📄 বিচার-সংক্রান্ত বিভিন্ন চিঠিপত্র
বিচার-সংক্রান্ত গঠনমূলক এবং তাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা পরিলক্ষিত হয় খলিফাগণ লিখিত দাপ্তরিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং বিচার পরিচালনা ও শ্রেষ্ঠ বিচারব্যবস্থার দিকনির্দেশনা সংবলিত সেসব কালজয়ী চিঠিপত্রে, যা তাঁরা সমস্ত প্রদেশের গভর্নরদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন। যাতে তারা পরিপূর্ণ ইনসাফ বাস্তবায়ন করেন। মানুষের অধিকার রক্ষা এবং জুলুম-নির্যাতনের প্রতিরোধ-সহ অন্যায়ের সকল পথ বন্ধ করে দেওয়া তাদের জন্য সহজ হয়।
আবু বকর সিদ্দিকের ফরমান
বিচারব্যবস্থা পরিচালনায় আবু বকর সিদ্দিক-এর বিশেষ কোনো চিঠিপত্র ছিল না। তবে তাঁর পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন আদেশ, নির্দেশনা, তাঁর বিভিন্ন ভাষণ ও বক্তব্যে এ ব্যাপারে কিছু দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি সর্বপ্রথম যে ভাষণ প্রদান করেছিলেন, তার প্রতি আমরা শুধু ইঙ্গিত প্রদান করব। অবশ্য আমরা ইতিপূর্বেও তা উল্লেখ করেছি। সে ভাষণে তিনি বলেছিলেন, 'আমি একজন অনুসারী মাত্র; নতুন কোনো কিছুর উদ্ভাবক নই।'
উমর-কে খিলাফতের দায়িত্বভার প্রদানকালেও তিনি অনুরূপ একটা ভাষণ প্রদান করেছিলেন। যা-তে ইনসাফের প্রতি তাঁর আগ্রহ, এর গুরুত্ব এবং ইনসাফ কায়েমের ব্যাপারে তাঁর প্রত্যাশার বর্ণনা পাওয়া যায়। সে-সময় উমর-এর ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন, 'তার ব্যাপারে তো আমার এটাই ধারণা যে, সে ইনসাফ করবে। তার ব্যাপারে এটাই আমার জ্ঞান। পক্ষান্তরে রদবদল ঘটালে বলব, প্রতিটি মানুষ নিজের কর্মফল নিজেই ভোগ করবে। তবে আমি মঙ্গল চেয়েছিলাম। আর আমার তো গায়িব জানা নেই। জালিমরা অচিরেই তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল সম্পর্কে জানতে পারবে।'
উমর-এর কঠোরতার কথা সবাই জানতেন। এ ব্যাপারে আবু বকর-কে কিছু সাহাবি ভয় দেখালে তিনি বলেছিলেন, 'আপনারা কি আমাকে আল্লাহর ব্যাপারে ভয় দেখাচ্ছেন? যে ব্যক্তি আপনাদের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অন্যায় করবে, সে তো ব্যর্থ হবে। তাকে নিয়োগের ব্যাপারে প্রশ্নের সম্মুখীন হলে আল্লাহকে আমি বলব, "হে আল্লাহ! আপনার বান্দাদেরকে আপনার পছন্দকৃত উত্তম ব্যক্তির জিম্মায় রেখে এসেছি।"'
উমর ফারুকের চিঠিপত্র
উমর তাঁর নিযুক্ত প্রশাসক এবং বিচারকদের কাছে বিচার বিভাগের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক চিঠিপত্র লিখেছিলেন। যা-তে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ এবং লক্ষ্যে পৌঁছার সঠিকতম নির্দেশনা দেওয়া থাকত। উমর-এর কৃত রাষ্ট্রের সর্বজনীন এবং বিচার বিভাগের বিশেষ ব্যবস্থাপনা ছিল প্রসিদ্ধ।
উমর-এর চিঠিগুলো হতো বিভিন্ন ধরনের পরিচালনার ব্যবস্থাপনা, বিচারের কর্মপন্থা এবং শারঈ বিধিবিধানের ব্যাখ্যায় পরিপূর্ণ। ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রয়াস এবং সঠিক কর্মপন্থা বিবরণ বেশি থাকত। প্রকৃতপক্ষে তাঁর পত্রাবলি ছিল কুরআন-সুন্নাহর সারনির্যাস এবং চয়িতাংশ। ইসলামের ক্রমবর্ধমান বিজয়ের ধারা এবং মানুষের দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার বিষয়টিও তাতে উল্লেখ করা থেকে বাদ পড়ত না। আমরা এখানে তাঁর কিছু পত্রের বিবরণ উল্লেখ করব। সেগুলো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনায় পরিপূর্ণ।
আবু মূসা আশআরি -এর উদ্দেশ্যে লিখিত পত্র
বিচার বিষয়ক জরুরি এই পত্রটি বিচার-সংক্রান্ত মৌলিক নীতিমালা সংবলিত। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান তো এই পত্রটিকে كِتَابُ السَّيَاسَةِ তথা 'বিচার-সংক্রান্ত নীতিমালা' বলে নামকরণ করেছেন। সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা বলেছেন, আবু মূসা আশআরি-এর উদ্দেশ্যে উমর-এর পত্রটি ছিল নিম্নরূপ।
"পরম করুণাময় ও চিরদয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর বান্দা মুমিনদের আমির উমরের পক্ষ থেকে আবদুল্লাহ ইবনু কায়সের প্রতি। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।
পরসমাচার এই যে, বিচারকার্য তো আল্লাহর নির্ধারিত দায়িত্ব এবং অনুস্মরণীয় সুন্নাহ। আপনার কাছে কোনো বিচার এলে তা ভালোভাবে বুঝে নেবেন। কারণ যে সত্য বাস্তবায়িত হয় না, তা বলে কোনো লাভ নেই। আপনার এজলাসে এবং রায়ের ক্ষেত্রে সব মানুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখবেন। যাতে সবল আপনার প্রতি আগ্রহী হয়ে না ওঠে এবং দুর্বল আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে। প্রমাণ পেশের দায়িত্ব বাদীর এবং অস্বীকারকারীর কর্তব্য হলো শপথ করা। মুসলিমদের মাঝে আপসে সমঝোতা করা বৈধ। কিন্তু তা যেন বৈধ বিষয়কে অবৈধ এবং অবৈধ বিষয়কে বৈধ বানিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে না হয়। কেউ যদি এমন অধিকার বা প্রমাণের দাবি করে যা উপস্থিত নেই, তাহলে সেটা উপস্থিত করার মতো সময় তাকে প্রদান করুন। প্রমাণ উপস্থিত করতে পারলে তাকে অধিকার দিয়ে দেবেন। আর যদি না পারে, তবে রায় তার বিপক্ষে যাবে। কারণ সেটাই চূড়ান্ত ওজর এবং অসারতার প্রমাণ।
সুপথপ্রাপ্ত হয়ে আগের দিনের যেসব (জাহিলি) ফয়সালা থেকে আপনি মনে মনে ফিরে এসেছেন, তা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো রকম সংকোচ বোধ করবেন না। কারণ সত্য হচ্ছে চিরন্তন বিষয়। কোনো কিছুই তার মাঝে পরিবর্তন আনতে পারে না। বাতিলের ব্যাপারে টালবাহানা অপেক্ষা হকের পথে প্রত্যাবর্তন শ্রেয়। স্বাভাবিকভাবে মুসলিমরা একে অপরের ব্যাপারে বিশ্বস্ততার পরিচয় দেয়। তবে যাদের ব্যাপারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া প্রমাণিত হয়েছে, যাদের ওপর শরীয়তের দণ্ডবিধি আরোপিত হয়েছে এবং দায়িত্বের ক্ষেত্রে বা আত্মীয়তার ব্যাপারে যারা অভিযুক্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে, তাদের কথা ভিন্ন। কারণ আল্লাহ তাআলা বান্দার গোপন বিষয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। প্রমাণ এবং শপথ ব্যতীত তাদের শাস্তির বিষয়টি তিনি প্রকাশ করেন না।
কোনো মোকদ্দমার ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি হলে যদি কুরআন এবং সুন্নাহতে তার সমাধান পাওয়া না যায়, তবে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় চিন্তা করবেন। এরপর বিষয়টিকে তার অনুরূপ আগেকার মোকদ্দমাগুলোর সাথে তুলনা করবেন। তারপর দেখবেন, কোন দিকটি আল্লাহ তাআলার কাছে অধিক পছন্দনীয় এবং সৃষ্টির সাথে বেশি মিল রাখে।
সাবধান! বিচারের সময় রাগান্বিত থাকবেন না। বিরক্তির ভাব কিংবা অস্থিরতা নিয়ে বিচার করবেন না। মানুষের কষ্টের কারণ হওয়া থেকে বিরত থাকুন। মোকদ্দমা বা মোকদ্দমা দায়েরকারীর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করবেন না। কেননা ন্যায়সংগত বিচার করার মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভ হয়। এমন বিচারকের নাম মানুষ উত্তমভাবে স্মরণ করে। নিজের মধ্যে নেই এমন গুণ প্রদর্শনকারীকে আল্লাহ তাআলা ত্রুটিযুক্ত বানিয়ে দেবেন। কারণ তিনি কেবল নির্ভেজাল বিষয়ই পছন্দ করেন।
আল্লাহ তাআলার কাছে থাকা রিযিক এবং তাঁর রহমতের ভাণ্ডার সম্পর্কে আপনার ধারণা কেমন হওয়া উচিত? ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।”
ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, 'গুরুত্বপূর্ণ এই পত্রটির ব্যাপারে কোনো আলিম দ্বিমত পোষণ করেননি। এর ভিত্তিতেই তাঁরা বিচার এবং সাক্ষ্য সংক্রান্ত মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন। বিচারকার্য পরিচালনাকারী এবং ফতোয়া প্রদানকারীর এই পত্রটি নিয়ে গবেষণা করা এবং তা গভীরভাবে অনুধাবন করা উচিত।
এই পত্রটি উপদেশমালা, প্রজ্ঞা এবং দিকনির্দেশনায় পরিপূর্ণ। বিচারকার্যের ব্যবস্থাপনা এবং দাবি প্রমাণিত করার পদ্ধতি তা থেকে শেখা যায়। দাবি পেশ করার সময় বিচারক কোন ধারা অনুসরণ করবেন, দাবি এবং বিরোধ কিভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন, বাদী-বিবাদীর কথা বিচারক কিভাবে শুনবেন, প্রমাণিতকরণের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করবেন যেভাবে, বিচারের রায় প্রকাশ এবং তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং বিচারকের কাজের নীতিমালা হলো এই পত্র। প্রকারান্তরে এই পত্রটি হচ্ছে একটি অভ্যন্তরীণ খসড়া এবং বিচারের সংবিধান। ফিকহবিদগণ ফরমানটির প্রত্যেকটি ধারা-উপধারার প্রতি নির্ভরশীল।
কোনো কোনো সন্দিহান আলিম অবশ্য রিওয়ায়াত এবং সনদ বিবেচনার বিচারে পত্রটি সহিহ হওয়ার ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ইবনু হাযাম যাহিরি কিয়াসের বিপক্ষে সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকায় তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। গোল্ডযিহার এবং মার্গোলিউর মতো কিছু প্রাচ্যবিদ তো এর সমালোচনা করার সুযোগ ছাড়েননি। তবে আলিমগণ এসব দাবি খণ্ডনপূর্বক তার বিশুদ্ধতা প্রমাণিত করেছেন। কিন্তু এখানে সেসব আলোচনা করার সুযোগ নেই।
কাযি শুরাইহ বরাবর খলিফা উমরের ফরমান
শুরাইহ-এর কাছে উমর বিচার বিষয়ক অনেকগুলো ফরমান পাঠিয়েছিলেন। সেগুলোর বেশির ভাগ ছিল শারঈ বিধানের বিবরণ সংবলিত। আর কিছু ফরমানে ছিল বিচারকের বিধানের উৎসের বিবরণ। এখানে আমরা কেবল প্রথম প্রকার তথা শারঈ বিধানের বিবরণ সংবলিত ফরমানগুলো উল্লেখ করব। বিচারকের বিধানের উৎসের বিবরণ সংবলিত ফরমান আমরা রাশিদুন যুগে বিচারিক বিধানের উৎস-সংক্রান্ত আলোচনায় উল্লেখ করব।
বলে রাখা ভালো, শুরাইহ বরাবর উমর -এর প্রেরিত ফরমানাদি এবং তাঁর সূত্রে কৃত বর্ণনাগুলো নিয়ে ওয়াকি একটি পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ সংকলন করেছেন। সেখান থেকেই আমরা কিঞ্চিৎ উল্লেখ করছি:
'কোনো ব্যক্তি যদি সামান্য সময়ের জন্যও সন্তানকে স্বীকৃতি দিয়ে ফেলে, তাহলে সে আর তা নাকচ করার কোনো সুযোগ পাবে না।'
'তুমি কোনো মহিলাকে তার সম্পদের অনুমোদন কিছুতেই দেবে না, যে যাবৎ না স্বামীর কাছে তার বছর পূর্ণ হয় কিংবা সন্তান জন্ম দেয়।'
শুরাইহ বরাবর উমর লিখেছিলেন, 'ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার প্রদানের ফয়সালা করো।' অন্য বর্ণনানুসারে শুরাইহ নিজেই বলেছেন, 'উমর আমাকে ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার প্রদানের ফয়সালা করার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন।'
আবদুল্লাহ ইবনু শুবরুমাহ বলেন, হামদানের ওয়াদিআ গোত্রে একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। হত্যাকারীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। বিচারক শুরাইহ ইবনুল হারিস তখন খলিফা উমর -এর কাছে সমাধান চেয়ে পত্র লিখলে জবাবে তিনি লিখলেন, 'ওয়াদিআর ৫০ জন লোককে ভালোমতো জিজ্ঞাসাবাদ করো। তারা নিজেরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল না এবং হত্যাকারী সম্পর্কেও তারা কিছু জানে না—এই মর্মে তাদেরকে কসম করতে বলো।' শুরাইহ তখন নির্দেশমতো কাজ করে উমর-কে জানালেন। তখন খলিফা লিখে পাঠালেন, 'এই কসমের মাধ্যমে তারা হত্যার দায় থেকে মুক্তি পেয়ে গেছে বটে। কিন্তু রক্তপণ দেওয়া থেকে তারা রেহাই পাবে না। সুতরাং তাদের ওপর তুমি রক্তপণ ধার্য করে দাও।'
শুরাইহ সূত্রে শারঈ এবং ফিকহি বিধান সংবলিত আরও অনেক ফরমানের বর্ণনা পাওয়া যায়। তার কাছে উমর বেশি বেশি ফরমান প্রেরণ করতেন। কারণ সাহাবি না হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ বিধান তার জানা ছিল না। এজন্যই উমর তাকে বিচারক নিযুক্ত করার পর পত্র মারফত বিধান জানাতেন। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা সামনে আলোচনা করব। উমর তাকে বলে রেখেছিলেন, 'তোমার কাছে যদি এমন মোকদ্দমা আসে যার বিবরণ আল্লাহর কিতাবে নেই, আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহতেও এর কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছ না, এমনকি এ বিষয়ে কেউ কিছু বলেওনি, তাহলে তুমি দুটি কাজের কোনো একটি করতে পারো—চাইলে আগ বেড়ে নিজের গবেষণাপ্রসূত রায় প্রদান করবে, অথবা বিষয়টি এড়িয়ে যাবে। আমার মনে হয় এড়িয়ে যাওয়াই তোমার জন্য ভালো হবে।' অন্য বর্ণনামতে তিনি বলেছিলেন, 'তুমি চাইলে আমার সাথে পরামর্শ করতে পারো। আমার মনে হয়, আমার সাথে পরামর্শ করাটাই তোমার জন্য নিরাপদ হবে।'
শুরাইহ সূত্রে বর্ণিত আছে, উমর তাকে লিখে পাঠিয়েছিলেন, '(মূর্খদের সাথে) কোনো রকম শলা-পরামর্শ করবে না বা তর্কবিতর্কে জড়াবে না। কারও কোনো রকম অনিষ্ট করবে না। বিচারের এজলাসে বেচাকেনা করা থেকে বিরত থাকবে। রাগান্বিত অবস্থায় দুজন ব্যক্তির মাঝে ফয়সালা করতে যেয়ো না।'
মুআবিয়ার উদ্দেশ্যে পত্র
শামের প্রশাসক মুআবিয়া -এর উদ্দেশ্যে উমর কিছু পত্র লিখেছিলেন। যাতে দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করা, সুবিচার করার উপদেশ এবং বিচারের কিছু ধারার নির্দেশনা দেওয়া ছিল।
শাবি সূত্রে বর্ণিত আছে, শামের প্রশাসক মুআবিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান -এর উদ্দেশ্যে উমর ইবনুল খাত্তাব -এর লিখিত পত্রটি ছিল এমন,
'মূলকথা হলো, আপনার উদ্দেশ্যে লিখিত আমার বিচার-সংক্রান্ত এই পত্রে আপনার বা আমার নিজের কল্যাণ কামনার ক্ষেত্রে আমি কোনো ধরনের অবহেলা করিনি। সুতরাং নিজের দ্বীন নিরাপদ রাখার স্বার্থে আপনি এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ধারণ করুন, যা আপনার সৌভাগ্য বয়ে আনবে। বাদী-বিবাদী উপস্থিত হলে দেখবেন, তাদের কাছে উপযুক্ত প্রমাণ এবং অকাট্য শপথ আছে কি না। দুর্বল ব্যক্তিকে আপনার কাছে টেনে নেবেন, যাতে তার মনে সাহসের সঞ্চার হয় এবং মুখ খুলে কথা বলতে পারে। বহিরাগত লোকের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ রাখবেন। কারণ তাকে দীর্ঘসময় আটকে রাখার অর্থ তার অধিকার লঙ্ঘন করা। তার পরিবারের খোঁজখবর রাখুন। বিচারব্যবস্থাকে তোয়াক্কা করে না—এমন ব্যক্তির অধিকারই কেবল বাতিল করা যায়। ফয়সালা আপনার কাছে সুস্পষ্ট হওয়ার আগে দুই পক্ষকে আপসে মীমাংসা করে নেওয়ার সুযোগ প্রদান করবেন।'
আবু উবায়দার কাছে পত্র
আবু উবায়দা—এর উদ্দেশ্যে উমর—এর লিখিত বিচার-সংক্রান্ত পত্রটি ছিল নিম্নরূপ।
‘মূলকথা হলো, আপনার উদ্দেশ্যে লিখিত আমার বিচার-সংক্রান্ত এই পত্রে আপনার বা আমার নিজের কল্যাণ কামনার ক্ষেত্রে আমি কোনো ধরনের অবহেলা করিনি। সুতরাং নিজের দ্বীন নিরাপদ রাখার স্বার্থে আপনি এমন পাঁচটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করুন, যা আপনার সৌভাগ্য বয়ে আনবে। বাদী-বিবাদী উপস্থিত হলে আপনার কর্তব্য হলো—তাদের কাছে উপযুক্ত প্রমাণ এবং অকাট্য শপথ আছে কি না তা যাচাই করা। তারপর দুর্বল ব্যক্তিকে আপনার কাছে ঘেঁষার সুযোগ দেবেন, যাতে সে মুখ খুলে কথা বলতে পারে এবং তার মনে সাহস সঞ্চার হয়। বহিরাগত লোকের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ রাখবেন। কারণ তাকে দীর্ঘসময় আটকে রাখার অর্থ তার অধিকার লঙ্ঘন করা। তার পরিবারের প্রতি মনোযোগী থাকবেন। বস্তুত সদয় আচরণ না করা হলেই অধিকার লঙ্ঘন করা হয়। সবসময় তাদের সদয় দৃষ্টি রাখবেন। ফয়সালা আপনার কাছে সুস্পষ্ট হওয়ার আগেই দুই পক্ষকে আপসে সমঝোতা করে নেওয়ার সুযোগ দেবেন। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।'
প্রাদেশিক শাসক এবং বিচারকদের কাছে উসমানের পত্র
সরকারি কর্মকর্তাদের বরাবর উসমান অনেক চিঠি প্রেরণ করেছিলেন। সেগুলোতে সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ, দায়িত্ব পালন এবং জনগণের মাঝে ন্যায়বিচারের কথা থাকত। যেমন,
‘মূলকথা হলো, আল্লাহ তাআলা ন্যায়সংগতভাবে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। ন্যায়ানুগ পন্থাই তিনি গ্রহণ করবেন। সুতরাং ন্যায়নিষ্ঠতা বজায় রাখুন। মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রদান করুন। খুব সতর্ক থাকুন আমানতের ব্যাপারে। আমানত যথাযথভাবে পৌঁছে দিন। এমন যেন না হয় যে, আপনারাই আমানতের প্রথম খিয়ানতকারী হয়ে গেলেন। তাহলে তো পরবর্তীরা আপনাদের অর্জনে অংশীদার হবে। ওয়াদা পূর্ণ করবেন। বিশ্বস্ততা বজায় রাখবেন। ইয়াতিম এবং চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিদের সাথে অন্যায় করতে যাবেন না। কারণ আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাদের সাথে অন্যায়কারীদের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন।'
খলিফা আলির পত্র
চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং ভাষার বিশুদ্ধতায় আলি-এর খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। বিচারকার্য পরিচালনায় তিনি শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি প্রাদেশিক শাসক এবং বিচারকদের উদ্দেশ্যে কিছু পত্র প্রেরণ করেন। সঠিক নির্দেশনা, ইনসাফের সাথে সুবিচারের পদ্ধতি, বিচারক বাছাইয়ের পন্থা এবং আপামর জনগণের দেখভাল করার কথা সেসব পত্রে উল্লেখ থাকত। মিশরের প্রশাসক আশতার নাখায়িকে প্রদত্ত একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক চিঠি ইতিহাসে খ্যাতি লাভ করেছে। আমরা এখানে সেই চিঠিটির কিয়দংশ তুলে দিচ্ছি:
‘জনগণের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য নাগরিকদের সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তিকে নির্বাচন করবে। সে এমন হবে, যে কিনা মামলা-মোকদ্দমা এলে মেজাজের ভারসাম্যতা হারায় না এবং বাদী-বিবাদী তাকে উত্তেজিত করতে পারবে না। নিজের ভুল বুঝতে পারলে গোঁ ধরে থাকে না, আবার সত্য চিনতে পেরেও তা গ্রহণে গড়িমসি করে না। না সে লোভী হবে, আর না ভাসাভাসা জ্ঞান দিয়ে বিচার করবে। সন্দেহজনক বিষয়ে সে থমকে যাবে, যুক্তি-প্রমাণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে এবং ফরিয়াদির দীর্ঘ কৈফিয়ত শোনার জন্য সে থাকবে মানসিকভাবে প্রস্তুত। সূক্ষ্ম নিরীক্ষণ এবং বিশদ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মিথ্যা থেকে সত্য উদঘাটনের কাজে তাকে অবশ্যই ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। রায় প্রকাশের সময় সে হবে নির্ভীক। তোষামোদে গলে যায় আবার প্ররোচনায় পথ হারিয়ে ফেলে—এমন লোক বিচারক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। অবশ্য এই ধরনের লোকের সংখ্যা নিতান্তই কম।
এরপর সে তার রায় ভালো করে যাচাই করে দেখবে। তাকে এ পরিমাণ ভাতা নির্ধারণ করে দিয়ো যাতে তার অসৎ হওয়ার কোনো অজুহাত না থাকে, সেইসাথে মানুষের কাছে তাকে চাইতে না হয়। তাকে এমন পদে বসাবে, যাতে তোমার বিশিষ্টজনদের কেউ তার ওপর ছড়ি ঘোরাতে না পারে। ফলে সে তোমার কাছের লোকদের হম্বিতম্বি থেকে নিরাপদ থাকবে। এ ব্যাপারে তুমি বিশেষ নজর দিয়ো। কারণ ইতিপূর্বে দেশটা মন্দ লোকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যারা নিজেদের খেয়ালখুশি অনুসারে দেশ চালাত এবং এর মাধ্যমে দুনিয়া কামাই করত।'
প্রাদেশিক শাসক, বিচারক এবং কর্মচারীদের কাছে আলি অনেক চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেগুলোতে ছিল সীরাতে মুসতাকিমের ওপর অবিচল থাকা এবং শরীয়ত বাস্তবায়ন করার জন্য উৎসাহ প্রদান। জুলুম, সীমালঙ্ঘন এবং বাড়াবাড়ির ব্যাপারে তিনি সতর্ক করতেন। শরীফ রেজা সংকলিত 'নাহজুল বালাগা' গ্রন্থে এমন অনেক পত্র আছে। তবে তাতে এমন অনেক কথাও আছে—যা আলি-এর বক্তব্য বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সেটা তাঁর বক্তব্য নয়। সঠিক এবং ভুলের পার্থক্য তাতে করা হয়নি।
টিকাঃ
[২৫২] তব্যকাতু ইবনি সাদ: ৩/১৮৩
[২৫৩] তবাকাতু ইবনি সাদ: ৩/১৯৯
[২৫৪] তবাকাতু ইবনি সাদ: ৩/১৯৯-২০০
[২৫৫] পত্রটি ইমাম আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, তবারানি, বায়হাকি, দারাকুতনি-সহ অনেক ফকিহ, ঐতিহাসিক, সীরাতবিদ এবং সাহিত্যিক বর্ণনা করেছেন। দেখুন, ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৯১; সুনানুদ দারাকুতনি : ৪/২০৬; আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ লিল মাওয়ারদি, পৃ. ৭১; আল-মাবসূত লিস সারাখসি: ৬০/১৬; ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২২১।
[২৫৬] ইলামুল মুওয়াক্তিয়ীন: ১/৯২। এ কথা লেখার পরে আল্লামা ইবনুল কাইয়িম পাঁচশতেরও অধিক পৃষ্ঠা জুড়ে এর ব্যাখ্যা করেছেন।
[২৫৭] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৮
[২৫৮] আথবারুল কুদ্ধাহ লিওয়াকি: ২/১৯১
[৫৯] আখবারুল কুদ্বাহ লিওয়াকি: ২/১৮৯; তারীখুল কুদ্বাহ ফিল ইসলাম, পৃ. ১২০
[২৬০] আল-বায়ানু ওয়াত তাবয়ীন: ২/১৫০
[২৬১] আখবারুল কুদ্দাহ লিওয়াকি: ১/৭৪
[২৬২] আখবারু উমার, পৃ. ২৪৫। এই চিঠি এবং আগের চিঠিটি এক রকম হওয়ার কারণ সম্ভবত এমনটা হতে পারে যে, উমর এই একই চিঠি দুজন প্রশাসকের কাছে পাঠিয়েছিলেন।
[২৬১] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০৪
[২৬৪] নাহজুল বালাগাহ বিশারহি ইবনিল হাদীদ: ১৭/৫৮
📄 বিচারের উৎস
নববি যুগে যেসব উৎসের ওপর রাসূলুল্লাহ নিজে এবং তাঁর নিয়োগকৃত বিচারকরা নির্ভর করতেন, রাশিদুন যুগের বিচারকরাও সেসব উৎসের প্রতি নির্ভরশীল ছিলেন। অর্থাৎ কিতাব, সুন্নাহ এবং গবেষণা ছিল নববি যুগের বিচারের উৎস। তবে রাশিদুন যুগে দুটি বিষয় প্রকাশ পেয়েছিল।
প্রথমত: ব্যক্তিগত গবেষণা এবং সে অনুপাতে কাজের বিকাশ ঘটেছিল। সৃষ্টি হয়েছিল গবেষণার ভূমিকা, মাধ্যম এবং লক্ষ্য। ফলশ্রুতিতে পরামর্শ, উপদেষ্টা পরিষদ, বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্য, অভিমত এবং সাদৃশ্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রকাশ পায়।
দ্বিতীয়ত: নববি যুগে ছিল না এমন কিছু নতুন উৎস প্রকাশিত হয়। সেটা হলো এক খলিফার যুগ থেকে অন্য খলিফার যুগের মধ্যকার সৎ পূর্বসূরি তথা সাহাবি এবং তাবিয়ি থেকে প্রকাশিত বিচারের ফয়সালা।
তাহলে রাশিদুন যুগে বিচারের ছয়টি উৎস পাওয়া গেল: কুরআন, সুন্নাহ, ইজতিহাদ, ইজমা, কিয়াস (সাদৃশ্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত) এবং পূর্ববর্তী বিচারকের ফয়সালা। তবে সবগুলোই মাসআলা, ফয়সালা এবং বিধানাবলি সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ আর পরামর্শের অধীনে ছিল। এই উৎসগুলোর সমর্থনে অনেক সুস্পষ্ট বক্তব্য আর বর্ণনা পাওয়া যায়। আমরা এখানে সেগুলোর একাংশ উল্লেখ করব:
(১) মাইমুন ইবনু মিহরান বলেন, আবু বকর -এর কাছে কোনো মোকদ্দমা এলে তিনি প্রথমে কিতাবুল্লাহতে (এর হুকুম) খোঁজ করতেন। বিষয়টি সেখানে পেয়ে গেলে তিনি সে অনুযায়ী তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিতেন। পক্ষান্তরে তা যদি কিতাবুল্লাহতে না থাকত, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ তাঁর জানা থাকলে তদনুযায়ী এর ফয়সালা করে দিতেন। এ ব্যাপারে সফল না হলে সাহাবিদেরকে জিজ্ঞেস করার জন্য তিনি বেরিয়ে যেতেন। তিনি বলতেন, 'আমার কাছে এমন এমন মোকদ্দমা এসেছে। রাসূলুল্লাহ এ বিষয়ে কিভাবে ফয়সালা করেছেন, তা আপনারা জানেন কি?' তখন সাহাবিরা দলে দলে তাঁর কাছে একত্র হতেন। তাঁদের প্রত্যেকেই উল্লেখিত বিষয়ে রাসূল-এর ফয়সালা বর্ণনা করতেন। তখন আবু বকর বলতেন, 'আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা, যিনি আমাদের মাঝে এমন লোকের ব্যবস্থা করেছেন, যারা নবি-এর বক্তব্য সংরক্ষণ করে রাখে।'
পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাহতে এ বিষয়ে কোনো ফয়সালা পেতে ব্যর্থ হলে তিনি সাহাবিদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠ আর নেতৃস্থানীয়দের একত্রিত করে তাঁদের সাথে পরামর্শ করতেন। তাঁরা সবাই একটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছলে তার ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন।
অন্য বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, উমর যদি কুরআন-সুন্নাহর মাঝে কোনো সমাধান না পেতেন, তাহলে জানতে চাইতেন, 'এ ব্যাপারে কি আবু বকরের কোনো সিদ্ধান্ত আছে?' আবু বকর -এর কোনো সিদ্ধান্ত পেয়ে গেলে উমর সেটার অনুসরণ করতেন। আর না পেলে আলিমদের একত্র করে পরামর্শ করতেন। এরপর তাদের সম্মিলিত মতানুসারে ফয়সালা দিতেন।
তাহলে ফয়সালার উৎস হলো কুরআন, সুন্নাহ, উপদেষ্টা পরিষদ, ঐকমত্য, পূর্ববর্তী ফয়সালা, গবেষণা এবং অভিমত।
(২) শাবি সূত্রে বর্ণিত আছে, শুরাইহের কাছে উমর লিখেছিলেন, 'তোমার কাছে যদি এমন মোকদ্দমা আসে যার বিবরণ আল্লাহর কিতাবে নেই, আল্লাহর রাসূল-ও তেমন কোনো ফয়সালা করেননি, এমনকি ন্যায়পরায়ণ বিচারকরাও এমন কোনো ফয়সালা করেননি, তাহলে তুমি দুটি কাজের কোনো একটি করতে পারো। ইচ্ছে হলে আগ বেড়ে নিজের গবেষণাপ্রসূত রায় প্রদান করবে। অথবা তুমি চাইলে আমার সাথে পরামর্শ করতে পারো। আমার মনে হয়, আমার সাথে পরামর্শ করাটাই তোমার জন্য নিরাপদ হবে।'
অন্য বর্ণনামতে উমর বলেছিলেন, 'তোমার কাছে যদি এমন মোকদ্দমা আসে যার বিবরণ আল্লাহর কিতাবে পাওয়া যাচ্ছে না, আল্লাহর রাসূল-ও তেমন কোনো ফয়সালা করেননি, তাহলে আলিমগণের ঐকমত্য অনুসারে ফয়সালা করবে। আর যদি এমন হয় যে তার বিবরণ আল্লাহর কিতাবে নেই, আল্লাহর রাসূল-ও তেমন কোনো ফয়সালা করেননি, এমনকি এ বিষয়ে কেউই কিছু বলেননি, তাহলে দুটি কাজের কোনো একটি করার অধিকার তোমার আছে। ইচ্ছে হলে আগ বেড়ে নিজের গবেষণাপ্রসূত রায় প্রদান করবে। নয়তো বিষয়টি এড়িয়ে যাবে। আমার মনে হয় এড়িয়ে যাওয়াই তোমার জন্য ভালো হবে।
এক বর্ণনাতে আছে, শুরাইহ বলেন, উমর আমাকে বলেছিলেন, 'আল্লাহর কিতাবের যতটা তোমার কাছে স্পষ্ট, তদনুযায়ী ফয়সালা করবে। গোটা কিতাবুল্লাহ যদি তোমার জানা না থাকে, তাহলে আল্লাহর রাসূলের যতটা তোমার কাছে স্পষ্ট, সে অনুযায়ী ফয়সালা করবে। আল্লাহর রাসূলের সমস্ত ফয়সালা তোমার জানা না থাকলে হিদায়াতপ্রাপ্ত নেতাদের রায়ের যতটা তোমার কাছে স্পষ্ট, সে অনুযায়ী ফয়সালা কোরো। হিদায়াতপ্রাপ্ত নেতাদের সব রায় তোমার যদি জানা না থাকে, তাহলে নিজের গবেষণা অনুযায়ী অভিমত প্রকাশ করবে এবং আলিম ও নেককার লোকদের সাথে পরামর্শ করবে।
অন্য বর্ণনামতে উমর বলেছিলেন, 'আল্লাহর কিতাব তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলে এ ব্যাপারে আর কাউকে প্রশ্ন কোরো না। স্পষ্ট না হলে হাদিস খোঁজ করবে। হাদিস না পেলে তখন নিজের গবেষণাপ্রসূত রায় দেবে।
(৩) ইবনু সীরিন বলেন, 'অজানা বিষয়ে আবু বকর অপেক্ষা অধিক নিষ্ঠাবান কেউ নেই। আবার আবু বকর-এর পর উমর-এর চেয়ে অধিক নিষ্ঠার পরিচয়ও কেউ দিতে পারবে না। আবু বকর-এর কাছে যখন কোনো মোকদ্দমা আসত, কিন্তু কুরআনে সেটার কোনো মূলনীতি এবং হাদিসে সে সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা তাঁর নজরে আসত না, তখন তিনি নিজের গবেষণাপ্রসূত অভিমত প্রকাশ করতেন। আর বলতেন, “এটা আমার অভিমত। সঠিক হলে তা আল্লাহর তরফ হতে। আর ভুল হলে আমার পক্ষ থেকে। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।”
(৪) ইবনু শিহাব যুহরি সূত্রে বর্ণিত আছে, উমর ইবনুল খাত্তাব একবার মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে লোকসকল! আল্লাহর রাসূল যেসব সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সেসবই নির্ভুল। কেননা আল্লাহ তাঁকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিতেন। পক্ষান্তরে আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে ধারণা আর কৃত্রিমতার পর্যায়ভুক্ত।' উমর সূত্রে সুফইয়ান সাওরি বলেছেন, 'এটা উমরের অভিমত। সঠিক হলে তা আল্লাহর তরফ থেকে। আর যদি ভুল হয় তবে উমরের পক্ষ থেকে।
(৫) ইবনুল কাইয়িম বলেন, খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর উমর এ বলেছিলেন, 'আবু বকরের মত খণ্ডন করার ব্যাপারে তো আল্লাহর সামনে আমি লজ্জিত অনুভব করব। শুরাইহের কাছে প্রেরিত তাঁর আরেকটি পত্রে এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। তাতে তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহ তাআলার কিতাব অনুসারে ফয়সালা করবে। তাতে না থাকলে রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ অনুসারে করবে। তাতে না থাকলে সৎ ব্যক্তিদের ফয়সালা অনুপাতে ফয়সালা কোরো।
(৬) উসমান-এর যুগে ফয়সালার উৎস এবং বিচারের উৎস ছিল প্রথম খলিফা দুজনের যুগের মতোই। উসমান নিজেও যে তাঁদের পূর্ণ অনুসরণ করতেন, সেটা তাঁর খিলাফতের বাইয়াতের সময়কার ঘটনা থেকেই ফুটে ওঠে।
আবু ওয়াইল বলেন, আবদুর রহমান ইবনু আউফ-কে আমি বলেছিলাম, 'আপনি আলির পরিবর্তে উসমানকে খলিফা নিযুক্ত করলেন কেন?' উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'আমি তো চেষ্টার কমতি করিনি। প্রথমে তো আলির কাছেই গিয়েছিলাম। তাঁকে বলেছিলাম, "আপনি কি কুরআন, সুন্নাহ এবং আবু বকর আর উমরের জীবনচরিত অনুসারে চলার জন্য আমার বাইয়াত গ্রহণ করবেন?” উত্তরে তিনি বলেছিলেন, "তোমাদের সাধ্যানুসারে চেষ্টা করব।" তারপর উসমানের কাছে একই কথা বললে তিনি সম্মতি প্রকাশ করেছিলেন।
(৭) সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব আলি-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, 'আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল! এমন অনেক বিষয় আমাদের সামনে আসে, যে সম্পর্কে কুরআনে কিছু অবতীর্ণ হয়নি, এমনকি সে বিষয়ে আপনার কোনো সুন্নাহও পাওয়া যায় না।” উত্তরে তিনি বললেন, "আলিমদের বা ইবাদতগুজার মুমিনদের একত্র করে তোমাদের উপদেষ্টা বানিয়ে নেবে। তাতে একজনের মতের মাধ্যমে অপরের মত খণ্ডন করবে না।"
(৮) সাহাবিদের অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়ে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেছেন, 'কেউ যদি আদর্শ গ্রহণ করতে চায়, তাহলে তার উচিত রাসূলুল্লাহ-এর সাহাবিদের আদর্শ গ্রহণ করা। কারণ তাঁরা এই উম্মতের মাঝে সর্বাধিক পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের অধিকারী। তাঁদের ইলম সবচেয়ে গভীর। তাঁদের মাঝে লৌকিকতা কম। তাঁরা সঠিক পথের দিশাপ্রাপ্ত এবং সর্বোত্তম মানুষ। নবিজির সংস্পর্শ এবং দ্বীন কায়েমের জন্য আল্লাহ তাঁদের নির্বাচন করেছেন। সুতরাং তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন করো এবং তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো। কেননা তাঁরাই সঠিক পথে অবিচল আছে।
সারকথা, নববি যুগের বিচারের উৎসই কিছুটা বিশদ আকারে রাশিদুন যুগে বিচারের উৎস ছিল। অর্থাৎ কুরআন, সুন্নাহ এবং গবেষণা। তবে এই গবেষণার মাঝে কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। নতুন নতুন বিষয়ের উদ্ভাবন ঘটায় নববি যুগের তুলনায় তাতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছিল। গবেষণার পদ্ধতিও তখন কিছুটা ভিন্ন হয়ে যায়। যেমন,
(ক) ইজমা তথা বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্য
কুরআন-সুন্নাহর মাঝে ফয়সালার ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া না গেলে বিচারক তখন আলিমদের শরণাপন্ন হতেন। সাহাবি আর ফিকহবিদদের সামনে বিষয়টি উপস্থাপন করে তাঁদের পরামর্শ চাইতেন। পর্যালোচনা-গবেষণা করে সর্বসম্মতিক্রমে তাঁরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হতেন, সেটাই হলো ইজমা তথা ঐকমত্য। অর্থাৎ কোনো শারঈ বিষয়ে উম্মতে মুহাম্মাদির গবেষকদের একমত পোষণ করা। এটা হচ্ছে শরীয়তের তৃতীয় উৎস। যা রাশিদুন যুগে প্রথম প্রকাশ পায়। এ ব্যাপারে অনেক সুস্পষ্ট হাদিস বর্ণিত হয়েছে। ফিকহ ও ফিকহের মূলনীতির গ্রন্থ এবং শরীয়তের ইতিহাসে এ সংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনা পাওয়া যায়।
তবে ফয়সালা এবং মাসআলার ক্ষেত্রে ইজমা বা ঐকমত্য খুব কমই সংঘটিত হয়েছে। কারণ খিলাফতের রাজধানী মদীনা মুনাওয়ারাতে অনেক সাহাবি, আলিম এবং ফিকহবিদগণ বসবাস করতেন। তাই সেখানে যেমন ঐকমত্য হওয়া সম্ভব ছিল, অন্যান্য শহরে তেমনটা ছিল না।
মৃত ব্যক্তির একাধিক ভাই না থাকলে তার মা ত্যাজ্য সম্পত্তির ১/৩ (এক-তৃতীয়াংশ) পাবেন। পক্ষান্তরে কয়েকজন ভাই থাকলে মায়ের অংশ কমে ১/৬ (এক-ষষ্ঠাংশ) হয়ে যাবে। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস একবার খলিফা উসমান -কে বলেছিলেন, 'আরবিতে أَخُ (ভাই) শব্দটির দ্বিবচন বোঝাতে أَخَوَانِ ব্যবহৃত হয়। উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আয়াতটিতে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির কয়েকজন ভাই থাকলে তার মা ১/৬ পাবেন। এখানে إِخْوَةٌ (কয়েকজন ভাই) তথা বহুবচনের শব্দ এসেছে। কিন্তু দুজন ভাই থাকলেও মৃত ব্যক্তির মায়ের হিস্যা ১/৩ থেকে ১/৬ হয়ে যায় কেন?' উত্তরে উসমান বলেছিলেন, 'প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমার পূর্ববর্তীদের যুগ থেকে যে রীতি চলে আসছে, তা থেকে তো আমি সরতে পারি না।'
অর্থাৎ ইবনু আব্বাস প্রশ্ন করার আগেই এ বিষয়ে ইজমা সংঘটিত হয়ে গেছে। সুতরাং তার প্রশ্নের কারণে এখানে মাসআলার রদবদল হবে না।
পরামর্শ, গবেষণা এবং ঐকমত্য হচ্ছে ইজমার প্রধান তিন উপকরণ। এই উপকরণ তিনটির কোনো একটি না পাওয়া গেলে বিচারক পরবর্তী উৎসের দিকে মনোনিবেশ করবেন।
(খ) পূর্ববর্তী ফয়সালা
অর্থাৎ বিগত খলিফা, নেককার ব্যক্তি এবং প্রবীণ সাহাবিদের ফয়সালা আছে কি না, তা যাচাই করা। যেমন আবু বকর-এর রায় এবং বিচারক ও প্রাদেশিক শাসকদের প্রতি তাঁর নির্দেশনা সম্পর্কে উমর-এর সুস্পষ্ট বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তদ্রূপ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস-ও স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, 'আলি-এর কোনো ফয়সালা বা ফতোয়ার কথা যদি আমরা জানতে পারি, তাহলে সেটা টপকে অন্য কারও ফয়সালা বা ফতোয়ার দিকে আমরা যাব না।'
এ বিষয়টি ইবনুল কাইয়িমও সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন। 'সাহাবিদের অভিমত আমাদের নিজেদের অভিমত অপেক্ষা শ্রেয়'—এই শিরোনামের অধীনে তিনি লিখেছেন, 'যারা এই স্তরভুক্ত, তাঁদের অভিমত তো আমাদের জন্য আমাদের নিজেদের অভিমত অপেক্ষা উত্তম হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেনই-বা তাঁদের অভিমত উত্তম হবে না? সেসব তো এমন অন্তর থেকে এসেছে—যা নূর, ঈমান, ইলম ও হিকমত দিয়ে পরিপূর্ণ। সেসব অন্তরের ধারকগণ তো স্বয়ং আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল থেকে ইলম ও ফাহম তথা জ্ঞান ও বুঝ লাভ করেছেন। তাঁদের মাঝে ছিল উম্মতের প্রতি কল্যাণকামিতা। তাঁদের অন্তর এবং রাসূলের অন্তর ছিল সরাসরি। রাসূল এবং তাঁদের মাঝে কোনো গ্যাপ ছিল না। নবুওয়তের দীপাধার থেকে সতেজ ঈমান এবং টাটকা ইলম তাঁরা ধারণ করতেন। যার মাঝে কোনো ধরনের সংশয় বা আপত্তি ছিল না। বৈপরীত্যের মাধ্যমে যা কলুষিত হয়নি। সুতরাং যে কিয়াস তাঁদের অভিমতের পরিবর্তে অন্যদের অভিমতে সমৃদ্ধ, সেটা সুশৃঙ্খল কিয়াস নয়।
(গ) কিয়াস
পূর্ববর্তী ফয়সালাও তেমন পাওয়া যেত না। বিচারক যদি কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বক্তব্য অথবা ইজমা কিংবা পূর্ববর্তী ফয়সালা না পেতেন, তখন তিনি মুআয -এর মতো ইজতিহাদ বা গবেষণার ওপর নির্ভর করতেন। গবেষণার প্রথম স্তর ছিল সুস্পষ্ট বক্তব্যবিহীন মাসআলাকে সুস্পষ্ট বক্তব্য আছে এমন মাসআলার সাথে তুলনা বা কিয়াস করা। এটা শরীয়ত, ইসলামি ফিকহ এবং বিধানাবলির চতুর্থ উৎস। আবু মূসা আশআরি -কে এটার নির্দেশনা দিয়ে উমর বলেছিলেন, 'এরপর বিষয়গুলো পরস্পর তুলনা (কিয়াস) করবেন। অনুরূপ বিষয়গুলো তখন ভুলে যাবেন না যেন। তারপর যে বিষয়টি আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয় এবং ন্যায়ের সাথে অধিক সংগতিপূর্ণ বলে মনে করবেন, সেটির ওপরই নির্ভর করবেন।'
ইবনুল কাইয়িম ‘আকস্মিক ঘটনার ক্ষেত্রে সাহাবিদের ইজতিহাদ এবং তাঁদের কিয়াস অবলম্বন’–এই শিরোনামের অধীনে বিষয়টির বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ -এর সাহাবিগণ আকস্মিক ঘটনার ক্ষেত্রে ইজতিহাদ করতেন। কিছু বিধানকে কিছু বিধানের সাথে কিয়াস করা এবং কোনো বিধানকে তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বিধানের সাথে মিলানো ছিল তাঁদের রীতি। আলি বলেছেন, দাবির সপক্ষে প্রমাণ পেশ এবং কল্যাণের দিকটি লক্ষ করে ব্যক্তির সপক্ষে ফয়সালা দেওয়া হবে। এমনটা না থাকলে মোকদ্দমাটি উপেক্ষা করা হবে। সত্য জানা যাবে জ্ঞানীদের কাছে তুলনার মাধ্যমে।
(চ) রায় বা অভিমত
মোকদ্দমার বিষয়টির যদি সুস্পষ্ট বক্তব্যের সাথে তুলনাযোগ্য কোনো মূলনীতি না থাকে, তাহলে বিচারক গবেষণা করে এমন একটি অভিমত প্রদান করতেন—যা ন্যায়, ইনসাফ এবং নির্ভুলের কাছাকাছি হয়। এ ক্ষেত্রে শারঈ নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে শরীয়তের উদ্দেশ্যের অনুকূলে তার অবস্থান থাকত। বিচারক শুরাইহ-সহ অন্যদের কাছে উমর -এর প্রেরিত পত্রাদিতে এ বিষয়টি তিনি বারংবার উল্লেখ করেছেন।
সুফইয়ান ইবনু উয়াইনা উল্লেখ করেছেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস -এর কাছে কোনো বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কিতাবুল্লাহর মাঝে উত্তর খোঁজ করতেন। সেখানে পেয়ে গেলে জবাব দিয়ে দিতেন। অন্যথা রাসূল -এর সুন্নাহর মাঝে দেখতেন। সেখানে পেয়ে গেলে জবাব দিয়ে দিতেন। সেখানেও না পেলে দেখতেন, আবু বকর এবং উমর এ সম্পর্কে কিছু বলেছেন কি না। তাঁদের কোনো বক্তব্য না পেলে অবশেষে নিজের গবেষণাপ্রসূত রায় প্রদান করতেন।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, ‘কারও কাছে মোকদ্দমা পেশ করা হলে সে যেন আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফয়সালা করে। আল্লাহর কিতাবে নেই—এমন বিষয় উপস্থাপিত হলে নবি -এর বিচারকার্য অনুপাতে ফয়সালা করবে। এমন মোকদ্দমা যদি সামনে আসে—যার বিবরণ আল্লাহর কিতাবেও নেই, আবার নবিজিও তেমন বিচারকার্য পরিচালনা করেননি, তবে নেককার ব্যক্তিদের কথা অনুসারে ফয়সালা করবে। আর যদি এমন মোকদ্দমা সামনে আসে—যার বিবরণ আল্লাহর কিতাবেও নেই, নবিজিও তেমন কোনো বিচারকার্য পরিচালনা করেননি, এমনকি নেককার ব্যক্তিরাও সে ব্যাপারে কিছু বলেননি, তাহলে নিজের ইজতিহাদ অনুপাতে ফয়সালা করবে। কেউ যদি ভালোমতো গবেষণা করতে না পারে, তাহলে লজ্জা কাটিয়ে বিষয়টি স্বীকার করে নেবে।'
এখানে শেষ বাক্যটি অন্য বর্ণনায় এসেছে এভাবে, ‘কেউ যদি ভালোমতো গবেষণা করতে না পারে, তাহলে লজ্জা না করে উঠে যাবে।
একবার এক মহিলার স্বামী তাকে সঙ্গদানের আগেই মৃত্যুবরণ করে। তখন মহিলাটি স্বামীর উত্তরাধিকার এবং মাহর পাবে কি না, এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ -এর কাছে জানতে চাওয়া হয়। প্রথমে তিনি এ মাসআলার সমাধান দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর লোকদের পীড়াপীড়িতে এক মাস সময় চেয়ে নেন। দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর অবশেষে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমি নিজের গবেষণা অনুসারে মতামত দিচ্ছি। সঠিক হলে সেটা আল্লাহর তরফ থেকে, আর ভুল হলে সেটি আমার এবং শয়তানের পক্ষ থেকে। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল এ ব্যাপারে দায়মুক্ত। মহিলাটি মাহরে মিসিল পাবে। কোনো ধরনের অবমূল্যায়ন বা কমতি করা হবে না। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতেও তার অংশ থাকবে। সেইসাথে ইদ্দত পালন করাও তার জন্য আবশ্যক হবে।'
আবদুল্লাহ -এর কথা শুনে আশজা গোত্রীয় কিছু লোক দাঁড়িয়ে বলল, 'আমাদের গোত্রের বারওয়া বিনতু ওয়াশিক নামের এক মহিলার ক্ষেত্রেও নবি এমনটাই রায় দিয়েছিলেন।'
এ কথা শুনে ইবনু মাসউদ -এর আনন্দের সীমা ছিল না। ইসলাম গ্রহণের পর সেদিনটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বেশি আনন্দের দিন।
পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি, নিজ গবেষণাপ্রসূত অভিমত প্রকাশ করার সময় আবু বকর বলতেন, 'এটা আমার অভিমত। সঠিক হলে তা আল্লাহর তরফ হতে। আর ভুল হলে আমার পক্ষ থেকে। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।'
পরামর্শ এবং উপদেষ্টা পরিষদ ছিল বিচারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। পূর্বে এ সংক্রান্ত বর্ণনা, পত্র এবং ফরমান আমরা উল্লেখ করেছি। দ্বীনের সুগভীর পাণ্ডিত্য থাকার পরও উমর নিজে পরামর্শের ব্যাপারে যত্নবান থাকার পাশাপাশি অন্যদেরও এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন। প্রবীণ সাহাবি এবং ফিকহবিদদের সাথে পরামর্শ না করে তিনি সাধারণত ফয়সালা করতেন না।
শাবি বলেছেন, উমর-এর কাছে মোকদ্দমা আসত। অনেক সময় রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এক মাস পর্যন্ত চিন্তাভাবনার সময় নিতেন এবং সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতেন। 'ধীরস্থিরতা আল্লাহর তরফ থেকে এবং তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে'—এই হাদিসের ওপর তাঁর আমল ছিল। আবু বকর এবং উমর উভয়েই উসমান ইবনু আফফান-এর সাথে পরামর্শ করতেন। বড় বড় আর গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ তাঁর পরামর্শ মোতাবেক করেছেন।
একই অভ্যাস উসমান-এরও ছিল। আবদুল্লাহ বা আবদুর রহমান ইবনু সাঈদ বলেছেন, উসমান একদিন মসজিদে ছিলেন। এমন সময় দুজন লোক তাঁর কাছে মোকদ্দমা নিয়ে এল। খলিফা তখন একজন লোককে বললেন, 'যাও, আলিকে ডেকে আনো।' আরেকজনকে বললেন, 'তালহা, যুবাইর এবং আবদুর রহমানকে ডেকে আনো।' সবাই এসে বসলে খলিফা তখন বাদী-বিবাদীর কথা শুনলেন। তারপর ডাকিয়ে আনা সাহাবিদের বললেন, 'আমাকে পরামর্শ দিন।' তাঁদের বক্তব্য খলিফার মতের অনুকূলে হলে তিনি তৎক্ষণাৎ ফয়সালা করে দিতেন। অন্যথা চিন্তাভাবনা করার জন্য কিছুটা সময় নিতেন। আগত সাহাবিরাও বিষয়টি খলিফার কাছে ন্যস্ত করে চলে যেতেন।
উবাই, যায়িদ, ইবনু উমর, ইবনু আব্বাস এবং আবু হুরায়রা সূত্রেও এমনটা বর্ণিত আছে।
টিকাঃ
[২৬৫] সুনানুদ দারিমি: ১৬৩; ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৬৫; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ২০
[২৬৬] ইলামুল মুওয়াকিয়ীন: ১/৬৬
[২৬৭] আখবারুল কুদ্দাহ লিওয়াকি: ২/১৮৯
[২৬৮] আখবারুল কুদ্দাহ লিওয়াকি: ২/১৯০
[২৬৯] ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/২২৪; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২১
[২৭০] ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৯১
[২৭১] ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৫৭ এবং ৮৮
[২৭২] সুনানু আবি দাউদ: ৩৫৮৬; ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৫৭
[২৭৩] ইলামূল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৫৮
[২৭৪] ইলামূল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/২২৪
[২৭৫] ইলামূল মুওয়াক্বিয়ীন: ২/১৮৬, ২৩৬
[২৭৬] তারীখুল খুলাফা সিসসুযুতি, পৃ. ১৫৪
[২৭৭] ইলামূল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৬৮
[২৭৮] আল-জামিউ লিআহকামিল কুরআন: ১/৬০
[২৭৯] সূরা নিসা (৪) এর ১১ নং আয়াতের কথা বলা হয়েছে।- অনুবাদক
[২৮০] বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় বচন দুই প্রকার হলেও আরবি ভাষায় বচন তিন প্রকার। এ কারণেই ইবনু আব্বাস প্রশ্নটি করেছিলেন।- অনুবাদক
[২৮১] আল-মুহাল্লা: ৯/২৫৮
[২৮২] আখবারুল কুদ্দাহ লিওয়াকি: ১/১১
[২৮৩] ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৮৭
[২৬৪] ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৯২
[২৮৫] ইলামুল মুওয়াকিয়ীন: ১/২২২
[২৮৬] অভিমত অনুসারে ফয়সালা এবং গবেষণা করা বলে প্রশংসিত অভিমত উদ্দেশ্য। যে নিন্দনীয় অভিমত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সেটা এখানে উদ্দেশ্য নয়। এই দুই ধরনের অভিমতের পার্থক্য নিরূপণে আলিমগণ অনেক ধরনের মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন। প্রয়োজনে ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৭০ দেখুন।
[২৮৭] ইলামুল মুওয়াক্তিয়ীন: ১/৬৭
[২৮৮] আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন: ৭০৩০
[২৮৯] আথবারুল কুদ্দাহ লিওয়াকি: ১/৭৬; ইলামুল মুওয়াকিয়ীন: ১/৬৭
[২৯০] ইলামুল মুওয়াক্তিয়ীন: ১/৬৭ ৩৮৭
[২৯১] ইলামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ১/৮৮; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ৯৪
[২৯২] আল-মাবসুত লিসসারাখসি: ১৬/৮৪; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০২, ১০৩ এবং ১০৫
[২৯৩] আখবারুল কুদ্ধাহ লিওয়াকি: ১/১১০; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৪৬
[২৯৪] ইলামূল মুওয়াক্তিয়ীন: ১/৬৭-৬৮