📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উমরের যুগের মোকদ্দমা

📄 উমরের যুগের মোকদ্দমা


উমর -এর খিলাফতকাল দীর্ঘ হওয়ায় সে-সময় ইসলাম দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিচারকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের কাছে আসা মোকদ্দমার সংখ্যাও ছিল অনেক। এ কারণেই ইতিহাসের পাতায় উমর -এর যুগে বিচারের অনেক উদাহরণ দেখা যায়। সাহাবিদের মাঝে আলি ইবনু আবি তালিব আর আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ এবং তাবিয়িদের মাঝে শুরাইহ আর কাব ইবনু সুর, সহ অনেকের বিচার ছিল এই উমর -এর যুগে। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি ঘটনা এখানে আমরা উল্লেখ করব।
ক. নিষিদ্ধ বিবাহ
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব এবং সুলাইমান ইবনু ইয়াসার সূত্রে বর্ণিত, তুলাইহা ছিলেন রুশাইদ সাকাফির স্ত্রী। ঘটনাক্রমে রুশাইদ তার স্ত্রীকে তালাক দিলেন। তারপর তুলাইহা ইদ্দতের মাঝেই নতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেলেন। এ খবর খলিফা উমর-এর কাছে গেলে তিনি তুলাইহা এবং তার স্বামীকে কয়েকটি বেত্রাঘাত করলেন এবং দুজনকে পৃথক করে দিলেন। এরপর তিনি বললেন, 'যে মহিলা তার ইদ্দতের মধ্যে বিবাহ করেছে, বিবাহকারীর সাথে তার সহবাস না হয়ে থাকলে দুজনকে পৃথক করে দেওয়া হবে। এরপর মহিলাটি প্রথম স্বামীর অসম্পূর্ণ ইদ্দত পূর্ণ করবে। দ্বিতীয় স্বামী তারপর মহিলাটিকে স্বাভাবিক নিয়মে বিবাহের প্রস্তাব দিবে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে মহিলার সহবাস হয়ে থাকলেও দুজনকে পৃথক করে দেওয়া হবে। এরপর মহিলাটি তার প্রথম স্বামীর অবশিষ্ট ইদ্দত পূর্ণ করবে। তবে এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্বামী আর কখনোই মহিলাটিকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে না।'
খ. হত্যায় জড়িতদের কিসাস
কায়স ইবনু সালাবা গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনু উমাইরাহ বলেন, সানআর এক লোক প্রতি বছর প্রতিযোগিতা করত। একবার সে প্রতিযোগিতা থেকে ফিরে দেখে, তার বাঁদি সাতজন লোকের সাথে মদপান করছে। মাতালগুলো লোকটিকে হত্যা করে ফেলল। একপর্যায়ে বিষয়টি খলিফার কাছে উত্থাপিত হলো। তখন তিনি লিখে পাঠালেন, 'সাতজনের প্রত্যেকেরই, এমনকি বাঁদিটির ওপরও কিসাস কায়েম করো। সানআর সমস্ত লোকও যদি এই ব্যক্তিকে হত্যার কাজে জড়িত থাকত, তাহলে সবার ব্যাপারেই আমি কিসাসের ফয়সালা দিতাম।'
গ. ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের দায়
উমর একবার জনৈক ব্যক্তি থেকে দেখেশুনে একটি ঘোড়া কিনলেন। তারপর ঘোড়ার পিঠে চড়ে নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর ঘোড়াটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে লাগল। উমর তখন দেরি না করে সরাসরি বিক্রেতার কাছে ফিরে এসে তাকে বললেন, 'তোমার ঘোড়া তুমি ফিরিয়ে নাও; এটা তো ত্রুটিযুক্ত।'
বিক্রেতা বলল, 'আমিরুল মুমিনীন! আমি ঘোড়াটি ফেরত নেবো না। কারণ আপনি তো সেটা সুস্থ-সবল অবস্থাতেই আমার থেকে কিনে নিয়েছিলেন।'
এভাবে দুজনের মাঝে মতানৈক্য হলে খলিফা বললেন, 'বেশ, তাহলে তোমার এবং আমার মাঝে সমাধানের জন্য একজন সালিশ নির্ধারণ করো।' বিক্রেতা বলল, 'ঠিক আছে, শুরাইহ আমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেবেন।'
এরপর তারা উভয়েই বিচারক শুরাইহের কাছে গিয়ে তাকে পূর্ণ ঘটনার বিবরণ দিলেন। ঘোড়ার মালিকের অভিযোগ শুনে শুরাইহ খলিফাকে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি কি ঘোড়াটি সুস্থ-সবল অবস্থায় কিনেছিলেন?' উমর তখন হাঁ-বাচক জবাব দিলে বিচারক বললেন, 'আমিরুল মুমিনীন! ঘোড়াটি ফেরত দিতে হলে যে অবস্থায় নিয়েছিলেন সে অবস্থাতেই দিতে হবে।'
খলিফা তখন শুরাইহের অপূর্ব ফয়সালায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এরপর তাকে সরকারি বিচারক নিযুক্ত করে কুফায় প্রেরণ করেন।

টিকাঃ
[৩৩৪] আল-হাক্কুল মুবিন ফী কাদ্বায়ি আমিরিল মুমিনীন, পৃ. ২১ দ্রষ্টব্য
[৩৩৫] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ১৫৮ দ্রষ্টব্য।
[৩৩৬] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/২২৭; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩০ এবং তরফাতুন ফিল কাদ্বা দ্রষ্টব্য।
[৩৩৭] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/২৭৫; আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ১৬৮ দ্রষ্টব্য।
[৩৩৮] মুওয়াত্তা, পৃ. ৩৩১; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৭৮
[৩৩৯] সুনানুদ দারাকুতনি: ৩/২০২; ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/২৫৪; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১৭৮
[৩৪o] আখবারুল কুদ্দা : ২/১৯৮; আল-কাদ্বাউ ফিল ইসলাম, পৃ. ৯৫; ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন : ১/১১

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উসমানের জামানার বিচারকগণ

📄 উসমানের জামানার বিচারকগণ


উমর কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক এবং বিচারকদের অনেকেই উসমান -এর খিলাফতকালে দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। এর বাইরে আরও অনেককেই উসমান নতুনভাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখানে আমরা তাঁদের একাংশের বিবরণ প্রদান করব।
আবুদ দারদা উওয়াইমির ইবনু মালিক। উসমান -এর খিলাফতকালে তিনি ছিলেন দামেস্কের বিচারক। উসমান -এর খিলাফতকাল সমাপ্তির দুই বছর আগে তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।
নাফে ইবনু আবদিল হারিস। উমর -এর যুগে তিনি মক্কার প্রশাসক এবং বিচারক ছিলেন। উসমান -ও তাঁকে স্বপদে বহাল রেখেছিলেন।
সুফইয়ান ইবনু আবদিল্লাহ। উমর -এর যুগে তায়িফের প্রশাসন এবং বিচারের দায়িত্বে থাকা এই সাহাবিকে উসমান -ও বহাল রাখেন।
আবু মূসা আশআরি। নববি যুগে এবং আবু বকর -এর খিলাফতকালে তিনি ছিলেন ইয়ামানের প্রশাসক। পরবর্তীকালে উমর তাঁকে বসরার প্রশাসক নিযুক্ত করেন। প্রথমে বসরা এবং কুফা—উভয় স্থানেরই প্রশাসক ছিলেন। পরবর্তীকালে কেবল বসরার দায়িত্ব পালন করেন। উসমান তাঁকে প্রথমে বসরার দায়িত্বে বহাল রাখলেও পরে কুফার প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু আমির। আবু মূসা আশআরি-এর পর তিনি বসরার প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন।
দামিস্কের প্রশাসক মুআবিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান।
মিশরের প্রশাসক আমর ইবনুল আস।
মিশরের প্রশাসক আবদুল্লাহ ইবনু সাদ। উসমান -এর যুগে তিনি আফ্রিকা জয় করেন। পরবর্তীকালে আসকালান-এ বসবাস করতে থাকেন। ৩৬ হিজরিতে সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়।
উসমান ইবনু কায়স ছিলেন মিশরের বিচারক। আমিরুল মুমিনীন উসমান ইবনু আফফান-এর শাহাদাতের পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর মুআবিয়া-এর খিলাফতের আগ পর্যন্ত মিশরে স্বতন্ত্র কোনো বিচারক ছিলেন না।
কাদিসিয়্যাহর বিজয়ী সেনাপতি সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস। কুফাতে উমর কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক। উসমান তাঁকে প্রথমে বহাল রাখলেও পরবর্তীকালে অপসারণ করেন। তখন তিনি মদীনায় ফিরে আসেন। হিজরি ৫৫ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। সাদ-কে অপসারণের পর ওয়ালিদ ইবনু উকবা -কে সে পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁকেও অপসারণ করে সেখানে সাঈদ ইবনুল আস-কে নিয়োগ দেন।
আমিরুল মুমিনীন উসমান -এর অভ্যাস ছিল বিচারের ব্যাপারে আলি -এর সাথে পরামর্শ করা। এ ছাড়া তালহা ইবনু উবাইদিল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনু আউফও ছিলেন তাঁর জুরিবোর্ডের সদস্য। মোকদ্দমা, দাবি-দাওয়া এবং বিধানের ব্যাপারে তাঁদের মতামত নিতেন। আবার আলি নিজেও বিচার করতেন। এ সময় আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ কুফায় বিচারকার্য পরিচালনা করে আসছিলেন। যায়িদ ইবনু সাবিত অনেক সময় মদীনায় বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। আর উবাদা ইবনুস সামিত-এর দায়িত্ব ছিল ফিলিস্তিন এবং শামে বিচারকার্য পরিচালনা করা।
খলিফার পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ইবনু উমর যে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করা থেকে বিরত ছিলেন—সে কথা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি।

টিকাঃ
[৩৪১] কুদ্দা তু দিমাশক, পৃ. ২; আল-ইসাবাহ : ৫/৪৬; তাহযীবুল আসমা : ২/২২৮
[৩৪২] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/২৭৪
[৩৪৩] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২১te; আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্বাহ, পৃ. ১১
[৩৪৪] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ২০২-২০৩
[৩৪৫] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২১৪
[৩৪৬] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২১৫-২১৬

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উসমানের যুগের মোকদ্দমা

📄 উসমানের যুগের মোকদ্দমা


বিচারের ক্ষেত্রে উসমান-এর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল, ফয়সালার ক্ষেত্রে তিনি কেমন দূরদর্শী ছিলেন, আর কতটা সূক্ষ্মভাবে মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করতেন—তা বোঝানোর জন্য সংক্ষিপ্ত দুটো উদাহরণ এখানে পেশ করছি।
ক. হত্যার বিচার
খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পরপরই হত্যা-সংক্রান্ত বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব চলে আসে উসমান-এর সামনে। নিহত খলিফা উমর-এর হত্যা এবং তার বদলা সংক্রান্ত হওয়ায় বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নাজুক। আবু লুলু খাঁজবিশিষ্ট দোধারী বড় ছোরা দিয়ে উমর-কে তিনটি আঘাত করেছিল। ফলে তিনি শহীদ হয়ে যান। বিষয়টি কেবল আবু লুলুর মাঝে সীমাবদ্ধ না থাকায় সেটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে।
আবদুর রহমান ইবনু আবি বকর বলেন, 'উমর যেদিন ভোরে আক্রান্ত হন, তার আগের দিন সন্ধ্যায় আবু লুলুর পাশ দিয়ে আমি অতিক্রম করি। সে তখন জুফাইনা এবং হুরমুজানের সাথে গোপনে আলাপ করছিল। আমি তাদের কাছাকাছি হতেই তারা পালাতে শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের থেকে খাঁজবিশিষ্ট একটি দোধারী ছোরা মাটিতে পড়ে যায়।'
লোকেরা তখন দেখলেন, আবু লুলুর ব্যবহৃত ছোরাটি আবদুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত বিবরণের সাথে মিলে যায়। এতে উবাইদুল্লাহ ইবনু উমর বুঝে ফেলেন, তাঁর বাবার ওপর হামলার পেছনে আবু লুলু ছাড়াও জুফাইনা ও হুরমুজানের হাত রয়েছে। ফলে তখনই তরবারি হাতে বের হয়ে হুরমুজান, জুফাইনা ও আবু লুলুর মেয়েকে হত্যা করেন। তাঁর অবস্থা এমন হয়েছিল, যেন পারলে মদীনায় থাকা সমস্ত যুদ্ধবন্দিকেই তিনি হত্যা করে ফেলেন।
মুসলিমরা উবাইদুল্লাহ-এর কাজ মেনে নিতে পারছিলেন না। কারণ তাঁকে তো কিসাস গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ওপরন্তু এ কাজে কারা জড়িত—এ ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণও তাঁর কাছে ছিল না। তাই মুসলিমরা ক্ষুব্ধ হয়ে উবাইদুল্লাহকে বিশিষ্ট সাহাবি সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস-এর ঘরে বন্দি করে রাখেন। উসমান খলিফা হওয়ার পরপরই বিষয়টি তাঁর সামনে উত্থাপন করা হয়।
উসমান বিষয়টি নিয়ে সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করলে তাঁরা বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করলেন। অবশেষে খলিফা নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বললেন, বিবরণের ভিন্নতা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে দিয়ত কার্যকরের ফয়সালা হবে। রাষ্ট্র তথা তিনি নিজে নিহত তিনজনের অভিভাবক হিসেবে কিসাসের দাবি মওকুফ করে দিয়েছিলেন। অন্য বর্ণনামতে, আবু লুলুর মেয়ে এবং জুফাইনার কোনো উত্তরাধিকারী ছিল না। পক্ষান্তরে হুরমুজানের ছেলে কুমাজান থাকায় খলিফা তার পক্ষে কিসাসের হুকুম দিয়েছিলেন। পরে কুমাজান কিসাসের দাবি ছেড়ে রক্তপণ গ্রহণে সম্মত হয়ে যায়।
খ. মদপানের বিচার এবং ভাইয়ের ওপর হদ কায়েম
উসমান তাঁর ২৫ বছর বয়সি সৎভাই ওয়ালিদ ইবনু উকবা-কে কুফার প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি পাঁচ বছর সেখানকার দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন খলিফার অত্যন্ত স্নেহভাজন। কুফার দায়িত্বে থাকাকালীন অনেক বিজয়ের ব্যাপারেও তাঁর অবদান ছিল।
একবার কুফার সম্ভ্রান্ত পরিবারের কিছু যুবক সিঁধ কেটে একটি ঘরে ঢুকে। ঘরের মালিককে হত্যা করে। লোকেরা ঘেরাও করে যুবকদের ধরে ফেলে। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় প্রশাসক ওয়ালিদের কাছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে ওয়ালিদ তাদের বিষয়টি জানিয়ে খলিফার কাছে পত্র প্রেরণ করেন। এরপর খলিফার নির্দেশে কিসাসস্বরূপ তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এইসব যুবকের পক্ষের লোকেরা তখন বদলা নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা বলে, ওয়ালিদ মদপান করেছেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, ওয়ালিদ সত্যই মদপান করেছিলেন। তিনি ফজরের নামাজ চার রাকাত পড়িয়েছিলেন। আবার কারও মতে, তিনি সিজদায় গিয়ে বলছিলেন, 'তুমি নিজে পান করো। আমাকেও পান করাও।' যা-ই হোক, খলিফার কাছে অভিযোগ পৌঁছলে তিনি ওয়ালিদ-কে কুফা হতে ডেকে পাঠালেন। তাঁর বিপক্ষে একাধিক সাক্ষীও পাওয়া গেল। কিন্তু ওয়ালিদ কসম করে বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহর কসম করে বলছি, মূলত বদলা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই ওরা এমন সাক্ষ্য দিচ্ছে।'
উত্তরে খলিফা বললেন, 'কিছু করার নেই। আমরা তো কেবল অভিযোগ অনুসারে বিচার করি। কেউ মজলুম হলে আল্লাহ তার তরফ থেকে বদলা নেবেন। আর জালিমকে আল্লাহ শাস্তি দেবেন।' এই বলে তিনি সাঈদ ইবনুল আস-কে নির্দেশ দিলে তিনি মদপানের হদ (তথা দণ্ড) বাস্তবায়ন করেন। সৎভাই এবং প্রশাসক হওয়া সত্ত্বেও খলিফা দণ্ড বাস্তবায়নে কোনো ধরনের কসুর করেননি। অবস্থা অনুসারে সংগত কাজটিই তিনি করেছিলেন। মূলত তাঁর রায় ছিল বাহ্যিক অবস্থা অনুসারে। অন্তরের অবস্থা তো আল্লাহই ভালো জানেন।

টিকাঃ
[৩৪৭] সুনানুত তিরমিযি: ১৩২২
[৩৪৮] আল-হাকুল মুবিন ফী কাদ্বায়ি আমিরিল মুমিনীন, পৃ. ৩৯
[৩৪৯] সাক্ষী-প্রমাণের মাধ্যমে শরীয়তের বিচারকার্য পরিচালিত হয়। ওয়ালিদ ইবনু উকবা এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য পাওয়া যাওয়ায় তার ওপর হদ কায়েম করা হয়েছিল। - অনুবাদক
[৩৫০] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৮৪; আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২৬৩; ইতমামুল ওয়াফা, পৃ. ১৪৩

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আলির জামানার বিচারকগণ

📄 আলির জামানার বিচারকগণ


আগের খলিফাগণ কর্তৃক নিযুক্ত যেসব বিচারক যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন, আলি তাদের স্বপদে বহাল রাখার পাশাপাশি নতুন বিচারক এবং প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিলেন। এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন,
শুরাইহ ইবনুল হারিস : ইনি আগে থেকেই কুফায় বিচারকার্য পরিচালনা করে আসছিলেন। আলি তাকে স্বপদে বহাল রাখেন এবং তার মাসিক ভাতা ৫০০ দিরহাম নির্ধারণ করেন।
আবু মুসা আশআরি : উসমান কর্তৃক নিযুক্ত কুফার প্রশাসক আবু মুসা আশআরি-কে আলি-ও বহাল রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁকে অপসারণ করেন।
মালিক ইবনুল হারিস আল-আশতার নাখায়ি : তিনি ছিলেন তৎকালীন অভিজাত শ্রেণির সদস্য এবং অন্যতম বাহাদুর যোদ্ধা। ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সিফফিনের যুদ্ধে তিনি আলি-এর সাথে ছিলেন। তার বাহাদুরির কারণে জয়ের পাল্লা তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পর আলি তাকে মিশরের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। তার সাথে দেওয়া ঐতিহাসিক পত্রটির কিছু অংশ আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। মিশর পৌঁছার আগে পথেই তার মৃত্যু হয়।
কুসাম ইবনুল আব্বাস : মদীনা মুনাওয়ারার প্রশাসক। ৩৭ হিজরিতে তিনি মক্কা এবং তায়েফের প্রশাসক ছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস : তিনি ছিলেন আলি-এর পক্ষ থেকে বসরার প্রশাসক। এক বর্ণনামতে, আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালি তখন বসরার বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। অন্য বর্ণনামতে, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বসরার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য আবদুর রহমান ইবনু ইয়াজিদ আল-হুদ্দানিকে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন আল-মুলাহহাব ইবনু সুফরার সৎভাই। আলি এবং মুআবিয়া -এর জামানার একটা সময় অবধি তিনি দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে যিয়াদ তাকে অপসারণ করে। আবু উবায়দা বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (বসরায়) ফতোয়া প্রদান এবং বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি বসরার বাইরে গেলে আবুল আসওয়াদকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। তখন তিনিই ফতোয়া প্রদান করতেন। সে-সময় বিচারককে মুফতি নামে অভিহিত করা হতো। হিজরি ৪০ সালে আলি নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবেই চলছিল। আবুল আসওয়াদ সূত্রে অনেক চমৎকার বিচারকার্যের বিবরণ পাওয়া যায়। আলি মদীনা থেকে বসরায় চলে যাওয়ার সময় আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস -কে সেখানকার প্রশাসক নিযুক্ত করে যান।
উবাইদুল্লাহ ইবনু মাসউদ: ইয়ামানের প্রশাসক এবং বিচারক।
জাদা ইবনু হুবায়রা, এরপর খালিদ ইবনু কুররা ছিলেন খোরাসানের প্রশাসক।

টিকাঃ
[৩৫১] রাওদ্বাতুল কুদ্বাহ: ৪/১৪৮৪; আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২৩৯
[৩৫২] তবাকাতু ইবনি সাদ: ৩/২১৩; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৪/৩৪; আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ২৩
[৩৫৩] তারীখুত তবারি: ৩/৫৪৬ ও ৪/৬৯
[৩৫৪] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/২৮৮-২৮৯
[৩৫৫] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/২৮৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00