📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারের কার্যালয় এবং বন্দিশালা

📄 বিচারের কার্যালয় এবং বন্দিশালা


আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, নববি যুগে বিচারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা ছিল না। কারণ, ইনসাফ কোনো স্থানের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। সত্য প্রকাশিত হবেই, তা যেখানেই হোক না। আবু বকর এবং উমর -এর যুগ এভাবেই চলছিল। বিচারক মামলার বিষয় পর্যবেক্ষণ করে সাধারণত মসজিদে বা ঘরে, কিংবা অন্য কোনো স্থানে ফয়সালা করে দিতেন। কখনো কখনো তো রাস্তাতেও মীমাংসা করে দেওয়া হতো। এভাবে বিচারের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না হওয়ার কিছু কারণ তো আমরা আগে উল্লেখ করেছি। সেগুলো ছাড়াও আরও কিছু কারণ ছিল এমন:
প্রথমত, মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যাধিক্য ছিল না। দ্বিতীয়ত, মসজিদের কর্মপরিধি ছিল ব্যাপক। তৃতীয়ত, মামলা হতো দীর্ঘসূত্রিতামুক্ত এবং বিচারের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। ফলে বিচারব্যবস্থা হতো ফতোয়া বা সালিশির মতো।
উসমান তাঁর শাসনামলে বিচারের জায়গা নির্দিষ্ট করার জন্য একটি কার্যালয় তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল: বিচারের সময় যে শোরগোল হয় তা থেকে মসজিদকে মুক্ত রাখা। মসজিদ যাতে অনর্থক কাজকর্ম থেকে পবিত্র থাকে। তাহলে বিচারে মানুষের অংশগ্রহণের জায়গা প্রশস্ত থাকবে। সে হিসেবে উসমান-ই সর্বপ্রথম মদীনাতে স্বতন্ত্র বিচারালয় নির্মাণ করেন। তারপর ধীরে ধীরে অন্যান্য শহর আর অঞ্চলে এ ব্যবস্থাপনার বিস্তার ঘটে।
কিন্তু এর মানে এটা নয় যে, বিচারকগণ মসজিদে বা ঘরে সাধারণ আর ছোটখাটো বিচারকার্য পরিচালনা থেকে বিরত থাকতেন। বরং বিচারের প্রধান প্রধান এবং সরকারি বৈঠকগুলো বিচারালয়ে অনুষ্ঠিত হতো। আর অন্যান্য সাধারণ বিচার মসজিদে বা ঘরেই হতো। এ কারণেই শোরগোল আর হইচই হয় বিধায় কোনো কোনো ফিকহবিদ মসজিদে বিচারকার্য পরিচালনা মাকরুহ বলেছেন। তা ছাড়া বিচারালয়ে বিচারকের ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করাও সহজ হয়।
নববি যুগে অভিযুক্ত ব্যক্তি আর অপরাধীকে বন্দি করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বন্দিশালা ছিল না। সে-সময় কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বন্দি করতে হলে তাকে মসজিদে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হতো। কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ ও চোখে-চোখে রাখার জন্য কোনো একজন মুসলিমকে দায়িত্ব দেওয়া হতো। নয়তো তাকে কোনো মুসলিমের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেখানে সে মেহমান হিসেবে থাকত। মেজবানের দায়িত্ব থাকত তাকে পাহারা দিয়ে রাখা এবং বিচারের সময় তাকে উপস্থিত করা। উমর-এর শাসনামলের প্রায় অর্ধেক সময় পর্যন্ত বন্দি করার বিষয়টি এভাবেই চলে আসছিল। অবশেষে উমর জেলখানা নীতির প্রচলন করেন। বিচারক, শাসক এবং সরকারি কর্মকর্তাগণ যাকে বন্দি করা দরকার বলে মনে করতেন, তাকে সেখানে আটক রাখতেন। পরিবেশ-পরিস্থিতির বিবেচনায় পরবর্তীকালে এভাবেই সকল বিভিন্ন শহরে জেলখানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রসার লাভ করে।
নাফে ছিলেন উমর কর্তৃক নিযুক্ত মক্কার প্রশাসক। তিনি উমর-এর আদেশে মক্কায় সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া থেকে জেলখানা বানানোর জন্য একটি বাড়ি কিনেছিলেন। শর্ত ছিল, উমর অনুমোদন না দিলে সেটা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। অবশেষে খলিফার অনুমোদনে সেটা জেলখানা হিসেবে ব্যবহার শুরু করা হয়।
আলি ঋণের কারণে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে বন্দি করতেন না। তিনি বলতেন, 'এটা জুলুম।' তিনি আরও বলতেন, 'একজন মানুষের অপারগতা জানার পর তাকে কারাগারে বন্দি রাখা ঠিক নয়।

টিকাঃ
[২৪৯] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৬; তুরাসুল খুলাফাইর রাশিদিন, পৃ. ১৬৪
[২৫০] বায়হাকি: ৬/৩৪; আল-মাদখালুল ফিকহিল আম: ১/৪৯৮
[২৫১] আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৬২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00