📄 বিচারক নিয়োগ
উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কুফার বিচারক শুরাইহের মতো আগের কোনো কোনো বিচারককে খলিফা এবং প্রশাসক স্বপদে বহাল রেখেছিলেন। তারপর খলিফা ইসলামি খিলাফতের রাজধানী দামিস্কে বিচারক মনোনয়ন এবং নিয়োগ প্রদান শুরু করেন। দামিস্কের বিচারককে 'কাদি আল-খলিফা' তথা খলিফার বিচারক নামে অভিহিত করা হতো। যাদের বিশালসংখ্যক একটা অংশ ছিলেন সুগভীর ইলম, পরহেজগারি, আল্লাহভীতি এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ। এ বিষয়টি আমরা সামনে লক্ষ করব।
বিচারক নির্বাচন এবং বিচারক সংক্রান্ত বিষয়ে খলিফা যথেষ্ট মনোযোগ এবং পরিপূর্ণ গুরুত্বারোপ করতেন। বিচারকদের গুণাবলি চিহ্নিত করার ব্যাপারে উমর ইবনু আবদিল আজিজের বক্তব্যও এমনই ছিল। তিনি বলেছেন, 'একজন উপযুক্ত বিচারকের পাঁচটি গুণের অধিকারী হতেই হবে: ১. চারিত্রিক পবিত্রতা, ২. সহনশীলতা, ৩. পূর্ববর্তী বিচারকদের কাজের ব্যাপারে জ্ঞান থাকা, ৪. অভিজ্ঞদের সাথে বিচার-সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ করা এবং ৫. আল্লাহর খাতিরে কারও নিন্দার পরোয়া না করা।'
বিচারক এবং অন্যান্য দায়িত্বশীলদের ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে সে নিজেকে এমন শাস্তি দেবে যা মানুষকে দেওয়া শাস্তির অধিক ভয়াবহ হবে, সে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা নিরাপত্তা প্রদান করবেন।'
কিন্তু উমাইয়া যুগে যে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল তা হলো, বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কোনো হস্তক্ষেপ না থাকা। দামিস্কে থেকে খলিফা বিভিন্ন শহরের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসকদের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছিলেন। উমাইয়া যুগের অধিকাংশ সময়ে গভর্নররাই প্রাদেশিক বিচারকদের নিয়োগ দিতেন। আবার কখনো খলিফারাও গভর্নরদের কাছে নির্বাচিত নাম প্রস্তাব করতেন।
বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে খলিফা এবং প্রশাসকরা ছিলেন যথেষ্ট সতর্ক। শ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের খোঁজ করে বিচারক হিসেবে নিয়োগ প্রদানের জন্য তারা বড় বড় ফকিহ, আলিম এবং অভিজ্ঞ লোকদের শরণাপন্ন হতেন।
খলিফা উমর ইবনু আবদিল আজিজ বলেন, 'একজন বিচারকের মধ্যে পাঁচটি গুণ থাকলে সে পূর্ণাঙ্গ বিচারক বলে বিবেচিত হবে: ১. পূর্ববর্তীদের বিচার সম্পর্কে জানা থাকা, ২. নির্লোভ হওয়া, ৩. বাদী-বিবাদীর প্রতি সহনশীল হওয়া, ৪. মুসলিম নেতার অনুসরণ করা এবং ৫. আলিমদের সাথে মিলে কাজ করা।'
ইবনু হুবায়রা ছিলেন ইরাকের প্রশাসক। তার থেকে ইবনু শুবরুমাহর সূত্রে ওয়াকি বলেছেন, 'বুদ্ধিমান এবং আল্লাহভীরু আলিমই বিচারকার্য পরিচালনার উপযুক্ত ব্যক্তি।'
বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে খলিফা এবং প্রশাসকরা অন্যদের সহযোগিতা নিতেন। সেটা হতো বয়োবৃদ্ধ কিংবা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে চাচ্ছেন এমন বিচারকের মনোনয়ন প্রদানের মাধ্যমে। অথবা এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের জন্য যিনি প্রার্থী হতে চান তার ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিশ্চিত হয়ে যাচাই-বাছাই করে তার সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার মাধ্যমে।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। বিচারক নুমাইর ইবনু আউস শারীরিকভাবে দুর্বল এবং দৃষ্টিশক্তিহীন হয়ে যাওয়ায় বিচারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলে খলিফা হিশাম ইবনু আবদিল মালিক তার জায়গায় আরেকজনকে মনোনীত করে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। নুমাইর তখন দামিস্কের অধিবাসী ফকিহ ইয়াজিদ ইবনু আবি মালিক হামাদানির কথা উল্লেখ করলে খলিফা তাকে নিয়োগ প্রদান করেন। ইয়াজিদ প্রচুর হাদিস বর্ণনার পাশাপাশি অনেক বিচারকার্যও পরিচালনা করেছেন।
প্রখ্যাত রাবি কিনদি বলেন, আবদুর রহমান ইবনু হুজাইরাহ ছিলেন সবার সেরা ফকিহ। তাই আবদুল আজিজ তাকে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস -এর কাছে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, 'তোমাদের মাঝে ইবনু হুজাইরাহ আছে, আর তুমি কিনা আমার কাছে জানতে চাইছ!'
কোনো বিচারক অসুস্থতা বা অপারগতা কিংবা অপসারণের কারণে বিচারের পদ ছেড়ে দেওয়ার সময় হলে খলিফা তার মতামত নিতেন, তার পরে কাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া যায়। বিচারক তখন উপযুক্ত আর যোগ্য কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন। ওয়াকির সূত্রে এ সংক্রান্ত একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, আবুদ দারদা ছিলেন দামিস্কের বিচারক। তিনি যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন মুআবিয়া তাঁকে দেখতে এসে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনার পর এ দায়িত্বের জন্য আপনি কাকে উপযুক্ত মনে করেন?' আবুদ দারদা তখন ফাদ্বালাহ ইবনু উবাইদ-এর নাম প্রস্তাব করেন।
ওয়াকি এ-ও বর্ণনা করেছেন, 'তাওবা ইবনু নামিরা বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বরত ছিলেন। একসময় তিনি অব্যাহতি চাইলে তাকে বলা হয়, "আপনার পরে আমরা বিচারক বানাতে পারি এমন কারও ব্যাপারে আপনি আমাদের পরামর্শ দিন।" তখন তিনি বললেন, "আমার মির-মুনশি জুবাইর ইবনু নুআইম।"'
এরপর জুবাইর বিচারের দায়িত্ব পালন করেন। জুবাইরও কিছুকাল দায়িত্ব পালন করে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি দেন। কেননা একজন সাধারণ লোককে গালি দেওয়ার অপরাধে একজন সৈনিককে তিনি বন্দি করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসক সৈনিকটিকে মুক্ত করে দেন। এ কারণে জুবাইর বিচারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে ঘরে চলে যান। প্রশাসক আবু আউন তাকে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের আবেদন করলে জুবাইর স্পষ্ট বলে দিলেন, "সৈনিকটিকে জেলে না ঢোকালে আমি ফিরে যাব না।" কিন্তু প্রশাসক এটা করল না। সে তখন বিচারক জুবাইরকে বলল, "তাহলে আপনার পর আমরা কাকে দায়িত্ব দিতে পারি সে ব্যাপারে আমাদের পরামর্শ দিন।" জুবাইর তখন তার মির-মুনশি গাউস ইবনু সুলাইমানের কথা বললেন। তারপর গাউস বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।
খলিফাদের নীতি ছিল, বিচারকদের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করার আগে তাদের যোগ্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া এবং তাদের বিষয়াদি নিয়ে নিজেরা পরামর্শ করে নেওয়া। শুরাইহ এবং কাব ইবনু ইয়াসারকে নিয়োগ দেওয়ার সময় উমর -ও এমনটা করেছিলেন। বনু উমাইয়াও এই নীতি অনুসরণ করে।
ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, উমর ইবনু আবদিল আজিজ বসরার প্রশাসক আদি ইবনু আরতাতের কাছে একজন লোক পাঠিয়েছিলেন। যার দায়িত্ব ছিল প্রথমে ইয়াস ইবনু মুআবিয়া এবং কাসিম ইবনু রবীআ সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হওয়া। এরপর তাদের মধ্যে যে সর্বাধিক বুদ্ধিমান, তাকে বসরার বিচারকার্য পরিচালনায় নিয়োগ দেওয়া। সেমতে তাদের দুজনকে একত্রিত করা হলে ইয়াস তাকে বলেন, 'আমাদের সম্পর্কে শহরের সেরা দুই ফকিহ হাসান ও ইবনু সীরিন -কে জিজ্ঞাসা করুন। তারা আপনাকে যাকে নিয়োগের ব্যাপারে পরামর্শ দিবে, তাকেই আপনি নিয়োগ দিন।' হাসান এবং ইবনু সীরিন-এর সাথে কাসিম ইবনু রবীআর ওঠাবসা ছিল। পক্ষান্তরে ইয়াস তা করতেন না। তাই কাসিম বুঝে ফেললেন, প্রশাসক তাঁদের দুজনকে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা তো তার ব্যাপারেই পরামর্শ দেবেন। তাই তিনি প্রশাসককে বললেন, 'জনাব! আমাদের সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই। আমার কথা শুনুন। এ ব্যাপারে আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আসলে আপনি যা চাচ্ছেন আমি তার উপযুক্ত নই। ইয়াসই এ ব্যাপারে অধিক অভিজ্ঞ। এ ব্যাপারে সে অধিক পারদর্শী। আপনি নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সত্যবাদী হয়ে থাকলে ইয়াসকে বাদ দিয়ে আমাকে নিয়োগ দেওয়া আপনার জন্য উচিত হবে না। পক্ষান্তরে দায়িত্বের ব্যাপারে আপনি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকলে কোনো মিথ্যাবাদীকে নিয়োগ দেয়াও আপনার জন্য সমীচীন নয়।' তখন প্রশাসক একটু থমকে গিয়ে সন্দেহে পড়ে গেলেন। তিনি ইয়াসকে নিয়োগ দেওয়ার মনস্থ করতেই ইয়াস বলে উঠলেন, 'আপনি এমন একজন লোককে আনতে চলেছেন, যাকে আপনি জান্নাত এবং জাহান্নামের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে শঙ্কা বোধ করছে। নিজের মুক্তির জন্য সে এমন কসম করেছে, যা থেকে সে তাওবা করে রবের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে আপনার ইচ্ছার ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে চায়।' তখন প্রশাসক বললেন, 'এ দায়িত্বের এমন নাজুকতা যদি আপনি বুঝে থাকেন, তাহলে আপনিই এর উপযুক্ত। কারণ আপনি কাসিমের চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান।' এরপর প্রশাসক তাঁকেই বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ দেন।
বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসক আবু আউন অনেক আলিমের সাথেও পরামর্শ করেছিলেন। আবদুর রহমান ইবনু হুজাইরাহকে আবদুল আজিজ ইবনু মারওয়ান বিচারকার্য পরিচালনায় নিয়োগ দিয়েছিলেন। ইবনু হুজাইরাহ ছিলেন একজন বিজ্ঞ ফকিহ।
**টিকাঃ**
[৩৭১] রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ গ্রন্থের দামিস্কে খলিফাদের বিচারক সংক্রান্ত আলোচনাটি দেখুন। অন্যান্য বিচারকদের তুলনায় খলিফার বিচারকদের বিশেষ কোনো স্বাতন্ত্র্য ছিল না। বিচারক নিযুক্তির ব্যাপারে তার কাছে কোনো ধরনের মতামতও জানতে চাওয়া হতো না। পক্ষান্তরে আব্বাসীয় যুগের অবস্থা ছিল ভিন্ন। (তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ৯৫; আল- কাম্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৫৯; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ২/২১৮: আবকারিয়্যাতুল ইসলাম, পৃ. ৪৪০)
[৩৭২] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/২০; আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/৭৭
[৩৭৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১৪১ ও ১৮১; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৯; আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ৪৬
[৩৭৪] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১৬
[৩৭৫] ইতিহাসে দুজন ইবনু হুবায়রার কথা জানা যায়। একজন হলেন উমর ইবনু হুবায়রা আল-ফাযারি। মৃত্যু ১১০ হিজরি। খলিফা ইয়াজিদ ইবনু আবদিল মালিক তাকে ইরাক এবং খোরাসানের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি কুফায় থাকতেন। (আল-আলাম: ৫/২৩১) আরেকজন ছিলেন উমর ইবনু হুবায়রার ছেলে ইয়াজিদ। মৃত্যু ১৩২ হিজরি। খলিফা মারওয়ান ইবনু মুহাম্মাদ ১২৮ হিজরিতে তাকে প্রশাসক নিযুক্ত করেন। তাকে দুই ইরাকের প্রশাসক বলা হতো। (আল-আলাম: ৯/২৪০)
[৩৭৬] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২০৬
[৩৭৭] আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্বাহ, পৃ. ৩১৪; আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২২৫
[৩৭৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/১৯৯; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৩৫। তারপর ফাদ্বালাহ বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুআবিয়া-এর খিলাফতকালেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। মুআবিয়া ও তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করে খাটলির একাংশ বহন করেছিলেন। ফাদ্বালাহ বাইয়াতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের সবার শেষে মৃত্যুবরণ করেন। মুআবিয়া শামের বাইরে গেলে তাঁকে নিজের স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে যেতেন। (আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২০১-২০২)
[৩৭৯] তাওবা ইবনু নামির ১১৫ হিজরিতে মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১২০ হিজরি সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালনরত ছিলেন। খলিফা হিশামের সময় তিনিই সর্বপ্রথম ওয়াকফ সম্পত্তি গ্রহণ করেন। (আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্বাহ, পৃ. ৩৪২, ৩৪৬ এবং ৩৪৭)
[৩৮০] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২৩১। কিনদি তার নাম খাইর ইবনু নুআইম আল-হাদরামি বলেছেন। ১২০ হিজরিতে তিনি মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সুয়ুতি তার নাম কখনো খাইর ইবনু নুআইম, আবার কখনো জাবর ইবনু নুআইম বলেছেন। ১৩৭ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়। (হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ১/২৯৯, ৫৫১)
[৩৮১] আখবারুল কুদ্ধাতি ওয়াল উলাহ: ২/২৩২; আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্বাহ, পৃ. ২৫৬
[৩৮২] আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/২৩২, ৩/১৩০
[৩৮৩] আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্ধাহ: ১/৩১৩; ওয়াফায়াতুল আইয়ান: ১/৩২৫; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৩৩
[৩৮৪] আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্ধাহ: ১/৩১৪
📄 বরখাস্তকরণ এবং স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
উমাইয়া যুগে বিচারকদের ব্যাপক রদবদল দেখা গিয়েছিল। বিচারকদের বরখাস্ত করা অথবা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ ছিল এর অন্যতম কারণ। এ ছাড়াও আরও অনেক কারণ ছিল।
পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি, প্রাদেশিক শাসকরা বিভিন্ন শহর এবং উপশহরে বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব পালন করতেন। এটাই ছিল বিচারকদের বরখাস্ত করা বা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার অন্যতম প্রধান কারণ। সে-সময় প্রাদেশিক শাসকরাও ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতো। কারণ তখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং প্রশাসনিকভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন হতো। বিভিন্ন দল এবং উপদলে বিপ্লবের উত্থান ঘটত। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল সাধারণ ঘটনা। এ কারণেই প্রশাসকদের রদবদল করা হতো। বিশেষত নতুন কোনো প্রশাসক আসলেই আগের বিচারককে বরখাস্ত করে নতুন বিচারক নিয়োগের প্রচলন ছিল। কখনো-সখনো আগের বিচারককে বহাল রাখা হতো।
কিন্দি বলেন, মারওয়ান ইবনু মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে হাওসারা ইবনু সুহাইল আল-বাহিলি মিশরে এল। তারা সেখানকার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের হত্যা করল। একপর্যায়ে বরখাস্ত করল বিচারক খাইর ইবনু নুআইমকে। হাসসান ইবনু আতাহিয়া তখন হাওসারাকে বললেন, 'আপনি তো হাদরামাউতের জন্য এই নেতা (অর্থাৎ খাইর ইবনু নুআইম) ছাড়া আর কাউকেই অবশিষ্ট রাখেননি। এখন তাকে শেষ করে দেওয়া মানে এই অঞ্চলকেই (উমাইয়াদের থেকে) বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।' হাওসারা অবশেষে খাইর ইবনু নুআইমকে বরখাস্ত করে তার জায়গায় আবদুর রহমান ইবনু সালিমকে নিয়োগ দিলেন।
সায়েব ইবনু হিশামের ইতিহাসে হাফিজ ইবনু হাজার লিখেন, 'মাসলামা ইবনু মাখলাদ তাকে মরক্কোর বিচারের দায়িত্বের পাশাপাশি মিশরের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বও প্রদান করেন। আর এটা ছিল সুলাইম ইবনু আনরের পর মুআবিয়া -এর যুগের ঘটনা। আর সুলাইমই ছিল সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যাকে মুআবিয়া এবং মাসলামা দুজনই নিয়োগ দিয়েছিলেন।' ইবনু হাজার আরও লিখেন, 'তারপর মাসলামার কাছে এ খবর পৌঁছল যে, সুলাইম বলেন, "আমিরের দরজায় যাওয়া বিচারকের উচিত নয়। বরং বিচারকের দরজায় আমিরের যাওয়া উচিত।" মাসলামা তখন সুলাইমকে বরখাস্ত করে দেয়।'
ওয়াকি বলেন, ১২৫ হিজরিতে হিশাম ইবনু আবদিল মালিক ইন্তেকাল করলে ওয়ালিদ ইবনু ইয়াজিদ ক্ষমতায় আসেন। তখন তিনি হিশাম ইবনুল ওয়ালিদকে শহরে প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করে সে জায়গায় ইউসুফ ইবনু খালিদকে নিয়োগ দেন। ইউসুফকে অবশ্য আগেই বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরে তাকে বরখাস্ত করেন। এভাবেই শহরে কোনো নতুন প্রশাসক নিয়োগ হলে তিনি নতুন বিচারক নিয়োগ দিতেন এবং সাবেক বিচারককে বরখাস্ত করতেন।
অনেক সময় বিচারকদের সাথে সম্পৃক্ত কিছু কারণেও বরখাস্ত করা হতো। যেমন উমর ইবন আবদিল আজিজ এক বিচারককে এজন্য বরখাস্ত করেছিলেন যে, মামলার মীমাংসার ক্ষেত্রে বাদী-বিবাদীর তুলনায় সে বেশি কথা বলত। কোনো ত্রুটি, সুন্নাহ এবং ইজমার বিরোধিতা, শরীয়তের বিধি-নিষেধ বা বিচারের নিয়ম অমান্য করা, আমানতদারিতার ব্যাপারে অভিযোগ, কিংবা অধিকাংশ জনগণের অভিযোগের কারণেও অনেক সময় বিচারককে বরখাস্ত করা হতো।
আবার বিচারকরাও অনেক সময় বিভিন্ন কারণে দায়িত্ব থেকে সরে যেতেন। যেমন বিচারপতি শুরাইহ বার্ধক্যজনিত কারণে হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের কাছে অব্যাহতি চেয়েছিলেন। উমাইয়া যুগে খাইর ইবনু নুআইম দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছিলেন। কারণ আমির মিশরের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের হত্যা করেন। আব্বাসীয় যুগেও তিনি আরও এক বার বিচারের দায়িত্ব থেকে সরে যান। কেননা তিনি অভিযোগের কারণে একজন সৈন্যকে বন্দি করেছিলেন। কিন্তু আমির সেই সৈন্যটিকে ছেড়ে দেয়। খাইর তখন সৈন্যটিকে পুনরায় বন্দি করার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। অবশেষে তার কথা মানা হচ্ছে না দেখে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যান।
বিচারক ইমরান ইবনু আবদিল্লাহরও এমনই একটি ঘটনা আছে। একবার তার কাছে সাক্ষ্য দেওয়া হয় যে, আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল মালিকের একজন মুনশি নেশা করেছে। তখন তিনি সেই মুনশির বিচার করতে চাইলে প্রশাসক আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল মালিক তাকে বাধা দেয়। তখন বিচারক ইমরান বলেন, 'বেশ, আমি বিচারের দায়িত্বও পালন করব না। আবার তাকে শাস্তিও দেবো না।' যে কথা সেই কাজ। তিনি বিচার তো করলেনই না; এমনকি বিচারের দায়িত্ব থেকেও সরে গেলেন।
**টিকাঃ**
[৩৮৫] আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্দাহ: ১/৩৫২
[৩৮৬] রাফউল ইসর আন কুদ্দাতি মিশর: ২/২৪৪; আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্বাহ: ১/৩১২
[৩৮৭] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৮৭। প্রশাসক রদবদল এবং শহরের বিচারক বরখাস্ত করার উদাহরণ দেখতে আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১১৪-১২০ দেখুন।
[৩৮৮] বিচারক বরখাস্ত করার ঐতিহাসিক উদাহরণ দেখতে নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআতি ওয়াত তারীখ, পৃ. ১৭০ দেখুন।
[৩৮৯] আখবারুল কুদ্দাহ: ২/৪০৮; নিযামুল হুকমি, পৃ. ১৭৯
[৩৯০] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ১৭৮; আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্বাহ, পৃ. ৩৫২
[৩৯১] নিযামুল হুকমি, পৃ. ১৭৮
📄 মসজিদ এবং অন্যান্য জায়গায় বিচার-সালিশ
অধিকাংশ ইসলামি শহরে বিচারের কার্যক্রম মসজিদেই পরিচালিত হতো। যেসব বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হতো, মসজিদেই তাদের শপথগ্রহণ হতো।
উমাইয়া যুগে বিচারকগণ অধিকাংশ বিচার জামে মসজিদে কিংবা মসজিদের মূল ফটকে করতেন। মদীনার বিচারক আবু বকর ইবনু হাযাম মসজিদেই বিচারের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তার কাছেই চাবুক হাতে প্রহরীরা দাঁড়ানো থাকত।
বিচারক ইয়াস বসরার বাজারে বিচার করতেন। আর এ ধরনের বিচার জামে মসজিদের বিচারের মতোই হতো।
বসরার অপর বিচারক আবু বুরদাহ তার বাসভবনে বিচার করতেন। শাবি বিচার করতেন কুফার জামে মসজিদে। সেখানেই শান্তি বাস্তবায়ন করতেন।
আবদুল্লাহ ইবনু নাওফ আত-তাইমি বিচার করতেন কুফার কেন্দ্রীয় মসজিদে। ইবনু আবি লাইলা মসজিদেই দণ্ডবিধি প্রয়োগ করতেন।
**টিকাঃ**
[৩৯২] আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/১৬৯; আল-কাদ্বাউল ইদারি, পৃ. ৪৬; আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১৪৫ ও ৩৩৯
[৩৯৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/৩২৮, ৪১২ এবং ৪১৪
[৩৯৪] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২৪
[৩৯৫] আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/১৩৫
📄 বিচারকের পদ থেকে দূরে থাকা
উমাইয়া যুগে আলিম এবং ফকিহদের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে বিরত থাকার বিষয়টি ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। এর পেছনে অনেক কারণ ছিল। গুরুত্বপূর্ণ দুয়েকটি কারণ এখানে উল্লেখ করা হলো:
১. রাজনৈতিক দিক: সে-সময় কিছু আলিম উমাইয়া-বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষণ করতেন। উমাইয়া যুগেই এ সকল আন্দোলনের উত্থান ঘটে। এ আন্দোলনের অনেক আহ্বায়ক তৈরি হয়। অনেক আলিম প্রত্যক্ষভাবে এসব আন্দোলনকে সমর্থন না করলেও এসবের প্রতি তারা একধরনের টান অনুভব করতেন। এগুলোর প্রতি তারা সংবেদনশীল ছিলেন। এ কারণেই তারা বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। যাতে তাদেরকে উমাইয়া প্রশাসনের লোক মনে করা না হয়। কেউ যাতে তাদেরকে প্রশাসনের সমর্থক না ভাবে। কিছু আলিম তো এমনও ছিলেন, সরকার-বিরোধী আন্দোলনের সাথে যাদের কোনো সম্পর্কই ছিল না, কিন্তু উমাইয়াদের কিছু রাজনৈতিক পলিসি নিয়ে তারা ছিলেন বেশ ক্ষুব্ধ। উমাইয়াদের কিছু রাজনৈতিক পলিসি ছিল রাশিদুন যুগের রাজনীতি থেকে আলাদা। যেমন, পরবর্তী শাসক নিযুক্ত করে যাওয়া। উমাইয়ারা ইসলামি রাজনীতির তুলনায় পার্থিব রাজনীতির দিকে একটু বেশিই ঝুঁকে পড়েছিল। নেককার পূর্বসূরিদের আদর্শের সাথে তাদের খুব বেশি মিল ছিল না। তাই আলিম সমাজ এবং উমাইয়া শাসকদের মাঝে একটি ফাটল তৈরি হয়েছিল। এসব কারণে তারা বিচারকের পদ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।
২. আধ্যাত্মিক দিক: এটাও ছিল আলিমদের বিরত থাকার অন্যতম কারণ। বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব কতটা নাজুক, আলিমরা সেটা বুঝতে পারতেন। এ ব্যাপারটিকে তারা ভীষণ ভয় করতেন। তারা মনে করতেন, এ এমন এক পরীক্ষা, যার পরিণাম তাদের অজানা। তাদের ভয় থাকত, পাছে জাহান্নামি বিচারকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান কি না! না-জানি জালিম আর অন্যায় বিচারক হতে হয়। কিংবা তারা মনে করতেন, সুচারুরূপে বিচারের দায়িত্ব পালন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। কারণ এ পথে রয়েছে প্ররোচনাদায়ক নানান জিনিস, কুপ্রবৃত্তির চাহিদা, ঘুস-সহ বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপের হাতছানি। এখানে শাসক এবং প্রশাসকের মুখোমুখি হতে হবে। সামাজিক সমালোচনার সামনে তারা টিকে থাকতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে মানুষ কেবল সে-সকল ন্যায়পরায়ণ বিচারকদেরই বরদাস্ত করে, যারা সকল শ্রেণির এবং সমস্ত স্তরের মানুষের মাঝে অকপটে শরীয়তের বাস্তবায়ন ঘটায় এবং বিচারের বিধান প্রয়োগ করে।
উমাইয়া যুগে আলিমগণের বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে বিরত থাকার অনেক দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বর্ণিত আছে। সেখান থেকে মাত্র কয়েকটা আমরা এখানে উল্লেখ করব।
১. আবদুল্লাহ ইবনু উতবা ইবনি মাসউদ আল-হুযালি: মুসআব ইবনুয যুবাইরের সময় তিনি ছিলেন কুফাবাসীদের বিচারক। আস্থাভাজন বিচারক হিসেবে সবাই তাকে চিনত। উমাইয়া যুগে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তাকে ডাকা হলে তিনি বিরত থাকলেন। তখন একজন লোক গোপনে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'তোমার কাছে আমার একটি প্রয়োজন আছে।' লোকটি জানতে চাইল, 'কী প্রয়োজন?' তিনি বললেন, 'তুমি এই অঙ্গারের মধ্যে একটি আঙুল রাখো তো দেখি।' লোকটি অবাক হয়ে বলল, 'সুবহানাল্লাহ, এ কী বলছেন আপনি!' তিনি বললেন, 'দুনিয়াতে একটি আঙুল বাঁচাতে তুমি কতটা সতর্ক। অথচ (দায়িত্ব নিলে) জাহান্নামে আমার গোটা শরীরই যে জ্বলবে!'
২. মুসাইয়াব ইবনু রাফেকে উমর ইবনু হুবাইরা: তাকে বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ডাকলে তিনি বললেন, 'বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করলে যদি তোমাদের মসজিদের এই চৌহদ্দি স্বর্ণে পরিণত হয়ে যায়, তবুও সেটা আমার কাছে পছন্দনীয় হবে না।'
৩. হাফ ইবনুল হারিস আল-ইয়ামানি: সিমনানি বর্ণনা করেন, হাফ ইবনুল হারিসকে খলিফা আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান বিচারের দায়িত্ব দিতে চাইলে তিনি অস্বীকৃতি জানান এবং বিরত থাকেন। তখন খলিফা তাকে আর জোরাজুরি করেননি।
৪. মাকহুল: তিনি ছিলেন তৎকালীন (১১৩ হিজরি) শামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ। বিচারকের পদ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, 'বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ অপেক্ষা আমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।' তিনি আরও বলেন, 'আমাকে যদি বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং আমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে যে-কোনো একটা বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে আমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়াটাই আমি পছন্দ করব।'
৫. হাইওয়া ইবনু শুরাইহ: ইয়াজিদ ইবনু হাতিম তাকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিল। তখন হাইওয়া সাফ জানিয়ে দেন-'আমি এটা পারব না। এখন আপনি যা ইচ্ছা করতে পারেন।' তখন ইয়াজিদ ইবনু হাতিম তাকে ছেড়ে দিয়ে আবু খুযাইমা ইবরাহীম ইবনু ইয়াজিদকে বিচারের দায়িত্ব দিলো। এই ঘটনার পর হাইওয়া সবসময় বলতেন, 'আবু খুযাইমা আমার চেয়ে উত্তম। তাকে পরীক্ষা করা হয়েছে। আর সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।' আবু খুযাইমার বিচারের দায়িত্ব গ্রহণের কারণ সম্পর্কে ওয়াকি বলেছেন, 'সালিহ ইবনু আলি নামক এক ব্যক্তিকে বিচারের দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারে আবু আউন পরামর্শ করলে তাকে তিনজন ব্যক্তির ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হলো। সেই তিনজন হলেন যথাক্রমে হাইওয়া ইবনু শুরাইহ, আবু খুযাইমা এবং আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস আল-গাসসানি। আবু খুযাইমাকে ইস্কান্দারিয়ায় ডেকে আনা হলো। বাকি দুজনকে ডাকা হলে তারাও এলেন। প্রথমে হাইওয়াকে দায়িত্ব দিতে চাওয়া হলে তিনি গ্রহণে অসম্মতি জানালেন। এরপর তাকে ভয় দেখানোর জন্য তরবারি এবং চামড়ার মাদুর আনা হয়। এটা দেখে হাইওয়া সাথে থাকা একটি চাবি বের করে বললেন, 'এটা আমার ঘরের চাবি। আমি তো আমার শেষ ঠিকানা জান্নাতের প্রতি আগ্রহী।' হাইওয়ার এমন দৃঢ়চেতা মনোভাব দেখে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। তখন হাইওয়া তাদের বলে দিলেন, 'তার অপর সঙ্গী দুজনের কাছে যেন তার অস্বীকৃতির বিষয়টি প্রকাশ না করা হয়। তাহলে আমি যা করেছি তারাও সেটাই করবে।' এভাবেই হাইওয়া বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে বেঁচে গেলেন। সুয়ূতি বলেন, তারপর আবু খুযাইমাকে ডেকে বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলা হলে তিনিও অসম্মতি প্রকাশ করেন। তখন তার সামনেও তরবারি এবং চামড়ার মাদুর আনা হলে তার অন্তর দুর্বল হয়ে যায়। এটা বরদাস্ত করতে না পেরে তিনি বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে নেন। ফলত তাকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। তারপর তিনি কর্মক্ষেত্রে চমৎকার দক্ষতার পরিচয় দিতে লাগলেন।
৬. আবু হানিফা : মারওয়ান ইবনু মুহাম্মাদ কর্তৃক নিযুক্ত ইরাকের প্রশাসক ছিল ইয়াজিদ ইবনু হুবায়রা। সে ইমাম আবু হানিফা -কে ডেকে বিচারের দায়িত্ব দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশ করেন। যার কারণে তাঁকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। এর কারণ সম্ভবত এটাও ছিল যে, যায়িদ ইবনু আলি ১২২ হিজরিতে কুফায় বনু উমাইয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। এই ঘটনার আগে আবু হানিফা -এর পক্ষ থেকে যায়িদ ইবনু আলির ব্যাপারে প্রশংসামূলক কিছু বক্তব্য পাওয়া গিয়েছিল। তাই ইবনু হুবায়রার ইচ্ছা ছিল, ইমাম আবু হানিফাকে উমাইয়াদের পক্ষ থেকে বিচারের দায়িত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা। এরপরও তাঁর অসম্মতি দেখে তাঁকে শাস্তিও দিয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা আবু হানিফা -এর সাথে বেশ কয়েকবার ঘটেছে। ১২৭ হিজরিতে আবদুল্লাহ ইবনু জাফরের নাতি আবদুল্লাহ ইবনু মুআবিয়া যখন উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, ইবনু হুবায়রা তখন আবু হানিফা -কে পুনরায় পরীক্ষা করে। একপর্যায়ে তাঁকে প্রহারও করা হয়। কারণ ইমাম আবু হানিফা যে বনু উমাইয়ার আদর্শ থেকে সরে গেছেন, সেটা ইবনু হুবায়রা ধরতে পেরেছিল। মূলত এটাই ছিল তাঁকে প্রহার করার কারণ। বিচারের দায়িত্ব প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে প্রহার করা হয়েছিল—বিষয়টি এমন নয়। আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ যখন আব্বাসীয় খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন ইমাম আবু হানিফার সাথে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সে-সময় কুফা ছিল এই আন্দোলনের বড় কেন্দ্র। সেখানেই আবুল আব্বাসের বাইয়াত সম্পন্ন হয়।
৭. আবদুর রহমান ইবনু আমর আল-আওযায়ি : তিনি ছিলেন শামের প্রখ্যাত ফকিহ। ইয়াজিদ ইবনুল ওয়ালিদ এক মজলিসে বসে তাঁকে বিচারের দায়িত্ব অর্পণ করে। তখন তিনি অব্যাহতি চাইলে তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে দেওয়া হয়।
প্রশাসকরা মুসলিম উম্মতের স্বার্থেই বড় বড় আলিমদের দায়িত্ব প্রদানে আগ্রহী ছিল। ন্যায়, ইনসাফ এবং সততা রক্ষার্থে প্রশাসকরা উম্মতের সূর্যসন্তান তথা ফকিহ এবং আলিমদের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করত।
**টিকাঃ**
[৩৯৬] আলিম এবং ফকিহদের বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি বিষয়ে আত-তুরাস পত্রিকার ৩য় বর্ষের ১১তম সংখ্যার ১৪০তম পৃষ্ঠায় আমাদের আলোচনা পড়ুন।
[৩৯৭] তবাকাতু ইবনি সাদ: ৬/১২০; আখবারুল কুদ্দাহ: ২/৪০২, ৪০৬
[৩৯৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/২৪
[৩৯৯] রাওদ্বাতুল কুদ্ধাহ: ৪/১৫০০
[৪০০] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/২৪; আল-আলাম: ৮/২১২
[৪০১] আখবারুল কুদ্দাঃ ৩/২৩২-২৩৩
[৪০২] হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ৩/১৩৯; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৭৪। পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি, ইয়াস প্রথমে দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি জানালেও পরে গ্রহণ করেছিলেন।
[৪০৩] তারীখু কুদ্দাতিল উনদুলুস, পৃ. ১১; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৭২; রাওদ্বাতুল কুদ্দাঃ ৪/১৪৯৭
[৪০4] আখবারুল কুদ্দাহ: ৩/২০৭