📄 উসমানের যুগের মোকদ্দমা
বিচারের ক্ষেত্রে উসমান-এর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল, ফয়সালার ক্ষেত্রে তিনি কেমন দূরদর্শী ছিলেন, আর কতটা সূক্ষ্মভাবে মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করতেন—তা বোঝানোর জন্য সংক্ষিপ্ত দুটো উদাহরণ এখানে পেশ করছি।
ক. হত্যার বিচার
খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পরপরই হত্যা-সংক্রান্ত বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব চলে আসে উসমান-এর সামনে। নিহত খলিফা উমর-এর হত্যা এবং তার বদলা সংক্রান্ত হওয়ায় বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নাজুক। আবু লুলু খাঁজবিশিষ্ট দোধারী বড় ছোরা দিয়ে উমর-কে তিনটি আঘাত করেছিল। ফলে তিনি শহীদ হয়ে যান। বিষয়টি কেবল আবু লুলুর মাঝে সীমাবদ্ধ না থাকায় সেটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে।
আবদুর রহমান ইবনু আবি বকর বলেন, 'উমর যেদিন ভোরে আক্রান্ত হন, তার আগের দিন সন্ধ্যায় আবু লুলুর পাশ দিয়ে আমি অতিক্রম করি। সে তখন জুফাইনা এবং হুরমুজানের সাথে গোপনে আলাপ করছিল। আমি তাদের কাছাকাছি হতেই তারা পালাতে শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের থেকে খাঁজবিশিষ্ট একটি দোধারী ছোরা মাটিতে পড়ে যায়।'
লোকেরা তখন দেখলেন, আবু লুলুর ব্যবহৃত ছোরাটি আবদুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত বিবরণের সাথে মিলে যায়। এতে উবাইদুল্লাহ ইবনু উমর বুঝে ফেলেন, তাঁর বাবার ওপর হামলার পেছনে আবু লুলু ছাড়াও জুফাইনা ও হুরমুজানের হাত রয়েছে। ফলে তখনই তরবারি হাতে বের হয়ে হুরমুজান, জুফাইনা ও আবু লুলুর মেয়েকে হত্যা করেন। তাঁর অবস্থা এমন হয়েছিল, যেন পারলে মদীনায় থাকা সমস্ত যুদ্ধবন্দিকেই তিনি হত্যা করে ফেলেন।
মুসলিমরা উবাইদুল্লাহ-এর কাজ মেনে নিতে পারছিলেন না। কারণ তাঁকে তো কিসাস গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ওপরন্তু এ কাজে কারা জড়িত—এ ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণও তাঁর কাছে ছিল না। তাই মুসলিমরা ক্ষুব্ধ হয়ে উবাইদুল্লাহকে বিশিষ্ট সাহাবি সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস-এর ঘরে বন্দি করে রাখেন। উসমান খলিফা হওয়ার পরপরই বিষয়টি তাঁর সামনে উত্থাপন করা হয়।
উসমান বিষয়টি নিয়ে সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করলে তাঁরা বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করলেন। অবশেষে খলিফা নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বললেন, বিবরণের ভিন্নতা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে দিয়ত কার্যকরের ফয়সালা হবে। রাষ্ট্র তথা তিনি নিজে নিহত তিনজনের অভিভাবক হিসেবে কিসাসের দাবি মওকুফ করে দিয়েছিলেন। অন্য বর্ণনামতে, আবু লুলুর মেয়ে এবং জুফাইনার কোনো উত্তরাধিকারী ছিল না। পক্ষান্তরে হুরমুজানের ছেলে কুমাজান থাকায় খলিফা তার পক্ষে কিসাসের হুকুম দিয়েছিলেন। পরে কুমাজান কিসাসের দাবি ছেড়ে রক্তপণ গ্রহণে সম্মত হয়ে যায়।
খ. মদপানের বিচার এবং ভাইয়ের ওপর হদ কায়েম
উসমান তাঁর ২৫ বছর বয়সি সৎভাই ওয়ালিদ ইবনু উকবা-কে কুফার প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি পাঁচ বছর সেখানকার দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন খলিফার অত্যন্ত স্নেহভাজন। কুফার দায়িত্বে থাকাকালীন অনেক বিজয়ের ব্যাপারেও তাঁর অবদান ছিল।
একবার কুফার সম্ভ্রান্ত পরিবারের কিছু যুবক সিঁধ কেটে একটি ঘরে ঢুকে। ঘরের মালিককে হত্যা করে। লোকেরা ঘেরাও করে যুবকদের ধরে ফেলে। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় প্রশাসক ওয়ালিদের কাছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে ওয়ালিদ তাদের বিষয়টি জানিয়ে খলিফার কাছে পত্র প্রেরণ করেন। এরপর খলিফার নির্দেশে কিসাসস্বরূপ তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এইসব যুবকের পক্ষের লোকেরা তখন বদলা নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা বলে, ওয়ালিদ মদপান করেছেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, ওয়ালিদ সত্যই মদপান করেছিলেন। তিনি ফজরের নামাজ চার রাকাত পড়িয়েছিলেন। আবার কারও মতে, তিনি সিজদায় গিয়ে বলছিলেন, 'তুমি নিজে পান করো। আমাকেও পান করাও।' যা-ই হোক, খলিফার কাছে অভিযোগ পৌঁছলে তিনি ওয়ালিদ-কে কুফা হতে ডেকে পাঠালেন। তাঁর বিপক্ষে একাধিক সাক্ষীও পাওয়া গেল। কিন্তু ওয়ালিদ কসম করে বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহর কসম করে বলছি, মূলত বদলা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই ওরা এমন সাক্ষ্য দিচ্ছে।'
উত্তরে খলিফা বললেন, 'কিছু করার নেই। আমরা তো কেবল অভিযোগ অনুসারে বিচার করি। কেউ মজলুম হলে আল্লাহ তার তরফ থেকে বদলা নেবেন। আর জালিমকে আল্লাহ শাস্তি দেবেন।' এই বলে তিনি সাঈদ ইবনুল আস-কে নির্দেশ দিলে তিনি মদপানের হদ (তথা দণ্ড) বাস্তবায়ন করেন। সৎভাই এবং প্রশাসক হওয়া সত্ত্বেও খলিফা দণ্ড বাস্তবায়নে কোনো ধরনের কসুর করেননি। অবস্থা অনুসারে সংগত কাজটিই তিনি করেছিলেন। মূলত তাঁর রায় ছিল বাহ্যিক অবস্থা অনুসারে। অন্তরের অবস্থা তো আল্লাহই ভালো জানেন।
টিকাঃ
[৩৪৭] সুনানুত তিরমিযি: ১৩২২
[৩৪৮] আল-হাকুল মুবিন ফী কাদ্বায়ি আমিরিল মুমিনীন, পৃ. ৩৯
[৩৪৯] সাক্ষী-প্রমাণের মাধ্যমে শরীয়তের বিচারকার্য পরিচালিত হয়। ওয়ালিদ ইবনু উকবা এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য পাওয়া যাওয়ায় তার ওপর হদ কায়েম করা হয়েছিল। - অনুবাদক
[৩৫০] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৮৪; আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২৬৩; ইতমামুল ওয়াফা, পৃ. ১৪৩
📄 আলির জামানার বিচারকগণ
আগের খলিফাগণ কর্তৃক নিযুক্ত যেসব বিচারক যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন, আলি তাদের স্বপদে বহাল রাখার পাশাপাশি নতুন বিচারক এবং প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিলেন। এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন,
শুরাইহ ইবনুল হারিস : ইনি আগে থেকেই কুফায় বিচারকার্য পরিচালনা করে আসছিলেন। আলি তাকে স্বপদে বহাল রাখেন এবং তার মাসিক ভাতা ৫০০ দিরহাম নির্ধারণ করেন।
আবু মুসা আশআরি : উসমান কর্তৃক নিযুক্ত কুফার প্রশাসক আবু মুসা আশআরি-কে আলি-ও বহাল রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁকে অপসারণ করেন।
মালিক ইবনুল হারিস আল-আশতার নাখায়ি : তিনি ছিলেন তৎকালীন অভিজাত শ্রেণির সদস্য এবং অন্যতম বাহাদুর যোদ্ধা। ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সিফফিনের যুদ্ধে তিনি আলি-এর সাথে ছিলেন। তার বাহাদুরির কারণে জয়ের পাল্লা তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পর আলি তাকে মিশরের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। তার সাথে দেওয়া ঐতিহাসিক পত্রটির কিছু অংশ আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। মিশর পৌঁছার আগে পথেই তার মৃত্যু হয়।
কুসাম ইবনুল আব্বাস : মদীনা মুনাওয়ারার প্রশাসক। ৩৭ হিজরিতে তিনি মক্কা এবং তায়েফের প্রশাসক ছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস : তিনি ছিলেন আলি-এর পক্ষ থেকে বসরার প্রশাসক। এক বর্ণনামতে, আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালি তখন বসরার বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। অন্য বর্ণনামতে, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বসরার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য আবদুর রহমান ইবনু ইয়াজিদ আল-হুদ্দানিকে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন আল-মুলাহহাব ইবনু সুফরার সৎভাই। আলি এবং মুআবিয়া -এর জামানার একটা সময় অবধি তিনি দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে যিয়াদ তাকে অপসারণ করে। আবু উবায়দা বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (বসরায়) ফতোয়া প্রদান এবং বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি বসরার বাইরে গেলে আবুল আসওয়াদকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। তখন তিনিই ফতোয়া প্রদান করতেন। সে-সময় বিচারককে মুফতি নামে অভিহিত করা হতো। হিজরি ৪০ সালে আলি নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবেই চলছিল। আবুল আসওয়াদ সূত্রে অনেক চমৎকার বিচারকার্যের বিবরণ পাওয়া যায়। আলি মদীনা থেকে বসরায় চলে যাওয়ার সময় আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস -কে সেখানকার প্রশাসক নিযুক্ত করে যান।
উবাইদুল্লাহ ইবনু মাসউদ: ইয়ামানের প্রশাসক এবং বিচারক।
জাদা ইবনু হুবায়রা, এরপর খালিদ ইবনু কুররা ছিলেন খোরাসানের প্রশাসক।
টিকাঃ
[৩৫১] রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৮৪; আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২৩৯
[৩৫২] তবাকাতু ইবনি সাদ: ৩/২১৩; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৩৪; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ২৩
[৩৫৩] তারীখুত তবারি: ৩/৫৪৬ ও ৪/৬৯
[৩৫৪] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/২৮৮-২৮৯
[৩৫৫] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/২৮৮
📄 আলির মোকদ্দমার উদাহরণ
সাহাবিদের মাঝে আলি ছিলেন বিচারকার্যে সর্বাধিক পারদর্শী। নববি যুগে এই দায়িত্বরত থাকার পাশাপাশি আবু বকর, উমর এবং উসমান -এই তিন খলিফার সময়কালে এই কাজের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। নিজের খিলাফতকালেও মোকদ্দমার নিষ্পত্তি এবং ফয়সালা প্রদানের কাজ করে গেছেন। বিচার-সংক্রান্ত বেশ কিছু মূল্যবান পত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক নির্দেশনা তাঁর পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর পরিচালিত বিচারকার্যের সংখ্যা অনেক। যার প্রতিটিই অন্তর্দৃষ্টি, অভিজ্ঞতা, গবেষণালব্ধ অভিমত এবং বিচারিক নীতিমালায় সমৃদ্ধ। আমরা সেসবের একাংশ, বিশেষভাবে সংক্ষিপ্ত কিছু উদাহরণ এখানে উল্লেখ করব। সেগুলোর অভিনবত্ব, স্বয়ং আলি -এর নিরীক্ষণ ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা এবং দক্ষতা দেখে আমরা যেমন মুগ্ধ হব, তেমনি অসংখ্য উপকারিতা আর বিধান আমাদের জানা হয়ে যাবে।
ক. রজম-সংক্রান্ত মোকদ্দমা
শাবি বলেন, শুরাহাহ নামক এক মহিলার স্বামী শামের বাইরে ছিল। এমতাবস্থায় মহিলাটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। তার অভিভাবক তখন আলি -এর কাছে এসে বলে, শুরাহাহ তো ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি দিয়েছে। আলি তখন বৃহস্পতিবারে মহিলাটিকে বেত্রাঘাত করালেন এবং শুক্রবারে রজমের শাস্তি দিলেন। মহিলাটিকে নাভি অবধি গর্তে পুঁতে নেওয়া হয়েছিল, যা আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। তারপর আমিরুল মুমিনীন বলেন, ‘রাসূল রজমের নীতি প্রবর্তন করেছেন। এ ধরনের মোকদ্দমার ব্যাপারে কেউ যদি সাক্ষ্য দেয়, তাহলে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তাকেই প্রথমে অভিযুক্ত করা হবে। এরপর তার দ্বিতীয়বার সাক্ষ্য গ্রহণ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হবে। তবে এ ক্ষেত্রে আমি ফয়সালা করেছি মহিলাটির স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে। তাই আমিই সর্বপ্রথম তাকে রজম করব।’ বর্ণনাকারী বলেন, এই বলে তিনি একটি পাথর নিক্ষেপ করলেন। এরপর লোকেরা পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। আমিও তাদের মাঝে ছিলাম। অন্য বর্ণনমতে আলি বলেছিলেন, ‘কুরআনের বিধান অনুযায়ী মহিলাটিকে বেত্রাঘাতের এবং রাসূল -এর সুন্নাহ অনুযায়ী তাকে রজমের শাস্তি দিয়েছি।’
বিচারের এই ফয়সালাটি ছিল একান্তই আলি -এর গবেষণামূলক। এর অনুসরণ করা যাবে কি না, তা নিয়ে ফকিহগণ মতবিরোধ করেছেন। তবে অধিকাংশ ফকিহ-ই এক ব্যক্তিকে বেত্রাঘাত এবং রজম—উভয়টি না করার কথা বলেছেন।
খ. হত্যা-সংক্রান্ত মোকদ্দমা
একবার এক লোককে ধ্বংসস্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। লোকটির হাতে ছিল একটি রক্তমাখা ছুরি। তার সামনে পড়ে ছিল নৃশংসভাবে হত্যা করা একটি মৃতদেহ। দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিই তাকে হত্যা করেছে।
টহলরত পুলিশেরা দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে আমিরুল মুমিনীন আলি -এর কাছে নিয়ে এল। সব শুনে খলিফা লোকটিকে জিজ্ঞাসা করতেই সে হত্যার কথা স্বীকার করল। অগত্যা তিনি লোকটিকে কিসাসস্বরূপ হত্যার নির্দেশ দিলেন।
লোকটিকে হত্যার জন্য উন্মুক্ত স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো। হঠাৎ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল এক লোক। ‘না, না, একে হত্যা করবেন না। নিহত লোকটিকে আমিই খুন করেছি।’—বলতে লাগল লোকটি। খলিফার সামনে এসে লোকটি বলল, ‘আমিরুল মুমিনীন! আসলে নিহত লোকটিকে আমিই খুন করেছি।’
কিসাসের আদেশ মুলতুবি করলেন খলিফা। এরপর প্রথম লোকটিকে বললেন, ‘ব্যাপার কী বলো তো? হত্যা না করেও দায় নিলে কেন?’
লোকটি বলল, ‘এ ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না। নিহত লোকটির সামনে রক্তাক্ত ছুরি হাতে আমিই যে দাঁড়ানো ছিলাম। ধ্বংসস্তূপের কাছে আর কেউ তো ছিল না। এমতাবস্থায় অস্বীকার করলেও আমার কথা কেউ বিশ্বাস করত না। তাই টহল পুলিশ আমাকে দায়ী করলে আমি সব মেনে নিয়েছি। ভেবেছি, আর কেউ না জানলেও আল্লাহ তো জানেন সত্যটা কি।'
আমিরুল মুমিনীন বললেন, 'তুমি কাজটা ভালো করোনি। এবার আসল ঘটনাটা খুলে বলো তাহলে।'
লোকটি বলল, 'আমি একজন কসাই। ভোররাতে দোকানে গিয়ে গরু জবাই করে চামড়া ছাড়াচ্ছিলাম। এমন সময় আমার প্রস্রাবের ভীষণ চাপ আসে। তাই হালকা হওয়ার জন্য কাছের ধ্বংসস্তূপটিতে যাই। কাজ সেরে সেখান থেকে দোকানে ফেরার জন্য বের হয়েই আমি লাশটি দেখতে পাই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করা যায় সেটাই ভাবছিলাম। এমন সময় টহল পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে আসে। সবাই আমার দোষ দিতে থাকে। এরপরের ঘটনা তো আপনি ভালো করেই জানেন।'
এরপর আলি দ্বিতীয় লোকটিকে জবানবন্দি দিতে বলেন। সে বলল, 'শয়তানের প্ররোচনায় মৃত লোকটির সম্পদের লোভে পড়ে আমি লোকটিকে হত্যা করে ফেলি। টহল পুলিশের আওয়াজ শুনে লাশটি আমি সেখানেই ফেলে রেখে সটকে পড়ার চেষ্টা করছিলাম। এমন সময় কসাইটিকে ধ্বংসস্তূপের কাছে দেখতে পেয়ে আমি সেখানেই লুকিয়ে পড়লাম। আমার সামনেই টহল পুলিশ বেচারা কসাইটিকে আপনার সামনে ধরে নিয়ে আসে। তারপর আপনিও কিসাসের ফয়সালা দিয়ে দিলেন। ফয়সালা বাস্তবায়নের সময় আমার মনে হলো, আমি তো এমনিতেই একজনের খুনি। আমার চোখের সামনেই নিরপরাধ একজন মানুষের জীবন এখন চলে যাচ্ছে। কিন্তু যেদিন আল্লাহ তাআলার সামনে আমাকে হাজির করা হবে, সেদিন আমি কী জবাব দেবো—এই ভেবে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না।'
আলি তখন হাসান-এর মতামত জানতে চাইলেন। হাসান বললেন, 'আমিরুল মুমিনীন! খুনি লোকটি একজনকে হত্যা করলেও আরেকজন নিরপরাধের প্রাণ সে বাঁচিয়েছে। আর কুরআনে এসেছে,
وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
'পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি একটি মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছে, সে যেন গোটা মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করেছে।'
মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনরা রক্তপণ নিতে সম্মতি প্রকাশ করলে খলিফা তখন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তা পরিশোধ করে দিলেন। এর মাধ্যমে অপরাধীকেও মাফ করে দেওয়া হলো।
গ. উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত মোকদ্দমা
একবার বিচারক শুরাইহের কাছে দুজন লোক একজন মহিলার উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের ব্যাপারে উপস্থিত হলো। লোক দুজনের একজন ছিল মহিলার স্বামী, আর অপরজন ছিল তার সৎভাই। উভয়েই আরেক সম্পর্কের দিক থেকে ছিল মহিলাটির চাচাতো ভাই। শুরাইহ তখন ফয়সালা দিলেন, মহিলার স্বামী অর্ধেক সম্পত্তি পাবে। আর তার সৎভাই পাবে অবশিষ্ট সম্পদ।
লোক দুটি তখন আলি (রা)-কে বিষয়টি জানালে তিনি শুরাইহকে ডেকে পাঠালেন। শুরাইহ উপস্থিত হলে খলিফা বললেন, 'এমন ফয়সালা কি তুমি কুরআনের ভিত্তিতে করেছ, না সুন্নাহর ভিত্তিতে?' শুরাইহ বললেন, 'কুরআনের ভিত্তিতে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَبِ اللَّهِ
আল্লাহর বিধান অনুযায়ী আত্মীয়রা পরস্পর অধিক ঘনিষ্ঠ। তাই, ফয়সালাটি কি এমন হবে না?'
আলি (রা) তখন ফয়সালা দিলেন এভাবে: মহিলার স্বামী পাবে অর্ধেক সম্পত্তি। তার ভাই পাবে এক-ষষ্ঠাংশ। আর অবশিষ্ট সম্পত্তি উভয়ের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হবে।
কুরআন এবং হাদিসে যাবিল ফুরূয এবং আসাবার অংশের ব্যাপারে যে বর্ণনা এসেছে—তার বিরোধী হওয়ায় আলি (রা) আগের ফয়সালাটি রদ করে দিয়েছিলেন। কুরআনের ভাষ্যমতে, মৃত-মহিলার স্বামী পাবে সম্পত্তির অর্ধেক এবং ভাই পাবে এক-ষষ্ঠাংশ। আর হাদিস অনুসারে চাচাতো ভাই আসাবা হিসেবে অবশিষ্ট সম্পত্তি পাবে।
ঘ. জটিল মোকদ্দমা
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত, একবার আমিরুল মুমিনীন উমর (রা) -এর কাছে এমন এক জটিল মোকদ্দমা আসলো, যার কারণে তিনি হয়রান হয়ে গেলেন। কিন্তু ফয়সালা দেওয়া তাঁর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হলো না। অবশেষে সাহাবিদের ডেকে বিষয়টি উল্লেখ করে পরামর্শ চাইলেন। সাহাবিরাও এ ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করে খলিফার কাছেই দায়িত্ব অর্পণ করলেন। তখন উমর বললেন, 'একজন বিজ্ঞ ব্যক্তিকে আমি চিনি। আমার মনে হয় তার পক্ষেই কেবল এ মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করা সম্ভব।'
সাহাবিরা বুঝে গেলেন, খলিফা কার কথা বলছেন। আমিরুল মুমিনীন বললেন, 'চলো, আমরা আলির কাছে যাই।' সাহাবিরা বললেন, 'আপনি কষ্ট করে কেন যাবেন? বরং তিনিই এখানে আসবেন।' খলিফা বললেন, 'এ কেমন কথা! তিনি বনু হাশিমের লোক। নবি-পরিবারের সদস্য। তাঁর রেখে যাওয়া ইলমের ধারক। তিনি কেন আসবেন? তার কাছেই বরং আমাদের যাওয়া উচিত।' সবাই মিলে আলি-এর কাছে পৌঁছে দেখলেন, তিনি একটি বাগানের মাঝে বসে বারংবার নিচের আয়াতটি পড়ছেন আর কাঁদছেন।
أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى
মানুষ কি মনে করে তাকে এমনিই ছেড়ে দেওয়া হবে?
উমর তখন সাথে থাকা শুরাইহকে বললেন, 'বিষয়টি আমাদের যেভাবে শুনিয়েছ সেভাবেই আলিকে শোনাও।' তখন শুরাইহ বললেন, 'আমি বিচারের মজলিসে বসা ছিলাম। এমন সময় এই লোকটি এসে আমার কাছে বলল, একজন লোক নাকি তাকে দুজন গর্ভবতী মহিলার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিল। মহিলা দুজনের একজন স্বাধীন, আর অপরজন দাসী। এরপর একরাতে দুজন মহিলাই সন্তান প্রসব করে। একজনের গর্ভ থেকে জন্ম নেয় ছেলে, আরেকজনের মেয়ে। কিন্তু পরবর্তীকালে দুজন মহিলাই পুত্র-সন্তান জন্ম দেওয়ার দাবি করে।'
শুরাইহ এ পর্যন্ত বলার পর আলি বললেন, 'তখন তুমি কী ফয়সালা করলে?' শুরাইহ বললেন, 'আমি ফয়সালা করতে পারিনি বলেই তো এখানে তাদের নিয়ে এসেছি।' আলি তখন একটি খড় তুলে নিয়ে বললেন, 'বিষয়টি তো এর থেকেও সরল।'
এই বলে তিনি দুটি পেয়ালা আনালেন। মহিলা দুজনের হাতে পেয়ালা দুটি দিয়ে বললেন, 'তোমরা দুজনেই আড়ালে গিয়ে যার যার পেয়ালায় নিজের বুকের দুধ নিয়ে এসো।'
মহিলা দুজন তা-ই করল। পেয়ালা দুটো বিচারক আলি-এর সামনে রাখা। ভালো করে লক্ষ করে দেখলেন তিনি। যে পেয়ালায় দুধ কম—তার মালিককে ডেকে কন্যা-সন্তানটি দিলেন। আর যে পেয়ালায় দুধ বেশি—তার মালিককে বললেন, 'পুত্র-সন্তানটি তোমার।'
বিচারের রায় শুনে খলিফা-সহ সবাই অবাক। কেউ কিছুই বুঝতে পারছেন না। শেষে বিচারক আলি নিজেই শুরাইহকে বললেন, 'মেয়ে-সন্তানের চেয়ে পুত্র-সন্তানের জন্য (মায়ের বুকে) যে বেশি দুধ আসে, তা বুঝি তুমি জানো না? উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে একজন ছেলে তো দুজন মেয়ের সমান হিস্যা পায়। বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে মেয়ের বুদ্ধি ছেলের বুদ্ধির অর্ধেক। সাক্ষ্যের ক্ষেত্রেও দুজন মহিলার সাক্ষ্য তো একজন পুরুষের সমান। মেয়েদের রক্তপণ ছেলেদের রক্তপণের অর্ধেক হয়ে থাকে। সুতরাং বোঝা গেল, মহিলা সর্বক্ষেত্রেই পুরুষের অর্ধেক হিস্যার অধিকারী।'
আলি-এর এমন সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে যারপরনাই মুগ্ধ হলেন খলিফা উমর। তিনি বলে উঠলেন, 'হাসানের বাবা! আল্লাহ যেন আমাকে এমন পরিস্থিতিতে না ফেলেন, যা আমি সামাল দিতে পারব না। আর আপনি নেই—এমন দেশে আল্লাহ যেন আমাকে না রাখেন।'
ঙ. দুধ সম্পর্কিত বোনের মাহর
এক ব্যক্তি এক মহিলাকে বিবাহ করে তার মাহর নগদ পরিশোধ করল। সহবাস করার আগে সে লক্ষ করল, নববধূ আসলে তারই দুধবোন। বিষয়টি আলি ২-এর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তাদের দুজনকে তিনি পৃথক হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। এরপর মহিলাটিকে তার মাহর হিসেবে পাওয়া সম্পদ ফিরিয়ে দিতে বললেন।
আলি-এর বিচার-সংক্রান্ত উদাহরণের এখানেই ইতি টানছি। খোঁজ করলে ইতিহাসের পাতায় আরও অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। তদ্রূপ তাঁর নিযুক্ত বিচারকদের পরিচালিত বিচারকার্যের উদাহরণও ইতিহাসে অনেক আছে। সেখান থেকে কেবল একটি নমুনা উল্লেখ করেই আমরা এই আলোচনা সমাপ্ত করব।
শাবি বলেন, আলি একবার তাঁর বর্মটি হারিয়ে ফেললেন। কিছুদিন পর সেটি এক খ্রিষ্টানের কাছে দেখলেন। আলি তখন নিজের বর্মটি চাইলে সে বলল, 'এটি আমার বর্ম এবং আমার দখলেই তা রয়েছে।' অগত্যা বিষয়টি মীমাংসার জন্য তারা দুজন বিচারক শুরাইহের কাছে গেলেন।
সেখানে পৌঁছে আলি বিচারককে বললেন, 'এই বর্মটি আমার। আমি সেটা বিক্রিও করিনি, আর কাউকে হাদিয়াও দিইনি।' এবার খ্রিষ্টানটি বলল, 'আমিরুল মুমিনীনকে আমি মিথ্যাবাদী বলব না, তবে বর্মটি আমারই।' বিচারক শুরাইহ তখন আলি -এর কাছে প্রমাণ চাইলে তিনি হেসে ফেললেন। বললেন, 'শুরাইহ ঠিক কাজই করেছেন। আমার কাছে তো কোনো প্রমাণ নেই।'
অবশেষে শুরাইহ খ্রিষ্টানের পক্ষে রায় দিলে বর্মটি নিয়ে সে রওনা হয়ে গেল। কিন্তু কয়েক পা হেঁটেই আবার ফিরে এসে বলল, 'শুনে রাখুন! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, এটাই নবিগণের বিধান এবং শিক্ষা। আমিরুল মুমিনীন আমাকে বিচারকের কাছে নিয়ে গেছেন, আর বিচারক তার বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর কসম করে বলছি, হে আমিরুল মুমিনীন! এটা আপনারই বর্ম। আপনি যখন সিফফিনে যাচ্ছিলেন, তখন আপনার বাহিনীর পেছনেই আমি ছিলাম। আপনার মেটে রঙের উটের ওপর থেকে বর্মটি পড়ে গেলে আমি তা তুলে নিই।' আলি বললেন, 'বেশ, তুমি যখন মুসলিম হয়ে গেছ, তাহলে এটি এখন থেকে তোমার।' তারপর নওমুসলিমটিকে একটি ঘোড়ায় চড়িয়ে তাকে বিদায় জানালেন।
টিকাঃ
[৩৫৬] নায়লুল আওতার: ৭/৯১ এবং ১১৪
[৩৫৭] নায়লুল আওতার: ৭/৯৬ এবং ৯৭; আল-মুগনি: ৯/৩৭
[৩৫৮] সূরা মায়িদা, ৫: ৩২
[৩৫৯] আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৫৬; আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২৫১
[৩৬০] সূরা আহযাব, ৩৩: ৬
[৩৬১] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২৫৬
[৩৬২] কুরআনে মৃত ব্যক্তির যেসব আত্মীয়ের প্রাপ্য নির্ধারিত হিস্যা বলে দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে ‘যাবিল ফুরূয’ বলা হয়। এদের সংখ্যা ১২ জন। যাবিল ফুরূযেরা নির্দিষ্ট অংশ নেয়ার পর অবশিষ্ট অংশ যারা পায়, তাদেরকে ‘আসাবা’ বলা হয়। কোনো মৃত ব্যক্তির ‘যাবিল ফুরুষ’ না থাকলে সম্পূর্ণ ত্যাজ্য সম্পত্তি আসাবাদের মাঝে বণ্টিত হয়।
[৩৬৩] সূরা কিয়ামাহ, ৭৫: ৩৬
[৩৬৪] তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১৯৫
[৩৬৫] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৯৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৮/২
[৩৬৬] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া : ৮/৪