📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আবু বকরের জামানার মোকদ্দমা

📄 আবু বকরের জামানার মোকদ্দমা


আবু বকর -এর যুগে বেশ কিছু মোকদ্দমার ফয়সালা হয়েছিল। এগুলোর কয়েকটি মদীনায়, কিংবা মক্কাতে, অথবা ভিন্ন কোনো শহরে তাঁর কাছে এলে তিনি সেসবের ফয়সালা করে দিয়েছিলেন। আর কিছু মোকদ্দমা তাঁর যুগের প্রশাসক এবং বিচারকের পক্ষ থেকে এসেছিল। এখানে আমরা সেসবের কিছু উদাহরণ পেশ করছি।
ক. কিসাসের মোকদ্দমা
মাজিদা নামক জনৈক ব্যক্তি বলেন, মক্কায় এক ব্যক্তির সাথে আমার ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে সে কামড়ে আমার কানের কিছু অংশ ছিঁড়ে নেয়। কিংবা আমি কামড়ে তার কানের কিছু অংশ ছিঁড়ে ফেলি। পরবর্তীকালে আবু বকর হজে এলে আমরা বিষয়টি তাঁর কাছে উত্থাপন করি। তিনি বললেন, 'তাদের দুজনকে উমরের কাছে নিয়ে চলো। বিষয়টি কিসাস পরিমাণ হলে আহত ব্যক্তিকে কিসাস নিয়ে দেওয়া হবে।'
এরপর উমর আমাদের অবস্থা দেখে জানালেন যে, বিষয়টি কিসাসের পরিমাণে পৌঁছেছে। সুতরাং একজন হাজাম ডাকতে হবে। হাজামের কথা শুনে খলিফা বললেন, 'রাসূলুল্লাহ -কে এ কথা বলতে আমি শুনেছি, "আমার খালাকে আমি একজন ভৃত্য দিয়ে দিয়েছি। আল্লাহ এর মাধ্যমে তাকে বরকত দান করবেন বলে আমি আশাবাদী। তবে আমার খালাকে আমি নিষেধ করেছি, তাকে যেন তিনি হাজাম বা ধোপা কিংবা স্বর্ণকার না বানান।"
খ. সন্তান কর্তৃক বাবার ব্যয়ভার নির্বাহ
কায়স ইবনু হাযিম বলেছেন, আবু বকর -এর কাছে আমি উপস্থিত ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! আমার বাবা তো আমার সব সম্পদ নিয়ে আমাকে অসহায় করে দিতে চাইছেন।' আবু বকর তখন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বললেন, 'তোমার চলার জন্য যথেষ্ট হয়—কেবল এ পরিমাণ সম্পদই তুমি নিতে পারবে।' লোকটি বলল, 'হে রাসূলের খলিফা! রাসূলুল্লাহ কি বলেননি, তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার পিতার?' আবু বকর তখন বললেন, 'আল্লাহ যা-তে সন্তুষ্ট, তুমিও তা-তে সন্তুষ্ট হয়ে যাও। অন্য বর্ণনামতে আবু বকর বলেছিলেন, 'এ কথার দ্বারা রাসূল-এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যয়ভার নির্বাহ করা।
গ. দাবি নাকচ
আবদুল্লাহ ইবনু আবি মুলাইকা তাঁর দাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির হাত দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল। দ্বিতীয় লোকটি তখন নিজের হাত বের করার জন্য সজোরে টান দিলে কামড়দাতার সামনের দাঁত পড়ে যায়। ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে আবু বকর -এর কাছে অভিযোগ উত্থাপন করা হলে তিনি সেটা নাকচ করে দেন।
ঘ. বেত্রাঘাতের বিধান
সফিয়্যা বিনতু আবি উবায়দ সূত্রে বর্ণিত, আবু বকর -এর কাছে এক লোককে আনা হলো। যে একটি কুমারী মেয়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। লোকটি ব্যভিচারের কথা স্বীকার করে। সে অবিবাহিত থাকায় আবু বকর তাকে বেত্রাঘাতের আদেশ করেন। এরপর তাকে ফাদাক নামক স্থানে নির্বাসিত করা হয়।

টিকাঃ
[৩১৭] মুসনাদু আহমাদ: ১০২; আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ১২৮; আখবারুল কুদ্বাহ: ২/১০২
[৩১৮] আসসুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি: ৭/৪৮১
[৩১৯] অর্থাৎ সন্তান তার পিতার ব্যয়ভার নির্বাহ করবে। তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৯৬
[৩২০] সহিহুল বুখারি: ২২৬৬; তারীখুল খুলাফা, পৃ. ৯৪
[৩২১] মুওয়াত্তা মালিক, পৃ. ৫১৬, ব্যভিচার স্বীকারকারী সংক্রান্ত অধ্যায়; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ৯৪

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উমরের জামানার বিচারকগণ

📄 উমরের জামানার বিচারকগণ


উমর-এর খিলাফতকালে অনেক দেশ বিজিত হয়ে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমা বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেসব স্থানে তিনি অনেক প্রশাসক এবং বিচারক নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিছু কিছু জায়গায় বিচারব্যবস্থাকে প্রশাসন থেকে যেমন পৃথক করে দিয়েছিলেন, তেমনি মদীনাতেও একাধিক বিচারক নিয়োগ দিয়েছিলেন। আবার তিনি নিজেও বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। তাঁর খিলাফতকাল ছিল সুদীর্ঘ এগারো বছরব্যাপী। এ সময়টাতে তিনি একাধিক বার বিচারক রদবদলও করেছেন। কুফা এবং বসরার ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছিল। এজন্যই তাঁর খিলাফতকালে অনেক প্রশাসক এবং বিচারকের কথা জানা যায়। যাদের নথিতে বহু মামলার বিবরণ এবং জীবনচরিতে অনেক বিচারকার্য পরিচালনার উল্লেখ আছে। সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের পরিচয় আমরা এখানে উল্লেখ করব।
আলি ইবন আবি তালিব : উমর -এর খিলাফতকালে তাঁর বিচারকার্য কিংবদন্তিতুল্য ছিল। সে যুগে লোককথা ছিল, মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করতে হলে আবুল হাসান হওয়া দরকার।
যায়িদ ইবন সাবিত : উমর তাঁকে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে সেজন্য ভাতাও নির্ধারণ করেছিলেন। একবার উমর এবং উবাই -এর মাঝে মতানৈক্য হলে তাঁরা উভয়েই যায়িদ -কে সালিশ বলে মেনে নেন।
ইয়াজিদ ইবনু সাঈদ : তিনি ইয়াজিদ ইবনু উখতিন নামির নামে প্রসিদ্ধ। তাঁর আলোচনা আমরা পূর্বে একাধিক বার করেছি।
মদীনায় উমর -এর পাশাপাশি ওপর্যুক্ত তিনজনও বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। অনেক সময় ফয়সালা প্রদানের ক্ষেত্রে উমর তাঁদের সহায়তা নিতেন।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ : উমর তাঁকে কুফার বাইতুল মাল এবং বিচার বিভাগের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। শাবি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ সর্বপ্রথম কুফার বিচারকার্য পরিচালনা করেন।
সুলাইমান ইবনু রবীআ : উমর তাঁকে কাদিসিয়্যাহ এবং কুফার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বর্ণিত আছে, তিনি সর্বপ্রথম কুফায় বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নেন। চল্লিশ দিন সেখানে অবস্থান করলেও কেউ তাঁর কাছে বিচার নিয়ে আসেনি।
শুরাইহ ইবনুল হারিস : তার শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর প্রসিদ্ধ অবস্থান দেখে উমর তাঁকে কুফায় নিযুক্ত করেন। সেখানে তিনি ষাট বছরেরও বেশি সময় কাযির দায়িত্বরত ছিলেন। ইবনুয যুবাইরের সময় ছাড়া অন্য কোনো সময় তিনি বিচারকার্য বন্ধ রাখেননি। হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ যখন ইরাকের প্রশাসক, সে-সময় তিনি দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেন। এর কিছুকাল পর ৮০ হিজরিতে ১০০/১২০ বছর বয়সে তাঁর ইন্তেকাল হয়।
আবু মারইয়াম ইয়াস ইবনু সুবাইহ হানাফি : উমর তাঁকে কিছু সময়ের জন্য বসরার বিচার বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বসরার প্রথম বিচারক। মানুষ তার দুর্বলতার কথা বললে খলিফা তাকে অপসারণ করেন। ইবনু সীরিন বলেছেন, ইয়াস ছিলেন বসরার প্রথম বিচারক। হিজরি ১৪ সালে বসরার প্রশাসক ছিলেন উতবা ইবনু গাযওয়ান। আবু মারইয়ামকে তিনি বিচার বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এরপর উতবার মৃত্যু হয়। মুগীরা ইবনু শুবা বসরার প্রশাসক হওয়ার পরও আবু মারইয়ামকে স্বপদে বহাল রাখেন। তারপর এ ব্যাপারে উমরের সাথে পত্র বিনিময় করেন।
কাব ইবনু সুর: ইয়াস ইবনু দুবাইহকে অপসারণ করার পর উমর বসরায় কাব ইবনু সুরকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। উমর-এর শাহাদাত পর্যন্ত কাব সেখানে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীকালে উসমান কর্তৃক নিযুক্ত বসরার প্রশাসক আবদুল্লাহ ইবনু আমিরও কাবকে সেই পদে বহাল রাখেন। অবশেষে জঙ্গে জামালে তিনি শহীদ হয়ে যান। সেদিন তার অবস্থান ছিল যুদ্ধের পরিবর্তে সন্ধির সপক্ষে। বিচারকার্য পরিচালনায় তার অপূর্ব যোগ্যতা দেখে উমর তাকে বসরার কাযি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এমনকি তার কাছে প্রেরিত পত্রে তার কাজের ভূয়সী প্রশংসাও করেন।
কায়স ইবনু আবিল আস : উমর তাঁকে মিশরের বিচারক পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মিশরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মুসলিম বিচারক। ২৩ হিজরিতে উমর তাঁকে বিচারক পদে নিয়োগ দানের জন্য আমর ইবনুল আস বরাবর পত্র প্রেরণ করেন। প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালনের পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর ছেলে উসমান বিচারক নিযুক্ত হন।
উবাদা ইবনুস সামিত : উমর তাঁকে শামের বিচারক এবং শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের প্রথম বিচারক।
এই বিচারকরা উমর-এর খিলাফতকালে স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার পাশাপাশি কখনো কখনো প্রশাসনের দায়িত্বও পালন করতেন। তাঁরা ছাড়া আরও কিছু প্রশাসককে উমর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যাদের অন্যতম ছিলেন:
মক্কার প্রশাসক নাফে ইবনু আবদিল হারিস।
সানআর প্রশাসক ইয়ালা ইবনু উমাইয়া। উমর-এর কাছে তিনি ইয়ামানের বিচারকার্য-সংক্রান্ত পত্র লিখেছিলেন।
তায়িফের প্রশাসক সুফইয়ান ইবনু আবদিল্লাহ।
কুফার প্রশাসক মুগীরা ইবনু শুবা।
শামের প্রশাসক মুআবিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান।
বাহরাইন এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রশাসক উসমান ইবনু আবিল আস।
হিমসের প্রশাসক উমাইর ইবনু সাদ।
এরা ছাড়া আরও কিছু সাহাবি ছিলেন, উমর -এর যুগে যাদের দায়িত্ব ছিল বিচারকার্য পরিচালনায় সহায়তা কিংবা বিচারকার্য পরিচালনার তত্ত্বাবধান করা। তাঁদের অন্যতম ছিলেন,
আবু উবায়দা আমির ইবনুল জাররাহ।
মুআয ইবনু জাবাল।
এই দুই সাহাবিকে উমর বিচারকার্য পরিচালনা এবং বিচারক নিযুক্ত করার ক্ষমতা দিয়ে শামে পাঠিয়েছিলেন।
আবুদ দারদা। তাঁর আসল নাম ছিল উওয়াইমির ইবনু মালিক। মদীনায় তিনি সামরিক বাহিনীর বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। উমর -এর নির্দেশে মুআবিয়া তাঁকে দামিস্কের বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন সেখানকার প্রথম বিচারক।
আবদুল্লাহ ইবনু উতবা ইবনি মাসউদ নববি যুগে ছোট ছিলেন। যুহরির সূত্রে সহিহ সনদে বর্ণিত আছে, ইবনু উতবাকে উমর বাজারের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেছিলেন।
আবু ইদরিস আল-খাওলানি -কে উমর দুর্নীতি সংক্রান্ত বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

টিকাঃ
[৩২২] তারীখুল কুদ্দা, পৃ. ১১৮
[৩২৩] আখবারুল কুদ্দা : ১/১০৭; রাওদ্বাতুল কুদ্দা, ৪/১৪৮১; তারীখুল কুদ্দা, পৃ. ১৯৮
[৩২৪] আখবারুল কুদ্দা : ২/১৮৫ ও ১৮৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৬১; তবাকাতু ইবনি সাদ: ২/৩৪২
[৩২৫] ওয়াকি‘ তাঁর নাম কখনো সালমান, আবার কখনো সুলাইমান বলেছেন। আখবারুল কুদ্দা: ২/১৮৪ ও ১৮৫; তারীখুল কুদ্দা, পৃ. ১০৯। ইবনু সাদ তাঁকে সালমান নামে অভিহিত করেছেন। (তবাকাত: ৬/৩৪ ও ১০)
[৩২৬] আখবারুল কুদ্দা: ২/১৮৯; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়িয়্যাহ: ২/৮; ওফায়াতুল আইয়ান: ২/১৬৭
[৩২৭] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/২৬৯; তারীখুল কুদ্বাহ, পৃ. ১০৯ এবং ১১৭
[৩২৮] তারীখু কুদ্বাতিল উনদুলুস, পৃ. ২২; সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৮; আল-ইসতীআব: ২/৪১২
[৩২৯] তবাকাতু ইবনি সাদ: ২/৩৬৯
[৩৩০] তারীখুল কাদ্বা: পৃ. ২০১
[৩৩১] আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৯৯; কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৪১৩
[৩৩২] আল-ইসাবাহ: ৪/১০০
[৩৩৩] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২২২; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৫

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উমরের যুগের মোকদ্দমা

📄 উমরের যুগের মোকদ্দমা


উমর -এর খিলাফতকাল দীর্ঘ হওয়ায় সে-সময় ইসলাম দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিচারকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের কাছে আসা মোকদ্দমার সংখ্যাও ছিল অনেক। এ কারণেই ইতিহাসের পাতায় উমর -এর যুগে বিচারের অনেক উদাহরণ দেখা যায়। সাহাবিদের মাঝে আলি ইবনু আবি তালিব আর আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ এবং তাবিয়িদের মাঝে শুরাইহ আর কাব ইবনু সুর, সহ অনেকের বিচার ছিল এই উমর -এর যুগে। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি ঘটনা এখানে আমরা উল্লেখ করব।
ক. নিষিদ্ধ বিবাহ
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব এবং সুলাইমান ইবনু ইয়াসার সূত্রে বর্ণিত, তুলাইহা ছিলেন রুশাইদ সাকাফির স্ত্রী। ঘটনাক্রমে রুশাইদ তার স্ত্রীকে তালাক দিলেন। তারপর তুলাইহা ইদ্দতের মাঝেই নতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেলেন। এ খবর খলিফা উমর-এর কাছে গেলে তিনি তুলাইহা এবং তার স্বামীকে কয়েকটি বেত্রাঘাত করলেন এবং দুজনকে পৃথক করে দিলেন। এরপর তিনি বললেন, 'যে মহিলা তার ইদ্দতের মধ্যে বিবাহ করেছে, বিবাহকারীর সাথে তার সহবাস না হয়ে থাকলে দুজনকে পৃথক করে দেওয়া হবে। এরপর মহিলাটি প্রথম স্বামীর অসম্পূর্ণ ইদ্দত পূর্ণ করবে। দ্বিতীয় স্বামী তারপর মহিলাটিকে স্বাভাবিক নিয়মে বিবাহের প্রস্তাব দিবে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে মহিলার সহবাস হয়ে থাকলেও দুজনকে পৃথক করে দেওয়া হবে। এরপর মহিলাটি তার প্রথম স্বামীর অবশিষ্ট ইদ্দত পূর্ণ করবে। তবে এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্বামী আর কখনোই মহিলাটিকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে না।'
খ. হত্যায় জড়িতদের কিসাস
কায়স ইবনু সালাবা গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনু উমাইরাহ বলেন, সানআর এক লোক প্রতি বছর প্রতিযোগিতা করত। একবার সে প্রতিযোগিতা থেকে ফিরে দেখে, তার বাঁদি সাতজন লোকের সাথে মদপান করছে। মাতালগুলো লোকটিকে হত্যা করে ফেলল। একপর্যায়ে বিষয়টি খলিফার কাছে উত্থাপিত হলো। তখন তিনি লিখে পাঠালেন, 'সাতজনের প্রত্যেকেরই, এমনকি বাঁদিটির ওপরও কিসাস কায়েম করো। সানআর সমস্ত লোকও যদি এই ব্যক্তিকে হত্যার কাজে জড়িত থাকত, তাহলে সবার ব্যাপারেই আমি কিসাসের ফয়সালা দিতাম।'
গ. ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের দায়
উমর একবার জনৈক ব্যক্তি থেকে দেখেশুনে একটি ঘোড়া কিনলেন। তারপর ঘোড়ার পিঠে চড়ে নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর ঘোড়াটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে লাগল। উমর তখন দেরি না করে সরাসরি বিক্রেতার কাছে ফিরে এসে তাকে বললেন, 'তোমার ঘোড়া তুমি ফিরিয়ে নাও; এটা তো ত্রুটিযুক্ত।'
বিক্রেতা বলল, 'আমিরুল মুমিনীন! আমি ঘোড়াটি ফেরত নেবো না। কারণ আপনি তো সেটা সুস্থ-সবল অবস্থাতেই আমার থেকে কিনে নিয়েছিলেন।'
এভাবে দুজনের মাঝে মতানৈক্য হলে খলিফা বললেন, 'বেশ, তাহলে তোমার এবং আমার মাঝে সমাধানের জন্য একজন সালিশ নির্ধারণ করো।' বিক্রেতা বলল, 'ঠিক আছে, শুরাইহ আমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেবেন।'
এরপর তারা উভয়েই বিচারক শুরাইহের কাছে গিয়ে তাকে পূর্ণ ঘটনার বিবরণ দিলেন। ঘোড়ার মালিকের অভিযোগ শুনে শুরাইহ খলিফাকে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি কি ঘোড়াটি সুস্থ-সবল অবস্থায় কিনেছিলেন?' উমর তখন হাঁ-বাচক জবাব দিলে বিচারক বললেন, 'আমিরুল মুমিনীন! ঘোড়াটি ফেরত দিতে হলে যে অবস্থায় নিয়েছিলেন সে অবস্থাতেই দিতে হবে।'
খলিফা তখন শুরাইহের অপূর্ব ফয়সালায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এরপর তাকে সরকারি বিচারক নিযুক্ত করে কুফায় প্রেরণ করেন।

টিকাঃ
[৩৩৪] আল-হাক্কুল মুবিন ফী কাদ্বায়ি আমিরিল মুমিনীন, পৃ. ২১ দ্রষ্টব্য
[৩৩৫] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ১৫৮ দ্রষ্টব্য।
[৩৩৬] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/২২৭; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ৩০ এবং তরফাতুন ফিল কাদ্বা দ্রষ্টব্য।
[৩৩৭] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/২৭৫; আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ১৬৮ দ্রষ্টব্য।
[৩৩৮] মুওয়াত্তা, পৃ. ৩৩১; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৭৮
[৩৩৯] সুনানুদ দারাকুতনি: ৩/২০২; ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/২৫৪; তারীখুল কাদ্ধা, পৃ. ১৭৮
[৩৪o] আখবারুল কুদ্দা : ২/১৯৮; আল-কাদ্বাউ ফিল ইসলাম, পৃ. ৯৫; ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন : ১/১১

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উসমানের জামানার বিচারকগণ

📄 উসমানের জামানার বিচারকগণ


উমর কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক এবং বিচারকদের অনেকেই উসমান -এর খিলাফতকালে দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। এর বাইরে আরও অনেককেই উসমান নতুনভাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখানে আমরা তাঁদের একাংশের বিবরণ প্রদান করব।
আবুদ দারদা উওয়াইমির ইবনু মালিক। উসমান -এর খিলাফতকালে তিনি ছিলেন দামেস্কের বিচারক। উসমান -এর খিলাফতকাল সমাপ্তির দুই বছর আগে তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।
নাফে ইবনু আবদিল হারিস। উমর -এর যুগে তিনি মক্কার প্রশাসক এবং বিচারক ছিলেন। উসমান -ও তাঁকে স্বপদে বহাল রেখেছিলেন।
সুফইয়ান ইবনু আবদিল্লাহ। উমর -এর যুগে তায়িফের প্রশাসন এবং বিচারের দায়িত্বে থাকা এই সাহাবিকে উসমান -ও বহাল রাখেন।
আবু মূসা আশআরি। নববি যুগে এবং আবু বকর -এর খিলাফতকালে তিনি ছিলেন ইয়ামানের প্রশাসক। পরবর্তীকালে উমর তাঁকে বসরার প্রশাসক নিযুক্ত করেন। প্রথমে বসরা এবং কুফা—উভয় স্থানেরই প্রশাসক ছিলেন। পরবর্তীকালে কেবল বসরার দায়িত্ব পালন করেন। উসমান তাঁকে প্রথমে বসরার দায়িত্বে বহাল রাখলেও পরে কুফার প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু আমির। আবু মূসা আশআরি-এর পর তিনি বসরার প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন।
দামিস্কের প্রশাসক মুআবিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান।
মিশরের প্রশাসক আমর ইবনুল আস।
মিশরের প্রশাসক আবদুল্লাহ ইবনু সাদ। উসমান -এর যুগে তিনি আফ্রিকা জয় করেন। পরবর্তীকালে আসকালান-এ বসবাস করতে থাকেন। ৩৬ হিজরিতে সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়।
উসমান ইবনু কায়স ছিলেন মিশরের বিচারক। আমিরুল মুমিনীন উসমান ইবনু আফফান-এর শাহাদাতের পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর মুআবিয়া-এর খিলাফতের আগ পর্যন্ত মিশরে স্বতন্ত্র কোনো বিচারক ছিলেন না।
কাদিসিয়্যাহর বিজয়ী সেনাপতি সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস। কুফাতে উমর কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক। উসমান তাঁকে প্রথমে বহাল রাখলেও পরবর্তীকালে অপসারণ করেন। তখন তিনি মদীনায় ফিরে আসেন। হিজরি ৫৫ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। সাদ-কে অপসারণের পর ওয়ালিদ ইবনু উকবা -কে সে পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁকেও অপসারণ করে সেখানে সাঈদ ইবনুল আস-কে নিয়োগ দেন।
আমিরুল মুমিনীন উসমান -এর অভ্যাস ছিল বিচারের ব্যাপারে আলি -এর সাথে পরামর্শ করা। এ ছাড়া তালহা ইবনু উবাইদিল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনু আউফও ছিলেন তাঁর জুরিবোর্ডের সদস্য। মোকদ্দমা, দাবি-দাওয়া এবং বিধানের ব্যাপারে তাঁদের মতামত নিতেন। আবার আলি নিজেও বিচার করতেন। এ সময় আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ কুফায় বিচারকার্য পরিচালনা করে আসছিলেন। যায়িদ ইবনু সাবিত অনেক সময় মদীনায় বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। আর উবাদা ইবনুস সামিত-এর দায়িত্ব ছিল ফিলিস্তিন এবং শামে বিচারকার্য পরিচালনা করা।
খলিফার পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ইবনু উমর যে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করা থেকে বিরত ছিলেন—সে কথা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি।

টিকাঃ
[৩৪১] কুদ্দা তু দিমাশক, পৃ. ২; আল-ইসাবাহ : ৫/৪৬; তাহযীবুল আসমা : ২/২২৮
[৩৪২] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/২৭৪
[৩৪৩] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২১te; আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্বাহ, পৃ. ১১
[৩৪৪] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্ধাহ, পৃ. ২০২-২০৩
[৩৪৫] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২১৪
[৩৪৬] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ২১৫-২১৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00