📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারকদের বেতন-ভাতা

📄 বিচারকদের বেতন-ভাতা


বিচারক হচ্ছেন নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। প্রশাসকের মতো তিনিও নিজেকে মুসলিমদের জনস্বার্থে নিয়োজিত রাখেন। তাই তার বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা মুসলিমদের একান্ত কর্তব্য। মক্কার প্রশাসক আত্তাব ইবনু উসাইদ বিভিন্ন শহরে নিযুক্ত কিছু প্রশাসকদের জন্য রাসূলুল্লাহ ভাতা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।
আবু বকর খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর মুসলিমরা তাঁর জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। যাতে তিনি ব্যক্তিগত আয়-রোজগারের পেরেশানি থেকে মুক্ত হয়ে মুসলিমদের রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে নির্বিঘ্নে আত্মনিয়োগ করতে পারেন। খলিফা এবং তাঁর পরিবারের প্রয়োজন মিটে যায় এ পরিমাণ ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। উমর এবং তাঁর পরবর্তীদের সময়ে ভাতা নির্ধারণের বিষয়টি এভাবেই চলত।
রাশিদুন যুগে অধিকাংশ প্রশাসক, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিচারকদের ভাতার বিষয়টি এভাবেই চলে আসছিল। কিন্তু নববি যুগে এবং আবু বকর -এর যুগে বিচারের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিয়োগ দেওয়া এবং তার জন্য ভাতা নির্ধারণের বিষয়টি পাওয়া যায় না। নববি যুগের পর বেতনের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থাপনা না থাকলেও খলিফার জন্য ভাতা নির্ধারিত ছিল। সেইসাথে আগে থেকেই প্রশাসন এবং বিচারের দায়িত্ব পরিচালনা করে আসা প্রশাসকরাও কিছু সুবিধা পেতেন।
এরপর উমর -এর শাসনামলে তিনি বিচারের জন্য বিশেষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেন। তাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন-ভাতা নির্ধারণ করেন। এ আইন প্রবর্তন করেন যে, বিচারকরা সরাসরি বাইতুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অথবা বাইতুল মালের যে-কোনো বিভাগ থেকে, কিংবা দেশের বা অন্য শহরের খিলাফতের যে-কোনো অফিস থেকে বেতন তুলতে পারবেন। মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করতে তারা নিজেদের অন্য কোনো ব্যস্ততা থেকে মুক্ত রেখেছেন বলেই এই সুবিধা তারা পেতেন। কারণ বিচারকরা জীবিকার জন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হলে সাধারণ জনগণের অধিকার খর্ব হবে।
ওপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, উমর-ই সর্বপ্রথম বিচারকদের জন্য সরকারিভাবে ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই বাইতুল মাল পরিপূর্ণ প্রশাসনিকভাবে গঠিত হয়। প্রশাসনিক অন্যান্য বিভাগের মতো বাইতুল মালের কার্যক্রম এবং নীতিমালাও তিনি নির্ধারণ করেছিলেন। প্রশাসকদের কার্যক্রম থেকে বিচারকদের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পূর্ণ পৃথক বানিয়ে দিয়েছেন। বিচারকদের বেতন নির্ধারণের ধারাবাহিকতায় সুলাইমান ইবনু রবীআ আল-বাহিলির জন্য বরাদ্দ করেছিলেন মাসিক পাঁচশ দিরহাম এবং শুরাইহের জন্য একশ দিরহাম।
পূর্বে নাফে সূত্রে ওয়াকি-এর বর্ণনা আমরা উল্লেখ করেছি, যায়িদ ইবনু সাবিত-কে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর উমর তার জন্য ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন। এ ছাড়াও আম্মার ইবনু ইয়াসির, উসমান ইবনু হুনাইফ এবং আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ-কে কুফায় পাঠিয়ে তাদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেন। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ কুফাবাসীদের শিক্ষকতার পাশাপাশি বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। সেখানকার রাষ্ট্রীয় কোষাগার দেখাশোনার দায়িত্বও তার ছিল। তার বেতন ছিল মাসে একশ দিরহাম এবং দিনে একটি বকরির এক-চতুর্থাংশ।
বিচারকদের বেতন বৃদ্ধির ব্যাপারে উমর সবসময় সচেষ্ট থাকতেন। কেননা তাদের বেতন বৃদ্ধিতে জনস্বার্থ জড়িত থাকে। মুআয ইবনু জাবাল এবং আবু উবায়দা-কে শামে পাঠানোর সময় খলিফা তাদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, 'আপনাদের পক্ষ থেকে কিছু যোগ্য লোক দেখে বিচারকের দায়িত্বে নিয়োগ দিন। তাদের বেতন বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহ তাআলার দেওয়া সম্পদ থেকে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দিন।
উসমান-এর শাসনামলে বিচারকদের ভাতার বিষয়টি উমর-এর যুগের মতোই অব্যাহত ছিল। বরং উসমান-এর সময়ে বিচারক, প্রশাসক-সহ তাবৎ মানুষের বেতন-ভাতা আগের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। হাসান বসরি বলেছেন, 'উমর এবং উসমান উভয়ই ইমাম, মুয়াযযিন, শিক্ষক এবং বিচারকদের বেতন-ভাতা দিতেন।'
আলি -এর যুগেও বিষয়টি এভাবেই চলছিল। বিচারকদের ভাতা বৃদ্ধির জন্য উমর -এর নীতি আলি -এর জন্য সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিল। বিচারকের ব্যাপারে মিশরের প্রশাসক আশতার -কে আলি বলেছিলেন, 'বিচারকের জন্য এ পরিমাণ খরচ করবে, যার মাধ্যমে তার সংকট দূর হয়ে যাবে। প্রয়োজনে মানুষের কাছে তার হাত বাড়ানোর দরকার পড়বে না।'
বিচারক শুরাইহ -এর নির্ধারিত মাসিক ভাতা যেখানে ছিল পাঁচশ দিরহাম, সেখানে খলিফাতুল মুসলিমীন আলি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অল্পেতুষ্ট দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি। সামান্যতেই পরিতৃপ্ত হতেন তিনি। বাইতুল মাল থেকে পাওয়া দৈনিক এক পাত্র পরিমাণ ছারিদই তাঁর যথেষ্ট হয়ে যেত।
এভাবেই বাইতুল মাল থেকে প্রশাসক, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিচারকদের প্রয়োজন অনুপাতে দেশভিত্তিক বেতন-ভাতা প্রদান করা হতো। বিচারকদের ভাতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য ছিল একেবারে সুস্পষ্ট। এমনকি বিচারকগণ তাদের বেতন অগ্রীম পেতেন।

টিকাঃ
[২৩৯] আখবারু উমার, পৃ. ৩৪৮; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়িয়্যাহ : ১/১৯১
[২৪০] আখবারু উমার, পৃ. ৩৫০
[২৪১] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৯; আখবারু উমার, পৃ. ১৪৬; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৪৮; তারীখুল কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৬২
[২৪২] আখবারুল কাদ্বা লিওয়াকি: ১/১০৮; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৪৭
[২৪৩] আখবারু উমার, পৃ. ১৪৫; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৪৬-৪৭
[২৪৪] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩২৬; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২১১; আল-মুগনি: ১০/৩৪
[২৪৫] উসমান নিজে ছিলেন হাতখোলা ব্যক্তি। সাধারণ মানুষ এবং সরকারি কর্মকর্তাদেরও তিনি হাত খুলে দান করতে উৎসাহিত করতেন। আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৫৫ দ্রষ্টব্য।
[২৪৬] আখবারু উমার, পৃ. ১৪৫; শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১৭/৫৯
[২৪৭] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৯; আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/২২৮; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৫৩
[২৪৮] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৪৭; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ৩০

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারের কার্যালয় এবং বন্দিশালা

📄 বিচারের কার্যালয় এবং বন্দিশালা


আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, নববি যুগে বিচারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা ছিল না। কারণ, ইনসাফ কোনো স্থানের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। সত্য প্রকাশিত হবেই, তা যেখানেই হোক না। আবু বকর এবং উমর -এর যুগ এভাবেই চলছিল। বিচারক মামলার বিষয় পর্যবেক্ষণ করে সাধারণত মসজিদে বা ঘরে, কিংবা অন্য কোনো স্থানে ফয়সালা করে দিতেন। কখনো কখনো তো রাস্তাতেও মীমাংসা করে দেওয়া হতো। এভাবে বিচারের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না হওয়ার কিছু কারণ তো আমরা আগে উল্লেখ করেছি। সেগুলো ছাড়াও আরও কিছু কারণ ছিল এমন:
প্রথমত, মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যাধিক্য ছিল না। দ্বিতীয়ত, মসজিদের কর্মপরিধি ছিল ব্যাপক। তৃতীয়ত, মামলা হতো দীর্ঘসূত্রিতামুক্ত এবং বিচারের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। ফলে বিচারব্যবস্থা হতো ফতোয়া বা সালিশির মতো।
উসমান তাঁর শাসনামলে বিচারের জায়গা নির্দিষ্ট করার জন্য একটি কার্যালয় তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল: বিচারের সময় যে শোরগোল হয় তা থেকে মসজিদকে মুক্ত রাখা। মসজিদ যাতে অনর্থক কাজকর্ম থেকে পবিত্র থাকে। তাহলে বিচারে মানুষের অংশগ্রহণের জায়গা প্রশস্ত থাকবে। সে হিসেবে উসমান-ই সর্বপ্রথম মদীনাতে স্বতন্ত্র বিচারালয় নির্মাণ করেন। তারপর ধীরে ধীরে অন্যান্য শহর আর অঞ্চলে এ ব্যবস্থাপনার বিস্তার ঘটে।
কিন্তু এর মানে এটা নয় যে, বিচারকগণ মসজিদে বা ঘরে সাধারণ আর ছোটখাটো বিচারকার্য পরিচালনা থেকে বিরত থাকতেন। বরং বিচারের প্রধান প্রধান এবং সরকারি বৈঠকগুলো বিচারালয়ে অনুষ্ঠিত হতো। আর অন্যান্য সাধারণ বিচার মসজিদে বা ঘরেই হতো। এ কারণেই শোরগোল আর হইচই হয় বিধায় কোনো কোনো ফিকহবিদ মসজিদে বিচারকার্য পরিচালনা মাকরুহ বলেছেন। তা ছাড়া বিচারালয়ে বিচারকের ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করাও সহজ হয়।
নববি যুগে অভিযুক্ত ব্যক্তি আর অপরাধীকে বন্দি করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বন্দিশালা ছিল না। সে-সময় কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বন্দি করতে হলে তাকে মসজিদে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হতো। কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ ও চোখে-চোখে রাখার জন্য কোনো একজন মুসলিমকে দায়িত্ব দেওয়া হতো। নয়তো তাকে কোনো মুসলিমের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেখানে সে মেহমান হিসেবে থাকত। মেজবানের দায়িত্ব থাকত তাকে পাহারা দিয়ে রাখা এবং বিচারের সময় তাকে উপস্থিত করা। উমর-এর শাসনামলের প্রায় অর্ধেক সময় পর্যন্ত বন্দি করার বিষয়টি এভাবেই চলে আসছিল। অবশেষে উমর জেলখানা নীতির প্রচলন করেন। বিচারক, শাসক এবং সরকারি কর্মকর্তাগণ যাকে বন্দি করা দরকার বলে মনে করতেন, তাকে সেখানে আটক রাখতেন। পরিবেশ-পরিস্থিতির বিবেচনায় পরবর্তীকালে এভাবেই সকল বিভিন্ন শহরে জেলখানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রসার লাভ করে।
নাফে ছিলেন উমর কর্তৃক নিযুক্ত মক্কার প্রশাসক। তিনি উমর-এর আদেশে মক্কায় সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া থেকে জেলখানা বানানোর জন্য একটি বাড়ি কিনেছিলেন। শর্ত ছিল, উমর অনুমোদন না দিলে সেটা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। অবশেষে খলিফার অনুমোদনে সেটা জেলখানা হিসেবে ব্যবহার শুরু করা হয়।
আলি ঋণের কারণে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে বন্দি করতেন না। তিনি বলতেন, 'এটা জুলুম।' তিনি আরও বলতেন, 'একজন মানুষের অপারগতা জানার পর তাকে কারাগারে বন্দি রাখা ঠিক নয়।

টিকাঃ
[২৪৯] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৬; তুরাসুল খুলাফাইর রাশিদিন, পৃ. ১৬৪
[২৫০] বায়হাকি: ৬/৩৪; আল-মাদখালুল ফিকহিল আম: ১/৪৯৮
[২৫১] আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৬২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00