📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 রাশিদুন যুগে বিচারের পরিধি

📄 রাশিদুন যুগে বিচারের পরিধি


রাশিদুন যুগে বিচারকের জন্য সময়সীমা নির্ধারণের কোনো ধরনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে দিনের একাংশের জন্য একজন এবং অপরাংশের জন্য আরেকজন বিচারক—এভাবে নিযুক্ত করা হতো না। আবার এমনও হতো না যে, সপ্তাহের কয়েকদিন একজন আর অবশিষ্ট দিনগুলো আরেকজন বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বরং সময়ের বিচারে বিচারকের দায়িত্ব পালনের সময় ছিল সর্বজনীন এবং পরিব্যাপ্ত।
তবে নববি যুগের মতো রাশিদুন যুগেও বিচারের স্থানগত পরিসীমা নির্দিষ্ট ছিল। বিচারক নিযুক্ত করার সময় খলিফা বা প্রশাসক তাকে নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা নগর, অথবা পূর্ণ অঞ্চলের দায়িত্ব প্রদান করতেন। মদীনা মুনাওয়ারায়, মক্কায়, কুফাতে, বসরায়, শামে, ফিলিস্তিনে, মিশরে, ইয়ামানে, ইয়ামানের এক অঞ্চলে, হাদরামাউতে এবং বাহরাইনে বিচারক নিযুক্তির আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে। আবার উমর এবং উসমান -এর যুগে মদীনাতে একাধিক বিচারক নিযুক্ত ছিল। খলিফা ছাড়া তারাও বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। সে হিসেবে আলি এবং যায়িদ ছিলেন মদীনার বিচারক।
আবুস সাইব ইয়াজিদ ইবনু উখতিন নামির এবং আবুদ দারদা -কে খলিফা উমর মদীনাতে বিচারকার্য পরিচালনায় নিয়োগ দিয়েছিলেন। যায়িদ এবং আলি তো আগে থেকেই সেখানকার বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
বিচারকার্যের ধরন হিসেবে তাদের কাজ বিভক্ত ছিল। আবু মূসা আশআরি এবং মুআয ইবনু জাবাল একই সময়ে ইয়ামানের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ নির্ধারিত অংশের দায়িত্ব পালন করতেন। আবু মূসা আশআরি তো উমর -এর খিলাফতকাল অবধি ইয়ামানের অর্ধেকে বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন।
রাশিদুন যুগে বিচারকের ধরন বা প্রকার নির্দিষ্ট করার বিষয়টি ছিল সুস্পষ্ট। খলিফার স্থলবর্তী বা প্রতিনিধি রূপে বিচারককে বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো। তবে খলিফা চাইলে স্থলবর্তী এবং প্রতিনিধিকে কোনো ধরনের শর্তারোপ করতে ও তার পরিধি নির্দিষ্ট করে দিতে পারতেন। বিচারের প্রকার নির্দিষ্ট করে দেওয়ার পদ্ধতি বিভিন্ন রকম হতো। যেমন,
(১) উমর এবং উসমান -এর যুগে আবুদ দারদা -কে সামরিক বাহিনীর বিচারক নিযুক্ত করা হয়েছিল। সৈন্যদের অবস্থান করা বা যাওয়ার সময় তাদের মাঝে সংঘটিত বিরোধের বিষয়টি তিনি দেখতেন।
আবু যুরআহ উল্লেখ করেছেন, আবুদ দারদা -কে উমর দামিস্কের বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন।
(২) হদ, কিসাস এবং অপরাধ সংক্রান্ত বড় বড় আর গুরুত্বপূর্ণ মোকদ্দমাগুলো সাধারণত খলিফার পক্ষ থেকে রাজধানীতে নিরসন করা হতো। এ ব্যাপারে উসমান সবিশেষ যত্নবান ছিলেন। আবু বকর তো তাঁর খিলাফতকালে বিষয়টি উমর-এর দায়িত্বে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর উমর এবং আলি মাঝে মাঝে হদ এবং অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়টি দেখতেন। আবার ঝামেলার সম্ভাবনা থাকলে কোনো কোনো প্রশাসকও তার নিরসন করে দিতেন। কেননা বড়সড় অপরাধের বিচার করতে গেলে বিচারকের প্রভাব এবং ক্ষমতার প্রয়োজন হয়। স্বভাবতই প্রশাসন এ ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হয়ে থাকে। অবশ্য খলিফা বা প্রশাসক বিষয়টি অনেক সময় বিচারকের দায়িত্বেই ছেড়ে দিতেন।
পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, খলিফা এবং প্রশাসকরা সাধারণত অভিযোগের তদন্ত এবং দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত বিচারকার্য নিজেরাই পরিচালনা করতেন। কিংবা এ কাজের জন্য বিশেষ বিচারক নিয়োগ দিতেন।
(৩) অপেক্ষাকৃত সহজ বিষয়ের জন্য বিচারক নিযুক্ত করা। যেমন উমর খলিফা হওয়ার পরে ইয়াজিদ ইবনু উখতিন নামির (ইয়াজিদ ইবনু সাঈদ) -কে বলেছিলেন, 'ছোটখাটো কিছু বিষয়ে তুমি আমাকে সাহায্য কোরো।' অন্য বর্ণনামতে উমর বলেছিলেন, 'ছোটখাটো বিষয়ের দায়িত্ব তোমার।' তখন থেকে ইয়াজিদ দিরহাম এবং অন্যান্য বিষয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
(4) দরকারি আর প্রয়োজনীয় বিষয়ে বিচারক নিয়োগ দেওয়া। উমর সর্বপ্রথম এই পদ্ধতির প্রচলন করেন। কুফায় নিযুক্ত প্রশাসককে সমাজে ঘটে যাওয়া বড় বড় অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি। উসমান খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পর আবু মূসা আশআরি-কে বসরার বিচারক ও এই পদে বহাল রাখেন।
যুহরি এবং ইবনুল মুসাইয়িব সূত্রে বর্ণিত আছে, উমর তাঁর খিলাফতকালে আলি-কে গুরুত্বপূর্ণ বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব নিতে বলেছিলেন। কারণ আলি ছিলেন বিচারকার্য পরিচালনায় সাহাবিদের মাঝে সর্বাধিক পারদর্শী। তবে এই ধরন বা প্রকার নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছিল ব্যতিক্রমী বিষয়। এমন পরিস্থিতি খুব কমই হতো। আবার সেটাও হতো নিতান্তই সীমিত পরিসরে। রাশিদুন যুগের স্বাভাবিক নীতি অনুসারে বিচারক সব ধরনের বিচারে পারদর্শী থাকতেন। অর্থনৈতিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শারীরিক, অপরাধ সংক্রান্ত, কিসাস এবং হদ সংক্রান্ত বিচার করতেন। খলিফাগণ বিচারক নিয়োগ দানের সময় কোন ধরনের বিচার করতে হবে সেটা নির্দিষ্ট করে দিতেন না। জটিল, কুরআন-সুন্নাহয় স্পষ্ট নয় ও গবেষণা নির্ভর—এমন বিষয়েই কেবল খলিফার শরণাপন্ন হতে বলতেন। শরণাপন্ন হওয়ার ব্যাপারটিও থাকত একান্তই ঐচ্ছিক। নির্দেশনা হিসেবে আন্তরিকতার কারণেই খলিফা মূলত পরামর্শটি দিতেন। যা পালন করা আবশ্যক ছিল না। আমরা আগে শুরাইহের উদ্দেশ্যে উমর-এর পত্রটি উল্লেখ করেছি। তাতে এ কথা ছিল, 'ইচ্ছে হলে আগ বেড়ে নিজের গবেষণাপ্রসূত রায় প্রদান করবে। অথবা তুমি চাইলে আমার সাথে পরামর্শ করতে পারো। আমার মনে হয়, আমার সাথে পরামর্শ করাটাই তোমার জন্য নিরাপদ হবে।'
বিভিন্ন শহর আর অঞ্চলের বিচারকরা অনেক সময় সরাসরি শারঈ বিধান জানতে বা এ ব্যাপারে ইঙ্গিত পেতে খলিফার শরণাপন্ন হয়ে নানান বিষয়ে পরামর্শ করতেন। আবার কখনো ফয়সালার সংবাদ খলিফা জানতে পারলে তিনিও সেটার অনুমোদন দিতেন। প্রধান মোকদ্দমার ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হতো না। এমন অনেক উদাহরণের মাত্র কয়েকটি আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
ওয়াকি বর্ণনা করেছেন, একবার আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ-এর কাছে কুরাইশের এক ব্যক্তিকে ব্যভিচারের অভিযোগে ধরে আনা হয়। আবদুল্লাহ তখন তার ব্যাপারে চল্লিশটি বেত্রাঘাতের ফয়সালা দিয়ে জনসম্মুখেই তা কার্যকর করেন। একদল লোক তখন খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব-এর কাছে এ মর্মে অভিযোগ দায়ের করল, 'ইবনু মাসউদ আমাদের একজনকে লাঞ্ছিত করেছে।' খলিফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি নাকি কুরাইশের এক লোককে বেত্রাঘাত করেছেন?' উত্তরে আবদুল্লাহ বললেন, 'জি, এমনটাই করেছি।' খলিফা আবার জানতে চাইলেন, 'বিধান কি এটাই?' আবদুল্লাহ বললেন, 'জি, এটাই বিধান।' খলিফা তখন বললেন, 'আপনি তো চমৎকার ফয়সালা করেছেন।'
এ অবস্থা দেখে অভিযোগ দায়েরকারী লোকেরা বলে উঠল, 'আমরা যার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করলাম, তার কাছেই দেখি বিধান জানতে চাওয়া হচ্ছে।'
একবার জনৈক ব্যক্তি কথাপ্রসঙ্গে উমর-কে বলল, 'আলি এবং যায়িদ এ বিষয়ে এমন ফয়সালা করেছেন।' খলিফা বললেন, 'তাদের স্থলে আমি হলে এমনটা না করে অমনটা করতাম।' লোকটি তখন আবদার করল, 'আপনি তো খলিফা। এখন অমনভাবে ফয়সালা করে দিন না!' উমর বললেন, 'কুরআন-সুন্নাহ অনুসারে ফয়সালা করলে আমি অবশ্য তাদের মতোই ফয়সালা করতাম। তোমাকে যে ফয়সালার কথা বললাম সেটা তো আমার নিজের রায় অনুসারে বলেছি।' এরপর তিনি আগের ফয়সালাই বহাল রাখলেন।
আবু মূসা আশআরি বলেন, আমি ইয়ামানের বিচারক থাকাকালীন একজন সন্দেহভাজন গর্ভবতী মহিলাকে আমার কাছে আনা হয়। আমি তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে বলে, 'আপনি এমন মহিলাকে প্রশ্ন করেছেন, যে কিনা কোনো স্বামীসঙ্গ ছাড়াই গর্ভবতী হয়ে পড়েছে। শুনে রাখুন, ইসলাম গ্রহণের পর আমি না কারও সাথে বন্ধুত্ব করেছি আর না ছেলেবন্ধু গ্রহণ করেছি। আসলে বিষয়টি হচ্ছে, একবার আমি ঘরের উঠানে ঘুমিয়ে ছিলাম। আল্লাহর কসম করে বলছি, এমন সময় কেউ এসে আমাকে তুলে আমার পেটে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো কিছু একটা ছুড়ে মারল। ঘাড় ফিরিয়ে সেদিকে তাকিয়ে আমি আবছামতো কাউকে দেখেছি। তবে সে মানুষ নাকি অন্য কিছু সেটা বুঝতে পারিনি।'
আবু মূসা বলেন, বিষয়টি উমর-এর কাছে লিখে জানালে তিনি জবাবে লিখলেন, 'মহিলাটিকে তার গোত্রের কয়েকজন-সহ নিয়ে আমার কাছে এসো।' আমরা সময়মতো তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। তিনি কৃত্রিম রাগের স্বরে বললেন, 'মহিলাটির ব্যাপারে আপনি কোনো কথা এড়িয়ে যাননি তো!' আমি বললাম, 'জি না, মহিলাটি এবং তার গোত্রের কয়েকজন লোক তো আমার সাথেই আছে।' তখন তিনি মহিলাটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে আগের মতোই উত্তর দিলো। তার গোত্রের লোকদের জিজ্ঞেস করলে তারাও মহিলাটি সম্পর্কে ভালো কথা বলল। উমর তখন মহিলাটির ওপর কোনো ধরনের হদ কায়েম করলেন না। ওপরন্তু মহিলার সাথে থাকা লোকদের বলে দিলেন, তার সাথে যেন ভালো আচরণ করা হয়।
আবদুল্লাহ ইবনু শুবরুমাহ বলেন, হামদানের ওয়াদিআ গোত্রে একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। বিচারক শুরাইহ ইবনুল হারিস তখন খলিফা উমর-এর কাছে সমাধান চেয়ে পত্র লিখলে জবাবে তিনি লিখলেন, 'ওয়াদিআর ৫০ জন লোককে ভালোমতো জিজ্ঞাসাবাদ করো। তারা নিজেরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল না এবং হত্যাকারী সম্পর্কেও তারা কিছু জানে না—এই মর্মে তাদেরকে কসম করতে বলো।' শুরাইহ তখন নির্দেশমতো কাজ করে উমর-কে জানালেন। তখন খলিফা লিখে পাঠালেন, 'এই কসমের মাধ্যমে তারা হত্যার দায় থেকে মুক্তি পেয়ে গেছে বটে। কিন্তু রক্তপণ দেওয়া থেকে তারা রেহাই পাবে না। সুতরাং তাদের ওপর তুমি রক্তপণ ধার্য করে দাও।'
তবে অপরাধ এবং হদ সংক্রান্ত মোকদ্দমার স্বল্পতা, এ ব্যাপারে সতর্কতা আর পরামর্শ, এতদসংক্রান্ত খলিফাদের পত্র প্রেরণ এবং সে তুলনায় অর্থনৈতিক আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধের আধিক্য দেখে ধারণা হয় যে, অধিকাংশ বিচারকের পরিধি ছিল শহরকেন্দ্রিক মোকদ্দমার সাথে সংশ্লিষ্ট। এ কারণে ইবনু খালদুন-সহ অনেকেই এ কথা খণ্ডন করেছেন যে, রাশিদুন যুগের বিচারকদের কোনো রকম পরিধি নির্দিষ্ট ছিল না। ইবনু খালদুন বলেন, 'খলিফাদের যুগে বিচারকের দায়িত্ব থাকত কেবল মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করা। এরপর খলিফা এবং বাদশাহগণ বড় বড় রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে বিচারকরাও বাধ্য হয়ে অন্যান্য কাজে হাত লাগান। তবে এ কথা ঢালাওভাবে বলা যায় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনো কোনো বিচারকের বেলায় এ কথা প্রযোজ্য হয়। কিন্তু এটা তাদের সর্বজনীন নয়। বিশেষভাবে কোনো কোনো প্রদেশে নির্দিষ্ট কিছু বিচারকের সাথে এমনটা ঘটত।

টিকাঃ
[২৯৫] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২২০; আখবারুল কুদ্ধাহ লিওয়াকি: ১/১০৫
[২৯৬] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৫৮; আখবারুল কুদ্ধাহ: ৩/১৯৯
[২৯৭] কুদ্ধাতু দিমাশক, পৃ. ৪১৩
[২৯৮] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১০৫; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১২।
[২৯৯] আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/১০৬
[৩০০] নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২৫৮; আখবারুল কুদ্বাহ: ১/২৭৪
[৩০১] তারীখুল কাযা, পৃ. ২৫৬
[৩০২] আখবারুল কুদ্দাহ লিওয়াকি: ২/১৮৯; ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৯০
[৩০৩] আখবারুল কুদ্দাহ লিওয়াকি: ২/১৮৮; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৪৫
[৩০৪] উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ, পৃ. ২৬৩; আল-মাদখাল লিলফিকহিল ইসলাম, পৃ. ৮৭-৮৮; ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৬৮; আল-মাদখালুল ফিকহিল আম: ২/৬২২
[৩০৫] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১০১; তারীখুল কাদ্বা, ১২২ ও ১৪৩
[৩০৬] আখবারুল কুদ্দাহ লিওয়াকি: ২/১৯১
[৩০৭] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২২১। শাইখ মুহাম্মাদ আল-খাযিরি 'মুহাদারাত ফী তারীখিল উমামিল ইসলামিয়্যাহ : ২/৮৮'-এ ইবনু খালদুনের কথা সমর্থন করেছেন。

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারের প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতি

📄 বিচারের প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতি


রাশিদুন যুগে বিচারব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা বিষয়ক এবং বাস্তবধর্মী প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একটি অনুচ্ছেদ উল্লেখ করেই আমরা এই আলোচনার ইতি টানব। এই অনুচ্ছেদটি আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনার সাথে সম্পৃক্ত।
রাশিদুন যুগের বিচারব্যবস্থা ছিল সহজ-সরল। জটিলতা-সহ সব ধরনের কৃত্রিম কর্মপদ্ধতি থেকে মুক্ত। সে-সময় মৌখিকভাবেই অভিযোগ দায়ের করা হতো। বাদী-বিবাদী উভয়েই একসাথে বিচারকের কাছে উপস্থিত হতো। কিংবা বিচারক নিজ উদ্যোগে বিবাদীকে ডেকে পাঠাতেন। সরাসরিই উভয়ের কথা শুনতেন এবং প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। উভয় পক্ষেরই আত্মপক্ষ সমর্থন এবং উত্তর দেওয়ার সুযোগ থাকত। বিচারক প্রমাণ পেশ করতে বলতেন। তবে সেরেস্তাদার বা কেরানি ব্যবহার করতেন না। বিচারালয়ের মুনশিও কমই কাজে লাগত।
বিচারকের সামনে সত্য স্পষ্ট হয়ে গেলে কোনো রকম দীর্ঘসূত্রিতা ছাড়াই অবিলম্বে রায় দিয়ে ফেলতেন। তবে বিধানের ক্ষেত্রে সন্দেহ দেখা দিলে অথবা প্রমাণ না থাকলে রায় প্রদানে বিলম্ব হতো। আবু মূসা -এর উদ্দেশ্যে উমর এ-এর লিখিত পত্রের আলোচনায় আমরা যেমনটা দেখেছি। বিচারের রায় লিখে রাখার প্রচলনও ছিল না। কিছু রায় খলিফার অবগতি বা পরামর্শের জন্য তাঁর কাছে এবং রাজধানীতে পাঠানো হতো। অথবা উদ্দেশ্য থাকত শরীয়তের বিধান বর্ণনা করা বা সংশয়পূর্ণ হলে পরামর্শ চাওয়া। নয়তো বিধান কুরআন-সুন্নাহর মাঝে সুস্পষ্টভাবে থাকলে বিচারক তৎক্ষণাৎ রায় দিয়ে দিতেন। পূর্বোল্লেখিত বিধানের উৎপত্তি এবং পত্রাবলির আলোচনা থেকে আমাদের এমনটাই বুঝে আসে।
সন্ধি বিষয়ক কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্য এবং উমর-এর পত্রের কারণে বিচারক সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন উভয় পক্ষ যেন আপসে সমঝোতা করে ফেলে। তা ছাড়াও ফয়সালা আর বিধানের মাধ্যমে উভয় পক্ষের দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিচারের ফয়সালা করার পর বিচারক তা যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করতেন। সাধারণত বিচারক নিজেই তার রায়ের বাস্তবায়ন করতেন। কিংবা তার তত্ত্বাবধানে রায় বাস্তবায়িত হতো।
ন্যায় এবং ইনসাফপূর্ণ বা এর কাছাকাছি হওয়ার শর্ত সাপেক্ষে খলিফা বা প্রাজ্ঞ ব্যক্তি কিংবা বিচারক নিজেই প্রদত্ত রায়ের পর্যালোচনা করতেন। যেমনটা উমর এক পত্রে লিখেছিলেন, 'সুপথপ্রাপ্ত হয়ে আগের দিনের যে রায় থেকে আপনি মনে মনে ফিরে এসেছেন, তা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো রকম সংকোচ বোধ করবেন না।... বাতিল নিয়ে টালবাহানা করার চেয়ে হকের পথে প্রত্যাবর্তন করা শ্রেয়।'
সুস্পষ্ট বক্তব্য বা ইজমার পরিপন্থি না হলে রায় প্রত্যাহার করা হতো না। এজন্যই উমর বলেছিলেন, 'আগে আমরা যা বলেছি সেটা ছিল আমাদের অতীত ফয়সালা। আর বর্তমানে আমরা যা করব সেটাই হবে এখনকার ফয়সালা।'
রাশিদুন যুগে ওকালতি পদ্ধতির সূচনা হয়েছিল। আলি বিরোধের ক্ষেত্রে তাঁর ভাই আকিলকে উকিল নিয়োগ করতেন। আকিলের বয়স বেড়ে গেলে আলি তখন নিজের ভাতিজা আবদুল্লাহ ইবনু জাফরকে বিচারের সময় উকিল নিয়োগ করতেন। তিনি বলতেন, 'আমার উকিলের পক্ষে ফয়সালাই আমার পক্ষের ফয়সালা। আর উকিলের বিপক্ষে যে ফয়সালা হবে, সেটা আমারই বিপক্ষের ফয়সালা।'

টিকাঃ
[৩০৮] শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১২/১৫৫; উসূলুল মুহাকামাতিশ শারইয়্যাহ, পৃ. ৭০

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 রাশিদুন যুগের বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

📄 রাশিদুন যুগের বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য


আমরা বিভিন্ন কারণে রাশিদুন যুগে বিচার বিভাগের ইতিহাসের ওপর একটু বিস্তারিত আলোচনা করেছি। নববি যুগের চেয়ে এই যুগটি ত্রিশ বছরেরও অধিক দীর্ঘ। রাশিদুন যুগে ইসলামি রাষ্ট্রের আয়তন এবং জনসংখ্যা নববি যুগে ইসলামি রাষ্ট্রের আয়তন এবং জনসংখ্যা অপেক্ষা দশগুণেরও বেশি ছিল। প্রশাসনিক এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ যুগের গুরুত্ব অনেক বেশি। পরবর্তী যুগে রাশিদুন যুগের যে প্রভাব রয়েছে, সেদিক থেকেও এ যুগ বিরাট গুরুত্ব বহন করে।
নববি যুগের বিচারব্যবস্থা হচ্ছে ইসলামি বিচারব্যবস্থার শিকড়। সে হিসেবে রাশিদুন যুগের বিচারব্যবস্থাও নববি যুগের বিচারব্যবস্থার দ্বিতীয় স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে। রাশিদুন যুগের বিচারব্যবস্থা একদিকে পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এবং একটি ব্যাপক প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে। অপরদিকে ইসলামি বিচারব্যবস্থার জন্য তা এক উজ্জ্বল মাইলফলক। যাকে পরবর্তী ইসলামি যুগের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি রোল মডেল তথা আদর্শ আর নমুনা হিসেবে গণ্য করা হয়।
আমরা এখানে রাশিদুন যুগের বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতি সংক্ষেপে কেবল ইঙ্গিত প্রদান করেই ক্ষান্ত থাকছি।
১. মূলত রাশিদুন যুগের বিচারব্যবস্থা ছিল নববি যুগের বিচারব্যবস্থার একটি সুদীর্ঘ চিত্র। কারণ রাশিদুন যুগ আঁকড়ে ধরেছিল নববি যুগকে। নববি যুগকে আদর্শরূপে গ্রহণ করেছিল। রাশিদুন যুগে দ্বীনি শিক্ষা ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল। নববি যুগের ঈমান-আকীদার সাথে এ যুগের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। বিশ্বাস আর চেতনার সাথে ছিল গভীর বন্ধন। এ যুগের লোকেরা ধর্মীয় অনুশাসন এবং ইনসাফের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তাদের মামলা-মোকদ্দমা চলত একেবারেই সাদাসিধাভাবে। বিচার প্রক্রিয়া হতো একদমই সংক্ষিপ্ত। রাষ্ট্রের ব্যাপক সম্প্রসারণ, জনসংখ্যার আধিক্য, উত্তম পন্থায় বিচারক নিয়োগ এবং বিচারের পরিপূর্ণ শর্তাবলি থাকার পরও মামলা-মোকদ্দমা এবং ঝগড়া-বিবাদ ছিল নিতান্তই কম।
২. রাশিদুন যুগ ছিল ইসলামি বিচারব্যবস্থার একটি সঠিক, প্রকৃত এবং পূর্ণাঙ্গ চিত্র। এ কারণেই গবেষকদের গবেষণার উৎস ছিল এই রাশিদুন যুগ। সমস্ত ফকিহের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল এ যুগের ওপর। রাশিদুন যুগের বিচারের বিধিবিধান ও প্রশাসনিক বিচারব্যবস্থা ছিল শারঈ বিধানাবলি, বিচারের কৌশল, গবেষণা, বিভিন্ন যুগে ইসলামি আইন শাস্ত্রের অন্যতম প্রধান উৎস। এমনকি সাহিত্যগত দিক থেকেও এই যুগ সমস্ত আলিম এবং সর্বশ্রেণির কাছে সমাদৃত। অবশ্য শাখাগত এবং বিস্তারিত কোনো কোনো বিষয়ে কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও মৌলিক বিষয়ে কারোরই দ্বিমত নেই। এ কারণেই সাহাবিদের কথা দলিল হবে কি হবে না, তা নিয়ে ফিকহবিদদের মাঝে মতভিন্নতা দেখা যায়। ইসলামি ফিকহের মূলনীতি, হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা এবং ইসলামি আইনের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।
৩. খুলাফায়ে রাশিদুন এবং বিভিন্ন শহরের প্রশাসকগণ ঝগড়া-বিবাদের বিচার পরিচালনা করেছেন। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিচারকার্যও পরিচালনা করতেন। তাঁরা পরিপূর্ণ গুরুত্ব দিতেন দুর্নীতি দমন এবং তদন্তের প্রতি।
৪. খুলাফায়ে রাশিদুন রাষ্ট্রের অন্য কোনো দায়িত্বের জন্য নয়, বরং বিচারের জন্য সর্বপ্রথম এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অধিকাংশ ইসলামি শহরে বিচারক নিয়োগ দিয়েছিলেন। সর্বপ্রথম বিচার বিভাগকে অন্যান্য বিভাগ থেকে পৃথক করেছিলেন। তাঁরা এ নীতিও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন যে, বড় বড় শহরে নিয়োগকৃত বিচারকদের ওপর প্রশাসকদের কোনো কর্তৃত্ব চলবে না। আর যে সমস্ত অঞ্চলে প্রশাসকদেরকে বিচারের ক্ষমতা-সহ নিয়োগ দিয়েছেন, সেখানে তারা উভয় দায়িত্বই পালন করবেন।
৫. রাশিদুন যুগের বিচারকগণ ছিলেন মুজতাহিদ তথা গবেষক। তাঁরা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কাজ করতেন। উত্থাপিত ঘটনার সমাধান কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে খুঁজে না পেলে পূর্বসূরিদের বিচারের আলোকে এবং সমকালীন আলিমদের পরামর্শ অনুসারে নিজেরা ইজতিহাদ করে ফয়সালা করতেন।
৬. নববি যুগের বিচার পদ্ধতি অনুকরণ করে রাশিদুন যুগে অনেক নতুন নতুন ধারা-উপধারা উদঘাটিত হয়। পরবর্তীকালে সেগুলোই হয়ে গেছে বিচারিক বিধিবিধানের মৌলিক উৎস। সেসব হচ্ছে: আল-কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস তথা সাদৃশ্যলব্ধ সিদ্ধান্ত, পূর্ববর্তী বিচারাচার এবং শূরা পরিষদের অভিমত।
৭. রাশিদুন যুগে নিখুঁত বিচার বিভাগ ও সুগঠিত প্রশাসন ছিল। বিচারের যাবতীয় বিষয় পরিচালনা এবং বিচারের সাংবিধানিক নীতিমালার বর্ণনা দিয়ে উমর এবং আলি বিচারক ও প্রশাসকদের বরাবর চিঠি প্রেরণ করেছিলেন। ইতিহাসের পাতায় সেগুলো অমর হয়ে আছে। এসব চিঠি প্রেরণের পাশাপাশি খলিফাগণ বিচারকদের নজরদারিতে রাখতেন। তাদের সাথে মতবিনিময় করতেন। তাদের খবরাখবর এবং বিচারাচার সম্পর্কে জানতে চাইতেন জনসাধারণের কাছে। বিভিন্ন জটিল, নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা-মোকদ্দমা পুনরায় পর্যালোচনা করে দেখার নির্দেশ দিতেন। এটা ছিল আমিরুল মুমিনীন উমর-এর খিলাফতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উসমান -এর সময় তা কিঞ্চিৎ শিথিল হয়ে যায়। আর আলি-এর খিলাফতকালে অস্থিতিশীল পরিবেশ, নানা ধরনের ফিতনা, ব্যাপক গৃহযুদ্ধ, একাধিক সরকারি আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও শাম এবং প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাধীনতা ও বিদ্রোহের ফলে এই বৈশিষ্ট্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
৮. সমস্ত ঘটনাপ্রবাহে বিচারকের ক্ষমতা ছিল। বিচারকের ক্ষমতা থাকত সর্বব্যাপী এবং বিস্তৃত। বিচারক পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতেন। এ যুগে বিচারকদের ধরন বা প্রকার নির্দিষ্ট করার পদ্ধতি চালু হয়েছিল। কিছু বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ছোটখাটো মামলা-মোকদ্দমা দেখার জন্য। আবার গুরুতর বিচার পরিচালনার জন্য কিছু বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খলিফাগণ বিভিন্ন অপরাধ এবং দণ্ডবিধি সংক্রান্ত বিচার পরিচালনা করতেন। কোনো কোনো প্রশাসকও এই দায়িত্ব পালন করতেন। তদ্রূপ মদীনা মুনাওয়ারা, কুফা, বসরা এবং ইয়ামানের মতো বৃহৎ অঞ্চলগুলোতে একই সময়ে একাধিক বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ঠিক তেমনি প্রথমবারের মতো আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল সামরিক বাহিনীর বিচারককে।
৯. নববি যুগের বিচারিক ফয়সালা ভালোভাবে লক্ষ করা হতে থাকে। ব্যক্তিগত মতামত এবং গবেষণা তখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হতো। কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত হলেই সেটা অনুমোদিত হতো। কারণ এক গবেষণা অন্য গবেষণার মাধ্যমে বাতিল হয় না। বরং একমাত্র কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক হলেই সেটা বাতিল হয়ে যায়।
১০. আরও কিছু বিষয় রাশিদুন যুগে ছিল, যা একেবারেই নতুন। নববি যুগে তার কোনো নজির ছিল না। যেমন: বিচারকদের সরকারি বেতন-ভাতা প্রদান, নিয়মিত রেশন দেওয়া, এ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে কিছুটা বাড়তি সুবিধা দেওয়া, স্বতন্ত্র বিচারালয় প্রতিষ্ঠা এবং জেলখানার ব্যবস্থা ইত্যাদি। তদ্রূপ বড় বড় সাহাবিদের বিচারের দায়িত্ব থেকে বিরত থাকার বিষয়টিও এ যুগে প্রথমবারের মতো প্রকাশ পেয়েছিল। যেমন আবদুল্লাহ ইবনু উমর -কে খলিফা উসমান বিচারকার্যের দায়িত্ব দিতে চাইলে তিনি সম্মত হননি। কাব ইবনু ইয়াসার -কে উমর মিশরের বিচার বিভাগের দায়িত্ব দিতে চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। কারও কারও মতে, তিনি অল্প কিছুদিন বিচারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বটে। এরপর স্বেচ্ছায় অব্যাহতি দিয়ে দেন।
১১. রাশিদুন যুগে বিচার কম হওয়ায় বিচারকার্যের প্রক্রিয়া ছিল নিতান্তই সহজ-সরল। প্রথমে মামলার শুনানি হতো। তারপর পেশ করা হতো দলিল, প্রমাণ এবং যুক্তি। সবশেষে ফয়সালা শোনানো হতো। ফয়সালা প্রদানের পরপরই তা বাস্তবায়িত হয়ে যেত। বিচারকার্যের অন্যতম নীতি ছিল—দুর্বলের প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা। দুর্বলের সমর্থন এবং মজলুমের সাহায্য ছিল বিচারের মুখ্য বিষয়। বাদী-বিবাদী উভয়ের প্রতিই ইনসাফ করা হতো। ন্যায় ও আল্লাহর শরীয়ত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের টালবাহানা ছিল না। যদিও সেটা স্বয়ং খলিফা, মুসলিম শাসক বা গভর্নরের বিরুদ্ধে যায় না কেন। ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় উভয় পক্ষ ফয়সালা বাস্তবায়নে বিলম্ব বা গড়িমসি করলে সাধারণত বিচারকই তা বাস্তবায়ন করে দিতেন। ফয়সালা দেওয়ার পর তা বাস্তবায়নে অযথা বিলম্ব করা হতো না।
রাশিদুন যুগে আরও কিছু নতুন প্রশাসনিক বিষয় চালু করা হয়েছিল। যেমন উমর-এর যুগে বিচারকের জন্য মির-মুনশি নিয়োগ দেওয়া হয়। পুলিশ ফোর্স এবং বিচারক ও প্রশাসকের জন্য সহযোগী নিয়োগ দেওয়ার প্রচলন শুরু হয় উসমান-এর যুগে। তদন্তের অগ্রগতি এবং প্রকৃত সত্য পর্যন্ত পৌঁছতে সাক্ষীদের পৃথক পৃথকভাবে যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা ছিল আলি -এর যুগে প্রবাদতুল্য বৈশিষ্ট্য।

টিকাঃ
[৩৬৭] তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৭০; আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১৭ ও ৩/২২১; আল-উলাতু ওয়াল-কুদ্বাহ, পৃ. ৩০২: হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৩৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00