগে ইজতিহাদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। বিচারকরা ছিলেন মুজতাহিদ তথা গবেষক। তারা প্রথমে মোকদ্দমা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন। কুরআন-সুন্নাহর মাঝে কোনো দলিল পেলে সে অনুযায়ী ফয়সালা দিতেন। কোনো দলিল খুঁজে না পেলে নিজস্ব চিন্তাভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ফকিহদের সাথে পরামর্শ করতেন। ইজতিহাদ অনুযায়ী বিরোধ মীমাংসা করে দিতেন। সে-সময় অবধি ফিকহ শাস্ত্র শৃঙ্খলাবদ্ধ না হওয়ায় সুনির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসরণ করার প্রচলন ছিল না। খলিফাও বিচারককে বিশেষ কোনো রায়ে বাধ্য করতেন না। বরং খলিফার পক্ষ থেকে ইজতিহাদের ক্ষেত্রে বিচারককে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হতো। মূলত এ সময় থেকেই ইজতিহাদের তোড়জোড় শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে বিচারকরা ফকিহদেরকেও সাথে রাখতেন। তাদের সাথে পরামর্শ করতেন। কারও ফতোয়ার ব্যাপারে আস্থাশীল হলে তারটা গ্রহণ করতেন। বিচারের আইন বাস্তবায়ন, বিরোধ নিরসন আর মোকদ্দমা মিটানোর জন্য বিচারকদেরই ইজতিহাদের বেশি প্রয়োজন পড়ত।
একদিক থেকে ইজতিহাদ ছিল মুজতাহিদের সাথে সম্পৃক্ত। অপরদিক থেকে প্রতিটি অঞ্চলে ইজতিহাদের নির্দিষ্ট অবস্থান ছিল। একসময় বিভিন্ন শহরে এমন কিছু মতানৈক্য সৃষ্টি হয়, যার কারণে মদীনা এবং কুফায় দুটি স্বতন্ত্র একাডেমিয়া গড়ে ওঠে। একটি ছিল ইজতিহাদ-নির্ভর, অপরটি হাদিস-নির্ভর। ফলে বিভিন্ন শহরে বিচারের রায়ের ক্ষেত্রেও তারতম্য দেখা দেয়। কেননা বিচারকরা সবাই মুজতাহিদ পর্যায়ের হওয়ায় প্রত্যেকের রায়ই ছিল ভিন্ন ভিন্ন। তারা নির্দিষ্ট কোনো ফয়সালা অনুকরণ করতেন না। নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসারী তারা ছিলেন না। বিচারকদেরকে খলিফার পক্ষ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া ছিল। তথাপি আলিমদের সাথে পরামর্শ করে এবং খলিফার কাছে পত্র লিখে তারা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। যেমন প্রতিবেশীর জন্য শুফআর অধিকার প্রযোজ্য হবে কি না-তা নিয়ে শুরাইহ, ইয়াস-সহ অন্যদের মতবিরোধ ছিল। ওয়াকি উমাইয়া যুগের বিচার-সংক্রান্ত আলোচনায় এটা তুলে ধরেছেন।
বিচারকদের মধ্যে ইখতিলাফের কারণ ছিল তাদের ইজতিহাদ পদ্ধতি ও মূলনীতির ভিন্নতা। কারণ সাহাবিদের বক্তব্য, বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের রীতিনীতি, মাসআলা-মাসায়েল আহরণ এবং শরীয়তের প্রায়োগিক বিধিবিধানের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ছিল।
উমাইয়া যুগে মক্কার বিচারকদের সম্পর্কে আবুল কাসিম সামনানি বলেছেন, 'সে-সময়ে প্রত্যেক বিচারকই নিজের কাজ এবং কথা দিয়ে দলিল পেশ করতেন।'
**টিকাঃ**
[৪৪৪] তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ২/২১৬
[৪৫৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/৩৩২; ২/২৪৯, ২৫৪, ২৬৯, ২৯২, ৩১৬, ৩৫২, ৩৭৮, ৩৮৯; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৩৪। এরকম আরও অনেক রায়ের ক্ষেত্রে মতভিন্নতা ছিল। যেমন ঋণের ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে বন্দি করা হবে কি না, লক্ষণ আর নিদর্শন দেখে বিচার করা যাবে কি না, নিজের জ্ঞান দিয়ে বিচারকের বিচার করা, মুমূর্ষু ব্যক্তির মৃত্যুশয্যায় সম্পদে হস্তক্ষেপ করার বিধান, তালাকের ক্ষেত্রে মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণ, ব্যক্তির পক্ষে তাব ছেলের সাক্ষ্য, একক ব্যক্তির সাক্ষ্য, অন্ধ ব্যক্তির সাক্ষ্য ইত্যাদি।
[৪৫৬] আমাদের উসূলুল ফিকহ গ্রন্থের ৫৭, ১০২ এবং অন্যান্য পৃষ্ঠায় দেখা যেতে পারে।
[৪৫৭] রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৪৯৫
📄 কার্যনির্বাহী বিচারক ও নির্দিষ্ট বিচার
উমাইয়া যুগে ইসলামি রাষ্ট্রের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছিল। জনসংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বিজয়াভিযান, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, ফিতনা দমন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন খলিফারা। যে কারণে তারা বিচারকার্য পরিচালনা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। বিচার-সংশ্লিষ্ট তাবৎ বিষয় ন্যস্ত করেছিলেন বিচারকদের কাছে। বিভিন্ন অপরাধের বিচার এবং দণ্ড নিয়ে চিন্তাভাবনা করার ফুরসতও তারা পাচ্ছিলেন না। তাই এগুলোর ভার বিচারকদের কাঁধেই তুলে দিয়েছিলেন।
মুআবিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি জখমের শাস্তি, হত্যা ও কিসাসের দণ্ড দেখাশোনার দায়িত্ব ছেড়ে দেন। মিশরের বিচারক সুলাইম ইবনু ইতরকে পত্র মারফত আদেশ প্রেরণ করে বলেন, জখম-সংক্রান্ত বিচার পরিচালনার দায়িত্ব এখন থেকে তার ওপর। শুনানির দায়িত্বশীল যেন তার কাছে জখম-সংক্রান্ত মোকদ্দমা উত্থাপন করে।
এ হিসেবে বিচারক সুলাইমই প্রথম ব্যক্তি, যিনি জখম-সংক্রান্ত বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। কোনো ব্যক্তি আহত হলে বিচারকের কাছে এসে আঘাতকারীর বিপক্ষে প্রমাণ পেশ করত। বিচারক সবকিছু শুনে আঘাতকারীর আত্মীয়স্বজনের কাছে সমন পাঠাতেন। এই বিবরণ আবার শুনানির দায়িত্বশীলের কাছেও থাকত। তারপর বার্ষিক জরিমানা আদায়ের সময় আঘাতকারীর আত্মীয়স্বজন থেকে দণ্ড গ্রহণ করা হতো। এই অর্থদণ্ড তিন কিস্তিতে তিন বছরে আদায় করার প্রচলন ছিল। জখমের শাস্তির বিষয়টি তখন এভাবেই চলছিল।
উমাইয়া যুগের আরেকটি বিশেষত্ব হলো সামরিক বাহিনীর বিচারক। যিয়াদ ইবনু আবি লাইলা আল-গাসসানি, কুলসুম ইবনু আবদিল্লাহ আল-হাকামি এবং মুহাম্মাদ ইবনুল আসলামি ছিলেন এই বিচারকদের অন্যতম।
উমাইয়া যুগে বিচারকের দায়িত্ব ছিল ব্যাপক। মানুষের অধিকার, ধনসম্পদ, পরিবার-নীতি, উত্তরাধিকার সম্পত্তি, মুক্তিপণ এবং শাস্তি-দণ্ড-সহ তাবৎ বিষয় দেখাশোনা এবং তদারকি করা ছিল বিচারকের দায়িত্ব। ওয়াকির গ্রন্থ আখবাতুল কুদ্বাহ এবং আল-কিনদির আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এ ধারাবাহিকতায় ফাদ্বালাহ ইবনু উবাইদ দণ্ড-সংক্রান্ত বিচার করতেন এবং আবু হুরায়রা-এর কাজ ছিল অপবাদ আরোপের বিচার করা। শাবি তো এক লোকের ব্যাপারে হদের ফয়সালা দিয়ে মসজিদেই সেই শাস্তি বাস্তবায়ন করেছিলেন।
উমাইয়া যুগে কাযিদের বিচারিক দায়িত্বের পাশাপাশি কিছু প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হতো। ফলে এ যুগে বিচারকদের কর্মপরিধি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আমরা এখন সেগুলো আলোচনা করব।
**টিকাঃ**
[৪৫৮] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩০৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৫৬; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/১৫৭
[৪৫৯] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/২০১ এবং ২০৮
[৪৬০] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২০১, ১/১১১ এবং ২/৪১৫
📄 বিচারকের আরও কিছু দায়-দায়িত্ব
বিচারকার্যের সাথে সম্পৃক্ত আরও কিছু বিষয় দেখাশোনা এবং পরিচালনার দায়িত্ব বিচারকের কাছে ন্যস্ত ছিল। বিচারকদের কাছে এসব দায়িত্ব প্রদানের অন্যতম কারণ ছিল, বিচারকদের প্রতি রাষ্ট্র এবং জনগণের অগাধ আস্থা। উমাইয়া যুগের এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
**ইয়াতিমদের সম্পদ দেখাশোনা**
ইসলামি শরীয়তে ইয়াতিমের সম্পদ তত্ত্বাবধান, মৌলিকভাবে তা সংরক্ষণ এবং বৃদ্ধি করার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ কারণে খলিফা এবং প্রশাসকরা ইয়াতিমের সম্পদ তত্ত্বাবধান এবং তা বৃদ্ধি করার দায়িত্ব বিচারকদের কাছে অর্পণ করেন। কেননা বিচারকরা ছিলেন সমাজের মাঝে সর্বাধিক আমানতদার। জনগণের আস্থার জায়গা এবং তাদের সম্পদের দায়িত্বশীল। ইয়াতিমদের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের এই ব্যবস্থা উমাইয়া যুগেই প্রথম শুরু হয়। এই ব্যবস্থাপনার সর্বপ্রথম পরিচালক ছিলেন হিজরি ৮৬ সনে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ানের পক্ষ থেকে নিয়োগকৃত মিশরের বিচারক আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া ইবনি খুদাইজ। কিনদি বলেন, আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া ছিলেন ইয়াতিমের সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্ব পালনকারী সর্বপ্রথম বিচারক। তিনি প্রত্যেক গোত্রের দায়িত্বে তাদের ইয়াতিমদের সম্পদ রেখেছিলেন। এ বিষয়টি তিনি লিখিত আকারে নিজের কাছে সংরক্ষণ করেন।
অন্য বর্ণনায় আছে, আবদুর রহমান ইবনু মুআবিয়া ইবনি খুদাইজ বিচারক হওয়ার পর ইয়াতিমদের কিছু মালের সন্ধান পান। সেটা তিনি গোত্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জিম্মায় রাখেন। সেসব সম্পদের কথা প্রচার করে এ ব্যাপারে সাক্ষী রাখেন। তারপর থেকে ইয়াতিমের সম্পদ হেফাজতের বিষয়টি এভাবে চলতে থাকে।
**ওয়াকফকৃত সম্পদের পৃষ্ঠপোষন**
ওয়াকফকৃত সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, এই খাতের লভ্যাংশের বণ্টন এবং ওয়াকফকারীর শর্তাদি বাস্তবায়ন ইত্যাদির ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামি শরীয়তের বক্তব্য অনেক সুস্পষ্ট। এর আগে ওয়াকফ-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো বিচারব্যবস্থা ছিল না। ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দাতাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকত কিংবা ওসিয়তকারীদের নিয়ন্ত্রণেই তা পরিচালিত হতো। ওয়াকফের সম্পত্তির কার্যনির্বাহী কোনো বিচারকও ছিল না। খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিকের যুগে বিচারক তাওবা ইবনু নামির সর্বপ্রথম ওয়াকফকৃত সম্পদের পৃষ্ঠপোষন শুরু করেন।
ইবনু লাহিআহর সূত্রে কিনদি বর্ণনা করেছেন, 'মিশরের ওয়াকফকৃত সম্পদের ওপর সর্বপ্রথম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিলেন খলিফা হিশামের নিয়োগকৃত বিচারক তাওবা ইবনু নামির। এর আগে ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দাতা-সদস্যদের অধীনে পরিচালিত হতো। ওসিয়তকারীদের নিয়ন্ত্রণেই তা থাকত। তাওবা বিচারক হওয়ার পর বললেন, "আমার মনে হয়, দরিদ্র আর অসহায় মানুষই এই সম্পদগুলোর প্রকৃত হকদার। তাই এগুলোর ওপর আমি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাই। নাহয় এগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে এবং উত্তরাধিকার সূত্রে একজনের পর একজন মুতাওয়াল্লী হয়ে তা নষ্ট করে ফেলবে।" সেমতে তাওবা ইবনু নামিরের ইন্তেকালের আগেই ওয়াকফকৃত সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে একটি বড় প্রশাসনিক বিভাগ তৈরি করা হয়।'
অন্য বর্ণনায় আছে, তাওবা ছিলেন মিশরের সর্বপ্রথম বিচারক, যিনি ওয়াকফকৃত সম্পত্তিকে প্রশাসনিক বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। এটা ছিল ১১৮ হিজরির কথা। এরপর আব্বাসীয় যুগে এ বিষয়টি আরও সুশৃঙ্খল রূপ পায়।
**ফতোয়া প্রদান**
বিচারকগণ প্রায় সবাই ছিলেন বড় বড় আলিম এবং ফকিহ। বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগেও তারা ফতোয়া প্রদান, পাঠদান ও মানুষকে শরীয়তের বিধিনিষেধ বর্ণনা করার দায়িত্ব পালন করতেন। বিচারক থাকা অবস্থায় এবং বরখাস্ত হওয়ার পরও তারা এ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতেন। বিচারক থাকাকালীন তারা মানুষকে ফতোয়া প্রদান করতেন। অধিকাংশ সময় মামলা বা বিরোধের নিষ্পত্তি হতো ফতোয়া আর শারঈ আইন বর্ণনার মাধ্যমে। যেমন, বসরায় হাসান বসরি ফতোয়া প্রদান করতেন। শামে মাকহুল এবং আবান ইবনু উসমান -সহ অন্যদের সাথে ফতোয়া প্রদানের কাজে নিয়োজিত ছিলেন বিচারক নুমাইর আল-আশআরি।
**টিকাঃ**
[৪৬১] তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ২/২১৬; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৮৬; আবকারিয়্যাতুল ইসলাম, পৃ. ৪৪১
[৪৬২] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্দাহ, পৃ. ৩২৫
[৪৬৩] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩৪৬; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ২৭; আবকারিয়্যাতুল ইসলাম, পৃ. ৪৪২