📄 বিচারকদের বেতন-ভাতা
উমাইয়া যুগে বিচারকদের ব্যাপকভাবে মাসিক বেতন-ভাতা দেওয়ার প্রচলন ছিল। মূলত এটা দেওয়া হতো তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে। বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে তারা অনেক সুবিধা লাভ করতেন। তবে দেশ, শহর এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির বিচারে বেতনের পরিমাণ নির্ধারিত হতো।
মালিক ইবনু আনাস সূত্রে ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, উমর ইবনু আবদিল আজিজ মদীনায় আসার পর এক ব্যক্তিকে লোকদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করেন এবং তার জন্য মাসিক ভাতা দুই দিনার নির্ধারণ করেন।
বসরার বিচারক ইয়াস ইবনু মুআবিয়ার বেতন ছিল ১০০ দিরহাম। আবু খুযাইমা যখন বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন প্রতি মাসে তার নির্ধারিত ভাতা ছিল দশ দিনার। তিনি জুমুআর দিনের জন্য কোনো ভাতা গ্রহণ করতেন না। তিনি বলতেন, 'আমি তো মুসলিমদের একজন শ্রমিক মাত্র। তাদের কোনো কাজ না করলে তো তাদের থেকে পারিশ্রমিক নিতে পারি না।' ওয়াকি বলেন, মিশরের একজন আমাকে বলল যে, সে মিশরের নথিতে এক টুকরা কাগজে লেখা পেয়েছে, 'বিচারক আবু খুযাইমা যে দিনগুলোতে বিচারের জন্য বসেননি, সেসব দিনের পাঁচ দিরহাম তিনি বাইতুল মালে ফিরিয়ে দিয়েছেন।'
ইউসুফ ইবনু উমর ১২১ হিজরি থেকে ১২৬ হিজরি অবধি ইরাকের গভর্নর ছিলেন। আবদুর রহমান ইবনু আবি লাইলার ছেলে মুহাম্মাদকে তিনি বললেন, 'কুফাবাসীদের মাঝে তোমাকেই আমি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছি। তোমার জন্য মাসে ১০০ দিরহাম ভাতা চালু করেছি। সুতরাং তুমি সকাল-সন্ধ্যা জনগণের অভিযোগ শোনার জন্য বসবে। কেননা তুমি মুসলিমদের একজন খাদিম মাত্র।' ওয়াকি বলেছেন, 'ইবনু আবি লাইলাকে ইউসুফ ইবনু উমর কুফায় সর্বপ্রথম বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং মাসে তার জন্য ১৫০ দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন।
বিচারক শুরাইহ সূত্রে শাবি বর্ণনা করেছেন, শুরাইহ বিচারকার্যের পরিচালনার জন্য মাসে ৫০০ দিরহাম নিতেন। তিনি বলতেন, 'আমি জনগণকে পরিপূর্ণ সময় দিই এবং পরিপূর্ণ পারিশ্রমিক গ্রহণ করি।' তিনি আরও বলতেন, 'জনগণের বিচারের জন্যই আমি বসি। আমি নিজেকে এ কাজেই নিয়োজিত রাখি। আর আমাকে ভাতা দেওয়া হবে না, এটা কেমন কথা!'
৭২ হিজরিতে খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান নাখিলা এলাকায় এসে শুরাইহ সম্পর্কে মানুষের কাছে খোঁজখবর নিলেন। তিনি জানতে পারলেন, ইবনুয যুবাইরের বিদ্রোহের সময় শুরাইহ বিচারের দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন। তখন খলিফা শুরাইহকে ডেকে বললেন, 'আল্লাহ আপনাকে তাওফিক দান করুন। আপনি বিচারের দায়িত্ব পালন করে যান। আমি আপনার জন্য ১০ হাজার দিরহাম এবং ৩০০ জারিব দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি।' শুরাইহ এটা গ্রহণ করেন এবং ৭৮ হিজরি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
কিছু বিচারক ছিলেন, যারা বিচারকার্য পরিচালনার জন্য কোনো বেতন নিতেন না। আল্লাহর শরীয়ত বাস্তবায়নের জন্য এর প্রতিদান তারা আল্লাহর কাছে আশা করতেন। তাদের একজন হলেন বিচারক ও মুফতি মাসরুক ইবনুল আজদা। মৃত্যু ৬৩ হিজরিতে। মাসরুক বিচারের ক্ষেত্রে শুরাইহের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ছিলেন। আর শুরাইহ ছিলেন বিচারের ক্ষেত্রে মাসরুকের চেয়ে বেশি দূরদর্শী। মাসরুকের স্ত্রী বলেছেন, 'মাসরুক বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে কোনো ভাতা নিতেন না।' কাসিম বলেন, 'মাসরুক বিচারের জন্য কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না।' মাসরুক নিজেও বলতেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে এক বছর পাহারা দেওয়ার চেয়ে একদিন ইনসাফের সাথে বিচার করা আমার কাছে বেশি পছন্দনীয়।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ -এর নাতি কাসিম ইবনু আবদির রহমান-ও বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না। তিনি বলতেন, 'চারটি কাজে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক নেওয়া যায় না। সেগুলো হচ্ছে: বিচারকার্য পরিচালনা, আযান, হিসাব-নিকাশ এবং কুরআন। আর হিসাব-নিকাশই হচ্ছে বণ্টন।
দামিস্কের বিচারক ছিলেন যুরআহ ইবনু আইয়ুব। তিনিও বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না। তিনি সিগনেচার করার সময় লিখতেন, لِكُلِّ عَمَلٍ قَوَابٌ অর্থাৎ প্রত্যেক কাজের একটি প্রতিদান আছে। তিনি বিচারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন খলিফা ওয়ালিদের যুগে। তাকে ২০০ দিনার ভাতা গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও তিনি গ্রহণ করেননি।
খলিফা ওয়ালিদ পীড়াপীড়ি করে তাকে আবাদি জমি দেন। তারপর কসম করে বলেন, এটা তার পৈতৃক সম্পদ থেকে দেওয়া হয়েছে। তখন যুরআহ বললেন, 'আপনার থেকে আমি এটা গ্রহণ করলাম। আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, এই জমির তিন ভাগের এক ভাগ আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দিলাম। আরেক ভাগ আমার কওমের ইয়াতিম ও অসহায়দের জন্য বরাদ্দ করলাম। আর এক ভাগ ওই নেককার ব্যক্তিদের জন্য, যারা এসব ইয়াতিম ও অসহায়দের দেখাশোনা করে এবং তাদের হক আদায় করে। তারপর আমি এটা পছন্দ করি, আমাকে এ পর্যন্ত আপনি যত বেতন দিয়েছেন, সেগুলি নিয়ে নেবেন। সেগুলো আমার ঘরের তাকে রাখা আছে।' এই বলে তিনি সেসব অর্থ বাইতুল মালে ফিরিয়ে দিলেন। তখন ওয়ালিদ তাকে বললেন, 'আপনি এমন করলেন কেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে যে ইলম দান করেছেন, তার বিনিময়ে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে চাই না।
অনেক সময় বিচারক একসাথে অনেক কাজ করতেন এবং সবগুলির বিনিময়ও গ্রহণ করতেন।
ওয়াকি বলেছেন, আবদুর রহমান ইবনু হুজাইরাহ মিশরে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ানের সাথে বিচার বিভাগ, অপরাধ বিভাগ এবং বাইতুল মাল দেখাশোনা করতেন। তিনি বিচারকার্যের বিনিময়ে ২০০ দিনার, অপরাধ বিভাগ পরিচালনার জন্য ২০০ দিনার এবং বাইতুল মাল দেখাশোনার জন্য ২০০ দিনার গ্রহণ করতেন। এর বাইরে হাদিয়া থাকত ২০০ দিনার, আবার বাড়তি ২০০ দিনার পেতেন। এভাবে সব মিলিয়ে বছরে তিনি এক হাজার দিনার গ্রহণ করতেন। দেখা যেত, বছর না-পেরোতেই তার ওপর যাকাত ফরজ হয়ে যেত। এভাবেই বিচারের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। অবশেষে ৮৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ থেকে প্রমাণিত হয়, সে-সময় বিচারকদের যথেষ্ট পরিমাণ বেতন-ভাতা দেওয়া হতো। তাদের বেতন মাসের শুরুতে অগ্রিম প্রদান করা হতো। কখনো কখনো দুই মাস বা তার চেয়েও বেশি বেতন অগ্রিম পেয়ে যেতেন।
**টিকাঃ**
[৪০৫] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৩৪
[৪০৬] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/৩৪২
[৪০৭] আখবারুল কুদ্দাহ: ৩/২৩৩
[৪০৮] আখবারুল কুদ্দাহ: ৩/১২৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২১১
[৪০৯] পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, শুরাইহের জন্য উমর মাসে ১০০ দিরহাম ধার্য করেছিলেন। ইবনু আবি লাইলা বলেছেন, আলি কুফার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য শুরাইহকে ৫০০ দিরহাম ভাতা প্রদান করতেন। (আখবারুল কুদ্দাহ: ২/২২৭, ৩৯৭)
[৪১০] আখবারুল কুদ্দাহ: ২/৩৯৮; আল-আলাম: ৮/১০৮; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৬/৮২
[৪১১] আখবাকল কুদ্দাহ: ৩/৬-৭
[৪১২] আখবারুল কুদ্দাহ : ৩/২০২; আবকারিয়্যাতুল ইসলাম, পৃ. ৪২৩। উমাইয়া যুগে এমন আরও অনেকেই বিচারকার্য পরিচালনার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না। হাসান আল-বাসরি, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ এ-এর পৌত্র কাসিম ইবনু আবদির রহমান এ ছিলেন তাদের অন্যতম। (নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২১৩)
[৪১৩] আখবারুল কুদ্দাহ: ৩/২২৫; রফউল ইসর: ২/৩১৬; নিযামুল হুকমি, পৃ. ৩৫৪; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩০
[৪১৪] তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ২/২১৭; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩৫৪; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩০
📄 বিচারালয়ের কিছু চিত্র
উমাইয়া যুগেই সর্বপ্রথম বিচার নথিভুক্তকরণ পদ্ধতি প্রকাশ পেয়েছে। বিচারের রায়গুলো বিচারক তার বিশেষ রেজিস্টারে ইস্যু করতেন। সে যুগে আরও চালু হয়েছিল জুডিসিয়াল অ্যাসোসিয়েশন। বিচারক-সহ অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্বশীলগণ প্রয়োজনে সেখানকার শরণাপন্ন হতেন।
মুআবিয়া এর যুগে মিশরের বিচারক সুলাইম ইবনু ইতর আত-তুজিবি সর্বপ্রথম বিচার-সালিশ নথিভুক্তকরণ শুরু করেছিলেন। ঘটনা ছিল এমন, মিরাস বণ্টনের জন্য কিছু ব্যক্তি তার কাছে মোকদ্দমা দায়ের করলে তিনি তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেন। কিন্তু কিছু বাদী-বিবাদী অনুপস্থিত থেকে যায়, যারা পরে বিচার মানতে অস্বীকার করে। তারপর তারা আবার মোকদ্দমা দায়ের করলে তাদের বিচারের হিস্ট্রি বিচারকের মনে পড়ে যায়। বিচারক তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা আগের বিচারের ফয়সালা মেনে নেয়। তখন বিচারক পুনরায় তাদের মাঝে ফয়সালা করে দেন। তখনই বিচারক মুনশিকে ফয়সালা লিখে রাখতে বলে দেন। মুনশি তখন বিচারকের ফয়সালার একটি রেকর্ড তৈরি করে সে ব্যাপারে সাক্ষ্যও লিপিবদ্ধ করেন।
কিনদি বলেন, 'সে হিসেবে সুলাইমই হলেন মিশরের সর্বপ্রথম বিচারক, যিনি তার বিচার-আচার নথিভুক্ত করেছেন।'
আমরা প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক বলতে পারি, বিচারকার্য আরও মজবুত করার জন্য বিচারক সুলাইমই সর্বপ্রথম বিচারের সাক্ষ্য ব্যবস্থাপনা রেখেছেন। রায় অস্বীকার করার পথ তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এরপর আব্বাসীয় যুগেও এ ধারাবাহিকতা চলমান থাকে এবং ক্রমান্বয়ে আরও ব্যাপকতা লাভ করে।
এ যুগে বিচারের নথি-পদ্ধতির এক নতুন নিয়ম চালু করা হয়। সেটা হচ্ছে, মামলার বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষই তাদের নাম একটি কাগজে লিখে বিচারকের কাছে পাঠিয়ে দিবে। তাদের সিরিয়াল আসলে বিচারক বা কোনো কর্মচারী তাদেরকে বিচারের জন্য ডাকবে। তখন তারা বিচারকের কাছে উপস্থিত হবে।
অনেক বিচারক আবার লিখিত হিস্ট্রি গ্রহণ করতেন না। একবার শুরাইহ দুজন বাদী-বিবাদীর লিখিত কোনো এক মামলা নিতে অস্বীকার করলে এক ব্যক্তি তাকে ওই মামলার হিস্ট্রি দেখায়। তবুও শুরাইহ সেই মামলা নিতে অসম্মতি জানিয়ে বলেন, 'আমি কোনো লিখিত মামলা পড়তে পারব না।' ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, শুরাইহ লিখিত কোনো মামলার হিস্ট্রি দেখতেন না।
সুষ্ঠুভাবে মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনার জন্য স্বাভাবিকভাবেই বিচারকদের অনেক সহযোগীর প্রয়োজন পড়ত। সহযোগীদের মধ্যে থাকত বিচারকের লেখক বা পেশকার কিংবা সেক্রেটারি। রাশিদুন যুগেই সর্বপ্রথম এই পদবিধারীদের প্রচলন হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে এসব পরিভাষার ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়। যুগের চাহিদা, জীবন-যাত্রার মানোন্নয়ন, বিচারকদের কর্মপরিধির বিস্তৃতি এবং মামলার আধিক্য ইত্যাদির কারণে উমাইয়া যুগে আরও নতুন নতুন বিভিন্ন সহযোগীর ব্যবহার চালু হয়। এখানে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের ব্যাপারে আমরা আলোচনা করব।
ক) ঘোষক
তিনি বিচারকের পাশেই থাকতেন। বিচারকের সম্মান ও মর্যাদার বিবরণ দিতেন। বিচারের আগে বাদী-বিবাদীকে উপস্থিত হওয়ার জন্য ডাকতেন। তাকে صَاحِبُ الْمَجْلِسِ الَّذِي عَلَى رَأْسِ الْقَاضِي বৈঠকের পরিচালক নামে অভিহিত করা হতো। এই পদ্ধতিটি সর্বপ্রথম বিচারক শুরাইহের যুগে শুরু হয়।
ওয়াকি বলেছেন, 'আমর ইবনু কায়স আল-মাজি সূত্রে বর্ণিত আছে, শুরাইহের কাছে একজন ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে আমি দেখেছি। মামলার উভয় পক্ষ বিচারকের সামনে আসলে সে বলত, "তোমাদের মধ্যে যে বাদী সে তার বক্তব্য পেশ করুক।"'
ওয়াকি আরও বলেছেন, 'শুরাইহ বিচারের এজলাসে বসলে ঘোষণা দেওয়া হতো- "আছে কি আরও কোনো বাদী-বিবাদী? কেউ কি বিচারের প্রমাণ চায়? কেউ কি সমস্যার সমাধান বা ফতোয়া পেতে আগ্রহী?" এরপর তিনি উঠে দাঁড়াতেন।
খ) দারোয়ান
তিনি বিচারকের মূল ফটকে অবস্থান নিতেন। মামলা চলাকালীন সময় বিচারক থেকে লোকদের সরিয়ে রাখতেন। বিচারপ্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলে বা প্রচণ্ড ভিড় হলে লোকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় দারোয়ানই বিচারকের ঘোষকের দায়িত্ব পালন করতেন। একা দুই কাজ সামাল দিতেন। দারোয়ান অনেক সময় নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ অথবা বিভাগীয় পুলিশের কাজও করতেন। কখনো-বা বিচারক তাকে আদালতের ভেতরে-বাইরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব প্রদান করতেন।
ওয়াকি বলেন, 'বিচারক শুরাইহের পুলিশ অফিসারের কাজ করতেন ইবরাহীম নাখায়ি।' মালিক ইবনু আনাসের সূত্রে রবীআ থেকে ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, 'আমি মদীনা মুনাওয়ারায় আবু বকর ইবনু হাযামকে মসজিদে বিচার করতে দেখেছি। তার পাশেই চাবুক হাতে রক্ষীবাহিনী দাঁড়িয়ে ছিল। তখন মালিকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এখানে চাবুক দিয়ে কী করা হয়? উত্তরে মালিক বললেন, এটা দিয়ে মানুষকে ভিড় করা থেকে বিরত রাখা হয়।
বিচারক ইয়াসের সাথে একজন পুলিশ থাকত। যার দায়িত্ব ছিল বাদী- বিবাদীকে বিচারকের কাছে পাঠানো। আর বিচারক শুরাইহের সামনে চাবুক হাতে একজন পুলিশ অফিসার থাকত।
গ) দোভাষী
যেসব অনারব জনগোষ্ঠী ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করছিল, তাদের আধিক্যের কারণে বিচারকগণ দোভাষী ব্যবহার করতেন। কারণ নতুন নতুন ভিন্নভাষী জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের পরিচয় হচ্ছিল। তারা একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছিল। এটা মূলত আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণীরই বাস্তবায়ন :
وَجَعَلْنَكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا
আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো।
তাই তাদের মাঝে কোনো ধরনের বিবাদ, বিরোধ, কিংবা কোনো বিতণ্ডা সৃষ্টি হলে বিচারক তখন আস্থাভাজন কোনো দোভাষীর সাহায্য নিতেন। যাদের কাজ ছিল বিবদমান উভয় পক্ষের বক্তব্য ভাষান্তর করে দেওয়া।
**টিকাঃ**
[৪১৫] নিযামুল হুকমি, পৃ. ২৫৬; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ২৮; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩০৯; আবকারিয়্যাতুল ইসলাম, পৃ. ৪৪১
[৪১৬] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩১০; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ২৮; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ৩০; আল- কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ৪৭
[৪১৭] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৩০৭; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৫০০
[৪১৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৩০৭; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১২৮
[৪১৯] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪১৪-৪১৬; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১২৮ ও ১৩৮
[৪২০] আখবারুল কুদ্দাহ: ২/২১৫, ২৭৭
[৪২১] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/৩১৮
[৪২২] আখবারুল কুদ্দাহ: ২/৩২০
[৪২৩] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১৩
[৪২৪] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৪২৩; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ৫৮; আখবারুল কুদ্দাহ : ৩/১৩৫
📄 উমাইয়া যুগে দুর্নীতির বিচার
উমাইয়া যুগের বিচারব্যবস্থার সর্বাধিক প্রসিদ্ধ বৈশিষ্ট্য ছিল দুর্নীতির বিচার-সংক্রান্ত পরিপূর্ণ আইন। ইসলামি সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটার সাথে সাথে সে যুগে প্রাদেশিক শাসক, আমির-উমারা এবং প্রশাসকদের মাঝে ব্যাপক হারে জুলুম, দুর্নীতি এবং অনিয়ম চলছিল বিধায় খলিফারা এ ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। সরকারি কর্মকর্তারা ইসলামি খিলাফতের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রাচুর্যের আধিক্য। আর্থিক অবস্থা সমৃদ্ধ হয়েছিল। রাশিদুন যুগের মানুষের মাঝে যে দ্বীনি চেতনা ছিল, উমাইয়া যুগে তা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আবির্ভাব ঘটেছিল অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির। যাদের কেউ ছিল খলিফার আত্মীয়স্বজন, কেউ-বা ছিল তাদের কাছের মানুষ, কেউ ছিল রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয় বা ঘনিষ্ঠজন। সেই প্রভাব খাটিয়ে কখনো তারা প্রজাদের প্রতি জুলুম করত, মানুষের অধিকার হরণ করত, প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করত।
এ কারণেই স্বয়ং খলিফাদের পক্ষ থেকে সীমা নির্ধারণ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। বিশেষ করে খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান এবং উমর ইবনু আবদিল আজিজ এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেন। খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানই প্রথমে বিভিন্ন দুর্নীতির বিচারের প্রতি পরিপূর্ণ দৃষ্টি দিয়েছেন। এসব কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইমাম মাওয়ারদি বলেছেন, 'তাঁর (অর্থাৎ আলি-এর) পর বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। লোকেরা প্রকাশ্যে জুলুম, বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করতে থাকে। ওয়াজ-নসিহতের সতর্কবার্তা অন্যায়, অবিচার, জুলুম ও দুর্নীতি থেকে তাদের দমাতে পারেনি। ফলে দুর্নীতিবাজ ও জালিমদের প্রতিহত করা এবং মজলুমদের প্রতি ইনসাফ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আসলে এটাই দুর্নীতি দমনের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা একটি রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আর এটা কেবল ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব। সে হিসেবে আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি জুলুম, নির্যাতন ও দুর্নীতি সংক্রান্ত বিচারের জন্য বিশেষ একটি দিন নির্ধারণ করেন। সেদিন তিনি জুলুম আর দুর্নীতির বিচারপ্রার্থীদের হিস্ট্রি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। সমস্যা রয়েছে এমন কোনো মামলা, কিংবা ফয়সালা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন এমন কোনো হিস্ট্রি সামনে আসা মাত্রই তিনি সেটি বিচারক আবু ইদরিসের কাছে হস্তান্তর করতেন। আর আবু ইদরিসও তৎক্ষণাৎ সেই ফয়সালা বাস্তবায়ন করতেন। কারণ তিনি জানতেন যে, আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান সকল হিস্ট্রি এবং তার কারণ ভালোভাবেই অবগত আছেন। তাই খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের আদেশে আবু ইদরিস বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
তারপর এই গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল দায়িত্ব পালন করেছেন ন্যায়পরায়ণ শাসক খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজ। এ ক্ষেত্রে তিনি পূর্ণ দক্ষতা এবং যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। এ কাজ তিনি শুরু করেছিলেন তাঁর নিজের ঘর থেকে। সেমতে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর যাবতীয় সম্পদ বাইতুল মালে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তারপর উমাইয়া বংশে তাঁর সকল আত্মীয়স্বজনের সম্পদের হিসেব নেন। এরপর তাঁর সকল প্রাদেশিক শাসক এবং আমির-উমারাদের সম্পদের প্রতি লক্ষ করেন। অবৈধ সম্পদ প্রমাণিত হওয়ায় একসাথে বারোজন সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ তিনি (জনতার মাঝে) বণ্টন করে দিয়েছিলেন। সর্বশ্রেণির মানুষের জন্য তাঁর দরজা ছিল উন্মুক্ত, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে যে-কেউ অভিযোগ দায়ের করতে পারে। তাঁর ইনসাফপূর্ণ বিচার সম্পর্কিত অনেক বিস্ময়কর ঘটনা রয়েছে, যা ইতিহাসে আজও প্রবাদতুল্য।
মাওয়ারদি বলেন, এরপর প্রশাসকদের জুলুম এবং সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্যায় আরও বেড়ে গেল, যা শক্ত হাতে প্রতিহত করার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল কার্যকর কোনো নির্দেশদাতার। উমর ইবনু আবদিল আজিজ-ই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। তিনি ইনসাফের মূলনীতির সংরক্ষণ করেছেন, নিপীড়িত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। বনু উমাইয়ার নির্যাতনের বদলা নিয়েছেন। তখন ওরা বলা শুরু করল— 'আপনার কঠোরতার কারণে আপনার ব্যাপারে আমরা আশঙ্কা করছি।' উত্তরে তিনি বললেন, 'কিয়ামতের পূর্বে প্রতিটি দিনকেই আমি ভয় করি। কোনো দিনই আমি নিরাপদ নই।'
খিলাফতের শুরুতে প্রশাসকদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে উমর ইবনু আবদিল আজিজ বলেছিলেন, 'আপনাদেরকে তাকওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা আল্লাহ শুধু তাকওয়া এবং তাকওয়াবানদেরই গ্রহণ করে থাকেন। প্রশাসকদের কিছু লোক সত্য থেকে দূরে আছে। আমি তাদের থেকে বদলা নেবো। তারা মিথ্যা ছড়িয়ে দিয়েছে। আমি তাদের থেকে বিনিময় গ্রহণ করে তবেই ছাড়ব। আল্লাহর কসম! হকের যে পথকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে, তা আমি আবার সজীব করব। আর মিথ্যার যে রেওয়াজ চালু করা হয়েছে, সেটাকে আমি নিশ্চিহ্ন করব। আমি এক মুহূর্তও বেঁচে থাকার প্রত্যাশা করি না। আপনারা আপনাদের আখিরাত ঠিক করে নিন। আপনাদের দুনিয়া এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।
দুর্নীতির বিচারের জন্য উমর ইবনু আবদিল আজিজ এমন বিশেষ নীতি চালু করেন, যা ছিল অনন্য। আর তা হচ্ছে দুর্নীতি ও অভিযোগের বিচার করা এবং দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীকে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
কেবল যে উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী দামিস्কেই দুর্নীতির বিচার সীমাবদ্ধ ছিল-এমন নয়। বরং দুর্নীতির বিচারের এই নীতি সর্বজনীন করতে, প্রশাসকদের ওপর এ নীতি আবশ্যক করতে এবং এ বিষয়টি মানুষকে মনে করিয়ে দিতে উমাইয়া বংশের খলিফাগণ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান তার ছেলের কাছে মিশরের নেতৃত্ব অর্পণ করার সময় তাকে পরামর্শ করে চলতে এবং পাওনাদারদের কাছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। তিনি আরও বলেছিলেন, 'বৎস! তুমি কাজের যোগ্য লোকদের প্রতি লক্ষ রাখবে। সকালে তোমার কাছে তাদের কোনো হক পাওনা থাকলে সেটা পরিশোধে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিলম্বিত করবে না। আবার সন্ধ্যায় কোনো হক থাকলে সেটা প্রদানে সকাল পর্যন্ত বিলম্ব করবে না। যথাসময়ে তাদের হক পরিশোধ করে দেবে। এতে তোমার প্রতি তাদের যে আনুগত্য আছে-সেটা আরও দৃঢ় হবে। তোমার সভাসদ এবং আলিমদের সাথে পরামর্শ করে কাজ করবে। তারপরও কোনো বিষয় অস্পষ্ট থাকলে আমার কাছে পত্র লিখবে। আল্লাহ চাহেন তো সে ব্যাপারে আমার পরামর্শ পাবে। এটাই আমার কথা। তোমার ব্যাপারে আল্লাহকেই আমার স্থলাভিষিক্ত করে দিচ্ছি।
খিলাফতের বাইয়াত গ্রহণের পর উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাঁর আগের সকল প্রশাসকদের পরিবর্তন করে সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যাতে দুর্নীতি দমনে তাঁর অনুসৃত নীতির ওপর তারা চলতে পারে। প্রশাসকদের কাছে তিনি লিখেছিলেন, 'মানুষ তো আজ কঠিন সমস্যার সম্মুখীন। আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে জুলুম ও সীমালঙ্ঘনের মুখোমুখি। কিছু অসৎ আলিম তাদের মাঝে অসৎ আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছে। সত্য, বিনয়, নম্রতা এবং মহানুভবতার ব্যাপারে এদের কোনো আগ্রহ নেই।'
তাঁর প্রথম দিকের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, 'সুধীমণ্ডলী! যিনি আমাদের সঙ্গ দিতে চান, তিনি পাঁচটি বিষয়ে আমাদের সঙ্গ দিতে পারেন। অন্যথায় তিনি যেন আমাদের ধারেকাছেও না আসেন। প্রথমত, অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির প্রয়োজন আমাদের নিকট উত্থাপন করার জন্য। দ্বিতীয়ত, কল্যাণের ব্যাপারে আমাদেরকে সাধ্যমতো সাহায্য করার জন্য। তৃতীয়ত, কল্যাণের এমন রাস্তা দেখানোর জন্য—যার সন্ধান আমরা এখনো পাইনি। চতুর্থত, আমাদের জনগণকে ধোঁকা থেকে বাঁচানোর জন্য। পঞ্চমত, কোনো অনর্থক কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য।
আরেকদিনের ভাষণে উমর বলেছিলেন, ‘হে লোকসকল! না কুরআনের পর আর কোনো নতুন কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে, আর না মুহাম্মাদের পর কেউ নবি হবেন। জেনে রাখবেন, আমি কোনো বিচারক নই। আমি শুধু আসমানি বিধানের অনুসারী। আমি কোনো নয়া দ্বীনের আবিষ্কারক নই; বরং আমি দ্বীনের একজন অনুসারী মাত্র। জালিম বাদশাহ থেকে যে পলায়ন করে, সে তো কোনো অবাধ্য নয়। জালিম শাসকই প্রকৃত নাফরমান ও অবাধ্য। স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য চলবে না।... আপনাদের অধিকার পূরণে আমি সাধ্যমতো সচেষ্ট থাকব।
খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান তার ভাই বিশর ইবনু মারওয়ানকে বসরা এবং কুফার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। অবাধ্যদের ব্যাপারে কঠোরতা এবং অনুগতদের সাথে কোমল আচরণ করার ব্যাপারে তার প্রতি নির্দেশনা ছিল।
হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ আস-সাকাফিকে খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান কুফা এবং বসরার প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। পরিমাপ এবং ট্যাক্স সংস্কার তার যুগে ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেছিল। খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের জনৈক সেক্রেটারি উপঢৌকন গ্রহণ করলে হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ তাদের শাস্তি দিয়ে সতর্ক করেছিলেন। হিশাম ইবনু আবদিল মালিকও ইরাকের প্রশাসকের সাথে এমন আচরণ করেছিলেন।
**টিকাঃ**
[৪২৫] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ৫৫৪, ৫৬১, ৫৬৪; আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ১২৫; আল-ইসলামু ওয়াল-হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/১৮০; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ ফী ইযযিল আরব, পৃ. ৮৪; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৭১
[৪২৬] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৮; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৮৮
[৪২৭] আল-হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১৭১
[৪২৮] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৭৮; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১০২; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৪৫
[৪২৯] আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ৮০
[৪৩০] নিযামুল হুকমি ফিশ শাবীআহ, পৃ. ৫৬১ এবং ১৬৪
[৪৩১] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ : ২/১৬৬
[৪৩২] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/১৭৪; ১৮০; ১৮৪; ১৮৬; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ১০৩
[৪৩৩] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/১৮৭
[৪৩৪] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ ফী ইযযিল আরব, পৃ. ৮৩
[৪৩৫] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ ফী ইযযিল আরব, পৃ. ৮৫ এবং ৮৬
[৪৩৬] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ ফী ইযযিল আরব, পৃ. ৮৭
[৪৩৭] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ ফী ইযযিল আরব, পৃ. ১১৫
📄 নজরদারি এবং জবাবদিহিতা
খলিফা এবং প্রশাসকরা বিচার-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন না করলেও বিচারকদের কার্যক্রম নজরদারি এবং তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা থেকে বিরত ছিলেন না। বিচারকার্য পরিচালনা, বিচারক নিয়োগ দেওয়া, বরখাস্ত করা এবং দুর্নীতি দমনের কাজ থেকে উদাসীন ছিলেন না। মামলা-মোকদ্দমা এবং বিচারকদের প্রদত্ত তাবৎ ফয়সালাই পর্যবেক্ষণ করা হতো। কেননা খলিফাই ছিলেন বিচার, দ্বীন, দুনিয়ার নেতৃত্ব-সহ জাতির প্রতিটা সদস্যের সাথে সম্পৃক্ত সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দায়িত্বশীল। কেবল বিচারকদের কাছে বিচারের দায়িত্ব ন্যস্ত করেই খলিফা দুনিয়া-আখিরাতের জবাবদিহি থেকে রেহাই পাবেন না। এজন্যই খলিফারা বিচারকদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতেন এবং তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতেন। কোনো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি বা অবহেলা দেখতে পেলে ঠিক করে দিতেন এবং সংশোধনের জন্য পদক্ষেপ নিতেন।
ইতিপূর্বে আমরা আবুল হাসান নুবাহির বর্ণনা উল্লেখ করেছি। তিনি বলেছেন, 'মুআবিয়া-এর কাছে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার পর বিচারকদের দেখভালের ক্ষেত্রে তিনি পূর্বসূরিদের নীতি অনুসারে চলতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। বিচারব্যবস্থা এ পদ্ধতিতেই আরও কিছুকাল চলেছিল।'
১০৫ হিজরির রমজান মাসে ইয়াহইয়া ইবনু মাইমুন মিশরের বিচার বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কিনদি বলেছেন, 'একবার খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিকের কাছে এ সংবাদ আসে, জনৈক ইয়াতিম সাবালক হওয়ার পর বিচারক ইয়াহইয়া ইবনু মাইমুনের কাছে মামলা দায়ের করেছিল। কিন্তু ইবনু মাইমুন তার সাথে সুবিচার করেননি। দলিল-প্রমাণ-সহ বিষয়টি খলিফা হিশামের কাছে পেশ করা হলে তিনি এটি অনেক গুরুতর মনে করলেন। তৎক্ষণাৎ মিশরের গভর্নর ওয়ালি ইবনু রুফাআর কাছে এ মর্মে নির্দেশ পাঠালেন, 'বিচারকের দায়িত্ব থেকে ইয়াহইয়াকে লাঞ্ছিত আর অপদস্থ করে বরখাস্ত করুন। আর আপনার সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে বাছাই করে চরিত্রবান, আল্লাহভীরু এবং কলঙ্কমুক্ত একজনকে বিচারক নিয়োগ দিন। যে আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবে না।'
খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান সব শহরের বিচারকদের খোঁজখবর রাখতেন। তাদের কাজের তদারকি করতেন। ইতিপূর্বে তার ঘটনা আমরা বর্ণনা করেছি। ৭২ হিজরিতে তিনি নাখিলায় আগমন করে বিখ্যাত বিচারক শুরাইহ সম্পর্কে জানতে চান। তাকে দরবারে নিয়ে আসতে বলেন। সেমতে তাকে নিয়ে আসা হলে খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি বিচারকার্য পরিচালনা করেন না?' উত্তরে শুরাইহ বলেন, 'এক ফিতনা নিয়ে দুজনের মাঝে বিচার করতে পারব না।' তখন খলিফা বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাওফিক দান করুন। আপনি আবার বিচারের দায়িত্বে ফিরে যান।'
ওয়াকি বর্ণনা করেন, বিভিন্ন প্রাদেশিক গভর্নরদের দায়িত্ব ছিল বিচারক নিয়োগ দেওয়া। তারা ইচ্ছেমতো বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে লোক নিয়োগ দিত। প্রশাসকদের অনুমতি ছাড়া বিচারক কোনো বাহনে চড়তেন না, বা দরকারে বাইরে যেতেন না।
বিচারক অনেক সময় খলিফাদের কাছে পত্র লিখে ফতোয়া জিজ্ঞেস করতেন। কোনো বিষয় অস্পষ্ট থাকলে তাদের কাছে সমাধান জানতে চাইতেন। ইয়াস ইবনু মুআবিয়া সূত্রে ওয়াকি এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইয়াস ইবনু মুআবিয়া বলেন, উমর ইবনু আবদিল আজিজের যুগে আমি বসরার বিচারক ছিলাম। একবার আমার কাছে একটি মেয়েকে নিয়ে আসা হলো। তার কোলে ছিল একটি শিশু। শিশুর গলায় ছিল একটি মালা। একজন লোক এসে মালাটি ধরে টান দিলে মেয়েটি চিৎকার করে ওঠে। তখন লোকটিকে ধরে ফেলা হয়। ইয়াস বলেন, আমি এই ব্যাপারে উমর ইবনু আবদিল আজিজের কাছে পত্র লিখলে তিনি উত্তরে লিখলেন, 'অবশ্যই এটা সুস্পষ্ট অভিযোগ। সুতরাং আপনি পুরুষ লোকটিকে অপরাধ পরিমাণ শাস্তি দিন।'
ইয়াজ ইবনু উবাইদিল্লাহ ছিলেন উমর ইবনু আবদিল আজিজ কর্তৃক নিযুক্ত মিশরের বিচারপতি। তিনি খলিফার কাছে শুফআ তথা ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার সম্পর্কে জানতে চেয়ে পত্র লেখেন। উত্তরে খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজ লিখলেন, ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার যেন শুধু অংশীদারকেই দেওয়া হয়।
বিচারক ইয়াস প্রতিবেশীর ব্যাপারে শুফআর ফয়সালা করতেন। কিন্তু তার কাছে এ মর্মে উমর ইবনু আবদিল আজিজের পত্র আসে, 'শুফআর ফয়সালা দুই অংশীদারের মাঝে করতে হবে। কিংবা এমন বাড়ির ক্ষেত্রে করতে হবে, যার প্রধান দরজা একটা।'
ইয়াস ইবনু মুআবিয়ার অভিমত ছিল, তালাকের ক্ষেত্রে মহিলার সাক্ষ্য গৃহীত হবে। পক্ষান্তরে হাসান বসরি মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না হওয়ার ফতোয়া দিতেন। এ ব্যাপারে মিশরের প্রশাসক খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজের কাছে পত্র লিখলে তিনি উত্তর দিলেন, 'হাসান বসরির ফতোয়া সঠিক। আর ইয়াসের ফয়সালা ভুল।'
ইয়াস প্রতিবেশীর জন্য শুফআ সাব্যস্ত করে ফয়সালা দিতেন। কিন্তু উমর ইবনু আবদিল আজিজ তাকে পত্র মারফত এ ব্যাপারে নিষেধ করেন।
**টিকাঃ**
[৪৩৮] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ২৪; রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৮৭
[৪৩৯] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ৩৪১; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৭০
[৪৪০] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/৩৯৭
[৪৪১] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৪১
[৪৪২] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/৩২৬; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ২/৩১৬; ই'লামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ২/১১৩
[৪৪৩] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্দাহ, পৃ. ৩৩৪
[৪৪৪] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/৩৩২
[৪৪৫] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/৩৩০, ৩৩২