📄 নজরদারি এবং জবাবদিহিতা
খলিফা এবং প্রশাসকরা বিচার-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন না করলেও বিচারকদের কার্যক্রম নজরদারি এবং তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা থেকে বিরত ছিলেন না। বিচারকার্য পরিচালনা, বিচারক নিয়োগ দেওয়া, বরখাস্ত করা এবং দুর্নীতি দমনের কাজ থেকে উদাসীন ছিলেন না। মামলা-মোকদ্দমা এবং বিচারকদের প্রদত্ত তাবৎ ফয়সালাই পর্যবেক্ষণ করা হতো। কেননা খলিফাই ছিলেন বিচার, দ্বীন, দুনিয়ার নেতৃত্ব-সহ জাতির প্রতিটা সদস্যের সাথে সম্পৃক্ত সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দায়িত্বশীল। কেবল বিচারকদের কাছে বিচারের দায়িত্ব ন্যস্ত করেই খলিফা দুনিয়া-আখিরাতের জবাবদিহি থেকে রেহাই পাবেন না। এজন্যই খলিফারা বিচারকদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতেন এবং তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতেন। কোনো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি বা অবহেলা দেখতে পেলে ঠিক করে দিতেন এবং সংশোধনের জন্য পদক্ষেপ নিতেন।
ইতিপূর্বে আমরা আবুল হাসান নুবাহির বর্ণনা উল্লেখ করেছি। তিনি বলেছেন, 'মুআবিয়া-এর কাছে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার পর বিচারকদের দেখভালের ক্ষেত্রে তিনি পূর্বসূরিদের নীতি অনুসারে চলতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। বিচারব্যবস্থা এ পদ্ধতিতেই আরও কিছুকাল চলেছিল।'
১০৫ হিজরির রমজান মাসে ইয়াহইয়া ইবনু মাইমুন মিশরের বিচার বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কিনদি বলেছেন, 'একবার খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিকের কাছে এ সংবাদ আসে, জনৈক ইয়াতিম সাবালক হওয়ার পর বিচারক ইয়াহইয়া ইবনু মাইমুনের কাছে মামলা দায়ের করেছিল। কিন্তু ইবনু মাইমুন তার সাথে সুবিচার করেননি। দলিল-প্রমাণ-সহ বিষয়টি খলিফা হিশামের কাছে পেশ করা হলে তিনি এটি অনেক গুরুতর মনে করলেন। তৎক্ষণাৎ মিশরের গভর্নর ওয়ালি ইবনু রুফাআর কাছে এ মর্মে নির্দেশ পাঠালেন, 'বিচারকের দায়িত্ব থেকে ইয়াহইয়াকে লাঞ্ছিত আর অপদস্থ করে বরখাস্ত করুন। আর আপনার সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে বাছাই করে চরিত্রবান, আল্লাহভীরু এবং কলঙ্কমুক্ত একজনকে বিচারক নিয়োগ দিন। যে আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবে না।'
খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান সব শহরের বিচারকদের খোঁজখবর রাখতেন। তাদের কাজের তদারকি করতেন। ইতিপূর্বে তার ঘটনা আমরা বর্ণনা করেছি। ৭২ হিজরিতে তিনি নাখিলায় আগমন করে বিখ্যাত বিচারক শুরাইহ সম্পর্কে জানতে চান। তাকে দরবারে নিয়ে আসতে বলেন। সেমতে তাকে নিয়ে আসা হলে খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি বিচারকার্য পরিচালনা করেন না?' উত্তরে শুরাইহ বলেন, 'এক ফিতনা নিয়ে দুজনের মাঝে বিচার করতে পারব না।' তখন খলিফা বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাওফিক দান করুন। আপনি আবার বিচারের দায়িত্বে ফিরে যান।'
ওয়াকি বর্ণনা করেন, বিভিন্ন প্রাদেশিক গভর্নরদের দায়িত্ব ছিল বিচারক নিয়োগ দেওয়া। তারা ইচ্ছেমতো বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে লোক নিয়োগ দিত। প্রশাসকদের অনুমতি ছাড়া বিচারক কোনো বাহনে চড়তেন না, বা দরকারে বাইরে যেতেন না।
বিচারক অনেক সময় খলিফাদের কাছে পত্র লিখে ফতোয়া জিজ্ঞেস করতেন। কোনো বিষয় অস্পষ্ট থাকলে তাদের কাছে সমাধান জানতে চাইতেন। ইয়াস ইবনু মুআবিয়া সূত্রে ওয়াকি এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইয়াস ইবনু মুআবিয়া বলেন, উমর ইবনু আবদিল আজিজের যুগে আমি বসরার বিচারক ছিলাম। একবার আমার কাছে একটি মেয়েকে নিয়ে আসা হলো। তার কোলে ছিল একটি শিশু। শিশুর গলায় ছিল একটি মালা। একজন লোক এসে মালাটি ধরে টান দিলে মেয়েটি চিৎকার করে ওঠে। তখন লোকটিকে ধরে ফেলা হয়। ইয়াস বলেন, আমি এই ব্যাপারে উমর ইবনু আবদিল আজিজের কাছে পত্র লিখলে তিনি উত্তরে লিখলেন, 'অবশ্যই এটা সুস্পষ্ট অভিযোগ। সুতরাং আপনি পুরুষ লোকটিকে অপরাধ পরিমাণ শাস্তি দিন।'
ইয়াজ ইবনু উবাইদিল্লাহ ছিলেন উমর ইবনু আবদিল আজিজ কর্তৃক নিযুক্ত মিশরের বিচারপতি। তিনি খলিফার কাছে শুফআ তথা ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার সম্পর্কে জানতে চেয়ে পত্র লেখেন। উত্তরে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজ লিখলেন, ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার যেন শুধু অংশীদারকেই দেওয়া হয়।
বিচারক ইয়াস প্রতিবেশীর ব্যাপারে শুফআর ফয়সালা করতেন। কিন্তু তার কাছে এ মর্মে উমর ইবনু আবদিল আজিজের পত্র আসে, 'শুফআর ফয়সালা দুই অংশীদারের মাঝে করতে হবে। কিংবা এমন বাড়ির ক্ষেত্রে করতে হবে, যার প্রধান দরজা একটা।'
ইয়াস ইবনু মুআবিয়ার অভিমত ছিল, তালাকের ক্ষেত্রে মহিলার সাক্ষ্য গৃহীত হবে। পক্ষান্তরে হাসান বসরি মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না হওয়ার ফতোয়া দিতেন। এ ব্যাপারে মিশরের প্রশাসক খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের কাছে পত্র লিখলে তিনি উত্তর দিলেন, 'হাসান বসরির ফতোয়া সঠিক। আর ইয়াসের ফয়সালা ভুল।'
ইয়াস প্রতিবেশীর জন্য শুফআ সাব্যস্ত করে ফয়সালা দিতেন। কিন্তু উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে পত্র মারফত এ ব্যাপারে নিষেধ করেন।
**টিকাঃ**
[৪৩৮] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ২৪; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৮৭
[৪৩৯] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৪১; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৭০
[৪৪০] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৩৯৭
[৪৪১] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৪১
[৪৪২] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/৩২৬; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ২/৩১৬; ই'লামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ২/১১৩
[৪৪৩] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্দাহ, পৃ. ৩৩৪
[৪৪৪] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/৩৩২
[৪৪৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/৩৩০, ৩৩২